আরাকানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস -ড. মাহফুুজুর রহমান আখন্দ

মিয়ানমারের ‘রাখাইন স্টেট’ নামে পরিচিত আরাকান রাজ্যে মুসলমানদের জীবন আজ মগ-বৌদ্ধ, সেনাবাহিনী এবং গণতন্ত্রের নতুন ফেরিওয়ালা অং সান সু চির হাতের মুঠোয়! মানুষের মাংসে বারবিকিউ বানানো কিংবা নোংরা যৌন-লালসা চরিতার্থ করার সব উপকরণ যেন এখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে আরাকানের সমগ্র এলাকাজুড়ে এখন মানবতার হাহাকার। গণহত্যার ভয়াবহ স্মৃতি বহন করে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ জীবন বাঁচানোর জন্য দীর্ঘকষ্টের পথ পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলার নানা স্থানে। অবুঝ শিশু, নারী-পুরুষ, বৃদ্ধ এবং অসংখ্য আহত মানুষের কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে সেখানকার আকাশ বাতাস। অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা তো দূরের কথা ন্যূনতম মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুও মিলছে না। মানবিক বিপর্যয়ে পতিত এসব অসহায় নারী শিশু বৃদ্ধসহ নির্মমভাবে আহত মানুষের কষ্ট লাঘবে পাশে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। সেইসাথে মুসলিমবিশ্বের নেতৃবৃন্দসহ আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলকে নাড়া দিয়েছে এ অমানবিকতা। তবে বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত ও চীনের ভূমিকা বিশ্ববাসীকে হতবাক করেছে। আরাকানে হাজার বছরের সোনালি ইতিহাসের নির্মাতা রোহিঙ্গা জাতিসত্তাকে গণহত্যা চালিয়ে নির্মূল করার অভিযানে বিশ্বের সকল বিবেকবান মানুষকে আহত ও বিস্মিত করেছে। কোন ধরনের মিডিয়াকর্মীকে সেসব এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। সরকার, মগ-বৌদ্ধ এবং সেনাবাহিনীর বানানো খবরই প্রচারিত হয় সারা বিশ্বমিডিয়ায়। ইতিহাস নির্মাণ হচ্ছে তাদেরই ইচ্ছে মতো। অথচ আরাকানের সোনালি ইতিহাসের ¯্রষ্টাই হচ্ছে রোহিঙ্গারা।
আরাকান অঞ্চলটি বর্তমানে মিয়ানমারের একটি প্রদেশ। মিয়ানমারের পূর্ব নাম ছিল বার্মা। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জুন সরকারিভাবে বার্মার নাম পরিবর্তন করে মিয়ানমার রাখা হয়েছে। খ্রিস্টপূর্ব ২৬৬৬ অব্দ থেকে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর ধরে আরাকান স্বাধীন ছিল। নে উইন সরকার ১৯৭৪ সালে সেই আরাকানের নামও পরিবর্তন করে ‘রাখাইন স্টেট’ রাখেন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চল আরাকান। এর উত্তরে চীন ও ভারত, দক্ষিণ ও পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, উত্তর ও পশ্চিমে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তবর্তী নাফ নদীর মধ্যসীমা এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম। পূর্বে মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী ইয়োমা পর্বতমালা। এ সুদীর্ঘ, দুর্গম, সুউচ্চ ও বিশাল ইয়োমা পর্বতমালা দুর্ভেদ্য প্রাচীরের মত আরাকানকে মিয়ানমার থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। যোগাযোগের সুবিধা ও ঐতিহ্যগত দিক দিয়ে মিয়ানমারের চেয়ে চট্টগ্রামই আরাকানের কাছাকাছি ও বন্ধুপ্রতিম অঞ্চল। প্রকৃতপক্ষে ছোটখাটো পর্বতমালা ও নাফ নদীর ব্যবধান ব্যতীত উভয় অঞ্চলের (চট্টগ্রাম-আরাকান) অভিন্ন গোত্রীয় জনবসতির তেমন আর কোন অন্তরায় ছিল না। তাই চট্টগ্রামে অস্টিকাদি জনগোষ্ঠী ও আরাকানে ভোট চীনা গোত্রীয় কিরাত জাতীয় লোকদের আধিক্য পরিলক্ষিত হয়। খ্রিস্টপূর্ব থেকে খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতক পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও আরাকান একটি অখন্ড রাজ্য হিসেবে চন্দ্রসূর্য রাজাগণ কর্তৃক শাসিত হলেও সময়ের ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামের সমাজ গড়ে ওঠে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের আলোকে এবং আরাকানি সমাজ গড়ে ওঠে বৌদ্ধ ধর্মীয় চেতনার আলোকে। অচিরেই এসব এলাকা ইসলামী আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। মিয়ানমারের সাথে দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার ফলেই সুদীর্ঘকালব্যাপী আরাকানের রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য ও নিরাপত্তা অক্ষুণœ রাখা সম্ভব হয়েছিল। বাংলাদেশের কক্সবাজার, রামু ও চট্টগ্রামসহ একটি বিশাল অংশ দীর্ঘদিন যাবৎ আরাকানের শাসনাধীনে ছিল। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে শায়েস্তা খান কর্তৃক বর্তমান নাফ নদী পর্যন্ত বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা।
আরাকানের দৈর্ঘ্য ৩৬০ মাইল কিন্তু প্রস্থে উত্তর আরাকান ১০০ মাইল এবং আরাকানের দক্ষিণাংশে নিচের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে ২০ মাইল। সমগ্র আরাকান অঞ্চল উত্তর-পশ্চিমে ১৭১ মাইলব্যাপী নৌ ও স্থল সীমারেখা সহকারে বাংলাদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত। নাফ, মায়ু, কালাদান, লেমব্রু, অনন, তানগু, ও স্যান্ডোয়ে প্রভৃতি আরাকানের প্রধান নদী। আরাকানে প্রায় ছোট বড় ১৭টি শহর আছে। শহরগুলো হলো আকিয়াব, কিয়াউকপায়ু, স্যান্ডোয়ে, কিয়াকতাউ, বুচিদং, মংডু, মিনবিয়া, ম্রাউক-উ, গোয়া, টংগু, পিউকতাউ, পোন্নগিউ, মেবন, মেনাং, রামব্রী, রাথিদং ও অন প্রভৃতি। এ শহরগুলোর রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব ব্যাপক থাকলেও মূলত স্যান্ডোয়ে, সিটওয়ে, মায়ু এবং কিয়াকপাউ- এ চারটিই আরাকানের প্রশাসনিক ইউনিট। আরাকানের মোট সমগ্র জনগোষ্ঠীর ৬০% রোহিঙ্গা ছিল। সময়ের ধারাবাহিকতায় তারাই এখানকার অর্থনীতি, সমাজ, সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে একটি অভিনব এবং স্বতন্ত্র অধ্যায় বিনির্মাণে সক্ষম হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ের নিধন মিশনে মুসলমানদের সংখ্যা কমে এসেছে। বর্তমানে ১৪ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমান থাকলেও তাদের নির্মূলেই এবারের অভিযান চলছে।

আরাকানে ইসলাম প্রচার

বাংলা ও আরাকান সীমান্তগত দিক থেকে শুধু প্রতিবেশীই নয় বরং চট্টগ্রাম অঞ্চল বিচ্ছিন্নভাবে প্রায় ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত আরাকানের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে বাংলায় ইসলাম প্রচারের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যেমন চট্টগ্রামে ইসলাম প্রচারকে আলোচনা করা হয় তেমনি আরাকানের ইসলামের আগমন আলোচনা করতে হলেও চট্টগ্রামের আলোচনা অপরিহার্য। কেননা তৎকালীন সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চল মূলত আরাকানেরই অংশ ছিল। সে হিসেবে চট্টগ্রামে ইসলামের আগমন অর্থই হলো আরাকানে ইসলাম প্রচারের সূচনা।
হিজরি প্রথম শতকের শেষ দিকে (৯৬ হি.) ৭১২ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া শাসনামলে সেনাপতি মুহাম্মদ বিন কাসিমের নেতৃত্বে সিন্ধু অঞ্চলে ইসলামের বিজয় নিশ্চিত হবার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রাজনৈতিকভাবে ইসলামের প্রতিষ্ঠা শুরু হলেও মূলত পবিত্র মক্কায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রায় সমসাময়িক কালে মহানবী (সা) এর জীবদ্দশাতেই ভারতীয় উপমহাদেশসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিশেষত আরাকান অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে। কেননা খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীর পূর্ব থেকে আরব বণিকেরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্যিক পথে ভারত, বার্মা ও চীনের ক্যান্টন বন্দরে বাণিজ্যিক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিল। উল্লেখ্য, দক্ষিণ-পূর্ব বাণিজ্যিক পথ বলতে ভারত মহাসাগরীয় সামুদ্রিক পথকে বুঝানো হয়ে থাকে। এ পথ একদিকে মেসোপটেমিয়া এবং পারস্যোপসাগর থেকে অন্যদিকে মিশর ও লোহিত সাগর থেকে শুরু হয়ে ভারতের পশ্চিম উপকূলে মালাবার পর্যন্ত চলে যেত; সেখান থেকে একদিকে শ্রীলংকা, ইন্দোচীন এবং দক্ষিণ চীন পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আরবের কুরাইশরাও ইসলাম-পূর্ব যুগেই এ বাণিজ্যিক পথে তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। বিশেষত পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে পারস্য (ইরান) ও রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে অব্যাহত যুদ্ধ বিগ্রহের কারণে আরবদের স্থল বাণিজ্যিক পথ মারাত্মকভাবে বিপদসঙ্কুল হয়ে পড়েছিল। ইয়েমেন ও হাজরা মাউতের আরব বণিকদের নৌবাণিজ্যের পূর্ব অভিজ্ঞতার সুবাদে আরবের কুরাইশরাও নৌবাণিজ্যে আগ্রহী হয়ে ওঠে। সে সূত্রেই মহানবী (সা)-এর আগমনের পূর্বেই তারা ভারতীয় উপমহাদেশ, বার্মা, কম্বোডিয়া ও চীনের ক্যান্টন পর্যন্ত বাণিজ্যিক যোগাযোগ স্থাপন করেছিল এবং ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীর সূচনালগ্নেই তারা দক্ষিণ ভারতের মালাবার, কালিকট, চেররবন্দর, তৎকালীন আরাকানের চট্টগ্রাম ও আকিয়ারের সামুদ্রোপকূলে স্থায়ী বাণিজ্যিক উপনিবেশও গড়ে তোলে। পূর্ব অভিজ্ঞতার আলোকেই ইসলাম প্রতিষ্ঠার সমসাময়িক কালের মুসলমানরাও বাণিজ্যিক কারণে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য করতে আসে এবং সপ্তম শতাব্দী থেকে একাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চীনা বাণিজ্যে মুসলিম প্রভাব অব্যাহত রাখে। তৎকালীন সময়ে দক্ষিণ চীনের ক্যান্টন বন্দর ‘খানফু’ নামে পরিচিত ছিল। মুসলিম বণিকগণ এ সময় ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চল বিশেষত মালাবার এবং চট্টগ্রাম থেকে কাঠ, মসলা, সুগন্ধীদ্রব্য ও ঔষধি গাছগাছরা সংগ্রহ করত। বাণিজ্যিক কারণে মুসলমানরা এ সব অঞ্চল সফর করলেও মূলত ইসলাম প্রচার তাদের মুখ্য বিষয় ছিল। কেননা দীনের দাওয়াত দান ও দীন প্রতিষ্ঠার কাজকে প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অত্যাবশ্যকীয় করে দেয়া হয়েছে। দীন প্রচারের এ অনুভূতির প্রেক্ষিতে তারা বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি ইসলাম প্রচারকে অন্যতম প্রধান কাজ হিসেবে গ্রহণ করার কারণে মহানবীর (সা) জীবদ্দশাতেই ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম প্রচারের প্রমাণ পাওয়া যায়।
মহানবী (সা) এর নবুয়তের পঞ্চম বছরে অর্থাৎ ৬১৫ খ্রিস্টাব্দে দিকে মক্কার প্রতিকূল পরিবেশে মুসলমানদের ঈমান-আকিদা নিয়ে বেঁচে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় মহানবী (সা) সাহাবিদেরকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। মহানবী (সা)-এর নির্দেশের প্রেক্ষিতে হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা) সহ প্রায় ৮৩ জন সাহাবি হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশির দরবারে আশ্রয় নেন। সম্রাট নাজ্জাশির পুরো নাম আসহামার ইবনে আবহার নাজ্জাশি। তিনি ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর হযরত মুহাম্মদ (সা) গায়েবানা জানাজা আদায় করেছিলেন। আলিমগণ কেউ কেউ তাকে সাহাবি আবার কেউ কেউ তাবেঈ মনে করেন। মূলত মুসলমানদের নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি ইসলামের সুমহান আদর্শ মক্কার বাইরে প্রচারের সুযোগ সৃষ্টির উদ্দেশ্যেই মহানবী (সা) এ সকল বিজ্ঞ সাহাবিকে আবিসিনিয়ায় প্রেরণ করেছিলেন। কারণ আবিসিনিয়া ছিল লোহিত সাগরে প্রবেশপথে অবস্থিত একটি উল্লেখযোগ্য অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র। পশ্চিমে মিশর এবং পূর্বে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত সমুদ্রপথে চলাচলকারী বাণিজ্যিক নৌবহরসমূহ আবিসিনিয়ায় এসে যাত্রা বিরতি করত। পূর্ব-পশ্চিম উভয় দিকের বণিকরাই এখানকার বাজারে বিপুল পরিমাণে পণ্য বিনিময় করত। এ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিকেন্দ্র হতে বিশ্বের খবর আদান প্রদানের বিশাল সুযোগ মুসলমানদের হাতে আসে। এটা ছিল আবিসিনিয়ায় হিজরতকারী মুসলমানসহ মহানবী (সা)-এর জন্য ইসলাম প্রচারের সুবর্ণ সুযোগ।
মহানবী (সা) মদিনায় হিজরতের পরবর্তী সময়ে আবিসিনিয়ায় প্রায় সকল মুসলিম মুহাজির মক্কা-মদিনায় ফিরে এলেও আবু ওয়াক্কাস (রা) আর ফিরে আসেননি। উল্লেখ্য, আবু ওয়াক্কাস (রা) এর পুরো নাম আবু ওয়াক্কাস মালিক ইবনে ওয়াইব। তিনি রাসূল (সা)-এর মাতা আমিনার আপন চাচাতো ভাই ছিলেন। তিনি কাদেসিয়া যুদ্ধের বিজয়ী সেনাপতি হযরত সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাসের পিতা। তিনি চীনের কোয়াংটা শহরে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। সেখানে তার মাজার এখনও বিদ্যমান। উক্ত সাহাবি মহানবী (সা) এর নবুয়তের সপ্তম বছরে হযরত কায়স ইবনে হুযায়ফা (রা), হযরত ওরওয়াহ ইবনে আছাছা (রা) এবং হযরত আবু কায়স ইবনে হারেছ (রা)-কে সঙ্গে নিয়ে নাজ্জাশির দেয়া একখানা সমুদ্র জাহাজে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাণিজ্যিক পথে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিলেন। তারা উক্ত জাহাজে প্রথমত ভারতের মালাবারে এসে উপস্থিত হন এবং সেখানকার রাজা চেরুমল পেরুমলসহ বহুসংখ্যক লোককে ইসলামে দীক্ষিত করে চট্টগ্রামে এসে যাত্রা বিরতি করেন। অতঃপর তিনি ৬২৬ খ্রিস্টাব্দে চীনের ক্যান্টন বন্দরে গিয়ে উপস্থিত হন। আবু ওয়াক্কাস (রা)-এর দলটি ৬১৭ খ্রিস্টাব্দে রওয়ানা দিয়ে প্রায় নয় বছর পর চীনে পৌঁছেন। এ থেকে অনুমান করা যায় যে, এ নয় বছর তারা পথিমধ্যে বাণিজ্যিক কেন্দ্রসমূহে ইসলাম প্রচারের কাজে ব্যয় করেছেন। কারণ চীনে আগমনের জন্য আরব দেশ থেকে রওনা করলে বাতাসের গতিবেগের কারণে বিভিন্ন স্থানে নোঙর করতে হতো। বিশেষত বণিকেরা এক্ষেত্রে মালাবার, চেরর, চট্টগ্রাম, আকিয়াব, চীনের ক্যান্টন প্রভৃতি স্থানে জাহাজ নোঙর করতেন। অতএব অনুমান করা যায় যে তিনি মালাবারের পর চট্টগ্রাম ও আকিয়াবেও জাহাজ নোঙর করে ইসলাম প্রচারের কাজ করেছেন।
হিন্দের (বৃহত্তর ভারতের কোন অঞ্চলের) জনৈক রাজা কর্তৃক মহানবী (সা)-এর নিকট হাদিয়া তোহফা প্রেরণের উল্লেখ পাওয়া যায়। হযরত আবু সাইদ খুদরি (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হিন্দের জনৈক শাসক মহানবী (সা)-এর কাছে এক পোঁটলা হাদিয়া প্রেরণ করেছিলেন; যার মধ্যে আদাও ছিল। মহানবী (সা) সাহাবিদেরকে তার (আদার) এক টুকরা করে খেতে দিয়েছিলেন এবং (রাবি বলেন) আমাকেও এক টুকরা খেতে দেয়া হয়েছিল। হিন্দের কোন শাসক মহানবী (সা) এর নিকট হাদিয়া প্রেরণ করেছিলেন সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জান যায় না। তবে রুহমী রাজ্যের শাসকগণ বহুকাল পূর্ব থেকেই ইরানের শাসকের কাছে মূল্যবান হাদিয়া তোহফা প্রেরণ করত। সম্ভবত এ রুহমী রাজাদেরই কোন রাজা মহানবী (সা) এর নিকট হাদিয়া প্রেরণ করেছিল। উল্লেখ্য যে, রুহমী রাজ্য সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের তথ্য থাকলেও অধিকাংশ ঐতিহাসিক রুহমী বলতে আরাকান রাজ্যকে বুঝিয়েছেন। কেননা আরাকানের পূর্ব নাম ‘রোখাম’। এটি আরবি শব্দ; যার অর্থ শ্বেতপাথর এবং আরাকানের প্রাচীন রাজধানী ম্রোহংয়ের পূর্বনাম কায়কপ্র“। এটি বার্মিজ শব্দ; যার অর্থও শ্বেত পাথর। এদিক থেকে কায়াকপ্রু অঞ্চল ও রোখাম একই অঞ্চল হেতু রুহমী বলতে রোখাম বা আরাকানকেই বুঝানো যায়। মনে করা হয় যে, রোখাম শব্দটির বিকৃতরূপই রুহমী। তবে কেউ কেউ রুহমী বলতে রামুকে বুঝিয়েছেন। যদি এটা ধরে নেয়া হয় তবুও আরাকানই হয়। কেননা তখন রামু আরাকানেরই অংশ ছিল। তাছাড়া হাজার বছরের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আরাকানের ঐতিহ্যও অস্বীকার করা যায় না।
নাইম বিন হাম্মাদ এর উদ্ধৃতিতে রুহমী রাজা কর্তৃক খলিফা উমর বিন আবদুল আজিজকে (৭১৭-৭২০ খ্রি.) চিঠি প্রেরণের তথ্য পাওয়া যায়। সে চিঠিতে বলা হয়েছে, রুহমী শাহেন শাহের পক্ষ থেকে যিনি হাজার বাদশাহর অধস্তন পুরুষ, যার স্ত্রীও হাজার বাদশাহের অধস্তন কন্যা এবং যার হাতিশালায় সহস্র হাতি ও যার রাজ্যে দুটি নহর রয়েছে সেগুলোতে উদ উৎপন্ন হয়। এ ছাড়া কর্পূর, করমচা ও বাদাম গাছও রয়েছে এবং যার প্রতিপত্তি ১২ শত মাইল দূর থেকেও পাওয়া যায়। এর পক্ষ থেকে আরবের বাদশাহ যিনি আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করেন না তার প্রতি। অতঃপর আমি আপনার নিকট কিছু হাদিয়া প্রেরণ করছি। বস্তুত এটি হাদিয়া নয় বরং কৃতজ্ঞতা। আমি আশা করি আপনি আমার নিকট এমন একজন ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন যিনি ইসলাম বুঝাবেন ও শুনাবেন। আস সালাম। অনুরূপভাবে রুহমীর বাদশাহ কর্তৃক বাগদাদের খলিফা আবু আবদুল্লাহ আল মামুনের নিকট লিখিত চিঠি ও খলিফা মামুন কর্তৃক তার প্রতি-উত্তরের বিবরণও পাওয়া যায়। এসব বিবরণের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মহানবী (সা) এর নবুয়তের পূর্ব থেকেই আরাকানের সাথে আরব বণিকদের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল এবং সেই সুবাদেই মহানবীর (সা) জীবদ্দশাতেই এ অঞ্চলে ইসলামের সুমহান আদর্শের দাওয়াত পৌঁছে।
আরাকানের চন্দ্র-সূর্য বংশের প্রথম রাজা মহৎ ইঙ্গ চন্দ্র (৭৮৮-৮১০ খ্রি.) ৭৮৮ খ্রিস্টাব্দে বৈশালীতে রাজধানী স্থাপন করে শাসনকার্য পরিচালনা শুরু করেন। তার উদারনীতির কারণে মুসলমানরা ইসলাম প্রচারের ব্যাপক সুযোগ পায় এবং সে সূত্রেই আরব মুসলিম বণিকগণ রাহাম্বী বন্দরসহ আরাকানের নৌবন্দরসমূহে ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিক ও ইসলাম প্রচার মিশন পরিচালনা করতে থাকে। এ রাজার শাসনামলেই কয়েকটি আরব মুসলিম বাণিজ্যবহর রামব্রী দ্বীপের পাশে বিধ্বস্ত হলে জাহাজের আরোহীরা রহম বলে চিৎকার করতে থাকে। এ সময় স্থানীয় লোকজন তাদেরকে উদ্ধার করে রাজার কাছে নিয়ে যায়। রাজা তাদের বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত আচরণে মুগ্ধ হয়ে আরাকানেই স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দান করেন। আরব বণিকগণ কেউই স্ত্রী-পুত্রসমেত সপরিবারে বাণিজ্য করতে আসেননি। তারা স্থানীয়ভাবে হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মহিলাদেরকে বিয়ে করে। ফলে মুসলমানদের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। এভাবে অষ্টম শতাব্দী থেকে দশম শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানের উপকূলীয় অঞ্চল হতে শুরু করে মেঘনা নদীর পূর্ব তীরবর্তী বিস্তীর্ণ বন্দরসমূহে আরব বণিকদের কর্মতৎপরতায় মুখরিত হয়ে ওঠে। এমনকি মুসলমানদের সুমহান আদর্শের প্রতিও শাসকগণ মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়ার নিদর্শন পাওয়া যায়। কেননা দ্বিতীয় উমার নামে খ্যাত উমাইয়া খলিফা উমার বিন আবদুল আজিজ (৭১৭-৭২০ খ্রি.) এবং আব্বাসীয় খলিফা মামুনকে (৮১৩-৮৩৩ খ্রি.) রুহমীর রাজা পত্র লিখেছিলেন। যদি রুহমী বলতে আরাকান বুঝানো হয়ে থাকে তবে তখন আরাকানে শাসক যথাক্রমে রাজা সূর্যক্ষিতি (৭১৪-৭২৩ খ্রি.) এবং সূর্য ইঙ্গ চন্দ্র (৮১০-৮৩০ খ্রি.) কর্তৃক এ পত্রগুলো লেখা হয়েছিল। তাঁদের পত্রের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ও মুসলমানদের প্রতি নমনীয়তার প্রমাণ মেলে।
দশম ও একাদশ শতাব্দীতে আরব বণিক ও সুফি দরবেশদের মধ্যে বদরুদ্দিন (বদর শাহ) নামে ইসলাম প্রচারক এ অঞ্চলে আসেন এবং ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। তার নামানুসারে আসামের সীমা থেকে শুরু করে মালয় উপদ্বীপ পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ‘বদর মোকাম’ নামে মসজিদও নির্মিত হয়েছে। অদ্যাবধি মাঝি মাল্লা ও নাবিকরা বদরকে মাঝি মাল্লার রক্ষাকর্তা বা দরিয়াপির বলে স্মরণ করে থাকে। এভাবে চট্টগ্রাম এবং আরাকানে আগত ও বসতি স্থাপনকারী আরব বণিক সম্প্রদায়, নাবিক, সুফি, দরবেশ শ্রেণী এবং ত্রয়োদশ শতকের পর থেকে তুর্কি, পাঠান ও মোগলদের শাসনামলে বাংলা থেকে আগত মুসলমানদের সাথে এ অঞ্চলের (চট্টগ্রাম-আরাকান) নিম্নবর্ণের হিন্দু ও বৌদ্ধদের সংমিশ্রণ ঘটে এবং তারা ব্যাপক হারে ইসলামে দীক্ষা গ্রহণ করে। সেইসাথে চট্টগ্রাম অঞ্চল ছিল বাংলা, আরাকান, ত্রিপুরা ও বার্মার লক্ষ্যস্থল এবং আরাকান রাজ্যের অধীনে চট্টগ্রাম দীর্ঘদিন শাসিত হওয়ার ফলে চট্টগ্রামে বসবাসরত জনগোষ্ঠী, নবদীক্ষিত মুসলমান, বহিরাগত ইসলাম প্রচারক-বণিক, সুফি-দরবেশ, উলামা সম্প্রদায় অবাধে আরাকানে ইসলাম প্রচারের জন্য যাতায়াত করতেন। ফলে চট্টগ্রামের মতো আরাকানেও একটি ইসলামি পরিবেশ সংবলিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। পর্দাপ্রথা, খাদ্যাভ্যাস, রান্না পদ্ধতি, এমনকি মানবীয় আচরণেও ইসলামের প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। পরবর্তীতে বরেণ্য পীরদরবেশগণের মধ্যে চকপিউ এর মুন্সী আবদুন নবী, আকিয়াবের শাহ মোনায়েম (বাবাজি), হায়দার আলী শাহ (কাহারু শাহ), নূরুল্লাহ শাহ (কৈলা শাহ), আজল উদ্দীন শাহ (আজলা শাহ) এবং সিরিয়মের পাঁচপীর ও কাইয়েমর সরদার পাড়ার সৈয়দ ভ্রাতৃদয়সহ অনেকের নাম উল্লেখযোগ্য। বদরুদ্দীন বদরে আলম যাহিদী নামক একজন অলী তিন/চারশত অনুগামী ইসলাম প্রচারক নিয়ে ভারতের মিরাঠাবাদ থেকে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এসেছিলেন। তিনি ১৩৮০ খ্রিস্টাব্দে বিহারে চলে যান এবং ১৪৪০ খ্রিস্টাব্দে সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন। তারা নানারূপ বিকৃত বৌদ্ধ-হিন্দুয়ানি আচরণ ও প্রথা রহিত করে মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন সত্যিকারের ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে গড়ে তোলার জন্য আমরণ চেষ্টা করেছেন। এভাবে আরাকানের সামাজিক অবকাঠামোগত ভিত্তিতে ইসলামের সম্পৃক্ততা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
আরবে ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন শতাব্দীতে আরব, ইরানি, গৌড়ীয় ও ভারতীয়সহ পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মুসলিম বণিক, নাবিক, ইসলাম প্রচারক, পরিব্রাজক প্রমুখ আরাকানে এসে এখানকার স্থানীয় মহিলাদের সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হতো। তাদের ঔরস ও গর্ভজাত আরাকানি মুসলমানগণের মধ্যে বর্ণসংকর জাতির সৃষ্টি হয়। আকার আকৃতির দিক থেকেও কেউ বেটে, খাটো, কেউ মধ্যম আকৃতির, লম্বাটে, নাক চেপ্টা, চক্ষু আয়ত ও ক্ষুদ্র ও দাড়ি বিহীন, চুল তামাটে এবং সজারু কাটার মতো খাড়া আবার কেউবা আরব ও ইরানিদের মত সুঠাম দেহের অধিকারী। বিবাহের সময় ভিনদেশী কোন কোন মুসলমান প্রস্তাবিত মহিলাকে আগে ইসলামে দীক্ষা দিত, আর কেউবা ইসলামে দীক্ষিত না করে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতো। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে তাদের পরবর্তী বংশধরদের মধ্যে ঈমানিয়াত বা বোধ-বিশ্বাস ও রুচির ক্ষেত্রে ভিন্নতা বিশেষভাবে লক্ষ্য করা যায়। এ বিশ্বাস ও রুচিবোধের ভিন্নতার কারণে মুসলিম সমাজে বিভিন্ন রীতিপ্রথা ও কুসংস্কার প্রবেশ করে এবং সে প্রেক্ষিতে আরাকানি মুসলমানদের মধ্যে গোত্রগত শ্রেণিবিভাজন শুরু হয়, যেমন থাম্ভইক্যা, জেরবাদী, কামানচি এবং রোহিঙ্গা।
আরাকান রাজ্যের মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক-বাহক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভূমিকা ছিল প্রধান। বাংলার অধিবাসী হবার কারণে যেমন বাঙালি বলা হয় তেমনি ম্রোহংয়ের অধিবাসী হবার কারণে আরাকানের মুসলমানগণকে রোহিঙ্গা বলা হয়ে থাকে। আরব বণিক, নাবিক, ইসলাম প্রচারক, রোহার থেকে আগত ইসলাম প্রচারক, গৌড়ীয় মুসলিম সৈন্য, বাংলায় অপহৃত দাসগণসহ অধিকাংশ মুসলমানই রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচিত। আধুনিক কালের প্রয়োগ হলেও যেমন বাঙালির ইতিহাস হাজার বছরের তেমনি রোহিঙ্গা শব্দটি আধুনিক কালের হলেও রোহিঙ্গাদের ইতিহাসও হাজার বছরের চেয়েও পুরনো। এরা পরিচয়হীনভাবে বেড়ে ওঠা কোন জনগোষ্ঠী নয়। মূলত রোহিঙ্গারাই আরাকানের স্থায়ী ও আদি মুসলমান। (চলবে)
লেখক : রোহিঙ্গা গবেষক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, সৎধশযধহফধ@মসধরষ.পড়স

SHARE

Leave a Reply