আল্লাহর আদালতে বিচার চেয়েছি – মাহমুদা দেলোয়ার (মুন্নী)

প্রেরণা : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
শহীদ মুজাহিদের মা : ওয়া আলাইকুমুসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।

প্রেরণা : কেমন আছেন?
শহীদ মুজাহিদের মা : আলহামদুলিল্লাহ ভালো।

প্রেরণা : প্রিয় সন্তানের শাহাদাতের প্রায় ১৫ বছর অতিবাহিত হলো। সেদিনের ঘটনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
শহীদ মুজাহিদের মা : একদিনের ব্যথা যে রকম, ১৫ বছরের ব্যথাও সে রকম। এটা কোনো অংশে কম নয়। দিন যায় সন্তানের চিন্তা বাড়ে। সন্তান হারানোর ব্যথাটা বাড়ে। প্রথম প্রথম কষ্টটা থাকে বেশি। আমি যখন স্ট্রোক করেছিলাম তখন আমাকে সিঁড়ি দিয়ে নামাতে গিয়ে আমার ভাই মেরুদণ্ডে ব্যথা পেয়েছে। আমার স্বামী আমাকে নামাতে পারেনি। আমার ছেলে, আমার ছেলের বউ তখন ঢাকার বাইরে। আমার দুই ভাইয়ের বউ, আমার ছোট ভাই এবং আমার মেয়ে চারজনে মিলে আমাকে নামিয়েছে। তাদের কি যে কষ্ট! ১৫-২০ বার বমি হয়ে সেনসলেস হয়ে গেছি। আমার ছোট ছেলে কাছে ছিল না, আমার বড় ছেলে কাছে ছিল না। ছেলেমেয়ের অভাবটা তখন খুব মনে পড়ে। যদি থাকতো সহযোগিতায় এগিয়ে আসতো। আমার প্রয়োজনের সময়ে খুব মনে পড়ে। তারপরও আল্লাহর শুকরিয়া। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আমার সন্তান জীবন দিয়েছে। আল্লাহ তাঁকে কবুল করেছেন।

প্রেরণা : জনসভায় যাওয়ার জন্য সেদিন আপনার সন্তানের প্রস্তুতি কেমন ছিল?
শহীদ মুজাহিদের মা : সেদিন আমার আব্বা আম্মা সৌদি থেকে আসার কথা ছিল। ২০০০ সালে তারা হজ করেছিল। ২০০৬ সালে আবার ওমরাহ। পুরো রমজান মাস ছিল সৌদিতে। ২৮ অক্টোবর ১২টার দিকে উনাদের ল্যান্ড করার কথা ছিল। মুজাহিদের পরীক্ষা। বলল, আমি পরীক্ষা শেষ করে পারলে যাবো। সেদিনের প্রোগ্রামে তার ছুটিও ছিল। পরীক্ষা শেষ করে বাসে উঠতে যাবে এই সময় মহানগরী সভাপতি আব্দুল মান্নানের ফোন পেয়ে সে ওদিকে আর যায়নি। দায়িত্বশীলের কথা শুনতে গিয়ে মাকেও বলে যেতে পারেনি।

প্রেরণা : শাহাদাতের সংবাদ কিভাবে জানতে পেরেছিলেন?
শহীদ মুজাহিদের মা : আমার জায়ের বাচ্চা হয়েছিল। আমি হাসপাতালে গেছি। এমন সময় দুই ভাই এসে বলছে, আপা বাসায় চলেন। আমি বললাম, আমার জায়ের বাচ্চা হয়েছে, ওর কাছে কেউ থাকার নাই, আমি এখানে থাকবো। ওরা বলছে না! বাসায় চলেন দরকার আছে। আমি থালা বাসন ধুতে বাথরুমে গেছিলাম, ওরা আমার জাকে আগে বলেছে। আমার জা বলছে, ভাবী আপনি যান। আমার বোন আসবে। ওরা কেউ কিছু বলছে না। তাদের সবার মুখ স্বাভাবিক। বাসায় এসে দেখি লোকে লোকারণ্য। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কী হয়েছে? কেউ কিছু বলে না। তারপর আমি আর বলতে পারি না।

প্রেরণা : এতদিনেও বিচার হয়নি, মামলাও বাতিল করে দিয়েছে- খুনিদের বিচার হবে মনে করেন কি?
শহীদ মুজাহিদের মা : আসলে মানুষের আদালতে বিচার চাইনি। আল্লাহর আদালতে বিচার চেয়েছি। দুনিয়ার আদালতে এতো সন্ত্রাস, এতো রাহাজানি, সঠিক বিচার কয়জনের হয়! আল্লাহর হাতে ছেড়ে দিয়েছি। দুনিয়ার আদালতে ভরসা করি না।

প্রেরণা : মুজাহিদ ভাইয়ের কোন স্মৃতি বেশি মনে পড়ে?
শহীদ মুজাহিদের মা : মনে পড়ে, ওর হাসি, ওর মুখ ওর সবকিছু।

প্রেরণা : ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য শহীদের মাতা হিসেবে আপনার কী উপদেশ?
শহীদ মুজাহিদের মা : তোমাদের ভেতর যেন আত্ম অহঙ্কার কাজ না করে। ওর মূল্যায়ন হচ্ছে। আমি এতো কাজ করছি মূল্যায়ন হচ্ছে না। অবমূল্যায়ন হচ্ছে। এটা কখনো মনে করো না। দুনিয়ার সন্তুষ্টি দেখবা না, আল্লাহর সন্তুষ্টি দেখবা। সব কাজ সহজ হয়ে যাবে। যদি দুনিয়ার কারো সন্তুষ্টির জন্য করো। দেখা যাচ্ছে তো, অনেকে তো নিজের স্বার্থে করছে। কিন্তু এগুলোর দিকে তাকায়ো না। যা করবা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করবা। এই পথে অনেক দুঃখ আছে, কষ্ট আছে, ব্যর্থতা আছে, সফলতা আছে। দুনিয়া পাওয়ার আশা করবা না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করবা। আল্লাহ কাকে কিভাবে সম্মানিত করবেন তিনিই ভালো জানেন। সহমর্মিতা সহযোগিতা বৃদ্ধি করবা। মুজাহিদকে দেখেছি, কার রক্ত লাগবে, কার কী লাগবে, কে পড়াশোনায় বেতন দিতে পারছে না, বই নিতে পারছে না, বিভিন্নজনকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করতো। ওর যতটুকু ক্ষমতা ততটুকু করতো। তারপরে মার কাছে, নানার কাছে টাকা চেয়ে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করতো। যেকোনো জিনিস, যেকোনো সাহায্য চাও না কেন, তুমি আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবা। আমরা এগুলো বন্ধুর কাছে শেয়ার করি, ভাইয়ের কাছে শেয়ার করি। শেয়ার করবা। পারসোনালি আল্লাহর কাছে শেয়ার করবা বেশি। যেকোনো চাহিদা, চাওয়া-পাওয়া বলবা, তখন হালকা লাগে, সহজ হয়ে যায়। আল্লাহর সাথে কথা বললে কষ্টটা কম পাওয়া যায়। হ্যাঁ, বড়দের নির্দেশ পালন করা উচিত।

SHARE

Leave a Reply