আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার মাধ্যম হলো ধৈর্য ও সালাত -মো. মঞ্জুরুল ইসলাম

অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীতে আলোর দরকার, কোথাও কোন আলো নেই। সমগ্র জাহান অপেক্ষা করছে সুবহে সাদিকের জন্য। দীর্ঘ অন্ধকারে পতিত এই দুনিয়া মুক্তি চাচ্ছিল। চারিদিকে হতাশা, জুলুমে ভরে উঠেছিল মানুষের বসবাসকৃত এই পৃথিবী। মানুষের চিন্তার মাধ্যমে অর্জিত শক্তির নিকট, মানুষ পরিণত হয়েছিল দাসে। কোন ধরনের মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক অধিকার ছিল না সেই সমাজব্যবস্থায়। সর্বত্র নির্যাতনের ভয়াল দৃশ্য ফুটে উঠেছিল মানবসমাজে। সর্বত্রই চলছিল শক্তিশালীর দ্বারা দুর্বলের ওপর অত্যাচার অনাচার। “জোর যার মুল্লুক তার” প্রবাদের বাস্তব প্রতিফলন ছিল সমাজের সকল স্তরে। শান্তি আর মুক্তির মশাল নিয়ে কেউ এগিয়ে আসেনি। মানবতার দুর্বিষহ অবস্থা থেকে সার্বিক কল্যাণকর পথ দেখানোর জন্য ছিল না কোন দূত বা বার্তাবাহক। সৃষ্টিকর্তার সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে দেয়ার জন্য প্রয়োজন ছিলো নবী-রাসূলের। পথহারা নির্যাতিত মানবতার মুক্তি যে মহান রবের নিকট হতেই আসে সেটা আর কয়জনই বা জানতো। ওহির জ্ঞানকে গোপন করে নিজেদের খেয়াল-খুশি মতো চলা আর নিজস্ব স্বার্থের পক্ষে বানোয়াট কথা বলা মানুষের জন্য ছিল একটি দৈনন্দিন অভ্যাস। পরস্পর যুদ্ধ, হত্যা, ব্যভিচার, সর্বোপরি অসামাজিক ও মানবতা বিরোধী কাজ ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। ঠিক এমন সময় সকল অসত্যকে পদদলিত করতে আলোর মশাল নিয়ে আগমন ঘটে বিশ্বনবী হযরত মুহম্মাদ (সা.)-এর। পবিত্র কুরআনের ভাষায় : “হে আহলে কিতাব, তোমাদের নিকট আমার রাসূল এসেছে। সে আল্লাহর কিতাবের এমন অনেক কথা তোমাদের নিকট প্রকাশ করছে যেগুলো তোমরা গোপন করে রাখতে, তিনি তার মধ্য থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করেন এবং অনেক ব্যাপারে ক্ষমার চোখেও দেখেন। তোমাদের কাছে এসেছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নূর এবং একখানি স্পষ্ট কিতাব।” (সূরা মায়িদাহ : ১৫)
রাসূল (সা.) সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী এবং বিশ্ববাসীর জন্য রহমত। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, “আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আম্বিয়া-১০৭) ‘তিনি (আল্লাহ) তাঁর প্রিয় নবীর (সা.) ওপর তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা সত্যসন্ধানীদের শান্তির পথ দেখিয়ে দেয়। লোকদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নিয়ে আসে এবং তাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করে। এ কিতাবের কারণে আল্লাহর নিয়ামতসমূহ লাভ করা এবং তাঁর শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়া খুবই সহজ। এটা ভ্রান্তিকে বিদূরিতকারী এবং হেদায়াতকে প্রকাশকারী।’ (ইবনে কাসির)

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, হাসান ইবনে সাবিত (রা) বলেন, ‘হঠাৎ শুনতে পেলাম জনৈক ইহুদি সবিরের একদা দুর্গের উপর আরোহণ করে উচ্চস্বরে ওহে ইয়াহুদিগণ বলে ডাক দেয়। লোকেরা তার কাছে সমবেত হয়ে বলল, হায় তোমার কী হলো? সে বলল, আজ রাতে আহমদের জন্মের একটা নক্ষত্র উদিত হয়।’ (ইবনে ইসহাক, সিরাতুন্নবী সা.) ইবনে সাদের (রা) বর্ণনায় রয়েছে ‘রাসূল (সা.)-এর মা বলেছেন, যখন তিনি জন্মগ্রহণ করেন, তখন আমার দেহ থেকে একটি নূর বের হয়। সেই নূর দ্বারা শাম দেশের মহল উজ্জ্বল হয়ে যায়।’ (আর রাহিকুল মাখতুম) রাসূল (সা.) নিজেই ছিলেন আলোকবর্তিকা বা মানবতার জন্য নূর এবং তাঁর সাথে ছিল সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী মহাগ্রন্থ আল কুরআন। যিনি হেদায়াতের আলোক মশাল দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে মানবতাকে তাঁর ¯্রষ্টার সাথে সম্পর্ক করে দিয়েছেন। সৃষ্টি পেয়েছে সঠিক দিশা ও পরম রবের নির্দেশ অমিয় বাণী। পেয়েছে সুসংবাদ ও নাজাত।
পৃথিবীতে প্রত্যেক নবী রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) মানবতার মুক্তির পথ দেখাতে এসেছিলেন। বান্দাকে তার মাবুদের সাথে কিভাবে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়, তাঁর নিকটে কিভাবে সাহায্যের আর্জি পেশ করতে হয় তাও শিখিয়েছেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, “প্রত্যেক জাতির মধ্যে আমি একজন করে রাসূল পাঠিয়েছি এবং তাঁর মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছি, তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাগুতের ইবাদত পরিহার করো।” (সূরা নাহল : ৩৬)

পৃথিবীতে প্রত্যেক জাতির নিকট নবী-রাসূল এসেছেন। তাঁরা সেই সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য বান্দাকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে দিয়েছেন। সেই সাথে আল্লাহদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এ কাজের জন্য তাঁরা হাজারো জুলুমের শিকার হয়েছেন। অসংখ্য নবীকে হত্যা করেছিল বনি ইসরাইলগণ। নবী-রাসূলগণের ওপর যখন নির্যাতন করা হয়েছে তখন তাঁরা পৃথিবীর কোন শক্তির নিকট আশ্রয় নেননি। সাহায্য প্রার্থনা করেননি কোন ব্যক্তির কাছে। তাঁরা সাহায্যের জন্য শুধু আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছেন। ধৈর্য হারা হয়নি ।
হযরত নূহ (আ) পৃথিবীর প্রথম দিকেই তাঁর জাতির লোকদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন। তিনি সাড়ে নয় শত বছর সময় ধরে জাতির মানুষের নিকট দাওয়াত দিয়েছেন। তিনি দিনে দাওয়াত দিয়েছেন, দাওয়াত দিয়েছেন রাতে। প্রকাশ্যে ও গোপনে দাওয়াত দিয়ে কিছু লোককে দ্বীন কবুল করাতে পেরেছিলেন। কখনো হতাশ হয়নি। কর্মপ্রচেষ্টা বন্ধ করেনি। জুলুম নির্যাতনে সরাসরি মহান রবের সাহায্য প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ঔদ্ধত্য প্রদর্শনকারীগণ সত্য অস্বীকার করার কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। আল্লাহর সাহায্য প্রত্যাশীগণ মুক্তি পেয়েছিলেন। তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন সাহায্য কোথা থেকে আসে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, “হে ঈমানদারগণ, ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।” (সূরা বাকারা : ১৫৩)

মুমিনগণ যদি আল্লাহর সাহায্য পেতে চায় তাহলে অবশ্যই মহান রবের পদ্ধতিতেই সাহায্য চাইতে হবে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর মুমিন বান্দাকে নিজেই সাহায্য করতে চান, সাহায্য করা তাঁর জন্য আবশ্যকীয় করে নেন। কুরআনের ভাষায়, “আর আমাদের দায়িত্ব তো মুমিনদের সাহায্য করা।” (সূরা রুম : ৪৭)
মহান আল্লাহ যদি মুমিনদের সাহায্য করেন, তাহলে কোন হতাশা, ভীতি থাকতে পারে না। নির্যাতন যতই আসুক, মুমিনগণ ভয়াবহ পরিস্থিতি দেখেও দ্বীন ও দ্বীনি আন্দোলন থেকে পেছনে ফিরে যায় না। কারণ সে জানে পেছনে ফিরে যাওয়া জঘন্য অপরাধ। কেবল যারা দুনিয়ামুখী হয়ে নিজ স্বার্থে, দুনিয়ার পেছনে ছুটছে, দুনিয়ার মোহ ও বেশি বেশি পাওয়ার আকাক্সক্ষায় সর্বদা ব্যস্ত ও নিমজ্জিত থাকে তারাই পেছনে ফিরে যায়, রবকে ভুলে যায়, ভুলে যায় তার প্রতি মহান রবের অশেষ নেয়ামতের কথা।
মুমিনগণ দু’টি মাধ্যমে মহান রবের সাহায্য পেয়ে থাকে। এক ধৈর্য, দ্বিতীয় সালাত বা নামাজ। ধৈর্য হলো সফলতা অর্জনের সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম। হাদিসে ধৈর্যকে নিয়ামত বলে আখ্যা দেয়া হয়েছে। হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ও ব্যাপক কোন নিয়ামত কাউকে দেয়া হয়নি।’ (বুখারি-মুসলিম, বুখারি-১৩৭৫)
মহান আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের যত কিছু দান করেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে কল্যাণকর হলো ধৈর্য ধারণের শক্তি। সেই শক্তি দিয়ে সফলতা অর্জন করা যায়। পৌঁছা যায় সাফল্যের চূড়ায়। বহুল প্রচলিত একটি বাক্যের সাথে আমরা খুবই পরিচিত আর তা হলো ‘সবুরে মেওয়া ফলে’ অর্থাৎ ধৈর্য ধারণে সুফল লাভ করা যায়। মুমিনগণের জীবনের পথ পরিক্রমায় নিজেদের মাঝে যদি মতবিরোধ দেখা দেয়, তৈরি হয় সম্পর্কের মাঝে দুর্বলতা, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন হয়ে যায় নড়বড়ে, প্রকাশ পায় সরকার, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির মাঝে সম্পর্কের দূরত্বের, তখন তাদের অবশ্যই কুরআন ও রাসূল (সা.)-এর নিকট ফিরে আসতে হবে। এটা হলো মুমিনের বৈশিষ্ট্য। ফিরে আসার সাথে সাথে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ধৈর্যের। ধৈর্যই পারে সকল সমস্যার সমাধান দিতে। পবিত্র কুরআনের ভাষায়, “আর তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর আনুগত্য করো এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না। তাহলে তোমাদের মাঝে দুর্বলতা দেখা দিবে এবং তোমাদের প্রতিপত্তির দিন শেষ হয়ে যাবে। সবরের পথ অবলম্বন করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবরকারীদের সাথে রয়েছেন।” (সূরা আনফাল : ৪৬)

নিজের মাঝে বিবাদ, সন্দেহ ও সম্পর্কের বিভাজন তৈরি করে ক্ষতির। এই ক্ষতি কোন একজন ব্যক্তির হয়ে শেষ হয়ে যায় বিষয়টা এমন নয়। বরং সমস্ত জাতির মাঝে এই ক্ষতি পরিলক্ষিত হয় এবং সেই সাথে নিজেদের প্রতিপত্তি, মর্যাদা ও গুরুত্ব নষ্ট হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে শুধু ধৈর্য ধারণের চেয়ে উত্তম কোন পন্থা থাকতে পারে না। ধৈর্য ও পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান প্রচেষ্টা সফলতার দ্বারকে খুলে দিতে পারে। ধৈর্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামরত ব্যক্তি ও সমাজ সংস্কারে নিজের উৎসর্গকারী মুমিনগণের। দ্বীনের মহান কাজে যারা নিজেদের নিয়োজিত রাখেন তাদের ওপর বাধা-বিপত্তি আসা যে অস্বাভাবিক নয় সেটা তারা ঈমান আনার পরই বুঝতে পারেন। দ্বীনি আন্দোলনের কাজে অগ্রসর হওয়ার সাথে সাথে তৈরি হয় চরম সঙ্কটাপন্ন পরিবেশ। বন্ধ হয়ে যায় প্রিয় বন্ধু, পরিবার, নিজ পিতা-মাতা ও ভাইয়ের কাছে থেকে সকল প্রকার সহযোগিতা। ব্যক্তি ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অর্থ-সম্পদ, ব্যবসা-বাণিজ্যের যেমন ক্ষতি হয়, ঠিক তেমনি ক্ষতি হয় নিজের শারীরিক ও মানুষিক, এমনকি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করতে হয়। এই সকল পরিস্থিতিতে ধৈর্যের চেয়ে কল্যাণ বয়ে নিয়ে আসতে পারে তেমন কোন উত্তম পন্থা নেই। কুরআনের ভাষায়, “আর আমি অবশ্যই পরীক্ষা করবো কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সূরা বাকারা : ১৫৫)
আল্লাহ তায়ালা পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই যেমন করতে চান, ঠিক তেমনি পরীক্ষার মাঝে যেন কোন ব্যর্থতা আসতে না পারে তার জন্য করণীয়ও বলে দিয়ে সুসংবাদ দিয়েছেন। মহান আল্লাহ তায়ালা পরীক্ষার মাধ্যমে বাছাই করেন। তিনি নিজেই দেখেন, কে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে চলছে আর কে সত্যি পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। যে সকল মুমিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবেন তাদের জন্য কাক্সিক্ষত আশ্রয়স্থল জান্নাত থাকবে পুরস্কারস্বরূপ। মহান রবের ভাষায়, “তোমরা কি মনে করেছো তোমরা এমনিতেই জান্নাতে প্রবেশ করবে? অথচ এখনো আল্লাহ দেখেননি তোমাদের মধ্যে কে তাঁর পথে প্রাণপণ সংগ্রাম করতে প্রস্তুত এবং কে তার জন্য সবরকারী। (সূরা আলে ইমরান : ১৪২)

জান্নাত হলো মহান রবের পক্ষ থেকে বান্দার জন্য শ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল। বান্দা ইচ্ছা করলেই যে সেই বাগ-বাগিচা ও ফুলে ফলে সুশোভিত এবং নহর প্রবাহিত জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে বিষয়টি এমন নয়। বরং সেটা লাভের জন্য তাকে অবশ্যই পরীক্ষা দিয়ে সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য যত গুণাবলি প্রয়োজন হয় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও দরকারী গুণাবলি হলো ধৈর্যের মতো কল্যাণকর গুণ। ধৈর্য বয়ে নিয়ে আসে সফলতা। মহান রবের ভাষায়, “হে নবী মুমিনদেরকে যুদ্ধের জন্য উদ্বুদ্ধ করুন। তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তাঁরা দুইশত জনের উপরে বিজয়ী হবেন। আর এমনই ধরনের যদি একশত জন থাকে তাহলে তাঁরা সত্য অস্বীকারকারীদের মধ্যে এক হাজার জনের ওপর বিজয়ী হবেন, কারণ তারা এমন ধরনের লোক যাদের বোধশক্তি নেই।” (সূরা আনফাল : ৬৫)
ইসলামে বিজয়ের জন্য সংখ্যা, অস্ত্র, পরিবেশ পরিস্থিতি কোন কালেই প্রয়োজনীয় ছিল না। আল্লাহর পথে সংগ্রামের জন্য ধৈর্য মূল পুঁজি। আর এই কারণে যখন কোন বিপদ মুসিবত এসেছে, জুলুম ও নির্যাতন যেমন তাদের হতাশ করতে পারেনি, ঠিক তেমনি ঈমানদারগণ বিপদ ও মুসিবতে পেছনে ফিরে আসেননি। কুরআনের ভাষায়, “আল্লাহর পথে তাদের ওপর যেসব বিপদ আসে তাতে তারা মনমরা ও হতাশ হয়নি। তারা দুর্বলতা দেখায়নি এবং তারা বাতিলের সামনে মাথানত করে দেয়নি। এ ধরনের সবরকারীদেও আল্লাহ ভালোবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৪৬)

রাসূল (সা.)-এর সময়ে যুদ্ধের সামগ্রিক ব্যয় বহন করার সামর্থ্য অপর্যাপ্ত হলেও আল্লাহর পথের সৈনিক বা ঈমানদার মুজাহিদদের মূল অস্ত্র ছিল ধৈর্য। কাজেই ধৈর্য হলো জিহাদের অস্ত্র। যার মাধ্যমে একজন মুমিনজীবন যুদ্ধ থেকে শুরু করে যত ধরনের যুদ্ধ রয়েছে সেখানে নির্ভয়ে নিশ্চিত কল্যাণ বয়ে আনতে শুধু এই অস্ত্রই ব্যবহার করতে পারে। কঠিন ও ভয়াল পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে সে শুধু মহান রবের নিকট ফিরে আসে। কুরআনের ভাষায়, “এবং যখনই কোন বিপদ আসে তখন তারা বলে নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই ফিরে যেতে হবে।” (সূরা বাকারা : ১৫৬)

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আল্লাহর রাস্তায় চলার প্রাথমিক পর্যায়েই বিপদ মুসিবত আসা যেমন অস্বাভাবিক নয়, ঠিক তেমনি কিছু দূর পথ অতিক্রম করলেই দুনিয়ার যত রকমের নির্যাতন আছে সেটা চেপে বসা বা শাহাদাতের মাধ্যমে নির্যাতনের সীমার শেষ পথ অতিক্রম করাও নতুন কোন বিষয় নয়। এমনি পরিস্থিতিতে ঈমানদারগণ আল্লাহর কাছে ফিরে এসে মহান রবকে স্মরণ করতে থাকেন। নিজেদের অন্তরকে ধৈর্যের মাধ্যমে প্রস্তুত করেন। কুরআনের ভাষায়, “তাদের (মুমিনগণের) অবস্থা এই যে, আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় কেঁপে উঠে, বিপদে তারা ধৈর্য ধরে, নামাজ কায়েম করে, যা কিছু রিজিক তাদেরকে দেয়া হয়েছে তা থেকে খরচ করে।” (সূরা হজ : ৩৫)

ধৈর্যের প্রতিদান হলো সফলতা। যারা ধৈর্যকে জীবনের জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছেন, জীবনের সকল অবস্থায় ধৈর্যের নীতি অবলম্বন করে তারাই কল্যাণকামী হন। মহান রবের ভাষায়, “হে ঈমানদারগণ, সবরের পথ অবলম্বন করো, বাতিল পন্থীদেরকে মোকাবিলায় দৃঢ়তা দেখাও, হকের খেদমত করার জন্য উঠে পড়ে লাগো এবং আল্লাহকে ভয় করতে থাকো। আশা করা যায় তোমরা সফল হবে।” (সূরা আলে-ইমরান : ২০০)
পৃথিবীতে যারা সদাচার গ্রহণ করে ঈমান আনে, আল্লাহকে ভয় করে তারাও কল্যাণকামী হবে। তবে ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে সবচেয়ে বেশি হিসাব ছাড়া অঢেল পুরস্কার। কুরআনের ভাষায়, “আল্লাহর জমিন তো প্রশস্ত, ধৈর্যশীলদের জন্য রয়েছে অঢেল পুরস্কার।” (সূরা যুমার : ১০)

মহান রবের নিকট প্রিয় হতে, পুরস্কার পাওয়ার জন্য এবং সফলতার জন্য বান্দাকে উত্তীর্ণ হতে হয় দুনিয়ার সকল পরীক্ষায়। যেখানে জাহিলিয়াতের শিকড় অনেক গভীর এবং সুদৃঢ়ভাবে বর্তমান সমাজব্যবস্থায় ভিত গেড়ে মজবুত অবস্থান নিয়ে আছে। সেটাকে সহজেই তুলে ফেলা চাট্টিখানি কথা নয়। বস্তুত স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেই এ কাজ কঠিন ও ঝুঁকিযুক্ত। সেখানে দ্বীনের বিপরীত ব্যবস্থাপনার মাঝে টিকতে হলে, আল্লাহর দ্বীনের ঝাণ্ডাকে সমুন্নত রাখতে হলে ধৈর্যের বিকল্প যেমন নেই, ঠিক তেমনি ধৈর্যকে আরো শানিত এবং তাওয়াক্কুল বিল্লাহ বৃদ্ধির জন্য নামাজের চেয়ে উত্তম কোনো ইবাদত নেই। নশ্বর এই পৃথিবীর দুর্বল মানুষ যখন তার সীমিত শক্তি ও সাহায্য হারিয়ে ফেলতে বসে তখন সে সর্বশক্তিমান আল্লাহর কাছে হাত পাতার প্রয়োজন আরো গভীরভাবে অনুভব করে। নামাজের মাধ্যমে সেই প্রয়োজন মিটিয়ে নিতে সক্ষম হয়। শুধুমাত্র নামাজই বান্দাকে আল্লাহর নিকটে নিতে পারে। পারে তার রবের সাথে যোগাযোগ ঘটাতে। রাসূল (সা.)-এর নিকটে জনৈক ব্যক্তি ইহসান সম্পর্কে জানতে চাইলে নবী (সা.) বললেন, ‘ইহসান হলো আপনি এমনভাবে ইবাদত করবেন যেন আল্লাহকে দেখছেন। আর যদি না দেখতে পান তাহলে মনে করবেন আল্লাহ আপনাকে দেখছেন।’ (সহিহ বুখারি-৫০, ঈমান অধ্যায়)

পবিত্র কুরআনে আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়ার জন্য যে ইবাদতের কথা বারবার বলা হয়েছে তা হলো নামাজ। কুরআনের ভাষায়, “তোমরা সিজদা দাও আর আল্লাহর নিকটবর্তী হয়ে যাও।” (সূরা আলাক : ১৯)
রাসূল (সা.) বলেন, ‘বান্দাহ যখন সিজদারত হয় তখন সে আল্লাহর কাছে পৌঁছে, অতএব তোমরা বেশি বেশি সিজদাহ কর।’ (মুসলিম, ইবনে কাসির, সূরা আলাক)

বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে রাসূল (সা.)কে সিজদাবনত অবস্থায় দেখা গেছে। হযরত আলী (রা) বলেন, ‘বদরের দিন আমরা সবাই নিদ্রিত অবস্থায় ছিলাম। কিন্তু রাসূল (সা.) একটি গাছের নিচে সালাত আদায় করছিলেন এবং আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করছিলেন।’ (ইবনে কাসির, সূরা আনফাল- ১১নং আয়াতের তাফসির) সিরাতে আর রাহিকুল মাখতুমের বর্ণনায় রয়েছে ‘রাসূল (সা.) সেদিন কাতরভাবে আল্লাহর নিকট মোনাজাত করছিলেন।’ নবী (সা.) যদি সালাতের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করেন তাহলে আল্লাহর দ্বীনের মুজাহিদগণ অবশ্যই অন্য কোন পন্থায় নয় বরং সালাতের মাধ্যমে প্রার্থনা যেমন করবে তেমনি আবার রাসূল (সা.) এর দেওয়া পদ্ধতির সঠিক অনুসরণ করবে। রাসূল (সা.)-কে নবুয়তের মহান দায়িত্ব দেয়ার পরপরই তিনি যেন ধৈর্যের সাথে সেই মহান দায়িত্ব পালন করেন এ জন্য রাত্রিতে জেগে সালাত আদায়ের ব্যাপারে বলা হয়েছে। যখন সবাই ঘুমিয়ে যায় নিশ্চুপ রাত্রিতে আল্লাহ নিকট আকুতি নিয়ে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে প্রাপ্ত দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা আরো বৃদ্ধি পায়। কুরআনের ভাষায়, “হে বস্ত্র মুড়ি দিয়ে শয়নকারী, রাতের বেলা নামাজে রত থাকো, তবে কিছু সময় ছাড়া, অর্ধেক রাত কিংবা তার চেয়ে কিছু কম করো।” (সূরা আল-মুজাম্মিল : ১-৩)
প্রচলিত সমাজব্যবস্থার কঠিন চাপ ও রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা তাগুতের কালো থাবার মহৌষধ হলো রাত্রি জেগে সালাত আদায় করা। কুরআনের ভাষায়, “আমি অতি শিগগিরই তোমার ওপর একটি গুরুতর বাণী নাযিল করবো, প্রকৃতপক্ষে রাতের বেলা জেগে ওঠা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে অনেক বেশি কার্যকর এবং যথাযথভাবে কুরআন পড়ার জন্য উপযুক্ত সময়।” (সূরা আল-মুজাম্মিল : ৫-৬)
সফল ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো যেমন সকলের সর্বপ্রধান কাজ আবার প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধান কাজ হলো ‘নামাজ কায়েম করা’। (সূরা হজ : ৪১)

নামাজের মাধ্যমে সামাজিক অবক্ষয় যেমন দূর হয় ঠিক তেমনি সমাজে প্রতিষ্ঠিত সকল অশ্লীল খারাবিও চলে যায়। তাই খুশুখুজুসহ নামাজ আদায় করা মুমিনের আবশ্যকীয় দায়িত্ব। যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে সালাত আদায় করলে নিজ অন্তরে অর্জিত হয় অভাবনীয় শক্তি ও নুর বা আলো। সেই আলোক মশাল ও প্রতিষেধক শক্তি হিসেবে নিয়ে মুমিন ব্যক্তি জাহিলিয়াতের অন্ধকারাচ্ছন্ন গলিপথ পাড়ি দিতে সক্ষম হন। মুমিন ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে মহান রবের নিকট প্রার্থনা করবে, এটা মহান রবের চাওয়া। কুরআনের ভাষায়, “হে নবী, আমার বান্দা যদি তোমার নিকট আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে তাহলে তাদেরকে বলে দাও, আমি তাদের কাছেই আছি। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং জবাব দেই। কাজেই তাদের উচিত আমার আহ্বানে সাড়া দেয়া এবং আমার ওপর ঈমান আনা। এ কথা তুমি শুনিয়ে দাও হয়তো সত্য-সরল পথের সন্ধান পাবে।” (সূরা আল-বাকারা : ১৮৬)

বান্দা যত বিপদেই থাকুক না কেনো আল্লাহ তাঁর বান্দার সেই আকুতি শুনেন যদি বান্দা মহান আল্লাহর নিকট ফিরে আসে। তাঁর ওপর আস্থা রাখে। যেমন ভাবে ইয়াকুব (আ) তাঁর সন্তানকে হারিয়ে উত্তম ধৈর্যের মাধ্যমে আল্লাহর ওপরই আস্থা রেখেছিলেন। আবার ইবরাহিম (আ) আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর আল্লাহর নিকট আশ্রয় চেয়ে বলেছিলেন, ‘আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক।’ (বুখারি-৪৫৬৪)
আমরাও এই কঠিন পরিস্থিতিতে মহান রবের নিকট ফিরে এসে ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে আমাদের সকল আকুতি জানাতে চাই। তাঁর নিকট সাহায্য চাই। আমাদের কোন আশ্রয়স্থল নেই, এ কথা সুন্দরতমভাবে রবের নিকট পেশ করতে চাই। আরো জানাতে চাই, হে আমাদের রব! তুমি আমাদের পৃথিবীকে আমাদের জন্য বসবাস উপযোগী করে দাও। আমাদের চলার পথকে করে দাও সহজ ও মসৃণ।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply