আসুন রাসূলুল্লাহ সা.কে জানি ও মানি জালাল উদ্দিন ওমর

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই মহাবিশ্বের সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা, লালনকর্তা এবং পালনকর্তা। তিনি সর্বময় ক্ষমতার একমাত্র মালিক এবং সার্বভৌমত্বের একচ্ছত্র অধিপতি। তিনিই সৃষ্টিকারী, তিনিই ধ্বংসকারী। তিনি সবকিছুই জানেন এবং তার কাছেই সবাইকে ফিরে যেতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর ¯্রষ্টা এবং যখন তিনি কোন কিছু করতে সিদ্ধান্ত করেন তখন ইহার জন্য শুধু বলেন ‘হও’ আর তা হয়ে যায়। (সূরা বাকারা : ১১৭) মানুষ হচ্ছে তার সৃষ্টির মধ্যে সেরা জীব। আল্লাহ মানুষকে তার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। এই প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন, “আমি জিন এবং মানুষকে আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সূরা যারিয়াত : ৫৬) এই পৃথিবীতে মানুষের বসবাসের জন্য যা প্রয়োজন তা সবই তিনি সৃষ্টি করেছেন। মানুষের জীবন বিধান হিসাবে আল্লাহ কুরআন নাজিল করেছেন এবং ইসলাম ধর্মকে মনোনীত করেছেন। হযরত মুহাম্মদ সা. আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ নবী এবং রাসূল। হযরত জিবরাইল (আ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর কাছে ধাপে ধাপে দীর্ঘ ২৩ বছরে এই কুরআন নাজিল করেছেন এবং মুহাম্মদ সা. এই কুরআন নিজের জীবনে এবং সমাজে বাস্তবায়ন করেছেন। রাসূল সা. এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এবং আদর্শ মানব। তাকেই অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে মানবজাতির ইহকালীন শান্তি এবং পরকালীন মুক্তি। তাই আমাদের কল্যাণ এবং মুক্তির স্বার্থেই রাসূল সা.কে জানতে হবে এবং রাসূল সা.কে মানতে হবে।

হযরত মুহাম্মদ সা. আল্লাহর মনোনীত নবী এবং রাসূল সা.। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানবজাতির কাছে রহমত এবং পথপ্রদর্শক হিসাবেই হযরত মুহাম্মদ সা.কে প্রেরণ করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন, “আমি তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি শুধু রহমত হিসাবেই প্রেরণ করেছি।” (সূরা আম্বিয়া : ১০৭) তিনি আরো বলেছেন, “হে নবী আমি তো তোমাকে সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারীরূপে পাঠাইয়াছি।”(সূরা আহযাব : ৪৫) রাসূল সা.-এর জীবন হচ্ছে মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয় আদর্শ। তার জীবনই মানবজাতির জন্য গাইডলাইন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের জন্য রাসূল সা.-এর জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ।” (সূরা আহযাব : ২১) রাসূল সা.-এর কোন নির্দেশ, আদর্শ এবং নীতিমালাকে অমান্য এবং অস্বীকার করার কোনো সুযোগ মানবজাতির জন্য নেই। যদি কেউ তা করে তাহলে সে নিশ্চিতভাবেই ধ্বংস হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ ও তার রাসূল সা. কোন বিষয়ে নির্দেশ দিলে কোন মুমিন পুরুষ এবং মুমিন নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন সিদ্ধান্তের অধিকার থাকবে না। কেহ আল্লাহ এবং তাহার রাসূল সা.কে অমান্য করলে সে তো ¯পষ্ট পথভ্রষ্ট হবে।” (সূরা আহযাব : ৩৬) আল্লাহকে ভালোবাসলে রাসূল সা.কেই অনুসরণ করতে হবে। অর্থাৎ একজন মানুষ যদি আল্লাহকে ভালোবাসতে চায়, তাহলে রাসূল সা.-এর নীতি এবং আদর্শকেই অনুসরণ করতে হবে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে রাসূল সা.কে উদ্দেশ করে আল্লাহ বলেন, “বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ তোমাদেরকে ভালোবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আলে ইমরান : ৩১) একজন মানুষ যদি আল্লাহ এবং আখিরাতে বিশ্বাস করে তাহলে তাকে অবশ্যই রাসূল সা.-এর আনুগত্য করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “হে মুমিনগণ, যদি তোমরা আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস কর তবে তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহর, আনুগত্য কর রাসূল সা.-এর এবং তাদের যারা তোমাদের মধ্যে ক্ষমতার অধিকারী। কোন বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটিলে উহা উপস্থাপন কর আল্লাহ ও রাসূল সা.-এর নিকট। ইহাই উত্তম এবং পরিণামে প্রকৃষ্টতর।” (সূরা নিসা : ৫৯) শুধু তাই নয় রাসূল সা.কে মানতে হবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে এবং যে কোন বিষয়ে তার প্রদত্ত সকল সিদ্ধান্ত নিঃসংকোচে ও দ্বিধাহীন চিত্তে মানতে হবে। তার বিচার-ফয়সালাকে কোন ধরনের প্রশ্ন ছাড়াই মেনে নিতে হবে। এই মানা হতে হবে খুশি মনে, সন্তুষ্টচিত্তে এবং স্বতঃস্ফূর্ত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “কিন্তু না, তোমার প্রতিপালকের শপথ। তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা তাদের নিজেদের বিবাদ-বিরোধের বিচারভার তোমার ওপর অর্পণ না করে। অতঃপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে কবুল না করে।” (সূরা নিসা : ৬৫) মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. হচ্ছেন মানবজাতির পথপ্রদর্শক এবং মুক্তিদূত। তিনি সৃষ্টিকুলের সবার সেরা। তিনি আল্লাহর প্রিয় বন্ধু এবং ফেরেশতাদের কাছেও তিনি অত্যন্ত সম্মানিত। সুতরাং আমাদের সবাইকেই রাসূল সা.কে যথাযথ সম্মান করতে হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাহার ফেরেশতাগণ ও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।” (সূরা আহযাব : ৫৬)

আল্লাহ তার প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা.-এর স¤পর্কে পবিত্র কুরআনে অসংখ্য আয়াত নাজিল করেছেন। আমি এখানে তার কয়েকটি উল্লেখ করেছি মাত্র। এসব আয়াত থেকে আমরা যা জানতে পেরেছি তা হচ্ছে রাসূল সা. হচ্ছেন মানবজাতির জন্য রহমত এবং মুক্তির পথপ্রদর্শক। তার জীবনেই রয়েছে মানবজাতির জন্য অনুকরণীয় আদর্শ। অর্থাৎ রাসূল সা.কেই কেবল অনুসরণ করতে হবে এবং তার আদর্শকেই কেবল মানতে হবে। রাসূল সা.-এর সিদ্ধান্তকে স্বাভাবিক এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেনে নিতে। রাসূল সা.-এর সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই অমান্য করা যাবে না। রাসূল সা.কে মানলেই কেবল মুক্তি আর না মানলে ধ্বংস অনিবার্য। রাসূল সা.কে না মানলে ইহকালে শান্তি এবং পরকালে মুক্তির কোন পথই মানবজাতির জন্য খোলা নেই। সুতরাং আসুন রাসূল সা.কে জানি এবং রাসূল সা. কেই মানি।

মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. মানবতার আদর্শ। তিনি ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের প্রতীক। তিনি ইসলামের প্রতিটি বিধানকে পালন করেছেন এবং সমাজে প্রতিষ্ঠা করে তার জীবদ্দশায় আরব জাহানে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত সমাজ ছিল নীতি, নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচারে সমৃদ্ধ। তার সমাজ ছিল ইনসাফ এবং মানবিকতায় পরিপূর্ণ। যাবতীয় অন্যায়কে তিনি নির্মূল করেছিলেন। সুদ, ঘুষ, অন্যায়, মাদক, জুয়া, নারী নির্যাতন, ব্যভিচার- সবই তিনি সমাজ থেকে নির্মূল করেছিল। তার প্রতিষ্ঠিত সমাজে হানাহানি, মারামারি, ছিনতাই, রাহাজানি এবং জুলুম-অবিচার ছিল না। তার সমাজ ছিল সাম্য এবং ভ্রাতৃত্বে সমৃদ্ধ ও আলোকিত। ক্ষুধা এবং দরিদ্রতাকে তিনি নির্মূল করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ক্ষুধামুক্ত একটি সুখী সমাজ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. হচ্ছেন স্বমহিমায় উদ্ভাসিত একজন ব্যক্তি যার খ্যাতি, সুনাম এবং প্রভাব শত শত বছর ধরে পৃথিবীকে যেমন আলোড়িত, আলোচিত এবং প্রভাবিত করছে, ঠিক তেমনি আগামীতেও তা অব্যাহত থাকবে। যুগে যুগে অসংখ্য অমুসলিম মনীষী ও রাসূল সা.কে সম্মানিত করে অনেক বক্তব্য দিয়েছেন এবং লেখালেখি করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা অধ্যাপক এবং বুদ্ধিজীবী মাইকেল এইচ হার্ট বছরের পর বছর ধরে গবেষণা করে পৃথিবীর শুরু থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত শ্রেষ্ঠ একশত জন মানুষ নিয়ে ১৯৭৮ সালে লিখেছেন আলোড়ন সৃষ্টিকারী “দি হান্ড্রেড” নামক বই যেখানে তিনি হযরত মুহাম্মদ সা.কে এক নম্বর পজিশনে স্থান দিয়েছেন। অথচ মাইকেল এইচ হার্ট একজন খ্রিষ্টান। তিনি বলেন, Muhammad (saw) is the only man in history who was supremely successful on both the religious and secular level. বিখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও টলস্টয় বলেন, Muhammad (saw) has always standing higher than Christianity. তিনি যখন মারা যান তখন তার পকেটে মুহাম্মদ সা.-এর বাণী সংবলিত একটি বই পাওয়া গিয়েছিল। খ্যাতনামা ব্রিটিশ দার্শনিক জর্জ বার্নার্ড শ বলেন, As a father, as a teacher, as a law giver, as a law maker maker, as a reformer of the society, as a messenger , as a commander Muhammad (saw) is the superman of the world. এটা ব্রিটিশ মিউজিয়ামের দেয়ালে লিখিত আছে। প্রফেসর রামাকৃষ্ণ রাও বলেন, In all the department of human activities Muhammad (saw) is alike a hero. শুধু তাই নয়, Muhammad (saw) honoured by united state supreme court as one of the greatest law givers of the world in 1935.

রাসূল সা.-এর আদর্শ হচ্ছে সার্বজনীন এবং বিশ্বজনীন। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকেই তিনি ভালোবাসতেন। তিনি ছিলেন স্থান কাল পাত্রের অনেক অনেক ঊর্ধ্বে। তার সততা, বিশ্বস্ততা, আমানতদারিতা এবং ন্যায়পরায়ণতা ছিল প্রশ্নাতীত। সত্য এবং ন্যায়ের পথে তিনি ছিলেন অবিচল আস্থার প্রতীক। তিনি সত্য ও ন্যায়ের কথা বলেছেন, সত্য ও ন্যায়ের পথে চলেছেন এবং সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে ব্যক্তিগত ভাবে তিনি লাঞ্ছিত হয়েছেন, অপমানিত হয়েছেন এবং নির্যাতিত হয়েছেন। কিন্তু বিনিময়ে তিনি কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি বরং সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছেন। রাসূল সা. তার ৬৩ বছরের জীবনে কখনো মিথ্যা কথা বলেননি, কখনো কারো আমানত খেয়ানত করেননি, জীবনে কখনো কারো ক্ষতি করেননি, কারো সাথে কখনো মন্দ ব্যবহার করেননি এবং কখনো কারো মনে কষ্ট দেননি। মানুষের দুঃখ কষ্ট দূর করতে তিনি কাজ করেছেন অবিরাম। সুতরাং আসুন আমরা সবাই রাসূল সা.-এর আদর্শকেই অনুসরণ করি। জীবনের সর্বক্ষেত্রে আসুন আমরা সবাই রাসূল সা.-এর জীবনকেকে অনুসরণ করি। ইহকালীন জীবনে শান্তি এবং পরকালীন জীবনে মুক্তির জন্য রাসূল সা.-এর জীবনকেই অনুসরণ করতে হবে।

কারণ তিনি হচ্ছেন আল্লাহর নাজিলকৃত কুরআনের বাস্তব অনুসারী এবং আল্লাহর মনোনীত জীবনবিধান ইসলামের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আজকের অশান্ত পৃথিবীতে বিদ্যমান যাবতীয় অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন এবং ক্ষুধা-দরিদ্রতাকে দূর করে একটি সাম্য ও শান্তির পৃথিবী গড়তে হলে মানবজাতিকে রাসূল সা.-এর আদর্শের কাছেই ফিরে যেতে হবে। যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং কলহ-বিবাদ মুক্ত পৃথিবীর জন্য রাসূল সা. জীবনকে অনুসরণই হচ্ছে মানবজাতির জন্য একমাত্র অবলম্বন। পরকালীন মুক্তি তো বটেই, ইহকালীন জীবনের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যও রাসূল সা.-এর জীবনকেই মানতে হবে। আর রাসূল সা.-এর আদর্শকে বিচ্ছিন্নভাবে এবং নিজের খেয়াল খুশি মতো অনুসরণের কোনো সুযোগ নেই। তাকে মানতে হবে পরিপূর্ণভাবে, সর্বক্ষেত্রে এবং সবসময়। স্বতঃস্ফূর্ত এবং আনন্দচিত্তেই রাসূল সা.কে মানতে হবে। রাসূল সা.-ই হবেন মানবজাতির একমাত্র অনুসরণ, অনুকরণ এবং অবলম্বন। আর কোন কিছুকে মানার জন্য তা জানা হচ্ছে অপরিহার্য। সুতরাং আসুন আমরা সবাই আমাদের মুক্তির স্বার্থেই রাসূল সা.কে জানি এবং রাসূল সা.কেই মানি। আর রাসূল সা.-এর আদর্শকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে মানবতার মুক্তিকে নিশ্চিত করি।
লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক

SHARE

Leave a Reply