আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ঈমানি আন্দোলনের বীর সিপাহসালার -এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান

আল্লামা হাফেয মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী বাংলাদেশের একজন ইসলামী চিন্তাবিদ, জনপ্রিয় মুসলিম নেতা, প্রখ্যাত হাদিস বিশারদ, চট্টগ্রামের দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসার শিক্ষাসচিব ও শায়খুল হাদিস ছিলেন। একই সাথে তিনি বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম নূরানী তালীমুল কুরআন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাসিক মুঈনুল ইসলামের প্রধান সম্পাদক, চট্টগ্রামের হাটহাজারী থেকে পরিচালিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর ছিলেন।
দেশের খ্যাতনামা ইসলামী বক্তা ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জুনায়েদ জনসাধারণের মাঝে জুনায়েদ বাবুনগরী নামেই অধিক সমাদৃত ছিলেন। বাংলাদেশি দেওবন্দি ইসলামী পণ্ডিত হওয়ার পাশাপাশি একাধারে তিনি ছিলেন শিক্ষাবিদ, লেখক ও প্রখ্যাত গবেষক।
তিনি বাংলাদেশে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সবসময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। দেশব্যাপী অসংখ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান তথা মসজিদ, মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি হাজারো আলেমের ওস্তাদ। দেশে-বিদেশে তাঁর অসংখ্য ছাত্র রয়েছে, যারা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দেশে ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুন প্রতিষ্ঠায় তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা তাঁকে আজীবন স্মরণীয় করে রাখবে। তার ইন্তেকালে জাতি একজন অভিভাবককে হারালো।

জন্ম ও পরিচয়
বাবুনগরী ১৯৫৩ সালের ৮ অক্টোবর চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার বাবুনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আবুল হাসান ও মাতা ফাতেমা খাতুন। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বাবুনগরের আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা হযরত হারুন বাবুনগরী ছিলেন তার নানা। বলা হয়ে থাকে মায়ের দিক দিয়ে তাঁর বংশধারা ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিআল্লাহু আনহুর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। (সূত্র : উইকিপিডিয়া)

শিক্ষাজীবন
৫ বছর বয়সে তিনি আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগরে ভর্তি হন। সেখানে তিনি মক্তব, হিফয ও প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর ভর্তি হন দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসায়। ১৯৭৬ সালে হাটহাজারী মাদরাসা থেকে দাওরায়ে হাদিস পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন।
তারপর উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে পাকিস্তান গমন করেন। ১৯৭৬ সালে করাচিতে অবস্থিত জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়ায় তাখাছুছাত ফিল উলুমুল হাদিস তথা উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগে ভর্তি হন। দুই বছর হাদিস নিয়ে গবেষণা সম্পন্ন করে তিনি আরবি ভাষায় ‘সীরাতুল ইমামিদ দারিমী ওয়াত তারিখ বি শায়খিহী’ (ইমাম দারিমী ও তাঁর শিক্ষকগণের জীবন বৃত্তান্ত) শীর্ষক অভিসন্দর্ভ জমা দেন। এই অভিসন্দর্ভ জমা দেওয়ার পর তিনি জামিয়া উলুমুল ইসলামিয়া থেকে হাদীসের সর্বোচ্চ সনদ লাভ করেন। পাশাপাশি তিনি ওয়ালি হাসান টঙ্কির কাছে সুনান আত-তিরমিজি ও মুহাম্মদ ইউসুফ বিন্নুরীর কাছে সহিহ বুখারি দ্বিতীয় বারের মত অধ্যয়ন করেন।
বাবুনগরীর উল্লেখযোগ্য শিক্ষকগণের মধ্যে রয়েছেন- মুহাম্মদ ইউসুফ বিন্নুরী, ইদ্রিস মিরাঠী, আব্দুল্লাহ ইউসুফ নোমানী, আব্দুল কাইয়ুম, আহমদুল হক (মুফতি), আবুল হাসান, আব্দুল আজিজ, শাহ আহমদ শফীসহ প্রমুখ খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ।

তাসাউফের দীক্ষাগ্রহণ
শিক্ষাজীবন সম্পন্ন করার পর আধ্যাত্মিক দীক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৭৮ সালে আব্দুল কাদের রায়পুরীর উত্তরসূরি আব্দুল আজিজ রায়পুরীর কাছে বাইয়াত গ্রহণ করেন। রমজান মাসে তিনি রায়পুরীর খানকায় আব্দুল আজিজ রায়পুরীর কাছে কিছুদিন অবস্থান করে তার সান্নিধ্য লাভ করেন।
এছাড়াও তিনি আল্লামা হুসাইন আহমদ মাদানি রাহমাতুল্লাহি আলাইহির দুই শিষ্য- আব্দুস সাত্তার, ফতেয়াবাদ, শাহ আহমদ শফী, রাঙ্গুনিয়া। আবুল হাসান আলী নদভীর শিষ্য সুলতান যওক নদভীর কাছ থেকেও খেলাফত ও ইলমে তাসাউফের শিক্ষা লাভ করেন।

কর্মজীবন
১৯৭৮ সালের শেষের দিকে তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করে বাবুনগর মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। বাংলাদেশের মাদরাসাসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম বাবুনগর মাদরাসায় তিনি উচ্চতর হাদিস গবেষণা বিভাগ চালু করেন। ২০০৩ সালে তিনি দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসায় যোগ দেন। পরবর্তীতে তিনি হাটহাজারী মাদরাসার সহকারী পরিচালক নিযুক্ত হন। ২০২০ সালের ১৭ জুন মাদরাসা কমিটি সহকারী পরিচালকের দায়িত্ব থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেয়। তার স্থলে মাদরাসার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক শেখ আহমদকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কিছুদিন পর হাটহাজারী মাদরাসায় ছাত্র আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলন তীব্র হতে থাকলে ১৭ সেপ্টেম্বর মাদরাসার মহাপরিচালক শাহ আহমদ শফী (রহ.) স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে মাদরাসার দায়িত্ব মজলিসে শূরাকে দিয়ে দেন। ওই দিন তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীতে বাবুনগরীসহ তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি মাদরাসা পরিচালনা কমিটি গঠিত হয়। তিনি মাদরাসার শায়খুল হাদিস ও শিক্ষাসচিব হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন।
২০১৯ সালের মে মাসে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, শিক্ষকতা জীবনে এ পর্যন্ত (২০১৯) আমার ছাত্রসংখ্যা প্রায় ৪০ হাজারেরও বেশি।
বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের সহ-সভাপতি, চট্টগ্রাম নূরানী তালীমুল কুরআন বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং মাসিক মুঈনুল ইসলামের প্রধান সম্পাদক ও মাসিক দাওয়াতুল হকের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

পরিবার
পারিবারিক জীবনে তিনি ৫ মেয়ে ও ১ ছেলের জনক। ছেলের নাম মুহাম্মদ সালমান।

রাজনৈতিক জীবন
২০১০ সালে বাবুনগরীকে মহাসচিব করে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ২০২০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির আমির মৃত্যুবরণের পর ১৫ নভেম্বর সংগঠনের একটি কেন্দ্রীয় সম্মেলনের মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে তিনি আমীর নির্বাচিত হন। এছাড়া চলতি বছরে ২৫ এপ্রিল হেফাজতের আহ্বায়ক কমিটির আহ্বায়ক এবং সর্বশেষ ৭ জুন তিনি হেফাজতের আমীর নিযুক্ত হন।
হেফাজত আন্দোলনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে হত্যার অভিযোগসহ কয়েকটি অভিযোগে ২০১৩ সালের ৭ মে তাকে পুরান ঢাকার ঢাকেশ্বরী মন্দির এলাকা থেকে গ্রেফতার করে ১৩ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। পরবর্তীতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তিনি মুক্তি পান।
২০২০ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশে ভাস্কর্য বিতর্ক শুরু হলে ইসলামী নেতা মামুনুল হকের পক্ষে সমর্থন দিয়ে তিনি কঠোরভাবে ভাস্কর্যবিরোধী বক্তব্য তুলে ধরেন। তার এই মন্তব্যে আওয়ামী লীগ ও তার ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
২০১৯ সালের ১৩ জুন তিন দেশ সফর করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করেন। উক্ত সম্মেলনে পর্দা বিষয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “হাত মোজা, পা মোজা, নাক-চোখ ঢেকে এটা কী? জীবন্ত টেন্ট (তাঁবু) হয়ে ঘুরে বেড়ানো, এটার তো কোনো মানে হয় না।” তার এই বক্তব্যকে আপত্তিকর আখ্যা দিয়ে জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, কুরআনের ৭টি আয়াত এবং ৭০টির মতো হাদিস দ্বারা পর্দার বিধান প্রমাণিত। এ সব আয়াত ও হাদিস দ্বারা পর্দার বিধান প্রমাণিত হওয়ার পাশাপাশি সর্বপ্রকারের বেপর্দা হারাম হওয়াও সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায়। সুতরাং শরয়ী পর্দা নিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রীর মুখে এমন আপত্তিকর মন্তব্য দুঃখজনক। ৯০ শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশে পর্দা সম্পর্কে দেওয়া এমন বক্তব্যে কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। তিনি শেখ হাসিনার পর্দা সম্পর্কে দেওয়া এ বক্তব্য প্রত্যাহার করে আল্লাহর কাছে তওবা করার আহ্বান জানান।
২০২০ সালের ২ অক্টোবর এক সভায় শাহ আহমদ শফী ও তার লংমার্চের ব্যাপারে তিনি বলেন, আল্লামা আহমদ শফী দেশে ভ্রান্ত মতবাদ ও ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখে গেছেন। ২০১৩ সালে ইসলামবিদ্বেষী নাস্তিক্যবাদের আগ্রাসী আস্ফালনের বিরুদ্ধে দেশের আলেমসমাজ ও তাওহিদি জনতাকে নিয়ে ইতিহাসের নজিরবিহীন গণআন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। ওই সময় আমি আল্লামা শফীর সঙ্গে লংমার্চে ও শাপলা চত্বরে ছিলাম। তারই ধারাবাহিকতায় কোনো বিদআত, শিরক, মাজার পূজারি, কাদিয়ানি, শিয়া ও নাস্তিক-মুরতাদের সঙ্গে বিন্দুমাত্র আপস করা যাবে না। প্রয়োজনে সব অপশক্তির বিরুদ্ধে এ ধরনের একটা নয়, আরও দশটা লংমার্চ করতে হবে।

লেখালেখি ও রচনায় তার অবদান
আরবি, উর্দু ও বাংলায় আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ত্রিশটি। দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামার আরবি পত্রিকা আল বাসুল ইসলামি, দারুল উলুম দেওবন্দের মাসিক পত্রিকা আদ দায়ী, দারুল উলুম হাটহাজারীর মাসিক আল মুঈনসহ বিভিন্ন সাময়িকীতে অসংখ্য প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন তিনি।
তাঁর লিখিত বইসমূহের মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য কয়েকটি হলো-
১. সীরাতুল ইমামিদ দারিমী ওয়াত তারিখ বি শায়খিহী (১৯৭৮);
২. বিশ্ববরেণ্যে মুহাদ্দিসগণের দৃষ্টিতে ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি;
৩. তালিমুল ইসলাম (আরবি);
৪. বাড়াবাড়ি ছাড়াছাড়ির কবলে শবে বরাত
৫. ইসলামে দাড়ির বিধান
৬. তাওহীদ ও শিরক : প্রকার ও প্রকৃতি
৭. মুকাদ্দিমাতুল ইলম : তাফসীর, হাদিস, ফিকাহ, ফতোয়া
৮. দারুল উলুম হাটহাজারীর কতিপয় উজ্জ্বল নক্ষত্র
৯. আকাবিরে দেওবন্দের সিলসিলায়ে সনদ
১০. জুনায়েদ বাবুনগরীর রচনাসমগ্র
১১. ইলমে হাদিসের ভূমিকা
১২. খুতবার ভাষা
১৩. মহাগ্রন্থ আল কুরআন ও বিশ্বনবী মুহাম্মদ সা.
১৪. ইসলাম আওর সায়েন্স
১৫. নাস্তিক মুরতাদের শরয়ী বিধান
১৬. জাল হাদিস
১৭. সূরা ফাতিহা
১৮. মুকাদ্দামায়ে তানযীমুল আশতাত
১৯. খতমে নবুয়ত ও কাদিয়ানী সম্প্রদায়
২০. সিয়াম সাধনা ইতেকাফ ও ঈদ মোবারক
২১. মিলাদ কিয়াম ও সুন্নাত বিদআত

মৃত্যু
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর শায়খুল হাদিস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী ১৯ আগস্ট ২০২১ ইং বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম নগরীর সিএসসিআর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১২টা ৫০ মিনিটে ৬৭ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী বার্ধক্যজনিত দুর্বলতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে কিডনির জটিলতা, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপে ভুগছিলেন।
মহান রাব্বুল আলামিন তাঁর গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন, নেক আমলগুলো কবুল করুন, জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মাকাম নসিব করুন। আমিন।
লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

SHARE

Leave a Reply