আবদুল্লা গান্ধী -এবনে গোলাম সামাদ

[এবনে গোলাম সামাদ (২৯ ডিসেম্বর ১৯২৯- ১৫ আগস্ট ২০২১) বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট পণ্ডিত, চিন্তাবিদ, লেখক এবং কলামিস্ট। কর্মজীবনে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের একজন অধ্যাপক ছিলেন। সাহিত্য জগতে জ্ঞানবৃক্ষ হিসেবে পরিচিত এই মনীষী জাতীয় প্রয়োজনে লিখেছেন আমৃত্যু। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তে হাসপাতালে শয্যাশায়ী অবস্থাতেও স্বদেশ ও মানুষকে নিয়ে তাঁর চিন্তার কোনো শেষ ছিল না। কথা বলতে খুব কষ্ট হওয়ার পরও তিনি তাঁর সর্বশেষ গ্রন্থের একটি অংশ ডিক্টেশন দেন। ‘বাংলাদেশ কথা’ নামে এ বইটি এখন প্রকাশের পথে। বইয়ের একটি পরিচ্ছেদ থেকে লেখার এই অংশটুকু প্রেরণার পাঠকদের উদ্দেশে দেয়া হলো।]

ভারতের বিখ্যাত নেতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর (১৮৬৯-১৯৪৮) পিতা করমচাঁদ উত্তমচাঁদ গান্ধী (১৮২২-১৮৮৫)। ব্রিটিশ শাসনামলে গুজরাটের পোরবন্দর ছিল করদমিত্র রাজ্য। করমচাঁদ উত্তমচাঁদ গান্ধী ছিলেন এই পোরবন্দর রাজ্যের রাজার দেওয়ান বা মন্ত্রী। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী জন্মেছিলেন পোরবন্দর করদমিত্র রাজ্যের রাজধানী পোরবন্দরে। পোরবন্দর আরব সাগরের তীরে অবস্থিত একটি বন্দর নগরী। মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে আমরা এখন সাধারণভাবে ডাকি মহাত্মা গান্ধী নামে। মহাত্মা গান্ধী নামে তাকে ডাকা আরম্ভ হয় ১৯১৪ সালের কাছাকাছি থেকে। মহাত্মা গান্ধীর পিতা বিবাহ করেছিলেন চারবার। মহাত্মা গান্ধীর মাতা পুতলিবাই (১৮৪৪-১৮৯২) ছিলেন তার শেষ স্ত্রী। পুতলিবাই ছিলেন জুনাগড়ের মেয়ে। ধর্মে ছিলেন জৈন। জৈন ধর্মে বলা হয় অহিংসা পরম ধর্ম। বৌদ্ধধর্মেরই মতো। মহাত্মা গান্ধী চেয়েছেন অহিংস রাজনীতি করতে। এই অহিংসার ধারণা তিনি পেয়েছিলেন মায়ের কাছ থেকে। মহাত্মা গান্ধীর পিতা ছিলেন পোরবন্দর করদমিত্র রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বা দেওয়ান। মহাত্মা গান্ধী জন্মেছিলেন এক বিশেষ রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে। তিনি রাজনীতি করেছেন, বেশ কিছুটা তার পিতার কাছ থেকে লব্ধ ধারণা নির্ভর করেও। মহাত্মা গান্ধীর বয়স যখন ১৩ বছর তখন তার পিতা তাকে বিবাহ দেন কস্তুরীবাই মাখন ঝি নাম্নী নারীর সঙ্গে। কস্তুরীবাই ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর থেকে এক বছরের বড়। মহাত্মা গান্ধীর বয়স যখন ১৭ বছর তখন প্রথম সন্তানের জনক হন। কিন্তু তার এই প্রথম সন্তানের মৃত্যু হয় জন্মের কয়েক দিনের মধ্যে। এরপর কস্তুরীবাইয়ের গর্ভে মহাত্মা গান্ধীর চার সন্তানের জন্ম হয়। যারা সবাই পুত্রসন্তান। এরা ছিলেন হরিলাল, মনিলাল, রামদাস এবং দেবদাস গান্ধী।

মহাত্মা গান্ধী ১৮ বছর বয়সে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন ভবনগর সরকারি কলেজে। কিন্তু তিনি এখান থেকে ডিগ্রি অর্জন করতে পারেননি। বারবার অকৃতকার্য হন। তার পিতা ছিলেন বিত্তবান। তিনি তাকে বিলাতে পাঠান ব্যারিস্টারি পড়তে। মহাত্মা গান্ধী বিলাতে তিন বছর থাকেন এবং ব্যারিস্টারি পাস করেন। বিলাতে যাবার আগে তার পুত্র হীরালাল-এর জন্ম হয়। আমরা জানি মহাত্মা গান্ধী রাজনীতিতে চেয়েছিলেন হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি স্থাপন করতে। তিনি নিহত হন ৩০ জানুয়ারি ১৯৪৮ সালে একজন উগ্র হিন্দুত্ববাদী যুবকের বন্দুকের গুলিতে। মহাত্মা গান্ধী এ সময় করছিলেন দিল্লিতে এক জনসভা; দিল্লিতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা কমাবার লক্ষ্যে। কিন্তু মহাত্মা গান্ধীর জীবনের একটি ঘটনার কথা আমরা অনেকেই জানি না। তা হলো, মহাত্মা গান্ধীর প্রথম পুত্র হীরালাল গান্ধীর (১৮৮৮-১৯৪৮) বয়স যখন ৪৮ বছর, তখন তার হিন্দু স্ত্রী মারা যান। তিনি ১৯৩৬ সালে দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন একজন মুসলিম নারীকে। তিনি এই বিবাহ করতে যেয়ে মুসলমান হন। নিজের নাম রাখেন আবদুল্লা গান্ধী। কিন্তু মহাত্মা গান্ধী ও কস্তুরিবাই গান্ধী তাদের পুত্রের এই বিবাহকে মেনে নিতে পারেন না। পিতা ও মাতার চাপে আবদুল্লা গান্ধী তার মুসলমান স্ত্রীকে পরিত্যাগ করেন। তিনি তার স্ত্রীকে পরিত্যাগ করে দয়ানন্দ সরস্বতী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আর্য সমাজের মাধ্যমে আবার হিন্দুধর্ম গ্রহণ করেন। এবং নিজের নতুন নামকরণ করেন হীরালাল গান্ধী।

মহাত্মা গান্ধী তার জীবনের একপর্যায়ে পরিচিত হন ‘বাবুজি’ হিসাবে। তাকে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হতে থাকে ভাবি স্বাধীন ভারতের জনক। মহাত্মা গান্ধী তথা বাবুজি দিল্লিতে জনসভায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ার খবর পেয়ে বোম্বে থেকে হীরালাল গান্ধী ছুটে যান দিল্লিতে। যোগ দেন পিতার শবযাত্রায়। তিনি দিল্লিতে পিতার শেষকৃত্য সম্পন্ন করে ফিরে আসেন বোম্বে শহরে। মহাত্মা গান্ধীর মৃত্যুর তিন মাস পরে বোম্বে শহরের পুলিশ হীরালাল গান্ধীকে অজ্ঞান অবস্থায় পায় বোম্বের এক রাস্তায়। পুলিশ জানত না তার পরিচয়। তারা তাকে নিয়ে আসে বোম্বের এক হাসপাতালে। হীরালালের জ্ঞান ফিরলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানতে চায় তার পরিচয়। তিনি বলেন, তিনি হলেন বাবুজির পুত্র। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বুঝতে পারে না, রোগী বাবুজির পুত্র বলতে ঠিক কী বোঝাতে চাচ্ছেন। ওই হাসপাতালে তার মৃত্যু হওয়ার কয়েকদিন পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানতে পারে, মৃত ব্যক্তি ছিলেন মহাত্মা গান্ধীর সন্তান।

মহাত্মা গান্ধী ও হীরালাল গান্ধীর জীবন অবলম্বনে খ্যাতিমান চিত্র পরিচালক ফিরোজ আবদুল্লা খান একটি সিনেমা গড়ে তোলেন Gandhi My Father নামে। ছবিটি ভারতে মুক্তি পায় ২০০৭ সালে। মহাত্মা গান্ধীর ভক্তরা ছবিটা দেখে বলেন, এই ছায়াছবি প্রদর্শন ভারতে আর না করাই উচিত হবে। কারণ ছবিটা দেখে মহাত্মা গান্ধীকে মনে হয় না ‘মহাত্মা’।
আমি রাজশাহী শহরে বসে বই লিখছি। রাজশাহী শহরকে আগে বলা হতো রামপুর-বোয়ালিয়া। এখানে মহাত্মা গান্ধী একবার এসেছিলেন ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে। ছিলেন চারদিন। তিনি এখানে এসেছিলেন কংগ্রেসের জন্য চাঁদা সংগ্রহ করতে। এ সময় নওগাঁ, নাটোর ও রামপুর-বোয়ালিয়া ছিল রাজশাহী জেলার তিনটি মহকুমা। রাজশাহী শহর বা রামপুরা-বোয়ালিয়া ছিল জেলা সদর শহর। এ সময় নওগাঁর আত্রাই থানা ছিল একটা বিরাট পাট ব্যবসাকেন্দ্র। এখানে মোসলেম আলী মোল্লা নামে একজন খুব ধনী পাট ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ছিলেন রাজনীতির সঙ্গেও জড়িত। এবং ছিলেন MLC (Member of the Legislative Council) মোসলেম আলী মোল্লা মহাত্মা গান্ধীকে চাঁদা প্রদান করেছিলেন ১০ হাজার টাকা। ১০ হাজার টাকা সেদিন ছিল একটা বিরাট অংকের চাঁদা। নাটোরের মহারাজা মহাত্মা গান্ধীকে প্রদান করেছিলেন ৪ হাজার টাকা। আমি এই চাঁদার কথা অবগত হয়েছিলাম কিছু বয়স্ক ব্যক্তির কাছে।
রাজশাহীতে হিন্দু তরুণ সমাজের কাছে মহাত্মা গান্ধী আদৃত নেতা ছিলেন না। রাজশাহী ছিল অনুশীলন পার্টির অন্যতম ঘাঁটি। অনুশীলন পার্টি মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা রাজনীতিতে মোটেও আস্থাশীল ছিল না। অনুশীলন পার্টির বিখ্যাত নেতা মহারাজ তৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী (১৮৮৯-১৯৭০) এক সময় রাজশাহীতে এসেছিলেন ও আত্মগোপন করেছিলেন কিছু দিনের জন্য।

রাজশাহীতে খেলাফত আন্দোলন খুব জোরেশোরে হয়েছিল। মহাত্মা গান্ধী খেলাফত আন্দোলন সমর্থন করেছিলেন। এই কারণে ১৯২৪ তিনি মুসলমান সমাজের কাছে হতে পেরেছিলেন বিশেষ আদৃত। এ সময় খেলাফত আন্দোলন থেমে গেলেও ছিল তার কিছুটা রেশ।
এই লেখা বর্তমান রাষ্ট্র বাংলাদেশকে নিয়ে। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশের উদ্ভব-ইতিহাস ও ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, ভারতের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সম্বন্ধে আমরা বেখবর থাকতে পারি না। ভারতের রাজনীতির প্রভাব বিশেষভাবেই এসে পড়তে পারে বাংলাদেশের ঘরোয়া রাজনীতির উপর। বিজেপির উদ্ভব হতে পেরেছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘকে নির্ভর করে। বিজেপির উদ্ভব হতে পেরেছে জনসংঘকে নির্ভর করেও। জনসংঘ ভেবেছে সাবেক পাকিস্তানকে বিলুপ্ত করে অখণ্ড ভারত গড়বার কথা। বর্তমান ভারতীয় জাতীয় পাটির্র (বিজেপি) মধ্যে সে ইচ্ছা আছে সুপ্ত হয়ে। মহাত্মা গান্ধীর চিন্তা চেতনায় অনেক ফাঁক ছিল। ১৯৪০ সালে নাগপুরে অনুষ্ঠিত হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে মহাত্মা গান্ধী তাঁর সভাপতির ভাষণে বলেছিলেন, ভাবী স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রভাষা হতে হবে নাগরী অক্ষরে লিখিত হিন্দি। উর্দু ভাষার উদ্ভব হয়েছিল মুসলিম নৃপতিদের শাসনামলে। মুসলমানরা যদি চান তবে এই ভাষার চর্চা করতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে সরকার তাতে কোনো উৎসাহ দিতে পারে না। মহাত্মা গান্ধী বাংলা ভাষা সম্বন্ধে ছিলেন নীরব। যদিও সে সময় ভারতের জনসংখ্যার দিক থেকে হিন্দির পরেই অধিক সংখ্যক ব্যক্তি কথা বলতেন বাংলা ভাষায়। আর ভাষার দিক থেকে হিন্দির তুলনায় বাংলা ছিল বহুগুণ অগ্রসর। এখন পশ্চিমবঙ্গে হিন্দি ভাষার আধিপত্য নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। ভাষার প্রশ্নটা বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়– প্রদেশেও। ভারতের আগামী রাজনীতিতে ভাষা একটা বড় বিচার্য হবে; এরকমই ধারণা করা চলে। ৩৪ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গের আইনসভায় ক্ষমতায় ছিল বামফ্রন্ট। কিন্তু এই ফ্রন্ট আর কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়। যতগুলি কারণে এই ফ্রন্ট আজ আর কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়, তার একটি কারণ হলো বামফ্রন্ট সরকার উপলব্ধি করতে পারেনি যে পশ্চিমবঙ্গে জাগবে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ। আমরা চোখের সামনে দেখলাম বিরাট সামরিক শক্তিধর সোভিয়েত ইউনিয়নকে ১৯৯১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভেঙে পড়তে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে। কারণ সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যায় বাইলোরাশিয়া এবং ইউক্রেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়েছে জাতিসত্তার সমাধান না করতে পারবার কারণে। সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠিত ছিল ১৫টি রিপাবলিক নিয়ে। এখন তারা প্রত্যেকেই পরিণত হয়েছে এক একটি পৃথক রিপাবলিক। ১৯৭১ সালে ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়েছিল মৈত্রী চুক্তি। রুশ সমরবিশারদরা ছকে দিয়েছিলেন ভারতের রাজনীতির মূল ছক। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন শেষ পর্যন্ত চায় না মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে। তাই ইন্দিরা গান্ধী যা চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তা ঘটাতে পারেনি। ভারতের বর্তমান বিজেপি সরকার অখণ্ড ভারত গড়বার কথাই ভাবছে। এটা মনে রেখেই নির্ধারিত হওয়া উচিত বাংলাদেশের জাতীয় নীতি।
শ্রুতিলেখক : কথাশিল্পী মঈন শেখ

SHARE

Leave a Reply