’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান ও আজকের ভাবনা -এইচ এম জোবায়ের

রাষ্ট্রবিজ্ঞান অভ্যুত্থান ও গণ অভ্যুত্থানের মাঝে বিস্তর পার্থক্য নির্ণয় করে। অভ্যুত্থান যেখানে মুষ্টিমেয় সামরিক ব্যক্তির সরাসরি অংশগ্রহণ বা সহায়তায় সংঘটিত হয়, গণ-অভ্যুত্থান সেখানে আপামর জনতার দীর্ঘ সময়ের চাপা অসন্তোষ ও বঞ্চনার প্রেক্ষিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংঘটিত এক বিপ্লবের নাম। অভ্যুত্থানের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া বা পাল্টা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা বেশি পক্ষান্তরে গণ অভ্যুত্থানের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। গণ অভ্যুত্থানকে সার্থক করতে রাস্তায় নামে লাখো জনতা। ছাত্র-জনতার উত্তাল ঢেউ রাজপথ থেকে সচিবালয়, ক্যান্টনমেন্ট থেকে সংসদ ভবন সর্বত্র আছড়ে পড়ে। স্বৈরশাসকের লাঠিয়াল বাহিনীর বুলেট ও কামানের গোলা জনতার পায়ের তলায় পিষ্ট হতে থাকে। সেনারা নির্ঘাত পরাজয় জেনে জনতার কাতারে লীন হয়ে যায়। পতন ঘটে জালিমশাহির। জনতার বিজয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার।
জানুয়ারি মাস এলেই মনে পড়ে যায় ১৯৬৯-এর কথা। অধিকার হারা ছাত্র-জনতার স্বাধিকার আদায়ের মিছিল তখন ঢাকাসহ গোটা বাংলার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে চলেছে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে স্বাধিকারের যে রূপ মাত্রই অঙ্কুরিত হয়েছিল ’৬৯ এ এসে তা যেন তারুণ্যের শেষ ধাপে উপনীত হয়েছে। তরুণ-যুবাদের উচ্ছ্বসিত আবেগ বাঁধভাঙা জোয়ারের ন্যায় স্বৈরাচারের তখতে-তাউসে মুহুর্মুহু আঘাত হানতে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তখন আন্দোলন-সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। প্রতিনিয়ত ছাত্রবিক্ষোভ ও ধর্মঘটের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়ে শিক্ষাকার্যক্রম। ঢাবি শিক্ষার্থীদের সাথে আশপাশের ছাত্র-জনতাও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই চালিয়ে যায়। ২০ জানুয়ারির এমনি এক মিছিলে কলাভবনের সামনে পুলিশের গুলিতে নিহত হন আমানুল্লাহ আসাদুজ্জামান (আসাদ)। আসাদ হত্যার প্রতিবাদে ২১, ২২, ২৩ তারিখে সর্বস্তরের মানুষের শোক পালনের মধ্য দিয়ে আন্দোলন পূর্ণতা লাভ করে। ২৪ জানুয়ারি গুলিতে ও ছুরিকাঘাতে আরো ২ জন নিহত হলে ঢাকার পরিস্থিতি আইয়ুব সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পতন ঘটে স্বৈরশাসকের। পরবর্তীতে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করি।
আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ইসলামপ্রিয় ছাত্র-জনতার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। বিশেষ করে ঢাকার প্রতিটি বিক্ষোভ-সমাবেশে ইসলামী ছাত্রসংঘ প্রথম কাতারে থেকে ভূমিকা পালন করে। ২০ জানুয়ারি যে মিছিলে আসাদ নিহত হন সে মিছিলেও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর নেতৃত্বে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতাকর্মীরা ব্যাপকভাবে অংশগ্রহণ করে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা কলাভবনের সামনে থেকে আসাদের লাশ নিয়ে মিছিলসহ পল্টন ময়দানে সমবেত হয়। সেখানেই জানাজার সিদ্ধান্ত হয়। জানাজাপূর্ব অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন ঢাকসুর তৎকালীন সহসভাপতি তোফায়েল আহমেদ। লাশ সামনে নিয়ে ছাত্র নেতাদের বক্তৃতা চলে। ছাত্রদের পক্ষ থেকে ছাত্রসংঘের নেতা মতিউর রহমান নিজামীকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিতে দাবি জানানো হয়, কিন্তু তোফায়েল আহমেদ তাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। জানাজা সমাবেশে সংঘ নেতাকর্মীরা তোফায়েলের সাথে তর্কবিতর্কে জড়ানো সমীচীন মনে করেননি। বক্তৃতাপর্ব শেষে জানাজার পালা। এবার তোফায়েল আহমেদ নিজেই এসে ছাত্রসংঘ নেতাদের অনুরোধ করলেন- ‘জানাজা পড়ানোর জন্য একজন মাওলানা দেন, আপনাদেরতো অনেক মাওলানা আছে’। ছাত্রসংঘ নেতারা জানালেন, “কোন অসুবিধা নাই, নিজামী ভাই জানাজা পড়াবেন”। ছাত্রনেতা নিজামী জানাজা শুরুর আগে এক চমৎকার ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়ে দিলেন। শত নাক সিঁটকিয়েও তোফায়েল কিছুই করতে পারলেন না। এই ঘটনা ’৬৯-এর গণ অভ্যুত্থান আন্দোলনে ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রথম সারির ভূমিকাকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে। এর মাধ্যমে মতিউর রহমান নিজামী হয়ে হয়ে আছেন স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসের এক অমোচনীয় অধ্যায়। ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যায় কিন্তু তার অবদানকে ইতিহাসের চির সবুজ পাতা থেকে মুছে ফেলা যায় না।
ফিরে আসি গণ অভ্যুত্থান আলোচনায়। সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর ওপার থেকে তেজারতির বাসনা নিয়ে বঙ্গভূমে আসে বিলেতি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারা বাণিজ্যের ছদ্মাবরণে এদেশের দুর্বল জমিদার ও রাজাদের ওপর ক্রমান্বয়ে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। বিভিন্ন প্রলোভন, কূটচাল, মিথ্যা ওয়াদা-চুক্তি ও নগদ পয়সার বিনিময়ে ইংরেজ বেনিয়া গোষ্ঠী এ দেশের ভূখণ্ড দখল করতে থাকে। তারা দেশীয় কুটিরশিল্পসহ হাজার হাজার হেক্টর ফসলি জমি বরবাদ করে। মুসলমান ও হিন্দুদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করে ভাইয়ের রক্ত দিয়ে ভাইকে গোসল করানোর কৌশল হাতে নেয়। তাদের জুলুমতন্ত্রের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন হাজী শরীয়তুল্লাহ, তিতুমীর, টিপু সুলতানসহ অনেক দেশপ্রেমিক নেতৃত্ব। সিপাহিদের নেতৃত্বে ঘটে সিপাহি বিদ্রোহ। কিন্তু দেশীয় গাদ্দার ও এক শ্রেণীর মেরুদন্ডহীন পদলেহীদের কারণে কোন প্রচেষ্টাই কাজে আসেনি। মীর জাফর ও অন্যদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজের পতন ঘটে এবং ১৯০ বছরের জন্য এদেশ বিদেশীদের হাতে চলে যায়। এরপরের ইতিহাস জুলুমের ইতিহাস। আমরা সেদিকে যাচ্ছি না। এর ঠিক ১৮৩ বছর পর অর্থাৎ ১৯৪০ সালে ‘লাহোর প্রস্তাব’-এ ঠিক করা হয় ভারতবর্ষের যে অঞ্চলগুলোতে মুসলমান বেশি সে রকম দু’টি অঞ্চলকে নিয়ে দু’টি দেশ এবং বাকি অঞ্চলটিকে নিয়ে আর একটি দেশ তৈরি করা হবে। কিন্তু ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট যে এলাকা দু’টিতে মুসলমানরা বেশি সেই এলাকা দু’টি নিয়ে দু’টি ভিন্ন দেশ না হয়ে পাকিস্তান নামে একটি দেশ এবং ১৫ আগস্ট বাকি অঞ্চলটিকে ভারত নামে অন্য একটি দেশে ভাগ করে দেয়া হলো। পাকিস্তান নামে পৃথিবীতে অত্যন্ত বিচিত্র একটি দেশের জন্ম হলো, যে দেশের দু’টি অংশ দুই জায়গায়। পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান। হিন্দু নেতাদের কূটকৌশল এবং ধর্মীয় আবেগ ও সমর্থনকে পুঁজি করে মাঝখানে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূরত্ব রেখে দেশ দু’টির জন্ম হয়। মুসলমানদের হাতে ক্ষমতা আসা মানেই ইসলামী রাষ্ট্র বা ইসলামী বিপ্লব কায়েম হওয়ার যে বক্তব্য মুসলমান নেতৃবৃন্দ দিয়েছিলেন দেশ ভাগের পর তারা সেখান থেকে অনেক দূরে সরে আসেন। ক্ষমতার লিপ্সা পেয়ে বসে শাসক শ্রেণীকে। রাজনৈতিক ও প্রাশাসনিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় সকল দিক থেকে পশ্চিম পাকিস্তান এগিয়ে যায় পূর্ব পাকিস্তান থেকে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক সকল দিক থেকে বঞ্চিত হতে থাকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। অথচ পরিসংখ্যানগত সকল দিক থেকে এ বাংলার মানুষ এগিয়ে ছিল। যেমন- দেশভাগের সময় পশ্চিম পাকিস্তানের লোকসংখ্যা ছিল দুই কোটি, পক্ষান্তরে পূর্ব পাকিস্তানের ছিল চার কোটি। কিন্তু সবকিছুতেই পশ্চিম পাকিস্তানের ভাগ ছিল শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ। বাজেটের ৭৫% ব্যয় হতো পশ্চিম পাকিস্তানে আর ২৫% ব্যয় হতো পূর্ব পাকিস্তানে, যদিও পূর্ব পাকিস্তান থেকে রাজস্ব আয় হতো শতকরা ৬২ ভাগ। সেনাবাহিনীতে পূর্ব পাকিস্তানের তুলনায় পশ্চিম পাকিস্তানের সৈন্যের সংখ্যা ছিল ২৫ গুণ বেশি। রাষ্ট্রভাষা ইস্যুতে সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করে। ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে বাংলার মানুষ স্বীয় অধিকার আদায় করে নেয়। বিভিন্ন ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গন ক্রমশ অস্থির হতে থাকে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের সেনাপতি আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে নেন। টানা ১১ বছর তিনি ক্ষমতা দখল করে রাখেন। ’৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুবের পতন হয় এবং সেনাপ্রধান ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায় বসেন।
এই দীর্ঘ উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই বাংলার মানুষ আমরা বেঁচে ছিলাম, আছি এবং থাকব। ইতিহাস প্রমাণ করে- ইংরেজদের বিদায়, গণ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আইয়ুবের পতন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে এদেশের মানুষ জীবন বাজি রেখে লড়াই করেছে। প্রতিটি লড়াই-আন্দোলনে ইসলামী ছাত্র-জনতা সম্মুখ সারিতে ভূমিকা পালন করেন। পরিবেশ পরিস্থিতি, সুযোগসহ নানাবিধ কারণে একেক দল ও ব্যক্তির ভূমিকা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হয় প্রতিনিয়ত। এই লড়াই যেন এক চলমান প্রক্রিয়া। যখনই কোন শাসক মানুষের অধিকার কেড়ে নেয় তখনই প্রয়োজন হয় সেই লড়াইয়ের।
সমাজে মর্যাদাপূর্ণভাবে বেঁচে থাকতে একজন মানুষের যেসব অধিকার দরকার, সেগুলোকে মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি রাষ্ট্রের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে এসবের মধ্য থেকে কিছু অধিকারকে মৌলিক হিসেবে ঘোষণা করে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সংবিধানের ২৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, আইনের দৃষ্টিতে প্রতিটি নাগরিক সমান। ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদে ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, বাসস্থান বা পেশাগত কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য না করতে বলা হয়েছে। ২৯ নম্বর অনুচ্ছেদে সরকারি চাকরিতে সবার সমান সুযোগ আছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিকের আইনের আশ্রয়লাভের অধিকারের কথা উল্লেখ আছে। ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদে বিনা কারণে কাউকে আটক না করতে বলা হয়েছে। ৩৬, ৩৭ ও ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদে সমাবেশ, সংগঠন ও চলাফেরার স্বাধীনতার নির্দেশনা রয়েছে। ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। এসব মৌলিক অধিকার ভঙ্গ হলে করণীয় হিসেবে ১০২(১) নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট আবেদনের মাধ্যমে অধিকার পুনরুদ্ধার করতে পারবেন বলে উল্লেখ আছে। এগুলো হচ্ছে নীতিবাক্য। কিন্তু চোরে যেমন ধর্মের কাহিনী শোনে না তেমনি স্বৈরাচার ও একনায়করাও কখনো সংবিধানের ধার ধারেনি। ব্রিটিশ আমল ও পাকিস্তান আমলের মত আজো দেশের মানুষ ভালো নেই। মানুষ আজ সংবিধান বর্ণিত এসব মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। দেশে আজ গণতন্ত্র নেই, নেই আইনের শাসন। মানবাধিকার আজ ভূলুণ্ঠিত। বিনা বিচারে আটক অবস্থায় জীবন কাটাচ্ছে হাজারো মানুষ। বাকস্বাধীনতা নির্বাক হয়ে কাঁদছে। এমতাবস্থায় ’৬৯-এর গণ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ইসলামী ছাত্রসংঘ এবং নেতা নিজামীর মতো একটি তৌহিদবাদী দল ও নেতৃত্ব প্রয়োজন, যে নেতৃত্ব জালিমের মসনদে কাঁপন ধরাবে, জীবন নিয়ে কোনো মতে পালিয়ে বাঁচতে পারে নব্য স্বৈরাচার।
লেখক : সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

SHARE

Leave a Reply