২৮ অক্টোবর ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত কালো অধ্যায় – মকবুল আহমদ

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত কালো অধ্যায়। এদিন বিশ্বের বুকে লেপন করা হয় মানবতার বিরুদ্ধে এক নির্মম পাশবিকতা। পৈশাচিকতার এমন নজির আর কোথাও নেই। প্রকৃতপক্ষে সেদিন কী ঘটেছিল, নেপথ্যের নায়কই বা কারা ছিলেন, কী ছিল তাদের উদ্দেশ্য, এ থেকে আমাদের শিক্ষণীয়ই বা কী, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে করণীয় কী- এসব প্রশ্নের জবাব জানতে হাজির হয়েছিলাম বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর জনাব মকবুল আহমদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্যান্য ধর্মীয় ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের কাছে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত আমীর জনাব মকবুল আহমদ বলেন, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি রক্তাক্ত কালো অধ্যায়। এদিন বিশ্বের বুকে লেপন করা হয় মানবতার বিরুদ্ধে এক নির্মম পাশবিকতা। পৈশাচিকতার এমন নজির আর কোথাও নেই।
ছাত্র সংবাদ : ২৮ অক্টোবর ২০০৬, দিনটিকে আপনি এককথায় কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?
মকবুল আহমদ : অক্টোবর মাস এলেই মনে পড়ে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লোমহর্ষক লগি-বৈঠার তাণ্ডবে নিহত জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের শহীদদের কথা। ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠার তাণ্ডবে সৃষ্টি হয়েছিল ইতিহাসের এক জঘন্যতম কালো অধ্যায়। আজও সেই ঘটনার কোনো তদন্ত ও বিচার হয়নি। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদছে। সেদিনের শহীদগণের পরিবার-পরিজন সেই দুঃসহ স্মৃতি ও স্বজন হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে আজও আল্লাহর দরবারে বিচার প্রার্থনা করেই যাচ্ছে। তাদের সেদিনের সেই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বিচার যদি দুনিয়ায় নাও হয়, কিন্তু আদালতে আখিরাতে অবশ্যই তাদের বিচার হবে। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার করা যাদের দায়িত্ব ছিল তারাও সেদিন দায়িত্ব পালন না করার কারণে বিচারের স¤মুখীন হবেন এবং উপযুক্ত শাস্তি পাবেন। দুনিয়ার বিচার সাময়িক। কিন্তু আখিরাতের বিচার স্থায়ী। সেদিন কেউ রেহাই পাবে না। তবে আমরা ২৮ অক্টোবরের ঘটনার বিচারের দাবি থেকে কখনো সরব না। আমরা অবশ্যই সেই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে অটল থাকব ইনশাআল্লাহ। আমরা আশা করি এই হত্যার সঠিক বিচার এ সরকার না করলেও বাংলার মাটিতে অবশ্যই হবে।
ছাত্র সংবাদ : বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য ২৮ অক্টোবরের ভূমিকাকে দায়ী বলে মনে করেন?
মকবুল আহমদ : ২৮ অক্টোবরের ঘটনা ছিল একটি পরিকল্পিত ঘটনা। চারদলীয় জোট সরকারের কার্যকালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ যখন বুঝতে পেরেছিল নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়, তখন তারা নৈরাজ্য সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এ ঘটনা সংঘটিত করে। লগি-বৈঠার তাণ্ডবে মানুষ হত্যার মাধ্যমে দেশের জনগণের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে নির্বাচন বানচাল করে অরাজনৈতিক শক্তিকে ক্ষমতায় এনে একটি প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে কথিত মহাজোটকে ক্ষমতায় বসানোর উদ্দেশ্যেই সেই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। তারই ফলশ্র“তিতে ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারি করে ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল করে দেয়া হয়েছিল। ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল করে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য দুই বছরব্যাপী প্লান প্রোগ্রাম করে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরে প্রহসনের নির্বাচন দেয়া হয়েছিল। যেটাকে বলা হয় মাস্টারপ্লানের নির্বাচন। সেই কথা আওয়ামী লীগের নেতারা নির্বাচনের পর প্রদত্ত বক্তব্যেও স্বীকার করেছেন।
বহুদলীয় গণতন্ত্র ও ইসলামী রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতি ধ্বংস করে বাংলাদেশকে ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করার এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েই ২৮ অক্টোবরের ঘটনার পর ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল। তারই ফল হচ্ছে বর্তমানে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনের মাধ্যমে সংবিধান থেকে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তুলে দিয়ে ও মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সংরক্ষণের ধারা বিলুপ্ত করে এবং ইসলামী রাজনীতি করার অধিকার সঙ্কুচিত করে বাংলাদেশকে মুসলিম বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে।
ছাত্র সংবাদ : ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা ২৮ অক্টোবরের ঘটনা থেকে কী শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে?
মকবুল আহমদ : সেই দিনের সেই ঘটনা থেকে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অনেক কিছু শেখার আছে। যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের উপর বহু হামলা, আঘাত এসেছে। এমনকি ইসলামবিরোধী শক্তি ইসলামী আন্দোলনের উপর এমন নির্যাতন চালাতো বা, মনে হতো এক ফুৎকারে আল্লাহর দ্বীনকে তারা নিভিয়ে দেবে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী তাদের সব চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশেও ২৮ অক্টোবরের মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলনকে তারা স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর দ্বীন এখনও দেদীপ্যমান আছে এবং থাকবে ইনশাআল্লাহ। ইসলামী আন্দোলনের পথ ফুলবিছানো নয়। এ পথ ত্যাগ ও কোরবানির। কাজেই সেই জন্য সবাইকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
ছাত্র সংবাদ : ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যাতে জাতিকে আর প্রত্যক্ষ করতে না হয় সে জন্য কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত?
মকবুল আহমদ : ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে সেই জন্য জনগণকে সচেতন করার পাশাপাশি আমাদের চোখ-কান খোলা রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে হবে এবং হেফাজাতের জন্য আল্লাহর কাছে ধরনা দিতে হবে। আল্লাহ সর্বোত্তম হেফাজতকারী। তিনি তার উপর নির্ভরশীল বান্দাদের হেফাজতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
ছাত্র সংবাদ : নিহতদের পরিবারের জন্য আপনার সান্ত্বনা কী?
মকবুল আহমদ : শহীদদের পরিবারের প্রতি আমাদের সান্ত্বনা হলো, যারা সেদিন শহীদ হয়েছে তারা সফল। আল্লাহ তাদের কবুল করেছেন। শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য সকলের হয় না। আল্লাহ যাদের কবুল করেছেন তারা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান। তাদের ও তাদের পিতা-মাতাকেও আল্লাহ রোজ হাশরে পুরস্কৃত করবেন। সেই পুরস্কারের কোন তুলনা হয় না। দুনিয়ায় হয় তো তাদের কষ্ট ভোগ করতে হচ্ছে। কিন্তু এর প্রতিদান আল্লাহ তাদের অবশ্যই দেবেন। যারা শহীদ হতে পারেনি সেদিন তারা আফসোস করবে। আর যারা শহীদ হয়েছে তারা সেদিন আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হবেন, আল্লাহও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।

SHARE

Leave a Reply