অল্পে তুষ্টি উপভোগ্য জীবন -সায়ীদ মোস্তাফিজ

মানুষের চাহিদার শেষ নেই। যত পায়, তত চায়। রাস্তায় বাস করা মানুষটা মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজে। যার বাস করার মতো একটা ঘর আছে, সে খোঁজ করে আরেকটা ঘরের। অসুস্থ মানুষটা শুধুই সুস্থতা কামনা করে, সুস্থ হয়ে গেলে আবার তাকে পাওয়া না পাওয়ার হিসাব কষতে দেখা যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে সম্পদশালী মানুষটাও আরও সম্পদের জন্য অবিরাম ছুটে চলে। মানুষ দিগন্তে ঢলে পড়া আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখে। কিন্তু ছুঁতে পারে না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দিগন্তের দিকে হেঁটেও আকাশের দূরত্ব একই থাকে। এজন্য মানুষের লোভাতুর মনের অবসর মেলে না। সুযোগ হয় না জীবনকে উপভোগ করার। না পাওয়ার বেদনাকাতর রাখে হৃদয়কে। এ ব্যাপারে রাসূল সা.-এর একটি হাদিস উল্লেখ করা যেতে পারে।
রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, কোনো আদম সন্তানের অধীনে যদি দুই উপত্যকা ভর্তি স্বর্ণ থাকে, তবু সে তৃতীয় একটি স্বর্ণ ভর্তি উপত্যকা অর্জনের ইচ্ছা করবে। মাটি ব্যতীত অন্য কিছুই তার মুখ ভর্তি করতে পারবে না।’ (তিরমিজি)
সুখ জিনিসটা সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার। অঢেল সম্পদ সুখের চাবিকাঠি নয়। বাড়ি, গাড়ি টাকা-পয়সা থাকলেই সুখী হওয়া যায় না। ভালো চাকরি, ভালো বেতন মানেই সচ্ছলতা নয়। যে ব্যক্তি মনের বাগানে সুখের চাষ করতে জানে তার এতো কিছু লাগে না। অল্পতেই হয়।
ঘর থেকে বের হলেই চোখে পড়ে অনেক কিছু। নানান পেশা, নানান সমস্যা। মাঝে মাঝে দেখা যায় সুঠাম দেহের অধিকারী কিছু মানুষ। সুন্দর চেহারা। যে দেহ ও চেহারার জন্য আফসোস করে অনেকে। কিন্তু মানুষটার চোখের আলো নেই। পৃথিবীর ফুল পাখি সে দেখে না। কিংবা কিছু পাগল দেখা যায় মাঝে মাঝেই। সব আছে, শুধু বুদ্ধি-বিবেচনার শক্তি নেই। কারও হাত নেই। কারও পা নেই। কেউ অসুস্থ। হাসপাতালের বেডে অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। কারও পরিবার নেই। কখনো পিতার চিকিৎসার জন্য সন্তানকে বা সন্তানের চিকিৎসার জন্য পিতাকে মানুষের কাছে হাত পাততে দেখা যায়। কী নির্মম সে বাস্তবতা!
সবকিছুই আছে। টাকা-পয়সা, যশ-খ্যাতি। লোকে যাকে সুখী মানুষ বলেই জানে। শুধু রাতের ঘুম নেই। এপাশ ওপাশ করতে করতে ফজর হয়। এমন মানুষটা সবকিছুর বিনিময়ে হলেও একটু ঘুম চায়। একটু প্রশান্তির ঘুম!

মানুষের সুখের অন্তরায় আসলে কী? সহজ ভাষায় বললে লোকের চোখে বড় হওয়ার অভিলাষ। মানুষের মাঝে আলাদা পরিচিতি অর্জনের আকাক্সক্ষা। আলোচনায় থাকার অহেতুক প্রচেষ্টাই মানুষের জীবনকে জটিল করে তুলে। তখন আর অল্পতে হয় না। আরও চাই, আরও চাই মন্ত্রের তন্ত্রে গ্রাস করে। অর্থহীন প্রতিযোগিতায় অস্থির হয়ে ওঠে। শুধুমাত্র লোকদেখানোর জন্য স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতাকে আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে দাসে পরিণত হয়। যেন দেয়ালের ওপারের পৃথিবীতে ঠেলে দেয় নিজস্ব সত্তাকে। বাইরে থেকে লোকে দেখে মানুষটা ভালো আছে। কিন্তু আদতেই সে ভালো থাকে না। ভেতরে ভেতরে লাশ হয়ে যায়। আজীবন নিজের লাশ নিজেই বয়ে বেড়ায়।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা তাকাসুরে সে কথা বর্ণনা করেছেন স্পষ্টভাবে ;
বেশি বেশি এবং একে ওপরের থেকে বেশি দুনিয়ার স্বার্থ লাভের মোহ তোমাদের গাফেল করে দিয়েছে। এমনকি তোমরা (এ চিন্তায় আছন্ন হয়ে) কবর পর্যন্ত পৌঁছে যাও। (সূরা তাকাসুর : ১-২)
আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া করতে না পারার দরুন মানুষকে ভুগতে হয়। কেউ যদি সত্যিকার অর্থেই নিয়ামতের শুকরিয়া করে তাহলে ভেতরের হতাশা দূরীভূত হবে নিমিষেই। তওবায় রূপান্তরিত হবে, না পাওয়ার বেদনা। বারাকায় পূর্ণ হবে জীবনের আঙ্গিনা। সতেজ হয়ে উঠবে হৃদয়ের রুক্ষ মরুভূমি।
এই দিক থেকে অল্পে তুষ্ট থাকা মানুষগুলো বেশ সুখী। জীবনকে যে সহজ করে ভাবতে জানে তার কাছে সহজেই ধরা দেয় সুখের পায়রা। যারা সুন্দর বিছানার জন্য পেরেশান না হয়ে, সুন্দর ঘুমের প্রতি মনোযোগী হয় তারাই জীবনকে উপভোগ করতে পারে। আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া করার মতো মন যাদের আছে, তারা কখনো হতাশায় ভোগে না। না পাওয়ার বেদনা তাদের পেরেশান করতে পারে না। শূন্যতা ভর করেনা হৃদয় আঙ্গিনায়। অসহায় নিরুপায় মনে হয় না নিজেকে কখনো। যারা সমস্যাকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে ভাবতে জানে। অভাবকে নিত্যদিনের সঙ্গী হিসেবে মানিয়ে নেয়। হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ নিয়েই জীবনের পথে স্বাভাবিক পদভারে এগিয়ে চলে। জীবন যেখানে যেমন সেখানে সেভাবেই মানিয়ে নেয়ার মানসিক শক্তি অর্জনের অসাধারণ গুণ যাদের আছে তারা কখনো হেরে যায় না। আড়াল খোঁজে না জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচার।
এই দুনিয়ায় আমরা দুই দিনের মুসাফির। আমাদের যত অর্জন সব মৃত্যু এসে নিমিষেই সাবাড় করে ফেলবে। একদম খালি হাতে ফিরতে হবে আমাদের চিরস্থায়ী আবাসে। আমাদের অর্জিত সম্পদ, আমাদের সন্তান-সন্তদি, আমাদের নাম-ডাক কোন কাজেই আসবে না। তাহলে আমাদের আরও চাই, আরও চাই করে লাভ কী!
মহাগ্রন্থ আল-কুরআন বারবার যে বিষয়ে সতর্ক করেছে, “হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের প্রতিপত্তি, ধন-সম্পত্তি ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না রাখে। যদি তোমরা গাফেল বা উদাসীন হও তবে অবশ্যই তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” (সূরা মুনাফিকুন : ৯)।
আবার সূরা আনফালের ২৮ ও সূরা তাগাবুনের ১৫ নং আয়াতে একই কথা বলা হয়েছে, “তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষাস্বরূপ।”
মানুষের মাঝে আলাদা পরিচয়ে পরিচিত হবার আকাক্সক্ষা দূর করতে পারলে আমাদের জীবনটা এতো বেশি সহজ ও স্বাভাবিক হবে যে জীবনের হতাশা, চিন্তা পেরেশানি সবকিছু মুহূর্তেই দূরীভূত হতে বাধ্য হবে। আমাদের সেই ব্যক্তির মতোই হওয়া উচিত যে ব্যক্তি মজলিসে আসলেও কোনো সাড়া পড়ে না, কেউ সরে বসে জায়গা করে দেয় না। আবার মজলিস থেকে উঠে গেলেও কোনো প্রভাব পড়ে না। নিরেট নিপাট সরল জীবনে অভ্যস্ত ব্যক্তির জীবনই উপভোগ্য জীবন।
আবার রাসূলের সা. আরেকটি হাদিসের দিকে লক্ষ করলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়, উসামা ইবনে যায়েদ রা. থেকে বর্ণিত যে, নবী করিম সা. বলেছেন, আমি জান্নাতের দরজায় দাঁড়ালাম, দেখলাম যারা তাতে প্রবেশ করেছে তারা অধিকাংশ ছিল দুনিয়াতে দরিদ্র ও অসহায়। (বুখারি ও মুসলিম)
আমাদের সমাজে এখন অশান্তির মূল কারণ হলো অল্পে তুষ্ট থাকতে না পারার মানসিকতার অভাব। পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী চিন্তা আমাদের এমনভাবে গ্রাস করেছে যে আমরা হালাল-হারাম বাছ-বিচার করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি। নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছি। ছোট বড় যে দায়িত্বেই থাকি না কেন আমাদের খেয়ানত করার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের চাইতে সবলরা আমাদের প্রতি জুলুম করছে আবার আমরা কারও থেকে সবল হলে তাদের প্রতি জুলুম করছি। সামান্য সম্পদের জন্য আত্মীয়তার সম্পর্ক বিনষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্ব। এক ভাই আরেক ভাইকে খুন করছে সম্পদের জন্য। জনস্বার্থের কথা বিবেচনা না করে নিজের উদরপূর্তিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে দেশের দায়িত্ববান ব্যক্তিরা। পুকুরচুরির মতো দুর্নীতি হচ্ছে প্রকাশ্যে। পথে ঘাটে ছিনতাই, মাদক ও চোরাকারবারি করে আঙুল ফুলে কলাগাছ হবার স্বপ্ন আমাদের সমাজ জীবনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছে। যারা এসব অন্যায় কাজ করে না, তারা আছে আরও খারাপ অবস্থায়। ছোট্ট জীবন ভরে গেছে অভিযোগ আর অভিমানে।
যার জীবনে অভিযোগ নেই, অভিমান নেই, যে ইতিবাচক চিন্তা করতে জানে, সমস্যা দেখে যে কখনো হিম্মত হারায় না, অল্প দেখে যে কখনো মুখ ভার করে না, যে আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করতে জানে, সে ব্যক্তিই প্রকৃত সুখী ব্যক্তি। তার জীবনে কখনো আঁধার নেমে আসে না।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply