সর্বশেষঃ
post

‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগানে জেগে উঠলো বিশ্ব

মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তুরস্কের এক সাগরতীরে পড়ে থাকা ৩ বছরের ছোট্ট শিশু আয়লান কুর্দির লাশ তখন গোটা বিশ্ব বিবেককে এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনি দিয়েছিলো। এক সুন্দর জীনের স্বপ্ন নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে সিরিয়া থেকে গ্রিসের পথে পাড়ি দিয়েছিলেন আয়লানের বাবা-মা ও ভাই। কিন্তু ভাগ্যবিড়ম্বিত আরো বহু অভিবাসনপ্রত্যাশীর মতোই সাগরগর্ভে সলিল সমাধি হয়েছিল পরিবারটির। যদিও এটি সেই সময়ে কোনো নতুন খবর ছিলো না, কারণ এরকম মৃত্যুর খবর বহু বছর ধরেই হরহামেশা শোনা যায়। কিন্তু আয়লান কুর্দির ঘটনায় যেন গোটা বিশ^ সেদিন শিহরিত হয়েছিল।

লাল টি-শার্ট এবং নীল প্যান্ট পরিহিত সাগরপাড়ে বালির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা ছোট্ট শিশু আয়লান কুর্দির সেই লাশ যেন মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা বিশ^বিবেকের এক মূর্তপ্রতীক হয়ে উঠেছিল। সেই শিশুর লাশ সেদিন সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছিল বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হয়ে একটু ভালো থাকার আশায় মানুষ কিভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে ভিন দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। অথচ প্রতিটি মানুষেরই তার নিজ মাতৃভূমিতে সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। তাই বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া ট্র্যাজেডিক ঘটনাকে ছাপিয়ে আয়লান কুর্দির ঘটনা সেদিন এক ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছিল।

প্রায় সাড়ে ছয় বছর পর ভারতের কর্নাটকের মান্ডা জেলার এক প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজের বিকম দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মুসকান খানের ঘটনাও যেন আয়লান কুর্দির ঘটনাকে মনে করিয়ে দিলো। কিন্তু মুসকানের ঘটনা নানাভাবে আয়লানের ঘটনার চেয়েও মানুষের মধ্যে অনেক বেশি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। কারণ মুসকান এক অসভ্য বর্বরতার বিরুদ্ধে এক অকুতোভয় সাহসী প্রতিবাদীর চরিত্রে আবির্ভূত হয়, যা বিশ্বব্যাপী অসংখ্য ঝিমিয়ে পড়া মানুষকে জাগিয়ে তুলেছে জুলুম নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে এখন দেখা যায় যে মানুষ কয়েক ভাগে বিভক্ত। এক শ্রেণীর যারা সভ্যতা ও নম্রতার মুখোশ পরে বিশ্বব্যাপী জুলুম নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাচ্ছে নিজেদের কায়েমি স্বার্থ হাসিলের জন্য, আরেক শ্রেণীর যারা নিজেদের সুখ-সুবিধা নিয়ে ব্যস্ত আছে এবং নিজেদেরকে কারো সাত-পাঁচে নাই বলে দাবি করেন, আরেক শ্রেণীর যাদের বিবেক রয়েছে কিন্তু বোধ কম থাকার কারণে প্রায়শই নিজেদের কর্তব্যকর্ম সাধন করতে পারেন না এবং চতুর্থ এক শ্রেণীর রয়েছেন যাদেরকে সোজা বাংলায় চামচা বলা যায় যারা জুলুমবাজ শক্তির চামচা হয়ে কাজ করছে।

যারা সজ্ঞানে জুলুম নির্যাতন করে তারা আসলে সব কিছু বুঝে শুনেই করে। এমনকি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েই তারা সব কিছু করে। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে উসমানীয় খিলাফতের পতন, মধ্যপ্রাচ্য তথা গোটা বিশ^মানবতার জন্য বিষফোঁড়াস্বরূপ যায়নবাদী ইসরাইলি রাষ্ট্রের উত্থান এবং মিয়ানমার ও কাশ্মিরে মানবতার চরম লঙ্ঘন ও সীমাহীন জুলুমের পেছনে যারা মুখ্য ভূমিকা পালন করছে তারা সব কিছু বুঝে শুনেই করছে, যদিও এদেরই একটি অংশ আবার অসহায় মানুষকে ত্রাণসহায়তার নামে তাদেরকে নিজেদের গণ্ডির ভেতরে রেখে দিয়েছে এবং বিশ^ব্যাপী নিজেদেরকে ত্রাণকর্তা হিসেবে জাহির করছে। সুবিধাভোগী চামচারা সবসময়ই এদের সহায়ক ভূমিকা পালন করে আসছে। আর যারা কেবল মাটির নিচ আর আসমানের ওপর নিয়ে ব্যস্ত এবং সুস্বাদু খাবার আর শঙ্কামুক্ত জীবন উপভোগ করছে তারা তাদের আয়েশি জীবনের খোলস খুব একটা পরিত্যাগ কখনই করেনি, হয়তোবা ভবিষ্যতেও করবে না। কিন্তু জ্ঞান ও বোধশক্তিতে দুর্বল কিন্তু বিবেকবান যেই বিরাট জনগোষ্ঠী ঝিমিয়ে আছে তাদেরকে জাগ্রত করতে পারলেই হয়তোবা এই বিশ^ থেকে জুলুম নির্যাতনের যবনিকাপাত করা অনেকটা সহজ হবে।

এবার ফেরা যাক মুসকান খানের ঘটনায়। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি ২০২২, ভারতের কর্নাটকে নিজ কলেজে আসেন মুসকান খান। নিজের স্কুটি থেকে নেমে ক্যাম্পাসের মধ্য দিয়ে কলেজ ভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন মুসকান। হঠাৎ করে গেরুয়া রংয়ের স্কার্ফ পরিহিত একদল উগ্র যুবক ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতে দিতে মারমুখী ভঙ্গিতে তার দিকে এগিয়ে আসে। ভারতের মতো কট্টর হিন্দুত্ববাদী মোদি সরকারের আমলে যখন মুসলিম ও হিজাববিরোধী অপতৎপরতা চরমে, তখন আকস্মিক ৩৫-৪০ জনের উগ্র যুবকের এমন মারমুখী আগমনে স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি মেয়ের প্রচণ্ড ভয় পাওয়ার কথা। বিশেষ করে ওই মুহূর্তে তার নিকট কিংবা আশপাশে আর কোনো মেয়েকে দেখা যাচ্ছিল না। মেয়েটি হয়তোবা মনে মনে ভয়ও পেয়েছিল। কিন্তু তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া গোটা বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। মেয়েটি সেই গোটা উগ্রবাদী দলটির মুখে একা প্রথমে অন্তত তিনবার এক হাত উঁচু করে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে স্লোগান দেয়। পরে আরো দুই-তিনবার একই স্লোগান দেয় এবং উচ্চকণ্ঠে ক্যামেরার সামনে এসে নিজের অবস্থান ব্যক্ত করেন।

মুসকানের এমন ফিডব্যাকের জন্য খুব সম্ভবত কেউ প্রস্তুত ছিল না। চরমপন্থী দলটির সাথে থাকা তুলনামূলক বয়স্ক কয়েকজনকে দেখা গেলো তাকে কলেজ ভবনের দিকে চলে যেতে সহায়তা করছেন। পুরো ঘটনাটির ভিডিও মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় গোটা বিশ^জুড়ে। ফেসবুক, টুইটারসহ সমস্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য মানুষ মুসকানকে সাহসিকতার এক মূর্তপ্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন। আবার কেউ কেউ তাকে সত্যিকার ঈমানদার মুসলমান কিভাবে ঈমানের বলে বলীয়ান হবেন তার এক মাইলফলক হিসেবে উপস্থাপন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি মূল ধারার গণমাধ্যমেও মুসকানকে নিয়ে প্রচুর খবর প্রকাশিত হয়। ভারতের জনপ্রিয় এনডিটিভি ও বিবিসি হিন্দিসহ বহু গণমাধ্যমে মুসকানের ইন্টারভিউ প্রচার ও প্রকাশিত হতে থাকে। তবে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে মুসকানের যে সরল বক্তব্য উঠে এসেছে তা রীতিমতো এক অ্যাটম বোম ঝিমিয়ে থাকা বিবেকবান মুসলিমসহ সমস্ত সভ্য মানবতার জন্য। মুসকান সাবলীলভাবেই স্বীকার করেছেন যে কট্টর যুবকদের দলটি যখন উগ্রভাবে তার দিকে জয় শ্রী রাম স্লোগান দিয়ে এগিয়ে আসে তখন তিনি ভয় পেয়ে যান এবং যখনই তিনি পাল্টা আল্লাহু আকবার বলে স্লোগান দেন তার মনের ভেতর থেকে ভয় চলে যায় এবং সেখানে এক ঐশ্বরিক সাহস ভর করে।

বিষয়টি অনেক অমুসলিমের জন্য কিছুটা দুর্বোধ্য মনে হতে পারে। কিন্তু মুসলমান নামমাত্রই সবার জানা আল্লাহ নামটির মধ্যে মুসলমানদের জন্য এক বিশাল শক্তি লুকিয়ে আছে। আজকে যারা বিবেকবান কিন্তু বিশ^ মোড়লদের ভয়ে চুপ মেরে আছেন, তাদের জন্য মুসকান যেন এক বিপ্লবী বার্তা দিয়েছেন। ইসলামোফোবিয়াসহ গোটা বিশ^জুড়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র ও নিপীড়ন চলছে তার বিরুদ্ধে মুসলমানদেরকেই সাহসিকতার সাথে রুখে দাঁড়াতে হবে। আর যখন কেউ আল্লাহর ওপর ভরসা করে এই কাজ করবেন তখন অনেকেই তাকে অনুসরণ করা শুরু করবেন। এবার মুসকানের ঘটনার পর আমরা যদি একটু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্নজনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করি দেখতে পাবো এই মেয়েটা কি বিপ্লবী কাজটাই না করেছেন। আবদুল্লাহ আল কাফি নামে একজন তার টুইটার অ্যাকাউন্টে মুসকানের একটি আর্ট করা ছবি দিয়ে লিখেছেন: “লিল্লাহি তাকবির আল্লাহু আকবার হৃদয়কে শিহরিত করে বারবার” রীতিমতো কবিতার এইটি অংশ। আহসান উদ্দিন গিলমান নামে আরেকজন তার টুইটারে মুসকানের ছবি দিয়ে কবি মতিউর রহমান মল্লিকের গানের একটি অংশ দিয়েছেন। যেখানে লেখা ছিল: “মুসলিম আমি সংগ্রামী আমি আমি চির রণবীর আল্লাহকে ছাড়া কাউকে মানি না নারায়ে তাকবির, নারায়ে তাকবির” সিনিয়র সাংবাদিক এম আবদুল্লাহ তার ফেসবুক পেজে লিখেছেন: ‘২০১০ সাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউবে যুক্ত আছি। গত এক যুগে কোনো ভিডিও এতবার দেখেছি বলে মনে পড়ছে না। যতবার দেখছি, ততবারই মনের অজান্তে আল্লাহু আকবার ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে। তবে ‘সিংহ শাবক’ দুর্দান্ত সাহসী কিশোরী বিবি মুসকান খানের মত শরীরের পুরোটা শক্তি দিয়ে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তোলার আগ্রহ দমাতে পারছি না। কিন্তু তার জন্য সম্ভবত কিছুসংখ্যক গেরুয়া উগ্রবাদীর সাক্ষাৎ পাওয়া দরকার। প্রথম ভিডিওটিতে মুসকান আল্লামা ইকবালের সেই কালজয়ী উচ্চারণটিই করলো- ‘তৌহিদ কি আমানত সি-- নু মে হ্যায় হামারে, আ..ছাঁ নেহি মেটানা নাম ও নেশান হামারা’। স্যালুট গ্রেট মুসকান।’ আরেক জনপ্রিয় টেলিভিশন সাংবাদিক মুস্তাফা মল্লিক লিখেছেন: ‘সাহসী মুসলিম মেয়ের চিৎকার এই দুনিয়ার সব থেকে বড় গণতান্ত্রিক দেশে, তার কলেজ প্রাঙ্গণে। একজন মুসলিম মেয়ে তার হিজাব পরার অধিকার বাঁচাতে শত শত স্লোগানের বিরুদ্ধে একাই প্রতিরোধে গর্জে উঠেছে। এটাই ঈমান।’ এভাবে বলতে গেলে বহু ব্যক্তি যারা কেউ বড় বড় আলেম কিংবা মুফতি নন, কোনো বড় ইসলামিক বা রাজনৈতিক দলের নেতাও নন, তারাও মুসকানকে নিয়ে লিখেছেন। ভারতের অনেক সভ্য হিন্দুও লিখেছেন মুসকানের প্রশংসা করে এবং কট্টর পন্থার সমালোচনা করে। একজন মানুষের ধর্মীয় স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপকে যে কোনো বিবেকবান মানুষই পছন্দ করেন না তা দেখতে পেলো গোটা বিশ^। পশ্চিমা বিশে^র পাশ্চাত্য কালচার থেকে আমদানি হওয়া অতি ছোট পোশাক যা প্রকারান্তরে অশ্লীলতাকেও উসকে দেয় এবং যার সাথে ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতির কোনো মিল নেই তাতে কোনো বাধা নেই। অথচ মুসলিমদের হিজাব ও বোরখা নিয়ে বৈষম্যমূলক আচরণ করছে দেশটির কট্টরপন্থীরা যা ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানও অনুমোদন করে না।

ছোট্ট কিশোরী মুসকানের ঘটনার মধ্য দিয়ে গোটা মুসলিম বিশে^র কাছে আজ যে বার্তাটি গেছে তা হলো- আর ঘুমিয়ে থাকার সময় নেই। এখন মুসলমানদেরকে জেগে উঠতে হবে। তাদেরকে শুধু ঘরে বসে ইবাদাত কিংবা মসজিদের কোণে নামাজ পড়ার জন্য পাঠানো হয়নি। তাদেরকে মুসলিম, অমুসলিম তথা গোটা মানবতার কল্যাণের জন্য পাঠানো হয়েছে। আর একটি সুস্থ সমাজ তথা দেশগঠন কখনো উগ্রবাদীদের দমন ব্যতীত সম্ভব নয়। আর এজন্য দরকার ঐক্য ও সাহসিকতা। মুসকানের ঘটনায় যে মানবতার আওয়াজ চারদিক থেকে উচ্চারিত হলো- তাকে যদি ঐক্যবদ্ধ রূপ দিয়ে সবাইকে জাগিয়ে তোলা যায় তবেই একটি সুন্দর শান্তিময় পৃথিবী গড়া সম্ভব যেখানে থাকবে সবার ধর্মীয় ও মানবিক স্বাধীনতা এবং অবসান ঘটবে জুলুম ও নিপীড়নের। লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির