ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা -মুহসিনা সুলতানা নিশাত

মহান আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামিনের একমাত্র মনোনীত দ্বীন ইসলাম। সমগ্র মানবজাতির জন্য ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা এবং সঠিক পথনির্দেশক। একমাত্র আল্লাহ পাকের নিকট আত্মসমর্পণের মাধ্যমেই মানুষ তার দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনকে সার্থক ও সুন্দর করে তুলতে পারে। মহান আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে তাঁর খলিফা হিসেবে এ পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন নর ও নারী, একে অপরের পরিপূরক হিসেবে। তিনি একদিকে যেমন সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন, তেমনি অপরদিকে তাঁর খলিফাদের মাঝেও বিভিন্ন দায়িত্ব সুষমভাবে বণ্টন করে দিয়েছেন। ইসলামী আইন নর ও নারীদের মধ্যে শুধু সমতা বিধানই নয়, দিয়েছে সাম্যতার বিধান। বরং অনেক ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাই নারীদেরকে ইসলাম পুরুষদের চেয়ে অগ্রাধিকার প্রদান করেছে। আল্লাহপাক নর ও নারীকে বৈচিত্র্যপূর্ণ করে সৃষ্টি করেছেন। তবে তা বৈষম্য করার জন্য নয়। এ বিচিত্রতা তাঁর সৃষ্টির এক অন্যতম নান্দনিকতা, যা এই সৃষ্টিজগৎকে করেছে আরও সুন্দর। ইসলাম নারীকে দিয়েছে আজীবনব্যাপী সার্বিক নিরাপত্তার সুযোগ। জন্ম থেকেই একজন কন্যাসন্তানকে কিভাবে লালনপালন করতে হবে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) তাঁর কন্যা ফাতেমা (রা)কে প্রতিপালনের মাধ্যমে দেখিয়ে গিয়েছেন। রাসূল (সা) বলেছেন, ‘তোমরা যখন কোনো উপহার, খাদ্য বা খেলনা নিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করবে, তা প্রদান শুরু করবে কন্যা থেকে।’ রাসূল (সা) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কন্যাদের প্রতিপালন করবে, তাদের ওপর পুত্রকে অগ্রাধিকার দেবে না, সেই ব্যক্তির জন্য রয়েছে অশেষ পুরস্কার।’ (আবু দাউদ) কন্যাসন্তান প্রতিপালনের মাধ্যমে বেহেশত লাভ করা যায়। অন্য একটি হাদিসে আছে, যে ব্যক্তি তিনজন মেয়ে অথবা তিনজন বোনের লালনপালন ও অভিভাবকত্ব করবে, যাতে তারা অন্যের মুখাপেক্ষী না থাকে, তার জন্য আল্লাহ বেহেশত অবধারিত করবেন। কন্যাসন্তানের সাথে সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাদিসে বর্ণিত আছে, হযরত আয়েশা (রা) বলেন, আমার কাছে দুটো মেয়েসহ এক মহিলা সাহায্য চাইতে এলো। আমার কাছে তখন একটা খেজুর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। আমি সেটাই তাকে দিলাম। মহিলা সেই খেজুরটি তার দুই মেয়েকে ভাগ করে দিলো। নিজে কিছুই খেল না। এ ঘটনা তিনি রাসূল (সা)কে জানালেন। রাসূল (সা) বললেন, কন্যাসন্তান দ্বারা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েও যে ব্যক্তি তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করবে, সেই কন্যারা তাকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে।
নারী-পুরুষের সৃষ্টিগত বিচিত্রতা প্রত্যেক নর-নারীকে ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা প্রদান করেছে, যাতে করে জীবনের প্রতিটি দিক সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হতে পারে। পরিবারের সার্বিক ভরণপোষণের গুরুভার পুরুষের ওপর ন্যস্ত করা হলেও নারীরা এ ক্ষেত্রে স্বাধীন। তারা তাদের সম্পূর্ণ সময় নিজ পরিবারের দেখাশুনা, সন্তানপালন, স্বামীর খেদমত ও ইবাদত-বন্দেগিতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন। আবার পর্দা রক্ষা করে শরিয়ত মেনে যেকোনো কর্মে নিয়োজিত হয়ে পরিবারে আর্থিক সহযোগিতাও করতে পারেন। তবে নারীদের জন্য উপার্জন ও সংসারের ব্যয় নির্বাহ বাধ্যতামূলক করা হয়নি। এমনকি নিজস্ব ব্যয় নির্বাহকেও নারীর জন্য অত্যাবশ্যক করা হয়নি। তার ভরণপোষণের সার্বিক ব্যয়ভারের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুরুষদের ওপর। এ ছাড়া নারীরা তাদের উপার্জিত অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রেও স্বাধীন। যেখানে একজন পুরুষ আইনগতভাবেই সংসারের ব্যয় নির্বাহে বাধ্য। ইসলাম একমাত্র ধর্ম যেখানে নারীকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্য সম্পত্তির অধিকার দেয়া হয়েছে। ইসলাম পিতার সম্পত্তির দুই ভাগ পুত্রকে আর এক ভাগ কন্যাকে দানের বিধান দিয়েছে। কিন্তু এটি কোনোমতেই বৈষম্য নয়। স্বাভাবিকভাবেই পুরুষদের ওপর আর্থিক দায়িত্ব থাকায় এবং নারীরা তাদের তত্ত্বাবধানে থাকার কারণেই এ ধরনের বণ্টনবিধান করা হয়েছে। তা ছাড়া স্ত্রী, স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারিত্ব লাভ করে থাকে। বিয়ের পরবর্তী জীবনের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য দেয়া হয়েছে মোহরানার বিধান যা বিবাহের সময় স্ত্রীর জন্য স্বামীর ওপর নির্ধারিত হয়ে থাকে। আল্লাহপাক এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলেছেন, ‘তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে স্ত্রীগণকে তাদের প্রাপ্য মোহর দিয়ে দাও।’ (সূরা আন্ নিসা ৭) মোহরানা প্রদান ও বিবাহের সার্বিক ব্যয়ভার বহনের সক্ষমতা অর্জন করলেই কেবল একজন পুরুষ বিবাহযোগ্য হতে পারে। স্ত্রীর মোহরানা প্রদান করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূল (সা) বলেছেন, ‘সেই শর্তটি পূরণ করা সর্বাধিক অগ্রগণ্য যার বলে তোমরা নারীর সতীত্বের মালিক হয়েছ। (অর্থাৎ মোহরানা) (বোখারি ও মুসলিম)
নারীদের সবচেয়ে বড় অধিকার হলো তাদের নিরাপত্তার অধিকার, যার নিশ্চয়তা একমাত্র ইসলামই নারীকে পরিপূর্ণরূপে দিতে পেরেছে। মহান আল্লাহ তায়ালা নারীদের জন্য দিয়েছেন বিশেষ পর্দার বিধান। যার সঠিক অনুসরণের মাধ্যমে তারা নিজেরাই নিজেদের সর্বাত্মক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। কোন নারী যখন খালেস নিয়তে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে শরিয়ত অনুযায়ী নিজের সৌন্দর্য আবৃত রেখে চলবে, মহান আল্লাহপাকের দেওয়া আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করে নিজেদের হেফাজতে রাখবে, তাদের মর্যাদা কোনো অংশেই কমবে না, বরং বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। পরিবার ও সমাজে যেমন তারা নিরাপদে থাকবে, তেমনি চারিত্রিক ও নৈতিক আত্মশুদ্ধি লাভ করতে পারবে। নারীদের পরিপূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পুরুষদের সহযোগিতাও অপরিহার্য। কেননা পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক বলেছেন, ‘নারীরা (যেমনি) তোমাদের জন্য পোশাক (স্বরূপ, ঠিক তেমনি) তোমরাও তাদের জন্য পোশাক (স্বরূপ)। (সূরা আল্ বাকারা : ১৮৭) ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী বিবাহের মাধ্যমেই কেবল নারী ও পুরুষ পরস্পরের আবরণে আবৃত হতে পারে। বিবাহ ব্যতিরেকে কোনোভাবেই তারা জাহেলিয়াতের অনাচার হতে রক্ষা পাবে না। ইসলাম স্ত্রীদেরকে অধিকার আদায় ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে। সূরা আল্ বাকারায় এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘স্ত্রীদেরও তেমন অধিকার রয়েছে যেমন স্বামীদের রয়েছে তাদের ওপর এবং তা যথাযথভাবে আদায় করতে হবে।’ স্ত্রী যেমন স্বভাবেরই হোক তাদের সাথে উত্তম ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তাদের (নারীদের) সাথে সদভাবে জীবনযাপন কর। অতঃপর যদি তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে হয়তো তোমরা এমন এক জিনিসকে অপছন্দ করছো, যার মধ্যে আল্লাহ তাআলা অফুরন্ত কল্যাণ নিহিত রেখেছেন।” (সূরা আন নিসা ১৯) মহানবী (সা) নিজ স্ত্রীদের সাথে ভালো ব্যবহার ও সাম্যতা বিধান করে আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ রেখে গিয়েছেন। রাসূল (সা) বলেছেন, “সর্বোত্তম সম্পদ হলো নেককার স্ত্রী যে স্বামীকে ইসলামের পথে টিকে থাকতে সাহায্য করে।” (তিরমিজি) একজন মুমিন নারী শুধু তার পরিবারেই নয়, বরং সমগ্র ইসলাম ও গোটা সমাজেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কেননা আপাতদৃষ্টিতে পুরুষদের ওপর কর্তৃত্ব ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব থাকলেও নারীদেরকে আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে পাঠিয়েছেন। আর তা হলো মানবসম্পদ উৎপাদন ও তার রক্ষণাবেক্ষণ। একজন আদর্শ নারী একদিকে যেমন তার স্বামীকে দ্বীনের পথে চলতে সহযোগিতা করে, পরিবারের অভ্যন্তরীণ তত্ত্বাবধান করে, তেমনি অপরদিকে প্রত্যেক সন্তানকে দ্বীনি শিক্ষা দিয়ে ইসলামের ভবিষ্যৎ প্রতিনিধিদের তৈরিতে মায়েদের ভূমিকা অপরিসীম। একজন নারীর জন্য এ দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও কষ্টসাধ্য। তাই ইসলামে মায়ের মর্যাদা সবচেয়ে বেশি। এমনকি পিতা অপেক্ষাও মায়ের মর্যাদা বেশি। আর তাই মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারীদের প্রতি সদয় দৃষ্টি এখানেই শেষ নয়, সমাজের যেসব নারী অসহায়, বিধবা, তালাকপ্রাপ্তা, ইয়াতিম তাদের জন্য ইসলাম সুব্যবস্থা দিয়েছে। বিধবা নারীদের জন্য বিবাহের মাধ্যমে পুনরায় কারো তত্ত্বাবধানে থাকার সুযোগ দিয়েছে। আমাদের প্রিয় নবী (সা) স্বয়ং বিবি খাদিজা (রা)কে বিয়ে করে তার দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। রাসূল (সা) বলেছেন, ‘যারা দরিদ্র ও বিধবাদের সেবার জন্য সচেষ্ট, তারা সেই ব্যক্তির মতো, যে আল্লাহর পথে জেহাদ করে এবং সারারাত আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকে (নামাজ পড়ে), কখনো ক্লান্ত হয় না এবং সবসময় রোজা রাখে, কখনো রোজা ভাঙে না।” (বোখারি ও মুসলিম) এমন ইবাদত কারো পক্ষে সম্ভব না হলেও এর সমান নেকি অর্জন করতে পারবে যদি বিধবাদের সেবায় নিয়োজিত থাকে। তালাকপ্রাপ্তা নারীদের সম্পর্কে নবী করীম (সা) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের সর্বোত্তম সদকার কথা বলব না? তাহলো তোমার কন্যা তোমার কাছে ফিরে এসেছে, তুমি ছাড়া তাকে খাওয়ানোর মতো আর কেউ নেই”। (ইবনে মাজাহ) অর্থাৎ তালাকপ্রাপ্তা বা বিধবা কন্যার জন্য পিতা যা খরচ করবেন সবই সর্বোত্তম সদকা বলে গণ্য হবে।
ইসলাম নারীকে এত বেশি মর্যাদা ও অধিকার দিয়েছে যা বলে শেষ করা যাবে না। সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে নারীদেরকে পাঠিয়েছেন। আর সেভাবেই আল্লাহ তাআলা নারীদের বিশেষরূপে সৃষ্টি করেছেন। মানবসম্পদকে সুষ্ঠুরূপে নেক সন্তান করে গড়ে তোলাই তাদের প্রধান দায়িত্ব। কেননা এর মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলার প্রকৃত বান্দারা গড়ে উঠবে। ইসলামের চাকাকে সচল রাখতে সচেষ্ট হবে। একজন পুরুষ যখন আল্লাহর পথে জিহাদ করে, তার স্ত্রী তার স্বামীর রেখে যাওয়া আমানত, সন্তান, সম্পদ ও পরিবার রক্ষণাবেক্ষণ করেই জিহাদে শামিল হতে পারে, সমপরিমাণ নেকি অর্জন করতে পারে। কোনরকম আর্থিক ব্যয়ভার বহনকেই নারীদের জন্য বাধ্য করা হয়নি। উপরন্তু অর্থনৈতিক দায়দায়িত্ব থেকে মুক্ত থেকে বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সম্পদ প্রাপ্তিতে নারীর ব্যক্তিগতভাবে সচ্ছলতার নিরাপদ সুযোগ লাভ করে থাকে। এভাবে ইসলাম নারীকে দিয়েছে সর্বাধিক নিরাপত্তা, নারীকে সবক্ষেত্রেই দিয়েছে অগ্রাধিকার, ইসলাম নারীকে সর্বোচ্চ মর্যাদায় ভূষিত করেছে. দিয়েছে সর্বোত্তম জীবনব্যবস্থা।

SHARE

Leave a Reply