২৮ অক্টোবর দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা…

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

বাংলাদেশ নিয়ে যে ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্রের খেলা শুরু হয়েছিল, চারদলীয় জোট ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার একেবারে প্রথমদিকে আওয়ামী লীগের খুনি কর্মীরা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পুরানা পল্টন এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে অর্ধডজন নিরীহ মানুষকে হাজার হাজার লোকের সামনে পিটিয়ে হত্যা করেছিল। কেউ কারো চেনা নয়। কারো সঙ্গে কারো শত্র“তা নেই। সয়সম্পত্তির বিরোধ নেই। নিরীহ মানুষ ছিল তারা সবাই। তার আগের দিন কেবল চারদলীয় জোট সরকার তাদের মেয়াদ শেষে সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে বিদায় নিয়েছে। পল্টন, নয়া পল্টন, বায়তুল মোকাররম এলাকাজুড়ে সেদিন বিভিন্নভাবে সমাবেশ ছিল। গুলিস্তান এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। পুরানা পল্টন থেকে বায়তুল মোকাররম এলাকায় ছিল জামায়াতে ইসলামী। নয়াপল্টন এলাকায় অবস্থান নিয়েছিল বিএনপির নেতাকর্মীরা। আশা ছিল, এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে, তিন মাসের মধ্যে নতুন নির্বাচন দেবে, সে নির্বাচনে আবারও রাজনৈতিক ক্ষমতার দায়িত্ব জনগণ কোনো জোট বা দলের হাতে তুলে দেবে। চারদলীয় জোটের নেতাকর্মীরা সেদিন যুদ্ধ করতে ঐ এলাকায় হাজির হয়নি। ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে নতুন নির্বাচনের জন্য তাদের ভেতরে ছিল একধরনের উল্লাস ও উদ্দীপনা।
কিন্তু আওয়ামী লীগের সে মনোভাব ছিল না। আওয়ামী লীগ তারও আগে থেকে এক রাষ্ট্রঘাতী আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। জ্বালাও, পোড়াও, হরতাল, ধর্মঘট, অবরোধ এমন সব রাষ্ট্রঘাতী কর্মসূচি তারা দিয়েই যাচ্ছিল এবং চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদের শেষ দিন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা তার দলের ঘাতক বাহিনীকে লগি-বৈঠার মতো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঢাকায় চলে আসার আহবান জানিয়েছিলেন। ঘটেওছিল তাই। আওয়ামী লীগের শত শত ঘাতক কাঁচা বাঁশের লাঠি আর সদ্য বানানো কাঠের বৈঠা উঁচিয়ে ঢাকায় চলে এসেছিল। উদ্দেশ্য বিএনপি তথা চারদলীয় জোটের লোকদের পিটিয়ে শায়েস্তা করে দেয়া। কী তাদের দোষ! দোষ ছিল এই যে, ২০০১ সালের নির্বাচনে জনগণ তাদের ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেছিল। জনগণ তোদের ভোট দিল কেন? আর তোরাই বা কেন এমনভাবে রাষ্ট্রপরিচালনা করলি, যাতে বাংলাদেশ নিউ ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক জায়ান্টে পরিণত হলো। দেশ স্বাধীন করেছে আওয়ামী লীগ। বাংলাদেশ লুটেপুটে ভোগ দখল করে খাবে তারা। তোরা কেন সমৃদ্ধি আনলি?
সকাল থেকে আওয়ামী ঘাতকেরা লগি-বৈঠা হাতে মুক্তাঙ্গন থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত উসকানিমূলক সব শ্লোগান দিতে দিতে এলাকা প্রদক্ষিণ করছিল। এরই এক পর্যায়ে লগি-বৈঠা ও পিস্তল হাতে একদল ঘাতক চলে এসেছিল পুরানা পল্টন মোড়ে। দলে দলে জোটবদ্ধ হয়ে এরা সেই এলাকায় একযোগে নরহত্যার উৎসবে মেতে উঠেছিল। শত শত ভিডিও ও স্টিল ক্যামেরার সামনে তারা পিটিয়ে লাশ বানিয়ে দিয়েছিল সাতজন ছাত্র-যুবককে। কোনো কোনো টিভি চ্যানেল এই লোমহর্ষক দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করছিল। টিভির সামনে বসা অভিভাবকেরা সেই ভয়াল দৃশ্য যাতে শিশুরা চোখে না দেখে সে জন্য তাদের চোখ দু’হাতে ঢেকে ধরছিল। টেলিভিশনের সামনে বসে সে দৃশ্য দেখেছে শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ। আতঙ্কে তারা কুঁকড়ে গিয়েছে, এ কেমন বীভৎস্য জনপদ! আধুনিক বিশ্বে এ কেমন নিষ্ঠুর-পৈশাচিক মানুষ। এই ঘটনায় আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ এক জনপদ পিশাচের জনপদে পরিণত হয়। বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় উঠেছে। প্রতিবাদে প্রতিবাদে উচ্চকিত হয়েছেন উৎকণ্ঠিত দেশবাসী।
কিন্তু এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা। তিনি মানবিকতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও এই নরহত্যাযজ্ঞের কোনো প্রতিবাদ পর্যন্ত করেননি। নিন্দা তো নয়ই। বরং ঘাতকদের পক্ষাবলম্বন করে তিনি বললেন, তারা যখন আক্রান্ত হয়েছে তখন প্রতিরোধ করার অধিকার তাদের আছে। যারা নৃশংসভাবে খুন হয়েছে, তারা আওয়ামী পিকেটারদের উদ্দেশে গুলি ছুড়েছিল। তাই বিক্ষুব্ধ হয়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা এমন কাজ করেছে। এতে কোনো অন্যায় হয়নি। আত্মরক্ষার অধিকার তাদের রয়েছে। কিন্তু ভিডিও চিত্র পরীক্ষা করে দেখা গেল যে, আওয়ামী ঘাতকেরাই জনতার উদ্দেশে পিস্তল থেকে গুলি ছুড়েছে। তাদের পাশাপাশি ছিল নরহত্যার পিশাচেরা।
সে সময়ে বস্তুতপক্ষে এই ঘটনায় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের করার কিছুই ছিল না। তখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিতই হয়নি। ফলে এত বড় পৈশাচিক ঘটনার তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিকার করা যায়নি। এরপর নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ক্ষমতায় আসীন হয়েছিল জেনারেল মইন ও ফখরুদ্দীন। সংবিধানে তিন মাসের বিধি থাকলেও সে বিধি লঙ্ঘন করে তারা দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। তখন অনেক মামলা-মোকদ্দমা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে হয়রানি করতে শুরু করেছিল তারা। কিন্তু লগি-বৈঠার ঘাতকদের ধরার কোনো প্রচেষ্টার কথা শোনা যায়নি। আওয়ামী লীগ দাবি করেছিল মইন-ফখরের সরকার তাদের আন্দোলনেরই ফসল। আর বিএনপি ধ্বংসে তারা যত পদক্ষেপ নেবে ভবিষ্যতে তার সবকিছুকে সাংবিধানিক-ভাবে জায়েজ করে দেবে। এই ঘোষণার ভেতর সত্যতা ছিল। তা না হলে ২৮ অক্টোবরের ঘাতকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই কেন নেয়া হলো না? মইন-ফখরের অবৈধ সরকার রাজনীতিক নিধনে যতটা আগ্রহী ছিল, ঘাতক নিধনে তাদের বিন্দুমাত্র উৎসাহ ছিল না। হয়তো তারাও ধরে নিয়েছিল রাজনীতিকদের শায়েস্তা করতে তাদেরও ঐসব ঘাতকদের প্রয়োজন হতে পারে অথবা যারা আওয়ামী লীগকে ঐ হত্যাকাণ্ডে লেলিয়ে দিতে উৎসাহিত করেছিল, তারাই ক্ষমতায় বসিয়েছিল মইন-ফখরকে। ফলে তাদের করার কিছুই ছিল না।
একই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ক্ষমতায় আসীন হয়েছে আওয়ামী সরকার। কবর খুঁড়ে কত মামলাই তো তারা বের করে নতুন চার্জশিট দিয়ে বিরোধী রাজনীতিকদের ফাঁসানোর জন্য কত মুফতি হান্নান তৈরি করেছে, ফাঁসাচ্ছে, আবার কোনো কোনো স্বীকারোক্তিতে সরকারের কদর্যমুখ ব্যাদান করে বেরিয়ে আসছে। নরমেধযজ্ঞ আড়ালেই থেকে গেছে। এই চেতনায়ই আওয়ামী দলের পুলিশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের চিফ হুইপকে পিটিয়ে হত্যার প্রান্তে পৌঁছে দিয়েছিল। বহাল তবিয়তে আছে, সে পুলিশ কর্মকর্তা। ক’দিন আগে হরতালে আরও এক আওয়ামী পুলিশ একজন পিকেটারের বুকে ও গলায় বুট দিয়ে চেপে ধরে হত্যায় উদ্যত হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশের বুটে চাপা পড়া নিরীহ নাগরিককেই এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন।
কিন্তু এত অবিচার, এত অন্যায় প্রকৃতি সহ্য করে না। আওয়ামী লীগকে বুঝতে হবে যে, ‘দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।’

SHARE

Leave a Reply