‘আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ’ -বুখারি -অধ্যাপক মফিজুর রহমান

তোমাদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নূরে মুহাম্মাদি ও কিতাবে মুবিন এসে গেছে। (সূরা মায়েদা : ১৫) আল কুরআন, হাদিসে রাসূল, সাহাবীদের আচার ও সিরাতকারকদের বিরচিত বিশুদ্ধ সিরাতগ্রন্থগুলোই সিরাতুন্নাবী সা.-এর উৎস। রাসূল সা. তাঁর নিজের নাম ও পরিচয় সম্পর্কে নিজেই বর্ণনা করেন। “জাবির রা. হতে বর্ণিত নবী সা. বলেন, তোমাদের যেমন নাম আছে আমারও নাম আছে আমি মুহাম্মাদ, আমি আহমাদ, আমি মাহি (অবিশ্বাস দূরকারী), আমি কুফর মেটাতে এসেছি।” (বুখারি, তিরমিজি) “আমি হাশের জমায়েতকারী, হাশরের মাঠে মানবজাতি আমার কদমে জমায়েত হবে” (তিরমিজি) “আমি আকেব আমার পরে আর নবী নেই।” (তিরমিজি) “হযরত হুযায়ফা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন একবার মদিনার রাস্তায় রাসূল সা.-এর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়, তিনি আমাকে বলেন-

১. আমি মুহাম্মাদ, (আমার নাম ‘মুহাম্মাদ’- প্রশংসিত, সকল যুগে, সব সময়ে, সব বিষয়ে)
২. আমি আহমাদ, (আমার আসমানি নাম ‘আহমাদ’- প্রশংসাকারী, আল্লাহ তায়ালা আমায় তাওফিক দিয়েছেন, আল্লাহর বন্দেগি ও প্রশংসাকারী হিসেবে আমি শ্রেষ্ঠতম)
৩. আমি রহমতের নবী, (সকল সৃষ্টির জন্য আল্লাহর দয়া হিসেবে শুধু আমাকে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। আমার বিষয়ে সকল সৃষ্টিকে আল্লাহ ওহি করেছেন। আসমান জমিনের সকল সৃষ্টি আমার আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন। নাবাতাত, জামাদাত ও হাইওয়ানাত আমাকে চিনতো ও জানতো, আমি সকল ইতর প্রাণী, গাছপালার হক ও সুখ দুঃখের বিষয়ে কথা বলেছি, তাদের প্রতি দয়ার্দ্র হতে; নিষ্প্রয়োজনে কষ্ট না দিতে উম্মাতকে সাবধান করেছি)
৪. আমি তাওবার নবী, (একমাত্র রাসূল যার থেকে ভুলক্রমেও কোনো গুনাহ হয়নি। আল্লাহ বলেছেন, মুহাম্মদের সামনে ও পিছনে কোনো গুনাহ নেই তারপরও দিনে ৭০ বার গুনাহের মাফ চান। বান্দার মাফ চাওয়া একটি ইবাদাত।)
৫. আমি নবুয়ত সমাপ্তকারী, (আমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই যে, আমার মাধ্যমে নবুয়ত সমাপ্ত করা হয়েছে, আমার পরে কোনো নবী নাই, নবী আসার কারণও শেষ করে দেয়া হয়েছে।)
৬. আমি হাশের, (আমার কদমে মানবমণ্ডলী জমায়েত হবে। কিয়ামাতের কঠিন দিনে পিপাসার্ত ঘর্মাক্ত ক্ষুধার্ত মানবমণ্ডলীর বেদনা হতে মুক্তির জন্য আল্লাহ আমাকে বলবেন ও আমার সুপারিশ গ্রহণ করবেন।)
৭. আমি নাবিয়্যুল মালাহিম, (আমি যুদ্ধের পয়গম্বর, আমার মত এতো লড়াই কোনো নবীর জীবনে আসেনি, ইতিহাস বলে ২৩টি যুদ্ধে রাসূল সা. সেনাপতি ছিলেন, ৮৩টি যুদ্ধে তিনি সৈন্য পাঠিয়েছেন।)

রাসূল সা.-এর নাম ও পরিচিতি হতে
আমরা যা পেলাম

রাসূল সা.-এর আসল নাম ‘মুহাম্মাদ’ ও ‘আহমাদ’। জন্মের ৭ দিন পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব ২০০ উট জবাই করে আকিকা অনুষ্ঠান করেন। আরবের সকল কবিলা এ জিয়াফতে অংশ নেয়। দাদা নিজেই প্রস্তাব করেন নাতির নাম রাখতে চান ‘মুহাম্মাদ’ যার অর্থ প্রশংসিত (Who is praised)। এর আগে এই নামে কোনো নবী এবং কোনো মানুষেরও নাম ছিল না, আশ্চর্য যে মুহাম্মাদ নামের সার্থকতা তাঁর জীবনে ছিল শতভাগ বিকশিত। তিনি সৌন্দর্যে, সত্যবাদিতায়, আমানতদারিতায়, চারিত্রিক গুণপনায় আপন-পর, দেশী-বিদেশী সকলের নিকট প্রশংশিত।
পৃথিবীর জন্মের আগে আল্লাহ তায়ালা সকল নবীদের সম্মেলনে তাঁর প্রশংসা করেন, তাঁদের কাছে বিশ^নবীর নবুওয়াতের স্বীকারোক্তি আদায়ে অঙ্গীকার গ্রহণ করেন। (সূরা আলে ইমরান : ৮১)
সকল আসমানি কিতাবে বর্ণিত হয়েছে তার প্রশংসাগাথা।
সোয়া লাখ আম্বিয়ায়ে কেরাম মর্যাদা ও প্রশংসার সাথে তাঁর আগমনের সুসংবাদ বহন করেছেন। সবার শেষে ঈসা ইবনে মারইয়ামের কথাতো কুরআনেও বর্ণিত হয়েছে; পৃথিবীর জন্ম হতে আজ পর্যন্ত কি বিশ^াসী কি অবিশ^াসী, কি আরবি কি আযমি, কালের এমন কোনো অধ্যায় নেই, জমিনের কোনো জনপদ নেই ‘মুহাম্মাদ’ নামটি প্রশংসিত হয়নি।
প্রশংসার দিগন্ত শুধু প্রসারিত হচ্ছে ও হবে। আল্লাহ বলেন, আমি আপনার প্রশংসার দিগন্ত উচ্চকিত করেছি। (সূরা আলাম নাশরাহ : ৪)

আমি আহমাদ বেশি প্রশংসাকারী

“স্মরণ করো মারইয়ামের পুত্র ঈসা তাদের বললো, হে বনি ইসরাইল! আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূল, আমি তাওরাতের সত্যতা প্রমাণকারী আমি তোমাদেরকে আমার পরে একজন জগদ্বিখ্যাত রাসূলের সুসংবাদ দিচ্ছি। তাঁর নাম আহমাদ।” (সূরা সফ : ৬)
– আহমাদ অর্থ প্রশংসাকারী, আকাশে জগতে এটাই তাঁর নাম- ‘মুহাম্মাদ’ ও ‘আহমাদ’। যিনি সর্বদা আল্লাহর প্রশংসায় রত।
– যার প্রতিটি বুলি, চাহনির পলক, চলার প্রতিটি পদক্ষেপ, সময়ের প্রতিটি ক্ষণ আল্লাহর বন্দেগি ও প্রশংসায় ব্যয় হয়েছে।
– গোটা জীবনে কোনো গুনাহের; নাফরমানির চিহ্ন নেই।
– একটিও অর্থহীন কথা বা কাজ যার জীবনে খুঁজে পাওয়া যাবেনা। সুস্থ, অসুস্থ, রাতে, দিনে সকল অবস্থায় বন্দেগিতে নিয়োজিত।

হযরত আলী রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা কুরআনুল কারীমে আমাকে সাতটি নামে অভিহিত করেছেন-
১. মুহাম্মাদ : অর্থ- প্রশংসিত। “না, মুহাম্মাদ একজন রাসূল ছাড়া আর কিছু নয়।” (সূরা আলে ইমরান : ১৪৪)
“মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নয় বরং তিনি আল্লাহর রাসূল, নবীগণের সিলমোহর (শেষনবী)। (সূরা আহযাব : ৪০)
২. আহমাদ : অর্থ- বেশি প্রশংসাকারী। “ঈসা ইবনে মারইয়াম বলেন, হে বনি ইসরাইলের লোকেরা আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূল হয়ে এসেছি। আমি হলাম আমার পূর্বের তাওরাতের সত্যতা প্রমাণকারী, আমার পরে একজন রাসূলের সুসংবাদ দিচ্ছি তিনি ‘আহমাদ’।” (সূরা সফ : ৬)
৩. ত্ব-হা : রাসূল সা.-এর একটি নাম। “ত্ব-হা (হে নবী) আমি কুরআন এজন্য নাজিল করিনি তুমি এর দ্বারা কষ্টে পড়বে।” (সূরা ত্ব-হা : ১-২)
৪. ইয়াসিন : রাসূল সা.-এর অপর একটি নাম। “ইয়াসিন (হে নবী), জ্ঞানগর্ভ কুরআনের শপথ। তুমি অবশ্যই রাসূলদের একজন।” (সূরা ইয়াসিন : ১-৩)
৫. মুযাম্মিল : অর্থ- বস্ত্র আচ্ছাদনকারী। রাসূল সা.কে ডাকা হচ্ছে- “হে বস্ত্র আচ্ছাদনকারী (মুহাম্মাদ), রাতের কিয়দংশ বাদে সালাতের জন্য উঠো দাঁড়াও।” (সূরা মুযাম্মিল : ১-২)
৬. মুদ্দাস্সির : অর্থ- কম্বল আবৃত ব্যক্তি। রাসূল সা.কে ডাকা হচ্ছে- “হে কম্বল আবৃত ব্যক্তি (মুহাম্মাদ), ওঠো মানবতাকে সতর্ক করো, তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো (সাহসের বারুদ বুকে নিয়ে)। (সূরা মুদ্দাস্সির : ১-৩)
৭. আবদুল্লাহ : অর্থ- আল্লাহর বান্দা। “আর যখন আল্লাহর বান্দা (মুহাম্মাদ) তাঁকে (আল্লাহকে) ডাকার জন্য দাঁড়ালো তখন দুষ্টের দল (কাফেররা) তাঁর পাশে ভিড় জমালো।” (সূরা জিন : ১৯)

রাসূল সা. তাঁর নবুয়ত ও রিসালাত

এ সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেন-
“আমি আমার দাদা ইবরাহিম (আ)-এর দোয়ার ফসল।” যার দোয়া ছিল ‘হে প্রভু! আমার বংশ থেকে একজন রাসূল পাঠাও; (ইসমাইলের বংশে, এই জনপদে; কাবার পাদদেশে), যিনি তোমার আয়াত তিলাওয়াত করবে, তোমার কিতাবের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা শিক্ষা দিবে, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবে। কারণ তুমি তো মহা শক্তিশালী ও বিজ্ঞ কুশলী।’ (সূরা বাকারা : ১২৯)।
“আমি ঈসা ইবনে মারইয়াম-এর সুসংবাদ আহমাদ।”
‘ঈসা (আ) বলেন, ক. আমি তোমাদের জন্য রাসূল, খ. তোমাদের সামনে তাওরাত রয়েছে তার সত্যায়নকারী, গ. আমি এমন একজন মহান রাসূলের সুসংবাদ বহনকারী যিনি আমার পরে আসবেন, ঘ. যাঁর নাম হবে আহমাদ।’ (সূরা সফ : ৬)। আমি আমার আম্মা (আমিনার) পেশানি হতে এমন নূর (বিচ্ছুরিত জ্যোতি) যা মক্কা থেকে সিরিয়ার প্রাসাদসমূহ আলোকিত করে।” (আহমাদ দারামি)
“আমি উম্মি রাসূল” (মুসনাদে আহমাদ)
এটাই রাসূলের নবুয়তের একটি উৎকৃষ্ট দলিল, পূর্বের সকল কিতাবে তাকে আল্লাহ ‘নাবিয়্যিল উম্মি’ বলে পৃথক করে পরিচয় দিয়েছেন।
“আমি রহমতের নবী” (মুসলিম)
এতো নির্যাতিত মজলুম হয়েও কোনোদিন উম্মতকে বদদোয়া দেননি। তায়েফের মাঠে রক্তাক্ত হয়ে বেহুঁশের পর বেহুঁশ হয়েছেন। গজবের ফিরিশতা অবতীর্ণ হয়ে তায়েফবাসীকে ধ্বংস করে দেয়ার অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দেননি। বরং নবীজি সা. তায়েফবাসীর জন্য দোয়া করলেন। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে শুধু উম্মতের জন্য নয় সকল সৃষ্টির জন্য করুণা বলেছেন। “আমি আপনাকে আমার সৃষ্টির জন্য করুণা করে পাঠিয়েছি।” (সূরা আম্বিয়া : ১০৭)
‘সকল সৃষ্টির জন্য আল্লাহর করুণা’-এর ব্যাপকতা বিস্তৃতি কারো পক্ষে বর্ণনা করা অসম্ভব যেখানে সকল সৃষ্টির ধারণা পর্যন্ত মানুষের নেই।
“আমি তাওবার নবী” (মুসলিম)
আল্লাহ তায়ালা তার পূর্বে ও পরের সকল গুনাহ মাফ করে দিয়ে ওহি করেছেন। “আল্লাহ আপনার আগে ও পরের ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন।” (সূরা ফাতাহ : ২)
“আমি দিনে ১০০ বার তাওবা করি।” (মুসলিম)
আল্লাহ তায়ালা যখন সূরা নাসর নাজিল করেন “তুমি প্রভুর প্রশংসা করো তার কাছে ক্ষমা চাও তিনি কবুলকারী” মা আয়েশা বলেন, এরপর রাসূল সা. প্রায় তিন মাস জীবিত ছিলেন। সারাক্ষণ পড়তেন ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি আসতাগফিরুল্লাহা ওয়া আতুবু ইলাইহি’।
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রাসূল সা. হতে শুনেছি আল্লাহর শপথ, আমি প্রতিদিনে ৭০ বারেরও বেশি আল্লাহর নিকট ইস্তেগফার করি’।
এ তাওবা ইস্তেগফার যারা নিজের ওপর জরুরি করেছে তাদের জন্য নবী সা. তিনটি শুভসংবাদ দিয়েছেন:
ইবনে আব্বাস হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন: ১. ইস্তেগফারকারীর জন্য সকল প্রকার সঙ্কট হতে রয়েছে মুক্তি ২. সকল টেনশন হতে অব্যাহতি ও ৩. ধারণাতীত রহমত।
নবীজির আরাফাতের বক্তব্য : সাবধান পূর্বের সমস্ত জাহেলিয়াত আজ আমার দু’পায়ের নিচে পিষ্ট করছি, নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত নিষিদ্ধ ও রহিত করে দিচ্ছি, আমি সর্বাগ্রে আমার বংশের রাবিয়া বিন হারেস বিন আব্দুল মোত্তালিবের রক্তের প্রতিশোধ মাফ করে দিলাম সে বনি লাইস গোত্রে দুগ্ধ পান করেছিল এবং হোজাইল তাকে খুন করেছিল। জাহেলি যুুগের সুদের শোষণ আজ হতে নিষিদ্ধ হয়ে গেলো, আমার চাচা আব্বাস বিন আব্দুল মোত্তালিবের সকল সুদের দাবি আমি প্রত্যাহার করে দিলাম।

“আমি জাহেলিয়াত ও কুফরি বিনাশকারী” (মুসলিম)
ইবনে উমার রা. বলেন, নবী সা. বিদায় হজের খুতবায় রক্তপাত ও সুদের শোষণ থেকে মানবতার মুক্তি ঘোষণা করেছিলেন। আবার মসজিদে নববীর মেহরাব থেকে বলেন : আমাকে যুদ্ধ কবার নির্দেশ দেয়া হয়েছে যতক্ষণ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা না হবে সালাত ও জাকাত প্রতিষ্ঠায় বাধা দিলে কারো জান ও মাল রেহাই পাবে না।”

“আমি জমায়েতকারী, আমার পতাকার নিচে আদম থেকে সকলেই জমা হবে।” (বুখারি)
যে দিনের ভয়াবহতা দিয়ে আদম (আ) হতে ঈসা (আ) বলতে থাকবেন, ‘হায় আমার কী হবে?’ ইবরাহিম (আ) আল্লাহর রাগের অবস্থা দেখে নিজ চেহারার ওপর হাত দিয়ে রাখবেন, চোখ খোলার সাহস করবে না, শুধু বলবেন ‘নাফসি নাফসি’। (বুখারির হাদিসের আলোকে)
মানুষেরা পিতা আদম (আ)কে বলবেন : আমাদের সাহস হচ্ছে না, আল্লাহকে আমাদের হিসাব সহজ করতে সুপারিশ করেন দয়া করে। তিনি বলবেন, আমার পক্ষে আল্লাহকে সুপারিশ করা সম্ভব নয়, বরং তোমরা ইবরাহিমের (আ) নিকট যাও। তিনি রাজি হবেন না- ২ লাখ আম্বিয়ায়ে কেরাম সম্মিলিতভাবে মুহাম্মাদ সা.কে শাফায়াত করার অনুরোধ করলে, তিনি সিজদায় পড়ে কাঁদতে থাকবেন। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা বলবেন: মুহাম্মাদ মাথা উঠাও তুমি চাও আমি তোমার সুপারিশ মঞ্জুর করবো। বিশুদ্ধ হাদিসে কিয়ামাতের এসকল বর্ণনা আরও বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে।
“আমার পরে ৩০ জন ভণ্ড নবুয়তের দাবি করবে তারা মিথ্যাবাদী। সাবধান, আমি শেষ নবী, আমার পরে নবী নেই।” (আবু দাউদ)
উপরের হাদিসে রাসূল সা. নিজের সম্পর্কে স্পষ্ট করে যা বলেছেন তা হাদিসের বিশুদ্ধ গ্রন্থসমূহে বর্ণিত। তিনি নবুয়তের সমাপ্তকারী, অথচ উম্মতের মধ্যে মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার সাহাবীদের সুরতে উদ্ভব হয়। হযরত আবু বকর রা. ভণ্ডনবী মুসায়লামার বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন তাতে অনেক সাহাবী ও তাবেয়ীরা শহীদ হয়েছেন। এখনও কাদিয়ানিদের নতুন নবীর ফিতনা উম্মতের জন্য চ্যালেঞ্জ। ইসলামের মধ্যে মুসলমান নাম নিয়ে তারা অবস্থান করলেও তারা যে কাফের এ বিষয়ে উম্মতের ইজমা রয়েছে।
“আমি লড়াইয়ের নবী।” (বুখারি)
সকল নবীর চাইতে আমি বেশি যুদ্ধ করেছি, আমি যুদ্ধ রেখে আসছি কিয়ামত পর্যন্ত হক না হকের যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে ইসা ইবনে মারইয়াম এর সমাপ্তি টানবেন পৃথিবীর ও যবনিকাপাত হবে।
২৩টি যুদ্ধে স্বয়ং তিনি সেনাপতি। বদর ওহুদ, খন্দকসহ ৮৭টি যুদ্ধে তিনি সৈন্য পাঠান।

“আমার উম্মতের জান্নাত তরবারির ছায়ার নিচে।” (বুখারি)
সূরা আনফালের ১৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন যুদ্ধের মাঠে শত্রুর মুখামুখি হও, তখন পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে না। সেনাপতির নির্দেশে যুদ্ধ কৌশলের জন্য বা বন্দী হলে এ দুই কারণ ছাড়া যারা পালাবে তারা আল্লাহর গজব নিয়ে পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে, জাহান্নাম তাদের ঠিকানা। যা অতীব নিকৃষ্ট স্থান”। (সূরা আনফাল : ১৫-১৬)
উম্মতে মুহাম্মাদি ভুলে গেলে চলবে না আজ পর্যন্ত কোনো আসমানি কিতাবের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়নি। কিন্তু যুদ্ধের জন্য উসকিয়ে দেয় এ অভিযোগে অনেকবার কুরআনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। যার ওপর এই কুরআন নাজিল হয়েছে, তিনি বলছেন, ‘আমি যুদ্ধের ও লড়াইয়ের নবী’ আর উম্মতের এক শ্রেণীর কথিত আলেমদের একটি অংশ মনে করে জিহাদের কথা যারা বলে আসলে তারা ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করে, অথচ মুহাম্মাদ সা. সোয়া লাখ পয়গম্বর হতে আলাদা।

রাসূল সা.কে কী মিশন নিয়ে পাঠানো হয়েছে?

এটি অনেক বিস্তারিত বিষয়। এ বিষয়ে হাদিসে রাসূলের আলোকে অর্থাৎ রাসূল সা. হতে আমরা জানবো,
মুহাম্মাদ সা. নিজেই বলেছেন, আমাকে আল্লাহ শিক্ষক হিসেবে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন। “আমি শিক্ষক হিসেবে পৃথিবীতে এসেছি, আমি সবকিছুকে সহজ করবো।” (মুয়াত্তা মালেক)
যিনি কারো কাছ থেকে একটি বর্ণও শিখেননি। পড়তে জানেন না, লিখতেও জানেন না। ৪০ বছরের জীবন পর্যন্ত এ অবস্থায় আরব জনপদে ছিলেন। সকলে তাকে চিনতো ও ভালোবাসতো আল-আমিন বলে ডাকতো। জানতো বিখ্যাত কুরাইশ বংশে তাঁর জন্ম, ইতিহাস বিখ্যাত আব্দুল মুত্তালিবের নাতি। হেরা গুহায় ওহি নাজিলের সময় জিবরাইল আমিন যখন বলেন পড়ো! তিনি বলেছিলেন ‘আমি পড়তে জানি না।’
নবী সা. বলেন, আমাকে সৃষ্টি জগতের শুরু ও শেষ অবধি সকল জ্ঞান ফুঁকে দেয়া হয়েছে। (মানবজীবন সংক্রান্ত মোয়ামিলাত, মোয়াশেরাত, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, যুদ্ধ, সন্ধি, বিচার ইত্যাদি এমন কোন বিষয় নেই তিনি শিক্ষা দেননি। তার সাহাবীরা দুনিয়ার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনায়ক, শ্রেষ্ঠ সমরবিদ, শ্রেষ্ঠ সংস্কারক, শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ছিলেন)
“না, মুহাম্মাদ নিজ হতে কিছু বলে না, বরং যা বলে তা হচ্ছে ওহি।” (সূরা নাজম : ৩-৪)
তাঁকে কি সীমাহীন জ্ঞান, বিজ্ঞান ও রহমত আল্লাহ সরাসরি তাঁর সিনা ফুঁকে দিয়েছেন কারো পক্ষে এর পরিমাপ করা ও সীমার সন্ধান করা মহাকাশের বিস্তৃতির পরিমাপ করার ব্যর্থ প্রয়াস ছাড়া আর কিছু না।
নবীজি সা. বলেন, আমি প্রেরিত হয়েছি নৈতিক চরিত্রের চূড়ান্ত পরিপূর্ণতা ও বিকাশ সাধনের জন্য।” মানব ইতিহাস যত পুরনো নৈতিকতার সঙ্কট ও সমস্যা তত পুরনো। মানুষ ও জিন জাতি ছাড়া আর কোনো সৃষ্টির সাথে এ বিষয়টি সম্পৃক্ত নয়। আমাদের আলোচনাতে শুধু ইনসান সম্পৃক্ত থাকবে। জিনদের বিষয়ে আমাদের জ্ঞান এতটুকু আছে মানুষের বিভ্রান্তির পথে সবচেয়ে অনৈতিক শক্তি, দৃষ্টির অন্তরালে থেকে আমাদের ক্ষতিসাধনে সার্বক্ষণিক ব্যস্ত সেই ইবলিসও জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত। এ জাতির মধ্যে কিছু ভালো ও কিছু মন্দ রয়েছে- ইবলিস শুধু চিরন্তনভাবে অভিশপ্ত। মানব ও জিন ছাড়া আল্লাহর সকল সৃষ্টি তাঁর ইচ্ছায় তাদের জন্য প্রণীত জীবনধারা, জীবন আচরণ নির্ভুলভাবে মেনে চলে আসছে অনাগত কাল থেকে। তাদের মধ্যে কোনো বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হয়না।

মানুষ আল্লাহ প্রদত্ত বিধিবিধান মেনে চলতেও পারে আবার নাও পারে। যদিও সীমালংঘন করার ক্ষমতা প্রদান একটি পরীক্ষা মাত্র। ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা পেয়েও যারা নফরমানি করেনি, সীমালংঘন করেনি বরং আল্লাহর রঙে নিজকে রঙিন করেছে তারাইতো প্রভুর প্রিয়ভাজন। জান্নাত তো তাদের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পুরস্কার।
হযরত জাফর বিন আবি তালেব রা. মজলুম ১৬ জন মুহাজিরের সাথে হিজরত করেছিলেন আফ্রিকার খ্রিষ্টান শাসক নাজ্জাশির দেশ আবিসিনিয়ায়। রাজদরবারে ভাষণ দেয়ার সময় তিনি তৎকালীন আরব দুনিয়ায় নৈতিক অনাচারের এক জীবন্ত বর্ণনা দেন। তা থেকে আমরা বুঝতে পারবো মুহাম্মাদ সা. কোন পরিবেশে পৃথিবীতে এসেছিলেন।

জাফর রা. বলতে শুরু করলেন, হে বাদশাহ! আমরা ছিলাম অসভ্য বর্বরতার গহিন অন্ধকারে নিমজ্জিত। শরাব, ব্যভিচার, খুন হত্যা, কন্যাসন্তানদের জীবিত কবরে পুঁতে দেয়া ছিলো সামাজিক প্রথা। উলঙ্গ হয়ে নারী-পুরুষ একসাথে কাবা প্রদক্ষিণ করা থেকে এমন কোনো পাপাচার অনৈতিক কাজ নেই যা আমাদের সমাজে ছিলো না। শিশুহত্যা, ধর্ষণ, শরাব পান, বেহায়াপনা কোনো কিছুই তারা গোপনে করতো না, সবকিছু প্রকাশ্যে সংঘটিত হতো প্রায় সবাই এতে লিপ্ত ছিলো। মুহাম্মদ সা. এ জনপদে ঘোষণা দিলেন: সকল প্রকার জাহেলিয়াত আমার দুই পায়ের নিচে পিষ্ট করছি।

আমরা অসংখ্য দেবতাকে মাবুদ বলে পূজা করতাম, এক আল্লাহ তায়ালার কোনো ধারণা আমাদের ছিলো না। এক একটি প্রয়োজনের জন্য এক এক দেবতা আর এমনি করে অসংখ্য প্রয়োজন জন্ম দিচ্ছিল অগণিত দেবতার মিছিল। গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, নুড়ি পাথর, নদী-নালা এমন কিছু নেই আমরা পূজা করি না, আল্লাহর ঘরকে আমরা শত শত দেবতার আস্তানায় পরিণত করেছিলাম। মুহাম্মদ সা. ঘোষণা দিলেন- সাবধান হে মানবমণ্ডলী এক আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই।

আমরা মৃত লাশ ভক্ষণ করতাম। আমাদের নিকট পবিত্র ও অপবিত্রের কোনো ধারণা, বৈধ ও অবৈধ সম্পর্কে কোনো বোধশক্তি ছিল না, শূকর, কুকুর, জীবিত, মৃত আমাদের খাদ্যতালিকায় সব ছিলো, এ অসভ্যরা নারীদের হায়েজের খুন চেটে খেতেও লজ্জা অনুভব করতো না। মুহাম্মদ সা. বললেন: সাবধান, আল্লাহ তোমাদের জন্য হারাম করেন রক্ত, মৃত, শূকরের মাংস এবং আল্লাহ ছাড়া দেবতার নামে উৎসর্গকৃত প্রাণীর গোশত।

আমরা ভয়ঙ্কর ব্যভিচারে লিপ্ত ছিলাম। সে যৌনাচার এখনও পৃথিবীর আধুনিক সভ্যতার অনুষঙ্গী আজকের কাব্য, সাহিত্য, সংস্কৃতি, নাটক, উপন্যাস, সঙ্গীত ও কলার মূল উপজীব্য- একটি বিবস্ত্র নারী। এ ধরনের পাপাচার পৃথিবী যেন আর বহন করতে পারছে না। ৮ বছরের মেয়ে ৮০ বছরের বৃদ্ধা দাদীর সাথেও বলাৎকার কি এর সাক্ষ্য দিচ্ছে না, এরা ইতরদের স্তর থেকে আরও নিচে নেমেছে। নবীজি সা. কুরআন হাতে বলেন: সাবধান, ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না, নিশ্চয় ইহা জঘন্য অশ্লীলতা ও পাপাচারের পথ।”

আমরা রক্তের আত্মীয়তাও ছিন্নকারী ছিলাম। আমাদের জাহালত পশুত্বের নেমে স্তরে গিয়েছিলো। মা-বাবা ভাইবোনসহ অন্যান্য রক্তের সম্পর্কও ছিল মূল্যহীন। ঘনিষ্ঠ আপনজনদের প্রতিও কোনো দায়িত্ব পালনের অনুভূতি আমাদের মধ্যে অবশিষ্ট ছিলো না। আমরা অসুস্থ পিতা-মাতা, আপনজনদের প্রতিও সহানুভূতি দেখাতাম না। অনেক সময় নিজেদের মধ্যে সংঘাত লেগে থাকতো। মুহাম্মদ সা.-ই সর্বপ্রথম আমাদেরকে পিতা-মাতা, ভাইবোনের হক ও অধিকার সম্পর্কে আল্লাহর বাণী স্মরণ করিয়েছেন: “হে মানুষ তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। যিনি তোমাদেরকে এক আদম হতে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আদম হতে তাঁর স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন। তাদের দুইজন হতে তোমাদের মানব বংশ বিস্তার করেছেন।” (সূরা নিসা : ১)

আমরা প্রতিবেশীর হক আদায় করিনি। এক মানুষের ওপর অপর মানুষের যে দায়িত্ব আছে আমাদের সমাজে তা ছিলো না। প্রতিবেশীর সুখে দুঃখে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো যে সমাজে ছিলো না। তারা সামান্য বিষয়ে প্রতিবেশীর সাথে সংঘাত ও বিবাদে লিপ্ত হতো, একই স্থানে উটকে পানি পান করাতে গিয়ে আগে ও পরে এতটুকুতে সংঘাত ও খুনাখুনি চলতো, যা যুগ যুগান্তর পর্যন্ত গড়াতো।

আমাদের সমাজে দুর্বলদের সম্পদ শক্তিশালীরা জোর করে ভোগ দখল করতো। সে বর্বর যুগের নিয়ম হলো, জোর যার মুল্লুক তার। সে বেদুইনদের সমাজে ন্যায়, ইনসাফ, সততা ও মানবতার মৃত্যু হয়েছিলো বহু আগে। সে সমাজে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতো পেশিশক্তি। দুর্বল ও অসহায় মানুষ নারী ও বৃদ্ধরা ছিলো করুণার পাত্র। তাদের ন্যূনতম বাঁচার অধিকারটুকুও কেড়ে নেয়া হয়েছিল। শক্তিমানদের হাতে দুর্বল অসহায়দের জানমাল ইজ্জত, নিরাপত্তা সবকিছু মূল্যহীন। মুহাম্মদ সা.-এর আগমন এবং তাঁর আদর্শ যেন মৃতদের মধ্যে জীবনের সঞ্জীবনী। নবী সা. বলেন, হে মানব সকল! সাবধান, তোমাদের একজনের রক্ত, তার সম্মান তার মালসম্পদ অপরের জন্য হারাম ও পবিত্র আমানত। যেমন আজকের আরাফার দিন, এ হজ্জের মাস, এ মক্কা নগরী হারাম ও সম্মানিত।
হযরত আম্মাজান আয়েশা রা.কে রাসূলের সা. আখলাক ও চরিত্র কেমন জিজ্ঞাসার জবাবে তিনি বলেন: “রাসূল সা. আখলাক আল কুরআন ছাড়া আর কিছু নয়। বিষয়টিকে বুঝিয়ে বলার জন্য ইবনে যোবাইর রা. আবার অনুরোধ করলে, হযরত আয়েশা রা. বলেন। আবদুল্লাহ সূরা মুমিনুন পড়ো। দশ আয়াত পড়ার পর হযরত আয়েশা বলেন, থামো, আবদুল্লাহ এই আয়াতসমূহ যে সকল গুণাবলি আলোচিত হয়েছে ইহাই রাসূলুল্লাহ সা.-এর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য।”
রাসূলের যুগে যেসকল জাহেলিয়াত ও নৈতিক অবক্ষয় ৭টি শিরোনামে হযরত জাফর রা. বাদশা নাজ্জাশির খ্রিষ্টান জনপদে বলেছিলেন। আজ আবার আধুনিকতার চকমকে ও জৌলুশপূর্ণ পোশাক পরে ১৪শত বছর সে পুরনো জাহিলিয়াত মাথা উঁচু করেছে। আজকের দাঈদেরকে সে চরিত্রের হাতিয়ার সংগ্রহ করতে হবে। এটাই মানব সংশোধনের নবুওয়াতি পদ্ধতি। নবীজি সা. চরিত্রের অত্যাশ্চর্য যাদু দিয়ে যেন সবকিছুকে পরাভূত করেছিলেন। শত শত টন মারণাস্ত্র পৃথিবীতে খুন খারাবি, অশান্তির দাবানল জ্বালাতে পারলেও অবক্ষয়ের কবল থেকে, নৈরাজ্যের হিংস্রতা থেকে, যৌনাচারের অশ্লীলতা থেকে, নেশার মাতলামি ও ধ্বংসের ভয়াল সমুদ্র হতে উঠিয়ে আনতে পারবে কি? না কখনও নয়। হৃদয়ে দরদ ও মায়া নিয়ে, উন্নত ও জাদুময়ী আখলাকের পরশ বুলিয়ে অব্যাহতভাবে লেগে থাকলে এদের মধ্যে সুপ্ত মানবিক মূল্যবোধ জীবিত হতে পারে।

সূরা মুমিনুন (২৩) এর প্রথম দশ আয়াতে বর্ণিত আখলাকে মুহাম্মাদী সা.
প্রথমত : ঈমান। এটা আখলাকের বুনিয়াদ। এটা সকল কামিয়াবি ও সফলতার প্রথম শর্ত। সকল নবীর দাওয়াতের মূল বিষয়। এ ঈমান হলো গায়েবের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস, তাগুতে অবিশ্বাস। আল কুরআনই ঈমানকে মজবুত করে। রাসূল সা.-এর ঈমান ছিলো ঈমানে কাসিম যেখানে সন্দেহ নেই, নিফাক নেই, শিরক নেই।
দ্বিতীয়ত : সালাত। এটা আখলাকের প্রথম চিহ্ন/পরিচয়। বন্দেগির শাহাদাত/সকল বন্দেগির সমষ্টি। যে বন্দেগির জন্যই ইনসান সৃষ্টি হয়েছে। অবিশ্বাসী ও বিশ্বাসীর মধ্যে পার্থক্যকারী। যেখানে সালাত নেই সেখানে বিশ^াসের অস্তিত্ব সন্দেহজনক। এটা সকল পয়গম্বরের ওপর ফরজ। সফলকাম তারা, যারা খুশুর সাথে সালাত আদায় করে। হতভাগ্য তারা যারা সালাত আদায়ে উদাসীন।

তৃতীয়ত : অপ্রয়োজনীয় কথা কাজ এড়িয়ে চলা। যে হায়াতের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য জিজ্ঞাসা করা হবে, অপ্রয়োজনে সে হায়াত ব্যয় করার পরিণতি শুভ হবে না। তারা সফল হয়েছে অর্থহীন কথা ও কাজ যাদের জীবন ধ্বংস করেনি। কিয়ামাতের দিন প্রত্যেককে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব আল্লাহকে দিতে হবে এর প্রথম প্রশ্ন হবে- হায়াত কোথায় এবং কিভাবে ব্যয় করেছিলে হিসাব দাও। রাসূল সা. বলেন: ইসলামী জিন্দেগির সৌন্দর্যই হলো, অপ্রয়োজনীয় সবকিছুই বর্জন। তিনি নবুওয়াতি হায়াতের একটি মুহূর্তও অপচয় করেননি।

চতুর্থত : তাযকিয়ার কাজে সর্বদা নিয়োজিত থাকা। সকল নবী-রাসূলদের আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব। ব্যক্তিজীবন পরিচ্ছন্ন করা। তাযকিয়াতুন্নাফস থেকে শুরু করে সমাজের সকল প্রকার অনাচার দূরীভূত করার জিহাদে রাসূল সা. আমরণ নিয়োজিত ছিলেন। অনেকে এটাকে ‘জাকাত’ অর্থ করেছেন অর্থটি কিন্তু ব্যাপক অর্থে গ্রহণ করতে হবে। এ আয়াতগুলো নাজিল হয়েছিলো মাক্কি যুগের প্রথমে যখন জাকাতের বিধান অবতীর্ণ হয়নি।
রাসূল সা.-এর চরিত্রের সাথে তাযকিয়া অপরিহার্য ও অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত। “মুহাম্মাদ তাদেরকে আল্লাহর আয়াত পড়ে শোনাবে, তাদের জীবনকে পবিত্র করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমাহ শেখাবে। (সূরা জুমআ : ২)

পঞ্চমত : পবিত্রতা। আল্লাহ তায়ালা নৈতিক চরিত্র সংরক্ষণকে সকল নবীর জন্য ফরজ করেছেন। ইউসুফ (আ)-এর নৈতিক পরীক্ষা ও তাঁর পবিত্রতার সংরক্ষণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা আখেরি কিতাবে বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সা.-এর নৈতিক পবিত্রতা এক মোজেজাতুল্য। ব্যভিচার শরাব ও খুন যে সমাজের বৈশিষ্ট্য। মুহাম্মাদ সা. সে সমাজ থেকে এ সকল খারাবি দূর করেন। তিনি বলেছেন: আমার দুই পায়ের নিচে পিষ্ট করে যাচ্ছি।
আমানত দাবিদার চরম পরাকাষ্ঠা রাসূলুল্লাহ সা.-এর আখলাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইসলামে এর গুরুত্ব অপরিসীম। জীবনে এমন কোনো সময় ও কাজ আমার জানা নেই যার সাথে আমানতদারিতার বিষয় জড়িত নয়। মুহাম্মাদ সা.-এর নবুয়ত পূর্ব ও নবুয়ত পর অর্থাৎ গোটা জীবনের কোনো স্থানে, পরিবারে, লেনদেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে ও যুদ্ধে সন্ধিতে একটি মিথ্যা কথা, ওয়াদা খেলাপি, চুক্তি লঙ্ঘনে একটি ক্ষুদ্র দৃষ্টান্তও কি ইতিহাসের দলিলে আছে? শিশু হতে আমৃত্য তাকে গোটা আরব জানতো ও ডাকতো ‘আল আমিন’ ও ‘আস সাদিক’ অর্থাৎ আমানতদার, পরম সত্যবাদী। আমার কাছে মনে হয় বিশ^নবীর নবুয়তের বিশাল মিনার দাঁড়িয়ে রয়েছে সত্যবাদিতা ও আমানতদারিদার ওপর।
সূরা মুমিনুনের ১০টি আয়াত পড়ার সাথে হযরত আয়েশা রা. বলে ওঠেন: এই গুণগুলোই মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহর আখলাক।” (নাসায়ি)
মুহাম্মাদ সা. এমন সময় এসেছিলেন যখন পৃথিবী হেদায়াতের আলোশূন্য ছিলো, জাহেলিয়াত গোমরাহির অন্ধকার পৃথিবীকে ঢেকে নিয়েছিলো। রাত শুধু নয়, অমাবস্যার কালোরাত, আকাশ ছিলো ঘন কৃষ্ণ মেঘে আবৃত, বাইরে প্রচণ্ড ঝড় তুফান। তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ একা, ইয়াতিম, নিঃস্ব। আল্লাহ বলেন: “ভয়ের কম্বল ছুড়ে ফেলো, কোমর সোজা করে দাঁড়াও, সাবধান করো বিশ্বমানবতাকে। তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো সর্বত্র।” (সূরা মুদ্দাস্সির : ১-৩) তোমার চরিত্রই হাতিয়ার এটি এতো ধারালো নিখুঁত, ক্ষিপ্র গতিময়, এর পাল্লা পৃথিবীর প্রান্তসীমা। এটি এতো অব্যর্থ- সকল কিছুই এর সামনে ধূলিবালি। “তোমাকে চরিত্র দিয়ে মুড়িয়ে দেয়া হয়েছে।” (সূরা ক্বলাম : ৪) হে মুহাম্মাদ! তোমার চরিত্র এতই বর্ণিল যেন সকল রঙের সমাহার। রংধুনতে সাত রং তোমার চরিত্রের সাত বৈশিষ্ট্যই যেন সে বর্ণিলতার সার্থক প্রকাশ। আসুন সেগুলো এক একটি পৃথক করতে শিখি। সিদ্ধান্তের তুলি দিয়ে নিজেকে রাঙাই; দৃষ্টিনন্দন হয়ে ফুটে উঠি। শৈল্পিক অনুভূতিতে ও মননে, সংগঠন, সমাজ ও বিশ্বকে রাঙাই, এঁকে দেই আলপনা।

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply