ঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমল । ড. মো: হাবিবুর রহমান

(দ্বিতীয় পর্ব)

মানুষের দুনিয়ার জীবনের আমল বা কর্ম দুইভাগে বিভক্ত (ক) আমলে সালেহ বা ভালো আমল যা মানুষের ঈমানের জন্য সহায়ক বা ঈমান বৃদ্ধিকারী (খ) আমলে সাইয়্যেয়াত বা খারাপ আমল যা মানুষের ঈমান বিনষ্ট করে দেয়। যে ব্যক্তি ভালো আমল করবে আল্লাহ তার উত্তম প্রতিদান দিবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।” (সূরা বনি ইসরাইল : ৯) আরো বর্ণিত হয়েছে, “যারা সৎকর্ম করে, নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।” (সূরা কাহাফ : ২)
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে কুফ্রি করবে এবং খারাপ আমল করবে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তাওবা নাই তাদের, যারা অন্যায় কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু এসে যায়, তখন বলে, আমি এখন তাওবা করলাম, আর তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা কাফির অবস্থায় মারা যায়; আমি এদের জন্যই তৈরি করেছি যন্ত্রণাদায়ক আজাব।” (সূরা আন-নিসা : ১৮)
আলোচ্য প্রবন্ধে আল-কুরআন ও আল-হাদিসের আলোকে ঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমলের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হলো:

নিজের মতামত ও সিদ্ধান্তকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর সিদ্ধান্তের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয়া :
ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বদ আমল হচ্ছে নিজের মতামত ও সিদ্ধান্তকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের (সা.) এর সিদ্ধান্তের উপরে অগ্রাধিকার দেয়া। এ ধরনের কাজ ঈমান ও আমল সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল হুজুরাত : ১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নবীর আওয়াজের ওপর তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না এবং তোমরা নিজেরা পরস্পর যেমন উচ্চস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সে রকম উচ্চস্বরে কথা বলো না। এ আশঙ্কায় যে তোমাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।” (সূরা আল হুজুরাত : ২)

উপদেশ অনুযায়ী কাজ না করা :
ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের মধ্যে আর একটি বদ আমল হচ্ছে কোন ব্যক্তি মানুষকে যে উপদেশ বা নসিহত করে অথচ নিজে সম্পূর্ণরূপে তা ভুলে থাকে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তোমরা কি মানুষকে ভালো কাজের আদেশ দিচ্ছ আর নিজেদেরকে ভুলে যাচ্ছ? অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াত কর। তোমরা কি বুঝ না?” (সূরা আল-বাকারা : ৪৪)
এ জাতীয় খারাপ আমলকে আল্লাহ খুবই অপছন্দ করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা তা কেন বলো, যা তোমরা কর না? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর নিকট বড়ই ক্রোধের বিষয়।” (সূরা আস-সাফ : ২-৩)
এ জাতীয় আমলকারীকে বলা হয় মুনাফিক। আর মুনাফিকদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনও তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না।” (সূরা আন-নিসা : ১৪৫)

আমানতের খেয়ানত করা :
ঈমান ধ্বংসকারী বদ আমলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমানতের খেয়ানত করা। আমানতের খেয়ানত করতে নিষেধ করে রাসূল (সা.) বলেন, “তোমাকে বিশ্বস্ত মনে করে যে ব্যক্তি তোমার কাছে আমানত রাখবে, তার আমানত ফিরিয়ে দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার সাথে খেয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তুমি তার সাথে খেয়ানত ও বিশ্বাস ঘাতকতা করবে না।” (সুনান আবু দাউদ ও তিরমিযি)
কারো হক নষ্টকারীকে বা খিয়ানতকারীকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “রাসূল (সা.) সাহাবীদের বললেন, তোমরা কি জানো প্রকৃত দরিদ্র কে? সাবাহীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) যার টাকা-পয়সা ও দুনিয়ার সম্বল নেই সে। রাসূল (সা.) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সেই প্রকৃত দরিদ্র, যে কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম, জাকাতসহ উঠবে। ঠিক তার সাথে কাউকে অভিশাপ করেছে, কাউকে আঘাত করেছে, অন্যায়ভাবে অন্যের মাল আত্মসাৎ করেছে, কাউকে প্রহার করেছে। কিয়ামতের দিন এটার কারণে তাকে দাঁড় করানো হবে এবং বলা হবে, এরা তোমার কাছে পাওনাদার তাদের প্রাপ্য তোমার ভালো কাজ দ্বারা পরিশোধ করো। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধের পূর্বেই তার ভালো আমল সব শেষ হয়ে যাবে। তখন এসব পাপের কারণে তাকে ধরা হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সুনান আত-তিরমিযি ও মুসনাদ আহমদ)

মানুষের ওপরে জুলুম বা অত্যাচার করা :
ঈমান বিনষ্টকারী বর্জনীয় আমলের মধ্যে আর একটি আমল হচ্ছে মানুষের ওপরে জুলুম-অত্যাচার করা। কিয়ামতের দিন জুলুমকারীকে তার কর্মের প্রতিফল ভোগ করতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জন অনুসারে প্রতিদান দেয়া হবে। আজ কোন জুলুম নেই। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। আর তুমি তাদের আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। যখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ-কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। জালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে।” (সূরা মু’মিন : ১৭-১৮)
রাসূল (সা.) জুলুমের শাস্তি সম্পর্কে বলেছেন, “যে ব্যক্তি অত্যাচার করে এক বিঘত পরিমাণ জমিন গ্রহণ করবে, (কিয়ামতের দিন) তার গলায় সাত তবক জমিন পরিধান করানো হবে।” (সহীহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা :
ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের মধ্যে অন্যতম একটি বর্জনীয় আমল হচ্ছে নিজের আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যে সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের জন্যই লানত আর তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের মন্দ আবাস।” (সূরা রাআদ : ২৫)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “কবিরা গুনাহ হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, পিতা-মাতার নাফরমানি করা, কোন মানবকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা শপথ করা।” (সহিহ আল-বুখারি)

পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া :
আল্লাহর ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার হক আদায় করার ব্যাপারে আল-কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাই পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা ঈমানের পরিপন্থী। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের সর্বাপেক্ষা বড় পাপ সম্পর্কে অবহিত করব না? কথাটি তিনি তিনবার বললেন। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) অবশ্যই আপনি বলে দিন। তিনি বলেন, আল্লাহর সাথে শরিক করা আর পিতা-মাতার নাফরমানি করা।” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

লোকদেখানো আমল করা :
মানুষকে খুশি করার জন্য কোন আমল করা হচ্ছে ঈমানের পরিপন্থি। এ আমল তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতএব সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজেদের সালাতে অমনোযোগী, যারা লোকদেখানোর জন্য তা করে এবং ছোটখাটো গৃহসামগ্রী দান করতে নিষেধ করে।” (সূরা আল-মাউন : ৪-৭)
লোকদেখানো আমলের কুফল সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, “জাহান্নামে এমন একটি প্রান্তর আছে যা থেকে স্বয়ং জাহান্নামই প্রতিদিন চারশত বার পানাহ চায়। এ প্রান্তরটি তৈরি করা হয়েছে উম্মতে মুহাম্মাদির ঐ সব রিয়াকার লোকদের জন্য, যারা আল্লাহর কিতাবের আলিম, দান খয়রাতকারী, আল্লাহর ঘরের হাজী এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী।” (আল-মু’জামুল কুবরা)

অন্যের হক নষ্ট করা ও জুলুম করা :
অন্যের অধিকার নষ্ট করা মস্তবড় অন্যায় কাজ যা মানুষের ঈমান ধ্বংস করে দেয়। এ ধরনের অন্যায়কারীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “রাসূল (সা.) আরাফার সন্ধ্যায় নিজ উম্মতের জন্য দোআ করেন। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এর জবাব আসে, তোমার দো‘আ আমি কবুল করলাম, তোমার উম্মতের পাপ আমি ক্ষমা করে দেব। তবে যারা অন্যের অধিকার হরণ করেছে, তাদের মুক্তি নেই। আমি জালিমের কাছ থেকে মযলুমের অধিকার অবশ্যই আদায় করে দেবো।” (সুনান ইব্ন মাযা)

মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যাবাদীদের সাথে থাকা :
মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যাবাদীদের কাজে সহযোগিতা করা ঈমান বিনষ্টকারী আমলের অন্যতম। কারণ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সত্যবাদীদের সাথে থাকতে এবং মিথ্যা পরিহার করতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।” (সূরা আত-তাওবা : ১১৯)
মিথ্যার পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, “মিথ্যা পাপের পথ দেখায় আর পাপ দোজখের আগুনের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যার অনুসরণ করতে করতে অবশেষে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী নামে লিপিবদ্ধ হয়।” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

দ্বীনের মধ্যে নতুন বিষয়ের উদ্ভাবন করা :
ঈমান বিনষ্টকারী বর্জনীয় আর একটি আমল হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করা বা বিদাআত করা। আল্লাহ তাআলা বিদআত করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিয়ে আমাদেরকে বলেন, “আর এটি তো আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।” (সূরা আল-আনআম : ১৫৩)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু ঢুকিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করছি। কারণ খারাপ বিষয় হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি করা। আর দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে বিদাআত, আর প্রত্যেক বিদাআত হচ্ছে ভ্রষ্টতা।” (সুনান ইব্ন মাযা)

অত্যাচারীকে সাহায্য করা :
অত্যাচারীকে সাহায্য করা ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের অন্যতম। কারণ ইসলামে অত্যাচারীকে সাহায্য করার কোন সুযোগ দেয়া হয়নি। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জেনে শুনে কোন অত্যাচারীকে সাহায্য করে শক্তি জোগাবে, সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।” (বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান)

ধার-কর্জ নেয়া জিনিস ফেরত না দেয়া :
ধার-কর্জ নেয়া জিনিস ফেরত না দেয়া ঈমানের পরিপন্থি আমলের অন্যতম। কারণ রাসূল (সা.) কোন জিনিস কর্জ নিয়ে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, “ধারে নেয়া জিনিস, দুধ খাওয়ার জন্য প্রদত্ত জন্তু ও ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। আর যে ব্যক্তি কারো জামিন হবে তাকে তার জামানত অবশ্যই ফেরত দিতে হবে।” (সুনান আবু দাউদ)

উত্তরাধিকারীকে প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা :
উত্তরাধিকারীকে তার প্রাপ্য ওয়ারিশ থেকে বঞ্চিত করা বড় ধরনের অন্যায় কাজ। আর যে ব্যক্তি উত্তরাধিকারীর হক হঞ্চিত করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে জান্নাতের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার উত্তরাধিকারীকে প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন।” (সুনান ইব্ন মাযা)

সুদ ও ঘুষ খাওয়া :
সুদ ও ঘুষ খাওয়া ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমল। এ কাজ আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার শামিল। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মু’মিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না কর তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও।” (সূরা আল-বাকারা : ২৭৮-২৭৯)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “হে মু’মিনগণ, তোমরা বহুগুণ বৃদ্ধি করে সুদ খাবে না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও।” (সূরা আলে-ইমরান : ১৩০)
সুদ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “যে সুদ খায়, যে খাওয়ায়, যে ব্যক্তি সুদের সাক্ষী হয় এবং যে ব্যক্তি এতদসংক্রান্ত বিবরণ কাগজেপত্রে লিপিবদ্ধ করে, তাদের সকলকে রাসূল (সা.) অভিসম্পাত করেছেন।” (সুনান ইব্ন মাযা)
ঘুষ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “ঘুষখোর ও ঘুষদাতা উভয়ের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।” (সুনান ইব্ন মাযা)

প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া :
প্রতিবেশীকে আচরণ ও কথার মাধ্যমে কষ্ট দেয়া ঈমান বিনষ্টকারী একটি খারাপ আমল। যদি কেউ ভালো আমল করে অথচ প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় সে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “একজন ব্যক্তি রাসূল (সা.) কে বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), অমুক মহিলা প্রচুর নফল নামায, রোযা ও সদকার জন্য প্রসিদ্ধ, কিন্তু প্রতিবেশীকে কটু কথা বলার মাধ্যমে কষ্ট দেয়। রাসূল (সা.) বললেন, সে জাহান্নামে যাবে। লোকটি আবার বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), অমুক মহিলা সম্পর্কে খ্যাতি রয়েছে যে, সে খুবই কম নফল নামায, রোযা ও সদকা করে এবং দু-একটা টুকরো সদকা করে থাকে। কিন্তু নিজের জিহবা দিয়ে কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসূল (সা.) বললেন, সে জান্নাতে যাবে।” (মুসনাদ আহমদ)

অসৎ পথে ব্যবসা করা :
আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন তবে সে ব্যবসা সৎ পথে হতে হবে। অসৎ পথে ব্যবসা করার পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “একমাত্র তাকওয়া ও সততা অবলম্বনকারী এবং সত্যবাদী ব্যতীত সকল ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন পাপী ও বদকার হিসেবে উত্থিত হবে।” (সুনান আত-তিরমিযি, সুনান ইবনে মাজা)

মাপ ও ওজনে কম দেয়া :
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে ওজন প্রতিষ্ঠা কর এবং ওজনকৃত বস্তু কম দিও না।” (সূরা আর-রাহমান-৯) কাজেই ওজনে কম দেয়া হচ্ছে অন্যতম একটা খারাপ আমল যা মানুষের ঈমান বিনষ্ট করে দেয়। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “রাসূল (সা.) মাপ ও ওজনের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয়কারী ব্যবসায়ীদেরকে সম্বোধন করে বললেন, তোমরা এমন দুটো কাজের দায়িত্ব পেয়েছো, যার কারণে তোমাদের পূর্বে অতিবাহিত জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।” (সুনান আত-তিরমিযি)
মজুদদারি করা :
মজুদদারি করে বাজারে মালের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা ঈমান বিনষ্টকারী খারাপ আমল। এর মাধ্যমে মানুষের অধিকার নষ্ট হয় বিধায় ইসলামে এটাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যথাসময়ে বাজারে সরবরাহ করে সে আল্লাহর রহমত ও অধিকতর জীবিকা লাভের যোগ্য। আর যে ব্যক্তি মজুদদারিতে লিপ্ত সে অভিশপ্ত।” (সুনান ইব্ন মাযা)

মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ করা :
সমাজের মানুষ যে রাস্তা দিয়ে চলাচল করে সে পথ বন্ধ করে দেয়া ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত সাহাল ইব্ন মুয়ায ইব্ন আনাস আল জুহানি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আমরা রাসূল (সা.) এর সাথে কোন এক যুদ্ধে গিয়েছিলাম। আমাদের সাথীরা এমন গাদাগাদি করে অবস্থান করতে লাগলো যে, চলাচলের রাস্তাই বন্ধ হয়ে গেলো। রাসূল (সা.) একজন ঘোষণাকারী পাঠিয়ে ঘোষণা করিয়ে দিলেন যে, যে ব্যক্তি অবস্থানস্থলকে সঙ্কীর্ণ করে দেবে বা চলাচলের পথ বন্ধ করে দেবে, সে জিহাদের সওয়াব পাবে না।” (সুনান আবু দাউদ)

দান করে খোঁটা দেয়া এবং লোকদেখানো দান করা :
ইসলামে নিঃস্বার্থভাবে দান করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা দান করে খোঁটা দেয়া এবং লোকদেখানো আমল করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, “হে মু’মিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি।” (সূরা আল-বাকারা : ২৬৪)

অন্যের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা ও দোষ অন্বেষণ করা :
মুমিনজীবনের আমল বিনষ্ট হওয়ার অন্যতম একটি খারাপ আমল হচ্ছে একজন মুসলিম অন্য মুসলিমের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা এবং দোষ অন্বেষণ করা। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না, কেননা খারাপ ধারণার ভিত্তিতে যে কথা বলা হবে, তা হবে সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। অন্যদের সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধান করে বেড়িও না, গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত হয়ো না, দালালি করো না, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করো না। আল্লাহর বান্দা হয়ে থাক, পরস্পরে ভাই ভাই হয়ে জীবন-যাপন কর।” (সহিহ আল-বুখারি)

একে অন্যের গিবত করা :
একজন অন্য জনের গিবত করা ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমলের অন্যতম যা মানুষের ঈমানকে নিঃশেষ করে দেয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন“হে মু’মিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।” (সূরা আল-হুজুরাত : ১২)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, “যখন আমার প্রভু আমাকে (মি’রাজের রাত্রে) আকাশে নিয়ে গেলেন, তখন আমি সেখানে এমন কিছু লোককে দেখতে পেলাম, যাদের নখ পিতলের তৈরি এবং তা দিয়ে তারা নিজেদের বুক ও মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করছিলো। আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জিবরাইল বললো, এরা দুনিয়ায় অন্য লোকের গোশত খেত এবং তাদের মান-সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলতো।” (সুনান আবু দাউদ ও মুসনাদ আহমদ)

অহঙ্কার করা :
অহঙ্কার করা ঈমান বিনষ্টকারী একটি বর্জনীয় আমল। অহঙ্কার করে দুনিয়ায় চলাফেরা করতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে নিষেধ করেছেন। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “আর জমিনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো জমিনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান পৌঁছতে পারবে না।” (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৭)
আল্লাহ আরো বলেন, “হে জিন ও মানবজাতি, যদি তোমরা আসমানসমূহ ও জমিনের সীমানা থেকে বের হতে পার, তাহলে বের হও। কিন্তু তোমরা তো (আল্লাহর দেয়া) শক্তি ছাড়া বের হতে পারবে না।” (সূরা আর-রাহমান- ৩৩)
অহঙ্কারের পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে কণা পরিমাণও অহঙ্কার থাকবে, সে বেহেশতে যেতে পারবে না। এক ব্যক্তি বললো, মানুষতো চায়, তার কাপড় ভালো হোক, জুতা ভালো হোক। (এটাও কি অহঙ্কার বলে গণ্য হবে?) রাসূল (সা.) বললেন, আল্লাহ সুন্দর ও পবিত্র। তিনি সৌন্দর্য, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে পছন্দ করেন। অহঙ্কার হলো আল্লাহর ইবাদত যথাযথভাবে না করা এবং তাঁর বান্দাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।” (সহীহ মুসলিম)

জীব-জন্তুর মধ্যে লড়াই বাধিয়ে দেয়া :
জীব-জন্তুর মধ্যে লড়াই বাধিয়ে দেয়া ইসলামে জায়েজ নেই। বরং এর থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত ইব্ন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) জীব-জন্তুর মধ্যে লড়াই বাধাতে নিষেধ করেছেন।” (সুনান আবু দাউদ ও তিরমিযি)

অপচয় ও অপব্যয় করা :
অপচয় ও অপব্যয় করা শয়তানের কাজ। তাই কোন মুমিনের উচিত নয় অপচয় ও অপব্যয় করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর আত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকেও। আর কোনোভাবেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।” (সূরা বনি ইসরাইল : ২৬-২৭)
এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত ইব্ন আব্বাস (রা.) বলেন, যা ইচ্ছা খাও, যা খুশি পর, কেবল অপচয়-অপব্যয় ও অহঙ্কার বর্জন করা চাই।” (সহিহ আল-বুখারি)

অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা :
অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা ঈমান ধ্বংসকারী সবচেয়ে বড় অপরাধ। আল-কুরআনে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করাকে একটা জাতিকে হত্যা করার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া যে কাউকে হত্যা করলো, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করলো। আর যে তাকে বাঁচালো, সে যেন সব মানুষকে বাঁচালো।” (সূরা আল-মায়িদা : ৩২)
উপরোল্লেখিত খারাপ আমল ছাড়াও আরো অনেক ঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমল রয়েছে যার বর্ণনা পরবর্তী পর্বে পেশ করব ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ পরিত্যাগ করা :
আল্লাহর এই পৃথিবীতে তাঁর প্রেরিত জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য জিহাদ (সকল প্রকার চেষ্টা-প্রচেষ্টা) করা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরজ। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তোমরা আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনবে এবং তোমরা তোমাদের ধন-সম্পদ ও জীবন দিয়ে আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যদি তোমরা জানতে।” (সূরা আস-সাফ : ১১)
আল-হাদিসে জিহাদ পরিত্যাগকারীকে মুনাফিকের সাথে তুলনা করা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি জিহাদে শরিক হলো না, কিংবা জিহাদ সম্পর্কে কোন চিন্তা-ভাবনাও করলো না; আর এ অবস্থায় সে মারা গেল, সে যেন মুনাফিকের মৃত্যু বরণ করল। (সহিহ মুসলিম)
জিহাদ পরিত্যাগ করার খারাপ পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যেসব লোক জিহাদ ত্যাগ করবে, আল্লাহ সেই লোকদের ওপর আজাব চাপিয়ে দেবেন।” (আল-মু’জামুল আওসাত )

মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া :
ইসলামে কোন অবস্থাতেই মিথ্যা বলা ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া জায়েয নেই। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, “মিথ্যা বলা কোন অবস্থাতেই বৈধ নয়। স্বাভাবিকভাবেও নয়, হাসি-ঠাট্টাচ্ছলেও নয়। অনুরূপভাবে তোমাদের কেউ তার শিশু সন্তানকে কিছু দেয়ার ওয়াদা করলো, কিন্তু সে তা পূরণ করলো না, এটাও জায়েয নয়।” (ইমাম বুখারি, আদাবুল মুফরাদ)
এ সম্পর্কে আল-হাদিসে আরো বর্ণিত হয়েছে, “হযরত সুফিয়ান ইব্ন আসিদ হাদরামী (রা.) বলেন, আমি রাসূল (সা.)কে বলতে শুনেছি যে, এটা অত্যন্ত জঘন্য ধরনের খেয়ানত তথা বিশ্বাসঘাতকতা যে, তুমি তোমার ভাইকে একটা কথা বলেছো এবং সে তোমাকে সত্যবাদী মনে করে তা বিশ্বাস করেছে। অথচ তুমি যে কথাটা তাকে বলেছো তা মিথ্যা ছিলো।” (সুনান আবু দাউদ)
মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “রাসূল (সা.) ফজরের নামাযে সমবেত মুসল্লিদের দিকে ঘুরে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন এবং তিনবার বললেন, মিথ্যা সাক্ষ্য দান ও আল্লাহর সাথে শিরক করা সমান গুনাহ। তারপর তিনি (সূরা হজ্জের ৩০ নং) আয়াত পড়লেন, “সুতরাং মূর্তিপূজার অপবিত্রতা থেকে বিরত থাক এবং মিথ্যা কথা পরিহার কর।” (সুনান আবু দাউদ)

অশ্লীল কথা বলা ও কটূক্তি করা :
অশ্লীল কথা বলা ও কাউকে কটূক্তি করা ঈমানের পরিপন্থি অসৎ আমল। তাই এর থেকে মুমিনদেরকে বিরত থাকতে হবে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “মুমিনের দাঁড়িপাল্লায় কিয়ামতের দিন সবচেয়ে ভারী যে জিনিসটি রাখা হবে, তা হচ্ছে তার সৎ চরিত্র। আর আল্লাহ সেই ব্যক্তিকে খুবই ঘৃণা করেন যে জিহবা দিয়ে অশ্লীল, অশালীন ও অশ্রাব্য কথা উচ্চারণ করে এবং কটূক্তি করে।” (সুনান আত-তিরমিযি )

দু’মুখো নীতি বা কপটাচার করা :
দু’মুখো নীতি অবলম্বনকারী কিয়ামতের দিন অপরাধীদের সাথে নিকৃষ্ট অবস্থায় উঠবে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমরা কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তিকে সবচেয়ে নিকৃষ্ট পাবে যে, দুনিয়ায় দু’মুখো আচরণ করতো। কিছু লোকের সাথে এক ধরনের মুখ নিয়ে মেলামেশা করতো। আর অপর কিছু লোকের সাথে আর এক ধরনের মুখ নিয়ে সাক্ষাৎ করতো।” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

অন্যায় কাজে সাহায্য করা :
অন্যায় কাজে সহযোগিতা করা ঈমান বিনষ্টকারী খারাপ আমল। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি নিজ গোত্র বা জাতিকে অন্যায় কাজে সাহায্য করে, সে ঐ ব্যক্তির মত, যে কুয়ায় পড়ে যাচ্ছে এমন উটের লেজ আঁকড়ে ধরে রেখে। ফলে উটের সাথে সাথে নিজেও কুয়ায় পড়ে যায়।” (সুনান আবু দাউদ)

ফাসেকের প্রশংসা করা :
কোন ফাসেক ব্যক্তির প্রশংসা করা অন্যায়, কারণ এতে আল্লাহ ক্রুদ্ধ হন। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যখন কোন ফাসেকের প্রশংসা করা হয়, তখন আল্লাহ ক্রুদ্ধ হন এবং সে কারণে আল্লাহর আরশ কাঁপতে থাকে।” (বাইহাকি শুয়াবুল ঈমান )

ধোঁকাবাজি করা :
ঈমান বিনষ্টকারী অন্যতম একটি আমল হচ্ছে কারো সাথে ধোঁকাবাজি করা। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “আদ্দা ইবনে খালিদ ইবনে হাওযা (রা.) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) আমার কাছে পাঠানো এক পত্রে লিখেন, আদ্দা ইবনে খালিদ ইবনে হাওযা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মদের (সা.) নিকট থেকে একটি দাস বা দাসী ক্রয় করে, যার মধ্যে না কোনো নৈতিক খারাপি আছে, না খিয়ানত আছে। এটা এক মুসলমানের ক্রয় বিক্রয়। এতে কোনো রকমের ধোঁকাবাজি নেই।” (সুনান আত-তিরমিযি )

কাউকে ভেঙানো বা ভেঙচি দেয়া :
কাউকে ভেঙচি দেয়া ও ভেঙানো ঈমানের বৈসাদৃশ্যমুলক আমলের অন্যতম। এ কাজ থেকে বিরত থাকতে রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমি কাউকে ভেঙচি দেয়া পছন্দ করি না। চাই তার পরিবর্তে আমি যতই ধন-সম্পদ পেয়ে যাই না কেন।” (সুনান আত-তিরমিযি ও মুসনাদ আহমদ)

অন্যের বিপদে খুশি হওয়া :
অন্যের বিপদে খুশি হওয়াও বদ আমলের মধ্যে অন্যতম আমল। এর পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “তুমি নিজের ভাই এর বিপদে আনন্দ প্রকাশ করো না। যদি কর, তাহলে আল্লাহ তার উপর অনুগ্রহ করবেন (বিপদ দূর করে দেবেন) এবং তোমাকে বিপদে ফেলবেন।” (সুনান আত-তিরমিযি )

হাসি তামাশা ও ঝগড়া বিবাদ করা :
হাসি তামাশা করা ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে। হযরত আবু যার (রা.) কে উপদেশ দিতে গিয়ে রাসূল (সা.) বলেন, “তুমি অধিক হাসি থেকে বিরত থাকবে। কারণ এটা তোমার অন্তরকে মেরে ফেলবে এবং তোমার মুখের উজ্জ্বলতাকে নষ্ট করে দিবে। (বাইহাকি, শুয়াবুল ঈমান)
ঝগড়া-বিবাদ করাও ইসলামে নিষেধ, যা ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে দেয়। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমার ভাই এর সাথে হাসি তামাশা ও বিতর্ক করো না। তার সাথে ওয়াদা করার পর ওয়াদার খেলাপ করো না।” (সুনান আত-তিরমিযি)

হিংসা ও বিদ্বেষ করা :
কারো প্রতি হিংসা করা ও বিদ্বেষ করা ইসলামে নিষেধ। হিংসা-বিদ্বেষের মাধ্যেমে মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়, এজন্য হিংসা-বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকার জন্য নির্দেশ দিয়ে রাসূল (সা.) বলেছেন, “হিংসা বিদ্বেষ থেকে নিজেকে বাঁচাও। কেননা আগুন যেভাবে কাষ্ঠকে জ্বালিয়ে ভস্ম করে, হিংসা সেভাবে সৎ কাজগুলোকে জ্বালিয়ে ছারখার করে দেয়।” (সুনান আবু দাউদ)

ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া :
ব্যভিচার জঘন্য অপরাধ তাই আল্লাহ তাআলা ব্যভিচারের নিকটবর্তী হতে নিষেধ করেছেন। এ সম্পর্কে আল কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “তোমরা জেনার নিকটবর্তীও হয়ো না, কারণ এটা খুবই খারাপ কাজ এবং অতীব নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা বনি ইসরাইল-৩২)
মুমিন ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার সময় মুমিন থাকে না। এ সম্পর্কে নবী (সা.) বলেন, “ব্যভিচারী পরিপূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় ব্যভিচারে লিপ্ত হয় না, চোর পরিপূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় চুরি করে না এবং মদ্যপায়ী পরিপূর্ণ ঈমানদার অবস্থায় মদ পান করে না।” (সহিহ আল-বুখারী ও সহিহ মুসলিম)

জোর করে নারীদের উত্তরাধিকার হওয়া :
আল-কুরআনের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাই জোর করে কোন নারীর উত্তরাধিকার হয়ে বসা ইসলাম সমর্থন করে না বরং এটা অন্যায় কাজ। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে মু’মিনগণ, তোমাদের জন্য হালাল নয় যে, তোমরা জোর করে নারীদের মালিক হবে। আর তোমরা তাদেরকে আবদ্ধ করে রেখো না, তাদেরকে যা দিয়েছ তা থেকে তোমরা কিছু নিয়ে নেয়ার জন্য, তবে যদি তারা প্রকাশ্য অশ্লীলতায় লিপ্ত হয়। আর তোমরা তাদের সাথে সৎভাবে বসবাস কর। আর যদি তোমরা তাদেরকে অপছন্দ কর, তবে এমনও হতে পারে যে, তোমরা কোন কিছুকে অপছন্দ করছ আর আল্লাহ তাতে অনেক কল্যাণ রাখবেন।” (সূরা আন-নিসা : ১৯)
কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করা ও তাদের আনুগত্য করা :
কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব করা ও তাদের আনুগত্য করা ঈমানের পরিপন্থি কাজ। আল্লাহ তাআলা এ দুটো কাজ থেকে মুমনিদের বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “মু’মিনরা যেন মু’মিনদের ছাড়া কাফিরদেরকে বন্ধু না বানায়। আর যে কেউ এরূপ করবে, আল্লাহর সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই।” (সূরা আলে ইমরান : ২৮)
কাফিরদের আনুগত্য করার পরিণাম সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “হে মু’মিনগণ, যদি তোমরা কাফিরদের আনুগত্য কর, তারা তোমাদেরকে তোমাদের পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। ফলে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ফিরে যাবে।” (সূরা আলে ইমরান : ১৪৯)

ইয়াতিম ও মিসকিনের সাথে খারাপ আচরণ করা :
ইয়াতিম ও মিসকিনদের সাথে খারাপ আচরণ করা ঈমানের পরিপন্থি কাজ, কারণ আল্লাহ তাআলা তাদের সাথে খারাপ আচরণ করতে নিষেধ করেছেন। স্বয়ং রাসূলকে (সা.) উপদেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, “সুতরাং তুমি ইয়াতিমের প্রতি কঠোর হয়ো না। আর ভিক্ষুককে তুমি ধমক দিও না।” (সূরা আদ-দুহা : ৯-১০)
আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন, “তুমি কি তাকে দেখেছ, যে হিসাবÑপ্রতিদানকে অস্বীকার করে? সেই ইয়াতিমকে কঠোরভাবে তাড়িয়ে দেয়, আর মিসকিনকে খাদ্য দানে উৎসাহ দেয় না।” (সূরা আল-মাউন : ১-৩)

হালাল বস্তুকে হারাম করা করা :
হালাল বস্তুকে হারাম করা মুমিনের জন্য জায়েয নেই। আল্লাহ তাআলা এটাকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ বলেন, “ হে মু’মিনগণ, আল্লাহ যেসব পবিত্র বস্তু তোমাদের জন্য হালাল করেছেন, তোমরা তা হারাম করো না এবং তোমরা সীমালঙ্ঘন করো না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরা আল-মায়েদা : ৮৭)

সোনা-রূপা পুঞ্জীভূত করা এবং আল্লাহর পথে খরচ না করা:
সোনা-রূপা পুঞ্জীভূত করা এবং আল্লাহর পথে খরচ না করা ঈমান বিনষ্টকারী আমল। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয় পণ্ডিত ও সংসার বিরাগীদের অনেকেই মানুষের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে, আর তারা আল্লাহর পথে বাধা দেয় এবং যারা সোনা ও রূপা পুঞ্জীভূত করে রাখে, আর তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করে না, তুমি তাদের বেদনাদায়ক আজাবের সুসংবাদ দাও।” (সূরা আত-তাওবা : ৩৪)

পর্দার বিধান মেনে না চলা :
পর্দার বিধান মেনে চলা আল্লাহর নির্ধারিত ফরজ। এটা পরিহার করা ঈমানের পরিপন্থি। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে (সা.) উদ্দেশ করে বলেন, “মু’মিন পুরুষদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাজত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় তারা যা করে সে সম্পর্কে আল্লাহ সম্যক অবহিত। আর মু’মিন নারীদেরকে বল, তারা তাদের দৃষ্টিকে সংযত রাখবে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হিফাযত করবে। আর যা সাধারণত প্রকাশ পায় তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য তারা প্রকাশ করবে না।” (সূরা আন-নূর : ৩০-৩১)
মানুষের বাড়িতে প্রবেশের বিধান সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “হে মু’মিনগণ, তোমরা নিজেদের গৃহ ছাড়া অন্য কারও গৃহে প্রবেশ করো না, যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নেবে এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম দেবে। এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” (সূরা আন-নূর : ২৭)

কৃপণতা করা :
কৃপণতা করা ঈমানের পরিপন্থি কাজ, তাই কোন মুমিন কৃপণ হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা কৃপণতা পরিহার করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, “আর তুমি তোমার হাত তোমার ঘাড়ে আবদ্ধ রেখো না এবং তা পুরোপুরি প্রসারিত করো না (একেবারে কৃপণও হয়ো না, আবার একেবারে ধন-সম্পদ উজাড় করেও দিও না ), তাহলে তুমি নিন্দিত ও নিঃস্ব হয়ে বসে পড়বে।” (সূরা বনি ইসরাঈল :২৯)
এ সম্পর্কে আল্লাহ আরো বলেন, “আর যে কার্পণ্য করেছে এবং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করেছে, আর উত্তমকে মিথ্যা বলে মনে করেছে, আমি তার জন্য কঠিন পথে চলা সুগম করে দেব। আর তার সম্পদ তার কোন কাজে আসবে না, যখন সে অধঃপতিত হবে।” (সূরা আল-লাইল : ৮-১১)
কৃপণতা ও ঈমান কখনো একসাথে থাকতে পারে না। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “কৃপণতা ও ঈমান কোন বান্দাহর অন্তরে কখনো একত্রে থাকতে পারে না।” (জারির আত-তাবারী, তাহযিবুল আছার ওয়া তাফসিলিস-সাবিত আন-রাসূলিল্লাহি মিনাল আখবার )
রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, “জুলুম করা থেকে বিরত থাক। কারণ, জুলুম ও অত্যাচার কিয়ামতের দিন অন্ধকারে পরিণত হবে। আর কৃপণতা থেকে দূরে থাকো। কারণ, কৃপণতা ও সংকীর্ণতাই তোমাদের পূর্ববর্তীদের ধ্বংস করে দিয়েছে। এ কৃপণতাই তাদের নিজেদের রক্তপাত করতে ও হারামকে হালাল করতে উদ্বুদ্ধ করেছিলো।” (সহিহ মুসলিম )

সন্দেহ ও সংশয় নিয়ে আমল করা :
সন্দেহ ও সংশয় নিয়ে কোন আমল করা ঈমানের পরিপন্থি। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যাতে তোমার সংশয় হয় তা পরিত্যাগ করো; যাতে সংশয় নেই তা অবলম্বন করো। সততা ও সরলতা হলো স্বস্তির কারণ, আর মিথ্যা ও অসত্য কথা মনে সংশয় সৃষ্টি করে।” (সুনান আত-তিরমিযি )

মদ খাওয়া, জুয়া খেলা, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারণী লটারিকে বিশ্বাস করা :
মদ খাওয়া, জুয়া খেলা, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারণী লটারিকে বিশ্বাস করা ঈমান ধ্বংসকারী আমলের অন্যতম। তাই আল্লাহ তাআলা এটা মুমিনদেরকে পরিহার করতে বলেছেন। আল্লাহর কিতাবে বর্ণিত হয়েছে, “হে মু’মিনগণ, নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা-বেদি ও ভাগ্যনির্ধারক তীরসমূহ তো নাপাক শয়তানের কর্ম। সুতরাং তোমরা তা পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হও। শয়তান শুধু মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চার করতে চায়। আর (চায়) আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে তোমাদের বাধা দিতে। অতএব, তোমরা কি বিরত হবে না?” (সূরা আল-মায়েদা : ৯০-৯১)

গায়রুল্লাহর নামে জবেহ করা পশুর গোশত ভক্ষণ করা :
গায়রুল্লাহর নামে জবেহ করা পশুর গোশত ভক্ষণ করা আল্লাহ তাআলা মুমিনদের জন্য হারাম করে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় তিনি তোমাদের ওপর হারাম করেছেন মৃত জন্তু, রক্ত, শূকরের গোশ্ত এবং যা গায়রুল্লাহর নামে জবেহ করা হয়েছে। সুতরাং যে বাধ্য হবে অবাধ্য বা সীমালঙ্ঘনকারী না হয়ে, তাহলে তার কোন পাপ নেই। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আল-বাকারা : ১৭২)

কথা ও কাজের গরমিল করা :
কথা ও কাজে গরমিল করা ঈমান বিনষ্টকারী আমলের অন্যতম। এর থেকে মুমিনদেরকে বেঁচে থাকার নির্দেশ দিয়ে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা তা কেন বলো, যা তোমরা কর না? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর নিকট বড়ই ক্রোধের বিষয়।” (সূরা আস-সাফ : ২-৩)

বিলাসিতা করা :
বিলাসিতা করা ও ভোগবিলাসে মত্ত হওয়া কোন মুমিনের কাজ নয়। রাসূল (সা.) বিলাসিতা থেকে বিরত থাকার জন্য মুমিনদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন। আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত মুয়ায বিন জাবাল (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) যখন তাকে ইয়েমেনের বিচারক বা শাসক নিয়োগ করে পাঠালেন, তখন তাকে বললেন, হে মুয়ায! বিলাসী ও ভোগবাদী জীবন-যাপন করো না। কেননা আল্লাহর বান্দারা বিলাসী জীবন-যাপন করে না।” (মুসনাদ আহমদ)

দুনিয়ায় লোভ লালসা করা :
দুনিয়ার জীবনে লোভ-লালসা করা ঈমানের পরিপন্থি কাজ। এর মাধ্যমে মানুষের ঈমানের ক্ষতি সাধন হয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “হে মানুষ, নিশ্চয় আল্লাহর ওয়াদা সত্য; অতএব দুনিয়ার জীবন যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রতারিত না করে; আর বড় প্রতারক (শয়তান) যেন তোমাদেরকে আল্লাহর ব্যাপারে প্রতারণা না করে।” (সূরা ফাতির : ৫)
রাসূল (সা.) বলেছেন, “দুনিয়াটা একটা শ্যামল সবুজ সুমিষ্ট বস্তু। মহান আল্লাহ তোমাদের প্রতিনিধি বানিয়ে পাঠিয়েছেন এবং তোমরা কি করছো, না করছো তা দেখছেন। সুতরাং এ দুনিয়ার (লোভ-লালসা থেকে) আত্মরক্ষা করো এবং স্ত্রীলোকের (ফিত্রা) সম্পর্কেও সতর্ক থাক।” (সহিহ মুসলিম )

একজনের ত্রুটি অন্যের নিকটে বলা :
একজনের ত্রুটি অন্যের নিকটে বলা ইসলামে বৈধ নেই বরং এটা বড় গুনাহ যা মুমিনের ঈমান বিনষ্ট করে দেয়। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমার সাহাবীদের কেউ যেনো অপর সাহাবীর কোনো ত্রুটি আমাকে না বলে। আমি তোমাদের সাথে স্বচ্ছ ও পরিষ্কার অন্তরে সাক্ষাৎ করতে পছন্দ করি।” (সুনান আবু দাউদ)

অধীনস্থদের ওপর অত্যাচার করা ও তাদের চাহিদা পূরণ না করা:
অধীনস্থদের ওপরে অত্যাচার করা ও তাদের চাহিদা পূরণ না করা ঈমান ধ্বংসকারী একটি আমল। রাসূল (সা.) এ কাজ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত আয়েয ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি আবদুল্লাহ ইবন্ যিয়াদের নিকট গিয়ে বললেন, হে বৎস! রাসূলুল্লাহ (সা.) কে আমি বলতে শুনেছি, নিকৃষ্টতম শাসক হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যে তার প্রজাদের ওপর কঠোর ও অত্যাচারমূলক নীতি অবলম্বন করে। কাজেই তোমরা সতর্ক থাকবে যেন তাদের অন্তর্ভুক্ত না হয়ে পড়ো।” (সহিহ মুসলিম)
এ কাজের পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যাকে আল্লাহ মুসলমানদের কোনো কাজের শাসক ও তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন আর সে তাদের প্রয়োজন, চাহিদা ও দরিদ্রাবস্থা দূর করার প্রতি এতটুকু ভ্রুক্ষেপ না করে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার প্রয়োজন, চাহিদা ও অভাব পূরণের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করবেন না।” (সুনান আবু দাউদ)

ভালো কাজের অভ্যাস পরিত্যাগ করা :
মুমিন জীবনে যে ভালো কাজের অভ্যাস ছিলো সেটা পরিত্যাগ করা উচিত নয়। কারণ আল্লাহ তাআলা ভালো কাজকে সংরক্ষণ করতে বলেছেন। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “আর তোমরা সে নারীর মত হয়ো না, যে তার পাকানো সুতো শক্ত করে পাকানোর পর টুকরো টুকরো করে ফেলে।” (সুরা আন-নাহল : ৯২)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “হে আবদুল্লাহ! অমুক ব্যক্তির মত হয়ো না যে নিয়মিত রাত্রি জাগরণ করতো (অর্থাৎ তাহাজ্জুতের নামাজ পড়তো) কিন্তু পরে রাত্রি জাগরণ ছেড়ে দিয়েছে।” (সহিহ আল-বুখারি)

বিপদে পড়ে মৃত্যু কামনা করা :
বিপদে পতিত হয়ে মৃত্যু কামনা করা কোন মুমিনের জন্য জায়েয নেই, কারণ রাসূল (সা.) এটা নিষেধ করে দিয়েছেন। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের কেউ যেন বিপদে পতিত হয়ে মৃত্যু কামনা না করে। কিছু বলতে যদি সে একান্ত বাধ্যই হয়ে পড়ে তাহলে যেন (এরূপ) বলে, হে আল্লাহ! আমাকে ঐ সময় পর্যন্ত জীবিত রাখ, যতক্ষণ পর্যন্ত আমার জীবন আমার জন্য কল্যাণকর হয়। আমাকে মৃত্যু দান কর যখন আমার মৃত্যু কল্যাণকর হয়।” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

পাঁচটি নিকৃষ্ট কাজ করা :
এমন পাঁচটি নিকৃষ্ট কাজ থেকে মুহাজিরকে বিরত থাকতে রাসূল (সা.) নসিহত করেছেন যার মাধ্যমে মুমিনের ঈমান বিনষ্ট হয়ে যায় এবং মুসলিম সমাজে নানা ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “হে মুহাজিরগণ! পাঁচটি মন্দ কাজ এমন আছে যেগুলোতে জড়িয়ে পড়লে তোমাদের পরিণাম খুব খারাপ হবে। আমি আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাচ্ছি যেন এই পাঁচটি মন্দ কাজ তোমাদের মধ্যে জন্ম না নেয়। সেগুলো হলো:
১. ব্যভিচার করা : এ পাপ যদি কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তাদের মধ্যে এমন এমন রোগ দেখা দেবে যা আগে ছিলো না।
২. মাপ ও ওজনে কম করা : এ মন্দ কাজ যদি কোন জাতির মধ্যে জন্ম নেয়, তবে আল্লাহ তাদের ওপর দুর্ভিক্ষ ও অনাবৃষ্টি চাপিয়ে দেন এবং তারা অত্যাচারী শাসকের শিকারে পরিণত হয়।
৩. জাকাত না দেয়া : এ মন্দ কাজ যাদের মধ্যে দেখা দেয়, তাদের ওপর আকাশ থেকে বৃষ্টি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আর ঐ অঞ্চলে যদি পশু-পাখি না থাকে তবে আদৌ বৃষ্টি হয় না।
৪. আল্লাহ ও রাসূলের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা : এ মন্দ কাজ যখন কোথাও দেখা দেয়, তখন আল্লাহ তাদের ওপর অমুসলিম শত্রুদের চাপিয়ে দেন যারা তাদের অনেক কিছু কেড়ে নিয়ে যায়।
৫. যদি মুসলমান শাসক আল্লাহর কিতাব অনুযায়ী শাসন না করে : তাহলে আল্লাহ মুসলিম সমাজে ভাঙন সৃষ্টি করে দেন এবং তারা পরস্পরের সাথে লড়াই ও খুন-খারাবি করতে শুরু করে দেয়। (সুনান ইব্ন মাযা )

সাতটি মহা-পাপকাজে লিপ্ত থাকা :
সাতটি ধ্বংসকর মহা-পাপকাজ থেকে বিরত থাকার জন্য রাসূল (সা.) এরশাদ করেন, “সাতটি ধ্বংসকর কাজ থেকে বাঁচো। লোকেরা জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) সে পাপগুলো কী কী? তিনি জবাব দিলেন, ১. আল্লাহর সাথে শরিক করা, ২. জাদু শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেয়া, ৩. অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা, ৪. সুদ খাওয়া, ৫. এতিমের মাল আত্মসাৎ করা, ৬. জিহাদের ময়দান থেকে পলায়ন করা, ৭. কোন সতীসাধ্বী মহিলার প্রতি অপবাদ দেয়া।” (সহিহ আল-বুখারি)
এ ছাড়া আরো মহা-পাপের বর্ণনা অন্যত্র পাওয়া যায়, ৮. মুসলমান পিতা-মাতার হক আদায় না করা এবং ৯. আল্লাহর ঘরের অসম্মান করা। যে দিকে মুখ করে তোমরা নামায পড় এবং কবরে যেদিকে মুখ করে তোমাদের দাফন করা হয়। যে ব্যক্তি এসব বড় বড় পাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে পারবে, সঠিকভাবে নামায আদায় করবে, যাকাত দেবে সে অবশ্যই রাসূল (সা.) এর সাথে প্রশস্ত, বিস্তীর্ণ ও সোনার দ্বারবিশিষ্ট জান্নাতের মধ্যে বসবাস করবে।” (শরহে মুশকিল আল-আসার ও মু’জামুল কাবির )
উপরোল্লেখিত আমলগুলো ছাড়াও আরো কিছু খারাপ আমল রয়েছে যা মুমিনের ঈমান বিনষ্ট করে দেয়। এসকল খারাপ আমলগুলো বিবেক-বুদ্ধির কষ্টিপাথরে যাচাই করে পরিত্যাগ করা অপরিহার্য।
পরিশেষে বলা যায়, একজন মু’মিনের উচিত পরকালীন কল্যাণ ও সাফল্যের জন্য ঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলগুলো পরিত্যাগ করা এবং ঈমানের সহায়ক আমল বা ঈমান বৃদ্ধিকারী আমলগুলো বেশি বেশি সম্পাদন করার মাধ্যমে আল্লাহর প্রিয় বান্দা হওয়া ও তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করা। (শেষ)

লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply