উইঘুর মুসলিম এক নির্যাতিত জাতির ইতিহাস – মুহাম্মদ মফিজুর রহমান

পত্র পত্রিকায় অনেক রকম খবর পেলেও অনেকেই হয়তো জানেন না চীন দেশের জিনজিয়াং প্রদেশে বসবাসরত মুসলমানদের আসল কাহিনী। আরাকানের মুসলমানদের মতো তারাও নিজ মাতৃভূমিতে পরদেশী হিসেবে বসবাস করেছে। অনেকদিন ধরে চীনা সরকারের নির্যাতন-নিপীড়নের স্টিম রোলার চলছে তাদের ওপর। অপরাধ! তারা মুসলমান। উইঘুর জাতির ইতিহাস অনেক প্রাচীন যা প্রায় ৪ হাজার বছর আগের। মূলত এরা স্বাধীন-পূর্ব তুর্কিস্তানের অধিবাসী। পূর্ব তুর্কিস্তান প্রাচীন সিল্ক রোডের পাশে অবস্থিত মধ্য এশিযার একটি দেশ, যার চারপাশে চীন, ভারত, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়ার অবস্থান। এ অঞ্চলের বেশির ভাগ দেশেই উইঘুর সম্প্রদায়ের বাস রয়েছে।
২০০৯ সালের এক হিসাব অনুযায়ী এসব দেশের মধ্যে চীনের জিনজিয়াংয়ে ১ কোটি ২০ হাজারের মতো উইঘুর লোক বসবাস করে। কাজাখস্তানে ২ লাখ ২৩ হাজার, উজবেকিস্তানে, ৫৫ হাজার, কিরগিজস্তানে ৪৯ হাজার, তুরস্কে ১৯ হাজার, রাশিয়ায় ৪ হাজার, ইউক্রেনে ১ হাজারের মতো উইঘুর সম্প্রদায়ের লোক বাস করে। এদের ভাষা উইঘুর। প্রাচীনকালে এ ভাষার বর্ণমালা উইঘুর হরফে লেখা হতো। নবম শতকের আগ পর্যন্ত পূর্ব-তুর্কিস্তান বৌদ্ধদের এক বড় তীর্থভূমি ছিল। এরপর তারা মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। বর্তমানে প্রায় ৯০ লাখ মুসলিম উইঘুর পূর্ব-তুর্কিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনপদে পরিণত হয়েছে। ইসলাম গ্রহণের পর ত্রয়োদশ থেকে বিংশ শতক পর্যন্ত উইঘুর বর্ণমালা আরবি হরফে লেখা হতো। এরপর কিছুদিন আরবি হরফে লেখা হলেও ১৯৮৫ সাল থেকে আবারো সরকারিভাবে আরবি হরফ চালু হয়েছে। ২০ শতকের প্রথম দিকেও প্রাচীন এ সম্প্রদায়ের লোকদের উইঘুর না বলে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন নামে ডাকা হতো।
মূলত ১৯২১ সালে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাশখন্দে একটি সম্মেলনের পর উইঘুররা তাদের পুরনো পরিচয় ফিরে পায়। ভাষাবিদ ও ইতিহাসবেত্তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন যে, উইঘুর শব্দটি উয়্যুঘুর শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ সংঘবদ্ধ। ১৯১১ সালে মাঙ্কু সাম্রাজ্য উৎখাতের মাধ্যমে পূর্ব তুর্কিস্তানে চীনা শাসন চালু হয়। কিন্তু স্বাধীনচেতা বীর উইঘুররা এই বিদেশী শাসনের সামনে মাথা নোয়ায়নি। এ কারণে ১৯৩৩ এবং ১৯৪৪ সালে তারা দু’বার চীনাদের সাথে সাহসিকতা প্রদর্শন করে স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু ভাগ্য তাদের অনকূলে ছিল না। ফলে ১৯৪৯ সালে আবারো তারা চীনা কমিউনিস্টদের হাতে পরাজিত হয়। জিনজিয়াং উইঘুর স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশে পরিণত হয়।
১৯৯০ সালের এক সমীক্ষায় চীনে প্রায় ৩০ হাজারের মতো মাদরাসা ছিল। আর ১৯৯৮ সালের সমীক্ষায় চীনে প্রায় ৩২ হাজার ৭৪৯টি মসজিদ ছিল। যার মধ্যে জিনজিয়াং প্রদেশেই ২৩ হাজার। বর্তমানে চীনে প্রায় ১০টির বেশি বিভিন্ন গোত্রীয় মুসলিম রয়েছে। চীনে বসবাসরত সব মুসলিমের মধ্যে উইঘুর মুসলিমদের ইতিহাস অনেক সমৃদ্ধ। তারা চীনের পশ্চিমাঞ্চলের জিনজিয়াং প্রদেশে বাস করে। তারাই এ এলাকার সংখ্যাগরিষ্ঠ। সমস্যার শুরু ১৯৪৯ সালে যখন চীন একটি গণপ্রজাতন্ত্রে রূপ নেয়, তখন থেকেই বড় ধরনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তন হতে লাগলো। এভাবে একটা সময় যখন কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় তখন তারা মুসলমানদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। ধর্মীয় স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপে উইঘুর মুসলমানরা নিজেদের আচার-অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত বাধার মুখে পড়ছে। যেমন, পবিত্র রমযান মাসে সরকারি কর্মচারীরা রোজা রাখতে পারবে না, কেউ যদি আইন লঙ্ঘন করে রোজা রাখে, তাকে রোজা ভাঙতে বাধ্য করা হয়। কলেজ ছাত্রদের অবশ্যই সাপ্তাহিক রাজনৈতিক শিক্ষাক্লাসে যোগ দিতে হবে এবং সশস্ত্র পুলিশ কর্মকর্তারা কর্তৃপক্ষের অনুমোদনবিহীন মাদরাসাগুলোতে যখন ইচ্ছা হানা দিতে পারবে।
সবচেয়ে বেশি উসকানিমূলক পদক্ষেপ হচ্ছে, গত কয়েকদিন আগে উইঘুর মুসলিমদের ঘরে পবিত্র কুরআন রাখা, নামাজ পড়া, জায়নামাজ ও নারীদের হিজাব ব্যবহার করা ও পুরুষদের দাড়ি রাখার বিরুদ্ধে প্রচারাভিযান। যেসব ট্যাক্সিচালক বোরকা পরা নারীদের গাড়িতে নেবে, তাদের মোটা অংকের জরিমানা করা, মস্তকাবরণ সরাতে অনিচ্ছুক নারীদের চিকিৎসা সেবা দিতে ডাক্তারদের বারণ করা। বোরকা পরা নারীদের প্রশাসন কর্তৃক বিভিন্নভাবে হেনস্তা করা। সরকারের আরেকটি খারাপ নীতি হচ্ছে নারী এবং ১৮ বছরের নিচের কোনো ছেলে মসজিদে যেতে পারবে না। সম্মিলিতভাবে কুরআন-হাদিস অধ্যয়নে সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং ধর্মীয় স্থাপনাগুলো সার্বক্ষণিক থাকে তাদের গোয়েন্দা নজরদারিতে। নামাজ পড়ার কারণে চাকরি চলে গেছে, এরকম ভূরি ভূরি নজির আছে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর জনপদে। চাকরির ক্ষেত্রেও উইঘুর মুসলমানরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। যা সাম্প্রতিক সময়ে পরিচালিত একটি জরিপ থেকে বোঝা যায়।
ধর্মীয় ক্ষেত্রে উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীন সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ২০০৯ সালের দাঙ্গার পর চীনা সরকারের সমালোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের দায়ে চীন সরকার গোপনে বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবীর বিচার করেছে। তারা আরো বলেছে, ধর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘুদের ভাষাশিক্ষা নিষিদ্ধ করার চীনা নীতি জিনজিয়াংয়ে অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ। মুসলমানরা অভিযোগ করছেন, তাদের স্বকীয়তা ও সংস্কৃতি মুছে ফেলার লক্ষ্যে তাদের নিজস্ব ভূভাগে সন্ত্রাসী হান সম্প্রদায়কে দিয়ে বসতি গড়ে তোলা হচ্ছে। ভূতত্ত্ববিদ আর সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, চীনা কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপের ফলে ১৯৪০ দশকে জিনজিয়াংয়ের ৫ শতাংশ হান সম্প্রদায় বর্তমানে ৪০ শতাংশে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা হয়ে আসছে।
খুন, হত্যা, গুম-অপহরণ যাদের নিত্যসঙ্গী তুর্কিস্তান থেকে চীনে আসা সম্প্রদায় উইঘুর। মঙ্গোলিয়া এবং তিব্বতের মাঝখানে এক পাহাড়ি ভূমিতে বসবাসকারী এই জাতিটি সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা হলো, তারা অতি মাত্রায় সাহসী যোদ্ধা এবং দুর্দমনীয়। একসময় এশিয়া মহাদেশের বড় অংশ যার দখলে ছিল, সেই চেঙ্গিস খাঁ এবং হালাকু খাঁর বাহিনীতে এদের যথেষ্ট সমাদার ছিল। কিন্তু ১৯৪৯ সালে তুর্কিস্তান চীনা বিপ্লবের সময় চীনের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। চিরস্বাধীনচেতা ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এই জাতিটি বর্তমানে চীনের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য প্রাণপণ লড়াই করছে। নিজস্ব ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার জন্য প্রতি বছর শত শত উইঘুর মুসলিম যুবক শাহাদতের অমিয় সুধা পান করছেন। আর চীন সাম্যবাদের নামে তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে বিলুপ্ত করার এক রক্তক্ষয়ী হোলিখেলায় মেতে উঠেছে। শত শত নিহতের সংখ্যা প্রায়ই মাত্র ১২ জন, অথবা ১৭ জন নিহত বলে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচার করছে।
প্রতিরোধ করার নিমিত্তে অস্ত্র হাতে নিলেও তাদের অন্যায়ভাবে বিশ্বের সামনে ফলাও করে উপস্থাপন করা হচ্ছে উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী, মানবতার শত্রু আর দাঙ্গা সৃষ্টিকারী হিসাবে। ধর্মীয় এবং জাতিগত কারণে তারা বারবার চীনা প্রশাসনযন্ত্রের নির্যাতনে নিষ্পেষিত হলেও তাদের দিকেই তোলা হয় অভিযোগের তীর। মামলা হামলায় বিপর্যস্ত হয় তাদের সাধারণ জীবন। বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠার জন্য নমুনাস্বরূপ কয়েকটি ঘটনা নিম্তুনেলে ধরছি, যা থেকে ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে সামান্য ধারণা পাওয়া যাবে। হান সম্প্রদায় বরাবরই হামলা চালায় উইঘুর মুসলমানদের ওপর। বর্তমানে জিনজিয়াংয়ের ৪৫ শতাংশ উইঘুর মুসলমান। স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। এর ফলে চীনা প্রশাসনের মদদে সেখানে অবৈধভাবে বসতি স্থাপনকারী হান বৌদ্ধদের হাতে চরম জুলুম-নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন উইঘুররা।
তবে সবচেয়ে বড় দাঙ্গার ঘটনাটি ঘটে ২০০৯ সালের জুলাই মাসে। ওই সময় জিনজিয়াংয়ের আঞ্চলিক রাজধানী উরুমকিতে মুসলমানদের ওপর হান সম্প্রদায়ের হামলায় অন্তত ২০০ জন উইঘুর প্রাণ হারান। এ ঘটনায় আহত হয় ১ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি উইঘুর মুসলিম। চীনা কর্তৃপক্ষ জিনজিয়াংয়ের সহিংসতার জন্য চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী উগ্রপন্থী মুসলমানদের! দায়ী করে। তবে উইঘুররা বিবিসি প্রতিনিধিকে জানান, সরকার তাদের ওপর কঠোর জুলুম-নিপীড়নকে বৈধতা দেয়ার লক্ষ্যে উগ্রপন্থীদের হুমকিকে অতিরঞ্জিত করে প্রচার করছে। ২০১৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর উত্তেজনাপূর্ণ জিনজিয়াংয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে ৮ জন উইঘুর মুসলিম নিহত হন।
যদিও কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ছুরি ও বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ে ৯ জন উইঘুর মুসলিম যুবক থানায় হামলা চালায় এবং গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। চীনের সরকারি বার্তাসংস্থা সিনহুয়ায় প্রশাসন এ অভিযোগ করলেও তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করে উইঘুর কংগ্রেস বলছে, এই হত্যাকাণ্ড শান্তিকামী সংখ্যালঘুদের ওপর চালানো নির্যাতনের আরেকটি ভয়ানক কাহিনী। ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট রাবেয়া কাদির গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন যে, সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উইঘুর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য মুছে ফেলার লক্ষ্যে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।
একইভাবে ২০১৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর চীনা পুলিশ একই ভিত্তিহীন অভিযোগে ১৪ জন উইঘুর মুসলিমকে হত্যা করে। ২০১৩ সালের জুন মাসে জিনজিয়াং অঞ্চলে এক রক্তক্ষয়ী দাঙ্গায় অন্তত ২৭ জন উইঘুর মুসলিম নিহত হন। পুলিশের সাথে এ সহিংসতার ঘটনা ঘটে। আঞ্চলিক রাজধানী উরুমকির ১২০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লুককুনে ভোর ৬টার দিকে এই দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। উইঘুর মুসলমানদের অভিযোগের তীর স্থানীয় প্রশাসন এবং হান সম্প্রদায়ের দিকেই। ২২ মে ২০১৪ উইঘুর মুসলিম অধ্যুষিত জিনজিয়াং প্রদেশের আঞ্চলিক রাজধানী উরুমকির একটি ব্যস্ততম মার্কেটে বোমা হামলায় ৩১ জন নিহত হয়েছে। এ হামলায় ৯০ জনেরও বেশি লোক আহত হয়। উইঘুর মুসলমান নিহত হলেও চীনা প্রশাসন তাদেরকে এই হামলার জন্য দায়ী করেছে। কিন্তু উইঘুর মুসলমানরা এটাকে তাদের ওপর চালানো দমন-নিপীড়নের অংশবিশেষ বলে মনে করে। এমনই মন্তব্য উঠে এসেছে বিবিসির প্রতিবেদনে। শুধু হত্যা আর খুন নয়, বরং তাদের বুদ্ধিজীবীদের গ্রেফতার করে তাদেরকে মনস্তাত্ত্বিকভাবেও চাপে রাখা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি চীনের পুলিশ খ্যাতনামা উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইলহাম তোহতি ও তার মাকে গ্রেফতার করে।
পুলিশ তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে তার ব্যক্তিগত কম্পিউটার, মোবাইল ফোন ও বিশ^বিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত কাগজ-পত্র আটক করে। ইলহাম তোহতি বেইজিং ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকসের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক। তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ, তিনি উইঘুর মুসলমানদের পক্ষে কাজ করেন। তেমনিভাবে চীনা কর্তৃপক্ষের নির্যাতনে আহত তরুণ উইঘুর মুসলিম নারী আইনজীবী গুলনার আবদুুল্লাহ মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে মারা যান। ২৭ মে ২০১৪ এক গণবিচারে ৫৫ জন উইঘুর মুসলমানকে দণ্ডাদেশ দিয়েছে চীন সরকার। জিনজিয়াং প্রদেশের ঈলি জেলার একটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এই গণবিচার প্রত্যক্ষ করে প্রায় সাত হাজার স্থানীয় জনতা ও কর্মকর্তারা। খুন, বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে যুক্ত হওয়ার দায়ে তিনজনকে মৃত্যুদণ্ড ও অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেয়া হয়েছে।
একই অভিযোগে আরো ৬৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে ঘোষণা করে পুলিশ। গত ২০১৩ সালের ২২ আগস্ট কাশগড় প্রিফেকচারে কর্তৃপক্ষের ভাষায় সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানে দুই ডজন উইঘুর মুসলিমকে হত্যা করা হয়। স্বতন্ত্র আবাসভূমির স্বপ্ন জিনজিয়াংয়ের আয়তন গোটা চীনের আয়তনের এক ষষ্ঠাংশ। খনিজ ও তৈল সম্পদে এ প্রদেশটি বিপুলভাবে সমৃদ্ধ। এখানে তেলের মজুদের পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ১শ কোটি টন। উইঘুর মুসলমানরা স্বতন্ত্র আবাসভূমির স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে লালন করলেও এমন খনিজ ও তৈল সম্পদে টইটম্বুর প্রদেশটি সহজে হাতছাড়া করবে চীন, এ ধরনের কল্পনা করাটাও যেন বোকার স্বর্গে বসবাস করার নামান্তর। বরং চীন চাইবে তাদেরকে যেভাবেই হোক চাপ প্রয়োগ করে অথবা অন্য যেকোনো পন্থায় হোক, নিজেদের বশীভূত রাখতে। যদিও তাতে হাজার হাজার উইঘুর মুসলমানের লাশ পড়ে। গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের রাষ্ট্রীয় কাঠামো সমাজতন্ত্র মতবাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। আর আমরা জানি, সমাজতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ধর্মের উৎখাত। তারা সেটাই বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলছে।
ঈমানদারদের ওপর নিষ্ঠুর আচরণের একটিই কারণ, “তারা তো মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ তায়ালা যিনি সপ্রশংসিত সে মহান প্রভুর ওপর বিশ্বাস ছাড়া আর কোনো অপরাধ করেনি।” (সূরা বুরুজ : ৮)
আমরা যারা ঈমানদার বলে নিজেদেরকে ঘোষণা দিয়েছি আমরা কি তাদের মতো ঈমানের স্বাদ ও মজা পেয়েছি?
আল্লাহ তায়ালা তাদের মতো ঈমান আনার আহবান করেছেন কুরআনে পাকে এভাবে – “যখন তাদেরকে বলা হলো, আর সব লোক যেভাবে ঈমান এনেছে তোমরাও সেসব লোকের মতো ত্যাগ কোরবানির সাথে ঈমান আন। তারা বলে আমরা কি বোকাদের মতো ঈমান আনব? হায়, এরা যে প্রকৃতপক্ষে বোকা সে ব্যাপারে তারা অজ্ঞতার তিমিরে।” (সূরা বাকারা :১৩)
আমাদেরকে তাদের মতোই ঈমান আনতে হবে, আল্লাহ তায়ালা যাদের ঈমান কবুল করেছেন। মুখে কতগুলো বুলি আর ঈমানের কথাসমূহ উচ্চারণের নাম প্রকৃত ঈমান নয়। আমাদেরকে সে লোকদের মত ঈমান আনতে হবে যাদের মাথার ওপর করাত দিয়ে চিরে দ্বিখণ্ডিত করার পরও ঈমান অখণ্ড ছিল। একচুল পরিমাণ বিশ্বাস টলেনি যাদের। তাদের ঈমান স¤পর্কে আবদুল্লাহ ইবনে উমার (রা) বলেন- “তাদের কালবের জমিনের ওপর ঈমানের পাহাড় অটলভাবে দাঁড়িয়েছিল।”
নির্যাযিত উইঘুর মুসলমানদের ভবিষ্যৎ কী হয়? সুখ নামক সোনার হরিণ কি ধরা দেবে তাদের হাতে, দুঃখের লোনা সাগরে হাবুডুবু খেতে হবে তাদের আরো বহুকাল? তা জানতে অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গত্যন্তর নেই।
লেখক : শিক্ষার্থী, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply