সৃষ্টি, সুব্যবস্থাপনা ও মহান আল্লাহর একক অস্তিত্ব -ড. মো. শফিকুল ইসলাম

تَبَارَكَ الَّذِي جَعَلَ فِي السَّمَآءِ بُرُوجًا وَّجَعَلَ فِيهَا سِرَاجًا وَّ قَمَرًا مُّنِيرًا . وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِمِّنْ أَرَادَ أَنْ يَّذَّكَّرَ أَوْ أَرَادَ شُكُورًا.
“কত মহান তিনি, যিনি নভোমন্ডলে ‘বুরূজ’ (সুরক্ষিত দুর্গ) সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সূর্য) ও আলোকময় চন্দ্র। আর যারা উপদেশ গ্রহণ করতে ও কৃতজ্ঞ হতে চায়, তাদের জন্য তিনিই রাত্রি এবং দিনকে পরস্পর অনুগামীরূপে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরাহ আল-ফুরকান : ৬১-৬২)

ফুরকান শব্দের অর্থ ও সূরাহটির নামকরণ
‘আল-ফুরকান’ (الْفُرْقَان) অর্থ পার্থক্যকারী। এটি ‘র্ফারাকা’ (فَرَّقَ) ক্রিয়ার মাসদার বা শব্দমূল। এটি কুরআন মজীদের একটি নাম। আল-কুরআন স্বীয় সুস্পষ্ট বক্তব্য দ্বারা হক ও বাতিলের মধ্যে এবং স্বীয় অলৌকিকত্ব দ্বারা সত্যপন্থী ও মিথ্যাবলম্বীর মধ্যে পার্থক্য করে দেয়। পবিত্র আল-কুরআনে ‘আল-ফুরকান’ (الْفُرْقَان) শব্দটি সাতবার এসেছে। এ সূরার প্রথম আয়াতে বর্ণিত (تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَى عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا) ‘আল-ফুরকান’ (الْفُرْقَان) শব্দটি চয়ন করে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে বলে প্রতিভাত হয়।

নাযিলের সময়কাল
সূরাহ আল-ফুরকানের বিবরণ ও আলোচ্য বিষয় এবং বিভিন্ন বর্ণনা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায়, সূরাহটি মাক্কী যুগের মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ নবুওয়াতের ষষ্ঠ বর্ষের শেষের দিকে নাযিল হয়েছে।
আলোচ্য বিষয়
সূরাহ আল্-ফুরকান মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের ২৫তম সূরাহ। এতে ৬টি রুকু, ৭৭টি আয়াত, ৮৭৬টি শব্দ এবং ৩৭৮০টি অক্ষর রয়েছে। এ সূরাহর মূল আলোচ্য বিষয় তাওহীদ, রিসালাত ও আখিরাত। মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে ঘোষণা করেন, আসমানসমূহ ও জমিনের সমূদয় সার্বভৌমত্ব একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য নিবেদিত, এতে অন্য কারো কোন শরীক নেই, তিনিই প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা। তখন মুশরিক সম্প্রদায় এ সত্যকে অস্বীকার করে আল-কুরআন ও রাসূল (সা.) সম্পর্কে বিভিন্ন অন্যায় ও মিথ্যা মন্তব্য পেশ করে। এরূপ প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহ কাফির মুশরিকদের এসব মিথ্যা অভিযোগ ও আপত্তির যুক্তিপূর্ণ জবাব দেন।
অনুরূপভাবে অত্র সূরাহটিতে ঈমানদারদের পুরস্কার এবং কাফিরদের ভয়াবহ আযাবের কথাও স্থান পেয়েছে। এছাড়া এ সূরার শেষেরদিকে মহান আল্লাহর মহিমা বর্ণনা করার পর মু’মিনদের উন্নত নৈতিক চরিত্রের বিবরণ সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

নির্বাচিত আয়াতদ্বয়ের ব্যাখ্যা
৬১তম আয়াত : বিশ^পরিম-ল সৃষ্টিতে মহান আল্লাহর নিপুণতা
تَبَارَكَ الَّذِي جَعَلَ فِي السَّمَآءِ بُرُوجًا وَّجَعَلَ فِيهَا سِرَاجًا وَّ قَمَرًا مُّنِيرًا .
“কত মহান তিনি, যিনি আকাশে ‘বুরূজ’ সৃষ্টি করেছেন এবং তাতে স্থাপন করেছেন প্রদীপ (সূর্য) ও আলোকময় চন্দ্র।”
অত্র আয়াতে মহান আল্লাহর মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। বরকতময় আল্লাহ আকাশে ‘বুরূজ’ (সুরক্ষিত দুর্গ), ‘সিরাজ’ (সূর্য) এবং ‘কামার’ (চন্দ্র) স্থাপন করেছেন। আয়াতের ব্যাখ্যার জন্য এ তিনটি বিষয় সংক্ষিপ্তাকারে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
এক. আকাশে বুরূজ স্থাপন
আয়াতে বলা হয়েছে, “আল্লাহ এমন বরকতময় যে, তিনি আকাশে ‘বুরূজ’ (بُرُوجً) স্থাপন করেছেন।” অত্র আয়াতে বর্ণিত ‘বুরূজ’ (بُرُوجً) শব্দটি বুরুজ (بُرُجً) এর বহুবচন। আল-কুরআনে এ শব্দটি ৪ বার ব্যবহৃত হয়েছে। এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। যথা-
১. ‘বুরূজ’ ( بُرُوجً) অর্থ সুরক্ষিত দুর্গ বা বিশাল প্রাসাদ। যেমন- সূরাহ নিসার ৭৮তম আয়াতে বলা হয়েছে- ‘ওয়া লাও কুনতুম ফী বুরূজিম মুশাইয়াদাহ’ (وَلَوْ كُنْتُمْ فِي بُرُوجٍ مُشَيَّدَةٍ) অর্থাৎ মৃত্যু তোমাদেরকে খুঁজে পাবেই। “যদিও তোমরা কোনো মযবুত দুর্গে থাক না কেন।”
২. ‘বুরূজ’ ( بُرُوجً) অর্থ চন্দ্র-সূর্যের গতিপথের মন্যিলসমূহ। আবূ উবাইদা, ইবন জারীর ও ইয়াহইয়া (রহ.)-এর মতে বুরূজ (بُرُوجً) দ্বারা চন্দ্র-সূর্যের গতি পথে বারটি মন্যিল বুঝানো হয়েছে। (তাফসীরে ফাতহুল মাজীদ, পৃ. ১৪০-১৪১)
৩. ‘বুরূজ’ (بُرُوجً) অর্থ আকাশের বিশাল আকার আকৃতিসম্পন্ন সকল গ্রহ-নক্ষত্র। ইবন আব্বাস (রা), মুজাহিদ, কাতাদা, হাসান বসরী, সুদ্দী, দাহ্হাক প্রমুখ মুফাস্সিরগণ এ আয়াতে ‘বুরূজ’ (بُرُوجً) দ্বারা এ অর্থই গ্রহণ করেছেন। আকাশে অবস্থিত গ্রহ নক্ষত্রের সংখ্যা এবং এগুলোর বিশালতা একমাত্র আল্লাহই জানেন। (ফাতহুল বায়ান, ৯ম খ-, পৃ. ৩৪২)
সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক আল্লাহ কত বড় ও মহান তা উপলব্ধির জন্য আকাশে স্থাপিত ‘বুরূজ’ তথা গ্রহ-নক্ষত্রের বিশালতা সম্পর্কে আলোচনা করা যেতে পারে। আমরা পৃথিবী নামক যে গ্রহে অবস্থান করছি তা মানবীয় দৃষ্টিতে বিশাল মনে হয়। পৃথিবীর আয়তন ৫১ কোটি ১ লক্ষ ৪২২ কি.মি.। অথচ এ পৃথিবীর চেয়ে সূর্য প্রায় ১৩ লক্ষ গুণ বড়। সূর্যের ব্যাস হলো ১৩ কোটি কিলোমিটারের চেয়েও বেশি। এ সূর্য যে আকাশের বড় নক্ষত্র তা কিন্তু নয়। এ সূর্যের চেয়েও আরো অনেক বড় বড় নক্ষত্র আছে। যেমন-
লুব্ধক নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে ২০ গুণ বড়। (অর্থাৎ পৃথিবীর চেয়ে ১৩ লক্ষ  ২০ = ২৬০ লক্ষ/ ২ কোটি ৬০ লক্ষ গুণ)
অগস্ত্য নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে ৮০ গুণ বড়। (অর্থাৎ পৃথিবীর চেয়ে ১৩ লক্ষ  ৮০ = ১,০৪০ লক্ষ/১০ কোটি ৪০ লক্ষ গুণ)
স্বাতি নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে ২,৫০০ গুণ বড়।
ব্যাটিলজিউস নক্ষত্রটি সূর্যের চেয়ে ৩৩ কোটি গুণ বড়।
বিজ্ঞানীরা বলেছেন, এ সূর্যের মত কোটি কোটি নক্ষত্র নিয়ে ‘গ্যালাক্সি’ বা ছায়াপথ নামক আরেকটি জগৎ রয়েছে। মহাকাশে লক্ষ লক্ষ ছায়াপথ রয়েছে। সকল গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথকে কুরআনের পরিভাষায় বুরূজও বলা হয়।
এখন পর্যন্ত মানবীয় পর্যবেক্ষণে ১০ কোটি ছায়াপথের সন্ধান পাওয়া গেছে। আমাদের এ পৃথিবী যে ‘গ্যালাক্সি’ বা ছায়াপথে রয়েছে বিজ্ঞানীরা তার নাম দিয়েছেন ‘মিলকিওয়ে’ (গরষশু ডধু) বা বাংলায় ‘আকাশগঙ্গা’। ধারণা করা হয় আমাদের ‘গ্যালাক্সি’ বা ছায়াপথে সূর্যের মত কমপক্ষে ২০০ থেকে ৪০০ বিলিয়ন নক্ষত্র রয়েছে। অর্থাৎ ২০,০০০ কোটি থেকে ৪০,০০০ কোটি নক্ষত্র রয়েছে। ‘মিলকিওয়ে’ খুব বড় নয়, এটি একটি মাঝারি সাইজের অথবা অন্যান্য অনেক গ্যালাক্সি হতে খুবই ছোট একটি গ্যালা´ি। ‘মিলকিওয়ে’ নামক এ ছায়াপথের ব্যাস আনুমানিক এক লক্ষ আলোকবর্ষ। আমাদের পাশের ছায়াপথের নাম ‘এ্যান্ড্রোমিডা’ (অহফৎড়সবফধ) ছায়াপথ। আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী এ্যান্ড্রোমিডা (অহফৎড়সবফধ) ছায়াপথটি এতটা দূরত্বে অবস্থিত যে, তার আলো প্রতি সেকে- ১,৮৬,০০০ (এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার) মাইল গতিতে চলে ২,৫০০ বছরে পৃথিবীতে পৌঁছায়। অর্থাৎ পৃথিবী থেকে ‘এ্যান্ড্রোমিডা’ আনুমানিক ২.৫ মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত।
কোন কোন বিজ্ঞানীর মতে, সমস্ত গ্রহ-উপগ্রহ আর অসংখ্য তারকাপুঞ্জ সীমাহীন মহাশূন্যে এক ক্ষুদ্র অংশে বিস্তৃত হয়ে রয়েছে। এটা মহাবিশ্বের সেই অংশের বিশালতার হিসাব, যা আজ পর্যন্ত মানুষের জ্ঞান ও পর্যবেক্ষণে ধরা পড়েছে। কিন্তু মহান আল্লাহর এই মহাসা¤্রাজ্যের বিশালতা ও বিস্তৃতি যে কতখানি সে বিষয়ে কোন সুস্পষ্ট ধারণা করা মানুষের সাধ্যাতীত। অতএব মহান আল্লাহর সৃষ্টি যদি এতো বিশাল হয় তবে সেই মহান আল্লাহ কত বড় ?
দুই. আকাশে সিরাজ (سِرَاجً) বা সূর্য এবং আলোকময় চন্দ্র (قَمَرًا مُنِيرًا) স্থাপন
মহান আল্লাহ বলেন, (وَّجَعَلَ فِيهَا سِرَاجًا وَّ قَمَرًا مُّنِيرًا) “এবং তিনি আকাশে স্থাপন করেছেন ‘সিরাজ’ ও আলোকময় চন্দ্র।”
‘সিরাজ’ অর্থ ‘প্রদীপ’। যার নিজস্ব আলো রয়েছে তাকে প্রদীপ বলে। আল-কুরআনের চারটি আয়াতে সূর্যকে ‘সিরাজ’ (سِرَاجً) বা ‘প্রদীপ’ বলা হয়েছে। যথা- ফুরকান : ৬১; আহযাব : ৪৬; নূহ : ১৬; নাবা : ১৩। আর আল-কুরআনে চন্দ্রকে ‘মুনীর’ বা আলোকময় বলা হয়েছে। আধুনিক যুগে বিজ্ঞান বলছে, সূর্যের কেন্দ্রে সংঘটিত পারমাণবিক বিক্রিয়ার ফলে সৃষ্ট শক্তির সাহায্যে সূর্য কিরণ দিয়ে থাকে। অথচ চাঁদ কিরণ দেয় চাঁদের উপরিভাগে সূর্যের প্রতিফলন থেকে। অর্থাৎ সূর্যের নিজস্ব আলো রয়েছে আর চঁদের নিজস্ব আলো নেই। সূর্যের আলোতেই চাঁদ আলোকিত হয়। আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের এ বক্তব্য প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর পূর্বে অবতীর্ণ কুরআনের সাথে মিলে যাচ্ছে। একজন উম্মী (প্রাতিষ্ঠানি পড়া-লেখাহীন) নবীর (সা.) পক্ষে সূর্য-চন্দ্র সম্পর্কে এ তথ্য জানার কথা নয়। অতএব কুরআন কোন মানুষের বাণী নয় বরং নিঃসন্দেহ এটি আল্লাহর বাণী।
মহান আল্লাহ কর্তৃক আকাশে সূর্য ও চন্দ্র স্থাপন আমাদের জন্য এক বিশাল নিয়ামত। আমরা যারা পৃথিবী নামক গ্রহে বসবাস করছি তাদের জন্য সূর্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নক্ষত্র। পৃথিবী ও তার অধিবাসীরা সূর্যের আলো, তাপ ও মাধ্যাকর্ষণের ওপরই টিকে আছে।
অনুরূপভাবে চন্দ্র পৃথিবীর একটি ক্ষুদ্র উপগ্রহ হলেও পৃথিবীর জীবনে তার প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রে জোয়ার ভাটা সৃষ্টিতে চন্দ্র সবচেয়ে কার্যকর উপকরণ।
সূর্য ও চন্দ্রের গতির উপরই মানব জীবনের সমস্ত কাজকর্ম নির্ভরশীল। এর মাধ্যমেই দিবারাত্রির পরিবর্তন, ঋতু পরিবর্তন এবং মাস, বছর ইত্যাদি নির্ধারিত হয়। সূর্য ও চন্দ্রের সাথে পৃথিবীতে অবস্থানরত জীবের সম্পর্ক সুগভীর।
পৃথিবী থেকে সূর্য প্রায় ১৫ কোটি কি. মি. দূরে অবস্থিত। (৯ কোটি ২৫ লক্ষ মাইল)। পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্ব যদি এ চেয়ে কম হতো তাহলে পৃথিবী জ¦লে-পুড়ে ছাই হয়ে যেত, অথবা বাষ্পে পরিণত হয়ে শূন্যে বিলীন হয়ে যেত। আর যদি তার দূরত্ব এর চেয়ে একটু বেশী হতো, তাহলে পৃথিবীর সব কিছু জমে বরফ হয়ে যেত। সূর্যের যেটুকু তাপ আমরা পাই, তা তার ২০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ মাত্র। এই সামান্য পরিমাণ তাপই আমাদের জীবনের জন্য উপযোগী ও মানানসই। (ফী যিলালীল কুরআন)
অনুরূপভাবে চন্দ্রের বর্তমান আকৃতি ও পৃথিবী থেকে তার দূরত্বের বিষয়টিও ভেবে দেখার মত। পৃথিবী থেকে চন্দ্রের দূরত্ব ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার ৪০০ কিমি.। আর চন্দ্রের ব্যাস ৩ হাজার ৪শ ৭৪ কিমি.। চন্দ্র যদি আরো বড় হতে, অথবা পৃথিবী থেকে চন্দ্রের দূরত্ব যদি এর চেয়ে কম হতো তাহলে ওর প্রভাবে এখন সমুদ্রে যে জোয়ার হয়ে থাকে, তা ভয়াবহ বন্যার রূপ নিয়ে পৃথিবীর সব কিছুকে ডুবিয়ে দিত। কিন্তু আল্লাহর হিসাবে এক চুল পরিমাণও ভুল হয় না।
পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র কোটি কোটি বছর ধরে আপন কক্ষপথে চলা সত্ত্বেও কোনো নক্ষত্র অপর নক্ষত্রের মুখোমুখি হয়নি। এই বিশাল মহাশূন্যে কোনো নক্ষত্রের কক্ষপথ একচুল পরিমাণও বাঁকা হয় না। তাই মহান আল্লাহর বাণী الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ بِحُسْبَانٍ “সূর্য ও চন্দ্র পরিকল্পিত অবস্থানে রয়েছে।”- (সূরাহ আর-রহমান)। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার এ যুগেও সম্পূর্ণ সত্য বলে প্রমাণিত।
মহান আল্লাহর এই সুউচ্চ বিশাল আকাশের বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো মানুষের উদাসীন মনকে সচেতন করা এবং যে সত্ত্বা এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন তাঁর অপার ক্ষমতা সম্পর্কে তাকে অবহিত করা। অতএব এই ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে গর্ব-অহংকার করার কিছুই নেই; বরং তার উচিত মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে তাঁর অনুগত বান্দা হওয়া।
৬২তম আয়াত : দিন ও রাতের পরিবর্তন মহান আল্লাহর এক বিশাল নিদর্শন
وَهُوَ الَّذِي جَعَلَ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ خِلْفَةً لِمَنْ أَرَادَ أَنْ يَذَّكَّرَ أَوْ أَرَادَ شُكُورًا.
“এবং যারা উপদেশ গ্রহণ করতে ও কৃতজ্ঞ হতে চায়, তাদের জন্য তিনিই রাত্রি এবং দিনকে পরস্পর অনুগামীরূপে সৃষ্টি করেছেন।”
অর্থাৎ দিন ও রাতের আবর্তন সম্পর্কে যারা চিন্তা গবেষণা করে তারা এ থেকে প্রথমত আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষা লাভ করতে পারে। তাদের মনে স্বাভাবিকভাবেই জাগ্রত হয় যে, সুদূর অতীত কাল থেকেই যে একই নিয়মে দিন-রাত একে অপরের অনুগমন করছে, এটা নিশ্চিত কোনো একক ¯্রষ্টা ও সুবিজ্ঞ পরিচালকের কাজ। এ চিন্তা তাকে তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী বানায় এবং আল্লাহর অনুভূতি তার মধ্যে জাগ্রত হয়। ফলে সে আল্লাহর শোকর গুযার বান্দায় পরিণত হয়।
আমরা জানতে পেরেছি যে, পৃথিবী গতিশীল। মহাকর্ষ শক্তির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে সূর্যকে কেন্দ্র করে পৃথিবী নিজ অক্ষে বা মেরুরেখায় পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে আবর্তন করছে। এভাবে আবর্তন করতে পৃথিবীর প্রায় ২৩ ঘন্টা ৫৬ মিনিট ৪ সেকে- অর্থাৎ প্রায় একদিন সময় লাগে। পৃথিবীর এ গতিকে আহ্নিক গতি বা দৈনিক গতি (Milky Way) বলে। আহ্নিক গতির ফলে দিন ও রাত হয়। পৃথিবীর নিজস্ব আলো নেই। সূর্যের আলোতে পৃথিবী আলোকিত হয়। পৃথিবী গোলাকার বলে সূর্যের আলো একই সময় ভূপৃষ্ঠের সকল অংশে পড়ে না। আবর্তনের সময় যে অংশে আলো পড়ে সে অংশে দিন এবং যে অংশে অন্ধকার থাকে সে অংশে রাত হয়। এভাবেই দিন-রাত হয়ে থাকে। আহ্নিক গতি না থাকলে পৃথিবীর একদিক চিরকাল অন্ধকার থাকতো ও অপরদিক আলোকিত হয়ে থাকতো।
পর্যায়ক্রমে দিন-রাত সংঘটিত হওয়ার ফলে আমরা দিনের বেলায় কাজ করি, আর রাতে বিশ্রাম নেই অর্থাৎ ঘুমাই। নিশাচর প্রাণী ছাড়া প্রায় সব প্রাণীই এ রুটিন মেনে চলে। মহান আল্লাহ দিন ও রাত সৃষ্টির কারণ সম্পর্কে বলেন,
وَجَعَلْنَا نَوْمَكُمْ سُبَاتًا . وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ لِبَاسًا. وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا.
“আমি তোমাদের নিদ্রাকে করেছি ক্লান্তি দূরকারী। রাত্রিকে করেছি আবরণ এবং দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।” (নাবা : ০৯- ১১)
রাত ও দিন আমাদের জন্য বিশাল নিয়ামত। মহান আল্লাহ এর মাধ্যমে সৃষ্টিকুলের জন্য নানাবিধ কল্যাণ দান করেছেন। চিন্তাশীল ব্যক্তিদের জন্য এর মধ্যে রয়েছে অনেক শিক্ষণীয় বিষয়।
আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, ঘুম ও জেগে ওঠার ব্যাপারটা মূলত নিয়ন্ত্রণ করে মেলাটোনিন নামের হরমোন। এটি শরীর থেকে নি:সরণ না হলে ক্যান্সার, ডায়াবেটিক, অকালমৃত্যুসহ নানাবিধ জটিল রোগ সৃষ্টি করে। আলোতে মেলাটোনিন সঠিকভাবে নিঃসৃত হতে পারে না। আর আলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস সূর্য। ফলে আলোর তীব্রতা যখন থাকে না বা আলোর অনুপস্থিতিতে এ হরমোন পর্যাপ্ত পরিমাণে নিঃসৃত হতে পারে। এতে ওই সময় আমাদের শরীর ‘রিল্যাক্স্ মোডে’ অবস্থান করে এবং ঘুম পায়। সুতরাং রাত বা আলোহীন পরিবেশেই ঘুম ভাল হয়। বি স্বাস্থ্য সংস্থার ক্যান্সার বিষয়ক গবেষণা বিভাগ International agency for research on cancer-এর মতে, রাত জাগা মানুষদের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। অর্থাৎ রাতের ঘুম অত্যন্ত প্রয়োজনীয় এবং এটি কোনোভাবেই দিনের বেলায় ঘুমিয়ে পুষিয়ে নেওয়া যায় না। যুক্তরাজ্যের একদল গবেষকের মতে, যারা দেরিতে ঘুমায় ও দেরিতে ঘুম থেকে ওঠে, তাদের অকালমৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ ছাড়া নানাবিধ জটিল রোগের সৃষ্টি করে।
রাতের ঘুম মহান আল্লাহর এক বিশাল নিয়ামত। বেশি রাত জেগে দিনে নিদ্রা যাওয়া ইসলামী ও স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ঠিক নয়। মহান আল্লাহ বলেন,
أَلَمْ يَرَوْا أَنَّا جَعَلْنَا اللَّيْلَ لِيَسْكُنُوا فِيهِ وَالنَّهَارَ مُبْصِرًا إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ
“তারা কি দেখেনি যে, আমি রাতকে সৃষ্টি করেছি যেনো তারা তাতে সুখ ও শান্তি ভোগ করে আর দিনকে সৃষ্টি করেছি উজ্জ্বল হিসেবে। নিঃসন্দেহে এতে মু’মিনদের জন্যে নিদর্শন রয়েছে।”
(সূরাহ নামল : ৮৬)
ক্লান্তি শেষে শক্তি জোগাতে এবং অলসতার পরে নতুন করে কর্মে উদ্যমতা সৃষ্টি করতে ঘুমের বিকল্প নেই। এটি শরীর থেকে হারানো উত্তেজনা ও জীবনী শক্তি ফিরে আনে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) এশার সালাতের পর তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যেতেন এবং রাতের শেষভাগে উঠে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করতেন। আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এশার সালাতের পর ঘুমাতে পছন্দ করতেন। তিনি এশার পর কথা বলা পছন্দ করতেন না। অতএব আমাদেরও উচিত হবে রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানো ও শেষরাতে তাড়াতাড়ি উঠার অভ্যাস করা।
মহান আল্লাহ রাতকে প্রশান্তিময় ও পোষাক স্বরূপ সৃষ্টি করেছেন এবং দিনকে জীবিকা অর্জনের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাই সূরাহ আল-ফুরকানের ৪৭তম আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তিনিই আল্লাহ যিনি রাতকে তোমাদের জন্যে পোষাকস্বরূপ, ঘুমকে সুখ ও শান্তির জন্যে এবং দিনকে (রুজীর সন্ধানে) ছড়িয়ে পড়ার জন্যে সৃষ্টি করেছেন।”
পোষাক যেমন মানুষের শরীরকে ঢেকে রাখে, গরম ও ঠান্ডা হতে এবং লজ্জাস্থানের প্রতি দৃষ্টিগোচর হওয়া থেকে রক্ষা করে তেমনিভাবে রাতও মানুষকে অপর মানুষ থেকে গোপন করে। আর রাতের অন্ধকারে মানুষ গভীর ঘুমে মগ্ন থাকে। রাত মানবদেহকে কষ্ট ও ক্লান্তি থেকে নিরাপদ রাখে। যদি অন্ধকারের এ পোষাক না হত, তবে মানুষ এভাবে ঘুমাতে পারত না এবং এরূপ প্রশান্তি পেত না। সুতরাং অন্ধাকারে শিরা-উপশিরাগুলো প্রশান্ত হয়, দৃষ্টি শীতল হয়, চিন্তা-চেতনা নতুনত্ব লাভ করে, সুক্ষè চিন্তা ভাবনায় মানুষ গভীরতা লাভ করে। মহান আল্লাহ বলেন, (وَجَعَلَ اللَّيْلَ سَكَنًا) “তিনিই রাতকে আরামদায়ক বানিয়েছেন।” (আন‘আম : ৯৬)। নিশ্চয়ই এতে রয়েছে, জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন। (আলে ইমরান : ১৩)
রাতের বিপরীতে দিনকে কর্ম ও জীবিকা উপার্জনের জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠা সম্পদ ও জ্ঞানের জন্য অন্যতম শর্ত। বলা যায় সফলতার চাবিকাঠি। কেননা ভোররাতে বা দিনের শুরুতে সবচেয়ে বেশি কল্যাণ থাকে। শুধু ইবাদত-বন্দেগিই নয়, দুনিয়াবি কাজের জন্যও এটি সবচেয়ে উপযুক্ত ও বরকতময়। মহান আল্লাহ বলেন, (وَجَعَلْنَا النَّهَارَ مَعَاشًا) আমি দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।” (সূরা নাবা : ১১) অর্থাৎ নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা দিনকে করেছেন জাগরণ, জীবন, জীবিকা উপার্জনের ও চলাচলের সময়। আল্লাহ তা‘আলা দিনকে সুউজ্জল আলোকিত করেছেন, আর তা থেকে প্রাণ জাগ্রত হয় এবং জীবন পরিচালার মূলনীতি গুলো সেখানে প্রবাহিত হয়।
রাসূলুল্লাহ (সা.) সকালের সূর্য ওঠার পর ঘুমানোকে রিজিকের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করতেন। তিনি ভোরবেলার কাজের জন্য বরকতের দু‘আ করেছেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সকালবেলায় রিজিকের অন্বেষণ করো। কেননা সকালবেলা বরকতময় ও সফলতা অর্জনের জন্য উপযুক্ত সময়।”
ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ (সা.) বলেন, একদা আমার পিতা রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার ঘরে এসে আমাকে ভোরবেলায় ঘুমন্ত অবস্থায় দেখলেন। তখন তিনি আমাকে পা দিয়ে নাড়া দিলেন এবং বললেন, মামুনি! ওঠো, তোমার রবের পক্ষ থেকে রিজিক গ্রহণ কর। অলসদের দলভূক্ত হয়ো না। কেননা আল্লাহ সুবহে সাদিক থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত মানুষের মধ্যে রিজিক বন্টন করে থাকেন।
(আত-তারগিব ওয়াত তারহিব-২৬১৬)
অতএব দিন ও রাতের মাধ্যমে বিশ^বাসীর জন্য মহান আল্লাহ বহুবিধ কল্যাণ দান করেছেন। এ কল্যাণসমূহ উপলব্ধির মাধ্যমে কৃতজ্ঞ বান্দাহ হওয়া আবশ্যক।

শিক্ষা
– মহান আল্লাহ মহাকাশে অসংখ্য বিশালাকার নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ সুচারুরূপে সৃষ্টি করেছেন। এ সবের সৃষ্টি এবং সুব্যবস্থাপনা মহান আল্লাহর একক অস্তিত্বের প্রমাণ।
– বিশ্ববাসীর কল্যাণে রাত ও দিন সৃষ্টি এবং এ দু’য়ের পরস্পর অনুগামীও মহান আল্লাহর একক অস্তিত্বের আরেক নিদর্শন।
– মহান আল্লাহর বিশ্বপরিম-ল সৃষ্টি সম্পর্কে চিন্তা গবেষণার মাধ্যমে তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে হবে।
– আল্লাহর দেয়া অসংখ্য নিয়ামতের জন্য তাঁর প্রতি শোকর আদায় করতে হবে।

লেখক : প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply