২৮ অক্টোবর ইতিহাসের কালো অধ্যায় : মুহাম্মদ রেজাউল করিম

mrkarim২৮ অক্টোবর, ২০০৬। অন্যদিনের মতো একটি দিন, একটি মাস, একটি বছর নয়। এটি একটি ঐতিহাসিক স্মরণীয় দিন কিন্তু বরণীয় নয়। এটি জাতীয় জীবনে একটি কালো অধ্যায়ের সংযোজন। এ দিনটি হয়তো বা পল্টন হত্যা দিবস, মানবাধিকার হত্যা দিবস, লগি-বৈঠার তাণ্ডব দিবস, আওয়ামী বর্বরতা দিবস হিসেবে পালিত হতে থাকবে যত দিন পৃথিবী থাকবে। ইতিহাসে হিরোশিমা-নাগাসাকি, ২৫-২৬ ফেব্রুয়ারি ’০৯ বিডিআর হত্যাযজ্ঞ, ২৫ মার্চের কালো রাত্রি, এপ্রিল ফুল দিবস ইত্যাদির মধ্য দিয়ে আমাদের স্মৃতিতে এক বীভৎস চিত্র ভেসে ওঠে। ঠিক তেমনি শত বছর পরও ২৮ অক্টোবরকে স্মরণ করলে শিউরে উঠবে মানুষের শরীর, বাকরুদ্ধ হবে তার বিবেক, কেঁদে উঠবে মন। অভিশপ্তদের ঘৃণা করবে বিশ্বমানবতা।

দিন যতই এগুচ্ছে ২৮ অক্টোবরের কলঙ্কের বোঝা ততই ভারী হচ্ছে। কারণ সুড়ঙ্গ পথ ধরে যে দানব আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে তার আক্রমণে ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে বিগত জরুরি সরকারের সময়। সংস্কারের নামে দেশকে রাজনীতিশূন্য করার ষড়যন্ত্র, গ্রেফতার, হামলা, মামলা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে চাঁদাবাজি, হিংসাত্মক প্রতিশোধ, হেয়প্রতিপন্ন করার মহোৎসব, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নামে দোকান-পাট ভাঙচুর, অসহায় মানুষের কান্নার রোল, অর্থনৈতিক মন্দা, ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা, দেশের সচল অর্থনীতির গতিকে পিছিয়ে দিয়েছে ২০ বছর। তারপরও গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ এসব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য ২৯ ডিসেম্বর’০৯ অংশগ্রহণ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। প্রত্যাশা ছিল গণতন্ত্রের উত্তরণ। কিন্তু না! দেশের মানুষকে বোকা বানিয়ে ৮৭% ভোটের আজগুবি ফলাফল নিয়ে ক্ষমতায় আসীন হলো মহাজোট সরকার। ধারণা করা হচ্ছিল বিগত ২ বছরের ঘটনা থেকে রাজনীতিবিদগণ শিক্ষা নিয়ে দেশ চালাবেন। কিন্তু দেখা গেল আওয়ামী লীগ বিগত কয়েক মাসে বিডিআর হত্যাকাণ্ড, টিপাইমুখ বাঁধ, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা প্রত্যাহার, দক্ষিণ এশিয়া টাস্কফোর্স, এশিয়ান হাইওয়ে, সংবিধান সংশোধনী, শিক্ষানীতিসহ জাতীয় গুুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে যেনতেন নীতি অবলম্বন করে দেশের স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্বকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। তাছাড়া বিরোধী সংগঠনের ওপর হামলা-মামলা নিত্য-নৈমিত্তিক কর্মসূচি; এছাড়াও ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তিবাণিজ্য দেশকে কারাগারে পরিণত করেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি শহীদ শরীফুজ্জামান নোমানী ও জামালপুরের হাফেজ রমজান আলীকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে দেশের প্রায় ৭৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। ছাত্রশিবিরের কয়েক হাজার নেতা-কর্মীকে আহত করা হয়েছে এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে জেলে ঢোকানো হয়েছে অনেককে।

২৮ অক্টোররের লগি-বৈঠাধারীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা থাকলেও তা রাজনৈতিক বিবেচনায় বাদ দেয়ার উদ্যোগ সরকারের নব্য বাকশালী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। আমি বিশ্বাস করি শহীদের রক্ত কথা বলে, এর আছে নিজস্ব এক শক্তি। ২৮ অক্টোবরের ও ২৫, ২৬ ফেব্রুয়ারির সেনা সদস্যদের রক্তের বেড়াজাল থেকে আওয়ামী লীগ কখনও রেহাই পাবে না। জলিল সাহেবের বোমায় বিধ্বস্ত আওয়ামী লীগ বর্তমান পরিস্থতিতে সেই সাক্ষ্যই বহন করছে।

২৮ অক্টোবর সংঘটিত ঘটনা নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে অনেক বক্তৃতা-বিবৃতি, বুকলেট, প্রতিবাদ, সিডি, ভিসিডি ওয়েবসাইট খোলাসহ নানা ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। আমার এই লেখাটি তারই অংশ। ঘটনার অনেক পরে আমার কয়েকটি কথা লেখার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস।
সেদিন ঘটনার শুরু যেভাবে

সকাল ১০টা। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সেক্রেটারিয়েট সদস্য ভাইদের আসতে বলেছেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি। দু-একজন করে আসছেন। হঠাৎ গেটের সামনে চিৎকার শোনা গেল। বেরিয়ে দেখি একজন ভাইকে রিক্সায় করে রক্তাক্ত অবস্থায় নিয়ে আসা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় সভাপতিসহ আমরা কয়েকজন সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। দেখছি অনবরত আহত ও রক্তাক্ত ভাইয়েরা আসছেন। গ্র্যান্ড আজাদ হোটেলের সামনে কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে করণীয় ঠিক করা হলো। কেন্দ্রীয় সভাপতি শফিকুল ইসলাম মাসুদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে কিছুটা বিষন্ন ও যন্ত্রণার চাপ অনুভব করলাম, যা অতীতে আর কোনদিন লক্ষ করিনি। কারণ এ সাহসী অকুতোভয় অবিচল আল্লাহর দ্বীনের জিন্দাদিল সৈনিককে দেখার সুযোগ হয়েছিল অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম, নির্যাতন আর ১৫ জন শহীদের জীবন্ত ময়দান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। একদিন নয়, দু’দিন নয়, দীর্ঘ ৭টি বছর। তাই বুঝতে আর বাকি নেই পরিস্থিতি ভালো নয়। এদিকে এই ৫ মিনিট যেন ঘণ্টার মর্মবেদনা।

আহত ভাইদের সারি আস্তে আস্তে দীর্ঘ হচ্ছে। আর সহ্য করা যায় না। কেন্দ্রীয় সভাপতির হাতের ইশারায় অনুমতি পেয়ে দৌড়াচ্ছি পল্টন মসজিদের গলির দিকে। এ দিক থেকে কয়েকজন ভাই ডাকছে, আসেন। তখনও বুঝতে পারিনি সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান মন্জু ভাইও এখানে আহত। কে যেন বলে উঠল, আহ্! মন্জু ভাইকে শেষ করে ফেলল। আল্লাহর দ্বীনের এই নির্যাতিত মানুষটির গায়ে আবারও ওরা আঘাত করেছে। তারা তাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা নিয়ে তার ওপর লগি-বৈঠার চরম আঘাত চালিয়েছে। লাঠি-বৈঠার আঘাতে জর্জরিত করেছে সারাটি দেহ। শুধু তাই নয়, এর আগেও তিনি এরকম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কয়েকবার। যে আঘাতের যন্ত্রণায় তিনি এখনও স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। এ দৃশ্য দেখতে না দেখতে জড়িয়ে পড়লাম পরিস্থিতি মোকাবেলায়। এদিকে ৪০-৫০ জন ভাই, অপরদিকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার সন্ত্রাসী হামলা চালাচ্ছে অস্ত্র, লাঠি, বোতল, বোমা ইত্যাদি নিয়ে। এমন কোনো অস্ত্র নেই যা তারা ব্যবহার করেনি। যে ইটগুলো তারা আমাদের দিকে মারছিল সেইগুলো তুলে আমরা আবার তাদের দিকে ছুড়ে মারছি। এভাবে একদিকে সন্ত্রাসীদের মারণাস্ত্রের হামলা অন্য দিকে আমরা নিরস্ত্র। এই নিরীহ মানুষগুলো ৭ ঘণ্টা মোকাবেলা করেছিল। ওরা এক ইঞ্চি জায়গা থেকেও সরাতে পারেনি আল্লাহর দ্বীনের গোলামদের। এ তো আল্লাহর দ্বীনের পথে এগিয়ে যাবার এক ঐতিহাসিক দিক-নির্দেশনা। বাতিলের বিরুদ্ধে এক চরমপত্র। ১৪ দলের গালে একটি চপেটাঘাত। জীবন দেয়ার প্রতিযোগিতা। ঈমানদারদের জন্য এটি বিরাট সুযোগ। আগামীর পথে এক দুরন্ত সাহস। এক সময় আমি নিজেও মনে করতাম অস্ত্রের মোকাবেলায় টিকে থাকা যায় না। কিন্তু রাবি’তে সে ভুল কিছুটা সুধরে নিয়েছি, বাকিটুকু পরিশুদ্ধ করেছি ২৮ অক্টোবরের ঘটনায়। আল্লাহর প্রত্যক্ষ মদদের বাস্তব সাক্ষী! ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলছে। কেউ কেউ আহত হচ্ছে নতুন করে, দু-একজন করে আমাদের সাথে যোগ দিচ্ছে। কিন্তু আমাদের সংখ্যা এর থেকে বাড়ছে না। কারণ “বিজয় তো সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল নয়”।

হঠাৎ চিৎকার শুনলাম টুটুল ভাইকে মারছে। এ কথা শুনে উপস্থিত ভাইদের উদ্দেশ্যে বললাম, ‘আপনাদের মধ্যে যারা জীবন থাকা পর্যন্ত পিছিয়ে আসবেন না তারা হাত তুলুন এবং সামনে আসেন।’ ১৫-২০ জন ভাই এগিয়ে এলেন। নারায়ে তাকবির ধ্বনি দিয়ে যখন আমরা এগুতে লাগলাম তাদের ৪-৫ হাজার লোক পেছনে যেতে লাগল। আল্ল­াহর ওপর তাওয়াক্কুল করলে তাঁর সাহায্য অনিবার্য। এটাই তার প্রমাণ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “কোনো মু’মিন মুজাহিদের জিহাদের ময়দানে নারায়ে তাকবির বাতিলের মনে চার হাজার লোক তাকবির উচ্চারণ করলে যে আওয়াজ হয় তার সমপরিমাণ ভীতি সৃষ্টি হয়।” ২৮ অক্টোবর হাতে-নাতে তার প্রমাণ পেয়েছি।

যাক, সামনে এগিয়ে গিয়ে দেখি গলির একটু ভেতরে পড়ে আছে আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ মুজাহিদের লাশ। হায়েনারা তাকে হত্যার পর ফেলে রেখেছে গলির মধ্যে। কয়েকজন মিলে ধরে কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রক্তপিপাসু আওয়ামী সন্ত্রাসীদের হামলা তখনও থামেনি। লাশের উপর তারা ছুড়ে মারছে ইট, পাথর, বোতল, লাঠি। তখনো ঠিক বুঝতে পারিনি আল্লাহর প্রিয় বান্দা মুজাহিদ আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। আল্লাহ জান্নাতের মেহমান হিসেবে তাকে কবুল করেছেন। পরে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে শুনলাম মুজাহিদ আর নেই। তখন স্মৃতিতে ভেসে উঠলো সব ঘটনা। এখন মিলিয়ে দেখলাম যে মন্জু ভাইয়ের আহত হওয়া আর মুজাহিদের শাহাদাতের ঘটনা ছিল একই সময়। মুজাহিদ শাহাদাতের পূর্বে ডায়েরিতে লিখেছিল “আমার প্রিয় দায়িত্বশীল সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মজিবুর রহমান মন্জু ভাই”। হজরত তালহা (রা) রাসূলে করিম (সা)-কে রক্ষা করার জন্য একাই নিজের শরীরে অসংখ্য তীরকে বরণ করেছিলেন। আর সেই চেতনায় উদ্ভাসিত হয়ে আমাদের প্রিয় ভাই শহীদ মুজাহিদও নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছিল তার প্রিয় দায়িত্বশীলকে রক্ষা করতে গিয়ে। আর হয়তো শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার পূর্বে চিৎকার করে বলেছিল আমি প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালিয়েছি কিন্তু এখানেই বিদায়।

এ পর্যায়ে দীর্ঘ ৫ ঘণ্টার পর গুলি আমার বাম পায়ে আঘাত হানল। আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। গাড়ির চাকা পাংচার হওয়ার মতো লুটিয়ে পড়লাম হাঁটুর ওপর ভয় করে। জাহেদ হোসেন ভূঁঞা ভাই ও আব্দুল মান্নান ভাইসহ কয়েকজন কাঁধে করে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। পায়ের যন্ত্রণায় যতটুকু কাতর তার থেকে বেশি কষ্ট লাগছে এই ধন্য মানুষগুলোর কাতার থেকে এই অধমের বিদায় নিতে হচ্ছে বলে। তখন নিজেকে খুব স্বার্থপরই মনে হচ্ছিল। সবাই যখন জীবনবাজি রেখে ভূমিকা রাখছে তখন আমি চলে যাচ্ছি অন্যের কাঁধে ভর করে। গুলিবিদ্ধ পা’টি ঝুলছে আর সেই সাথে রক্ত ঝরছে। কষ্টের মধ্যেও নিজেকে একটু গুছিয়ে নিলাম। অনেক ভাই পেরেশান হয়ে গেল এবং দলবেঁধে আমার সাথে আসতে লাগল। কিছুটা ধমকের সুরে বললাম, এতজন কোথায় যাচ্ছেন? পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। সেখানে দায়িত্বশীল হিসেবে আমি, জাহেদ হোসেন ভূঁঞা ভাই এবং শেখ নেয়ামুল করিম ভাই ছিলাম।

নিয়ে যাওয়া হলো হাসপাতালে। এ যেন আরেক কারবালা। কিন্তু কঠিন পরিস্থিতিতেও দারুণ শৃঙ্খলা এ শহীদি কাফেলার ভাইদের মাঝে। এখানেও ইয়ামামার যুদ্ধের সেই সাহাবীদের অপর ভাইকে অগ্রাধিকারের দৃষ্টান্ত। নিজেদের কষ্ট হচ্ছে, রক্ত ঝরছে তবুও ডাক্তারকে বলছে ঐ ভাইকে আগে চিকিৎসা করুন। এ যেন ‘বুন ইয়ানুম মারসুস’-এর উত্তম দৃষ্টান্ত। এ যেন আনসার মুহাজিরদের ভ্রাতৃত্বের জীবন্ত দলিল।

জোহরের নামাজ আদায় করলাম অপারেশন থিয়েটারে গুলিবিদ্ধ পা প্লাস্টার করা অবস্থায়। নিজের অজান্তেই ভাইদের জন্য  দোয়া করতে লাগলাম। প্লাস্টার করছেন ডাক্তার। এক্স-রে রিপোর্ট ঝুলানো, দেখা যাচ্ছে পায়ের হাড় দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেছে। কেউ যেন বলতে চেয়েও আমি ভয় পাব সে জন্য আর কিছু বলতে চায়নি। আমি বললাম, এই গুলিটি আমার জন্য আল্লাহ কবুল করেছিলেন। শুধু তাই নয়, গুলিটি আমার পায়ের নামেই লেখা ছিল। আর এ বিশ্বাস থাকতে হবে প্রতিটি আল্লাহর দ্বীনের সৈনিকের। এই বিশ্বাসের ইমারতের ওপর যে আন্দোলন গড়ে ওঠে তার ওপর আঘাতের পর আঘাত এলেও তাকে কখনো স্তব্ধ করা যাবে না।

আজ হয়তো কেউ কেউ বলেন, আমাদের প্রস্তুতির কথা। কিন্তু আমি দ্বিমত পোষণ করি। কারণ দীর্ঘ ৭ ঘণ্টা যাদের সাথে আমরা মারামারি করেছি, কী তাদের পরিচয়? দলে তারা আওয়ামী লীগ কিন্তু ভাড়াটে সন্ত্রাসী, টোকাই, গার্মেন্টস কর্মী ও পতিতালয়ের হিন্দা। মুখে রুমাল, কোমরে মাফলার, খালি গায়ে মারামারিতে অংশ নিয়েছে ওরা। আমাদের প্রস্তুতি আরো ভালো হলে সেদিন লাশের সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেত। আর এ ধরনের সন্ত্রাসী একজন টোকাই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়–য়া, নামাজী, আল্লাহর দ্বীনের সৈনিকদের লাশ সবাই একই হিসেবে মূল্যায়ন করতো। হিসাব হতো কাদের লাশ কয়টি। দেশী এবং আন্তর্জাতিকভাবে দেখা হতো সেভাবে। অন্তত আল্লাহতায়ালা সে কলঙ্কের হাত থেকে এ আন্দোলনকে রক্ষা করেছেন। বিশ্বের মানুষ চিনতে সক্ষম হয়েছে উগ্র ও জঙ্গি কারা। আল্লাহ যা করেন তার মধ্যে এই আন্দোলনের কল্যাণ নিহিত।

আল্লাহ বলেন, “আর বিপদ কখনো আমার অনুমতি ব্যতিরেকে আসে না।” এটিই চিরন্তন সত্য। আমাদের কারো হিসেবে যেটি বিপদ, কেউ নিচ্ছেন আবার পরীক্ষা হিসেবে। কেউ নিচ্ছেন পরিশুদ্ধতা হিসেবে। আবার কেউ মনে করেন এটিই আমাদের পাওয়া। এটিই ইসলামী আন্দোলন। ১৯৮৯ সালের ১৮ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলিবিদ্ধ হয় রোজাদার শহীদ শফিকুল ইসলাম। হাসপাতালে সবাই চেষ্টা করছেন তাকে সুস্থ করার। কিন্তু সেদিন শফিকুল ইসলামের আকুতি ছিল এরূপ, “ভাই! আমি গুলিবিদ্ধ হয়েছি ঠিক, কিন্তু শহীদ হওয়ার আকাক্সক্ষা অনেক দিনের। সুতরাং আমাকে রোজাদার অবস্থায় শহীদ হওয়ার সুযোগটুকু করে দিন।” এ কথা বলতে বলতে তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করেছেন। এই তো তার প্রস্তুতি!
কিন্তু আমি জানি না ২৮ অক্টোবরের ঘটনা পর্যালোচনা ১৪ দল কিভাবে করছে। হাসপাতালে শত শত দর্শনার্থী। এতো দর্শনার্থীর ধাক্কায় রোগী কাবু কিন্তু করার কিছু নেই। এটি ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ। এই পৃথিবীতে ভালোবাসা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে বলেই আমরা মানুষ। হাসপাতালে আহতদের অবর্ণনীয় অবস্থা দেখে কেউ কেউ বলতে থাকেন আহ্, সেদিনের প্রস্তুতি আরেকটু ভালো হওয়া দরকার ছিল। এতগুলো ফুটফুটে ছেলে আমাদের ভুলের কারণে বিদায় নিল। আচ্ছা আপনারা জানতেন না এভাবে হামলা হবে? আবার কেউ কেউ বলছেন, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আওয়ামী লীগ আবার ’৭২, ৭৩’এর বাকশালী চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। জোটের মজবুতি বৃদ্ধি পেল। জোট সরকারের ব্যর্থতা, বিদ্যুৎ ও দ্রব্যমূল্যের কথা মানুষ এখন ভুলে গেছে। আগামী নির্বাচনে বিজয়ের জন্য এটাই যথেষ্ট। আবার কেউ কেউ এ খবরও দিচ্ছেন অনেকে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ছেড়ে ইসলামী আন্দোলনে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একজন অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে হঠাৎ করে হাসপাতালে অচেতন হয়ে ফ্লোরে পড়ে মাথা ফাটিয়ে আরেক দৃশ্যের অবতারণা করেছে। এ হচ্ছে মানবীয় পর্র্যালোচনার হিসাব নিকাশ। আর আল্লাহর হিসাব তো ভিন্ন।

আজ যদি বলা হয় এই দুনিয়ার বিবেচনায় ২৮ অক্টোবর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কে? কেউ বলবে, শহীদ মাসুম, শিপন, মুজাহিদ, রফিক, ফয়সলের পরিবার। কিন্তু না। এটি আপনার হিসাব হতে পারে তবে শহীদ পরিবারের অনুভূতি ভিন্ন। কিন্তু তা অবিশ্বাস্য। তারপরও শহীদ গোলাম কিবরিয়া শিপনের মায়ের ফরিয়াদ : আল্লাহর দরবারে আমার স্বপ্ন ছিল আমি শহীদের মা হবো, আল্লাহ যেন আমাকে একজন শহীদের মা হিসেবে কবুল করেন। শিপন সবসময় সত্যকে সত্য জানতো, মিথ্যাকে মিথ্যা জানতো। শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাসুমের গর্বিত মায়ের আহ্বান : আমার জীবনের আশা ছিল আমার ছেলে খালেদ বিন ওয়ালিদ হবে, নিষ্পাপ হবে। আমার ছেলে হাসান-হুসাইন এর মতো হবে। আমার আরেক ছেলে শামসুল আলম মাহবুব। সবসময় দোয়া করতাম সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে তারা যেন গাজী কিংবা শহীদ হয়। সত্যি আমার প্রার্থনা আল্লাহপাক কবুল করেছেন। আমি মনে-প্রাণে সর্বদা আশা পোষণ করতাম মাসুম যেন ময়দানে সবার আগে থাকে। আল্লাহপাক আমার দুয়া কবুল করেছেন। আমি আমার সাইফুল্লাহর রক্তের বিনিময়ে এ দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হোক এই প্রার্থনা সবসময় করি। শহীদ ফয়সলের গর্বিত মা অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন ঠিক এভাবে, তাদের কথা শুনেই মনে হয় তারা সত্যিই ইব্রাহিম (আ)-এর উত্তরসূরি। হজরত ইসমাইল (আ)-কে আল্লাহর পথে কুরবান করে ইব্রাহিম (আ) যেভাবে সন্তুষ্ট হয়েছিলেন ঠিক তেমনি তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ। আমি আশা করি ইনশাআল্লাহ আমার এই সুশিক্ষিত বিনয়ী, ভদ্র, শান্ত, অমায়িক ও সুন্দর আচরণবিশিষ্ট সন্তানকে আল্লাহ শাহাদাতের মর্যাদা দান করবেন। আমার সন্তানদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় সন্তানকে আল্লাহ কবুল করে নিয়েছেন সেজন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করছি। শহীদ রফিকুল ইসলামের পিতার চাওয়া : আমার ছেলে আল্লাহর দরবারে শহীদ হিসেবে কবুল হয়েছে বলে আমি মনে করি। কুড়িগ্রামবাসী সবাই তার জন্য কেঁদেছে। জীবনে সে কারো সাথে ঝগড়া-বিবাদে লিপ্ত হয়নি। সে সব সময় সৎ সঙ্গে মিশত এবং দ্বীনের পথে মানুষকে ডাকত। আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসীরা যাদের পিটিয়ে হত্যা করেছে, লাশের ওপর নৃত্য উল্লাস করেছে, ভেঙে দিয়েছে দাঁত, উপড়ে ফেলেছে চোখ; তারা হয়তো বা ভাবতে পারে এর মধ্য দিয়ে তাদের বিজয় হয়েছে। কিন্তু জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ এই পৃথিবীতেই শেষ নয়। বরং তাদের এই একটি আঘাত আল্লাহর দ্বীনের সৈনিকদের করেছে জান্নাতের কাছাকাছি। আর তাদের অনেককে করেছে জাহান্নামের নিকটবর্তী। যারা আঘাতের পর আঘাত চালিয়েছে এ নিষ্পাপ মানুষের দেহে তারা কি আজ উত্তর দিতে পারবেন হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপনের মায়ের জিজ্ঞাসার, ‘কী অপরাধ আমার সন্তানের? তাকে হত্যা করা হয়েছে তাতে আমার কোন আপত্তি নেই। এ জন্য আমি গর্বিত। কিন্তু কেন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমার সন্তানের দাঁতগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে? এই মুখ দিয়ে তো সে মহাগ্রন্থ আল-কুরআন মুখস্থ করেছে। যাদের বুকের ওপরে নৃত্যউল্লাস করা হয়েছে, তারা কি জানে যে কপালে লাথি মারা হয়েছে সে কপালে দিনে পাঁচবার করে আল্লাহকে সেজদা করতো! পড়তো তাহাজ্জুদ নামাজ। যে হাত ভেঙে দেয়া হয়েছে সে হাত দিয়ে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করতো। যে পা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে সে পা দিয়ে আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করতে যেত।’ এ হাজারো জিজ্ঞাসার জবাব আজ তাদের কাছে আছে কি? যারা সেদিন আমাদেরকে পিছিয়ে দিতে এসেছে তারা আমাদেরকে অনেক পথ এগিয়ে দিয়েছে। আরেকবার আমরা দেখে নিয়েছি আমাদের পরীক্ষিত নেতৃত্ব। যাদের সাহস আমাদের এগিয়ে দেয়। যাদের আল্লাহর নির্ভরতা এ কাফেলার কর্মীদের আশান্বিত করে। যাদের ত্যাগ আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আমরা দেখেছি তাদেরকে। আমরা দেখছি তাকে যাকে ঘিরে এ জনসভার আয়োজন। শ্রদ্ধেয় আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সাহেবকে। মুহুর্মুহু গুলি আর বোমা স্তব্ধ করতে পারেনি তার বলিষ্ঠ কণ্ঠকে। যা ছিল তেজোদীপ্ত, নিশ্চল, অবিরত আর অবিচল। তিনি যেন মাওলানা মওদূদীর অবিকল প্রতিচ্ছবি। এমনি এক জনসভায় অবিরাম গুলিবর্ষণ চলাকালে মাওলানা মওদূদীকে বসে পড়ার জন্য অন্যরা অনুরোধ করলে দৃঢ়তার সাথে তিনি বলেছিলেন, আমিই যদি বসে পড়ি তাহলে দাঁড়িয়ে থাকবে কে? তাই বিশ্বাস শহীদের রক্ত বৃথা যাবে না, একদিন কথা বলবেই।

আমাদের প্রিয় নবী রাসূলে করিম (সা) মক্কা থেকে দ্বীনের যাত্রা শুরু করেছেন। কিন্তু সেখানে তিনি বেশিদিন টিকে থাকতে পারেননি। হিজরত করেছেন মদিনায়। ইসলামকে অল্প সময়ের মধ্যে বিজয়ের মাধ্যমে মক্কা বিজয়ের সূচনা করেছিলেন। সে অনুসারে ইসলামী ছাত্রশিবিরও ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। কিন্তু শহীদ আবদুল মালেকের শাহাদাত আর অনেক জুলুম-নির্যাতন থামিয়ে দিতে পারেনি এ কাফেলাকে। আজ বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এক অপ্রতিরোধ্য সংগঠনের নাম বালাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। আমার বিশ্বাসÑ মক্কা বিজয়ের মতো ঢাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রক্তঝরা খুন আর ২৮ অক্টোবর পল্টনের শাহাদাতের নজরানার মধ্য দিয়ে এ জমিনে বিজয়ের সূচনা হবে। হে বিস্তীর্ণ আকাশ ও জমিনের মালিক! তুমি আমাদের ফরিয়াদকে কবুল কর।

লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
পিএইচডি গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

E-mail : mrkarim_ru@yahoo.com

SHARE

Leave a Reply