post

অপপ্রচার মোকাবিলায় মিডিয়া জিহাদে আমাদের দায়িত্ব

আব্দুদ্দাইয়ান মুহাম্মদ ইউনুছ

২০ মার্চ ২০২৩

ইসলামের জিহাদ ও প্রচলিত যুদ্ধ (হারব বা কিতাল) এর মাঝে অনেক পার্থক্য আছে। এখানে পরিভাষাগত পার্থক্য আছে। আর এ পরিভাষাগত পার্থক্য থেকেই জিহাদ ও হারবের প্রকৃতিগত পার্থক্য অনুমান করা যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে  জিহাদ ও হারবের পরিভাষা অনেক মুসলমানের কাছেও পরিষ্কার নয়। তাই তাঁদের লেখনী বা বক্তব্যে জিহাদের তাৎপর্য সঠিকভাবে পরিস্ফুটিত হচ্ছে না। আবার মুসলমানদের কেউ কেউ জিহাদের সত্যিকার স্পিরিট থেকে দূরে। তাঁদের কথা ও জীবন জিন্দেগি দেখলে মনে হয় জিহাদ শুধু আল্লাহর রাসূলের জীবনে ছিল-বর্তমানে কিতাবুল মাগাজি ইতিহাসের মতো অধ্যয়নের বিষয়। অতএব, পাশ্চাত্যের মুসলমানদের কাছে জিহাদের প্রকৃত তাৎপর্য পরিষ্কার থাকতে হবে। আমাদেরকে বলিষ্ঠতার সাথে এই কথা তুলে ধরতে হবে যে ইসলাম এসেছে অন্যায় দমন ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য। একজন মুসলমান যদি কোনো অমুসলিমের প্রতি অন্যায় করে ইসলাম তা সমর্থন করে না। একজন অমুসলিম যদি কোনো মুসলিম দ্বারা অত্যাচারিত হয় অত্যাচারিত অমুসলিমের পক্ষে দাঁড়ানোই ইসলামেই শিক্ষা। ইসলামের ইতিহাস পড়লে দেখা যায় একজন অমুসলিম হিন্দু রমণীর সতীত্ব রক্ষার জন্যই হজরত শাহজালাল রাজা গৌর গোবিন্দের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছিলেন। স্পেনের অত্যাচারী রাজা রডারিকের অত্যাচার থেকে মাজলুম মানুষদেরকে রক্ষা করার জন্যই স্পেনে মুসলমানরা এসেছিল।

বর্তমানে জিহাদ শব্দটির বিকৃত বিশ্লেষণের ফলে মুসলমানদের কেউ কেউ এ শব্দটি উচ্চারণ করতেও ভয় পান। তাই আমাদেরকে জিহাদ শব্দের সত্যিকার তাৎপর্য জানতে হবে এবং এই কথা পরিষ্কার করতে হবে যে ইসলামের স্বীকৃত জিহাদের সাথে সন্ত্রাসবাদের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলাম এসেছে সন্ত্রাস নির্মূল করে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে আমাদের পরিচয় হচ্ছে আমরা উম্মতে ওয়াসাত তথা মধ্যমপন্থী জাতি। তাই আমাদের চিন্তা-চেতনা, বিশ্বাস ও কর্মে এর প্রতিফলন হওয়া উচিত। উগ্রতা কিংবা সীমালংঘন ইসলাম আদৌ সমর্থন করেনি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বর্তমানে মুসলমানদের কারো কারো মাঝে জিহাদি চেতনার নামে উগ্রতাও কাজ করছে। কেউ কেউ জিহাদি চেতনার নামে পাশ্চাত্যের সাথে সব সময় টক্কর লাগানোকেই নেকির কাজ মনে করেন। তাদের মধ্যে দ্বীনের সত্যিকার দাওয়াতি কাজের তুলনায় সংঘাত সংঘর্ষ সৃষ্টির মানসিকতা বেশি। আবার কেউ কেউ ইসলামের স্বার্থের চেয়ে ইসলাম বিরোধীদের স্বার্থ রক্ষার কাজেই ব্যস্ত; মূলত ইসলাম বিরোধীদের ক্রীড়নক হিসাবে তাদের পরিকল্পনাতেই কিছু সংগঠন সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালায়। আর তাকেই মিডিয়াতে জিহাদি কার্যক্রম হিসেবে প্রচার করছে। আবার কেউ কেউ মুসলমানদেরকে নিছক ধর্মীয় একটি গোষ্ঠী হিসাবে বেঁচে থাকার জন্য দাওয়াত ও তাবলিগের কাজ নিয়েই ব্যস্ত। তাদের কাছে ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মানুষদের কান্নার আওয়াজের মূল্য নেই। বসনিয়া, চেচনিয়া, আফগান, কাশ্মিরসহ বিশ্বের নির্যাতিত মানবতার হাহাকার চিৎকার তাদের কানে পৌঁছে না।

অপর দিকে পাশ্চাত্যে ইসলাম ও জিহাদ সম্পর্কে নানা অপপ্রচার চলছে। এ অপপ্রচার নতুন করে শুরু হয়নি। অনেক আগ থেকেই প্রচারমাধ্যমের বদৌলতে তারা ইসলাম ও জিহাদ সম্পর্কে ভ্রান্তধারণা বিশ্ববাসীর সামনে পেশ করে আসছে। তারা অপপ্রচার চালাচ্ছে যে, ইসলাম তরবারির মাধ্যমে তথা শক্তি প্রয়োগ করে বিস্তার লাভ করছে। তাদের এ অপপ্রচারের জবাবে মুসলমানদের কেউ কেউ আত্মরক্ষামূলক বক্তব্য দিয়ে দোষ খণ্ডনের চেষ্টা করেছেন। এমনকি তারা ইসলামের জিহাদ ও কিতাল সংক্রান্ত বক্তব্যকে মনগড়াভাবে পেশ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। এ প্রসঙ্গে মাওলানা মওদূদী (রহ) তাঁর আল-জিহাদ বইতে বলেন, ‘ইসলামের সাফাই দিতে গিয়ে তারা ইসলামবিরোধী লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নিজেরাই নিজেদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন এবং অপরাধীর মতোই দোষ স্খলনের চেষ্টায় নিয়োজিত হয়েছেন। তারা জিহাদ ও কিতাল সংক্রান্ত ইসলামের নীতিমালাকে যথাযথভাবে তুলে ধরেন না। বরং এর অনেকগুলো দিক এমন অস্পষ্ট রেখে দেন, তাতে সন্দেহ সংশয়ের প্রচুর অবকাশ থেকে যায়। আসলে ভুল ধারণার অপনোদনের জন্য প্রয়োজন ছিল আল্লাহর পথে জিহাদ ও আল্লাহর বিধানকে সমুন্নত রাখার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধ সম্পর্কে ইসলামের যা আইন ও বিধান আছে তা কুরআন, হাদিস ও ফিকহের গ্রন্থাবলি অধ্যয়ন করে জানা। 

শক্তিশালী মিডিয়া সময়ের অনিবার্য দাবি

আগেকার দিনে চিঠি বা দূত পাঠিয়ে সংবাদের আদান প্রদান হতো। আল্লাহর রাসূল সা. মাঝে মধ্যে পাহাড়ের উপরে উঠে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা প্রদান করতেন যাতে করে দূরবর্তী লোকেরাও তাঁর কথা শুনতে পায় এবং তাঁকে দেখতে পান। রাসূলে কারীম সা. মাঝে মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাটিতে লাঠি দ্বারা চিত্র অঙ্কন করে সাহাবায়ে কেরামকে বুঝাতেন। কাল পরিক্রমায় প্রিন্টেড ও ইলেকট্রনিক এই দুই ধরনের মিডিয়ার সাথে আমরা পরিচিত হই। বর্তমানে এর সাথে যোগ হয়েছে অনলাইন ও সোশ্যাল মিডিয়া। মূলত সংবাদপত্র, রেডিও, টেলিভিশন, লিফলেট, পোস্টার, ওয়েবসাইট প্রভৃতির মাধ্যমে ঘরে বসেই বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের খবর জানা যায়। বিশেষভাবে অনলাইন ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে যেকোনো সংবাদ বিশ্বের আনাচে কানাচে অতিদ্রুত ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এর ফলে জনমত গড়ে ওঠে। অতি সম্প্রতি পৃথিবীর কয়েকটি দেশে সরকার পরিবর্তনে কিংবা সরকারবিরোধী বিক্ষোভে জনমত গঠনে সোশ্যাল মিডিয়া তথা টুইটার, ফেসবুক ও ব্লগ গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজকের তরুণ সমাজ অনলাইন মিডিয়ার প্রতি বেশি আকৃষ্ট। অডিও, ভিডিও, কার্টুন ইউটিউবই ইন্টারনেটে প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুসারে বিশ্বের প্রায় ৮০% মানুষ টেলিভিশন দেখে। অতএব, মিডিয়া বর্তমান বিশ্বকে কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জিম মরিসন যথার্থই মন্তব্য করেছেন যে, Whoever controles the media- controls the mind. 

মিডিয়া কোনো একজন ব্যক্তি, বা সংগঠন কিংবা দেশের ইমেজ বৃদ্ধি বা নষ্ট করার ক্ষেত্রেও বিরাট ভূমিকা পালন করে। একজন ভালো মানুষও মিডিয়ার অব্যাহত অপপ্রচারের ফলে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের কাছে খারাপ মানুষ হিসেবে পরিচিত হতে পারে। আমরা দেখি অনেক সময় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হারিয়ে যায় মিডিয়া কভারেজ এর অভাবে। আর মিডিয়া কভারেজ পেয়ে অনেক নন ইস্যুকে ইস্যুতে পরিণত হতে সময় লাগে না। অখ্যাত যে কোনো ব্যক্তি মিডিয়ার কভারেজ পেয়ে বিশ্ব পরিচিতি লাভ করতে পারে। আফগানিস্তানের কিশোরি মালালা ইউসুফজাই মিডিয়ার বদৌলতেই বিশ্বে এত খ্যাতি অর্জন করেছে। অথচ মালালার মতো লাখো শিশু-কিশোর পৃথিবীর আনাচে কানাচে নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে তার খবরও কেউ জানে না। মিডিয়ার প্রচারণার ফলেই অল্প সময়ে মানুষের মধ্যে কোনো আদর্শ জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারে। আবার কোনো আদর্শ সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় সৃষ্টি হতে পারে। এভাবে বিশ্বজনমত গঠনে মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। 

কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে, বর্তমান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সংস্থাগুলো ইহুদিদের নিয়ন্ত্রণে। রয়টারের ৮০% কর্মকর্তা-কর্মচারী ইহুদি। অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি)-এর ৯০% পুঁজিই ইহুদিদের। আমেরিকান ব্রড কাস্টিং কর্পরোরেশান (এবিসি), ন্যাশনাল ব্রড কাস্টিং সিস্টেম (এনবিএস), ক্যাবল নিউজ নেটওয়ার্ক (সিএনএন), ফ্রান্স নিউজ এজেন্সি, বিবিসি প্রভৃতি সংবাদ সংস্থা ইহুদি নিয়ন্ত্রিত। আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রের মধ্যে লন্ডন টাইমস, ম্যাঞ্চেস্টার গার্ডিয়ান, অবজারভার প্রভৃতি পত্রপত্রিকাও ইহুদি নিয়ন্ত্রণাধীন। ইহুদিরা মুসলমানদের এক নম্বর শত্রু। তাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে মুসলমানদেরকে মৌলবাদী (Fundamentalist), সাম্প্রদায়িক (Communal) বর্বর সন্ত্রাসী (Terrorist) হিসাবে চিত্রিত করে বিশ্বব্যাপী ইসলামের নবজাগরণ ঠেকাতে চায়। মুসলিম দেশগুলোতেও তাদের দালালরা একই পরিভাষা ব্যবহার করে ইসলাম, ইসলামী অন্দোলন ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণায় লিপ্ত রয়েছে। পাশ্চাত্যের মিথ্যা প্রচারণায় মুসলমানরা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েও উল্টো ‘টেরোরিস্ট’ হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে। 

মিডিয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বর্তমানে কাউকে বুঝাতে হবে বলে আমার মনে হয় না। ইসলামের বিরোধিতা যেভাবেই করা হোক না কেন তার মোকাবিলায় ভূমিকা পালন করা মুসলমানদের উপর অপরিহার্য। যদি মিডিয়ার মাধ্যমে ইসলামের বিরোধিতা করা হয় তাহলে মিডিয়ার মাধ্যমে তার জবাব দিতে হবে। যদি সংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিরোধিতা হয় সংস্কৃতির মাধ্যমে তার জবাব দিতে হবে। যদি বুদ্ধিবৃত্তিক কূটকৌশলে বিরোধিতা হয় বৃদ্ধিবৃত্তিক কূটকৌশলে তার জবাব দিতে হবে। কলমের মাধ্যমে বিরোধিতা হলে কলমের মাধ্যমে জবাব দিতে হবে। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বিরোধিতা হলে শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘শত্রুর মোকাবিলার জন্য যত বেশি সম্ভব যুদ্ধসরঞ্জাম ও সদাপ্রস্তুত অশ্ব বাহিনী সংগ্রহ করে রাখ। এসব নিয়ে তোমরা আল্লাহর শত্রুদের এবং তারা ছাড়া আরও কিছু লোককে যাদের তোমরা চেননা, আল্লাহ চেনেন, ভীত ও সন্ত্রস্ত করে দিতে পারবে। এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য তোমরা আল্লাহর পথে যা কিছু ব্যয় কর তা তোমরা পুরোপুরি ফেরত পাবে। তোমাদের উপর কোনোক্রমেই জুলুম করা হবে না।’ (সূরা আনফাল : ৬০)

আল্লাহ তায়ালা এখানে কুওয়াত বা শক্তি অর্জনের কথা বলেছেন। বর্তমানে আধুনিক যে সমরাস্ত্র আছে তার শক্তি, জ্ঞানের শক্তি, অর্থনৈতিক শক্তি সবই এর অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহর রাসূলের যুগে তীর ও অশ্ব যুদ্ধের জন্য প্রয়োজন ছিল তাই তিনি তা সংগ্রহ করেছেন। তাঁর সময় বৈষয়িক প্রস্তুতি কাফেরদের তুলনায় কম থাকলেও এমনটি কখনও হয়নি যে, তিনি আদৌ কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করেননি। তাই ইসলাম বিরোধীদের মোকাবিলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ ও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। 

আফসোসের বিষয় হচ্ছে, অনেকেই শক্তিশালী মিডিয়া নাই কেন তার জন্য নানা ধরনের প্রশ্ন করছেন। অথচ তাঁদের সামনে যখন মিডিয়ার কোনো প্রজেক্ট প্রস্তাবনা দেওয়া হয় তখন তাঁরা বলে বসেন, ‘টাকা মিডিয়াতে ইনভেস্ট করলে কী লাভ হবে?’ অমুক ব্যবসাতে খাটালে এত % লাভ হবে। আমি মনে করি শুধু নগদ জাগতিক লাভ নয় বরং মিডিয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুসলিম ব্যবসায়ীদের একটি অংশকে আন্তর্জাতিক মানের অনলাইন, প্রিন্টেড ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠা করা ও ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া উদ্যোগসমূহকে সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসতে হবে। বর্তমানে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্টেড কিছু মিডিয়াতে ইসলাম ও মুসলমানদের অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় নেহাতই কম। তবে ইউরোপে এখনও মূলধারার কোনো মিডিয়া মুসলমানদের নেই বললেই চলে। তাই মুসলমানদেরকে এই দিকে গুরুত্বের সাথে নজর দেওয়া উচিত।

এ ছাড়া প্রতিনিয়ত মিডিয়াতে ইসলাম সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন উপস্থাপন করা হয়। সে সম্পর্কে ভারসাম্যমূলক জবাব আসা দরকার। কিন্তু এই ক্ষেত্রে মুসলমানদের তেমন কোনো স্পোকসমেন নেই। তাই মিডিয়াতে ভারসাম্যমূলক বক্তব্য তুলে ধরার মতো যোগ্য লোক তৈরি করতে হবে। মিডিয়াতে নেতিবাচক প্রচারণার ফলে অনেক মানুষ বিভ্রান্ত অবস্থায় রয়েছে। তাই ইউরোপীয় মুসলিম হিসাবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে- ইসলামের প্রকৃত রূপ মিডিয়াতে তুলে ধরা। কিন্তু কারো কারো প্রবণতা হচ্ছে বসে বসে শুধু সমালোচনা করা। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে যে সমালোচনা করা সহজ কিন্তু বাস্তব উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং উক্ত উদ্যোগকে সফল করা কঠিন। এ ছাড়া মিডিয়াতে ভূমিকা রাখার মতো যাদের যোগ্যতা আছে তারা প্রতিনিয়ত লেখালেখি করা এবং শক্তিশালী মিডিয়া প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা সময়ের দাবি। 

মিডিয়া কর্মীদেরকে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করা দরকার। আর মুসলমানদেরকেও নিজস্ব মিডিয়া তৈরি করার প্রতি সিরিয়াস হতে হবে এবং মুসলিম মিডিয়া কর্মীদেরকে মেইনস্ট্রিম মিডয়াসমূহে কাজ করার প্রতি আগ্রহী হতে হবে। পাশ্চাত্যের মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা মিডিয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার আসল পথ নয়। এর আসল জবাব হচ্ছে ‘বিকল্প শক্তিশালী মিডিয়া।’ 

মিডিয়াতে নেতিবাচক প্রচারের ইতিবাচক ফল

মিডিয়াতে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণার ইতিবাচক ফলও রয়েছে। পাশ্চাত্যের অনেক চিন্তাশীল মিডিয়াতে ঢালাওভাবে ইসলাম সম্পর্কে বিষোদগার করায় তারা ইসলাম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং তাদের মনের নানা প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করতে গিয়ে সত্যের সন্ধান খুঁজে পান। এ ছাড়া মুসলমানদের একটি অংশ যারা ইসলাম ভালোভাবে জানতো না তারা সহকর্মী ও বন্ধুদের নানা প্রশ্নের সঠিক জবাব জানতে গিয়ে নিজেরা ভালোভাবে ইসলাম জানার চেষ্টা করছে। এর ফলে যেসব মুসলমান আগে ইসলাম অনুশীলন করতেন না তাঁরা ইসলাম অনুশীলন শুরু করেন। যেসব মুসলিম মহিলা আগে হিজাব পরিধান করতেন না তাঁরা হিজাব পরিধান করা আরম্ভ করেন। তাঁদের মাঝে ইসলামের প্রতি মহব্বত ও আকর্ষণ অনেকগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

ইসলাম সম্পর্কে মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণার ফলে অমুসলিম চিন্তাশীলদের কেউ কেউ কুরআন অধ্যয়ন শুরু করেন এবং ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে আমি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিনারে অংশ গ্রহণ করি; তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী এরদোগান উক্ত সেমিনারে মূল বক্তা ছিলেন। রাত দশটার দিকে সেমিনার শেষ হওয়ার পর লন্ডন ফেরার পথে অক্সফোর্ড বিশ্বদিল্যায়ের একজন ছাত্রী ও দুইজন ছাত্রের সাথে পরিচয় হয়। আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে জানলাম উক্ত ছাত্রীর নাম মারইয়াম এবং সে নও মুসলিমাহ। আমি তার কাছে ইসলাম গ্রহণ করার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে জানতে চাইলাম। প্রতি- উত্তরে সে জানায় যে তার বাড়ি ফ্রান্সে। তার পিতা-মাতা ও পুরো পরিবার প্রচণ্ডভাবে মুসলিমবিদ্বেষী ছিল। ৯/১১ এর পর তার পিতা একটি বই তাকে পড়ার জন্য দেয়। উক্ত বইতে মুসলমানদেরকে কুকুরের সাথে তুলনা করে প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা ছড়ানো হয়। মারইয়াম এই ধরনের মন্তব্য পাঠ করার পর চিন্তা করে ‘আসলেই মুসলমানেরা কি এত বেশি খারাপ? সে এই প্রশ্নের জবাব জানার জন্য তার মুসলিম বন্ধুদের সাথে মতবিনিময় করতে আগ্রহী হয়। মুসলিম বন্ধুরা তাকে তাদের সাথে আলাপ-আলোচনার পরিবর্তে তার সকল প্রশ্নের জবাব খুঁজে পাবার জন্য কুরআন অধ্যয়ন করার উপদেশ দেয়। সে তাদের উপদেশমত কুরআন পাঠ করা শুরু করে। কিন্তু প্রথম তিন মাস কুরআন পাঠ করে কোনো মজা অনুভব করেনি। তার মতে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে কুরআন পাঠের চেষ্টা করায় প্রথম তিন মাস সে কোন মজা পায়নি। তিন মাস পর উন্মুক্ত মন-মগজ নিয়ে কুরআন পাঠ শুরু করার পর তার মনে হয়েছে কুরআনের প্রতিটি আয়াত যেন তার মনের নানা প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। এইভাবে ছয় মাস তিলাওয়াত করে কুরআন পাঠ শেষ করে। কুরআন পাঠ করতে গিয়েই সে নিজেকে ‘কুরআনি’ বলে পরিচয় দেওয়া শুরু করে এবং এক পর্যায়ে ইসলাম কবুল করে।  মারইয়াম আল-কুরআন অধ্যয়ন করেই ইসলাম কবুল করে। কিন্তু তার মতে কুরআন পাঠ করে ইসলাম জানার চেষ্টা না করলে তার পক্ষে ইসলাম কবুল করা হয়তোবা সম্ভব হতো না। কেননা কুরআনে ইসলামের যেসব বিধান চমৎকারভাবে বিবৃত আছে তা খুব কম মুসলমানই অনুসরণ করে। 

উপরের ঘটনা থেকে এই বাস্তব সত্য ফুটে উঠেছে যে, অনেক অমুসলিম ইসলাম সম্পর্কে পরিচালিত অপপ্রচারের জবাব খুঁজতে গিয়েই ইসলামের সুমহান আদর্শের সন্ধান পায়। এ ছাড়াও মুসলমানদের সাথে ওঠা-বসা, লেন-দেন করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে অমুসলিমদের কেউ কেউ ইসলাম কবুল করছে। অতি সম্প্রতি ইস্ট লন্ডন মসজিদে একটি যুবক ইসলাম কবুল করে। ইসলাম কবুল প্রসঙ্গে সে জানায় যে, দীর্ঘদিন ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সে আরো জানায় যে তার মুসলিম বন্ধুদের চলাফেরা, কথা-বার্তা, ওঠা-বসা, লেন-দেন প্রভৃতি তাকে বিমোহিত করে। এইভাবে অনেক মুসলমান সত্যের সাক্ষ্য হিসাবে নিজেদের জীবন গড়ার চেষ্টা করছেন এবং তাঁদেরকে দেখেই চিন্তাশীল অনেক অমুসলিম এই কথা অকপটে স্বীকার করছেন যে, ‘মুসলিমরা সন্ত্রাসী নয় বরং পরোপকারী।’ 

এই প্রসঙ্গে একটি বাস্তব ঘটনা উল্লে­খ করতে চাই। কিছু দিন আগে যুক্তরাজ্যে একজন অমুসলিম তার ঘর বিক্রির সময় পার্শ্ববর্তী ঘরের চেয়ে তার ঘরের মূল্য ত্রিশ হাজার পাউন্ড বেশি দাবি করে। এজেন্ট বেশি মূল্য চাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করার পর তিনি জবাব দেন যে, “আমার পার্শ্বে একজন পরোপকারী মুসলিম ভালো প্রতিবেশী রয়েছেন। তিনি কাউকে কষ্ট দেন না বরং সব সময় প্রতিবেশীর প্রতি যত্নশীল থাকেন। যেকোন স্থানে ঘর কেনা সম্ভব কিন্তু ভালো প্রতিবেশী পাওয়া কঠিন।’ 

মিডিয়াতে অপপ্রচার : ইসলাম ও মুসলমানদের ইমেজ নষ্ট করাই টার্গেট

পাশ্চাত্যে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্টেড মিডিয়াতে অব্যাহতভাবে ইসলাম বিরোধী প্রচারণা পরিচালিত হচ্ছে। কিছু মিডিয়াতে মুসলমানদেরকে টেরোরিস্ট হিসাবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছে এবং ইসলামকে পাশ্চাত্যের জন্য হুমকিস্বরূপ হিসাবে উপস্থাপন করছে। ইউরোপে যে শতাব্দীকাল থেকে মুসলমানদের বসবাস রয়েছে সে কথা প্রকাশ না করে শুধু ইমিগ্র্যান্ট হিসাবে দেখানোর চেষ্টা করছে এবং মুসলমানরা ইউরোপের মূলস্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বলে তারা মনে করে। তাদের প্রচারণা হচ্ছে, ইসলাম আজকের যুগে অচল এবং মুসলমানরা রক্ষণশীল, উগ্র ও টেরোরিস্ট। মিডিয়াতে মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই ধরনের প্রচারণার ফলে মুসলমানদের উপর বিশেষভাবে মুসলিম ছাত্র-ছাত্রীদের উপর গ্যাং অ্যাটাক বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই Q News এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ফুয়াদ নাহদী পাশ্চাত্যের মিডিয়ার সমালোচনা করে বলেন,

 A western news agenda dominated by hostile, careless coverage of islam distors reality and destroys trust. Western reports, when positive, are seen as selective and partisan; when negative, hypocritical and insensitive (Diana Abdel- Maged, The British Media: Fair or biased )

একশ্রেণির পশ্চিমা মিডিয়ার ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক অপপ্রচারের কারণে বাস্তব অবস্থা খারাপভাবে চিহ্নিত হচ্ছে এবং আস্থা নষ্ট করছে। কোনো ইতিবাচক রিপোর্ট প্রকাশ করা হলে তা হয় বাছাইকরা এবং একপেশে। আর যখন কোনো নেতিবাচক বিষয় তুলে ধরা হয় তা হয় মোনাফেকি সুলভ এবং অসংবেদনশীল। (ডায়ানা আবদেল মাজেদ. দি ব্রিটিশ মিডিয়া: ফেয়ার অর বায়াসড)

কিছু মিডিয়া নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নীতি পোষণ করলেও যেকোনো সন্ত্রাসী ঘটনার জন্য মুসলমানদেরকে অভিযুক্ত করার একটা প্রবণতা প্রায় সকল মিডিয়াতেই রয়েছে। যেকোনো ঘটনার জন্য ঢালাওভাবে সকল মুসলমানকে দায়ী করা যৌক্তিক নয়। ইতোপূর্বে সন্দেজনকভাবে বিভিন্ন ঘটনায় যাদেরকে আটক করা হয়েছিল তাদের অনেকেই পরবর্তীতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন; তাঁদের কেহই কথিত ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিল না। তাই সন্ত্রাসের সাথে ইসলাম ও মুসলমানকে ঢালাওভাবে সম্পৃক্ত করার সুযোগ নেই। যেমনিভাবে খ্রিস্টান ও ইয়াহুদি কেউ সন্ত্রাসী কার্যক্রম করলে তার জন্য পুরো খ্রিস্টান বা ইয়াহুদি ধর্মাবলম্বীকে দায়ী করা যায় না। কতিপয় মিডিয়ার প্রবণতা হচ্ছে মুসলমান কেউ সন্ত্রাসের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার সন্দেহের তালিকায় থাকলেও তা যেভাবে ফলাও করে ছাপা হয় অপরদিকে একই ধরনের ঘটনা কোনো নন-মুসলিম করলে তা মিডিয়াতে উপেক্ষা করা হয়। এই স¤র্কে বিগত ৭ই ডিসেম্বর ২০০৯ ‘দি মুসলিম পোস্ট’ পত্রিকায় এইভাবে শিরোনাম করা হয়, Media Silent as non-Muslim bomb makers pleads guilty। উক্ত রিপোর্ট অনুসারে Terence Gavan  নামক ব্রিটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির জনৈক মেম্বার বোমা তৈরিসহ ২২টি ঘটনায় অভিযুক্ত হয়। এর মাঝে ৬টি টেরোরিজম অ্যাক্টের অধীন ছিল। Woolwich Crown Court তাকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেয়। অথচ বোমা সন্ত্রাসের মতো ঘটনায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও ব্রিটিশ মিডিয়া তা উপেক্ষা করে। কিন্তু শুধুমাত্র সন্দেহের তালিকায় থাকার কারণে অনেক মুসলমানের ছবি ফলাও করে ছাপা হয়। Gavan যদি মুসলমান হতো তাহলে প্রায় সকল পত্রিকাতেই সম্ভবত হেডলাইন করা হতো এভাবে ‘Islamic terrorist found guilty of possessibg bomb factory/Evil Muslim bomb maker admits guilty/Mastermind Muslim bomb expert Guilty ... 

বাংলাদেশে কিছু মিডিয়ার নেতিবাচক ভূমিকা 

- আন্তর্জাতিক কতিপয় মিডিয়ার মত বাংলাদেশে কিছু মিডিয়া জঙ্গি, টেরোরিস্ট, আল কায়েদা, তালেবানি রাষ্ট্র ইত্যাদি পরিভাষা একইভাবে ব্যবহার করে। 

- ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের কল্পিত কাহিনী প্রচার করে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সনম্প্রীতি নষ্ট করতে চায়। প্রকৃত সত্য প্রকাশ না করে তারা ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন সম্পর্কে দেশে-বিদেশে নেতিবাচক ধারণা দিতে চায়। তারা ইসলামী আন্দোলন ও তার নেতৃত্ব সম্পর্কে মনগড়া রিপোর্ট প্রচার করছে অথচ তাঁদের বক্তব্য, স্টেটমেন্ট পত্রিকায় ছাপায় না। তারা আওয়ামী-ছাত্রলীগ কর্তৃক মন্দির ভাঙা হলেও জামায়াত-শিবিরের উপর তার দায় বর্তায় অথচ জামায়াত শিবিরের কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় যে মন্দির পাহারা দেয় তার সংবাদ ও ছবি ছাপায় না। 

- অপরাধ সংক্রান্ত সংবাদ বিকৃত করে প্রচার করছে যার ফলে সত্যিকার অপরাধীরা আরও অপরাধ করতে উৎসাহিত হয়। যেমন নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যার পর প্রথমেই জামায়াত-শিবিরের উপর দোষ চাপায়। অথচ ত্বকীর পিতা পরে স্পষ্ট করেই বলে দেন যে, ‘এর সাথে জামায়াত শিবিরের কেউ সম্পৃক্ত নয়। আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাই জড়িত।’ 

- অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশেী হস্তক্ষেপের ক্ষেত্র তৈরি করে। কিছু পত্রিকায় বিদেশেী কয়েকজন রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী-ও বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। 

- কিছু মিডিয়াতে বাংলাদেশকে অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রচারণা চালাতে দেখা যায়। এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জীবনধারা মূল্যবোধ কটাক্ষ করা হয়। দাড়ি টুপি ধারীদেরকে রেডিও টিভিতে নাটক উপন্যাসে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যাতে দর্শকের ঘৃণা জন্মে।

বাংলাদেশের মিডিয়ার নেতিবাচক প্রচারণার ফল-

- আন্তর্জাতিক মিডিয়া সাধারণত লোকাল মিডিয়াকে সোর্স হিসাবে ব্যবহার করে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে নেতিবাচক প্রচারণা চলে যার ফলে প্রকারান্তরে বাংলাদেশের ইমেজ নষ্ট হচ্ছে। 

- জাতি বিভক্ত হয়ে পড়ছে। অথচ দেশ গড়ার জন্য জাতীয় ঐক্য জরুরি।

- জঙ্গিবাদের উত্থান হতে তা সহায়তা করছে।

- জনগণের মধ্যে দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে অথচ বাংলাদেশ হচ্ছে অফুরন্ত সম্ভাবনার দেশ। আমাদের দেশের নদ-নদীতে মাছ আছে; বনে জঙ্গলে কাঠ আছে। জমিতে হরেক রকমের ফসল ফলে। গ্যাস ও কয়লার খনি আছে। এই সকল প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাবার জন্য আছে মানব সম্পদ। 

- পর্নোগ্রাফি যুবচরিত্র নষ্ট করছে। অথচ যুবকরাই হচ্ছে দেশের কর্মক্ষম জনশক্তি। 

মিডিয়াতে নেতিবাচক প্রচারণার কয়েকটি কারণ

- মিডিয়াতে যারা কাজ করেন তাদের অনেকেই বিশ্বাস ও চেতনায় ইসলামবিদ্বেষী। 

- ভিনদেশীদের এজেন্ট হিসেবে কেউ কেউ দায়িত্ব পালন করেন। এই জন্য তারা মাসিক ভাতা পান।

- ব্যবসায়ী মিডিয়া মালিকরা নিজেদের স্বার্থের কারণে একজনের অপরাধ আরেকজনের উপর চাপিয়ে দিয়ে প্রকৃত ঘটনা ধামা চাপা দিতে চায়।

হতাশা বা সমালোচনা নয় প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগ ও সহযোগিতার। আফসোস হচ্ছে মুসলমানদের হাতে প্রচুর সম্পদ আছে। কিন্তু বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকার মতো ইলেকট্রনিক মিডিয়া নেই। দি টাইমস, দি গার্ডিয়ান, দি ইন্ডেপেন্ডেন্স-এর মত আন্তর্জাতিক মানের কোনো পত্রিকা নেই। তাই মুসলমানেরা পাশ্চাত্যে মিডিয়ার আক্রমণ ও অপপ্রচারের শিকার। কেননা অপপ্রচারের জবাব দেওয়ার মতো কোনো শক্তিশালী মাধ্যম মুসলমানদের হাতে নেই। এমতাবস্থায় মুসলিম তরুণ সমাজের যাদের মিডিয়া স্টাডিজ পড়ার আগ্রহ আছে তাদেরকে মিডিয়াকর্মী হিসেবে ক্যারিয়ার গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া সময়ের অনিবার্য দাবি। রেডিও, টিভি ও পত্রপত্রিকায় কাজ করা মুসলিম তরুণ সমাজের একটি অংশের ক্যারিয়ার ফিল্ড হওয়া উচিত। যারা সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকা দরকার। এ ছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি হওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। নিজেদের সাধ্যমতো অনলাইন পত্রিকা, ব্লগ ও ওয়েবসাইট চালু করা যায়। ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক উদ্যোগে মিডিয়া হাউজ করা যেতে পারে। মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের সাথে যোগাযোগ ও সম্পর্ক বৃদ্ধি করে তাদের নানা লেখনীতে নিজেদের কিছু ইস্যু নিয়ে আসার চেষ্টা করা। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট করে সাংবাদিকদের বৃত্তি  ও চিকিৎসাসেবা করা দরকার। গ্লোবাল মিডিয়া মনিটরিং টিম করা প্রয়োজন- তারা বিভিন্ন মিডিয়া মনিটরিং করবেন এবং অনলাইন আর্কাইভ রাখবেন। মিডিয়াতে স্পোকস পারসন হিসেবে বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী একটি গ্রুপ সৃষ্টি করতে হবে। 

মিডিয়ার নাই নাই বলে হা হুতাশ করে যেমনি মিডিয়া অভাব পূরণ করা যাবে না। তেমনিভাবে সফল মিডিয়া গড়ার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ খরচের মানসিকতা না থাকলে মিডিয়া প্রজেক্ট বাস্তবায়ন হবে না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও মিশনারি টার্গেট নিয়ে কিছু মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯০ সালের পর ব্যবসায়ীদের ইনভেস্টমেন্টে কিছু পত্রিকা ও স্যাটেলাইট চ্যানেল চালু করা হয়। বিদেশী সাহায্যেও কিছু মিডিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই তাদের অর্থের অভাব হয় না। আমরা যারা ইসলামী আদর্শে বিশ্বাসী আমাদেরকে নিজের পকেটের টাকা খরচ করেই মিডিয়া করতে হবে। এই ক্ষেত্রে আল্লাহ পাক কিছু ব্যক্তিকে অর্থ উপার্জনের মেধা দিয়েছেন আর কিছু ব্যক্তিকে মিডিয়া কর্মী হওয়ার যোগ্যতা দান করেছেন। মিডিয়াকর্মীদের অনেকের কাছে অনেক সুন্দর পরিকল্পনা আছে কিন্তু উক্ত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ নাই। আর কিছু ব্যক্তির অর্থ আছে কিন্তু তাদের কাছে কোনো প্রজেক্ট নাই। যাদের অর্থ আছে তারা এমন জায়গায় ইনভেস্টমেন্ট করতে চান যেখান থেকে দ্রুত রিটার্ন আসবে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে তা সঠিক। কিন্তু মুসলিম কিছু ব্যবসায়ী/সামর্থ্যবান বিত্তশালী যদি মিডিয়া, রিসার্চ, থিংকট্যাংকসহ জ্ঞান গবেষণার কাজে বিনিয়োগ না করেন তাহলে তাদের অধিক মুনাফার জন্য বিনিয়োগকৃত অর্থ তারা যে ভোগ করতে পারবেন তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? আমি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত অনেক ধনী ব্যক্তির কথা জানি যারা দুনিয়ার মোড়লদের অনুমতি ছাড়া নিজের অ্যাকাউন্ট থেকেও টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না। 

লেখক : বিশিষ্ট কলামিস্ট ও ইসলামী চিন্তাবিদ

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির