ইসলাম ও জাহেলিয়াতের বাইরে তৃতীয় পথ কোনটি?- মো: রাশেদুল ইসলাম

মানবতার কল্যাণে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মনোনীত দ্বীন ইসলাম। ইসলাম কোন যুগ ও কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়- বরং সকল যুগ ও সকল কালেই এ জীবনবিধান মানুষের জন্য কল্যাণকর। মানুষকে সত্যের দিকে, আলোর দিকে নিয়ে আসাই ইসলামের উদ্দেশ্য। মানুষের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো নিজের মর্জিমাফিক চলা। যার ফলশ্রুতি জাহেলিয়াত। কারণ, নফসের উপর শয়তানের খবরদারি সহজ। আর নফসকে আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে রাখতে না পারলে নফস শয়তানের খবরদারির আওতায় চলে যায়। শয়তান তখন আল্লাহর বন্দেগির বিপরীতে মানুষের বন্দেগি করতে রাজি করায়। ফলে কল্যাণকর দ্বীন ইসলামের পরিবর্তে জাহেলিয়াতের রমরমা পরিবেশ আকর্ষণীয় হয়। অর্থাৎ কিছু সংখ্যক শক্তিশালী লোক গায়ের জোরে আল্লাহর দেওয়া বিধান পরিত্যাগ করে নিজেদের খেয়াল খুশিমতো আইন-কানুন রচনা করে সমাজের উপর চাপিয়ে দেয় এবং সমাজ তা মেনে নিয়ে আইনপ্রণেতাদের বান্দা হয়ে যায়। ইসলাম বলে, সমগ্র মানবগোষ্ঠী এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর বন্দেগি করবে এবং সকল আকিদা-বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণা, আইন-কানুন, গ্রহণ ও বর্জনের মানদণ্ড ইত্যাদি একমাত্র আল্লাহরই নিকট থেকে গ্রহণ করেব। সৃষ্ট জীবের অধীনতা থেকে মুক্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে শুধু আল্লাহরই অধীন হয়ে জীবন যাপন করবে।
এই যে আল্লাহর বান্দা হিসেবে একনিষ্ঠভাবে তাঁর বন্দেগি করতে হবে, আমরা পৃথিবীবাসী ক্ষণে ক্ষণে তা ভুলে যাই। অপর দিকে আমরা যারা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার প্রত্যয়ে কাজ করছি, তাদের কাজের পরিধিতে প্রাথমিক বিষয় হলো ভুলে যাওয়া মানুষকে সতর্ক করা। কেউ ভুল করতে থাকবে আর আমি নিজেকে খাঁটি মুমিন হিসেবে পরিচয় দিয়ে আল্লাহর শোকর গুজার করতে থাকবো, এমন হতে পারে না। এর জন্য হাশরে কঠিন জবাবদিহি করতে হবে। আবার এ কথাও সত্য যে, দ্বীনের তত্ত¡ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এবং তদনুযায়ী মানুষের করণীয় ঠিক করে দিতে গিয়ে আমাদের অনেকের কথা এবং আচরণ এমন হয়, যার কারণে দ্বীনের দিকে আকর্ষণবোধ ক্ষীণ হয় দাওয়াত প্রাপ্তের। এ জন্য ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে কিভাবে পেশ করতে হবে তা নিয়ে চিন্তা করার প্রয়োজন আছে।
আমরা পৃথিবীর একটি সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনের লক্ষ্যে ইসলামের আহবান জানিয়ে আসছি আমাদের নিজস্ব অর্থাৎ শেষ নবীর (সা.) রিসালাতের রেশ ধরে। যেই পরিবর্তনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য মানবসমাজের নেতৃত্ব থেকে জাহেলিয়াতের উচ্ছেদ সাধন করে নেতৃত্বের রশি নিজ হাতে গ্রহণ করা এবং ক্রমে ক্রমে তার বৈশিষ্ট্যময় স্বাতন্ত্র্যের অধিকারী নিজস্ব জীবনবিধান কার্যকর করা। এ সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবতার কল্যাণ সাধন ও উন্নয়ন। ¯্রষ্টার নিকট নতি স্বীকার এবং মানুষ ও সৃষ্টিজগতের মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপনের মাধ্যমেই এ উদ্দেশ্য পূরণ হতে পারে। এ দ্বীনের লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে আল্লাহ তা‘য়ালার বাঞ্ছিত উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছে দেয়া এবং তাকে নফসের দাসত্ব থেকে মুক্ত করা।
মানুষকে ইসলাম গ্রহণ করার জন্য আহবান করার সময় টার্গেটকৃত ব্যক্তি মুসলিম কিংবা অমুসলিম, যাই হোক না কেন- আমাদের একটি বিষয় সবসময় খেয়াল রাখতে হবে যে, সাম্য-শান্তি-মানবিকতা ইসলামের প্রকৃতির মধ্যেই প্রচ্ছন্ন রয়েছে। ইসলাম মানবজীবন ও বিশ্বপ্রকৃতির সম্পর্কে যে ধারণা বিশ্বাস থেকে উদ্ভ‚ত, মানবরচিত জীবনবিধান তার সকল শাখা প্রশাখাসহ অন্যান্য জীবনাদর্শ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। জীবন সম্পর্কিত ইসলামী ধারণা-বিশ্বাস প্রাচীন ও আধুনিক সকল প্রকার জাহেলিয়াতের বিরোধী। অবশ্য জীবন বিধানের ভিত্তিতে বিস্তারিত ব্যবস্থা প্রণয়নের সময় জাহিলিয়াতের কোনো কোনো বিষয় ইসলামের কোনো কোনো বিষয়ের সাথে সাদৃশাত্মাক হতে পারে। কিন্তু যে মৌলিক ধারণা ও বিশ্বাস থেকে এসব বিধান রচনা করা হয় তা বরাবরই জাহেলিয়াতের

সম্পূর্ণ বিপরীত। মানুষের জ্ঞাত সকল প্রকার জীবনাদর্শই ইসলামী জীবন দর্শনের দৃষ্টিতে জাহেলিয়াত।

ইসলামের প্রথম কাজ হচ্ছে তার নিজস্ব ঈমান ও আকিদার ভিত্তিতে মানুষের জীবন যাত্রার পরিবর্তন সাধন করে নিজস্ব ছাঁচে গড়ে তোলা, আল্লাহ তা‘য়ালার দেয়া একটি বাস্তবমুখী জীবনবিধান অনুসারে মানবসমাজের চলার পথ নির্দেশ করা। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মতকে মানবসমাজের জন্য এক বাস্তব নমুনা হিসেবে পেশ করেছেন। তিনি বলেন-
“তোমরা শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবসমাজের কল্যাণ সাধনের জন্য তোমাদের উত্থিত করা হয়েছে। তোমরা নেকির আদেশ দাও এবং অন্যায় থেকে মানুষকে বিরত রাখ। আর নিজেরা আল্লাহর উপর ঈমান রাখ।” (সূরা আলে ইমরান : ১১০)
(এরা হচ্ছে ঐ দল) যাদেরকে ভূ-পৃষ্ঠে ক্ষমতা দান করলে তারা নামাজ কায়েম করে, জাকাত আদায় করে, সৎকাজের আদেশ দান করে এবং অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আল হজ : ৪১)
ইসলাম দুনিয়ায় প্রচলিত জাহেলিয়াতের সাথে কোন আপসরফা অথবা জাহেলিয়াতের পাশাপাশি সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়। দুনিয়ায় যেদিন ইসলামের প্রথম আগমন ঘটেছিল সেদিনই সে জাহেলিয়াতের সাথে আপস বা সহাবস্থান করতে রাজি হয়নি, আজকের দুনিয়াতেও রাজি নয় এবং ভবিষ্যতেও কখনো রাজি হবে না। জাহেলিয়াত যে যুগেরই হোক না কেন, তা জাহেলিয়াত ছাড়া আর কিছুই নয়। আর জাহেলিয়াতের অর্থ হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার বন্দেগি পরিহার এবং আল্লাহপ্রদত্ত জীবনবিধানের প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করা। আল্লাহর পরিচয়হীন অন্ধকার উৎস থেকে জীবন যাপনের রীতিনীতি, আইন-কানুন ও ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করাই জাহেলিয়াতের ধর্ম। অপর দিকে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ এবং জাহেলিয়াত পরিত্যাগ করে আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানের দিকে ছুটে আসার জন্য আহবান জানানোই ইসলামের প্রকৃতি।
ইসলামের প্রকৃতিই এরূপ। দুনিয়ায় এখন অবধি ইসলাম যে ভূমিকা পালন করছে তা থেকেই আমাদের এ কথা পরিষ্কার পাওয়া যায়। ভবিষ্যতেও সে একই ভূমিকা পালন করবে। আমরা মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে যাদের সামনেই ইসলামের বাণী পেশ করব, তাদের নিকট ইসলামের উপরোক্ত ভূমিকাও অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরবো।
আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে হোক অথবা জীবন-বিধানের ক্ষেত্রে; ইসলাম জাহেলিয়াতের সাথে কোন আপস-রফা করতে প্রস্তুত নয়। এক সাথে এক স্থানে, হয় ইসলাম থাকবে অন্যথায় জাহেলিয়াত। অর্ধেক ইসলাম ও অর্ধেক জাহেলিয়াত মিলেমিশে থাকার কোন ব্যবস্থাই ইসলাম নেই। এ ব্যাপারে ইসলামের বক্তব্য অত্যন্ত সুস্পষ্ট। সে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করে যে, মহাসত্য একটি অবিভাজ্য একক। যেখানে মহাসত্যের ধারক-বাহক কেউ ধেনই সেখানে মিথ্যা বা জাহেলিয়াত রয়েছে। সত্য ও মিথ্যা অথবা হক ও বাতিলের সংমিশ্রণ, আপস অথবা সহ-অবস্থানের কোনই অবকাশ নেই। হয় আল্লাহর আদেশ মেনে চলতে হবে, না হয় জাহেলিয়াতের, হয় আল্লাহর শরিয়ত সমাজে বাস্তবায়িত হবে অন্যথায় মানুষের খেয়াল-খুশি ও স্বেচ্ছাচারের রাজত্ব চলবে। কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে এ বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
“(হে নবী!) আল্লাহর নাযিল করা বিধান অনুসারে তাদের মধ্যে বিচার ফায়সালা কর এবং তাদের খেয়াল খুশির প্রতি কোন গুরুত্ব দিও না। তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাক, অন্যথায় তারা তোমাদের আল্লাহর নাযিল করা বিধান থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে বিভ্রান্তিতে নিক্ষেপ করবে।” (সূরা মায়িদাহ : ৪৯)
“এ সত্যের প্রতি তাদের আহবান করে যাও এবং তোমাদের যেরূপ আদেশ করা হয়েছে তদনুসারে অটল হয়ে থাক এবং তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করো না।” (সূরা শুরা : ১৫)
“যদি তারা তোমার ডাকে সাড়া না দেয় তাহলে জেনে রাখো, তারা নিজেদের খেয়াল-খুশিরই অনুসরণ করছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হেদায়াতের পরোয়া না করে নিজেদের খাহেশের অনুসরণ করে, তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে হতে পারে? আল্লাহ কখনো যালিমদের হেদায়াত দান করেন না।” (সূরা কাসাস : ৫০)
“(হে নবী!) আমি তোমাকে একটি স্পষ্ট শরিয়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছি। সুতরাং এ শরিয়াত মেনে চল এবং অজ্ঞ লোকদের খেয়াল-খুশির অনুকরণ করো না। আল্লাহর অসন্তুষ্টির মুখে তারা তোমার কোন উপকারেই আসবে না। অবশ্যই যালিমরা পরস্পরের বন্ধু। আর আল্লাহ পরহেজগারদের পৃষ্ঠপোষক।” (সূরা জাসিয়া: ১৮-১৯)
এসব আয়াত থেকে বুঝা গেল যে, পথ মাত্র দু’টিই রয়েছে। তৃতীয় কোন পথ নেই। হয় আল্লাহ ও রাসূল (সা.)-এর নির্দেশ মেনে নিতে হবে। অন্যথায় নফসের খাহেশ মোতাবেক জীবন যাপন করতে হবে। হয় আল্লাহর ফায়সালা মেনে নিতে হবে অন্যথায় জাহেলিয়াতের সামনে মাথা নত করতে হবে। আল্লাহর নাযিল করা বিধানকে সকল বিষয়ে মীমাংসার মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ না করার অনিবার্য পরিণতি হবে আল্লাহর নির্দেশ পরিহার ও অমান্য করা। আল্লাহর কিতাবে উপরোক্ত আয়াতগুলোর উল্লেখ থাকার ফলে এ বিষয়ে আর কোনো বিতর্কের অবকাশ মাত্র নেই।
লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply