ইসলামে মানুষের মর্যাদা -মু. আতাউর রহমান সরকার

মহান রাব্বুল আলামিন একটি বড় উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। তাদের বসবাসের জন্য এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য হিসেবে তৈরি করেছেন। মানুষকে দিয়েছেন ‘আশরাফুল মাখলুকাত’-এর মর্যাদা। কোন নির্দিষ্ট জাতি, গোত্র বা বর্ণের মানুষ এই মর্যাদার একক দাবিদার নয়, বরং সকল মানুষ সমানভাবে এই মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।
সৃষ্টিজগতের অন্য যে কোন জীবের সাথে এই পার্থক্য গভীরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন মহান রাব্বুল আলামিন। বাহ্যিক অবয়ব, মনুষ্যত্বের অস্তিত্ব অর্থাৎ নৈতিক মূল্যবোধ, জীবনপদ্ধতি সকল দিক দিয়েই মানুষ অনন্য। অন্য যে কোন সৃষ্টির তুলনায় সে স্বতন্ত্র ও বিশেষ মর্যাদার অধিকারী। যে ফেরেশতারা সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর তাসবিহ পড়ে তারা থাকার পরও আল্লাহ খলিফার মর্যাদা দিয়ে একদল রক্তে-মাংসে গড়া মানুষকে কেন দুনিয়াতে প্রেরণ করলেন? ফেরেশতাদের এ প্রশ্নের জবাবে আল্লাহ বলেছেন-
আবার সেই সময়ের কথা একটু স্মরণ কর যখন তোমাদের রব ফেরেশতাদের বলেছিলেন, ‘আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা বা প্রতিনিধি নিযুক্ত করতে চাই’। তারা বললো, ‘আপনি কি পৃথিবীতে এমন কাউকে নিযুক্ত করতে চান যে সেখানকার ব্যবস্থাপনাকে বিপর্যস্ত করবে এবং রক্তপাত করবে? আপনার প্রশংসা ও স্তুতিসহকারে তাসবিহ পাঠ এবং আপনার পবিত্রতা বর্ণনা তো আমরা করেই যাচ্ছি’। আল্লাহ বললেন, ‘আমি যা জানি তোমরা তা জানো না’। (সূরা বাকারা : ৩০)  সূরা জারিয়াতে সে উদ্দেশ্যটাই আরো পরিষ্কারভাবে আল্লাহ বলেছেন-
জিন ও মানুষকে আমি শুধু এ জন্যই সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার দাসত্ব করবে (সূরা জারিয়াত : ৫৬)  এই গোলামি বা দাসত্বের পরিচয়কেই আল্লাহ উচ্চমর্যাদা দান করে সূরা বাকারার ৩০ নম্বর আয়াতে বলেছেন, ‘আমি পৃথিবীতে খলিফা প্রেরণ করেছি।’
মানুষের পরিচয়কে সৃষ্টিকুলে বিশেষত ফেরেশতাকুলের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করতে ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন আদম (আ)কে সিজদা করার জন্য।
যখন আমি তাকে পূর্ণ অবয়ব দান করবো এবং তার মধ্যে আমার রূহ থেকে কিছু ফুঁকে দেবো তখন তোমরা সবাই তার সামনে সিজদাবনত হয়ো। (সূরা হিজর : ২৯) অর্থাৎ শুধু ঘোষণা দিয়েই ক্ষান্ত হননি বরং মানুষের চমৎকার অবয়ব দান করে, পৃথিবীর চারপাশকে তার অনুকূলে এনে তাকে এ মর্যাদার উপযোগী করে গড়ে তুললেন। অপর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
তোমরা কি দেখো না, আল্লাহ জমিন ও আসমানের সমস্ত জিনিস তোমাদের জন্য অনুগত ও বশীভূত করে রেখেছেন এবং তোমাদের প্রতি তার প্রকাশ্য ও গোপন নিয়ামতসমূহ সম্পূর্ণ করে দিয়েছেন? এরপর অবস্থা হচ্ছে এই যে, মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক আছে যারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে, তাদের নেই কোনো প্রকার জ্ঞান, পথনির্দেশনা বা আলোক প্রদর্শনকারী কিতাব। (সূরা লুকমান : ২০)    এই নিয়ামত ও মর্যাদা শুধুমাত্র মানুষ হিসেবেই সে লাভ করেছে। এতে সাদা কালো, আরব-অনারব, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য, উঁচু-নিচুর কোন ভেদাভেদ নেই। কেননা একই আত্মা থেকে সকলের সৃষ্টি। মহানবী (সা) মানুষের এই নিয়ামত ও মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করে তাওয়াফকালীন পবিত্র কাবা ঘরকে সম্বোধন করে বলেছিলেন,
‘কতই না পবিত্র তুমি। তোমার পরিবেশ কতই না মনোমুগ্ধকর, কত মহান তুমি এবং কতই না মহান তোমার মর্যাদা। যে আল্লাহর হাতে মোহাম্মদের প্রাণ তার শপথ করে বলছি, একজন মুসলমানের জান-মাল ও রক্তের মর্যাদা আল্লাহর নিকট তোমার চাইতেও বেশি।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস নম্বর -৩৯৩২, মুসনাদে আহম্মদ)
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে এত বেশি মর্যাদা দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি অসৎ পথকে গ্রহণ না করে সৎ পথকে বেছে নিলো তার মর্যাদা ফেরেশতার চেয়েও বেশি। কেননা একজন ফেরেশতার কাজই হলো আল্লাহর তাসবিহ করা আল্লাহর হুকুম পালন করা কিন্তু মানুষের সামনে আল্লাহ ভালো ও মন্দ যে কোন একটি পথ বেছে নেয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন।
মানুষ যে অন্যান্য সৃষ্টি থেকে অনেক বেশি উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন তার কারণ হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে নৈতিকতার মানদন্ড দিয়ে দিয়েছেন যা অন্য কোন প্রাণীর নেই। এই পার্থক্য প্রথম দৃশ্যমান হয় আদম সন্তান হাবিল ও কাবিলের ঘটনায়। কাবিল যখন হাবিলকে হত্যা করল, অনেকটা উ™£ান্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন একটি কাকের মাধ্যমে ইঙ্গিত প্রদানের মাধ্যমে বুঝিয়ে দিলেন মৃত ব্যক্তির লাশ উন্মূক্ত না রেখে তাকে মাটির নিচে সুন্দরভাবে কবর দিতে হবে। দুনিয়ার প্রথম হত্যাকান্ড ছিল এটি। একটা পশুর সাথে মানুষের মূল্যবোধগত পার্থক্য এটি।
ইসলাম-পূর্ব যুগে মানুষের মর্যাদা বা সম্মান কিছুই ছিল না বললেই চলে। পণ্যের মত মানুষ বেচাকেনা হতো। দাস হিসাবে কেনা গোলাম হয়ে থাকতো সবাই। ঝগড়া, মারামারি, শত্রুতার কারণে হত্যা। এ-সবই ছিল নিত্য দিনের সঙ্গী। নারীদের অবস্থা ছিল আরো শোচনীয়। জীবিত কন্যাসন্তানকে মাটিতে পুঁতে ফেলা হতো। সমাজে তাদের অস্তিত্ব ছিল অনাকাক্সিক্ষত। সমাজে না ছিল ইনসাফ, না ছিল শান্তি, না ছিল নৈতিকতা, মূল্যবোধের কোন অস্তিত্ব। এই অবস্থায় মানুষের অনন্য অতুলনীয় মর্যাদা নিয়ে পৃথিবীতে আবির্ভূত হলেন শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা)। নাজিল হলো পবিত্র কুরআন। পরিপূর্ণ হলো দ্বীন ইসলাম। প্রতিষ্ঠিত হলো মানুষের চমৎকার কিছু মর্যাদা। নি¤েœ তা তুলে ধরা হলো-

মানুষ হলো খলিফাতুল্লাহ
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষকে তার খলিফা হিসেবে ঘোষণা দিলেন। মানুষ হলো দুনিয়ায় আল্লাহর প্রতিনিধি। মানুষের কাজ হলো আল্লাহকে এক ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়ে জীবনের সব ক্ষেত্রে তার প্রতিনিধিত্ব করা। এরশাদ হচ্ছে-
তিনিই তোমাদের করেছেন দুনিয়ার প্রতিনিধি এবং যা কিছু তোমাদের দিয়েছেন তাতে তোমাদের পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কাউকে অন্যের ওপর অধিক মর্যাদা দান করেছেন। নিঃসন্দেহে তোমার রব শাস্তি দেয়ার ব্যাপারে অতি তৎপর এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়। (সূরা আনআম-১৬৫)

মানুষ হলো আনসারউল্লাহ
মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে এক আল্লাহর দাস, গোলাম হওয়ার মর্যাদা দিলেন। এমনকি তার আহবানে সাড়া দানকারীদের ‘আনসারউল্লাহ’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। সৃষ্টিকর্তা, একমাত্র মনিব মহান রাব্বুল আলামিনের সাথে সরাসরি এই সম্পর্ক নিঃসন্দেহে মানুষকে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করল।

আল্লাহর সাথে মানুষের চুক্তি
আল্লাহ নিজেই মানুষকে দিলেন জান ও মাল। আবার সেই জান মালকে বিক্রি করারও সুযোগ করে দিলেন। আর সেই ক্রয়-বিক্রয়ের বিনিময় বস্তুটি কোন সামান্য কিছু না বরং সেটি জান্নাতের বিনিময়ে। মহান আল্লাহ বলেন-
প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে এবং মারে ও মরে। তাদের প্রতি তাওরাত, ইঞ্জিল ও কুরআনে (জান্নাতের ওয়াদা) আল্লাহর জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়াদা বিশেষ। আর আল্লাহর চাইতে বেশি নিজের ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে? কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে যে কেনাবেচা করছো সে জন্য আনন্দ করো। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। (সূরা তাওবা-১১১)  সরাসরি স্বয়ং ¯্রষ্টার সাথে ক্রয় বিক্রয়ের চুক্তি করার এই অপূর্ব সুযোগ শুধু মানুষেরই আছে।

কিতাবের ধারক
মানুষের আরেকটি মর্যাদার বিষয় হলো সৃষ্টি জগতের একমাত্র এই মানুষের কাছেই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন কিতাব নাজিল করেছেন। এই কিতাবের সাথে সাথে প্রেরণ করেছেন দাওয়াত দানের জন্য উন্নত চরিত্র ও উন্নত আমলসম্পন্ন নবী ও রাসূলদের। যাদের কাজ মানুষকে সতর্ক করা, সুসংবাদ দান করা, ভীতি প্রদর্শন করা এবং আহবান করা। আল্লাহ বলেছেন, ‘এ কুরআন মানুষের জন্য সুস্পষ্ট প্রমাণ এবং নিশ্চিত বিশ্বাসী লোকদের জন্য পথনির্দেশ ও রহমত’। এ কুরআন শুধু মর্যাদাই নয় বরং এটি অনেক বড় একটি নিয়ামতও, যা মানুষের জন্য শুধু সম্মানই বয়ে আনে না বরং তার জন্য জবাবদিহিতাও বয়ে আনে। আর ঠিক সেই কারণে সৃষ্টি জগতের কেউ এই কিতাব গ্রহণ করতে চায়নি। শুধুমাত্র মানুষ তাকে গ্রহণ করেছে। এবং পরবর্তীতে সে মর্যাদার যোগ্যতা হারিয়ে নিজকে অক্ষম ও অকৃতজ্ঞ প্রমাণ করেছে। আল্লাহ বলেছেন-
আমি এ আমানতকে আকাশসমূহ, পৃথিবী ও পর্বতরাজির ওপর পেশ করি, তারা একে বহন করতে রাজি হয়নি এবং তা থেকে ভীত হয়ে পড়ে। কিন্তু মানুষ একে বহন করেছে, নিঃসন্দেহে সে বড় জালেম ও অজ্ঞ। (সূরা আহজাব : ৭২)
আমি যদি এই কুরআনকে কোন পাহাড়ের ওপর নাজিল করতাম তাহলে তুমি দেখতে পেতে তা আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়ছে এবং ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। আমি মানুষের সামনে এসব উদাহরণ এ জন্য পেশ করি যাতে তারা (নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে)  ভেবে দেখে। (সূরা হাশর-২১)
এভাবেই মানুষ যেমন শ্রেষ্ঠ মর্যাদা লাভ করেছে ঠিক একইভাবে অতি কঠিন দায়িত্ব ও আমানতের ভার নিয়েছে। যা সঠিকভাবে সংরক্ষণ করলে মর্যাদা ও সম্মান অক্ষুন্ন রাখা সম্ভব।
দুনিয়ার সকল নেয়ামতের কেন্দ্রবিন্দু
মানুষের সহায়কশক্তি হিসেবে আল্লাহ অসংখ্য নেয়ামত সৃষ্টি করেছেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষ ধ্বংস হোক, সে কতো অকৃতজ্ঞ। তিনি তাকে কি বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন? বীর্য থেকে সৃষ্টি করেছেন তাকে, অতঃপর তাকে সুপরিমিত করেছেন। অতঃপর তার পথ সহজ করেছেন, তারপর তার মৃত্যু ঘটান ও কবরস্থ করেন। এরপর যখন ইচ্ছা করবেন তখন তাকে পুনরায় জীবিত করবেন। সে কখনও কৃতজ্ঞ হয়নি। তিনি তাকে যা আদেশ করেছেন সে তা পূর্ণ করেনি। মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ্য করুক। আমি অলৌকিকভাবে তাতে পানি বর্ষণ করেছি, তারপর আমি ভূমিকে বিদীর্ণ করেছি। যেখানে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙ্গুর, শাক সবজি, যয়তুন, খেজুর, ঘনঘন বাগান, ফল ও ঘাস। তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ প্রাণীদের উপকারার্থে। (সূরা আবাসা : ১৭-৩২)
আরো কিছু নেয়ামতের কথা আল্লাহ্ বলেছেন-
তিনিই তো আল্লাহ যিনি তোমাদের জন্য সমুদ্রকে অনুগত করে দিয়েছেন যাতে তাঁর নির্দেশে জাহাজসমূহ সেখানে চলে আর তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে এবং কৃতজ্ঞ হতে পার। (আল জাসিয়াহ-১২)
ঠিক একইভাবে পশু-পাখিকেও মানুষের পোষ্য অনুগত করে দিয়েছেন। এভাবে বিভিন্ন নিয়ামত শুধু মানুষের জন্যই নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। মানুষ ছাড়া সৃষ্টি জগতের এমন কোন জীব নেই যার জন্য পৃথিবীর সব নিয়ামতকে সৃষ্টি করা হয়েছে। কাজেই এটি আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের এক অনন্য মর্যাদা।

অধিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ‘হাক্কুল ইবাদ’
‘হাক্কুল ইবাদ’কে ইসলামের একটি মৌলিক শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যার মাধ্যমে ব্যক্তি হিসেবে সে দুনিয়া ও আখেরাতে মর্যাদা পেতে পারে এবং দুনিয়ার সম্মান ও অধিকার প্রাপ্তির মাধ্যমে পরিপূর্ণ হতে পারে। আল্লাহর হকের পরপরই বান্দার হককে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এমনকি কোন ব্যক্তি যদি আল্লাহর হক আদায় করে কিন্তু বান্দার হককে অগ্রাহ্য করে তাহলেও তার জান্নাত প্রাপ্তি সম্ভব নয়। আল্লাহ তার সংশ্লিষ্ট হক মাফ করেন কিন্তু বান্দার হক নষ্ট হলে তিনি মাফ করেন না। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি ব্যক্তির কাছে, সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে কিছু ব্যাপারে হকদার।
ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্র মানুষের কিছু অধিকার নিশ্চিত করতে বাধ্য।
যেমন-মৌলিক অধিকার- খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

মালিকানার নিরাপত্তার অধিকার-এ ক্ষেত্রে প্রাণ হত্যাকে হারাম ঘোষণা করা হয়েছে।
সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করাকে হারাম বলা হয়েছে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-
আর তোমরা নিজেদের মধ্যে একে অন্যের সম্পদ অবৈধ পদ্ধতিতে খেয়ো না এবং শাসকদের সামনেও এগুলোকে এমন কোন উদ্দেশ্যে পেশ করো না যার ফলে ইচ্ছাকৃতভাবে তোমরা অন্যের সম্পদের কিছু অংশ খাওয়ার সুযোগ পেয়ে যাও। (সুরা বাকারা-১৮৮)

ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ধর্ম পালনে স্বাধীনতা
প্রত্যক ধর্মের অনুসারীরাই পূর্ণ স্বাধীনতার সাথে ধর্ম পালন ও উৎসব আয়োজন করতে পারবে। এমনকি ভিন্ন ধর্মের অনুসারীরা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে তার ধর্ম পালন ও প্রচার করতে পারবে।
‘যেহেতু এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাই হে মুহাম্মাদ এখন তুমি সেই দ্বীনের দিকেই আহবান জানাও এবং যেভাবে তুমি আদিষ্ট হয়েছো সেভাবে দৃঢ়তার সাথে তা আঁকড়ে ধরো এবং এসব লোকের ইচ্ছা আকাক্সক্ষার অনুসরণ করো না। এদের বলে দাও, ‘আল্লাহ যে কিতাব নাজিল করেছেন আমি তার ওপর ঈমান এনেছি। আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যেন তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করি। আল্লাহই আমাদেরও রব এবং তোমাদেরও রব তিনিই। আমাদের কাজকর্ম আমাদের জন্য আর তোমাদের কাজকর্ম তোমাদের জন্য। আমাদের ও তোমাদের মাঝে কোন বিবাদ নেই। একদিন আল্লাহ আমাদের সবাইকে একত্রিত করবেন। তাঁর কাছেই সবাইকে যেতে হবে।’ (সূরা শূরা-১৫)

মান ইজ্জতের নিরাপত্তার অধিকার
এক্ষেত্রে নিন্দা, গিবত, গোয়েন্দাগিরি, অশ্লীল ভাষাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, চক্ষু সংযত রাখতে বলা হয়েছে।

ইনসাফ ও আদল পাওয়ার অধিকার
অমুসলিম বা মুসলিম প্রত্যেকের সাথেই ন্যায়বিচার করতে হবে। সুবিচার ও সমানধিকার দিতে হবে। আল্লাহ্ বলেছেন-
হে মানবজাতি, আমি তোমাদেরকে একজন পুরুষ এবং একজন নারী থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীতে বিভক্ত করে দিয়েছি যাতে তোমরা পরস্পরকে চিনতে পার। তোমাদের মধ্যে যে অধিক পরহেজগার সে-ই প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদার অধিকারী। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাজ্ঞানী ও সবকিছু সম্পর্কে অবহিত। (সুরা হুজুরাত-১৩)  এছাড়া অমুসলিম ব্যক্তিকে জিম্মি হিসেবে, নাগরিক প্রতিবেশী হিসেবে এমনকি আত্মীয় হিসেবে যেটুকু ইসলাম প্রদত্ত অধিকার তা তাকে দিতে হবে।
রাষ্ট্রের পর পরিবার ও সমাজ জীবনে একজন ব্যক্তি যে অধিকার লাভ করার দাবিদার তা হলোÑ
১.    পিতা-মাতা হিসাবে সন্তানের কাছে প্রাপ্য অধিকার সম্মান ও মর্যাদা
#    ভরণ-পোষণ
#    আশ্রয় ও যতœ
#    ভালো ব্যবহার, সদাচরণ
#    আনুগত্য ও ভালোবাসা
২.    কন্যা-পুত্র সন্তান হিসাবে বাবা-মার কাছে প্রাপ্য মর্যাদা
#    ভরণ-পোষণ
#    নৈতিক, ব্যবহারিক শিক্ষা
#    আনুষ্ঠানিক হক (আকিকা, বিয়ে-শাদি, সম্পদ ও অর্থ-সম্পদ সংক্রান্ত অধিকার)
৩.    স্বামী-স্ত্রী
#    একে অপরের প্রতি দায়িত্ববোধ
#    ভরণ-পোষণ, আনুগত্য
#    সন্তান ও পরিবারের দেখাশোনা
#    আচরণগত বিষয়ে সৌন্দর্য
৪.    ভাইবোন হিসেবে
#    ছোট হিসেবে ¯েœহ পাওয়া
#    বড় হলে সম্মান পাওয়া
#    পারিবারিক সম্পর্ক
৫.    প্রতিবেশী/আত্মীয় স্বজন
#    বিপদ-আপদে সহযোগিতা
#    সুসম্পর্ক
#    খোঁজ রাখা।
#    দাওয়াত প্রদান।

একজন মানুষ প্রতিটি ক্ষেত্রে অধিকার প্রাপ্তির মাধ্যমে নিজের সম্মান ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করতে পারে। ইসলাম মানুষের কোন সেক্টর বাদ দেয়নি। পরিবারের, সমাজের সদস্য, রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সকল মর্যাদা তাকে দেয়া হয়েছে। এমনকি শ্রমজীবী, পেশাজীবী বা দিনমজুর প্রত্যেকেরই অর্থনৈতিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছে। মানুষ হিসেবে সৃষ্টি জগতে যেমন মহান রাব্বুল আলামিন তাকে পূর্ণ মর্যাদার অঙ্গীকার করেছেন ঠিক একইভাবে ব্যবহারিক জীবনেও সেই মর্যাদার অধিকারী হবে এই নিশ্চয়তা ইসলাম দিচ্ছে।
যে মানুষ দুনিয়া প্রাপ্তির আশায় কাজ করবে আল্লাহ তাকে দুনিয়ায় সমৃদ্ধি দান করবেন। যদিও বা সে অমুসলিম বা অবিশ্বাসী হয়। আর মুসলিম হলে তো পরকালীন মর্যাদা ও প্রতিদান আছেই।
ইসলাম মানবজাতিকে যে সীমাহীন মর্যাদা দিয়েছে অন্য আর কোন ধর্ম, জীবনব্যবস্থা, অন্য কোনো মতবাদ সে মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। আর এই মর্যাদার সাথে যুক্ত হয়েছে দায়িত্ব। মানুষ নিজে যত সুন্দরভাবে, যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করবে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনও ততটাই সঠিকভাবে তাকে তার মর্যাদায় আসীন করবেন। মহান আল্লাহ  মানবজাতিকে এই মর্যাদা উপলব্ধি করার তৌফিক দান করুন এবং তার পথে সঠিকভাবে চলার সুযোগ করে দিন, আমিন।

SHARE

Leave a Reply