৪৯তম মহান বিজয় ও বিজয়ীর ভাবনা -গাজী নজরুল ইসলাম

১৬ই ডিসেম্বর আমাদের বিজয় দিবস। বাংলাদেশের বিজয় দিবস। বাংলাদেশীদের বিজয় দিবস। ১৯৭১ এর মার্চে স্বাধীনতা পেয়েছি, ডিসেম্বরে বিজয় পেয়েছি। কেন বিজয় পেতে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হলো- এ নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা কিংবা গবেষণার প্রয়োজন থাকলেও বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে বিজয় দিবসের ভিন্ন ভাবনা নিয়ে কথা বলতে চাই।
বিজয় দিবসে দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণ বিভিন্ন ধরনের নীতিনির্ধারণী উপদেশমূলক বক্তব্য দিয়ে থাকেন। অনুসারীগণ সম্মানিত নেতা-নেতৃবৃন্দের ঐসব নীতিনির্ধারণী উপদেশাবলি অনেক ক্ষেত্রে বেদ-বাক্য মনে করে আবশ্যকীয় পালনীয় হিসেবে গ্রহণ করে থাকেন। এবারের বিজয় দিবসের প্রাক্কালে দেশের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে কী সব নির্দেশনা-উপদেশাবলি আসবে তা এখনো জানা যায়নি। তবে পুরনো পত্র-পত্রিকা ঘাঁটতে যেয়ে কয়েক বছর পূর্বের এক বিজয় দিবসের নির্দেশনা-উপদেশাবলি চোখে পড়লো।

২০১২ সালের বিজয় দিবসের মাসব্যাপী কর্মসূচি উদ্বোধনকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিরোধের ডাক দিয়েছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঐ আহবানের পর পরই ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা নারায়ণগঞ্জের তথাকথিত স্বাধীনতাবিরোধীদের প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। নারায়ণগঞ্জের পথ ধরে ঐ সময় দেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, মহল্লা সবখানেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহবান বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় মন্তব্য করে বলা হয়েছিল “সময়ের সাহসী সন্তানদের এখনই এগিয়ে আসার সময়।” (দৈনিক জনকণ্ঠ-৬ ডিসেম্বর ২০১২), জনৈক স্বদেশ রায়ের উপসম্পাদকীয় কলাম থেকে উক্ত উদ্ধৃতি। দৈনিক জনকণ্ঠের গত ৪/১২/১২ তারিখের আরেকটি সংবাদ ‘ছাত্রলীগকে বাঁশের লাঠি নিয়ে নামতে বললেন হানিফ’ -ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ঢাকা জেলা-ছাত্রলীগের সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য। ইতোমধ্যে এমনিতর আরো অনেক জ্বালাময়ী বজ্রকঠিন বক্তব্য দিয়ে সতীর্থদের মাঠে নামার ধাক্কা দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের প্রথম সারির অনেক নেতা-নেত্রী। উদ্দেশ্য বাঁশের লাঠি নিয়ে, লগি-বৈঠা নিয়ে-সেই সাথে আরো কিছু জঙ্গি হাতিয়ার নিয়ে মাঠে নামো আওয়ামী লীগ, মাঠে নামো যুবলীগ-ছাত্রলীগ। রা-রা শব্দ করে, হায়দরী হুঙ্কার দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী ঠেকাতে তাদেরকে ধরো-মারো-কাটো-উৎখাত করো-খুঁজে খুঁজে বের করে দেশ ছাড়া করো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা একবার চট্টগ্রামে যেয়ে রণহুংকার দিয়ে বলেছিলেন, “একটি লাশ পড়লে এবার দশটি লাশ পড়বে” চট্টগ্রামে আওয়ামী যুবলীগের লোকেরা কি শাড়ি-চুড়ি পরে বসে আছো?” এরপরের ইতিহাস তো সকলের জানা। একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশে এসব রণহুঙ্কার, যুদ্ধংদেহী বজ্রবাক্য মাঠে ময়দানে প্রতিবাদী জনগণের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহ দেয়া কি মানবতাবিরোধী কাজ নয়? জঙ্গিবাদী হুঙ্কার নয়? সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ নয়? অবশ্য এসব হুংকার আসছে তথাকথিত স্বাধীনতাবাদী এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন দল-সংগঠন এবং ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে। অতএব এসব হুকুম বা ফরমান সতীর্থদের শুধু আমলই করতে হবে কার্যকরী করতে হবে, ময়দান সাফ করতে হবে-এটাই লক্ষ্য। হলোও তাই। আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন যুবলীগ-ছাত্রলীগ মাঠে নামালো। নেতৃবৃন্দের ফরমান অনুযায়ী সাথে নিল অস্ত্র-কিরিস ছোরা-চাকু-বাঁশের লাঠি-হাতুড়ি-পিস্তল ইত্যাদি। “কাঁচপুরে ১৮ দলের (তৎকালীন) এক কর্মীকে বাঁশের লাঠি-লগি-হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে ছাত্রলীগ ও যুবলীগ কর্মীরা।” (যুগান্তর ১০/১২/১২, ছবিসহ ক্যাপশন) “এক শিবিরকর্মীকে গায়ে সর্বশক্তি দিয়ে লাঠিপেটা করছে যুবলীগ-ছাত্রলীগের কর্মীরা। (যুগান্তর- ঐ) শাহবাগে এক বিএনপি কর্মীকে পেটাচ্ছে ছাত্রলীগ-যুবলীগ কর্মীরা। একজন লাথি দিচ্ছে মাথায়, অপরজন লাঠির আঘাতে নাকাল করে ফেলেছে তাকে।” (যুগান্তর ছবি ১০/১২/১২) “পুরানো ঢাকায় পথচারী দর্জি বিশ্বজিৎকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে উপর্যুপরি কোপাচ্ছে ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলম মিলন। একই সঙ্গে হরদম পেটাচ্ছে ছাত্রলীগ নেতা মাহফুজুর রহমান নাহিদ ও তার সাথে লাঠিধারী সঙ্গীরা।” (যুগান্তর ছবিসহ ১০/১২/১২)। উপর্যুপরি কোপানো আর ধুন্দুমার লাঠি পেটায় ঢামেক হাসপাতালে জীবনপ্রদীপ নিভে গেল নিরীহ বেচারা বিশ্বজিতের। “গাবতলীতে বিএনপি-জামায়াতকর্মীদের ধাওয়া করে নিয়ে যাচ্ছে পিস্তল হাতে সরকারি দলের (আওয়ামী লীগের) এক ক্যাডার।” (ছবিসহ যুগান্তর রিপোর্ট ১০/১২/১২)। শুধু কাঁচপুর, শাহবাগ, গাবতলী নয়, সারাদেশে যুবলীগ-ছাত্রলীগের এই নৃশংসতম তাণ্ডব এবং হত্যাযজ্ঞের চিত্র স্মরণ করিয়ে দেয় নিরীহ জনগণের ওপর আওয়ামী নেতৃবৃন্দের লেলিয়ে দেয়া তর্জন-গর্জন আর হুংকারের প্রণোদনার কথা যার নির্মম ধারাবাহিকতা চলছে বর্তমানকাল পর্যন্তও।

দলীয় ক্যাডারদের লেলিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি সতীর্থ একদল কলাম লেখিয়েরাও উঠে পড়ে লেগে যান নেতা-নেত্রীদের আদেশ নির্দেশগুলি যথাযথ বাস্তবায়নে ভূমিকা নিয়ে বীরদর্পে রা রা হুংকারে মাঠে-ময়দানে প্রতিবাদী জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার কু-মন্ত্রণায়। জনৈক স্বদেশ রায় (নাকি বিদেশ রায়) আমার মনে হয় বিদেশ রায়-ই হবেন, তা না হলে স্ব-দেশের ভাইদের মধ্যে শত্রুভাবাপন্ন মানসিকতা তৈরীতে চিরশত্রুর মত একে অপরের উপর দন্ত-নখর খিঁচিয়ে যুদ্ধংদেহী আক্রমণ চালানোর বিনাশী ব্যঞ্জনাপূর্ণ উক্তি কী করে করতে পারেন? তিনি লিখেছেন “সময়ের সাহসী সন্তানদের (ছাত্রলীগ-যুবলীগের) এখনই এগিয়ে আসার সময়; ব্যর্থতা কাটিয়ে উঠতে হবে ছাত্রলীগকে।” এ মুহূর্তে যুবলীগ ছাত্রলীগ যা করছে এবং তাদের যে বীর্যহীন কাপুরুষতা প্রতি মুহূর্তে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে প্রমাণিত হচ্ছে, তাতে মনে হয় কোন এক আফিমের ঘোরে ছাত্রলীগ-যুবলীগ তাদের পৌরুষত্ব হারিয়েছে। তারা এখন ঘোর তমসার অন্ধকারে পড়ে আছে। তারা তাদের বীরত্ব হারিয়েছে।” (দৈনিক জনকণ্ঠ-৬/১২/১২, প্রতিরোধের ডাক; স্বদেশ রায়)। যথার্থ আহবান! হৃদয়ের সুপ্ততন্ত্রীগুলো টগবগে রক্তে উজ্জীবিত করে প্রতিপক্ষের ওপর খুনের নেশায় হায়েনার মত ঝাঁপিয়ে পড়ার হার্মাদ হুঁশিয়ারি। আফিমের ঘোর কাটিয়ে গা ঝাড়া মেরে হিংস উল্লাসে এক ভাই আরেক ভাইএর ওপর নৃশংস আক্রমণে কুপিয়ে-খুঁচিয়ে-লাঠির আঘাতে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার ধ্বংসাত্মক প্রণোদনা। সত্যিই যেমন টগবগে খুন ঝরানো আহবান, তেমনি হন্যে হয়ে রক্ত ঝরানো পদক্ষেপ। “ভাইরে আমি কোন রাজনৈতিক দলের কর্মী নই। আমি গরিব মানুষ, টেইলার্সে কাজ করি” এ মর্মন্তুদ অনুনয়-বিনয়ে কোন কাজ হলো না। “দা ও লাঠি হাতে উদ্ধত ছাত্রলীগ ক্যাডারদের মনে সামান্যতম করুণার উদ্রেক হলো না। প্রাণভিক্ষা চেয়ে, নিজের হিন্দু পরিচয় দিয়েও প্রাণ রক্ষা করতে পারেনি বিশ্বজিৎ।” (দৈনিক যুগান্তর ১৫/১২/১২)। এ হিংসার রাজনীতি কি চলতেই থাকবে? বিশ্বজিতের বৃদ্ধা মা পুত্রের মৃত্যু সংবাদ শুনে বিলাপ করে বলেছেন, তার ছেলে কোন রাজনীতি করে না। কিন্তু নিষ্ঠুর রাজনীতির বলি হতে হলো তাকে। বিশেষ দলের ক্যাডারদের এসব নৃশংস বীভৎস্য খুনি রক্ত ঝরানো পৈশাচিকতা কি মানবতাবিরোধী অপরাধ না? এরা কি খুনি নয়? অপরাধ যারা করে তারা যেমন দায়ী- অপরাধ সৃষ্টিতে যারা রসদ জোগায় তারাও তো কম দায়ী নয়। উভয়ের কি শাস্তিবিধান প্রণিধানযোগ্য নয়? দেশে অপরাধী খুনিদের বিচার হওয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সাম্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায়, শান্তি ও শৃঙ্খলা বিধানে রক্ষাকবচ। এ ধরনের অপরাধের বিচার এদেশে নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলেছে কিনা তা ভাববার বিষয়। খুন খুনের জন্ম দেয়। অন্যায় অন্যায়ের পরিবেশ সৃষ্টি করে। জুলুম পাল্টা জুলুমের বিভীষিকা ছড়ায়। কিন্তু প্রয়োজন সঠিক প্রতিরোধ এবং সুষ্ঠু প্রতিকার ব্যবস্থা। দেশের প্রচলিত আইন বিধানের প্রয়োগে দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের প্রতি পালনের ন্যায়ানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। জানি না স্বাধীন সার্বভৌম বিজয়ী বাংলাদেশে এর কতকটুকু প্রয়োগ হচ্ছে। ঊনপঞ্চাশটি বিজয় দিবস চলে গেল। পঞ্চাশতম বিজয় দিবসে সমগ্র জাতি কতটুকু বিজয়ী বেশে স্বাধীনতার সাধ আস্বাদন করতে পারবে- এটাই হোক আজকের বিজয় দিবসের একান্ত ভাবনা।
লেখক : বীর মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট ও সাবেক সংসদ সদস্য

SHARE

Leave a Reply