ইকবালের দৃষ্টিতে ইসলাম ও পাশ্চাত্য -এবনে গোলাম সামাদ

কবি ইকবাল (১৮৭৩-১৯৩৮) ছিলেন পাশ্চাত্য দর্শনে সুপণ্ডিত। তার ইসলামসংক্রান্ত চিন্তা-চেতনায় পড়েছে এর প্রভাব। ইকবাল ইসলামের যে ভাষ্য প্রদান করেছেন, সম্ভবত তার সমকালীন আর কোনো মুসলিম চিন্তাবিদ তা দেয়ার চেষ্টা করেননি। ইকবাল ইসলামের দার্শনিক বিশ্লেষণ দিতে গিয়ে কুরআন শরিফের একটি বিশেষ অধ্যায়ের কিছু উক্তির ওপর দিয়েছেন গুরুত্ব; যেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন মর্ত্যে তার খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে। আর তাকে প্রদান করেছেন বিচারবুদ্ধি যা সে কাজে লাগিয়ে বেঁচে থাকতে সক্ষম। (সূরা বাকারা : ৩০-৩২) ইকবালের আগে কুরআন শরিফের এই বিশেষ বক্তব্যের ওপর আর কোনো ইসলামী চিন্তাবিদ এতটা গুরুত্বারোপ করেছেন বলে আমাদের জানা নেই। ইকবাল মানুষকে দেখতে চেয়েছেন সচেতন শক্তি হিসেবে। মানুষ উদ্দেশ্য-অভিসারী প্রাণী। মানুষ ভাবনা-চিন্তার মাধ্যমে তার জীবনকে গড়তে চায়। সে কেবলই ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিতে চায় না নিজেকে। ইতিহাসে দেখা যায়, কোনো মানবসমাজ যখন বিশেষভাবে ভাগ্যবাদী হয়ে উঠেছে, তখন তা হয়ে পড়েছে নিষ্ক্রিয়। নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছে তার বেঁচে থাকার সমস্যাকে। ইকবাল বলেছেন মানুষকে নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে। মানুষ তাই, সেভাবে নিজেকে গড়ে নিতে পারে। ইকবালের নিজের ভাষায়-
খুদি কো কর বুলন্দ ইতনা কি হর তকদির সে পহেলে
খুদা বন্দ সে খুদ পুছে বাতা তেরি রজা কেয়া হ্যায়?
অর্থাৎ, নিজেকে এতটা আত্মবিশ্বাসী ও শক্তিমান করে তোলো যে, বিধাতা তোমাকে তোমার ভাগ্যলিপি রচনা করার আগে জিজ্ঞাসা করেন, বল কী তোমার অভিপ্রায়?’ ইকবাল আস্থাশীল ছিলেন সজীব ইসলামে। তিনি মনে করতেন, নতুন নতুন সমস্যা আসতেই পারে। আর মুসলমানদের সে সব সমস্যার সমাধান করতে হবে ভাবনাচিন্তা করে। এর মধ্য দিয়ে ফুটে উঠবে তাদের সজীব সত্তা, তাদের প্রাণশক্তি। মানুষের জ্ঞানের রাজ্যে এসেছে বিরাট পরিবর্তন। এই পরিবর্তনকে অস্বীকার করা যাবে না। তা করতে গেলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবে মুসলিম মিল্লাত যেটা হতে দেয়া যায় না। ইকবালের মতে, কুরআন শরিফে মানুষের জ্ঞানের তিনটি উৎসের কথা বলা হয়েছে। এগুলো হলো- মানুষের অন্তর্গূঢ় অভিজ্ঞতা, প্রকৃতি জগৎ এবং ইতিহাস। ইকবালের মতে, যাকে বলা হয় ইসলামী তার স্বর্ণযুগ, সে সময় মুসলমান দার্শনিক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা বুঝতে চেয়েছেন বিশ্ব প্রকৃতিকে। বুঝতে চেয়েছেন মানুষের ইতিহাসকে। এই দুই চেষ্টার নামে পরিচয় পাওয়া যায় ইসলামী সংস্কৃতি বা সভ্যতার চালিকাশক্তিকে। মুসলমান দার্শনিক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা এ সময় দিয়েছেন খোলা মনের পরিচয়। ইসলামী সভ্যতায় তাই যুক্ত হতে পেরেছে নানা সভ্যতার উপাদান। ইকবাল মনে করতেন, বর্তমানে মানুষের দার্শনিক চিন্তার পটভূমি রচনা করে চলেছে বিজ্ঞান। দর্শনকে হতে হবে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা। বিজ্ঞানের ভিত্তি হলো পরীক্ষা-নিরীক্ষালব্ধ জ্ঞান। এই জ্ঞানকে বিচার-বিশ্লেষণ করে দার্শনিকদের আসতে হবে দার্শনিক সিদ্ধান্তে; বিজ্ঞানের জ্ঞানকে অবজ্ঞা করে নয়। বিজ্ঞানীরা বিশ্বজগৎকে দেখেন খণ্ডিত করে। দার্শনিকের কাজ এই খণ্ডিত জ্ঞানকে সমন্বিত করে উপলব্ধি করা, কী রকম বিশ্বে আমাদের বাস, আর কিভাবে চেষ্টা করা উচিত আমাদের বেঁচে থাকতে। ইকবালের মতে, আইনস্টাইনের গবেষণা বিশ্বজগৎ সম্পর্কে মানুষকে প্রদান করেছে চিন্তার নতুন উপকরণ। এর পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের করতে হবে তাদের ধর্মের নতুন মূল্যায়ন। প্রয়োজনে করতে হবে ইসলামের ধর্মীয় চিন্তাপদ্ধতির পুনর্গঠন। এটা করতে গিয়ে যদি পূর্বসূরিদের সাথে উত্তরসূরিদের মতের অমিল হয়, তবে সে জন্য থাকতে হবে প্রস্তুত। ইকবালের মতে, ইউরোপীয় সংস্কৃতি আর ইসলামী সংস্কৃতি সাংঘর্ষিক নয়। কারণ ইউরোপীয় সংস্কৃতি ইসলামী সংস্কৃতির কতগুলো দিকের পরিণতি মাত্র। মুসলিম দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের মনে যেসব সমস্যা একসময় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, পরে সে সব বিষয় নিয়েই ইউরোপে হয়েছে আরো বিস্তৃতভাবে চিন্তাভাবনা। এর ফলে ইউরোপে ঘটতে পেরেছে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার ও প্রকর্ষ। ইকবাল এসব কথা আলোচনা করেছেন ইংরেজিতে লেখা তার জবপড়হংঃৎঁপঃরড়হ ড়ভ জবষরমরড়ঁং ঞযড়ঁমযঃ রহ ওংষধস নামক বইয়ে। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৪ সালে। ইকবাল তার রাজনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে বোঝাতে চেয়েছেন, যেহেতু আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন মর্ত্যরে খলিফা হিসেবে; তাই মর্ত্যে মানুষ সার্বভৌম। তাই মানুষের আছে রাষ্ট্রিক বিষয়ে আইন তৈরি করার, সংশোধন করার ও স্থগিত করার অধিকার। কোনো আইনই শাশ্বত নয়। মানুষ আইনের স্রষ্টা। ইকবাল ইসলামের ইজমার ধারণার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ইজমা শব্দটির উদ্ভব হয়েছে আরবি ‘জাম’ শব্দ থেকে। জাম শব্দের অর্থ একত্রে জমা করা। আর ইজমা বলতে বোঝায় সংগ্রহ বা একত্রে সমাবেশ। সাধারণ অর্থে ইজমা বলতে বোঝায় কোনো ব্যাপারে একমত বা মতৈক্যে উপনীত হওয়াকে। ইজমার ভিত্তিতে আইনের বিষয়ে মুসলমানরা সিদ্ধান্তে আসতে পারেন। যেহেতু ইসলাম ধর্মে কোনো পুরোহিত প্রথা নেই, তাই ইজমা বলতে ধরা যায়, সব মুসলমানের সাধারণ সম্মতিকে। এই ব্যবস্থা খুবই গণতান্ত্রিক। ইসলাম গণতন্ত্রের পরিপন্থী ধর্ম নয়।
আজ বাংলাদেশে উত্তরাধিকারসংক্রান্ত আইন নিয়ে অনেক বিতর্ক উঠেছে। ইকবালের পথ ধরে ভাবলে বলতে হয়, এর একটা সমাধান সম্ভব ইজমার মাধ্যমে। কুরআন শরিফে বলা হয়েছে, উত্তরাধিকার আইন বলতে বুঝতে হলে যুক্তিসঙ্গত প্রথাকে বুঝতে হবে (সূরা বাকারা : ১৮০)। কিন্তু যুক্তিসঙ্গত প্রথা বলতে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। এটা ঠিক করতে গেলে নিশ্চয় ইজমার প্রয়োজন হবে। এখন ইজমা সৃষ্টি হতে পারে আইনসভার মাধ্যমে অথবা গণভোট গ্রহণ করে। ইকবাল অধ্যাপনা করেছেন। ইকবাল আইন ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। আরবি ও ফারসি ভাষায় ছিল তার গভীর জ্ঞান। ইকবাল ছিলেন কবি-দার্শনিক। এই উপমহাদেশে মুসলিম সমাজজীবনে ইকবালের চিন্তা একসময় বড় রকমের প্রভাব ফেলেছিল। অবশ্য বাংলাভাষী মুসলমানের ওপর তেমন বেশি নয়। আজ বাংলাদেশে ইসলামী মূল্যবোধ খুব বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। ব্যবহৃত হচ্ছে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছাড়াই। ইকবাল যেভাবে ইসলামের ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা আমাদের ইসলাম সম্পর্কে ভাবতে যথেষ্ট সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে আরব বিশ্বে ঘটতে দেখা যাচ্ছে বিশেষ জাগরণ। এই যে জাগরণ, এর মূলে কাজ করছে পাশ্চাত্যের প্রভাব। আরব বিশ্বে মানুষ চাচ্ছে ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মুক্তভাবে মতপ্রকাশের অধিকার। আমাদের দেশে অনেকে ভাবছেন, এই জাগরণ হতে যাচ্ছে ইসলামের পরিপন্থী। কিন্তু তা ভাববার কারণ নেই। এর আছে একটি আদর্শিক দিক, যদিও সেই আদর্শের উদ্ভব হতে পেরেছে প্রধানত পশ্চিম ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ইকবাল ইসলাম এবং ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের মধ্যে কোনো সংঘর্ষের কথা ভাবতে পারেননি। বলেছেন, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে সঙ্গতি রেখে ইসলামী চিন্তার পুনর্গঠন করতে। এই পুনর্গঠনের সমস্যা এখন আবার নতুন করে ভাববার বিষয় হয়ে উঠেছে। আর ইকবাল হয়ে উঠেছেন যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক। ইকবাল চেয়েছিলেন মুসলিম সমাজকে ইসলামের একটি সজীব ব্যাখ্যা দিয়ে সক্রিয় করে তুলতে। তিনি বলেছেন, যেহেতু কুরআন শরিফে বলা হয়েছে মানুষ মর্ত্যরে খলিফা; তাই তার অধিকার আছে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের।
অদৃষ্টবাদ ও মানুষের কর্মের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক ইসলামে অনেক প্রাচীন। ইসলামে একপর্যায়ে ‘কাদরি’ ও ‘জাবরি’ বলে দু’টি মতবাদিক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছিল। কাদরিরা মনে করতেন, সব কিছুই যদি আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী হয়, তাহলে মানুষকে তার কার্যকলাপের জন্য দায়ী করা যায় না। নৈতিকতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায় অবান্তর। মানুষ নৈতিক জীব। নিজের কার্যকলাপের ওপর তার ‘কাদর’ বা শক্তি আছে। এই কাদরের ওপর বিশ্বাসী বলেই উদ্ভব হয় কাদরি শব্দটি। পক্ষান্তরে অদৃষ্টবাদ বা তকদিরের সমর্থকরা অভিহিত হন জাবরি নামে। জাবরি বলতে বোঝায় বাধ্যবাধকতা। জাবরিরা মনে করতেন, মানুষের কোনো স্বাধীন ইচ্ছা নেই। মন ও কর্মের স্বাধীনতা নেই। মানুষ সম্পূর্ণ অসহায়।
বিজ্ঞান কার্যকারণ সূত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বিজ্ঞান মনে করে, পূর্বাবস্থা পরবর্তী অবস্থার কারক। জড় বিজ্ঞানে স্বাধীন ইচ্ছার কোনো স্থান নেই। জড়বিজ্ঞান জাবরি দর্শনের অনুকূল। ইকবালের চিন্তা ছিল কাদরিদের কাছাকাছি। তিনি মনে করতেন, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, কিন্তু তার কর্মকে নয়। তাকে বিচার করতে হবে তার আপন বৈশিষ্ট্য দিয়ে; জড় জগতের নিয়ম দিয়ে নয়। ইকবালের সময় পাশ্চাত্য দর্শনে ‘প্রাণবাদ’ প্রবল হয়ে উঠেছিল। প্রাণবাদীরা ভাবতেন, মানুষকে যন্ত্র বিজ্ঞানের নিয়মে ব্যাখ্যা করা যায় না। প্রাণের ধর্ম জড়ের ধর্ম থেকে আলাদা। মানুষ কেবল প্রাণবান প্রাণী নয়, মনোবান প্রাণীও। তাকে বিচার করতে হবে প্রাণ-মনের বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই।
রাষ্ট্র হিসেবে আজকের বাংলাদেশের উদ্ভব হয়েছে সাবেক পাকিস্তান ভেঙে। পাকিস্তান আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, তারা সবাই ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। তারা পরিচিত ছিলেন ইউরোপীয় চিন্তাচেতনার সাথে। পাকিস্তান আন্দোলনে ইকবাল পালন করেছিলেন দার্শনিকের ভূমিকা। পাকিস্তান আন্দোলন কোনো ধর্মনৈতিক আন্দোলন ছিল না। এটা ছিল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন যার ভিত্তি ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদ। এ জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হতে পেরেছিল দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে, ব্রিটিশ শাসনামলে। পাকিস্তান আন্দোলনের নেতারা তাদের রাজনৈতিক আন্দোলনে কোনো ধর্মীয় যুক্তি তোলেননি। অবশ্য তারা যে ধর্মবিরোধী ছিলেন, তা নয়। তারা সবাই আস্থাবান ছিলেন, সজীব ইসলামে, যে ইসলাম পারবে সমকালীন বিশ্বের সমস্যাগুলোকে সমাধান করে চলতে ।
লেখক : বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply