২৮ অক্টোবর মহান আল্লাহর সাহায্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত

মু. গোলাম আযম

Chhatrasangbadবাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও স্মরণীয় দিন হলো ২৮ অক্টোবর। যেদিন আওয়ামী বাকশালীদের লগি-বৈঠার তাণ্ডবে পল্টন মোড়ের পিচঢালা কালো পথ লাল হয়ে গিয়েছিল। কোরবানির ঈদের পর আরেকটা কোরবানির দিন। জোট সরকারের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহাসমাবেশ হবে ২৯ অক্টোবর, পরে জানতে পারি ২৮ অক্টোবর হবে। তাই বাড়ি হতে ২৭ অক্টোবর ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় আমি বিকেল ৪টা আসি তারপর সাভার বোনের বাসায় এসে মালামাল রেখে আবার ঢাকায় যাওয়ার জন্য বাসা হতে বের হই। কিন্তু দেখা গেল রাস্তায় তেমন কোন গাড়ি নেই। অনেক কষ্টে গাবতলী পর্যন্ত আসি তারপর ৮ নম্বর গাড়িতে করে সায়দাবাদ আসব কিন্তু সায়দাবাদ আসার আগেই আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল । তারপর যে যার মতো করে গাড়ি থেকে জানালা দিয়ে লাফিয়ে নামতে শুরু করল। আমি গাড়ি হতে নেমে আমাদের মেসের দিকে রওনা হলাম।
মসজিদে ফজর নামাজ পড়ার পর দেখি মসজিদ কমিটির সভাপতি তার সকল লোকদেরকে লগি- বৈঠা সহকারে আওয়ামী অফিসে যেতে বললো। বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর সমাবেশকে পণ্ড করার জন্য শেখ হাসিনা তার দল-বলকে লগি-বৈঠাসহ তাদের অফিসে আসতে বলে। বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশের মঞ্চ তৈরির কাজ সকাল থেকে চলতে থাকে। মঞ্চের নিরাপত্তার জন্য কিছু ভাই আশেপাশে থাকেন সকাল থেকেই। কিন্তু আওয়ামী লীগ সকাল ১০টার সময় হামলা শুরু করে। আমি বয়সে ছোট, তাই আমাদেরকে বলা হলো বেলা ২টার সময় বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটে থাকা জন্য। সকাল ১১টায় আমাদের কিছু ভাই আহত এবং শহীদ হলেন তা আমাদেরকে জানানো হলো না। আমি আমার দায়িত্বশীলসহ উত্তর গেটে গিয়ে সকালের সংঘর্ষের কথা শুনতে পাই। আমার দায়িত্ব ছিল দৈনিক বাংলা মোড়ে নিরাপত্তা বিভাগে। আমি দায়িত্বশীলের অনুমতি নিয়ে উত্তর গেটে গিয়ে আর ফিরে আসতে পারিনি। আমীরে জামায়াতের ভাষণের সময় দেখি সামনের বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে এক অস্ত্রধারী মঞ্চের দিকে গুলি ছুড়ছে। ঠিক তখনই ৩টি বোমা আমাদের দিকে নিক্ষেপ করে। বোমার আওয়াজে আমাদের লোকজন ছোটাছুটি শুরু করে, তবে পরক্ষণেই আবার এক হয়ে আমরা তাদেরকে ধাওয়া দেই এবং তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। শতশত অস্ত্রধারীর মোকাবেলায় সেখানে ছিল কিছু মুজাহিদ যাদের হাতে ছিল শুধু ইটের কঙ্কর। আমার দেশের পুলিশ বাহিনী তখন আমাদের এই সংঘর্ষ নীরব দর্শক হয়ে উপভোগ করেছে। তারা কিছুই করেনি। পুলিশকে আমরা রুটি কলা পানি দিলাম তারা সংঘর্ষের সময় বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের ভেতরে চলে গেল। বোমার আওয়াজ যখন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলল তখন ধোঁয়ার মাঝে দেখলাম কারো কোন কিছু হয়নি, এর সাথে সাথে গুলি করতে শুরু করল আওয়ামী হায়েনারা কিন্তু আল্লাহর কি অপার কুদরত গুলির খোসা দেখছি, গুলি দেখছি কিন্তু কারো গায়ে গুলি লাগছে না। আমাদের ভাইয়েরা শ্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে আসল এবং আওয়ামী সন্ত্রাসীদের ধাওয়া দিয়ে পিছু হটিয়ে দিল। আমরা সবচেয়ে বেশি আশ্চর্য হই তখন যখন দেখি সকালে যারা আহত হয়েছেন তাদের থাকার কথা ছিল হাসপাতালের বেডে তারাও আমাদের সাথে এসে শামিল হয়েছে এবং বিকেলবেলায়ও শত্রুর মুখোমুখি। আমাদের সাবেক দুই কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম বুলবুল ভাই মাথায় আঘাত পেয়ে ব্যান্ডেজসহ হাজির আর শফিকুল ইসলাম মাসুদ ভাই তার ভাঙা হাত গলায় ঝুলিয়ে আমাদের সাথে রাজপথে।
আমরা ২০-৩০ জনের মত সামনে ছিলাম শুধু বায়তুল মোকাররম উত্তর গেটের দিকে। আর তারা ছিল রাস্তার তিন দিকে। আমরা যখন তাদের ধাওয়া দেই তখন অস্ত্রের বলে বলীয়ান আওয়ামীর দিগি¦দিক ছোটাছুটি করতে থাকে। আমরা আবার আমাদের অবস্থান শক্ত করে দাঁড়াই। এবাবে মাগরিব পর্যন্ত চলতে থাকে। আমরা কয়েকজন পাশে মসজিদ থাকা সত্ত্বেও মসজিদে গিয়ে আসর নামাজ পড়তে পারিনি, রাস্তায় নামাজ পড়ি। মাগরিবের নামাজের কিছু পূর্বে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি শুধু কঙ্কর। মনে হচ্ছে ফেরেশতারা আমাদের পক্ষ থেকে কঙ্কর নিক্ষেপ করছে। আমার দুই হাত তখন আঘাতপ্রাপ্ত। এই সময় আমার ঘাড়ে আর একটি ইট এসে পড়ে, তখন আমি বসে পড়ি আর উঠতে পারছিলাম না। অনেকে বলল আমাকে চলে যেতে, আমি কিছুটা হিম্মত নিয়ে আবার দাঁড়ালাম। মাগরিবের পূর্ব মুহূর্তে কপালের ওপর একটা ইটের টুকরা পড়ল তখনই আমার কপাল কেটে রক্ত বের হওয়া শুরু করল। তারপর কী হয় আমি ঠিক জানতে পারিনি। জ্ঞান ফেরার পর বুঝতে পারি আমি একটি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। সন্ধ্যার পর হতে শুধু গুলিবিদ্ধ ভাইদেরকে হাসপাতালে ভর্তি করা হচ্ছে। হাসপাতালে রোগীদের জায়গা হচ্ছে না। রাত ১১টায় হাসপাতালের ডাক্তার বললেন আপনি বাসায় চলে যান।
পরদিন মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে লোকজন বলাবলি করতে লাগল তুমি পল্টনে গিয়েছিলে কি? আমি কিছু না বলে নামাজ পড়ে সোজা বাসায় চলে আসলাম। এরপর বাসার আরো কয়েকজন ভাইসহ হাসপাতালে গেলাম ভাইদেরকে দেখতে। হাসপাতালে গিয়ে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেব ও শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লাকেও দেখতে পেলাম। আহত ভাইদের দেখতে এসেছেন তারা। একসাথে আসর নামাজ আদায় করে আহত ভাইদের সাথে দেখতে গেলাম। শহীদ সাইফুল্লাহ মোহাম্মদ মাছুম ভাইকে দেখলাম। তিনি আইসিওতে থাকার পর ২ নভেম্বর শাহাদাত বরণ করেন। হাসপাতালে গিয়ে আমাদের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মুজিবুর রহমান মঞ্জু ভাই, ড. রেজাউল করিম ভাইসহ জামায়াত ও শিবিরের গুরুতর আহত ভাইদেরকে দেখতে পাই। ভাইদের দেখে মনে হলো জীবন্ত শহীদরা আমার সামনে। মঞ্জু ভাই এর কথা শুনলাম- তিনি একটা গলির ভেতরে চলে গেলেন, কিছু লোক ওনাকে পেয়ে আঘাত শুরু করল, তিনি আর হাঁটতে পারলেন না, মাটিতে পড়ে গেলেন আর এই সময় তাদের মধ্য হতে কে একজন বলল, এ আমাদের লোক তাকে আর মেরো না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের ভাইকে এভাবে রক্ষা করলেন। রেজাউল করিম ভাই বললেন, তার পায়ে এমনভাবে গুলি ঠুকলো যে গাড়ির চাকার বাতাস চলে গেলে যেমন হয় তেমন হয়ে গেল। আমরা তাঁর এক্সরে রিপোর্ট দেখলাম দেখে মনে হলো পায়ের হাড় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
জামায়াতের কয়েকজন ভাইয়ের আহত হবার চিত্র আমার প্রায়ই মনে পড়ে, তাদের মধ্যে এমদাদ ভাই যাকে জীবন্ত শহীদ বললে ভুল হবে না। আওয়ামী হায়েনারা তার নাক মুখ ও মাথা থেঁতলে দিল বৈঠার আঘাতে চেহারা চেনা খুবই কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। এমদাদ ভাইয়ের এক আত্মীয় তার পকেটে থাকা সেল ফোনে কল করলে হায়নাদের একজন কল রিসিভ করে বলল তোর ভাইকে জাহান্নামে পাঠিয়ে দিয়েছি, তারপর ফোনটি বন্ধ করে দিল। আত্মীয়স্বজন এমদাদ ভাইয়ের সন্ধানে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে, মনে করল তাকে আর পাওয়া যাবে না তাই তারা দেশের বাড়িতে গায়েবানা জানাজার নামাজ আদায় করে। এদিকে পুলিশ বেওয়ারিশ লাশ মনে করে এমদাদ ভাইয়ের লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যায় এবং লাশের সারির মাঝে ফেলে রাখে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এর একজন ডাক্তার এসে সকল লাশ দেখতে লাগলেন এমন সময় তিনি মুখে দাড়িসহ এমদাদ ভাইকে দেখে ধারণা করলেন যে এখনো বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আছে। আর তখনো পর্যন্ত আওয়ামী হায়েনারা ঢাকা মেডিক্যাল থেকে কোন লাশ বের করতে দিচ্ছে না। ডাক্তার সাহেব নার্সকে দিয়ে এমদাদ ভাইকে নার্সদের থাকার রুমে নিতে বললেন। একজন নার্সকে সবসময় রোগীর পাশে বসিয়ে রাখলেন। এমদাদ ভাইকে স্যালাইন দিয়ে নার্সকে বললেন স্যালাইন শরীরে প্রবেশ করে কি না দেখেন। স্যালাইন দেয়ার অনেক পর এমদাদ ভাইয়ের শরীরে অল্প অল্প করে স্যালাইন প্রবেশ করতে শুরু করল। নার্স তখনই ডাক্তারকে খবর দিলেন। ঠিক কিছুক্ষণ পর রোগীর হুঁশ ফিরলো আর ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন আপনার কোন আত্মীয় স্বজনের মোবাইল নাম্বার জানা থাকলে বলুন । এমদাদ ভাই তার এক আত্মীয়ের নাম্বার দিলেন আর আল্লাহর কী রহমত ঐ আত্মীয় তখন লাশের খোঁজে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের নিচে অবস্থান করছিলেন। ডাক্তার বললেন, এমদাদ ভাই মোবাইল নাম্বার বলা শেষে আবার বেহুঁশ হয়ে গেলেন। ডাক্তার তখনি এমদাদ ভাইয়ের আত্মীয়ের নাম্বারে ফোন দিয়ে তাকে ডেকে বললেন, আমি এই রোগীর মৃত সার্টিফিকেট দিয়ে দিচ্ছি আপনি তাকে বাইরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করুন। ঢাকা মেডিক্যাল থেকে লাশ বের করার সময় ছাত্রলীগের লোকজন বললো, এই লাশ কোথায় যাচ্ছে, বলা হলো ওপরে কেবিনে থাকা রোগী মারা গিয়েছে। এমদাদ ভাইকে বাইরের একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হলো এবং পরবর্তীতে অন্যদের মতো তিনিও সুস্থ হয়ে উঠলেন। আল্লামা সাঈদী সাহেব এমদাদ ভাইকে দেখে কেঁদে উঠলেন ও মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করলেন।
এমদাদ ভাই এখন একটা কলেজের শিক্ষক, তিনি এখন সুস্থ সবল একজন মানুষ। এই ভাইকে দেখে মনে হয় আমাদের মাঝে একজন জীবন্ত শহীদ হাঁটাচলা করছে। এভাবে আরো অনেক নির্যাতিত ভাইয়ের ইতিহাস আমাদের সামনে। ২৮ অক্টোবরের সকল শহীদ, পঙ্গ ও আহত ভাইদেরকে মহান আল্লাহ কবুল করুন। বাতিলের সকল ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে ইসলামের অগ্রযাত্রা বাংলাদেশের বুকে যেন অব্যাহত থাকে আল্লাহর নিকট এই কামনা করছি। আমিন।
লেখক : সভাপতি, ঢাকা জেলা উত্তর, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply