২৮ অক্টোবরের নৃশংসতা ছিল পরিকল্পনামাফিক -মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীক

প্রেরণা : আস্সালামু আলাইকুম
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : ওয়ালাইকুমুস সালাম।

প্রেরণা : দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলুন।
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : প্রেরণাকে ধন্যবাদ। সাদামাটা ভাষায় আমি এটাই বলবো বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা কোনোমতেই প্রেরণাদায়ক, উৎসাহব্যঞ্জক, আশা সৃষ্টিকারী নয়। কেউ বলতে পারে রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। কেউ বলতে পারে রাজনীতি অনেক পঙ্কিল হয়ে গেছে। কেউ বলতে পারে রাজনীতি জনসম্পৃক্ততা হারিয়েছে। আমি যদি বলি রাজনীতি রাজনীতিবিদগণের সম্পৃক্ততা হারিয়েছে। Another word it is a depolitiziation process-এর সাথে আরেকটি শব্দ যুক্ত করা যায়, crimilization of politics. আগামী নির্বাচন যথাসময়ে হতে গেলে ২০২২ এর শেষে বা ২০২৩ সালের মাঝামাঝি হতে পারে। আগামী নির্বাচনের তত্ত্বাবধান কে করবেন? বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনের দুইবারের অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। ২০১৪ সালে ১৫৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সবাই নির্বাচিত হয়েছে। আগামীতে কি হবে আমার এ ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে আসছে না। যখন আসবে তখন আপনাদের মুখোমুখি হবো। ইনশাআল্লাহ। বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের বদলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্ন আসছে। সরকার তো পার্লামেন্ট ও উচ্চতর আদালতকে ব্যবহার করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপদ্ধতি বাতিল করে দিয়েছে। সেইখানে তো কেউ নক করতে পারছে না। যেখানে আইনি পদ্ধতিতে সরকারকে মোকাবেলা করার পদ্ধতি পাওয়া যাচ্ছে না। সেখানে পরিবর্তন কিভাবে আনবেন আমি জানি না। কোভিড-১৯ আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে- অনেক বিষয়ে দুর্নীতি আর দুর্নীতি। আমরা এমন একটি পরিবেশে বাস করছি যেমন মাছ বাস করে পানির মধ্যে, পাখি বাস করে বাতাসের মধ্যে, তেমন আমাদের পরিবেশ হচ্ছে দুর্নীতির পানি এবং মহাসাগর অথবা দুর্নীতির অক্সিজেন ভরা বাতাস। এর থেকে বের হওয়া কঠিন কাজ। সুইচ টিপলে আলো জ¦লে, ফ্যান চলে কিন্তু সুইচ টিপলেও অর্থাৎ সরকার বদল হলেও বাংলাদেশের সমস্যাগুলো সমাধান হবে না। তার জন্য অকুতোভয় ব্যক্তি লাগবে। যাদের দুনিয়ার প্রতি আর কোনো মোহ নাই। জ্ঞানী মানুষ লাগবে। সৎ মানুষ লাগবে। রাজনীতির অন্যতম অংশ পররাষ্ট্রনীতি। সেখানে আমরা এখন দুটি পা দুই দিকে দিয়েছি। হ্যাঁ, আমরা প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে চাই, নিজেদের মর্যাদাকে রক্ষা করে। আমাদের স্থিতি চিন্তায় আসতে হবে। আমাদের মৌলিক নীতি, ফ্রেন্ডশিপ টু অল ম্যালিশ টু নান। সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়। এই নীতিকে আমিও সমর্থন করি। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বাংলাদেশও সমস্যায় আছে। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয় নাই। কেন হয় নাই? যিনি বন্ধু তিনিতো সাহায্য করছেন না।

প্রেরণা : ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর রাজধানী পল্টনের লগি-বৈঠার তাণ্ডবকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : বিএনপি সরকার সরকার ক্ষমতা থেকে চলে গেল ২৬ অক্টোবর ২০০৬। কিন্তু সে সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন সংবিধান অনুযায়ী করা উচিত ছিল, সেটাও করা সম্ভব হয়নি। তার জন্য বিএনপি ও আওয়ামী লীগ সমানভাবে দায়ী। কেউ কাউকে বোঝাতে পারুক বা না পারুক আমার দৃষ্টিতে সমানভাবে দায়ী। সেই বিশ্লেষণে আমি যেতে চাই না। ওটার-ই প্রেক্ষাপটে ২৮ অক্টোবরে ঘটনাটি ঘটেছিল। বায়তুল মোকাররম মসজিদের পল্টন এলাকায় ভীষণ রকম গণ্ডগোল হয়েছিল। জামায়াত-শিবিরের কর্মীদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা। আহতের সংখ্যাও কম না। এবং সেটার প্রেক্ষাপটে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করাটা কঠিন হয়ে যায় সেই জটিলতার মাঝখানে ভঙ্গুর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুরুত্বপূর্ণ চারজন ব্যক্তি পদত্যাগ করেছিলেন। তারা কি জেনেশুনে এই পরিস্থিতির জন্য অপেক্ষা করেছিলেন না কাকতালীয়ভাবে ঘটনাগুলো ঘটেছিল আমি জানি না। সবকিছু কেমন জানি পরিকল্পনামাফিক হচ্ছিল।

প্রেরণা : সেই ঘটনার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন/বিবর্তন নিয়ে আপনার মন্তব্য জানতে চাই?
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : এ ঘটনার পরে জনাব ফখরুদ্দীন প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে জেনারেল মইনুদ্দিনের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করলেন। সেই দুই বছরে সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু ছিল যথাসম্ভব গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। যেমন মুখে বলেছিলেন ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে ট্রেনকে লাইনে আনা। মনে হয় মাঝামাঝি সময়ে এসে মইনুদ্দিন সাহেব সমঝোতা করেছিলেন দেশের ভিতরে বা দেশের বাইরে। প্রয়াত ভারতীয় মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি সাহেবের লিখা আত্মজীবনী বইয়ের তৃতীয় খণ্ডে মইনুদ্দিন সাহেব যে ভারতের রাষ্ট্রপতির কাছে জীবনের নিরাপত্তা চেয়েছিলেন তা লেখা আছে। রাজনৈতিকভাবে দুইয়ে দুইয়ে মিলালে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনা হলো তার বিনিময়ে।

প্রেরণা : বর্তমান মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিচারতো দূরের কথা, মামলাটি প্রত্যাহারই করে নেয়া হয়। এ বিষয়টি আপনি কিভাবে দেখছেন?
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : দলগুলো ক্ষমতায় যায়। ক্ষমতার বাইরে থাকে। রাজনীতিতে দলীয় প্রভাব থাকবেই। কিন্তু দলীয় রাজনীতি যখন সরকারি অঙ্গনকে দখল করে ফেলে তখন কিন্তু অবস্থা সন্তোষজনক থাকে না। বাংলাদেশে তাই হয়েছে। গত আড়াই বছর যাবৎ যে পার্লামেন্ট চলছে তাতে এই পার্লামেন্টের নৈতিক কোনো ভিত্তি নেই। আইনগত ভিত্তি আছে বলে অনেকে দাবি করেন, কিন্তু আইনটাই তো ফ্রড। যে নির্বাচন হয়েছে সেটা তো নির্বাচন হয়নি। এখন গায়ের জোরে সবকিছু চলছে। আমরাও মেনে নিয়েছি, যেহেতু পেশিশক্তির সামনে আমরা দাঁড়াতে পারছি না। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে তো প্রশ্ন আছেই। প্রধান বিচারপতি যেখানে নিজেই ভিকটিম, সেখানে আর কী বলার থাকতে পারে।

প্রেরণা : বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ২৮ অক্টোবরের প্রভাব কেমন বলে আপনি মনে করেন?
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : একদিনেই কিন্তু সরকার এতো বেপরোয়া হয়ে ওঠেনি। চৌদ্দ বছর ধরে ক্রমান্বয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে। ২৮ অক্টোবর ছিল আওয়ামী লীগের পেশিশক্তির মহড়া প্রদর্শনের দিন। দুই বছর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। অনেকে বলে মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন-এর সরকার। সেই সরকারটা ছিল বাংলাদেশের জন্য যন্ত্রণা। না তারা বাংলাদেশের জন্য মঙ্গলজনক ছিল। না ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য। নির্বাচন কমিশন দুই-চারটা ভালো কাজ করেছিল তাদেরকে ধন্যবাদ জানাবো। সেগুলো আবার বর্তমান রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসে নাকচ করে দিয়েছে। সেই যে ক্ষমতায় আসলেন সেই ক্ষমতা ধরে রেখেছেন। একটি দল যদি চৌদ্দ বছর ক্ষমতায় থাকে তাহলে রাজনীতিতে অনেক কিছু ঘটে যায়। তাই হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে অনেক রায় বের করা হয়েছে। পার্লামেন্টের মাধ্যমে অনেক আইন করা হয়েছে। এটা দেশবাসী জানেন, আজকে কী একটা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রকারের ইস্যু তৈরি হচ্ছে। ঘটনা তৈরি হচ্ছে। সাংবিধানিক ক্রাইসিসকে অ্যাডজাস্ট করার কেউ সুযোগ পাচ্ছে না। সেই সুযোগটা কেউ কাউকে দিচ্ছে না। আমি চারটি বড় রাজনৈতিক দলের নাম বলবো আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি। দেশব্যাপী তাদের সংগঠন আছে। আর একটি রাজনৈতিক দলের নাম বলতে পারি যার দেশব্যাপী সংগঠন নাই। তবে দেশব্যাপী নাম পরিচিত আছে। বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি। আমরা মিলে মিশে কাজটা করতে চাই, আর কতদিন আমরা সংঘাতপূর্ণ রাজনীতি করব? আর কতদিন আমরা ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ঝগড়া করবো? আর কতদিন আমরা সংসদকে অপবিত্র করবো? আর কতদিন আমরা দ্বীন ইসলামকে অপবিত্র করবো? আর কতদিন আমরা অন্যান্য ধর্মের মানুষকে আতঙ্কে রাখবো?

প্রেরণা : ২৮ অক্টোবরের ঘটনা থেকে বাংলাদেশের জনগণ কি কোনো শিক্ষা নিতে পেরেছে- আপনি কী মনে করেন?
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : প্রেরণা যথাসম্ভব তরুণদের পত্রিকা। তরুণদের অভিনন্দন জানাই। তরুণ এবং তারুণ্যের মধ্যে তফাত হলো, তরুণ বয়সের সাথে সম্পৃক্ত, আর তারুণ্য হচ্ছে অনুভূতির সাথে সম্পৃক্ত। আমি বয়সে প্রবীণ। সবাই বলে আমি তারুণ্যকে লালন করি। তরুণদের সাথে একই রকম শার্ট প্যান্ট পরে, গেঞ্জি পরে, ধানমন্ডিতে, কল্যাণপুরে স্বাধীনতা দিবসে-বিজয় দিবসে র‌্যালি করি। যেখানে যাই তরুণদের আগে ডাকি। এই বাংলাদেশটা তাদেরই সম্পত্তি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক আদর্শের ক্ষেত্রে দেশপ্রেম এখনো পারিবারিক প্রভাবের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়নি। যাকে বলে অন্ধ অনুসরণ। এজন্য মূলত কোনো ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়ার নিরপেক্ষ মানসিকতা এখনো সেভাবে তৈরি হয়নি। তরুণদের সে সঙ্কীর্ণ বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

প্রেরণা : আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেশের দুর্নীতি ও উন্নয়নকে কিভাবে দেখছেন?
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : দেশে কাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে অনেক। মহাসড়ক হয়েছে, রাস্তা হয়েছে, কালভার্ট হয়েছে। প্রথমেই হলো তারা বিদ্যুৎ সেক্টর উন্নত করেছে। জিয়াউর রহমানের আমলে বিভিন্ন বোর্ড করা হয়েছিল। হাউস উন্নয়ন বোর্ড, উপকূলীয় উন্নয়ন বোর্ড, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নতিকরণ বোর্ড, উন্নয়নের একটা ধাক্কা পেয়েছিল। একটা পুশ পেয়েছিল। উনি তখন করেছিলেন বাংলাদেশে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (বেপজা)। উনি গার্মেন্টস সেক্টর লঞ্চ করেছিলেন। উনি বিদেশে মানুষ পাঠানোর প্রক্রিয়া লঞ্চ করেছিলেন। সেটার চল্লিশ বছর পর ইনফরমেশন কমিউনিকশন টেকনোলজি প্রযুক্তির ধাক্কায় চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য বাংলাদেশকে তৈরি করা হচ্ছে। ইকোনমিক জোনগুলো বানানো হচ্ছে। যেখানে অনেক বিনিয়োগ আসবে। প্রোডাকশন বাড়বে। এক্সপোর্ট বাড়বে। আগামী ১০-১৫ বছরের মধ্যে টপ ১৫-২০টি দেশের কাতারে যাবে। এসব অস্বীকার করা যায় না। এসব যেমন সত্য, তেমন সত্য সব জায়গায় দুর্নীতি আছে। উন্নয়নটা দুর্নীতিযুক্ত। দুর্নীতিটা জনগণ ফিল করছে না, দেখছে না। কাঠামোটা দেখছে। গাড়ি চলছে, পদ্মা সেতু দেখছে।

প্রেরণা : দেশের ইতিহাসে এ জঘন্যতম ঘটনার বিচার হওয়া উচিত কি-না? আপনি কী মনে করেন?
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : অবশ্যই হওয়া উচিত।

প্রেরণা : প্রেরণাকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
বীরপ্রতীক ইবরাহিম : প্রেরণা পরিবারকেও অনেক ধন্যবাদ। প্রেরণার তরুণ পাঠকদের জন্য ভালোবাসা রইলো।

SHARE

Leave a Reply