কুরআনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ

জুবায়ের হুসাইন

বর্তমান সময় থেকে প্রায় হাজার বছর পূর্বে তখনকার বিশ্বে কুরআন ও বিজ্ঞান-এর মাঝে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় আরব বিশ্ব, তদানীন্তন জ্ঞান-বিজ্ঞানে খ্যাতিমান বড় বড় বিজ্ঞানী ও পণ্ডিত ব্যক্তিত্বের প্রায় অধিকাংশই নিজ বুকে ধারণ করে বিশ্বব্যাপী একক কৃতিত্বের স্বর্ণশিখরে স্থান দখল করে নিয়েছিল। তখন তাঁদের উজাড় করা অবদানের কারণে কোথাও কুরআন ও বিজ্ঞান-এর মাঝে ভুল বোঝাবুঝির ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়নি বরং কুরআন ও বিজ্ঞান-এর পারস্পরিক সহযোগিতামূলক হাত ধরাধরি করে চলার নীতির ফলে খুবই দ্রুতগতিতে সমাজ এগিয়ে গেছে সম্মুখ পানে। বিজ্ঞানীগণ জ্ঞানের সকল শাখায় আবিষ্কার করেছেন অসংখ্য প্রয়োজনীয় বিষয় এবং মজবুতভাবে বিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে তোলার ব্যাপারে সফলতা লাভ করেছেন প্রায় শতভাগ। পরবর্তীকালে সেই আরব নির্ভর জ্ঞান বিজ্ঞানই সমগ্র বিশ্ব সভ্যতাকে জ্ঞানের আলো বিতরণ করে চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
পরে মাঝখানে কুরআন ও বিজ্ঞান প্রিয় মুসলিম সমাজে অন্ধকার তিমির রাত নেমে আসায় বিগত প্রায় ৫০০ বছর জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোময় পথ থেকে তারা ছিটকে বহুদূরে অন্ধকারে নিপতিত হয়েছে। অবস্থার করুণ পরিণতি এতদূর গড়ায় যে আজ আবার নতুন করে মুসলিম সমাজকে জানতে হচ্ছে- আল কুরআন কী? কুরআন কি বিজ্ঞানকে সমর্থন করে? কিংবা বিজ্ঞান কি কুরআনকে সমর্থন করে?

কুরআন ও বিজ্ঞানের মাঝে সম্পর্ক
আমাদের প্রিয় গ্রহ এ পৃথিবী চূড়ান্তভাবে ধ্বংস হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত বর্তমান বিজ্ঞান তার সফল অগ্রযাত্রার মাধ্যমে যে যে বিষয়গুলো সত্য সঠিক আবিষ্কার আর উদ্ঘাটন হিসেবে বিশ্বব্যাপী উপস্থাপন করতে সমর্থ হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে, তার প্রতিটি বিষয় সম্পর্কে অগ্রিম প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর পূর্বেই সঠিক তথ্য (Information) দিয়ে পরিপূর্ণ করে আল কুরআন মানব জাতির নিকট মহান স্রষ্টা ও প্রতিপালক আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নিকট থেকে অবতীর্ণ করা হয়েছে।
প্রকৃতপক্ষে আল্লাহতায়ালাই একমাত্র স্রষ্টা যিনি এ মহাবিশ্ব, মহাবিশ্বের প্রকৃতি ও প্রকৃতির বিধান (law of nature)সহ যাবতীয় সকল কিছুই করেছেন। আর এ সকল বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা, অনুসন্ধান ও উদ্ঘাটন করা এবং আবিষ্কার করাই হচ্ছে বিজ্ঞানের অন্যতম প্রধান কাজ।
আল্লাহ যেহেতু মানুষকে আহ্বান করেছেন তাঁর এ বিশাল সৃষ্টিকে নিয়ে গবেষণা করে তাঁকে খুঁজে পেতে, তাই তিনি পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআনকে প্রকৃতি, প্রকৃতির বিথান, মহাবিশ্ব ও তার ভেতরকার সকল শক্তি ও বস্তুর বিষয়ে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সাজিয়েছেন, যা বর্তমান পূর্ণাঙ্গতাপ্রাপ্ত বিজ্ঞান তার প্রতিদিনের আবিষ্কার আর উদ্ঘাটনের মাধ্যমে এক এক করে প্রমাণিত করে চলেছে। সুতরাং আল কুরআন ও বিজ্ঞানের মাঝে সুগভীর সম্পর্ক বিদ্যমান এবং পরস্পর পরস্পরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

কুরআন মুসলিমদের হাতে
আজকে আমরা সবাই দেখতে পাচ্ছি সমগ্র বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজ শুধুমাত্র কুরআনের কিছু কিছু বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান, গবেষণা ও পর্যালোচনা চালিয়ে সার্বিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। মুসলিম হওয়ার কারণে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় তারা এ কিতাবকে ধারণ করেছে, যদিও জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে চরম উদাসীনতা প্রকাশ করে চলেছে সর্বক্ষেত্রে। আরো লক্ষ্যণীয় যে তারা এ ব্যাপারে কোনো প্রকার গরজও দেখাচ্ছে না। এর ফলশ্রুতিতে বর্তমান বিশ্বে মুসলিম সর্বক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছে এবং বিশ্ব নেতৃত্ব তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে যা ফিরে পাওয়ার কোনো লক্ষণও আপাতত দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

জ্ঞান-বিজ্ঞান অমুসলিমদের হাতে
বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞানের যে সীমাহীন অগ্রগতি ও উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে- এর পেছনে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অমুসলিম সমাজের অবদানই বেশি। ওরা আল্লাহর কিতাবকে তথা আল কুরআনকে প্রাধান্য না দিয়ে বিজ্ঞানের সাফল্যকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। ফলে বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনায় আচ্ছন্ন হয়ে পরকালমুখী সফল কর্মকাণ্ড বাদ দিয়ে দুনিয়াবী ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ছে। সাথে সাথে একজন মহান সত্তা আল্লাহর উপস্থিতি ও সার্বক্ষণিক তাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে যে এ বিশ্ব ব্যবস্থা এগিয়ে যাচ্ছে, তা তাদের নিকট একটি হাস্যকর ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। বিজ্ঞানের আকাশচুম্বী অগ্রগতি ও সাফল্য যেন তাদেরকে ক্রমান্বয়ে এক মহাশাস্তির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
যাই হোক, আল্লাহতায়ালা বর্তমান মুসলিমদের হাতে কুরআন এবং অমুসলিমদের হাতে সাফল্যে ভরা বিজ্ঞান তুলে দিয়ে পরকালের কঠিন এক জবাবদিহিতার শিকলে যেন উভয় দলকেই বেঁধে ফেলেছেন। ন্যূনতম পক্ষে উভয় দলই এক ও একক সত্তা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পরিচয় ও বাস্তব উপস্থিতির প্রমাণ লাভ করে একমাত্র তাঁরই আনুগত্য করে নিজেদের জীবনকে ধন্য করার জন্য কুরআন ও বিজ্ঞান তাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। অথচ বাস্তব জীবনে তারা তা করেনি। কেন করেনি? এ এক কঠিন প্রশ্ন, যে প্রশ্নের জালে তারা উভয় দলই আটকা পড়ে যাবে।
এত বড় বড় দু’টি নিদর্শন দু’টি দলের ভাগ্যে জোটার পরও তারা আল্লাহর পথ মহাশান্তির পথ থেকে বহু যোজন যোজন দূরে নিক্ষিপ্ত হয়ে ছিটকে পড়েছে। তাই সম্ভবত আল্লাহ দু’দলকেই পরীক্ষা করার জন্যই একদলের হাতে পবিত্র আসমানী গ্রন্থ কুরআন এবং অপরদলের হাতে বিস্ময়কর জ্ঞান-বিজ্ঞানের বর্তমান চাবিকাঠি তুলে দিয়েছেন। প্রকৃত ব্যাপার মূলত আল্লাহই ভালো জানেন।

কুরআনের প্রতি বিজ্ঞানের সমর্থন
কুরআন মৌলিকভাবে বিজ্ঞানের গ্রন্থ নয়। তবে প্রাকৃতিক জগৎ, প্রাণী জগৎ, উদ্ভিদ জগৎসহ আরো অন্যান্য জগৎ নিয়ে যা কিছু আছে, তাদের যেসব তথ্য কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে তার ভিত্তিতে বিজ্ঞানের চর্চা হতে পারে। এ পর্যন্ত কুরআনে প্রায় হাজার খানেক আয়াত সনাক্ত করা হয়েছে যেগুলো সরাসরি বিজ্ঞানের সাথে জড়িত। এর মধ্যে আমাদের এ বিশাল দৃশ্যমান মহাবিশ্বের সৃষ্টি বিষয় থেকে শুরু করে গ্যালাক্সি, কোয়াসার, নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ, ধূমকেতু, নেবুলা, ব্ল্যাক হোল, সুপার নোভা, এমনকি অণু-পরমাণূ, উপ-আণবিক কণিকা, ফোটন কণিকা ইত্যাদি মহাসূক্ষ্ম কণিকা জগৎও বিদ্যমান আছে। অর্থাৎ বিশাল মহাবিশ্বে জ্ঞান বিজ্ঞানের মহাভাণ্ডার থেকে মানবজাতির যতটুকু জ্ঞান বিজ্ঞান জানা প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই মহাগ্রন্থ আল কুরআনে চূড়ান্ত তথ্য হিসেবে উদ্ধৃত হয়েছে। বিজ্ঞান যখন যে বিষয়ের চূড়ান্ত আবিষ্কার আর উদ্ঘাটন সম্পন্ন করতে সক্ষম হবে কেবল তখনই তাদের সেই প্রকৃত সফল আবিষ্কারের তথ্যকে কুরআনে উজ্জ্বল কিরণ ছড়িয়ে জ্বল জ্বল করতে দেখতে পাবে। যা বিজ্ঞানের আবিষ্কারের প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর পূর্বেই আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআনের আগমন করে স্থান করে নিয়েছে।
আমাদের এ বিশাল সীমা-পরিসীমাহীন মহাবিশ্বের সৃষ্টি বিষয়ক আদি তথ্য দিতে গিয়ে আল্লাহ পাক কুরআনের মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বলছেন, “অবিশ্বাসীরা কি গবেষণা করে দেখে না যে, আদিতে মহাবিশ্বটি মিশে ছিল একত্রে ওতপ্রোতভাবে। এক পর্যায়ে আমি সকল কিছুকে সবেগে পৃথক করে দিয়েছি।” (সূরা আম্বিয়া : ৩০)
এখানে স্পষ্টভাবেই ফুটে উঠেছে যে, মহাবিশ্বটি সৃষ্টির পূর্বে মৌলিক উপাদান আকারে বিশেষ পদ্ধতিতে সংকুচিত ও মিশ্রিত অবস্থায় বিরাজমান ছিল। পরে আল্লাহ তাঁর নিজ পরিকল্পনা অনুযায়ী এ সংকুচিত মিশ্রণটির বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দেন, ফলে তা চতুর্মুখী গতিবেগপ্রাপ্ত হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে পৃথক হয়ে বর্তমান দৃশ্যযোগ্য এ মহাবিশ্বে রূপ নেয়। এ হচ্ছে মহাবিশ্বের সৃষ্টি বিষয়ক আদি তথ্য।
বিজ্ঞান বিশ্ব বিগত বিংশ শতাব্দিতে এসেই কেবলমাত্র এ বিষয়ে একটু একটু করে সঠিক পথে এগোতে থাকে। ১৯৩৩ সালে বেলজিয়ামের পদার্থবিদ জর্জ লি মেইটর সর্বপ্রথম মহাবিস্ফোরণ তথা ইরম ইধহম থিওরি উত্থাপন করেন। ১৯৪৬ সালে আমেরিকান বিজ্ঞানী মি. গ্যামো তার এ মহাবিস্ফোরণ থিওরি সমর্থন করেন এবং অঙ্ক কষে দেখান যে, সেই মহাবিস্ফোরণে ধ্বংসপ্রাপ্ত বস্তুর উদ্বৃত্ত থেকে যাওয়া তাপীয় অবস্থা (back ground radiation) এখন মহাবিশ্বের সর্বত্র প্রায় ৩শ. বিরাজমান আছে। যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা গেলে তা আবিষ্কৃত হতে পারে। এর প্রায় ২০ বছর পর ১৯৬৪ সালে আমেরিকায়  Bell Telephone  কোম্পানিতে চাকরিতে বিজ্ঞানী মি. আরনো পেনজিয়াস এবং মি. রবার্ট উইলসন তাদের তৈরি অ্যান্টেনাতে কাজ করার সময় হঠাৎ করেই Ôback ground radiationÕ 2.73k.-কে সনাক্ত করতে সক্ষম হন এবং  Big Bang যে সত্য ঘটনা তা সমগ্র বিজ্ঞান বিশ্বে একযোগে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। কৃতিত্বস্বরূপ বিজ্ঞানীদ্বয় ১৯৬৫ সালে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
সুতরাং প্রায় সাড়ে ১৪০০ বছর পূর্বে অবিজ্ঞান যুগে এ মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কে রাসূল (সা) যে মৌলিক তথ্যটি প্রদান করে গেছেন, আজকে বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতা হুবহু সে তথ্যটি প্রমাণিত করে কুরআনের সত্যতাকে জ্ঞানী সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করছে।
এখন আরো কিছু প্রমাণ নিচে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

অদৃশ্য বস্তুসম্ভার
আমাদের এ মহাবিশ্বে দৃষ্টি আড়ালে লুকায়িত বস্তু ও ঘটনা সম্পর্কে সর্বপ্রথম আল কুরআন মানবজাতিকে অবহিত করেছে। সূরা হূদ-এর ১২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীতে (সমগ্র মহাবিশ্বে) যা কিছু দৃষ্টিসীমার বাইরে (লুকায়িত) তা সমস্তই আল্লাহর এবং তাঁর নিকটই সমস্ত কিছু প্রত্যানীত হবে।”
সূরা আস-সাজদার ৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “তিনি (আল্লাহ) অদৃশ্য ও দৃশ্যের পরিজ্ঞাত মহাপরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু।”
সূরা আন-নাবার ৩ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত হয়েছে, “তিনি (আল্লাহ) অদৃশ্য সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীতে (সমগ্র মহাবিশ্বে) তাঁর অগোচরে নেই অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তদপেক্ষা ক্ষুদ্র অথবা বৃহৎ কিছু। এর প্রত্যেকটি আছে সুস্পষ্ট কিতাবে।”
কুরআনের উল্লেখিত বক্তব্যসমূহের মূল কথা হচ্ছে- মানবজাতি স্বাভাবিক দৃষ্টিতে খালি চোখে যা দেখে- এর বাইরেও অসংখ্য ক্ষুদ্র ও বড় বড় বস্তু এবং ঘটনা রয়েছে। মানুষ তার সঙ্কীর্ণ দৃষ্টির কারণে তা দেখতে পাচ্ছে না। আল্লাহতায়ালা তাঁর নিজ উদ্যোগেই মানবজাতিকে জ্ঞান ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আগ্রহ সৃষ্টির ভেতর দিয়ে পর্যায়ক্রমে ওই সকল অদৃশ্য বিষয় প্রকাশ করার ব্যবস্থা করে থাকেন, যেন তারা তা অবহিত হয়ে ধন্য হতে পারে।
বিজ্ঞান জগৎ প্রথমদিকে দৃশ্যমান মাথার ওপর মহাজাগতিক বস্তুসমূহকে দর্শন করে ভাবতো, এদের বাইরে মহাবিশ্বে বোধ হয় আর কোনো বস্তু নেই, দৃশ্যমান আকাশটুকুই হয়তো বা মহাবিশ্ব হবে। কিন্তু ১৯২০ সালে মহাকাশ বিজ্ঞানী হাবল পাওয়েল কর্তৃক টেলিস্কোপের সাহায্যে আকাশে লক্ষ কোটি গ্যালাক্সি দর্শন লাভ করার পরই বিজ্ঞান জগতের টনক নড়ে। মানবজাতি প্রথমবারের মতো জানতে পেলো দৃশ্যমান জগৎ মূল মহাবিশ্বের মাঝে বালুকণার সমান মর্যাদাও পায় না। ফলে তখন থেকে অদৃশ্য বিশাল মহাবিশ্বকে দৃশ্যমান করে তোলার জন্য পৃথিবীর সর্বত্র তোলপাড় শুরু হয়ে যায় এবং নতুন নতুন টেলিস্কোপ ও মানমন্দির বানাবার জোর প্রচেষ্টা চলতে থাকে।
এরই ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিজ্ঞানের চোখে অদৃশ্য জগতের অসংখ্য গ্যালাক্সি, কোয়াসার, পালসার, নোভা, সুপার নোভা, নিউট্রন স্টার, ব্ল্যাক হোল, নেবুলা ইত্যাদি এক এক করে প্রকাশিত হয়ে ধরা দিতে থাকে। সাথে সাথে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপের আবিষ্কারের ফলে মহাসূক্ষ্ম জগৎও অদৃশ্য থেকে দৃশ্যমান হয়ে মানবজাতির কর্মকাণ্ড ও গবেষণাকে ব্যাপক পরিসারে বাড়িয়ে তোলে।
এতদিনের দূরত্ব ও ক্ষুদ্রত্বের কারণে অদৃশ্য জগৎ বর্তমানে বিজ্ঞানের মাধ্যমে দৃশ্য জগতে পরিণত হওয়ায় প্রমাণিত হচ্ছে কুরআনের প্রতি বিজ্ঞানের সমর্থন এক বৈপ্লবিক ঘটনা, যা কুরআনকে মহাসত্য আসমানী গ্রন্থ হিসেবে সমর্থন জানাচ্ছে এবং হযরত মুহাম্মদকে (সা) বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

মহাকাশ অভিযান
আমাদের এ পৃথিবী থেকে মহাকাশ অভিযান মানব ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ এর সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের বহু সূত্র ও সম্পর্ক সরাসরি জড়িত। নানা জটিলতা ও প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে যে এ মিশন পরিচালনা করতে হয়, সে কথা বর্তমান বিজ্ঞানই মানবজাতিকে অবহিত করেছে বিস্তারিতভাবে। অথচ আল কুরআন তা আমাদের অবহিত করেছে রাসূলের (সা) মাধ্যমে। সূরা আর-রাহমানের ৩৩ ও ৩৪ নম্বর আয়াতটি খেয়াল করা যেতে পারে- “হে জিন ও মানব সম্প্রদায়! যদি তোমাদের পক্ষে সম্ভব হয় তোমাদের আঞ্চলিক আকাশ ও পৃথিবীর সীমানা ছেড়ে চলে যেতে মহাকাশে, তাহলে তা করে দেখো। কিন্তু তোমরা তা কখনোই পারবে না ‘চরম ক্ষমতা’ (Scape velocity) অর্জন ব্যতিরেকে। তোমরা তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে আগত কোন্ বৈজ্ঞানিক তথ্যকে অস্বীকার করতে পারো?”
আবার সূরা আল-জাসিয়ার ১৩ নম্বর আয়াতের মাধ্যমে বলা হচ্ছে, “আল্লাহ আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীর (সমগ্র মহাবিশ্বের) সমস্ত কিছু তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন নিজ অনুগ্রহে।”
উপরে উদ্ধৃত আয়াত দু’টিতে জিন ও মানবজাতিকে লক্ষ্য করে বলা হয়েছে তারা যদি পৃথিবীর আকাশ সীমা অতিক্রম করে মহাকাশের দিকে চলে যেতে চায় তাহলে তারা যেতে পারবে, কেননা সৃষ্টির সেরা হিসেবে তাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের অধীন করে দেয়া হয়েছে। তবে বহির্বিশ্বে তথা মহাকাশে যেতে চাইলে প্রথম প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে হবে। অর্থাৎ মহাকাশ যানকে প্রচণ্ড শক্তি-ক্ষমতাসম্পন্ন হতে হবে। কেননা স্থানীয় এলাকা ত্যাগ ও সীমা-পরিসীমাহীন মহাকাশ পাড়ি দিয়ে মিশন সফল করতে হলে অসম্ভব গতির প্রয়োজন হবে। তা না হলে মহাকাশ অভিযান কখনো সফল হবে না।
বিজ্ঞান ১৬৬৫ সালে মাধ্যাকর্ষণ শক্তির সন্ধান পায়। এ শক্তি পৃথিবীপৃষ্ঠে অবস্থিত সমস্ত বস্তুকে পৃথিবীর কেন্দ্রের দিকে টেনে নিয়ে যেতে চায়। ফলে বস্তুসমূহ পৃথিবী পৃষ্ঠের সাথে লেগে থাকে, মহাশূন্যে ছিটকে বেরিয়ে যেতে পারে না। পৃথিবীর এ মাধ্যাকর্ষণ শক্তির টান থেকে মুক্ত হয়ে দি কোনো বস্তু মহাশূন্যের দিকে চলে যেতে চায়, তাহলে বস্তুটিকে মুক্তিগতি অর্জন করতে হবে। নতুবা বস্তুটি বেরিয়ে যাওয়ার পথে মাধ্যাকর্ষণের টানে আবার পৃথিবী পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে ধ্বংস হয়ে যাবে। পৃথিবীর মুক্তিগতি ১১ কিলোমিটার/সেকেন্ড। অত্রএব কমপক্ষে ১১ কিলোমিটার/সেকেন্ড গতিসম্পন্ন যান হতে হবে।
আবার আরো একটি কারণেও প্রচণ্ড শক্তি-ক্ষমতাসম্পন্ন গতি অর্জন করতে হবে, তা হলো মহাকাশ মহাশূন্য। মহাশূন্য এত বিশাল যে সেখানে মাইল কিংবা কিলোমিটার দিয়ে দূরত্ব মাপা যায় না। আলোকবর্ষ দিয়ে মাপা হয়। তাই সংক্ষিপ্ত জীবনকাল সম্পন্ন মানবজাতি তাদের জীবদ্দশায় যে কোনো মিশন সফল করার জন্য অবশ্যই মহাকাশ যানকে প্রচণ্ড গতিসম্পন্ন আলোর গতি বা তার কাছাকাছি গতি অর্জন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।

আকাশে পাথরের বহর
বিশাল এ মহাবিশ্বের মাঝে পৃথিবী নামক আমাদের এ গ্রহটি নিতান্তই ক্ষুদ্র একটি মহাজাগতিক বস্তুপিণ্ড, যার ওপর জীব-উদ্ভিদসহ আমরা মানবজাতিও আমাদের জীবন নির্বাহ করে চলছি। আমরা আমাদের ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ দৃষ্টিশক্তির মাধ্যমে মহাবিশ্বের প্রায় ৯৯.৯৯ ভাগই দেখতে পাচ্ছি না। তার চেয়ে বেশি দেখতে পারা প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ছাড়া সম্ভবপর নয়। আল্লাহপাক কুরআনের মাধ্যমে রাসূলকে (সা) দিয়ে মানবজাতিকে অবহিত করেছেন যে, আমরা দেখতে অপারগ হলেও বাস্তবে কিন্তু আকাশে ভাসমান ও চলমান অবস্থায় আছে বিরাট বিরাট পাথর খণ্ড এবং মাঝে মাঝে বিশাল বিশাল পাথরের স্তূপ। সূরা মূলক-এর ১৭ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, “তোমরা কি নির্ভয় হয়ে গিয়েছো যে, আকাশে যিনি রয়েছেন তিনি (আল্লাহ) তোমাদের ওপর পাথরের স্তূপ প্রেরণ করবেন না? তখন তোমরা জানতে পারবে কিরূপ ছিল আমার সতর্কবাণী।” সূরা আন-নামলের ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “আল্লাহই মহাবিশ্বের অদৃশ্য বস্তুকে প্রকাশ করেন।”
পঞ্চাশের দশকে বিজ্ঞানী Ernest Opik এবং Jan Oort যৌথভাবে আমাদের সৌরজগতের বাইরে সংলগ্ন এলাকার চতুর্দিকে বিরাট এলাকা নিয়ে পাথর খণ্ড, ধূমকেতু ও উল্কাপিণ্ডসহ জ্বলন্ত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ পরিবেষ্টিত ভয়ানক মেঘমালার সন্ধান লাভ করেন। বিজ্ঞান বিশ্ব তাদের ঐ পাথুরে মেঘমালার নামকরণ করে  ‘Opik Oort Cloud’। এর দৈর্ঘ্য হচ্ছে প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার এবং প্রস্থ হচ্ছে প্রায় ২৫ ট্রিলিয়ন কিলোমিটার যা সমগ্র সৌরজগতকে ঘিরে ফেলেছে।
এছাড়াও ইতিমধ্যেই বিজ্ঞান পৃথিবীর চারপাশেও প্রায় ৫০০০ ঝুলন্ত পাথর খণ্ড আবিষ্কার বরেছে যেখান থেকে বিনা নোটিশে সকালে অথবা বিকালে বিশাল পাথর খণ্ড ছুটে এসে এ পৃথিবী পৃষ্ঠে আছড়ে পড়ে মানব সভ্যতার বিনাশ ঘটাতে পারে। আবার বিজ্ঞানীগণ মঙ্গল গ্রহ ও বৃহস্পতি গ্রহের মধ্যবর্তী স্থানে এবং শনি গ্রহের চতুর্দিকেও বিশাল পাথরের বেল্ট আবিষ্কার করেছেন, যে পাথর বেল্ট থেকেও পাথর খণ্ড ছুটে এসে এ পৃথিবীর ধ্বংসাধন করতে পারে অবলীলাক্রমে।
জাহান্নামের ইন্ধন পাথর এবং মানুষ
মানবজাতির মধ্যে যে বা যারা আল্লাহর দেয়া নিয়ামত ভোগ করার পর তাঁর দেখানো পথে জীবন অতিবাহিত করবে না, তিনি তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়ার জন্য অগ্নিকুণ্ড (জাহান্নাম) তৈরি করে রেখেছেন, যেখানে তাদেরকে আগুনের মধ্যে নিক্ষেপ করা হবে। আর সেই আগুনকে উত্তপ্ত করার ব্যবস্থা করা হয়েছেÑ পৃথিবীর মধ্যে সর্বোচ্চ তাপ ও বিকিরণ সমৃদ্ধ প্রমাণিত বস্তু, দাহ্য ‘পাথর খণ্ড’ দিয়ে। সূরা বাকার ২৪ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “তবে সেই আগুনকে ভয় করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। অবিশ্বাসীদের জন্য যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।” সূরা তাহরীমের ৬ নম্বর আয়াতে একইভাবে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা করো সেই আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম হৃদয় কঠোর স্বভাবের ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না আল্লাহ যা আদেশ করেন তাকে।”
বিজ্ঞান বিশ্ব ঊনবিংশ শতাব্দিতে কঠিন পদার্থ থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়, ফ্রান্সের বিজ্ঞানী দম্পতি পিরি কুরি ইউরেনিয়াম নামক কঠিন তেজস্ক্রিয় পদার্থ আবিষ্কার করে বিশ্বব্যাপী তাক লাগিয়ে দেন। এর আগে ভারী পদার্থরূপে ইউরেনিয়ামের পরিচিতি থাকায় কেউ এ পাথর খণ্ডকে ব্যবহার করতো না। কিন্তু যেদিন থেকে এ ‘পাথর খণ্ড’ তেজস্ক্রিয় পদার্থ হিসেবে পরিচিতি পেল, সেদিন থেকে এর মূল্য সকল প্রকার পদার্থকে ছাড়িয়ে গেল। ইউরেনিয়াম পদার্থের পরমাণু প্রতি মুহূর্তেই ভাঙতে থাকে। ফলে তা থেকে প্রচণ্ড ক্ষমতাসম্পন্ন তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বেরিয়ে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। যা জীবন-উদ্ভিদ ও প্রাণী জগতের জন্য ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনে।
বর্তমান বিশ্বে একমাত্র কঠিন ইউরেনিয়াম (পাথর খণ্ড) সর্বোচ্চ তাপ ও বিকিরণ সৃষ্টিকারী দাহ্য পদার্থরূপে স্বীকৃতি লাভ করেছে। মাত্র এক টন ইউরেনিয়াম পদার্থ প্রায় ২৫ হাজার টন কাঠ পুড়িয়ে যে তাপশক্তি উৎপন্ন করতে পারে তার চেয়েও অনেক বেশি তাপশক্তি উৎপন্ন করতে পারে। সেজন্য বর্তমানে সমগ্র বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরির হিড়িক পড়ে গেছে। উন্নত দেশসমূহে আজ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ অধিক পারমাণবিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে সেখানে ইউরেনিয়াম ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো হচ্ছে। আগামী দিনে সমগ্র বিশ্বব্যাপী বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর একমাত্র অবলম্বন হতে যাচ্ছে ইউরেনিয়াম ব্যবহৃত পারমাণবিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
এখন দেখা যাচ্ছে, সর্বোচ্চ তাপশক্তিসম্পন্ন জাহান্নাম নামক অগ্নিদুর্গে যে পাপী মানুষেরা বর্ণনাতীত কঠিন শাস্তি লাভ করবে পরকালে, তাতে আর কোনো প্রকার সন্দেহের অবকাশ থাকছে না।

কোয়াসার জাহান্নামের নিদর্শন
মানব ইতিহাসের প্রথম মানুষটি হযরত আদম (আ) একজন নবী হিসেবেই পৃথিবীতে আগমন করেছিলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে নবী হিসেবে এজন্যই পাঠিয়েছিলেন যেন প্রথম মানুষটি থেকেই এ ধরার বুকে এক আল্লাহর বিধান কার্যকর হয়। পরবর্তীতে যত মানুষই পৃথিবীতে আগমন করবে তারা যেন আল্লাহর বিধান মেনে চলা ওই প্রথম মানুষটিকে অনুসরণ করে সফলতা লাভ করতে পারে। পরকালে সফলতা লাভকারী মানুষেরা জান্নাতে সুখময় জীবন যাপন করবে আর বিফল, ব্যর্থ ও পাপিষ্ঠ মানুষগুলো জাহান্নাম নামক ভয়ঙ্কর অগ্নিদুর্গের তাপ ও তেজস্ক্রিয়তায় জ্বলে-পুড়ে ছাই ভস্ম হয়ে শাস্তি পেতে থাকবে।
মহানবী (সা)-এর উপর কুরআন নাজিল করে বহু পূর্বেই এ পৃথিবীবাসীকে সেই ভয়ঙ্কর জাহান্নাম সম্পর্কে আল্লাহপাক সতর্ক সাবধান করেছেন এবং বলেছেন তাড়াহুড়ো না করার জন্য। সময় আসবে যখন আল্লাহ ওই জাহান্নামের নিদর্শন আকাশে দেখাবেন। তখন মানবজাতি একটুখানি চিন্তা করলেই সাবধান হতে পারবে। সূরা আম্বিয়ার ৩৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “মানুষ সৃষ্টিগতভাবে ত্বরাপ্রবণ, শীঘ্রই আমি তোমাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি দেখাবো। সুতরাং তোমরা আমাকে তাড়াহুড়ো করতে বোলো না।”
জাহান্নামের প্রজ্বলিত ভয়াবহ অগ্নি সম্পর্কে বলা হয়েছে সূরা মুরসালাতের ৩২ নম্বর আয়াতে, “অগ্নিদুর্গ উৎক্ষেপণ করবে বৃহৎ অট্টালিকাতুল্য অগ্নিস্ফুলিঙ্গ।” অর্থাৎ বিশাল বিশাল অগ্নিলেলিহান শিখা সৃষ্টি হবে প্রচণ্ড আগুনের কারণে।
অতঃপর সূরা আল বুরুজের ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে যে, বিচারের দিন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড ভয়ানক অবস্থাসহ মানুষের সামনে আনা হবে- “সেই দিন জাহান্নামকে সম্মুখে আনা হবে এবং সেইদিন মানুষ উপলব্ধি করবে।” অর্থাৎ পরকালে পাপীরা সম্মুখেই জাহান্নাম দেখতে পাবে। তখন তার ভয়ঙ্কর রুদ্ররোষ দেখে দেখে ভাবতে থাকবে কেন যথাযথভাবে ঈমান না এনে অহঙ্কার ও গর্ব করে কেবলই ধ্বংসের পথে এগিয়ে গেছে? কেন অন্ধকার পথ ছেড়ে আলোর পথে চলতে পারেনি? তাহলে তো আজ এত বড় বিপদ হতো না।
বিজ্ঞান বিশ্ব ১৯৬৩ সালের দিকে সর্বপ্রথম কোয়াসার আবিষ্কার করে। কোয়াসার আয়তনের দিক থেকে এক বা একাধিক সৌরজগতের আয়তনের সমান মাত্র। অথচ এর উজ্জ্বলতা প্রায় ১০০টি গড় গ্যালাক্সির সম্মিলিত উজ্জ্বলতার সমান এবং এর তেজস্ক্রিয়তা নির্গমন ক্ষমতা প্রায় ১০,০০০ গড় গ্যালাক্সির সমান। অর্থাৎ কোয়াসার এক ভয়ঙ্কর মহাজাগতিক জ্যোতিষ্ক আমাদের এ বিশাল মহাবিশ্বে, আজ পর্যন্ত প্রায় ১০,০০০ কোয়াসার আবিষ্কার করেছেন আমাদের বিজ্ঞানীগণ। সবগুলোই আবিষ্কৃত হয়েছে মহাবিশ্বের প্রান্তসীমানার দিকে। বিজ্ঞানীদের ধারণা অতীতে একাধিক গ্যালাক্সির কেন্দ্রের সমন্বয়ে কোয়াসার সৃষ্টি হয়েছে। আবার কেউ বলেন, সম্ভবত ‘স্টার ক্লাস্টার’ (Star Cluster) থেকেই কোয়াসার সৃষ্টি হয়েছে। কোয়াসারের আচার-আচরণ থেকে মনে হয় যেন একটি কোয়াসারের ভেতর হাজার হাজার কোটি নক্ষত্র চধপশবফ অবস্থায় আছে।
কোয়াসার (Quasars) Quasi staller radio source তথা QSRS থেকেই নামকরণ করা হয়েছে। বিজ্ঞানের QSRS আল কুরআনের  কছর শব্দকেই (সূরা মুরসালাতের ৩২ নম্বর আয়াত যার অর্থ বিরাট বিরাট অগ্নিস্ফুলিঙ্গ) একশত ভাগ সমর্থন করে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে। সুতরাং একথা বলা যায় যে, কোয়াসার সত্যিই জাহান্নামের একটি নিদর্শন।
এভাবে সৃষ্টি তত্ত্ব বিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ভূগোল বিদ্যা, ভূ-বিদ্যা, সমুদ্র বিজ্ঞান, জীব বিজ্ঞান, উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণী বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান, চিকিৎসা বিজ্ঞান, শরীর বিজ্ঞান, ভ্রƒণ বিজ্ঞান ইত্যাদি জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রায় হাজার খানেক আয়াত পবিত্র গ্রন্থ কুরআনে আল্লাহতায়ালা উল্লেখ করেছেন, যাতে করে মানবসমাজের মধ্যে যারা চিন্তাশীল জ্ঞানী তারা এর ভেতর দিয়ে এক আল্লাহর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ তাদের জীবনের প্রয়োজনীয় সকল প্রকার চাওয়া-পাওয়ার জন্য একমাত্র কুরআনকে আঁকড়ে ধরে তথা রাসূলের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করে সম্মুখপানে এগিয়ে যেতে পারে। আর যদি তাই হয় তাহলে তারা এ পৃথিবীতে জ্ঞান-বিজ্ঞানে, শিল্প-সাহিত্যে, সভ্যতা-সংস্কৃতিতে, কৃষ্টি-কালচারে, শৌর্য-বীর্যে এককথায় সকল ব্যাপারেই সকল জাতিকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারবে, সাথে সাথে সঙ্গত কারণেই বিশ্ব নেতৃত্বও তাদের হাতের মুঠোর মধ্যে চলে আসবে। সমগ্র বিশ্বব্যাপী সোনালি যুগের আবার আবির্ভাব ঘটবে। সপ্তম শতাব্দি থেকে প্রায় দ্বাদশ শতাব্দি পর্যন্ত এ পৃথিবী শুধু একবারই সেই সোনালি যুগকে বাস্তবভাবে দর্শন লাভ করেছিল তদানীন্তন আরব জাতির জ্ঞানী-গুণীদের বিস্ময়কর অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। আজও যার আলোর ঝলক বিশ্বব্যাপী মানব সমাজকে দোলা দিয়ে যায়।

jubair_hussain@yahoo.com

SHARE

Leave a Reply