ইরানের মেডিক্যাল সাইন্স বিপ্লবের আগে ও পরে -কামরুজ্জামান নাবিল

কয়েক দশক আগেও মেডিক্যাল সায়েন্সে যে ইরান বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থানে ছিল সেই ইরান আজ মেডিক্যাল সায়েন্সে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধন করেছে। বলা বাহুল্য যে, মেডিক্যাল সায়েন্সে ইরানের সাফল্য ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকেই ধাপে ধাপে এগিয়ে চলেছে।
যে ইরানে বিপ্লবের আগে অনেক শহরে ইরানি ডাক্তার খুঁজে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার ছিল সে ইরানেই এখন শুধু বড় শহরে নয়, একটি ছোট শহরেও ইরানি ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞের অভাব হয় না।
১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর সেই বিপ্লবের নেতৃত্বদানকারী ইমাম খোমেনি রহ: ইরানকে নতুন করে গড়তে এবং মেডিক্যাল সায়েন্সকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে সেই সময় বাংলাদেশের মতো দেশ থেকেও অনেক ডাক্তারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। যে ক্ষেত্রে তিনি অনেকখানিই সফল হয়েছিলেন। যার সত্যতাও ইরানের বর্তমান মেডিক্যাল সায়েন্সের সাফল্যই জানান দেয়।
ইরানে বর্তমানে প্রায় প্রত্যেকটি বড় শহরেই একটি করে মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। যার মোট সংখ্যা প্রায় ৪৭টি হবে। এ ছাড়াও কয়েকটি বেসরকারি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ও রয়েছে।
১৯৭৯ সালের এক সমীক্ষা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, সেই সময় সর্বমোট ডাক্তারের সংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ৭০০ জন, যার মাঝে ৯ হাজার ৪৪১ জন সাধারণ ডাক্তার এবং ৫ হাজার ২৫৯ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ছিলেন। ২০১২ সালের সমীক্ষায়, এই সংখ্যা দাঁড়ায় ২৭ হাজার ১২২ জনে, যার মধ্যে সাধারণ ডাক্তার ১৪ হাজার ৯০১ জন এবং বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ১২ হাজার ২২১ জন।
১৯৭৯ সালে বিভিন্ন মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৬০ হাজার জন, যা ২০১২ সালে দাঁড়ায় ২ লাখে। ১৯৭৯ সালে ইরানে হাসপাতালের সংখ্যা ছিল ৫৪৭টি যা ২০১২ সালে ৮০৫টিতে পৌঁছায়।
ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেয়া তথ্য মতে, ২০১৩-১৪ সালেই ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব মেডিসিন শেষ করেছেন ৪৪ হাজার ৮১৬ জন। যার মাঝে ৩০৯ জন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন ৫৩০০ জন, এমপিএইচ ১৮০১ জন এবং এমবিএ ৩০ জন।
বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ইরানের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থানের দিকে তাকালে দেখা যাবে, বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে ৩৬৪ নম্বরে রয়েছে ১৯৩৪ সালে স্থাপিত তেহরান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। তারপরই রয়েছে তেহরানে অবস্থিত শহীদ বেহেশতি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। যার অবস্থান ৯২২ নম্বরে। শিরাজ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৯২৮ নম্বরে। ১১৮২ এবং ১২০১ এ রয়েছে যথাক্রমে, ইস্ফাহান এবং মাশহাদ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়।
অতীতে ইরানিদের বিভিন্ন চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে হতো কিন্তু মেডিক্যাল সায়েন্সে ইরানের ধারাবাহিক সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকায় বর্তমানে দেশেই বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে।
ইরানের মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাফল্যের জন্য যে মানুষগুলোর অবদান সবচেয়ে বেশি তারা হচ্ছেন মানুষ গড়ার কারিগর সেই সকল শিক্ষকগণ।
ইরানের প্রায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ সাপ্তাহিক ছুটি বাদে অন্যান্য সরকারি ছুটির কারণে যেসব ক্লাস নেয়া সম্ভব হয় না তা অন্য কোন দিনে অতিরিক্ত ক্লাস নিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে দেন, যা শিক্ষার্থীদের পড়াশুনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বললে ভুল হবে না।
ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীতে অসংখ্য বিদেশী শিক্ষক নিয়োজিত ছিলেন কিন্তু বর্তমানে সম্ভবত হাতেগোনা কিছু বিদেশী শিক্ষক ছাড়া মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ শিক্ষকই সেই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে সেখানেই চাকরিতে নিয়োজিত রয়েছেন, যার মাঝে অনেক শিক্ষকই বাইরের বিভিন্ন দেশ থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে ইরানের মেডিক্যাল সায়েন্সকে এগিয়ে নিয়ে যেতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছেন।
আরেকটা বিষয় হলো, ইরানের সকল বিশ্ববিদ্যালয় রাজনীতি থেকে মুক্ত। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই বাংলাদেশের মতো মিছিল, মিটিং, হরতাল, মারামারি, গোলযোগ ইত্যাদি।
মেডিসিন শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে দুটো টার্ম হয়ে থাকে। টার্মের ক্রেডিট নির্বাচন করার সাথে সাথে পুরো সেই বছরের ক্লাস ও পরীক্ষার সময়সূচির বড় একটা রুটিন সকল শিক্ষার্থীর হাতে দেয়া হয়। যেহেতু রাজনৈতিক কোন সমস্যা নেই, তাই সেই রুটিন মাফিকই টার্মের সমাপ্তি ঘটে থাকে।
ইরানের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ১০০০ জন বিদেশী শিক্ষার্থী ইরান সরকারের স্কলারশিপে অধ্যয়নরত আছেন। এ ছাড়াও কয়েক হাজারের মতো শিক্ষার্থী টিউশন ফি দিয়ে ইরানে মেডিক্যালে অধ্যয়নরত আছেন। সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, তুরস্ক, ফিলিস্তিন, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, বাহরাইন, তাজিকিস্তান, মিসর, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ভারত প্রভৃতি দেশের শিক্ষার্থীরা আছেন। সাথে বাংলাদেশী কয়েকজন শিক্ষার্থীও আছেন।
মেডিক্যাল সায়েন্সে ইরানের ধারাবাহিক সাফল্যের কিছু উদাহরণ।
১.    প্লাস্টিক সার্জারির ক্ষেত্রে অন্যতম গবেষক ইরানের।
২.    তেহরানের শহীদ বেহেশতি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় প্লাস্টিক সার্জারির ক্ষেত্রে শক্তিশালী আঠালো টিস্যু তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
৩.    আগুনে পুড়ে যাওয়া শরীরের ক্ষতস্থান লেজারের মাধ্যমে কৃত্রিম চামড়া উৎপাদনের মাধ্যমে তা পূর্ণ হয়ে যাওয়ার মতো পদ্ধতির আবিষ্কারকও ইরানের ডাক্তারগণ।
৪.    প্রায় ১১০ বছর গবেষণা চালিয়ে কৃত্রিম শ্বাসনালী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন ইরানের মেডিক্যাল সায়েন্সের গবেষকগণ।
৫.    Three-Dimensional Medical Images নামক নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন ইরানি চিকিৎসকগণ।

কৃতজ্ঞতা : সিনা আব্বাসপুর এর প্রতি
তথ্যসূত্র : 1.www.daqianus.com
2. www.tebyan.net
3. http://behdasht.gov.ir/
3. www.salamatnews.com
4. Wikipedia

লেখক : ছাত্র (ডক্টর অব মেডিসিন, দ্বিতীয় বর্ষ) ইস্ফাহান মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ইরান

SHARE

Leave a Reply