আল্লাহ তাআলার পথে দান ও সাদকা – ড. মুহা: রফিকুল ইসলাম

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنفِقُوا مِن طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُم مِّنَ الْأَرْضِ ۖ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنفِقُونَ وَلَسْتُم بِآخِذِيهِ إِلَّا أَن تُغْمِضُوا فِيهِ ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ حَمِيدٌ . الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاءِ ۖ وَاللَّهُ يَعِدُكُم مَّغْفِرَةً مِّنْهُ وَفَضْلًا ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ . يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ . وَمَا أَنفَقْتُم مِّن نَّفَقَةٍ أَوْ نَذَرْتُم مِّن نَّذْرٍ فَإِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُهُ ۗ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ .إِن تُبْدُوا الصَّدَقَاتِ فَنِعِمَّا هِيَ ۖ وَإِن تُخْفُوهَا وَتُؤْتُوهَا الْفُقَرَاءَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۚ وَيُكَفِّرُ عَنكُم مِّن سَيِّئَاتِكُمْ ۗ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ.
অনুবাদ
২৬৭. হে ঈমানদারগণ! যে অর্থ তোমরা উপার্জন করেছো এবং যা কিছু আমি জমিন থেকে তোমাদের জন্য বের করে দিয়েছি, তা থেকে উৎকৃষ্ট অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করো। তাঁর পথে ব্যয় করার জন্য তোমরা যেন সবচেয়ে খারাপ জিনিস বাছাই করার চেষ্টা না করো; কেননা ঐ জিনিসই যদি কেউ তোমাদের দেয়, তাহলে তোমরা কখনো তা নিতে রাযী হবে না, অবশ্য তোমরা যদি নেবার সময় লক্ষ্য না কর তাহলে আলাদা কথা। তোমাদের জেনে রাখা উচিত, আল্লাহ করো মুখাপেক্ষী নন এবং তিনি সর্বোত্তম গুণে গুণান্বিত।
২৬৮. শয়তান তোমাদের গরিব হয়ে যাওয়ার ভয় দেখায় এবং লজ্জাকর কর্মনীতি অবলম্বন করতে প্রলুব্ধ করে কিন্তু আল্লাহ তোমাদেরকে তাঁর ক্ষমা ও অনুগ্রহের আশ্বাস দেন। আল্লাহ বড়ই উদার ও মহাজ্ঞানী।
২৬৯. তিনি যাকে চান, হিকমত দান করেন। আর যে ব্যক্তি হিকমত লাভ করে সে আসলে বিরাট সম্পদ লাভ করেছে। এই কথা থেকে কেবলমাত্র তারাই শিক্ষা লাভ করে যারা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী।
২৭০. তোমরা যা কিছু ব্যয় করেছো এবং যা মানতও করেছো আল্লাহ তা সবই জানেন। আর জালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।
২৭১. যদি তোমাদের দান-সাদ্কাগুলো প্রকাশ্যে করো, তাহলে তাও ভালো, তবে যদি গোপনে অভাবীদের দাও, তাহলে তোমাদের জন্য এটিই বেশী ভালো। এভাবে তোমাদের অনেক গুনাহ নির্মুল হয়ে যায়। আর তোমরা যা কিছু করে থাকো আল্লাহ অবশ্যই তার খবর রাখেন। (সুরা আল বাকারা : ২৬৭-২৭১)

আয়াতগুলো নাযিলের প্রেক্ষাপট
عَنْ جَابِرٍ: قَالَ أَمَرَ النَّبِيُّ- صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ- بِزَكَاةِ الْفِطْرِ بِصَاعٍ مِنْ تَمْرٍ، فَجَاءَ رَجُلٌ بِتَمْرٍ رَدِيءٍ، فنزل القرآن: يَا أَيّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ وَلَا تَيَمَّمُوا الْخَبِيثَ مِنْهُ تُنْفِقُونَ
জাবির (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) খেজুর দ্বারা রোযার ফিতরা আদায় করার নির্দেশ প্রদান করলে এক ব্যক্তি খারাপ খেজুর নিয়ে আসে; তখন ২৬৭ নং আয়াত অবতীর্ণ হয়। আর ২৭১ নং আয়াত নাযিলের ব্যাপারে ক্বালবি বলেন: সাহাবাগণ প্রশ্ন করলেন: ‘ يَا رَسُولَ اللَّهِ صَدَقَةُ السِّرِّ أَفْضَلُ أَمْ صَدَقَةُ الْعَلَانِيَةِ ‘ ইয়া রাসুলুল্লাহ গোপনে না প্রকাশ্যে সদকা করা উত্তম? তখন এ আয়াত অবর্তীর্ণ হয়। অন্যান্য আয়াতগুলোতে দানের ব্যাপারে বিভিন্ন কথা বলা হয়েছে।

আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা
প্রথম আয়াত অর্থাৎ ২৬৭ নং আয়াতটি দান করার ক্ষেত্রে এবং কোনো ব্যক্তিকে কোনো কিছু দেওয়ার ব্যাপারে অত্যন্ত সুস্পষ্ট ব্যক্তব্য প্রদান করেছে। মানুষের সাথে কোন কিছু আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে কী ম্যানার মেনে চলতে হবে তার সুস্পষ্ট নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। যেমন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا أَنْفِقُوا ‘ওহে যারা ঈমান এনেছো তারা ব্যয় কর’। এখানে মু‘মিনদের দান করার ব্যাপারে আহবান জানানো হয়েছে। আল-কুরআনে যত স্থানে মু‘মিনদের আহবান করা হয়েছে, প্রতিটি আহবানে মহান আল্লাহর কাছাকাছি হওয়া যায়, এমন কিছু আমলের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাফসির ইবন কাছিরে ‘আনফিকু..’ বলতে আস-সাদাকা বুঝানো হয়েছে। সাদাকার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে মহান আল্লাহ বলেন-
وَمَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمُ ابْتِغَاء مَرْضَاتِ اللّهِ وَتَثْبِيتًا مِّنْ أَنفُسِهِمْ كَمَثَلِ جَنَّةٍ بِرَبْوَةٍ أَصَابَهَا وَابِلٌ فَآتَتْ أُكُلَهَا ضِعْفَيْنِ فَإِن لَّمْ يُصِبْهَا وَابِلٌ فَطَلٌّ وَاللّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ
‘যারা আল্লাহর রাস্তায় স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এবং নিজের মনকে সুদৃঢ় করার জন্যে তাদের উদাহরণ টিলায় অবস্থিত বাগানের মতো, যাতে প্রবল বৃষ্টিপাত হয়; অতঃপর দ্বিগুণ ফসল দান করে। যদি এমন প্রবল বৃষ্টিপাত না-ও হয়, তবে হাল্কা বর্ষণই যথেষ্ট। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম যথার্থই প্রত্যক্ষ করেন।’ (সূরা বাকারা : ২৬৫)।
পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ আরো ইরাশাদ করেন
مَثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنْبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنْبُلَةٍ مِائَةُ حَبَّةٍ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ
‘যারা আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ ব্যয় করে তার উদাহরণ হচ্ছে সেই বীজের মতো যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায়। আর প্রতিটি শীষে একশতটি করে দানা থাকে। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা অতিরিক্ত দান করেন। আল্লাহ সুপ্রশস্ত সুবিজ্ঞ।’ (সূরা বাকারা : ২৬১)
এ সাদাকা কোন অনুগ্রহ নয়, বরং অভাবী ও বঞ্চিতদের অধিকার। মহান আাল্লাহ সুরা আয-যারিয়াতের ১৯ নং আয়াতে বলেন:
وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِّلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ
‘তাদের সম্পদে দানপ্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে’।
মহান আল্লাহ সুরা আল মা‘আরিজ এর ২৪ ও ২৫ নং আয়াতে আরো বলেন-
وَالَّذِينَ فِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ مَعْلومٌ، لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ ‘এবং তাদের সম্পদে নির্দিষ্ট হক রয়েছে, এমন সব লোকদের জন্য যারা (অন্যদের কাছে কিছু) চায় এবং যারা (নানা সুবিধা ) বঞ্চিত।’
তিনি সুরা সাবার ৩৯ আয়াতে বলেন-

قُلْ إِنَّ رَبِّي يَبْسُطُ الرِّزْقَ لِمَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ وَيَقْدِرُ لَهُ ۚ وَمَا أَنفَقْتُم مِّن شَيْءٍ فَهُوَ يُخْلِفُهُ ۖ وَهُوَ خَيْرُ الرَّازِقِينَ
“হে নবী! তাদেরকে বলো, “আমার রব তার বান্দাদের মধ্য থেকে যাকে চান মুক্ত হস্তে রিযিক দান করেন এবং যাকে চান মাপাজোপা দেন। যা কিছু তোমরা ব্যয় করে দাও তার জায়গায় তিনি তোমাদের আরো দেন, তিনি সব রিযিকদাতার চেয়ে ভাল রিযিকদাতা।”

সাদাকার ফজিলত সম্পর্কে হাদিস শরীফে এসেছে-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ قَالَ اللَّهُ أَنْفِقْ يَا ابْنَ آدَمَ أُنْفِقْ عَلَيْكَ. )صحيح البخاري(
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ব্যয় কর হে আদম সন্তান! তোমার ওপরও ব্যয় করা হবে। (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস নং ৫৩৫২, পরিবার-পরিজনের জন্য খরচ করার ফযীলত অধ্যায়)।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا وَمَا تَوَاضَعَ أَحَدٌ لِلَّهِ إِلَّا رَفَعَهُ اللَّهُ  صحيح مسلم
আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, সদকা সম্পদ হ্রাস করে না। কাউকে ক্ষমা করলে এর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা বান্দার ইজ্জত বৃদ্ধিই করে থাকেন এবং যে কেউ আল্লাহর জন্য বিন¤্র হয়, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন। (মুসলিম)।

অতএব, দান বা সাদাকার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম কিছু প্রদান করতে হবে কারণ, সেটা জান্নাতে যাওয়ার এবং মহান রবের নিকট থেকে পুরষ্কার পাওয়ার নিশ্চিয়তা প্রদান করে। এ আয়াত থেকে আরো যে সকল বিধান পাওয়া যায় তা হচ্ছে-
ক্স উত্তম ও পবিত্র জিনিস সাদাকা করতে হবে। স্বর্ণ-রৌপ্য, জমিনের উৎপাদিত ফসল, জামা-কাপড় যাই সাদাকা দেওয়া হবে, তার উত্তমটাই দিতে হবে। (ইবন কাছির)।
ক্স কোন খারাপ জিনিস প্রদান না করা। অনেক সময় যা খেতে ইচ্ছা হয় না বা অরুচি বোধ হয়, তা দান বা সাদাকা করা হয়। এজাতীয় কাজ করলে অবশ্যই আল্লাহর পক্ষ অনুরুপ মন্দটাই পাওয়া যাবে।
ক্স যা সাদাকা করা হচ্ছে, তা যদি আমাকে সাদাকা হিসেবে গ্রহণ করতে হয়, তাহলে আমার কেমন লাগবে? এটা অনুভব করে সাদাকা করা।
কোন ব্যক্তিকে কিছু দেওয়ার ক্ষেত্রে রাসূল (সা.) বাস্তসম্মত একটি মানদ- প্রদান করেছেন। কোন কিছু দান বা সাদাকা করতে গেলে যে মৌলিক কথা মনে রাখতে হবে তা হচ্ছে-
عن أنس بن مالك رضي الله عنه خادم رسول الله صلى الله عليه وسلم أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : ( لا يؤمن أحدكم حتى يحب لأخيه ما يحب لنفسه ) رواه البخاري ومسلم .(
রাসূল (সা.) এর খাদিম আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন: তোমাদের কেউ মু‘মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য যা ভালবাসে, তা অন্য ভাইয়ের জন্য ভালবাসে। (বুখারি ও মুসলিম)।

২৬৮ নং আয়াতে মহান আল্লাহর পথে সাদাকা ও দান করার ক্ষেত্রে সবথেকে বড় বাধা দানকারী শয়তানের সাথে পরিচয় করাচ্ছেন। সাদাকার দ্বারা মহান আল্লাহর খুশী অর্জনের মাধ্যমে জান্নাত পাওয়ার যে সুযোগ আছে, সেটা শয়তান বন্ধ করার জন্য বদ্ধপরিকর। কারণ, সে মহান আল্লাহর সাথে যে চ্যালেঞ্জ করেছিলো যা সুরা আল আ‘রাফের ১৭ আয়াতে বলা হয়েছে:
ثُمَّ لَآتِيَنَّهُم مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَمِنْ خَلْفِهِمْ وَعَنْ أَيْمَانِهِمْ وَعَن شَمَائِلِهِمْ ۖ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شَاكِرِينَ

এরপর তাদের কাছে আসব তাদের সামনের দিক থেকে পেছন দিক থেকে, ডান দিক থেকে বাম দিক থেকে (সবদিক থেকে এদেরকে ঘিরে ধরবো) আপনি এদের অধিকাংশকে শোকর গুজার পাবে না।”
শয়তানের চ্যালেঞ্জ হলো সে মানুষকে বুঝায়, দান-সাদাকা করো না সম্পদ কম হয়ে যাবে, গরীব হয়ে যাবে। সে বলে- تُمْسِكُوا مَا بِأَيْدِيكُمْ فَلَا تُنْفِقُوهُ فِي مَرْضَاة اللَّه ‘তোমরা হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরো যা তোমাদের আছে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় করো না” (ইবন কাছির)। আর যে ব্যাপারে উৎসাহ দেয় তা হচ্ছে- إِيَّاكُمْ عَنْ الْإِنْفَاق خَشْيَة الْإِمْلَاق يَأْمُركُمْ بِالْمَعَاصِي وَالْمَآثِم وَالْمَحَارِم وَمُخَالَفَة الْخَلَّاق ‘ব্যয় করো না নিঃস্ব হয়ে যাবে, এবং তোমাদের আদেশ করে পাপাচার, অন্যায় ও মন্দ কর্মের দিকে এবং ¯্রষ্টার ইচ্ছার বিপরীত কর্মের দিকে। (ইবন কাছির)। শয়তানের এ প্ররোচনার বিপক্ষে মহান আল্লাহর ঘোষণা: وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ মহান আল্লাহ বড়ই উদার ও মহাজ্ঞানী। এ আয়াত প্রসঙ্গে তাফসীরে বাগভীতে বলা হয়েছে “ শয়তান দারিদ্রের ভয় দেখায় এবং মহান আল্লাহ কল্যাণের দিকে ওয়াদা করে। মহান আল্লাহর কল্যাণের ওয়াদা হচ্ছে: وَعَدَكُمُ اللَّهُ مَغَانِمَ كَثِيرَةً – আল্লাহ তোমাদরকে অঢেল গনীমতের (সম্পদের) প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন (সূরা আল ফাতহ : ২০)। আর শয়তান ফাহিশার দিকে আদেশ করে অর্থাৎ সে কৃপণতা ও যাকাত না দেওয়ার প্রতি আহবান জানায়।”
২৬৯ নং আয়াতটি মহান আল্লাহ প্রদত্ত মানুষের মাঝে যে ‘ইলমের আলো রয়েছে সেদিকে নির্দেশ করে। মানুষকে তিনি ‘হিকমাত’ দান করেছেন। অর্থাৎ কোন বিষয়ের ব্যাপারে অতিসুক্ষ্ম এবং গভীর চিন্তা-ভাবনা শক্তি দান করেছেন। এ সম্পদ যে পেয়েছে সে সর্বোত্তম কিছু প্রাপ্ত হয়েছে। তার চিন্তা-ভাবনা, কর্মদক্ষতা ও বাস্তবজীবনের কর্মকৌশল প্রয়োগের ক্ষেত্রে সে অন্যদের থেকে আলাদা। হিকমাত এর ব্যাখ্যায় ইবন ‘আব্বাস (রা) বলেন:
عَنْ اِبْن عَبَّاس يَعْنِي الْمَعْرِفَة بِالْقُرْآنِ نَاسِخه وَمَنْسُوخه وَمُحْكَمه وَمُتَشَابِهه وَمُقَدَّمه وَمُؤَخَّره وَحَلَاله وَحَرَامه وَأَمْثَاله
“আল কুরআন ও হাদিস শরীফের পূর্ণ পারদর্শিতা লাভ, যার দ্বারা রহীতকৃত ও রহীতকারী, স্পষ্ট ও অস্পষ্ট, পূর্বের ও পরের, হালাল ও হারামের এবং উপমার আয়াতসমূহের পূর্ণ পরিচয় লাভ করা যায়। (ইবন কাছির)।
হিকমত অর্থ হচ্ছে, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার শক্তি। এখানে একথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই যে, হিকমতের সম্পদ যে ব্যক্তির কাছে থাকবে সে কখনো শয়তানের দেখানো পথে চলতে পারবে না। বরং সে আল্লাহর দেখানো প্রশস্ত পথ অবলম্বন করবে। শয়তানের সংকীর্ণমনা অনুসারীদের দৃষ্টিতে নিজের ধন-সম্পদ আঁকড়ে ধরে রাখা এবং সবসময় সম্পদ আহরণের নতুন নতুন ফন্দি-ফিকির করাই বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক। কিন্তু যারা আল্লাহর কাছ থেকে অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছে, তাদের মতে এটা নেহায়েত নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাদের মতে, মানুষ যা কিছু উপার্জন করবে, নিজের মাঝারী পর্যায়ের প্রয়োজন পূর্ণ করার পর সেগুলো সৎকাজে ব্যয় করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। দুনিয়ার এই হাতে গোণা কয়েকদিনের জীবনে প্রথম ব্যক্তি দ্বিতীয় জনের তুলনায় হয়তো অনেক বেশী প্রাচুর্যের অধিকারী হতে পারে। কিন্তু মানুষের জন্য এই দুনিয়ার জীবনটিই সম্পূর্ণ জীবন নয়। বরং এটি আসল জীবনের একটি সামান্যতম অংশ মাত্র। এই সামান্য ও ক্ষুদ্রতম অংশের সমৃদ্ধি ও সচ্ছলতার বিনিময়ে যে ব্যক্তি বৃহত্তম ও সীমাহীন জীবনের অসচ্ছলতা, দারিদ্র ও দৈন্যদশা কিনে নেয় সে আসলে নিরেট বোকা ছাড়া আর কিছুই নয়। যে ব্যক্তি এই সংক্ষিপ্ত জীবনকালের সুযোগ গ্রহণ করে মাত্র সামান্য পুঁজির সহায়তায় নিজের ঐ চিরন্তন জীবনের সমৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে সে-ই আসলে বুদ্ধিমান। (তাফহিমুল কুরআন)।
আবুল ‘আলিয়া বলেন-
وَقَالَ أَبُو الْعَالِيَة : الْحِكْمَة خَشْيَة اللَّه فَإِنَّ خَشْيَة اللَّه رَأْس كُلّ حِكْمَة
আবুল ‘ হিকমাহ হচ্ছে আল্লাহকে ভয় করা। আর আল্লাহভীতিই সকল হিকমাতের মূল। ইবন মাস‘উদ (রা) থেকে বর্ণিত, মার‘ফু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল (সা.) বলেছেন-
رَأْس الْحِكْمَة مَخَافَة اللَّه
‘হিকমাতের মূল আল্লাহর ভয়’। মহান আল্লাহ রাসূলদের প্রেরণ করে মানুষদের চারটি মৌলিক বিষয় শিক্ষাপ্রদান করেছেন। তার একটি হিকমাহ। মহান আল্লাহ আল-কুরআনের কয়েকটি আয়াতে এ ব্যাপারে বলেন:
هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ

তিনিই মহান সত্তা যিনি উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন যে তাদেরকে তাঁর আয়াত শুনায়, তাদের জীবনকে সজ্জিত ও সুন্দর করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমাত শিক্ষা দেয়। অথচ ইতিপূর্বে তারা স্পষ্ট গোমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল। (সূরা আল-জুমু‘আ : ২)
তবে মোদ্দাকথা হচ্ছে, যারা বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী কেবলমাত্র তারাই এই বিশেষগুণে গুণান্বিত হবে। এজন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ” وَمَا يَذَّكَّر إِلَّا أُولُو الْأَلْبَاب ” ইবন কাছির এর ব্যাখ্যায় বলেছেন: وَمَا يَنْتَفِع بِالْمَوْعِظَةِ وَالتِّذْكَار إِلَّا مَنْ لَهُ لُبّ وَعَقْل – ‘ যাদের যথাযথ আকল ও গভীর বুদ্ধি না থাকবে তাদের জন্য এ সকল উপদেশ এবং নির্দেশনা কোন উপকারে আসবে না’।
২৭০ আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা মানব মনের স্বাভাবিক প্রবণতাকে প্রকাশ করেছেন। মানুষের মন মাঝে মাঝে খারাপ কিছু করতে প্রলুব্ধ হয়। মহান আল্লাহর অনেক বিধান জানার পরও মন্দ কাজের প্রতি ঝোক এসে যায়। এজন্য তিনি বলছেন, কোন জিনিস দান করো আর কোন জিনিস মান্নত করো মহান আল্লাহ জানেন। মানুষ অনেক সময় ভালোটা না দিয়ে অপেক্ষাকৃত কমভালোটা দান করতে চায়। এ বিষয়টাও আল্লাহর দৃষ্টির বাহিরে নয় সে বিষয়টা এ আয়াত স্পষ্ট করে। এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে-
আল্লাহর পথে ব্যয় করা হোক বা শয়তানের পথে, আল্লাহর জন্য মানত করা হোক বা গায়রুল্লাহর জন্য, উভয় অবস্থাযই মানুষের নিয়ত ও তার কাজ সম্পর্কে আল্লাহ ভালোভাবেই জানেন। যারা আল্লাহর জন্য ব্যয় করে থাকে এবং তাঁর জন্যই মানত করে তারা তাদের প্রতিদান পাবে। আর যেসব জালেম শয়তানের পথে ব্যয় করে থাকে এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্যদের জন্য মানত করে, তাদের আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করার সাধ্য কারো নেই।
মানত বলা হয় নজরানাকে। কোন একটি মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হলে মানুষ যখন নিজের ওপর এমন কোন ব্যয়ভার বা সেবাকে ফরয করে নেয়, যা তার ওপর ফরয নয় তখন তাকে মানত বলে। এই মনোবাঞ্ছা যদি কোন হালাল জিনিস সম্পর্কিত হয় এবং তা আল্লাহর কাছে চাওয়া হয়ে থাকে আর তা পূর্ণ হবার পর যে কাজ করার অঙ্গীকার করা হয় তা আল্লাহর জন্যই হয়ে থাকে, তাহলে এই ধরণের নজরানা ও মানত হবে আল্লাহর আনুগত্যের অধীন। এই মানত পূর্ণ করলে সওয়াব ও প্রতিদান লাভ করা যাবে। যদি এই ধরনের মানত না হয়, তাহলে তা নিজেই নিজের ওপর আরোপিত গুনাহের কারণ হয়ে দাঁড়াবে এবং তা পূর্ণ করলে অবশ্যই আযাবের অংশীদার হতে হবে। (তাফহীমুল কুরআন)।
তবে কেউ যদি সতর্ক করার পরও গাইরুল্লাহর নামে মান্নত অথবা দান করে তাহলে তাহলে সেটা জুলুম হবে। আর মহান আল্লাহ এ ধরনের জালিমদের কোন সাহায্য করবেন না ( وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ) । অর্থাৎ কিয়ামতের ময়দানে মহান আল্লাহর আজাব ও প্রতিশোধ থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না।(ইবন কাছির)।
وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَار -এর আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে: لمن أنفق ماله رئاء الناس وفي معصية الله، وكانت نذوره للشيطان وفي طاعته – ‘যদি কেউ লোক দেখানো দান করে অথবা মহান আল্লাহর অবাধ্যতার জন্য (বা দ্বীনের কাজে আসে না এমন) কোন কাজে অর্থ ব্যয় করে, তাহলে সে ব্যয় শয়তানের জন্য এবং তার আনুগত্যের জন্যই করা হয়’। (আত-তাবারি)।

২৭১ নং আয়াতে কোন ধরনের দান উত্তম তা বর্ণিত হয়েছে। কেউ বলেছেন প্রকাশ্যে কেউ অপ্রকাশ্যে। মুফাসসিরগণ বিভিন্ন মতামত পেশ করেছেন। যেমন-
যে দান-সাদাকা করা ফরয সেটি প্রকাশ্যে করাই উত্তম। অন্যদিকে ফরয নয় এমন দান-সাদাকা গোপনে করাই ভালো। সমস্ত কাজের ক্ষেত্রেও এই নীতি প্রযোজ্য। ফরযগুলো প্রকাশ্যে এবং নফলগুলো গোপনে করাই উত্তম হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ লুকিয়ে সৎকাজ করলে মানুষের আত্মা ও নৈতিক বৃত্তির অনবরত সংশোধন হয়ে থাকে। তার সৎগুণাবলী বিকাশ লাভ করতে থাকে তার দোষ, ত্রুটি ও অসৎবৃত্তিগুলো ধীরে ধীরে নির্মুল হতে থাকে। এই জিনিসটি তাকে আল্লাহর এমন প্রিয়ভাজন করে তোলে, যার ফলে তার আমলনামায় যে সামান্য কিছু গুনাহ লেখা থাকে, তার এই সৎগুণাবলীর প্রতি দৃষ্টিপাত করে মহান আল্লাহ সেগুলো মাফ করে দেন। (তাফহীমুল কুরআন)
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় একটি হাদিস উল্লেখ করা যায়-
وَقَالَ رَسُول اللَّه صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْجَاهِرُ بِالْقُرْآنِ كَالْجَاهِرِ بِالصَّدَقَةِ وَالْمُسِرُّ بِالْقُرْآنِ كَالْمُسِرِّ بِالصَّدَقَةِ
‘রাসূল (সা.) বলেন: প্রকাশ্যদানকারী উচ্চ শব্দে কুরআন পাঠকারীর ন্যায়, আর গোপনে দানকারী ধীরে ধীরে কুরআন পাঠকারীর ন্যায়’। এ হাদীস দ্বারা গোপনে দানের শ্রেষ্ঠত্ব বোঝা যায়। (ইবন কাছির)। অন্য এক হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَة قَالَ : قَالَ رَسُول اللَّه – صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – سَبْعَة يُظِلُّهُمْ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ يَوْم لَا ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ : إِمَامٌ عَادِلٌ وَشَابٌّ نَشَأَ فِي عِبَادَةِ اللَّهِ وَرَجُلَانِ تَحَابَّا فِي اللَّهِ اِجْتَمَعَا عَلَيْهِ وَتَفَرَّقَا عَلَيْهِ وَرَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ بِالْمَسْجِدِ إِذَا خَرَجَ مِنْهُ حَتَّى يَرْجِعَ إِلَيْهِ وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللَّهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ وَرَجُلٌ دَعَتْهُ اِمْرَأَةٌ ذَاتُ مَنْصِبٍ وَجَمَالٍ فَقَالَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبّ الْعَالَمِينَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَخْفَاهَا حَتَّى لَا تَعْلَم شِمَاله مَا تُنْفِق يَمِينه وَرَجُلٌ ذَكَرَ اللهَ خَالِيًا فَفَاضَتْ عَيْنَاهُ) متفق عليهআবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন কেয়ামত দিবসে সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা তার আরশের ছায়াতলে আশ্রয় দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত ভিন্ন কোন ছায়া থাকবে না। ন্যায় পরায়ণ বাদশাহ; এমন যুবক, যে তার যৌবন ব্যয় করেছে আল্লাহর এবাদতে; ঐ ব্যক্তি যার হৃদয় সর্বদা সংশ্লিষ্ট থাকে মসজিদের সাথে; এমন দু ব্যক্তি, যারা আল্লাহর জন্য একে অপরকে ভালোবেসেছে, এবং বিচ্ছিন্ন হয়েছে তারই জন্য; এমন ব্যক্তি, যাকে কোন সুন্দরী নেতৃস্থানীয় রমণী আহ্বান করল অশ্লীল কর্মের প্রতি, এবং প্রত্যাখ্যান করে সে বলল, আমি আল্লাহকে ভয় করি; এমন ব্যক্তি, যে এরূপ গোপনে দান করে যে, তার বাম হাত ডান হাতের দান সম্পর্কে অবগত হয় না। আর এমন ব্যক্তি, নির্জনে যে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার দুচোখ বেয়ে যায় অশ্রুধারা। (ইবন কাছির)
প্রাগুক্ত হাদিসে গোপনে দানের ব্যাপারে বলা হয়েছে। অন্য একটি হাদিসে রয়েছে:
عَنْ أَنَس بْن مَالِك عَنْ النَّبِيّ – صَلَّى اللَّه تَعَالَى عَلَيْهِ وَعَلَى آلِهِ وَسَلَّمَ – قَالَ لَمَّا خَلَقَ اللَّه الْأَرْض جَعَلَتْ تَمِيد فَخَلَقَ الْجِبَال فَأَلْقَاهَا عَلَيْهَا فَاسْتَقَرَّتْ فَتَعَجَّبَتْ الْمَلَائِكَة مِنْ خَلْق الْجِبَال فَقَالَتْ : يَا رَبّ هَلْ فِي خَلْقك شَيْء أَشَدّ مِنْ الْجِبَال ؟ قَالَ نَعَمْ الْحَدِيد قَالَتْ : يَا رَبّ فَهَلْ مِنْ خَلْقك شَيْء أَشَدّ مِنْ الْحَدِيد قَالَ : نَعَمْ النَّار قَالَتْ : يَا رَبّ فَهَلْ مِنْ خَلْقك شَيْء أَشَدّ مِنْ النَّار ؟ قَالَ : نَعَمْ الْمَاء قَالَتْ : يَا رَبّ فَهَلْ مِنْ خَلْقك شَيْء أَشَدّ مِنْ الْمَاء ؟ قَالَ : نَعَمْ الرِّيح قَالَتْ : يَا رَبّ فَهَلْ مِنْ خَلْقك شَيْء أَشَدّ مِنْ الرِّيح ؟ قَالَ : نَعَمْ اِبْن آدَم يَتَصَدَّق بِيَمِينِهِ فَيُخْفِيهَا مِنْ شِمَاله وَقَدْ ذَكَرْنَا فِي فَضْل آيَة الْكُرْسِيّ عَنْ أَبِي ذَرّ قَالَ : قُلْت يَا رَسُول اللَّه أَيّ الصَّدَقَة أَفْضَل ؟ قَالَ سِرٌّ إِلَى فَقِير أَوْ جَهْدٌ مِنْ مُقِلٍّ وَرَوَاهُ أَحْمَد
আনাস বিন মালিক (রা) রাসূল (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন: যখন আল্লাহ তা‘আলা পৃথিবী সৃষ্টি করেন তখন পৃথিবী দুলতে আরম্ভ করে। তখন আল্লাহ তা‘আলা পর্বত সৃষ্টি করে পৃথিবীর মধ্যে গেঁড়ে দেন। ফলে পৃথিবীর কম্পন থেমে যায়। পর্বতরাজিকে এত শক্ত করে সৃষ্টি করা দেখে ফিরিশতাগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ আপনার সৃষ্টির মাঝে পাহাড়ের থেকে শক্ত আর কিছু সৃষ্টি করেছেন? তিনি বললেন হ্যাঁ, লৌহ রয়েছে। ওর থেকে শক্ত লোহা, তার থেকে আগুন, তার থেকে পানি, তার থেকে বাতাস। তাঁরা পুনরায় জিজ্ঞেস করেন: বাতাস অপেক্ষা শক্ত অন্য কিছু আছে কী? আল্লাহ তা‘আলা বললেন: হ্যাঁ সেই আদম সন্তান যে এমন গোপন করে দান করে যে, তার ডান যা খরচ করে বাম হাত তা জানতে পারে না। (ইবন কাছির)
عَنْ اِبْن عَبَّاس فِي تَفْسِير هَذِهِ الْآيَة قَالَ : جَعَلَ اللَّه صَدَقَة السِّرّ فِي التَّطَوُّع تَفْضُل عَلَانِيَتهَا يُقَال بِسَبْعِينَ ضِعْفًا وَجَعَلَ صَدَقَة الْفَرِيضَة عَلَانِيَتهَا أَفْضَل مِنْ سِرّهَا يُقَال بِخَمْسَةٍ وَعِشْرِينَ ضِعْفًا.
ইবনু আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, নফল সাদাকা গোপনে করা সত্তরগুণ সওয়াব, আর ফরজ দান অর্থাৎ যাকাত প্রকাশ্যে দেওয়ার ফজিলত পঁচিশগুণ। (ইবন কাছির)।
অতএব গোপনে বা প্রকাশ্যে দান বা সাদাকা যাই করা হোক সওয়াবের কিছু তারতম্য আল-কুরআন ও আল-হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে যে বিষয়টি মহান আল্লাহ স্পষ্ট জানিয়েছেন তা হচ্ছে: وَيُكَفِّرُ عَنْكُمْ مِنْ سَيِّئَاتِكُمْ – ‘আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের বহুবিধ গুণাহ মাফ করে দেন’, এ ব্যাপারটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং এ ক্ষেত্রে সুরা আল-বাকারার ২৭৪ আয়াতটি সার্বিকভাবে দান-সাদাকার জন্য আখিরাতে পুরষ্কার এবং ভয় ও দুশ্চিন্তাহীন জীবনের পূর্ণ গ্যারান্টি প্রদান করেছে। মহান আল্লাহ বলেন:
ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٰلَهُم بِٱلَّيۡلِ وَٱلنَّهَارِ سِرّٗا وَعَلَانِيَةٗ فَلَهُمۡ أَجۡرُهُمۡ عِندَ رَبِّهِمۡ وَلَا خَوۡفٌ عَلَيۡهِمۡ وَلَا هُمۡ يَحۡزَنُونَ
“যারা নিজেদের ধন-সম্পদগুলো আল্লাহ তা‘আলার পথেই রাত-দিন প্রকাশ্যে এবং অপ্রকাশ্যে দান করবে তাদের প্রতিদানসমূহ তাদের প্রভুর নিকটই রক্ষিত থাকবে। কিয়ামতের দিন তাদের কোনো ভয়-ভীতি থাকবে না এবং তারা কখনো চিন্তাগ্রস্তও হবে না”।

আয়াতসমূহের শিক্ষা
– হালাল এবং পবিত্র দ্রব্যাদির মাধ্যমে দান বা সাদাকা করা।
– ভালো সম্পদের সাথে মন্দসম্পদ না মিশানো।
– দান ও সাদাকার ব্যাপারে শয়তানের দক্ষ নেতিবাচক ভূমিকার পূর্ণ বিরোধিতা করা।
– দুনিয়ার জীবনে যে গুণের ও মানের জিনিস দান-সাদাকা করা হবে আখিরাতে তা পাওয়া যাবে।
– ‘হিকমাহ’ পাওয়ার জন্য মহান রবের নিকট সর্বদা দু‘আ করা।
– গোপনে-প্রকাশ্যে একমাত্র মহান আল্লাহর নামে মান্নত করা অথবা ব্যয় করা।
– ‘মহান আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দিবেন’ এ প্রত্যাশা ধারন করে তাঁর ইবাদত করা।
– একমাত্র মহান আল্লাহকে উদ্দেশ্য করেই দান, সাদাকা ও মান্নত করা।
মহান আল্লাহ আয়াতসমূহের আলোকে জীবন গঠন করার তৌফিক দান করুন।
আমিন।

লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply