ইমাম হোসাইন রা. ও কারবালা -মিয়া গোলাম পরওয়ার

ইমাম হোসাইন রা. সম্বন্ধে পয়লা কথা হলো যে, রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর দুই নাতিকে অত্যধিক ভালোবাসতেন। আপনারা জানেন যে, তাঁরা তাঁকে ঘোড়া বানিয়ে পিঠে চড়ে বসতো, তিনি তাদেরকে ঘাড়ে-গলায় চুমু দিতেন, তর্কও করেছেন দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটির মাধ্যমে। এই যে এতো ভালোবাসার সম্পর্ক। এতটাই তীব্র যে আল্লাহর রাসূল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি হাসান হোসাইনকে ভালোবাসলো, সে আমাকে ভালোবাসলো।’ আবু সাঈদ খুদরী রা. বলেছেন, “তারা হচ্ছে জান্নাতে বেহেশতি যুবকদের নেতা।”
আল্লাহর প্রিয় হাবিব মুহাম্মদ সা.-এর দৌহিত্র, আলী রা. এবং মা ফাতেমা রা.-এর আদরের পুত্রসন্তান ইমাম হোসাইন রা.। তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে রাসূল সা. যেসব ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি যেভাবে জীবন দিলেন, এর মাঝে আমাদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ রয়েছে। যদিও এর প্রকৃত ইতিহাস নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে, তবুও এ ঘটনা আমাদের জন্য শিক্ষাবহুল ও তাৎপর্যপূর্ণ।

একটি সমাজ, রাষ্ট্রের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের সা. যে দিগদর্শন, কুরআন মাজিদে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা একটি ইসলামী সমাজ এবং রাষ্ট্রের যে দর্শন উল্লেখ করেছেন, রাসূল সা. এবং খোলাফায়ে রাশেদিন খেলাফতের যে সিস্টেম চালু করে করেছেন- ইয়াজিদের শাসনক্ষমতা গ্রহণ এবং বাইয়াত নিতে বাধ্য করবার নীতির মাধ্যমে, সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রকৃত ধারণা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিকৃত চিন্তাধারার জন্ম দেয়া হচ্ছিলো। এই বিকৃত ধ্যান-ধারণা প্রতিরোধ করাটাকে ইমাম হোসাইন রা. নিজস্ব দায়িত্ব মনে করেছিলেন। কেননা আল্লাহ প্রদত্ত বিধান অনুযায়ী, জনগণের মতামতের ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্রের খিলাফত নির্বাচিত হবে।
খোলাফায়ে রাশেদিনের জীবনী পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, তাদের কেউ নিজেকে নিজে খলিফা হিসেবে ঘোষণা করে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। কখনো কেবলমাত্র একজন ব্যক্তির কথায় খলিফা মনোনীত করা হয়নি। কোনো খলিফা তার সন্তানকে পরবর্তী খলিফা নিযুক্ত করেননি। এমনকি রাসূল সা. স্বয়ং আবু বকর রা.কে খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করে যাননি। একটি পরামর্শ সভা হলো, শূরা গঠন করা হলো এবং তারা আবু বকর রা.কে খলিফা হিসেবে নির্বাচিত করেন।

এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য নবীজি সা.-এর দাফন পর্যন্ত বিলম্বিত করা হয়। অর্থাৎ নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে অথবা স্বীয় বংশের কাউকে খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করার কোনো বিধান ইসলামী ইতিহাস সমর্থন করে না। এটা রাসূল সা.-এর আদর্শের অনুসৃত পথ নয়। ইমাম হোসাইন রা. বুঝতে পেরেছিলেন যে, ইয়াজিদ যেভাবে নিজেকে খলিফা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলো তা কোনোভাবেই রাসূল সা.-এর দেখানো পন্থা নয় ।
রাষ্ট্র এবং সমাজ গঠনে ইসলামের যে কর্মপন্থা, সেই মূল চিন্তা থেকে বিকৃত পন্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে, যদি তার প্রতিরোধ না করা হয়। তাই তিনি জোর তাগিদ অনুভব করেছিলেন সে, এই ব্যাপারটি স্পষ্ট না করা হলে, এই বিকৃত পন্থা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে ইসলামী খিলাফতের নিয়ম হিসেবে। কেননা এটি যদি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় ইমাম হোসাইন রা. জীবিত থাকাকালীন এবং তিনি এর প্রতিবাদস্বরূপ কিছু না করেন, তাহলে পরবর্তীতে যুগ যুগ ধরে গোটা উম্মাহ এ ভুল মেসেজ পেয়ে যাবে যে, ইমাম হোসাইন বেঁচে থাকতেই তো এটি এস্ট্যাবলিশ হয়ে গিয়েছিলো, ফলে হয়তো এটি জায়েজ।

মুলুকিয়াত বা রাজতন্ত্র যে গ্রহণযোগ্য নয়, রাজার ছেলে রাজা হবে, পরামর্শ ছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমতায় বসিয়ে দেয়া হবে (যাকে ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচারী বলে), অত্যাচারী শাসকের ক্ষমতায় যাবার এই প্রক্রিয়া রুদ্ধ করাকে নিজের দায়িত্ব মনে করে ইমাম হোসাইন রা. জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রওনা হয়েছিলেন।
আমি অবাক হই! অনেক স্কলাররা বলে থাকেন, তিনি মদিনা থেকে গভীর রাত্রে কাউকে কিছু না বলে পালিয়ে চলে গিয়েছিলেন! কিন্তু এটি বিন্দুমাত্রও সত্য নয়। অনেক আলোচনার পর তিনি মদিনায় থেকে বাইয়াত নিতে চাননি, পরবর্তীতে মক্কায় উমরাহ করেন এবং তারপর তিনি কুফার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন।
প্রথম শিক্ষা হচ্ছে, তিনি নিজে নেতা হওয়ার জন্য এই শাহাদাতের মুখোমুখি হননি। তিনি ইসলামী সমাজ সভ্যতা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাসূল সা.-এর অনুসৃত পন্থাকে বিকৃত হতে দিতে চাননি। ইতিহাসের কাছে যেন তিনি দায়ী না হয়ে যান সেই দায় থেকে মুক্ত হওয়ার জন্যই তিনি নিজে অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করে শক্ত হয়ে দাঁড়াবার জন্যই রওনা হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় শিক্ষা হচ্ছে যে, তিনি যখন গেলেন পথিমধ্যে তাঁকে আটকে দেওয়া হলো। ইমাম হোসাইন রা. ক্ষমতার জন্য কুফায় রওনা হয়েছেন মর্মে ইয়াজিদ খবর পেল এবং আব্দুল্লাহ বিন যিয়াদকে পাঠালো, তাঁর কাছে বলা হলো একদিন সময় দেয়া হলো আপনি বাইয়াত গ্রহণ করবেন; না মৃত্যুর জন্য ফায়সালা গ্রহণ করবেন। তিনি তাঁর পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে বসেছিলেন। তাঁর পরিবারকে কিছু মেসেজ দিলেন।
এটা বলতে গেলে আমাদের শহীদ নেতৃবৃন্দের কথা মনে আসে। যারা আমাদের নেতৃবৃন্দ শহীদ হয়েছেন তারা ফাঁসির রাতে পরিবারের সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করে যেসব কথা বলে গেছেন একদম চেতনার সঙ্গে যেন একই মিল। তার স্ত্রী পরিবার-পরিজনকে হযরত ইমাম হোসাইন রা. বলেছেন যে আমার প্রতি মেসেজ এসেছে, তোমাদের সকলের মতামত কী? ওই ছোট্ট শিশু, মহিলা সকলে মিলে কেউ দ্বিমত করেননি, সবাই হযরত ইমাম হোসাইন রা.-এর সেই কনসেপশনকে মেনে নিয়ে বলেছেন। আমরা রাসূল সা.-এর আদর্শের বাইরে কোনো কিছু মেনে নিতে পারি না। আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত আছি। খালিদ, নিজামী ভাইয়ের ছেলে; তার পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এসে লেখার মাধ্যমে যে বর্ণনাটি প্রকাশ করেছেন সেটি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি ডাক্তার হিসেবে অনেক বড় মানুষের মৃত্যুর সময় কাছে থেকেছি। কাছে থেকেও মৃত্যুর দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়েছে। মৃত্যুর মুহূর্তে এসে কত অস্থির হয়ে যায়, বাঁচার জন্য কত আকুতি মিনতি করে, বাঁচার চেষ্টা আমি আমার পিতার মধ্যে কখনো দেখি নাই। আমার পিতা ফাঁসির মঞ্চে যাবেন তাঁর চেহারার মধ্যে এই ধরনের কোনো আলামত লক্ষ করি নাই। প্রশান্ত হৃদয়ে তিনি আমাদেরকে বলতে বলছেন যে ‘কোন লেবাস পরে আমি ফাঁসির মঞ্চে যাব। লুঙ্গি পরা থাকবে না পায়জামা পরা থাকবে। জানাজায় কে যাবে? তোমার মা যেন না যায়। আমার কবর কোথায় হবে?’
মনে হচ্ছে বিষয়টা ব্যাপার না; একটি নরমাল জিনিস। নরমাল জীবনে যেমন মানুষ সাধারণত কনভারসেশন করে সেভাবেই যেন তিনি কনভারসেশন করছেন। মুজাহিদ ভাই কথা বলেছেন তাঁর পরিবারের সাথে, কামরুজ্জামান ভাই বলেছেন। আমাদের নেতৃবৃন্দ এভাবে কথা বলেছেন তাদের পরিবারের সঙ্গে, বিদায়ী সাক্ষাৎকারে।
ফাঁসির মঞ্চে মানুষকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু আমাদের শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা ভাই ছুটছেন ফাঁসির মঞ্চের দিকে। কারারক্ষীরা বলছেন যে, তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কথা ফাঁসির মঞ্চে। কিন্তু আবদুল কাদের মোল্লা ভাই ছুটছেন সবার আগে, কারারক্ষীরা তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছিল না। যেন আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করার তর সইছে না।
ইমাম হোসাইন রা. এবং তার গোটা পরিবার ঐকমত্য হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন যে, আমরা ইসলামের মৌলিক নীতিমালা থেকে বিচ্যুত হতে পারি না। উম্মত চিরজীবনের জন্য বিভ্রান্ত হবে। তাই আমরা মাথা নত করব না। হয় আমাদের কথা মানতে হবে না হয় আমরা শাহাদতের ফয়সালা করলাম। আলহামদুলিল্লাহ। এটি হচ্ছে দ্বিতীয় মেসেজ। ইসলামের মৌলিক নীতিমালা একটি আদর্শিক বিষয় সেটা রক্ষা করা জীবনের চেয়েও বেশি মূল্যবান; ইমাম হোসাইন রা. কারবালার প্রান্তরে জীবন দিয়ে সেটি প্রমাণ করে গেছেন।

আমরাও ফ্যাসিবাদী শাসকের অধীনে আজ অত্যাচারিত মজলুম, জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে যারা ক্ষমতায় আসে তারাও তো সেই ইয়াজিদের আদর্শের অনুসারী। যারা জনগণের কথার তোয়াক্কা না করে ভোটাধিকারের তোয়াক্কা না করে আমার ছেলের উপরেই খেলাফত হবে। এটার নামই হচ্ছে কিন্তু মুলুকিয়াত; ফ্যাসিবাদ; জবরদস্তি করে ক্ষমতায় যাওয়া।
রাসূল সা. ইমাম হাসান-হোসাইন রা.কে ভালোবেসেছেন, তাঁদেরকে জান্নাতি বলেছেন। আবু সাঈদ খুদরী রা. রাসূলের বর্ণনা থেকে রেওয়ায়েত করেছেন, সাইয়্যিদুস শাবাব ইয়া আহলিল জান্নাহ। জান্নাতে যুবকদের সর্দার হবেন। ফলে আল্লাহর নবীর এই সাহাবি ও দৌহিত্র যে জান্নাতি তা নিয়ে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই। ফলে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন সেটি অবশ্যই সঠিক।
যেটা মানুষের মধ্যে ধারণা বা আজকে আমাদের মধ্যে যে ধারণা একটা সেক্যুলার ধারণা, নামাজ রোজা হজ জাকাত করো, সদকা, ফিতরা দাও, ব্যক্তিগত জীবনে ধর্ম পালন করো- এটা ইসলাম। কিন্তু হযরত ইমাম হোসাইন সেটাও রক্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে ওটা ইসলাম নয়। তাহলে আল্লাহর নবীর এই প্রিয় সাহাবী দৌহিত্র মদিনায় পৌঁছে তসবিহ তাহলিল করে আদর্শ এবং উন্নত মানের জীবন যাপন করতে পারতেন, দুনিয়ার এত আরামের জায়গা ছেড়ে দিয়ে তিনি কেন শাহাদাতের পথ বেছে নিলেন। তিনি বুঝিয়ে দিলেন এটিই শুধু ইসলাম নয়, রাষ্ট্রে আল্লাহর দ্বীন কায়েম করতে হবে। রাষ্ট্রের মাঝে কুরআনের বিধান খেলাফতে রাশেদার বিধান এবং খেলাফতের সর্বোচ্চ অর্জনকে তুলে ধরে জাতির নিরাপত্তা এবং মুক্তির জন্য আদর্শ সমাজ গড়তে হবে এটাও ইসলাম, এটাই হচ্ছে আসল ইসলাম।
যে ব্যাপারে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আকিমুদ্দিন ওয়ালা তাফাররাকু “দ্বীন কায়েম করো এবং তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”

দ্বীন কায়েমের যে ফরজিয়াত, ইকামতে দ্বীন এর যে গুরুত্ব তা ইমাম হোসাইন রা. উপলব্ধি করেছিলেন বলেই তিনি কিন্তু এই পথকে বেছে নিয়েছিলেন। ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপালন যদি ইসলাম হতো তাহলে ইমাম হোসাইন রা. এই ঝুঁকি নিতে যেতেন না। উনার কথা না হয় বাদই দিলাম। আল্লাহর প্রিয় নবীই তো এ পথে যেতে না। এবং মসজিদে হারামে আল্লাহর জিকির আজকার তাহাজ্জুদে রত থাকলে কেউ বাধা দিতো না। কাফেররা তো বলেই ছিলো যে তোমরা এসব করো। রাষ্ট্রপরিচালনার ক্ষেত্রে তুমি এসো না। কিন্তু তাতো রাসূল সা.-এর আদর্শের সঙ্গে কন্ট্রাডিকশন করেছিল।
এটার মাঝে তৃতীয় শিক্ষা আছে যে, যারা মুসলিম সমাজের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেন রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই আশুরা আমাদেরকে এই শিক্ষা দিচ্ছে- কারবালার মর্মান্তিক ইতিহাস আমাদের এই শিক্ষা দিচ্ছে যে ব্যক্তিগত জীবনে ধর্মপালনই ইসলাম নয়। ইসলাম হচ্ছে পরিপূর্ণ এবং ভারসাম্যপূর্ণ একটি জীবনব্যবস্থা।
আল কুরআনে বলেছেন, আকমালতু লাকুম দিনুকুম এটা একটা পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা। ‘নেজামে মোকাম্মেলে হায়াত’। এটা পরিপূর্ণ সমাজ রাষ্ট্র অর্থনীতি-ব্যবসা, বিচার, শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক ব্যবস্থা সব বিষয়ে জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে। সকল বিষয়ে হচ্ছে পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা করে আল্লাহ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন।
ব্যক্তিগত জীবনে ইসলাম পালন করেই যদি মনে করেন যে জান্নাতে চলে যাবেন এর থেকে বড় বিভ্রান্ত আর কিছু হতে পারে না। এটি ভাবারও কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ তায়ালা তো কুরআনে বলেছেন, “তোমরা কি আমার কিতাবের কিছু অংশ পড়বে আর কিছু অংশ ছেড়ে দিবে। তোমরা কি কিছু অংশকে অস্বীকার করবে।” (সূরা বাকারা : ৮৫)

পক্ষান্তরে কুরআনকে না মানারই নামান্তর ঘরের মধ্যে ইসলাম থাকবে আর রাষ্ট্রব্যবস্থায় শয়তান দুষ্কৃতি বাতিল শক্তি আধিপত্য করবে, রব বানিয়ে আমরা আনুগত্য করব। ইমাম হোসাইন রা.-এর শাহাদাত আমাদের কী শিক্ষা দিচ্ছে। তিনি এটা মোটেও বরদাস্ত করেননি, তা তার জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন। ইসলাম ব্যক্তিগত পর্যায়ে রেখে দিতে হবে এটা ইসলাম নয় ইসলাম সমাজজীবন এবং ব্যক্তিজীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্যই এসেছে। “লি ওয়া যাহরাহু আলাদ্দীনি কুল্লিহি” এই কথার মানে কী? আর যত দ্বীন, আর যত মতবাদ, আর যত আইডোলজি আছে তার উপরই এই দ্বীনকে প্রচার করো, জাহির করো। ইমাম সেটা প্রচার করার জন্যই জীবন দিয়েছিলেন। সেটাই হচ্ছে শাহাদাতের তামান্না। এটার সবথেকে বড় শিক্ষা যে জীবনের মায়া তিনি করেননি। বেঁচে থাকলে এই দুনিয়ার লোভ-লালসা মায়া-মমতা স্ত্রী সন্তান পিতা-মাতা ভাই বোন নিয়ে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যের জীবন কার না ভালো লাগে। কিন্তু সবকিছু তাঁর কাছে তুচ্ছ হয়ে গিয়েছিল। ইসলামী আন্দোলন জামায়াতে ইসলামী এবং ইসলামী ছাত্রশিবির আমাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করে শাহাদাতের তামান্না এবং তা থেকে শিক্ষা পাই রাসূল সা.-এর নাতি ইমাম হোসাইন রা. কারবালার ময়দানে রক্ত দিয়ে শাহাদতের যে আকাক্সক্ষা উম্মতের জন্য হাদিয়া করে গেছেন আমরা তাঁরই সার্থক উত্তরসূরি।

আমরা যে জমিনে জন্মগ্রহণ করেছি, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বাংলাদেশে আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রব্যবস্থায় ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবেই ইনশাআল্লাহ। ফ্যাসিবাদী অত্যাচারী শাসক, রাষ্ট্রক্ষমতা, পুলিশ, রাজনীতি, মিডিয়া প্রশাসনকে ব্যবহার করে মুসলমানদের এই চিন্তা-চেতনা এবং ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বাধা দেয়। কিন্তু আমাদের জয় হবেই। তাদের শাস্তি দুনিয়াতেও হবে আখেরাতেও হবে।
ইয়াজিদ নাম কেউ রাখে না, মীরজাফর নামও কেউ রাখে না, শাস্তি দুনিয়াতে হয়ে গেছে। যে গালে; যে ঠোঁটে; যে গলায় আল্লাহর প্রিয় নবী চুমু খেয়েছেন, ইবন যিয়াদ সেই মস্তিষ্ক খণ্ডিত করে ইয়াযিদের সামনে রাখলো আর লাঠি দিয়ে সেই খণ্ডিত মস্তিষ্কে আঘাত করে যে নিষ্ঠুরতার ইতিহাস তৈরি করা হয়েছে। আমি মনে করি যারা আল্লাহর দ্বীনের পথে কাজ করা মানুষদেরকে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যা করে, শহীদ করে, হাত খণ্ড করে দ্বীন কায়েমের পথে বাধাগ্রস্ত করতে চাচ্ছে, তাদের এই অত্যাচারের হাত বন্ধ না করলে করুণ পরিণতি অপেক্ষা করছে।

ফলে আমরা মনে করি আমাদের এই স্বপ্ন, আমাদের এই মিশন, আমাদের কাফেলা, আমাদের এই অভিযাত্রা কেউ রুখতে পারবে না। এটা একটা অপ্রতিরোধ্য কাফেলা। আমাদের এই চেতনাকে কখনো রুখে দেয়া সম্ভব নয়। আমাদের এই চেতনায় মৃত্যুর কোনো ভয় নাই। কারণ যারা পূর্বসূরি আমাদের, তারা মৃত্যুকে ভয় পাননি। তাদের উত্তরসূরি হিসেবে আমরা কখনো মৃত্যুকে ভয় পাবো না। তারা আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছেন আমরাও আমাদের আদর্শের জন্য জীবন দেবো। এই আশুরার শিক্ষা, মহররমের শিক্ষার অর্থই হলো অত্যাচারী ফ্যাসিবাদী জালিমের সামনে মাথা নত না করা এবং খেলাফতে রাশেদার জন্য যে শাসন তার ভিত্তিতে সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জীবন দেয়া, ইসলামকে ব্যক্তিগত জীবনে চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থায় সেক্যুলার বা অন্য কোনো ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে ডেমোক্র্যাসি সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদীর দিকে ঝুঁকে যাবে তারাও যে তাদের উত্তরসূরি এটাও মহররমের একটি শিক্ষা।

আমাদের কাফেলা শাহাদাতের সিঁড়ি বেয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে আলহামদুলিল্লাহ। আমাদেরকে রক্ত আরো দিতে হবে। আল্লামা ইকবাল তো এটাই বলেছেন,“ইসলাম জিন্দা হোতা হে হার কারবালা কি বাদ” ‘প্রতিটি কারবালার পরেই ইসলাম আবার জিন্দা হয়।’
আমরা সেই কারণের জন্যই কারবালার হোসাইন হতে রাজি আছি। রক্তাক্ত একটি জমিনের মধ্য দিয়ে যদি ইসলাম জিন্দা হয় তাহলে আমরা সেই রক্ত দিতে রাজি আছি। আমরা সেই দিনের জন্য প্রস্তুত আছি। ইনশাআল্লাহ আমাদের কাফেলার এই অন্ধকার দূরীভূত হবে। আমাদের সফলতা এবং সম্ভাবনার সেই সকাল আমাদের সামনে আবার উদিত হবে। কারবালার এই শিক্ষা থেকে আমাদের সুসংগঠিত হয়ে আদর্শের সংগ্রামের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। বাতিলের সাথে আপস করা কখনো কারবালার শিক্ষা নয়। আদর্শের জন্য মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমার জীবনকে তুচ্ছ মনে করে ঈমানকে বড় মনে করা- এটাই আমাদের শিক্ষা। আমাদের কদম যেন দুর্বল না হয়ে যায়। আমরা যেন বিচলিত না হই। আমাদের ঈমান, সবর এবং তাওয়াক্কুলের উপর থেকে, আল্লাহ তায়ালার দ্বীনের উপর থেকে আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার তাওফিক এবং নসিব যেনো দান করেন। আমিন।

(প্রবন্ধটি সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ারের
একটি আলোচনা থেকে নেয়া)

শ্রুতিলিখন : সাইফুল্লাহ মুহাম্মাদ তোফায়েল

SHARE

Leave a Reply