আবৃত্তিকারের ছন্দজ্ঞান । আহমাদ হোসাইন নির্ঝর

আবৃত্তিকারের ছন্দজ্ঞানআবৃত্তি একটি স্বতন্ত্র ও বিশুদ্ধ শিল্প। বর্তমানে বাংলাদেশে এই শিল্প ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশুদ্ধ শিল্প হিসেবে আবৃত্তির রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সুনিপুণ রীতিপদ্ধতি। ভরাটকণ্ঠে বা দরাজকণ্ঠে কবিতা পাঠই আবৃত্তি নয়। আবৃত্তি করার আগে আবৃত্তির ব্যাকরণ জানা জরুরি। আবৃত্তি শেখার কিছু মৌলিক স্তম্ভ রয়েছে। যেগুলো না জানলে সঠিকভাবে আবৃত্তি করা যায় না। লৌকিক জগৎকে অলৌকিক ভাব-ব্যঞ্জনায় মোহময় করে তোলা হয় কবিতায়। খুব সহজে যেমন এই ভাব আয়ত্ত করা যায় না তেমনি অসম্ভবও নয়। চাইলেই এ শিল্পের ভাবালোকে ডুব দেয়া সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ চর্চা এবং শেখার মানসিকতা। আবৃত্তি করার আগে জীবনকে জানতে হয়, জানতে হয় হৃদয়ের ভাষা, চিনতে হয় আবেগের গতিপথ, আয়ত্ত করতে হয় যৌবনের পরিভাষা, মানস প্রবণতা তৈরি করতে হয় আবৃত্তির ধর্ম মানার, বুঝতে হয় কবিতার ধর্ম, অনুভব করতে হয় ধর্মের ধর্ম, বহন করতে হয় কণ্ঠশীলনের গ্লানি, নিপুণভাবে জানতে হয় ছন্দের ছলাকলা। কবিতা যেহেতু ছন্দের কারুকার্যে লিখতে হয়। তাই আবৃত্তির জন্য ছন্দ জানা অপরিহার্য। ছন্দ না জানলে ধ্রুপদী আবৃত্তি করা সম্ভব নয়।

ছন্দ
ধ্বনির সঙ্গে সময়ের সামঞ্জস্য বিধান করাকেই ছন্দ বলা যায়। চলার গতিই ছন্দ। এই গতি পরিমিত এবং শৃঙ্খলিত। মানুষের কথা বলা; হেঁটে চলা, পাখির উড়ে যাওয়া; গান করা, নদীর বয়ে চলা, সমুদ্রের উর্মিমুখরতা, গাছ; তরুলতার বেড়ে ওঠা, বাতাসের বয়ে যাওয়া, জীবন ক্ষয়ে যাওয়া তথা সমস্ত বিশ্বের প্রকৃতির বেগের আবেগ বা গতিশীলতার সঙ্গে ছন্দের যোগ অবিচ্ছেদ্য। সুপরিকল্পিত ধ্বনিবিন্যাসের কারণে যে তরঙ্গভঙ্গি বা স্পন্দন বা ঝোঁক সৃষ্টি হয় তাকেই বলা যায় ছন্দের প্রাণ। বাক্য-পরম্পরায় ভাষাগত ধ্বনি প্রবাহের সুসামঞ্জস্য, সঙ্গীতমধুর ও তরঙ্গ-ঝঙ্কৃত ভঙ্গি রচনা করা হয় যে পরিমিত পদবিন্যাস রীতিতে তাকে ছন্দ বলে। পর্বই ছন্দের প্রধান উপাদান। সে জন্য বলা যায়, ধ্বনির সঙ্গে তার উচ্চারণগত সময়ের সামঞ্জস্য বিধানের নাম ছন্দ। ছন্দ চক্ষুগ্রাহ্য নয়, এটি শ্রুতিগ্রাহ্য। এ জন্য ছন্দ ধরা পড়ে তখনই, যখন কবিতা আবৃত্তি করা হয়। কবিতা আবৃত্তি করার সময় তার ধ্বনিপ্রবাহে যে সুললিত ও সুনিয়ন্ত্রিত দোলার সৃষ্টি হয় তারই নাম ছন্দ।
ভাব ও আবেগের গতি বাড়িয়ে বাক্যকে রসাত্মক করে তোলার জন্য বিশেষ পদবিন্যাস রীতিই ছন্দ। ছন্দের মূল প্রয়োজন কথার মধ্যে গতি দিয়ে কথাকে আমাদের কাছে হৃদয়ের ব্যাপার করে তোলা। বাক্যকে গতিশীল করার জন্যই ছন্দের প্রয়োজন। কবিতার ছন্দময় চলমানতার মধ্যেই ভাবের আনন্দময় রূপের প্রকাশ ঘটে। তাই ছন্দ আমাদের ভাবানন্দকে বহমান ও প্রাণবান করে। ছন্দ হলো আনন্দ তৈরির উপকরণ। ছন্দের নিজস্ব একটা স্রোত আছে। সেই আবৃত্তি একটি স্বতন্ত্র ও বিশুদ্ধ শিল্প। বর্তমানে বাংলাদেশে এই শিল্প ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশুদ্ধ শিল্প হিসেবে আবৃত্তির রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস ও সুনিপুণ রীতিপদ্ধতি। ভরাটকণ্ঠে বা দরাজকণ্ঠে কবিতা পাঠই আবৃত্তি নয়। আবৃত্তি করার আগে আবৃত্তির ব্যাকরণ জানা জরুরি। আবৃত্তি শেখার কিছু মৌলিক স্তম্ভ রয়েছে। যেগুলো না জানলে সঠিকভাবে আবৃত্তি করা যায় না। লৌকিক জগৎকে অলৌকিক ভাব-ব্যঞ্জনায় মোহময় করে তোলা হয় কবিতায়। খুব সহজে যেমন এই ভাব আয়ত্ত করা যায় না তেমনি অসম্ভবও নয়। চাইলেই এ শিল্পের ভাবালোকে ডুব দেয়া সম্ভব। তবে এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ চর্চা এবং শেখার মানসিকতা। আবৃত্তি করার আগে জীবনকে জানতে হয়, জানতে হয় হৃদয়ের ভাষা, চিনতে হয় আবেগের গতিপথ, আয়ত্ত করতে হয় যৌবনের পরিভাষা, মানস প্রবণতা তৈরি করতে হয় আবৃত্তির ধর্ম মানার, বুঝতে হয় কবিতার ধর্ম, অনুভব করতে হয় ধর্মের ধর্ম, বহন করতে হয় কণ্ঠশীলনের গ্লানি, নিপুণভাবে জানতে হয় ছন্দের ছলাকলা। কবিতা যেহেতু ছন্দের কারুকার্যে লিখতে হয়। তাই আবৃত্তির জন্য ছন্দ জানা অপরিহার্য। ছন্দ না জানলে ধ্রুপদী আবৃত্তি করা সম্ভব নয়।

ছন্দ
ধ্বনির সঙ্গে সময়ের সামঞ্জস্য বিধান করাকেই ছন্দ বলা যায়। চলার গতিই ছন্দ। এই গতি পরিমিত এবং শৃঙ্খলিত। মানুষের কথা বলা; হেঁটে চলা, পাখির উড়ে যাওয়া; গান করা, নদীর বয়ে চলা, সমুদ্রের উর্মিমুখরতা, গাছ; তরুলতার বেড়ে ওঠা, বাতাসের বয়ে যাওয়া, জীবন ক্ষয়ে যাওয়া তথা সমস্ত বিশ্বের প্রকৃতির বেগের আবেগ বা গতিশীলতার সঙ্গে ছন্দের যোগ অবিচ্ছেদ্য। সুপরিকল্পিত ধ্বনিবিন্যাসের কারণে যে তরঙ্গভঙ্গি বা স্পন্দন বা ঝোঁক সৃষ্টি হয় তাকেই বলা যায় ছন্দের প্রাণ। বাক্য-পরম্পরায় ভাষাগত ধ্বনি প্রবাহের সুসামঞ্জস্য, সঙ্গীতমধুর ও তরঙ্গ-ঝঙ্কৃত ভঙ্গি রচনা করা হয় যে পরিমিত পদবিন্যাস রীতিতে তাকে ছন্দ বলে। পর্বই ছন্দের প্রধান উপাদান। সে জন্য বলা যায়, ধ্বনির সঙ্গে তার উচ্চারণগত সময়ের সামঞ্জস্য বিধানের নাম ছন্দ। ছন্দ চক্ষুগ্রাহ্য নয়, এটি শ্রুতিগ্রাহ্য। এ জন্য ছন্দ ধরা পড়ে তখনই, যখন কবিতা আবৃত্তি করা হয়। কবিতা আবৃত্তি করার সময় তার ধ্বনিপ্রবাহে যে সুললিত ও সুনিয়ন্ত্রিত দোলার সৃষ্টি হয় তারই নাম ছন্দ।
ভাব ও আবেগের গতি বাড়িয়ে বাক্যকে রসাত্মক করে তোলার জন্য বিশেষ পদবিন্যাস রীতিই ছন্দ। ছন্দের মূল প্রয়োজন কথার মধ্যে গতি দিয়ে কথাকে আমাদের কাছে হৃদয়ের ব্যাপার করে তোলা। বাক্যকে গতিশীল করার জন্যই ছন্দের প্রয়োজন। কবিতার ছন্দময় চলমানতার মধ্যেই ভাবের আনন্দময় রূপের প্রকাশ ঘটে। তাই ছন্দ আমাদের ভাবানন্দকে বহমান ও প্রাণবান করে। ছন্দ হলো আনন্দ তৈরির উপকরণ। ছন্দের নিজস্ব একটা স্রোত আছে। সেই স্রোতে কবিতাকে ছেড়ে দিলে সে নাচতে নাচতে গিয়ে ঐ স্রোতে ভাসতে থাকে এবং ভাসতে ভাসতে এক সময় পাঠকের হৃদয়ে আঘাত করে। এই আঘাতে পাঠক জাগ্রত হয়ে ওঠেন। তিনি বুঝতে পারেন তিনি কিছু একটা পেয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে পৃথিবীর সব ভাষার ছন্দই নাচের তাল এবং গানের সুরের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল; বাংলা ছন্দও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলা ছন্দ যতি এবং তালের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বলা যায় বাংলা ছন্দের গঠন ও গতি আর তালের গঠন ও গতি একই রকম।
বাংলা ভাষার বিভিন্ন প্রবীণ ছন্দবিশারদ ছন্দের নানা রকম সংজ্ঞা দিয়েছেন-
প্রবোধচন্দ্র সেন বলেছেন- “শিল্পিত বাকরীতির নামই ছন্দ”।
অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের মতে- “যেভাবে পদবিন্যাস করলে বাক্য শ্রুতিমধুর হয় এবং মনে রসের সঞ্চার হয়, তাকে ছন্দ বলে।”
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় বলেছেন- “বাক্যস্থিত পদগুলোকে যেভাবে সাজালে বাক্যটি শ্রুতিমধুর হয় এবং তার মধ্যে কালগত ও ধ্বনিগত সুষমা উপলব্ধ হয়, পদ সাজাবার সেই পদ্ধতিকে ছন্দ বলে।”
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ভাষায়- “ছন্দ হল কবিতার শরীরে দোলা লাগাবার কায়দা।”
ছন্দবিজ্ঞানী আবদুল কাদিরের মতে- “শব্দের সুমিত ও সুনিয়মিত বিন্যাসকে বলা হয় ছন্দ।”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছন্দকে সেতারের সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন- “সেতারের তার বাঁধা থাকে বটে, কিন্তু তার থেকে সুর ছাড়া পায়। ছন্দ হচ্ছে সেই তার বাঁধা সেতার, তার অন্তরের সুরকে সে তাড়া দিতে থাকে।”
ভাষায় প্রাণ সঞ্চার করার জন্য, তরঙ্গ সৃষ্টির মাধ্যমে কথাকে ব্যঞ্জনাময় করার জন্য ছন্দের বিকল্প নেই। ছন্দ হলো কবিতার রক্তপ্রবাহ। এই যে ছন্দ, এটি কবিতায় কিন্তু আপনাতেই জেগে ওঠে না। কবিকে রীতিমত সাধনা করে ছন্দ নির্মাণ করতে হয়। কাব্যরসধর্মী সুষম শব্দ চয়নের মধ্য দিয়ে কবি কবিতায় ছন্দ নির্মাণ করেন। এই নির্মাণ-কৌশল যেমন গাণিতিক তেমনি আবার বৈজ্ঞানিক। সে কারণে ছন্দ এখন পেয়েছে বিজ্ঞানের মর্যাদা।

ছন্দের উপাদান
ছন্দের কতগুলো উপাদান আছে, যেগুলো না বুঝলে ছন্দ শেখা যাবে না। আমরা ছন্দের প্রকারভেদে যাওয়ার আগে এগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করব:

অক্ষর
বাগযন্ত্রের স্বল্পতম প্রচেষ্টায় যে ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ একবার একত্রে উচ্চারিত হয় তাকে অক্ষর বলে। যেমন ‘সুন্দর’ শব্দটিতে দু’টি অক্ষর আছে ‘সুন’ ও ‘দর’।
প্রত্যেক শব্দের অন্তর্গত অক্ষরের সংখ্যা জানতে হলে শব্দটিকে টেনে টেনে উচ্চারণ করলে বিভিন্ন অক্ষরের পার্থক্য কানে ধরা পড়ে। দ্রুত উচ্চারণে অক্ষরে অক্ষরে পার্থক্য ধরা পড়া বেশ কঠিন। যেমন- ‘দাদ’ শব্দটি। এর উচ্চারণ -দাদ্। শব্দটিকে যতই টানা হোক সে না ভেঙে একবারেই উচ্চারিত হবে। একইভাবে- ‘দাদা’ শব্দটি নেয়া যাক। টেনে উচ্চারণ করলে হবে- দা-দা। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে দু’টি পৃথক অক্ষর একত্রিত হয়ে শব্দটি গড়ে তুলেছে। ‘দাদা’ দুই অক্ষরের শব্দ। ছোট বড় যে কোনো শব্দকে এমনিভাবে টেনে টেনে উচ্চারণ করলে পৃথক পৃথক কতগুলো অক্ষর স্পষ্ট হয়ে ধরা পড়বে। ছন্দ জানতে হলে অক্ষরের ওপর পরিপূর্ণ ধারণা থাকতে হবে। অক্ষর না চিনতে পারলে কোনোভাবেই বাংলা ছন্দ পূর্ণাঙ্গরূপে আয়ত্ত করা যাবে না। প্রবোধচন্দ্র সেন অক্ষরকে বলেছেন- ‘দল’ আর সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বলেছেন ‘শব্দ-পাপড়ি’।
ছন্দশাস্ত্রে অক্ষর দুই প্রকার, যথা-
১. মুক্তাক্ষর ও
২. বদ্ধাক্ষর

মুক্তাক্ষর : যেসব অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকে ও উচ্চারণের পর সাধারণত মুখ খোলা থাকে এবং অক্ষরকে ইচ্ছেমত প্রলম্বিত করা যায় অর্থাৎ টেনে টেনে পড়া যায় তাকে মুক্তাক্ষর বলে। মুক্তাক্ষর উচ্চারণের সময় বাগযন্ত্রের কোথাও বাধা না পেয়ে অবারিতভাবে বেরিয়ে আসে। মুক্তাক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকে তাই বলা যায়, যে অক্ষরের শেষে স্বরধ্বনি থাকে তাকে মুক্তাক্ষর বলে। শেষে স্বরধ্বনি থাকায় একে স্বরান্ত অক্ষরও বলা হয়। মুক্তাক্ষরকে অর্ধচন্দ্র ( ঁ) চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করা হয়। যেমন ‘দোলা’ শব্দে দু’টি মুক্তাক্ষর আছে ‘দো’ এবং ‘লা’। একইভাবে- জানালা, খোলা, ছোলা, কলা, বলা, নলা, ধলা, অদিতি, অনামিকা, আনিকা, আশালতা ইত্যাদি মুক্তাক্ষর।
বদ্ধাক্ষর : যে অক্ষর উচ্চারণের সময় অবারিতভাবে উচ্চারণ করা যায় না বা বাগযন্ত্রের কোথাও না কোথাও কোনো না কোনোভাবে বাধা পড়ে তাই বদ্ধাক্ষর। ব্যঞ্জন ধ্বনির মাধ্যমে যেসব অক্ষরের সমাপ্তি ঘটে ও উচ্চারণের পর সাধারণত মুখ বন্ধ হয়ে যায় এবং ইচ্ছেমত প্রলম্বিত করা যায় না, সেসব অক্ষরকে বদ্ধাক্ষর বলে। বদ্ধাক্ষরকে ফ্ল্যাট বা ড্যাস বা সমান্তরাল ক্ষুদ্র রেখা (-) চিহ্ন দিয়ে প্রকাশ করা হয়। যেমন- ‘প্রান্তর’ শব্দে দু’টি বদ্ধাক্ষর আছে ‘প্রাণ’ এবং ‘তর’। একইভাবে স্পন্দন, কান, ডাক, হাঁক, পাক, যাক, থাক, চুন, পান, ধান, যান, মান ইত্যাদি বদ্ধাক্ষর।

মাত্রা
একটি অক্ষর উচ্চারণ করতে যে সময় লাগে তাকে মাত্রা বলে। অর্থাৎ উচ্চারিত ধ্বনির ব্যাপ্তিকালই মাত্রা। এক একটি অক্ষর উচ্চারণ করতে যে পরিমাণ সময় প্রয়োজন হয়, সেই অনুসারে মাত্রা নির্ধারিত হয়। উচ্চারণের সময় অনুসারেই শব্দের মাত্রা গণনা করা হয়। যেমন- দু/ য়া/ রে/ কে/ দাঁ/ ড়ি/ য়ে/ আ/ ছে?। এই বাক্যে মোট নয় মাত্রা এবং প্রত্যেকটি অক্ষরই এক মাত্রার। বাংলায় কোন অক্ষর কত মাত্রার হবে তার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই। ছন্দের প্রকৃতি বা বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী একই অক্ষর কোথাও একমাত্রার আবার কোথাও দুই মাত্রার হতে পারে। অর্থাৎ অক্ষর বিশেষের উচ্চারণ সময়ের ওপর মাত্রা নির্ধারিত হয়। যেমন-
মাত্রা উচ্চারণের ক্ষেত্রে একমাত্রা উচ্চারণে যে সময় লাগে দুই মাত্রা উচ্চারণে তার দ্বিগুণ সময় লাগবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তবে একমাত্রার চেয়ে দুইমাত্রা অপেক্ষাকৃত বেশি সময় দাবি করে। যেহেতু বাংলা কবিতায় ছন্দের গতির ওপর মাত্রা নির্ধারিত হয় সেহেতু ধীরগতির উচ্চারণে যে অক্ষর দুই মাত্রায় নির্ধারিত হবে, দ্রুতগতির উচ্চারণে সেই অক্ষরই এক মাত্রার হতে পারে।
এক এক ছন্দের ক্ষেত্রে মাত্রাবিন্যাস এক এক রকম। তবে সব ছন্দেই মুক্তাক্ষর এক মাত্রা ধরা হয়। পার্থক্য সূচিত হয় বদ্ধাক্ষরের মাত্রা গণনায়। বদ্ধাক্ষর কখনো এক মাত্রা কখনো দুই মাত্রার হতে পারে। নিচে ছকের মধ্যে তিন ছন্দের মাত্রা গণনার পদ্ধতি দেয়া হলো :
ছন্দ মুক্তাক্ষর বদ্ধাক্ষর
স্বরবৃত্ত ১ মাত্রা ১ মাত্রা
মাত্রাবৃত্ত ১ মাত্রা সব স্থানেই ২ মাত্রা
অক্ষরবৃত্ত ১ মাত্রা
ক) শব্দের শরুতে ও মাঝে থাকলে ১ মাত্রা
খ) শব্দের শেষে থাকলে দুইমাত্রা
গ) একাক্ষর শব্দে থাকলে কখনো ১ মাত্রা কখনো দুই মাত্রা

যতি
মাঝে মাঝে কথা বলার সময় বা আবৃত্তি করার সময় প্রশ্বাস-নিশ্বাসের প্রয়োজনে আমাদেরকে থামতে হয়। এক ঝোঁকে কতগুলো ধ্বনি উচ্চারণ করলে যেখানে সে ঝোঁকের সমাপ্তি ঘটে এবং জিহ্বা স্বল্পসময়ের জন্য বিরাম গ্রহণ করে, সেই বিরামকে বলে যতি।
যতির প্রকারভেদ :
যতি দুই প্রকার:
১. অর্ধযতি ও ২. পূর্ণযতি
অর্ধযতি: চরণের মধ্যে স্বল্প সময়ের জন্য জিহবার যে বিরতি তাকে বলে অর্ধযতি। যেমনÑ
শুধু অকারণ / পুলকে
ক্ষণিকের গান / গারে আজি প্রাণ/
ক্ষণিক দিনের / আলোকে।
পূর্ণযতি: চরণ শেষে জিহবার যে দীর্ঘ বিরতি হয় তাকে বলে পূর্ণ যতি।
যেমন-
জীবন মানে বাজির খেলা
জীবন মানে সুর
জীবন মানে গজিয়ে ওঠা
ব্যথার সমুদ্দুর।
অর্থ প্রকাশের সঙ্গে যতির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই।

ছেদ
কবিতার রূপায়িত বক্তব্যের অর্থকে সুবোধ্য ও সুচারুরূপে প্রকাশ করার জন্য মাঝে মাঝে থামতে হয়। অর্থের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এই সামঞ্জস্যপূর্ণ বিরতিকে বলা হয় ছেদ বা অর্থযতি। যেমন:
আমার মেয়ে / খাঁচায় একটা ময়না পুষতো /
আদরে-আব্দারে / কিভাবে যেন /
পাখিটার নাম দাঁড়িয়ে গেল / কবিতা। /

ছেদ এর প্রকারভেদ:
ছেদ দুই প্রকার : ১. উপচ্ছেদ, ২. পূর্ণচ্ছেদ
উপচ্ছেদ: কবিতার প্রয়োজনে যেখানে কমা বা সেমিকোলন দিয়ে বিশিষ্ট অর্থবাচকতা বোঝানো হয় অর্থাৎ ভাবের বিহার বজায় থাকে কিন্তু ভাব পূর্ণাঙ্গ শেষ হয় না এমন অর্থময় বিরতিকে বলে উপচ্ছেদ। তবে শুধু কমা বা সেমিকোলন নয় এসব ছাড়াও কবিতাকে মোহময় করে উপস্থানের জন্য অর্থ ঠিক রেখে যে কোনো জায়গায় উপচ্ছেদ দেয়া যেতে পারে।
যেমন:
স্মৃতিতে পাহাড় গলে, / স্মৃতিতেই নির্ঝর /
স্মৃতিতে ডুকরে কাঁদে / স্মৃতির বহর।
এখানে ‘গলে’, ‘নির্ঝর’ এবং ‘কাঁদে’ এরপর উপচ্ছেদ পড়েছে। কিন্তু ভাবের সমাপ্তি ঘটেনি অথচ অর্থও বজায় থেকেছে।

পূর্ণচ্ছেদ: ভাব শেষ হওয়ার পর যেখানে দাঁড়ি পড়ে অর্থাৎ বাক্য যেখানে শেষ হয়ে যায় সেখানে পূর্ণচ্ছেদ বসে। যেমন:
স্মৃতিতে স্বপ্ন ভাসে, / স্মৃতিতেই মন /
স্মৃতিতে জেগে ওঠে, / স্মৃতির দহন।
এখানে ‘দহন’ এ এসে পূর্ণচ্ছেদ পড়েছে। অর্থাৎ ভাব সমাপ্ত হয়েছে এবং অর্থবহ হয়েছে।
অধুনা যতি এবং ছেদের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য করা হয় না। কারণ আবৃত্তিশিল্পীরা এমনভাবে কবিতাকে আবৃত্তির জন্য নির্মাণ করেন যেখানে শ্বাস আটকে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। অথবা শিল্পীরা চর্চা করে এমন কণ্ঠস্বর তৈরি করেন যাতে অনেক বড় বাক্যও না আটকে একসঙ্গে পড়ে ফেলতে পারেন। আবার অর্থবহ স্থানে থেমে শ্বাস নিয়ে নেন যার জন্য আলাদাভাবে যতির প্রয়োজন পড়ে না। এ জন্য ছেদ আর যতি আবৃত্তি শিল্পীর জন্য প্রায় এক। তবে পাঠ্যকেন্দ্রিক ছন্দ আলোচনার জন্য যতি এবং ছেদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

প্রস্বর
প্রস্বর মানে চাপ সৃষ্টি করা। নির্দিষ্ট শব্দের ওপর জোর প্রদান করাই প্রস্বর। বক্তব্যকে সুস্পষ্ট করার জন্য অথবা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে বিশেষভাবে প্রকাশ করার জন্য প্রস্বর দেয়া হয়। বক্তব্যকে জোরালোভাবে উপস্থাপনই মূলত প্রস্বর। বাক্যে এক একটা শব্দের ওপর প্রস্বর দিলে এক এক রকম অর্থ প্রকাশ করে। যেমন:
যদি আদ্রহাতে তোমার চিবুক ছুঁয়ে বলি, চলো যুদ্ধে যাই; যাবে?
এই বাক্যে একে একে সবগুলো শব্দের ওপর প্রস্বর দিলে আলাদা আলাদা বক্তব্য ফুটে উঠবে।
যদি- এই শব্দে প্রস্বর দিলে প্রশ্ন এবং সন্দেহের দ্যোতনা সৃষ্টি হবে
আদ্রহাতে- হাতের কোমলতার দৃশ্যকল্প ফুটে উঠবে
তোমার- ভালোবাসার পাত্র-ই (ব্যক্তি) প্রাধান্য পাবে
চিবুক- চিবুক স্পর্শের চিত্র আলাদাভাবে প্রস্ফুটিত হবে
ছুঁয়ে- স্পর্শের অনুভূতি বিশেষভাবে জাগ্রত হবে
বলি- বলাটাই বড় হয়ে উঠবে
চলো- আহবানটা বড় হয়ে উঠবে
যুদ্ধে যাই- আকুতি এবং দৃপ্ত প্রত্যয় ফুটে উঠবে
যাবে- বিশ্বাস এবং ভালোবাসার একটা সংশয় তৈরি হবে সঙ্গে সঙ্গে আবেগের দোলা এসে কোমলতায় এবং আহবানে আচ্ছন্ন করে তুলবে।
একইভাবে আমরা আরো কিছু বাক্য তৈরি করে প্রত্যেক বাক্যের ওপর আলাদা প্রস্বর দিয়ে দেখতে পারি এবং চর্চা করতে পারি। যেমন:
আমি যখন বাড়িতে এসে পৌঁছলুম তখন দুপুর
আমি তোমাকে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়ার উদাত্ত আহবান জানাই
বাঘের গর্জন শুনেই হরিণ পালিয়েছে
ভালোবাসলে পাথর গ’লে ঝর্ণা বহে
ভুলেই গিয়েছিলাম অত্যন্ত সাধারণ মানুষ আমি

প্রস্বর আবার দুই প্রকার:
বল প্রস্বর (Stress accent) : অক্ষর বা দলবিশেষের ওপরে উচ্চারণের ঝোঁক দিলে যে প্রস্বর তৈরি হবে তাই বল প্রস্বর।
গীতি প্রস্বর (Musical accent) : কণ্ঠস্বরের তীব্রতা থেকে সৃষ্ট প্রস্বরই গীতি প্রস্বর।

পর্ব
কবিতার চরণে অর্ধযতি দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ধ্বনি সমষ্টির নাম পর্ব। অর্থাৎ যতি দ্বারা কবিতার চরণ কতগুলো ধ্বনি সমষ্টিতে বিভক্ত হয়ে যায়। এই খণ্ডিত ধ্বনি প্রবাহই পর্ব। অন্যভাবে বলা যায়, কবিতা পড়ার সময় এক ঝোঁক থেকে আরেক ঝোঁক পর্যন্ত উচ্চারিত অংশই পর্ব। কিংবা আরো সহজ করে বলা যায়, কবিতার একটি পঙক্তিকে ভাব অনুসারে যত অংশে ভাগ করা যায় তত অংশই এক একটা পর্ব। বাংলা ছন্দ বিশ্লেষণে পর্ব অপরিহার্য উপাদান। কারণ বাংলা কবিতায় পর্বের মাত্রার ওপর নির্ভর করেই ছন্দ বিশ্লেষণ করা হয়। যেমন-
গাছের পাতারা / সেই বেদনায় / বুনো পথে যেত / ঝরে/
ফাল্গুনী হাওয়া / কাঁদিয়া উঠিত / শুনো মাঠখানি / ভ’রে/

এখানে /- চিহ্ন দ্বারা বিভাজিত অংশগুলোই পর্ব
ছন্দের মূল ভিত্তি ঐক্য। এই ঐক্য পর্ব বিভাজনের ওপর নির্ভর করে। পর্বে মাত্রা সংখ্যার সমতা-অসমতা এবং পঙক্তিতে পর্ব সংখ্যা বিবেচনা করেই ছন্দ বিচিত্রতা প্রকাশ করা হয়।

পর্বাঙ্গ
পর্বের অন্তর্গত ক্ষুদ্রতম অংশ বা পর্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিভাগকে পর্বাঙ্গ বলে। একটি পর্বে সাধারণত তিনটির বেশি পর্বাঙ্গ থাকে না, তেমনি দু’টির কম পর্বাঙ্গ নিয়েও পর্ব গঠিত হয় কম। একই চরণের পর্বের মধ্যে পর্বাঙ্গের সংখ্যাসাম্য থাকা বাঞ্ছনীয়।
যেমন:
এইখানে : তোর / দাদির : কবর / ডালিম : গাছের / তলে
তিরিশ : বছর / ভিজায়ে : রেখেছি / দুই : নয়নের /জলে।

এখানে বিসর্গ (ঃ) চিহ্ন দ্বারা পর্বাঙ্গ বুঝানো হয়েছে।

মধ্যখণ্ডন
পর্ব বিন্যাসের প্রয়োজনে উচ্চারণের সুবিধার জন্য কোনো শব্দের মাঝখানে কেটে দেয়াকে বলে মধ্যখণ্ডন। মধ্যখণ্ডন পঙক্তির শেষ পর্বে হয়ে থাকে। যেমন-
ভালোবাসা মানে / দু’জনের পাগ / লামি

এখানে ‘পাগলামি’ শব্দের মাঝখানে কেটে দেয়াই মধ্যখণ্ডন।

অতিপর্ব
কখনো কখনো কবিতার শুরুতে একটি অতিরিক্ত ছোট পর্ব থাকে। এই পর্বের সাথে অন্যান্য পাঠগুলোর সমতা থাকে না। যেমন-
(আজ) সঙ্কেত / শঙ্কিতা/ বনবীথি / কায়
(কত) কুলবধূ / ছিঁড়ে শাড়ি / কুলের কাঁ / টায়
[এখানে ‘আজ’ ও ‘কত’ অতিপর্ব]

অপূর্ণ পর্ব
মাঝে মাঝে দেখা যায় ছন্দের শেষ পর্বটি অপেক্ষাকৃত ছোট হয়, যদি কোনো স্থানে এমন হয় তবে তাকে অপূর্ণ পর্ব বলে। যেমন-
তোমার কাছে / আরাম চেয়ে / পেলেম শুধু / লজ্জা
[এখানে-‘লজ্জা’ হচ্ছে অপূর্ণ পর্ব]
পঙক্তি
এক সারিতে সাজানো শব্দ সমষ্টিকে ছন্দ বিজ্ঞানে পঙক্তি বলে। যেমন-
মন ও হৃদয় এক নয় প্রিয়তমা
দু’জনার আছে শিল্পিত ব্যবধান
[এখানে ‘মন ও হৃদয় এক নয় প্রিয়তমা’ একটি পঙক্তি এবং ‘দু’জনার আছে শিল্পিত ব্যবধান’ একটি পঙক্তি। মোট দুটি পঙক্তি আছে।]

চরণ
একটি সম্পূর্ণ বাক্যই ছন্দ বিজ্ঞানে চরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। ছন্দের পূর্ণরূপ প্রকাশের জন্য যতগুলো পর্বের প্রয়োজন ততগুলো পর্ব নিয়ে একটি চরণ গঠিত হয়। যেমনÑ
মন ও হৃদয় / এক নয় প্রিয় / তমা
দু’জনার আছে / শিল্পিত ব্যব / ধান।
[এখানে দুটি পঙক্তি নিয়ে একটি চরণ হয়েছে]

স্তবক
পঙক্তির সমষ্টিকে স্তবক বলে। কবির ইচ্ছানুযায়ী দুই, তিন, চার, পাঁচ, ছয় প্রভৃতি যে কোনও সংখ্যক পঙক্তি নিয়ে তিনি স্তবক গঠন করতে পারেন। স্তবককে অধ্যায় এর সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। একটি উপন্যাস বা নাটক যেমন এক বা একাধিক অধ্যায়ে অথবা অঙ্কে বিভক্ত হয়ে পরিপূর্ণতা লাভ করে তেমনি একটি কবিতাও এক বা একাধিক স্তবক নিয়ে পূর্ণতা লাভ করে। স্তবকে পূর্ণাঙ্গ ভাবের ক্ষুদ্রতম অংশ রূপায়িত হয়; অনেকটা বিন্দু বিন্দু জলের সমাহারে সমুদ্র সৃষ্টির মতো।
যেমন-
মন ও হৃদয় এক নয় প্রিয়তমা
দু’জনার আছে শিল্পিত ব্যবধান।
মন চঞ্চল-তাই শুধু তাড়াহুড়ো
হৃদয়ের আছে ঘনীভূত অভিমান।
[এখানে চারটি পঙক্তি নিয়ে একটি স্তবক হয়েছে]

আবৃত্তিকারের ছন্দজ্ঞানছন্দের লয় বা গতি
কবিতার গতিভঙ্গিই লয়। কবিতার গতিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে কবিতাকে কখনো ধীরে, কখনো দ্রুত, কখনো মধ্যম, কখনো বিলম্বিত করে আবৃত্তি করতে হয়। বিভিন্ন কবিতার গতিভঙ্গি বিভিন্ন হওয়ায় লয়ও বিভিন্ন হতে বাধ্য। কবিতা পড়ার বিশেষ এই গতিবেগকে ছন্দের লয় বা চাল বা গতি বলে। এক এক ছন্দের কবিতার গতি এক এক রকম। আবার একই ছন্দের কবিতার গতি ভিন্ন ভিন্নও হতে পারে। স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত হাস্যরসের কবিতার লয় দ্রুত আবার একই ছন্দে রচিত করুণ রসের কবিতার লয় ধীর বা মধ্যম। যেমন-
হাস্যরস:
বরেনবাবু মস্ত জ্ঞানী মস্ত বড় পাঠক
পড়েন তিনি দিনরাত্তির গল্প এবং নাটক
কবিতা আর উপন্যাসে বেজায় তিনি ভক্ত,
ডিটেকটিভের কাহিনীতে গরম করেন রক্ত

করুণ রস:
কষ্ট নেবে কষ্ট
হরেক রকম কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট।

লাল কষ্ট নীল কষ্ট কাঁচা হলুদ রঙের কষ্ট
পাথর চাপা সবুজ ঘাসের সাদা কষ্ট,
আলোর মাঝে কালোর কষ্ট
‘মালটি-কালার’ কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট।

ঘরের কষ্ট পরের কষ্ট পাখি এবং পাতার কষ্ট
দাড়ির কষ্ট
চোখের বুকের নখের কষ্ট,
একটি মানুষ খুব নীরবে নষ্ট হবার কষ্ট আছে
কষ্ট নেবে কষ্ট।

হাস্যরসের অংশটি দ্রুত পড়তে হবে নইলে কবিতার মূলভাব ফুটে উঠবে না। করুণ রসের অংশটি ধীরে পড়তে হবে নতুবা কবিতার বক্তব্য পরিস্ফুট করা সম্ভব হবে না। যদিও দুটিই স্বরবৃত্ত ছন্দে রচিত কবিতা।
একইভাবে মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত কিছু কবিতায় কখনো কখনো বীর রস উপস্থাপনের জন্য দ্রুত লয়ে পড়তে হয়। আর স্বাভাবিকভাবেই মাত্রাবৃত্তের বিলম্বিত লয় তো আছেই। যেমন:

বীর রস:
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে-
মোর মুখ হাসে মোর চোখ হাসে মোর টগবগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে
বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার ভাঙা কল্লোলে!
আস্ল হাসি, আস্ল কাঁদন,
মুক্তি এলো, আস্ল বাঁধন,
মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মোর তিক্ত দুখের সুখ আসে।
ঐ রিক্ত বুকের দুখ আসে-
আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে!

করুণ রস:
এইখানে তোর দাদির কবর ডালিম গাছের তলে
তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে
এতটুকু তারে ঘরে এনছিনু সোনার মতন মুখ
পুতুলের বিয়ে ভেঙ্গে গেল বলে কেঁদে ভাসাইত বুক।

প্রথম কবিতাটি দ্রুত এবং দ্বিতীয় কবিতাটি ধীরে পড়লে কবিতার মর্ম উপলব্ধি করা সম্ভব হবে।
অক্ষরবৃত্ত ছন্দের রস অনুযায়ী লয় দ্রুত, মধ্যম বা বিলম্বিত হতে পারে। কবির উপস্থাপন শৈলীর ওপর নির্ভর করে লয়ের অবস্থা। কবি জগৎকে যেভাবে দেখেন সেভাবেই আমাদেরকে পড়তে বাধ্য করেন। আবৃত্তিকাররা চাইলেও এর বাইরে যেতে পারেন না। কোনো আবৃত্তিশিল্পী যদি জোর করে নজরুলের ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতাকে বিলম্বিত লয়ে আবৃত্তি করতে চান তাহলে সেটি প্রকৃত অর্থেই ভালো লাগবে না এবং কবিতার মূলভাব শ্রোতার কাছে বাঙময় করতে তিনি ব্যর্থ হবেন।
উল্লেখ্য, একই রসের কবিতার গতিও বিভিন্ন হতে পারে।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply