আমাদের প্রকাশনা সামগ্রী অনিন্দ্য সুন্দরের হাতছানি

নিজামুল হক নাঈম

দাওয়াত যে কোনো আদর্শিক আন্দোলন বা সংগঠনের জন্যই প্রথম এবং সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা কর্মসূচি, যে যা কিছু বলতে চান তার জন্য একমাত্র হাতিয়ার দাওয়াত। দাওয়াত দানের রয়েছে অনেক মাধ্যম অনেক পদ্ধতি, যার মৌলিক দু’টি দিক একটি সাউন্ড অপরটি সাইলেন্ট। সাউন্ড হল বক্তব্য, বিবৃতি, মিছিল, শ্লোগান, সভা-সমাবেশ, আলোচনা সভা, জনসভা, নাটক-সিনেমা, সিডি-ভিসিডি ইত্যাদি। অপরদিকে সাইলেন্ট দাওয়াত হলো স্টিকার-কার্ড, পোস্টার, দেয়ালিকা, ব্যানার-ফেস্টুন, গল্প-কবিতা, লেখনী ইত্যাদি। বক্তব্য বিবৃতির মাধ্যমে যেমনি স্ব স্ব আদর্শের কথার পাশাপাশি বিরোধী শক্তির দুর্বলতা যুক্তিগ্রাহ্য করে উপস্থাপন করা যায়, তেমনি প্রকাশনার একটি স্টিকার, কার্ড বা বিভিন্ন সামগ্রীর মাধ্যমে অনেক শক্তিশালী বক্তব্য উপস্থাপন করা যায়। ইসলামী ছাত্রশিবির একটি আদর্শিক ছাত্র সংগঠন হিসেবে তার রয়েছে উভয় দিকেই সৃজনশীল, সময়োপযোগী ও বলিষ্ঠ উপকরণাদি।
প্রকাশনা সামগ্রী: আধুনিক রুচিসম্মত এবং সামাজিক চাহিদানির্ভর সংগঠনের প্রয়োজনীয় উপকরণাদি প্রকাশ তথা বিপণনের জন্য রয়েছে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রকাশনা বিভাগ, যা সৃজনশীল প্রকাশনা সামগ্রীর মাধ্যমে দেশের প্রকাশনা জগতে এক অনন্য ধারা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

নববর্ষের প্রকাশনা সামগ্রী
এক সময় ছিল যখন আমাদের দেশের ক্যালেন্ডারসমূহের পাতায় পাতায় হলিউড ভলিউড নায়িকাদেরকে দেখা যেত, এ ছাড়া বিভিন্ন পশু পাখি, কাল্পনিক ভূত-প্রেত ইত্যাদি ছিল ক্যালেন্ডারের মৌলিক অনুষঙ্গ, যা ছিল দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের  ঈমান আক্বিদা, কৃষ্টি-কাল্চার, সভ্যতা-সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিরোধী। কোন সৃষ্টিশীল, সৃজনশীল চিন্তার লালন তথা বিকাশের পরিবর্তে ছিল শিশু-কিশোর, যুব-তারুণ্যের চরিত্র ধ্বংসের নিকৃষ্ট হাতিয়ার। এর বিপরীতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের তিন পাতা ক্যালেন্ডার এক ব্যতিক্রমী অনন্য আয়োজন, যাতে ছাত্র ও যুব সমাজের বিশ্বাসের অনুকূলে চরিত্র গঠন ও মেধা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। কুরআন-হাদিসের ক্যালিগ্রাফি, দেশ-আন্তর্জাতিক বিষয়সমূহ, সমস্যা-সম্ভাবনার নিখুঁত উপস্থাপনার মাধ্যমে এক নতুন, ব্যতিক্রম, শিক্ষণীয়, সৃজনশীল ধারার সংযোজন ঘটিয়েছে। ক্যালেন্ডার শুধু মাস-তারিখ দেখার প্রয়োজন মেটানোর সীমা ছাড়িয়ে জানা-বোঝার এক ব্যতিক্রম আয়োজনের সাথে পরিচয় ঘটিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এ সকল আয়োজন থাকলেও সর্বমহলে সাড়া জাগাতে সক্ষম হয় ২০০০ সালের প্রকাশিত ‘ঘটনাবহুল বিংশ শতাব্দী’ শিরোনামের তিন পাতা ক্যালেন্ডার। যার অকুণ্ঠ স্বীকৃতি শুধুমাত্র আমাদের সুধীসমাজ নয়, শোনা যাচ্ছে অন্যান্য মত ও আদর্শের মানুষ, সংগঠন, প্রতিষ্ঠান এবং দেশী-আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও। ২০০০ সালের তিন পাতা ক্যালেন্ডারের ওপর ‘ক্যালেন্ডার শুধু তারিখ-মাস দেখার জন্যই নয়, ক্যালেন্ডার হতে পারে জানারও সুন্দর মাধ্যম’ শিরোনামে বিবিসি বিশেষ প্রতিবেদন সম্প্রচার করে।
এর পর থেকে ২০০১ সালে সীরাতে রাসূল (সা), ২০০২ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়, ২০০৩ সালে মহাবিশ্বের বিশ্বয়কর সৃষ্টি ও আল-কুরআন, ২০০৪ সালে আল-কুরআনে নবী ও রাসূল (সা), ২০০৫ সালে ইসলামের প্রচার প্রসার ও বিকাশ, ২০০৬ সালে বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান, ২০০৭ সালে সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ, ২০০৮ সালে সৃষ্টিতত্ত্বে আল্লাহর অস্তিত্ব, ২০০৯ সালে আগামীর বাংলাদেশ, ২০১০ সালে খোলাফায়ে রাশেদা, ২০১১ সালে আল-হাদিস এক অনুপম জীবনালেখ্য, ২০১২ সালে আল-কুরআন শিরোনামে তথ্যবহুল, হৃদয়গ্রাহী উপস্থাপনা ও সুন্দর ডিজাইনে প্রকাশ করেছে, যা আজ পর্যন্ত অন্য কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এ ছাড়া নববর্ষের প্রকাশনার মধ্যে এক পাতা বড় ক্যালেন্ডার প্রতি বছর দেশের গুরুত্বপূর্ণ- ঐতিহ্যবাহী মসজিদসমূহ নিয়ে, এক পাতা ছোট ক্যালেন্ডার কুরআন হাদিসের ক্যালিগ্রাফি এবং ডেস্ক ক্যালেন্ডার দেশ-বিদেশের গুরত্বপূর্ণ স্থাপনা, প্রাকৃতিক বিষয়াদি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিজ্ঞান প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রকাশিত হয়ে আসছে। পকেট ডায়েরিসহ ছোট বড় পাঁচ প্রকারের ডায়েরি নিয়ে নববর্ষের সমৃদ্ধ আয়োজন রয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবিরের।
২০০২ সালে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুককে নববর্ষের উপহারসমগ্রী প্রদান করলে তিনি প্রকাশনা সামগ্রীর মান ও সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, এসব তোমরা করো? কেন্দ্রীয় সভাপতি বিনয়ের সাথে জবাব দিলেন জি, আমরাই করি। অতঃপর মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী পুনরায় প্রশ্ন করলেন, তোমরা এ কাজ করার সময় পা-ও কোথায়? সন্মানিত কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বুলবুল ভাই বললেন, আসলে আমাদের কাজই হচ্ছে অ্যাকাডেমিক পড়া-লেখার পাশাপাশি এগুলো করা, রাজনৈতিক কার্যক্রম যা দেখেন তা আমাদের করতে হয় নিছক পরিস্থিতির কারণে অনেকটা বাধ্য হয়ে। অবশেষে মন্ত্রী মহোদয় বললেন- ‘আমরা তোমাদের এত সুন্দর কাজগুলো সম্পর্কে জানি না কেন? আহ্ দেশের সকল ছাত্রসংগঠন যদি এভাবে কাজ করতো!’ গত মার্চ মাসে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান তরুণ সাংসদ ও রাজনীতিবিদ ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থের সাথে দেখা করতে গিয়ে নববর্ষের প্রকাশনা ও নতুন সাহিত্য সামগ্রী উপহার দিয়ে এর চাহিদা এবং সার্কুলেশন সম্পর্কে জানালে তিনি আশ্চর্য চাহনি দিয়ে বললেন “তোমাদেরকে আসলে কেউ থামাতে পারবে না।” ২০০৯ সালে আগামীর বাংলাদেশ শিরোনামে প্রকাশিত তিন পাতা ক্যালেন্ডার থেকে সরকারের এমপি মন্ত্রিগণ তথ্য সংগ্রহ করে জাতীয় সংসদে আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে এ বিষয়ে বক্তব্য রেখেছেন বলেও জানা গেছে।

নিয়মিত প্রকাশনা
ছাত্রশিবির প্রকাশিত বিজ্ঞানসিরিজ ছাত্র সংগঠনের ইতিহাসে এক বিস্ময়!
যে কোনো দেশের উন্নতি-অগ্রগতির জন্য জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রত্যেকটি শাখায় সফল পদচারণা একান্তই অপরিহার্য। আজ যেখানে বিজ্ঞানের নতুন নতুন আবিষ্কারের প্রতিযোগিতায় প্রত্যেকটি দেশ এগিয়ে যাচ্ছে সেখানে আমাদেরকে একটি সুই পর্যন্ত আমদানি করতে হয়। কারণ হলো নতুন আবিষ্কারতো পরের কথা, আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝ থেকে বিজ্ঞানভীতিই দূর হয়নি। তাই ইসলামী ছাত্রশিবির প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রকাশ করেছে পদার্থ, রসায়ন ও জীববিদ্যার ওপর রেফারেন্স বই ও চার্ট পেপার। এ বইগুলো এসএসসি/ দাখিল, এইচএসসি/ আলিম, অনার্স এবং ডিগ্রির প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য অনন্য ও অপরিহার্য শিক্ষাসামগ্রী হিসেবে এক দিকে শিক্ষার্থীদের মাঝে সমাদৃত হয়েছে, অন্য দিকে এ সকল বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত শিক্ষকমণ্ডলী ও শিক্ষাবিদদের কাছে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। বিজ্ঞানের এই সঙ্কলনটি (Understanding Science Series) ইতোমধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় সংস্করণ শেষ হয়ে এখন তৃতীয় সংস্করণের কাজ চলছে। এছাড়া বিজ্ঞান বিষয়ের আরো দু’টি বই ১. মানব দেহের অলৌকিক রহস্য ২. স্রষ্টার সৃষ্টি অপার বিস্ময়ও পাঠক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে।
প্রাসঙ্গিক আয়াত হাদিস এবং সুন্দর সুন্দর উক্তি নিয়ে আকর্ষণীয় স্টিকার-কার্ড ও পোস্টার
সংগঠনের দাওয়াত দানের জন্য মৌখিক বক্তব্যের পাশাপাশি দাওয়াতের চুম্বক অংশ, ছোট্ট একটি আয়াত-হাদিস, গান-কবিতা বা প্রয়োজনীয় একটি সুন্দর কথা সংবলিত স্টিকার-কার্ডও একজন শক্তিমান বক্তার ভূমিকা পালন করতে পারে। বইয়ের  ভেতরে, দরজার চৌকাঠে, বাড়ি বা রুমের দেয়ালে, পড়ার টেবিলে, বুক সেলফ বা আলমিরার ওপর, বাসের জানালা ইত্যাদি জায়গায় লাগানো স্টিকারের একটি কথা একজন মানুষের মনে নীরবে রেখাপাত করতে পারে। আত্মোপলব্ধি, সঠিক পথ নির্দেশনা ও বিশ্রামহীন পথচলার উদ্দীপনা জোগাতে পারে পাশে ঝুলানো একটি পোস্টার। জালিম শক্তিগুলোর নারকীয় তাণ্ডবে দুনিয়ার বাতাশ যখন ভারী হয়ে ওঠে, অনৈতিকতা, পশ্চিমা উলঙ্গপনা ও আকাশ সংস্কৃতির জোয়ারের দানবীয় ¯্রােতের মুখে দাঁড়িয়ে যখন স্টিকারের এক একটি লেখা চোখে পড়ে “যারা বাতাসের গতিবেগকে পাল্টে দেয়ার ক্ষমতা রাখে নদীর স্রোতকে বিপরীতে নেয়ার মত হিম্মত বুকে রাখে তাদের জন্য ইসলাম”, “পাড়ি দাও স্রোতে কঠিন প্রয়াসে অকুতোভয়-এ নিশিথের তীরে হবে ফের সূর্যোদয়” “দুর্গমগিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার-লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি-নিশিথে যাত্রীরা হুঁশিয়ার” “তোমার উত্থানে হোক অন্ধকার শেষ-প্রবল প্রশ্বাসে তুমি জাগাও স্বদেশ” “আগুনের ফুলকিরা এসো জড়ো হই দাবানল জ্বালাবার মন্ত্রে-বজ্রের আক্রোশে আঘাত হানি তাগুতের সব ষড়যন্ত্রে” ইত্যাদি কথাগুলো নতুন করে পথ চলতে উৎসাহ জোগায় একজন তরুণের মাঝে। তারুণ্যদীপ্ত আশা জাগানিয়া আয়াত, হাদিস, কবিতা গান, উক্তি সংবলিত আকর্ষণীয় ডিজাইন ও মনকাড়া উপস্থাপনায় আড়াই শতাধিক স্টিকার-কার্ড এবং পোস্টার রয়েছে কেন্দ্রীয় প্রকাশনা বিভাগের।
ইসলামী সাহিত্য
ইসলামী ছাত্রশিবির কেবলমাত্র একটি ছাত্র সংগঠনই নয়, একটি অনন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বটে। নিজস্ব শিক্ষাপদ্ধতি, অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকমণ্ডলী এবং সময়োপযোগী পরীক্ষাপদ্ধতির পাশাপাশি নিজস্ব সাহিত্য ভাণ্ডার ছাত্রশিবিরের ব্যতিক্রম দিক। বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভার্সনে অর্ধশতেরও বেশি বই নিয়মিত প্রকাশ করে আসছে কেন্দ্রীয় প্রকাশনা বিভাগ। এ সকল বইয়ের মধ্যে এসো আলোর পথে,আমরা কি চাই কেন চাই কিভাবে চাই, মুক্তির পয়গাম এবং মোরা বড় হতে চাই- বইগুলো দেশের বেস্ট সেইলার বইসমূহের মধ্যে শীর্ষে রয়েছে। ৩০ ধরনের সাংগঠনিক প্রকাশনা ও ৫০ প্রকারের রকমারি আয়োজনসহ প্রায় দেড়শত আইটেম নিয়ে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় প্রকাশনা বিভাগ।
তাইতো আজকের আত্মভোলা পরিচয়হীন নাস্তিক্যবাদী চিন্তা ও বস্তুবাদী চোখ ধাঁধানো চমকের বিপরীতে, আত্মজিজ্ঞাসা আত্মানুসন্ধান এবং সুস্থ মন-মানসিকতা বিকাশে একান্ত সাথী হয়ে আছে আমাদের প্রকাশনা সামগ্রী, যা ছড়িয়ে দিতে হবে প্রান্তর থেকে প্রান্তরে, অন্তর থেকে অন্তরে।
লেখক : কেন্দ্রীয় সাহিত্য সম্পাদক, বালাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
[email protected]

SHARE

Leave a Reply