আজো শোকাহত ও স্তম্ভিত পুরো পৃথিবীর মানুষ । শাহ মোহাম্মদ মাহফুজুল হক

২৮ অক্টোবর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে একটি কালো দিন। ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর প্রকাশ্য দিবালোকে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশে অপর একটি রাজনৈতিক দল কর্তৃক পরিকল্পিতভাবে সশস্ত্র হামলা করে মানুষ হত্যা ও মৃত লাশের ওপর মানুষরূপী হায়েনাদের নৃত্য সারা পৃথিবীর বিবেকবান মানুষকে শোকাহত ও স্তম্ভিত করে। ঐ দিন পল্টনে যে বর্বর ঘটনা ঘটেছে তা কেবল বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর অন্য কোথাও কখনো ঘটেছে কিনা আমার জানা নেই।

কী ঘটেছিল ২৮ অক্টোবর
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ছিল ২০০১ সালের ১ অক্টোবর ক্ষমতায় আসা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন। সরকারের সফলভাবে ৫ বছর পূর্তি উদযাপনের লক্ষ্যে বিএনপি নয়াপল্টনে দলীয় অফিসের সামনে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে সমাবেশ ডাকে। অন্য দিকে বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোকে দুরভিসন্ধিমূলক আখ্যা দিয়ে সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি কে এম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে না নেয়ার ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ আজিজের পদত্যাগ দাবি করে আগে থেকেই বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে রাজপথ উত্তপ্ত করার চেষ্টারত ছিল তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। সরকারবিরোধী আন্দোলনকে আরো বেগবান করার লক্ষ্যে সরকারের শেষদিন তথা ২৮ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে সমাবেশ ডাকে আওয়ামী লীগ। কিন্তু হঠাৎ করে সমাবেশের ২ দিন আগে ধানমন্ডির দলীয় কর্মিসমাবেশ থেকে ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা হাতে সারাদেশ থেকে নেতাকর্মীদেরকে ঢাকায় আসার ঘোষণা দেন বর্তমান অবৈধ সরকারের স্বঘোষিত প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনা। তার এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। অন্য দিকে ঐ বছর ২৫ অক্টোবর ছিল ঈদুল আজহা। ফলে ঈদের ছুটিতে ঘরমুখো মানুষের মাঝেও একধরনের অজানা আতঙ্ক বিরাজ করছিল। স্বাভাবিকভাবে সেই বছর ঈদে অন্যান্য বছরের মতো সংগঠনের জনশক্তিদের ছুটি দেয়া হয়নি। যাদেরকে ছুটি দেয়া হয়েছিল তাদের প্রতি নির্দেশ ছিল ২৭ তারিখ রাতের মধ্যে ঢাকায় পৌঁছাতে হবে। কিন্তু ২৭ তারিখ সকাল থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজপথে অবস্থান নিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়। ফলে আমাদের জনশক্তিদের মধ্যে যারা বাড়িতে গিয়েছিল তাদের অধিকাংশই আসতে পারেনি। আমরা যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এসেছি তাদেরকেও পথে পথে অনেক বাধা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হয়েছে।
এমন টান টান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সকাল ১১টার দিকে বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে জামায়াতের সমাবেশের মঞ্চ নির্মাণকাজ শুরু হয়। এই সময় আমাদের শৃঙ্খলা বিভাগের ৩০০ থেকে ৪০০ লোক সমাবেশস্থলের আশপাশে অবস্থান নিয়েছিল। এর মধ্যে থেকে আমাদের ১৫০ লোককে তিন সারিতে দেয়া হয়েছিল পল্টন মোড় থেকে বায়তুল মোকাররমের দিকের রাস্তার প্রবেশমুখে যাতে করে প্রতিপক্ষের কেউ আমাদের সমাবেশস্থলের দিকে ঢুকতে না পারে। তৎকালীন কেন্দ্রীয় সভাপতি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বুলবুল ও মজিবুর রহমান মঞ্জু ভাইয়ের পক্ষ থেকে আমাদেরকে বলা হলো আপনাদের ভূমিকা হবে ওহুদ যুদ্ধের সময় হজরত যুবায়ের রা.-এর নেতৃত্বে গিরিপথে যে বাহিনীকে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছিল তাদের মতো। অন্যদিকে পরিস্থিতি যাই হোক না কেন আপনারা এই স্থান থেকে বিন্দু পরিমাণও নড়বেন না। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে আপনাদের প্রতি যদি থুতুও নিক্ষেপ করে তবুও আপনারা কোন প্রতি-উত্তর দিবেন না।
এর কিছুক্ষণ পর পরই সকাল আনুমানিক সাড়ে ১১টায় বিভিন্ন দিক থেকে লগি-বৈঠা হাতে আওয়ামী লীগের মিছিল আসতে থাকে। তারা বিভিন্নভাবে আমাদের ভাইদেরকে উত্তেজিত করার চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের ভাইয়েরা তাদের উসকানিতে উত্তেজিত না হয়ে ধৈর্যের সাথে দাঁড়িয়ে থাকে। এরই মধ্যে কাকরাইলের দিক থেকে সাহারা খাতুন ও সাবের হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন সশস্ত্র মিছিলটি পল্টন মোড়ে এসে ব্যারিকেড ভেঙে আমাদের সমাবেশস্থলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু আমাদের শক্ত অবস্থান ও অত্যধিক সহনশীলতার কারণে শেষ পর্যন্ত তারা পল্টনের দিকে না গিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের দিকে চলে যায়।
এই মিছিলটি পার হতে না হতেই শাহবাগ ও প্রেস ক্লাবের দিক থেকে ডা: ইকবাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও হাজী সেলিমের নেতৃত্বে ৫-৭ হাজার লোকের বিশাল একটি মিছিল আসে। পিজি হাসপাতাল, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট, প্রেস ক্লাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়ে আসতে থাকা জঙ্গিরূপ ধারণকারী মিছিলটিতে থাকা আওয়ামী সন্ত্রাসীরা পল্টন মোড়ে এসে দক্ষিণ দিকে তাদের সমাবেশস্থলের দিকে না গিয়ে সরাসরি আমাদের সমাবেশস্থল ও অফিসের দিকে রওনা করে। তারা আমাদের ওপর লগি-বৈঠা ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা করে।
প্রথম দিকে তাদের তীব্র আক্রমণের মুখে আমরা পিছু হটতে বাধ্য হলেও পরবর্তীতে মঞ্চের আশপাশে থাকা সবাই মিলে সংগঠিত হয়ে আমরা তাদেরকে ধাওয়া দেই। এতে তারাও পিছু হটতে বাধ্য হয়। পিছনে এসে সংগঠিত হয়ে তারা আবার আমাদের ওপর প্রচণ্ড হামলা চালায়। চলতে থাকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও ওয়ার্কার্স পার্টির অফিসের সামনে জড়ো হওয়া তাদের সকল নেতাকর্মী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সংগঠিত হয়ে চতুর্দিক থেকে বিভিন্ন অলিগলি দিয়ে আমাদের ওপর আক্রমণ করে। এ যেন এক রক্তাক্ত ওহুদের প্রান্তর। তাদের টার্গেট ছিল বায়তুল মোকাররমের পাশেই অবস্থিত শিবিরের কেন্দ্রীয় অফিস ও মহানগর জামায়াত অফিস গুঁড়িয়ে দেয়া এবং সমাবেশস্থলে আসা আমাদের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করা। কিন্তু আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের হাতেগোনা কয়েক শ’ জনশক্তি শাহাদাতের তামান্নায় উজ্জীবিত হয়ে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। লগি-বৈঠা ও বিভিন্ন দেশী-বিদেশী অস্ত্রসজ্জিত হাজার হাজার আওয়ামী সন্ত্রাসীর মোকাবেলায় কয়েক শ’ মর্দে মুজাহিদের ইট, পাথর ও তাদের ফেলে যাওয়া লাঠি কুড়িয়ে তাদেরকে মোকাবেলা করার সেই বীরোচিত দৃশ্য নিজ চোখে না দেখলে কাউকে বুঝানো সম্ভব নয় আল্লাহর সরাসরি সহযোগিতা কাকে বলে। এতো কিছুর পরও যখন নেতৃবৃন্দ মঞ্চে আসেন এবং সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয় তখন চারদিক থেকে মঞ্চকে লক্ষ্য করে শুরু হয়ে যায় মুহুর্মুহু গুলি। বিশেষ করে তৎকালীন আমিরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ভাই যখন বক্তব্য শুরু করেন তখন চূড়ান্ত আঘাত হানে। এই সময় হজরত তালহা রা. ও আবদুর রহমান ইবনে আউফ রা.-এর উত্তরসূরি জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ভাইসহ নেতৃবৃন্দকে ঘিরে মানবপ্রাচীর তৈরি করে। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সমাবেশের কার্যক্রম শেষ হয়। ভেস্তে যায় পেশিশক্তি দিয়ে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার আওয়ামী লীগ ও তার দোসরদের মূল টার্গেট। কিন্তু খুনের নেশায় মত্ত হায়েনাদের সশস্ত্র হামলায় শাহাদাতের অমিয় পেয়ালা পান করেন শহীদ আবদুল মালেকের উত্তরসূরি আমাদের প্রিয় ভাই মুজাহিদুল ইসলাম, হাফেজ গোলাম কিবরিয়া শিপন, সাইফুল্লাহ মুহাম্মদ মাসুম, রফিকুল ইসলাম, মুহাম্মদ শাহজান ও আব্দুল্লাহ আল ফয়সালসহ ছয়জন। আহত ও ক্ষত-বিক্ষত হন নাম না জানা অসংখ্য ভাই। এই সব শহীদ ও আহত ভাইয়ের রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় পল্টন ও তার আশপাশের পিচঢালা কালো রাজপথ। মহানগর জামায়াতের অফিসের ৫তলা ও শিবির অফিসে রাখা আহত ভাইদের চিৎকারে ভারী হয়ে ওঠে আকাশ বাতাস। কিন্তু সংঘর্ষ তখনো চলতে থাকে। এভাবে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে মাগরিবের কিছুক্ষণ পূর্বে পুলিশ বিডিআর ও র‌্যাবের সমন্বিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুই দলের মাঝখানে অবস্থান নেয় এবং টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে সবাইকে সরিয়ে দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। অথচ অজ্ঞাত কোন কারণে বা কাদের নির্দেশে সকাল ১১টায় সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে সন্ধ্যার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ছিল সম্পূর্ণ নীরব ও দর্শকের ভূমিকায়।
যেই শেখ হাসিনা আজকে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদেরকে কঠোর হাতে দমন করার কথা বলছেন অথচ তিনিই ছিলেন আইন হাতে তুলে নেয়া ও লগি-বৈঠা দিয়ে মানুষ হত্যা করার নির্দেশদাতা। অন্যদিকে মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ যে সকল জামায়াত নেতৃবৃন্দকে তথাকথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে শহীদ করা হয়েছে অথচ ২৮ অক্টোবর তাদেরকে লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু গুলির মধ্যে বক্তব্য দেয়ার সময়ও তাদের মুখ দিয়ে এমন একটি শব্দও বের হয়নি যা পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটাতে পারতো।
আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা কথায় কথায় জামায়াত শিবিরকে উগ্রবাদী সন্ত্রাসী ও মানবতাবিরোধী বলে। অথচ ইতিহাস সাক্ষী, ২৮ অক্টোবর আমাদের নেতাকর্মীদেরকে ধরে নিয়ে গিয়ে লগি-বৈঠা দিয়ে সাপ পেটানোর মত পিটিয়ে ও খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তারা হত্যা করে এবং বাপ্পা দিত্যের মত পশুরা সেদিন মৃত লাশের ওপর দাঁড়িয়ে নৃত্য করে। এই সকল দৃশ্য বিভিন্ন মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়লে দেশে-বিদেশে নিন্দার ঝড় ওঠে। অথচ সেদিন আমাদের নেতাকর্মীদের হাতে তাদের ১৬ জনের মত আটকা পড়ে কিন্তু আমাদের নেতৃবৃন্দের নির্দেশে তাদের সাথে কোনো খারাপ আচরণ না করে প্রয়োজনীয় খাবার ও চিকিৎসা দিয়ে তাদেরকে নিরাপদে পরিবারের নিকট পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। ইসলামে যুদ্ধবন্দিদের সাথে আচরণের যে বিধান রয়েছে ঐ বিধান না মেনে যদি আওয়ামী লীগের মত পশুসুলভ আচরণ করা হতো তাহলে আমাদের ৮ জনের পরিবর্তে ওদের ১৬ জন মারা যেত। তাই আমরা শেখ হাসিনা ও তাদের দোসরদেকে বলতে চাইÑ মুখে মানবতা ও সম্প্রীতির বাণী না আউড়িয়ে আয়নায় আপনাদের চেহারা দেখুন। রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও অস্থিরতা নিয়ে বক্তব্য দেয়ার আগে ২৮ অক্টোবরের খুনের বিচার করুন এবং এই নির্মম হত্যাকাণ্ডসহ অতীতে আপনাদের জঘন্য ভূমিকার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে নিন। আর মানবতা ও সহনশীলতা কাকে বলে তা জামায়াত-শিবির নেতৃবৃন্দের কাছ থেকে শিখুন।

২৮ অক্টোবরের ফলাফল : বাংলাদেশের বর্তমান সঙ্কট
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের নেতাকর্মীরা ২৮ অক্টোবর দিনে-দুপুরে ঢাকাসহ সারাদেশে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে জীবিত মানুষকে হত্যা করে তাদের লাশের ওপর যেভাবে নৃত্য করে তা শুধু বাংলাদেশ নয় বরং পৃথিবীর সকল বিবেকবান মানুষকে নাড়া দেয়। বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। আওয়ামী লীগের এই হিংস্ররূপ দেখে সর্বত্রই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংবিধান অনুযায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সম্ভাব্য প্রধান উপদেষ্টা তৎকালীন সদ্যবিদায়ী প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। শুরু হয় অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা। এরূপ পরিস্থিতিতে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ প্রধান উপদেষ্টার শপথ গ্রহণ করেন। আওয়ামী লীগ প্রথমে ইয়াজউদ্দিনকে উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিতে কিছুটা আপত্তি জানালেও পরবর্তীতে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা দেয়ার পর তা মেনে নিয়ে নমিনেশন দাখিল করে, পুরোদমে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমে পড়ে। কিন্তু হঠাৎ এক অদৃশ্য শক্তির বলে সারাদেশে একযোগে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেয় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট। শুরু হয় সারাদেশে আন্দোলনের নামে আওয়ামী লীগের নারকীয় তাণ্ডব। পরিকল্পিত এই কৃত্রিম সঙ্কটকে অজুুহাত বানিয়ে‘সেনা কু’-এর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন আহাম্মেদের সেনাসমর্থিত অবৈধ সরকার। শুরু হয় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে বিরাজনীতিকরণ প্রচেষ্টা। শুরুর দিকে দুর্নীতি দমন ও সুশাসনের মতো চমকপ্রদ শ্লোগান ও কিছু কিছু পদক্ষেপের কারণে মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার কিছুটা জনসমর্থন পেলেও পরবর্তীতে তাদের অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি, অবৈধ ক্ষমতায় দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টা ও নিজেদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার কারণে মানুষের আস্থা হারায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে সেনাবাহিনীর সাথে ছাত্রদের কথাকাটাকাটির মত তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়া গণবিক্ষোভই ছিল মূলত মানুষের মাঝে দীর্ঘদিন ধরে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। বন্দুকের নলের জোরে ক্ষমতায় আসা সংগঠন ও জনসমর্থনবিহীন মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীন সরকার বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি। একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। কিন্তু দীর্ঘ দুই বছরের তাদের সকল অসাংবিধানিক ও নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সম্ভাব্য পরিণাম থেকে বাঁচার জন্য তারা একটি নিরাপদ এক্সিট পয়েন্ট খুঁজছিল। এক্ষেত্রে তারা চারদলীয় জোটকে ম্যানেজ করতে না পারলেও আধিপত্যবাদী শক্তির মধ্যস্থতায় তারা আওয়ামী লীগকে ম্যানেজ করতে সক্ষম হয়। ভোটের আগেই আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করার সকল মেকানিজম ঠিক করে আয়োজন করা হয় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচন। সাজানো ছক অনুযায়ী অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সমঝোতার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ভারতের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে যায়। অবৈধভাবে ক্ষমতায় গিয়ে যারপরনাই আওয়ামী লীগকে একে একে পূরণ করতে হয় ভারত কর্তৃক প্রত্যাশিত অনেক আবদার ; যেটা ছিল দেশ ও জনগণের সেন্টিমেন্টবিরোধী কর্মকাণ্ড। ভারতকে ট্রান্জিট প্রদান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, প্রতিরক্ষা চুক্তিসহ আরো অনেক প্রত্যাশ- চাহিদা মেটাতে হয়। যুদ্ধাপরাধ বিচারের নামে দেশপ্রেমিক জাতীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যার মত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ পুরোপুরি জনবিচ্ছিন্ন হয়ে ভারতনির্ভর হয়ে যায়। জনগণের ভোটে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় থাকার পরিবর্তে তারা এখন ভারতকে খুশি করে ক্ষমতায় থাকার নীতি গ্রহণ করেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি হিসেবে সর্বজন প্রশংসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধান থেকে বাদ দিয়ে নিজেদের অধীনে নির্বাচন করে চিরজীবন ক্ষমতায় থাকার ব্যবস্থা করেছে আওয়ামী লীগ। রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণকে খুশি করার পরিবর্তে ভারতকে খুশি করা এখন আওয়ামী লীগ সরকােেরর বড় নীতি। ফলশ্রুতিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন ও পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি এখন দিবালোকের মত স্পষ্ট যে বাংলাদেশের সরকার পরিচালনায় কারা থাকবে তা আমার দেশের জনগণের ভোটে নির্ধারিত না হয়ে দিল্লিতে নির্ধারিত হয়। তাঁবেদার সরকার ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে যারা কথা বলে তাদেরকে গুম ও খুনের শিকার হতে হয়। যাদের অনেককে জীবিত বা মৃত অবস্থায় পরবর্তীতে ভারতে পাওয়া যায়। এই ধরনের পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবে দেশে বিদেশে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে বাংলাদেশ আদৌ কোন স্বাধীন সার্বভৌম দেশ আছে নাকি ভারতের করদরাজ্য বা অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে?
এই বছরের ডিসেম্বর নাগাদ হতে যাওয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনের ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে আমাদের সংবিধান কর্তৃক ঘোষিত রাষ্ট্রের মালিক জনগণের রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরে পাওয়া না পাওয়া। এই নির্বাচনের পূর্বেই যদি দেশপ্রেমিক দল ও জনতা সকল ভেদাভেদ ভুলে সম্মিলিত আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনতে পারে এবং নির্বাচনের মাধ্যমে একটি দেশপ্রেমিক ও জবাবদিহিতামূলক সরকার কায়েম করতে পারে তবেই জনগণ রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরে পাবে। আমরা স্বাধীন সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবো। আর যদি আধিপত্যবাদী শক্তির প্রত্যক্ষ মদদে ৫ জানুয়ারির মতো কোন তামাশার নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও যদি আওয়ামী লীগ কিংবা তাদের মতো অন্য কোন তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় তবে জাতি হিসেবে আমাদেরকে বরণ করতে হবে সিকিম, হায়দারাবাদ কিংবা কাশ্মিরের ভাগ্য।
আজকের এই কঠিন বাস্তবতার সূত্রপাত ঘটেছে মূলত ২৮ অক্টোবর। সেদিন জামায়াত-শিবিরের সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর আওয়ামী লীগ নামধারী হায়েনাদের এই নৃশংস হামলা সমগ্র জাতি বিশেষ করে ১-২ কিলোমিটার দূরে অনুষ্ঠিত বিএনপির সমাবেশে আগত নেতাকর্মীরা দর্শক হিসেবে না দেখে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতো তাহলে সেদিনই আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসররা লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হতো। ব্যর্থ হতো বাংলাদেশকে ঘিরে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিবেশীদের ষড়যন্ত্রের সকল নীলনকশা। জাতি হিসেবে আমাদেরকে মুখোমুখি হতে হতো না আজকের এই কঠিন পরিস্থিতির।

লেখক : কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply