রাজনৈতিক মিথ্যাচারের শেষ কোথায়?

মুহাম্মদ আবদুল জববার

মিথ্যা শব্দটি সকলের কাছে ঘৃণিত। যিনি মিথ্যা বলেন তিনিও মিথ্যাকে ঘৃণা করেন। ব্যক্তি নিজেকে পরিচ্ছন্ন প্রমাণ করতে গিয়ে মিথ্যার বেড়াজালে আচ্ছন্ন হয়ে যান। মানুষ মাত্রই নিজেকে অপরের কাছে খাটো হতে চান না। যত দোষ নন্দ ঘোষ। নিজের দোষ কেউ ঘাড়ে টানতে চায় না। ইনিয়ে-বিনিয়ে, রং-ঢং মিশিয়ে, অসত্য বলে নিজেকে হিফাজত করতে চায়। একটি মিথ্যা কথা আরো দশটি মিথ্যা কথা বলার পথনির্দেশ করে। মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে সত্যকে ঢেকে রাখতে চাইলেও একদিন সত্য হিসেবে প্রকাশিত হবেই।
মিথ্যার পরিণাম ধ্বংস। মিথ্যাবাদী রাখালের কথা সবার জানা আছে। তার আহবানে প্রথমদিকে কিছু পথচারী সাড়া দিলেও রাখাল মিথ্যাবাদী প্রমাণিত হওয়ায় যেদিন সত্যিকারার্থে বাঘ তাকে আক্রমণ করলÑ সেদিন অনেক কাকুতি-মিনতি করে বাঘ… বাঘ.. বাঁচাও… বাঁচাও বললেও তাকে কেউ বাঁচতে আসেনি। যার পরিণতি ছিল অপ্রত্যাশিত মৃত্যু।
আমাদের সমাজে এই অপ্রত্যাশিত কালচার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। ভিন্নমতের যে কাউকে আক্রমণ করা বা অপমানিত করাই যেন আমাদের কালচার। এ কালচার থেকে রেহাই পায়নি আমাদের জাতীয় রাজনীতিও।
মিথ্যাচারের কারণে কত মানুষের জীবন ক্ষত-বিক্ষত। বছরের পর বছর বিনা অপরাধে কারাবরণ করছে কত মানুষ, তার কোন ইয়ত্তা নেই। এদেশের ইতিহাসে খোঁজ মেলে কত জজ মিয়ার! এসব মিথ্যাচারের বীভৎস চিত্রগুলো চোখের পর্দায় ভেসে আসলে গা শিউরে ওঠে, ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে ওঠে, এ দেশে জন্মই যেন বৃথা মনে হয়।
কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা নিজকে মাঝে মাঝে খুব তাড়া করে বেড়ায়। যোগ-বিয়োগ করে কোন উত্তর খুঁজে পাই না। তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। প্রশ্ন জাগে এর কোনো সমাধান কি নেই?
কথাগুলো শুনতে অনেকটা গণতান্ত্রিক মনে হলেও এর গভীরতা অনেক বেশি। বেদনাবিধুর ও কষ্টক্লীষ্ট।
তখন অনার্স প্রথম বর্ষে পড়তাম। শুনলাম কলেজ আঙিনায় দু’টি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে, আর এ মামলায় আমার বড় ভাইকে আসামি করা হয়েছে। সে সেদিন কলেজেও যায়নি। তাকে গ্রেফতার করা হলো, মানবেতর দীর্ঘ ৩ মাস কারাভোগ করতে হলো। এ দায়সারা গোছের দায়িত্ব পালন কেন? কার স্বার্থে? একজন নাগরিকের জান-মালের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। যার যতটুকু অপরাধ আইনের আলোকে অপরাধী সে ততটুকু শাস্তি পাবে এটাই স্বাভাবিক। পরে শুনেছিলাম কারো চাপে বাধ্য হয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষ কিছু নির্দোষ ছাত্রকে দায়ী করে মামলা করে।
দেশে প্রতিনিয়ত অনেক ঘটনার বাস্তব সাক্ষী সচেতন বিবেক সমাজ। যে কোন ঘটনা ঘটার পরে প্রকৃত দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, অথচ নিরপরাধ নাগরিকের ওপর বিনা হিসেবে পুলিশের নির্মম প্রহার রিমান্ড জেল জুলুম চলছেই। মন্ত্রীর মুখ থেকেও শোনা যায় জেলে গেলে কি হবে? কয়েকদিন পরে ছেড়ে দেবে। এ কেমন কথা? বিনা অপরাধে একজন নাগরিককে কেন জেলে যেতে হবে, কেন তার স্বাধীনতা খর্ব করা হবে। সন্দেহÑ রাজনৈতিক কর্মী! হিউম্যান রাইটচ ওয়াচসহ মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারের এহেন কুকর্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেও কার কথা কে শোনে। বিরোধী দলের কোন সভা সমাবেশ করলেই আইন শৃঙ্খলা নষ্ট হয়! অথচ এ বছরের ১২ মার্চ বিরোধী দলের সমাবেশকে সামনে রেখে মহাজোট সরকার ৩ দিন ধরে অঘোষিত হরতাল দিয়ে জনজীবন স্তব্ধ করে, ১১ জুন ১৮ দলের গণসমাবেশে আগত নেতাকর্মীদের ওপর সরকারের লালবাহিনী সদরঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এতে কি আইন শৃঙ্খলা বিঘœত হয়নি? বিরোধী দল হরতাল ডাকলে কোনভাবেই মিছিল মিটিং করতে দেয়া হয় না অথচ নিজের দলের নেতাকর্মীদের পুলিশি প্রহরায় শো-ডাউন করে জনমনে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এটিও কি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নমুনা!
বিরোধী দলের কর্মসূচি মানেই বাধা, পুলিশের লাঠিচার্জ, ১৪৪ ধারা জারি অথবা সরকারি দলের আক্রমণ। তারপর ধরপাকড়। মামলা-জেল জুলুম। জামিনের পর শ্যোন অ্যারেস্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপরও ২১ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সামনে ক্ষমতায় আসার স্বপ্ন! এসব কাণ্ডজ্ঞানহীন নির্বুদ্ধিতা জাতির আগামীর পথচলাকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। ৪১ বছর কেন? শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়েও আমাদের দুঃখ-দুর্দশা আকাল দূর হবে না। যদি এসব ঘোড়া রোগ থেকে জাতির কর্ণধারকে সুস্থ করে তোলা না যায়।
কয়েকদিন আগে বিরোধী দল হরতাল ডেকেছিল। সচিবালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে বোমা হামলার ঘটনায় ১৮ দলের অসংখ্য নেতাকর্মীর নামে মামলা দেয়া হলো। তারপর কোর্টে অ্যারেস্ট। অথচ এই ঘটনার দিন অনেকেই ছিলেন রাজধানীর বাইরে। এসব হাস্যকর। রাজনীতি ও বিচারালয়ের প্রতি জনগণের আস্থার পরিবর্তে ঘৃণা জন্মাবে।
সম্প্রতি সাগর-রুনি সাংবাদিক রহস্যজনক খুনের কোন কূল-কিনারা করতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পরদিন শুনলাম যে, পুলিশ কয়েকজন সন্দেহজনক হিরোঞ্চিকে গ্রেফতার করেছে। অথচ মূল আসামি ধরা- ছোঁয়ার বাইরে। এভাবে কত হত্যাকাণ্ড স্বাধীনতার ৪১ বছরে ঘটল সকল সরকার তদন্তের নামে আইওয়াশ করে কিন্তু অধিকাংশ হত্যা মামলার আসল সুরত জাতির সামনে অস্পষ্ট থেকেই গেল।
এখন শুরু হয়েছে নতুন সংস্কৃতিÑ গুম করে ফেলা। এ সরকারের আমলে প্রায় ৯ শতাধিক মানুষ গুম হয়েছে। এদের একটা অংশ ফিরছে লাশ হয়ে। নালা-নর্দমায় যাদেরকে পাওয়া গেছে। আর একটা অংশের সন্ধান মিলেনি। এসব পরিবারের অর্তনাদে জাতি বাকরুদ্ধ। ঔপনিবেশিক কায়দায় নাগরিকদের যখন-তখন ধরে নিয়ে যাওয়া এবং অত্যাচার-নির্যাতন, হুমকি-ধমকি দিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী আদায় করে বিচারের আগেই অভিযুক্তকে দোষী প্রমাণের এই চর্চা বড় ধরনের ক্ষতি করবে।
কার স্বার্থে এসব গুম, টর্চার? অপরাধী যত বড়ই হোক না কেন তার জন্য আইন আছে, আছে আদালত। তার নাগরিক অধিকার যদি আমরা রাষ্ট্রকে ক্ষুণœ করতে সানন্দে রাজি হই সকল নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্র ক্ষুণœ করতে মোটেও দ্বিধা করবে না।
কারো বিরুদ্ধে যে কোনো পক্ষের অভিযোগ উঠলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে তাকে নাগরিকের চোখে অপরাধী সাব্যস্ত করার প্র্যাকটিস মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিতে অন্যায়। একজন ব্যক্তির যত বড় অপরাধই করুক না কেন যদি তার নাগরিক অধিকার ক্ষুণœ করে আগেই অপরাধী বলে চিহ্নিত করার বেড কালচার প্র্যাকটিস করি তাহলে আইন-আদালত-সংবিধানের কী দরকার? এতে সমাজব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। নিরপরাধ কত জজ মিয়ার আর্তচিৎকার গুমরে মরবে কাল থেকে কালান্তরে। মানবতা আর মানবাধিকারের খোলস পরিবৃত পৃথিবী জ্বলতে থাকবে অশান্তির আগুনে দাউ দাউ করে।
কিছু সুবিধাবাদী লোক ক্ষমতার অপব্যবহার করতে সদা তৎপর। সরকার পুলিশ প্রশাসনকে অপব্যবহার করে আইনের রক্ষকদেরকে জনগণের সামনে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। সম্প্রতি র‌্যাব-পুলিশসহ প্রশাসনের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে ক্রসফায়ার, গুম, লুণ্ঠন ইত্যাদিসহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের।
আজকে কর্তাব্যক্তিদের ভাবার সময় এসেছে। এভাবে একটা দেশ চলতে পারে না। ৪১ বছরে আমাদের অর্জন শুধুমাত্র বিরক্তি ও তিক্ততার। এসবের অবসান হওয়া উচিত।
রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যেন শুধু নিজের দলের ডুগডুগি বাজানোর খাতিরে রাজনীতি না করে দেশ ও দশের জন্য করেন। সরকারের ভালো কাজকে সাদুবাদ জানায়, আবার বিরোধী দল যখন সমালোচনা করে সরকার নিজের সংশোধনের জন্য যৌক্তিক দিকগুলো গ্রহণ করা উচিত। সরকারের মনে রাখা উচিত বিরোধী দল সরকারের অংশ। শুধু রাজনীতির জন্য বিরোধিতা এটি সুষ্ঠু রাজনীতির পরিচয় বহন করে না।
নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য বিরোধী দলকে জেল-জুলুম দিয়ে দমন করা সরকারের কোনোভাবেই উচিত নয়। বরং নিরপরাধ ব্যক্তিদের ওপর অকারণে হয়রানি সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করে এবং সরকারের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়।
দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলকে একাট্টা হয়ে কাজ করা জরুরি। নচেৎ দেশের অভ্যন্তরে গোলমাল পাকাতে বহিঃশত্র“ সদা তৎপর থাকে।
র‌্যাবকে যখন সরকার গঠন করেছিলÑ স্পেশাল ফোর্স হিসেবে তার যাত্রা। বিশেষ করে জঙ্গি দমনসহ বিশেষ অভিযানের জন্য। বর্তমানে তাদের যত্রতত্র ব্যবহার করে তাদের বিশেষত্ব ম্লান হতে চলেছে। বিডিআর এখন বিজিবি। প্রতিনিয়ত সীমান্তে বিএসএফ বাংলাদেশী হত্যা করছে। কিন্তু কোনো অদৃশ্য ইশারায় তারা কোন ভূমিকা রাখছে না।
পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ আছে, তা সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলকে ভাবতে হবে। যাদের ওপর জনগণের জানমালের নিরাপত্তা তাদেরকে প্রয়োজীয় সুযোগ-সুবিধা ও সম্মান বাড়ানো জরুরি।
অপর দিকে পুলিশকে চিন্তা করা উচিত এদেশের ভুখা-নাঙ্গা মানুষগুলোর ট্যাক্সের টাকায় তাদের বেতন দেয়া হয়। সুতরাং প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা-সম্ভ্রম রক্ষার দায়িত্ব তাদেরই।
সবাই মিলে আমদের প্রিয় মাতৃভূমির অগ্রগতির হাল ধরা প্রয়োজন। আর নয় মিথ্যা আর লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি, ভিন দেশের পদলেহন। সবাই নিজের কর্তব্য সচেতনতা জবাবদিহিতার দ্বারকে উন্মোচিত করে এক শান্তির বর্ণিল সোনালি দেশ গঠনে সিদ্ধহস্ত হই।

লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির
E-mail: zabbarics@gmail.com

SHARE

Leave a Reply