একজন অসহায়ের আর্তি

মাওলানা মুহিউদ্দীন খান
২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টন মোড়ে ‘লগি-বৈঠার’ মহড়া নামে যে পৈশাচিক বর্বরতার তাণ্ডব দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে, এ নির্মমতার নজির সম্ভবত নিকট অতীতের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না। কয়েকটি টগবগে তরুণকে প্রকাশ্য রাজপথে পিটিয়ে হত্যা করে তাদের লাশের ওপর উঠে নাচানাচি দেখে উহুদের শহীদ সাইয়্যেদেনা হজরত হামযার (রা) ছিন্নভিন্ন লাশের কথাটাই বারবার মনে পড়ছিল।
সাইয়্যেদুশ-শোহাদা হযরত হামযার (রা) বুক ফেঁড়ে কলিজা বের করে তা চিবিয়ে খেয়েছিল মক্কার দুর্বৃত্তরা! নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমবয়সী প্রিয় চাচার সাথে অন্যান্য শহীদানের পবিত্র লাশের সেই মর্মান্তিক অবমাননা জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ভুলতে পারেননি। কিন্তু তারপরও বর্বর খুনিদের তিনি ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। সেই মহোত্তম ক্ষমার প্রতিদানে ঘাতকরা অবশিষ্ট জীবন ইসলামের কল্যাণে উৎসর্গ করেছিলেন।
আবু সুফিয়ানের (রা) কৃতদাস ওয়াহশী হযরত হামযাকে (রা) হত্যা করে মালিকের নিকট পুরস্কৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে ইসলামে দীক্ষিত হয়ে প্রিয়তম নবীর (সা) মর্মবেদনা উপলব্ধি করে এই অপরাধের প্রতিকার করতে তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন। ভাগ্যবান ছিলেন তিনি, তাই প্রিয়তম নবীর সবচেয়ে বড় এক দুশমন মুসাইলামাতুল-কাজ্জাবকে সম্মুখ যুদ্ধে হত্যা করে সেই ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করেছিলেন। ওয়াহশী সাহাবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তাই বিশ্বাস করি, তিনি জাহান্নামী হবেন না। কিন্তু ওয়াহশীর সেই ভয়ঙ্কর কৃতকর্মের দৃশ্য স্মরণ হয়ে প্রিয় চাচার স্মৃতি ব্যাকুল করে তুলতে পারে, এই আশঙ্কায় প্রিয়তম নবী (সা) ওয়াহশীকে তাঁর সামনে আসতে বারণ করতেন।
আবু সুফিয়ান ছিলেন মক্কা থেকে আগত কুরাইশ বাহিনীর নেতৃত্বে। সত্তর জন নিবেদিতপ্রাণ সাহাবীর প্রাণ সংহার করেছিল দুর্ধর্ষ কুরাইশ যোদ্ধারা! সেই কুরাইশদের নেতা মহাবীর আবু সুফিয়ান মক্কা বিজয়ের দিন ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন। তারপর থেকে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাঁর শৌর্য-বীর্য, মেধা ও মনন নিঃশেষে নিয়োজিত করেছিলেন ইসলামের কল্যাণে।
হযরত ওমরের (রা) শাসনামলে কাদেসিয়ার মহা সমরে তিনি সস্ত্রীক যোগ দিয়েছিলেন। স্ত্রী হিন্দা ছিলেন সেই ভয়ানক মহিলা, যিনি হযরত হামযার (রা) কাঁচা কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিলেন।
কাদেসিয়ার যুদ্ধে এই মহিলাও স্বামীর সহযোদ্ধা ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক পর্যায়ে মুসলমানদের অগ্রবর্তী বাহিনীর কিছু লোক পিছু হঠতে শুরু করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে আবু সুফিয়ানও ছিলেন। তাঁদের পিছু হঠার দৃশ্য দেখে একটি বড় হাতুড়ি হাতে নিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন হিন্দা! তিনি স্বামীর ঘোড়ার মাথায় আঘাত করে চিৎকার করে বলতে ছিলেন, ‘উহুদের পাপের কথা কি তুমি ভুলে গেছ? এখন সম্মুখে অগ্রসর হয়ে সেই পাপস্খলনের সুবর্ণ সুযোগ। সামনে অগ্রসর হয়ে বীরের ভূমিকা পালন কর। উহুদের পাপ হয়তো আল্লাহপাক এর দ্বারা মুছে দিতে পারেন।
ইতিহাসবিদ ইবনুল আছীর লেখেছেন, স্ত্রী হিন্দার উদ্দীপনাময় সেই বক্তব্য শুনেই আবু সুফিয়ান একেবারে সম্মুখ কাতারে ফিরে গিয়েছিলেন।
লগি-বৈঠার তাণ্ডবে নিহতদের লাশ নির্মমভাবে পিষ্ট হতে দেখে বারবার মনে পড়ছিল শহীদানে-উহুদের কথা। তাঁদের পবিত্র লাশের মর্মান্তিক অবমাননার কথা।
লগি-বৈঠা তাণ্ডবের দৃশ্য দেখে কিছুক্ষণের জন্য কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিলাম। কিছুটা সম্বিত ফিরে এলো এশার নামাযে ইমাম সাহেবের কেরা’আত শুনে। তিনি সূরা বুরুজ পাঠ করছিলেন দরদভরা কণ্ঠে! বলছিলেন, ওয়া মা নাকামু মিনহুম ইল্লা…।
“এরা কি এ জন্যই নির্যাতিত হয়নি যে একমাত্র মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল। যাঁর একচ্ছত্র মালিকানায় রয়েছে মহাবিশ্ব এবং আকাশ মণ্ডলের সকল কর্তৃত্ব। মনে রেখো, সেই মহা শক্তিধর আল্লাহ সকল কিছুরই সাক্ষী হয়ে থাকছেন…।
আর এই ঘটনার নায়কদের পরিণতি কী হবে, তা পরবর্তী আয়াতের অনুবাদের প্রতি লক্ষ্য করেই অনুধাবন করা যায়!
লগি-বৈঠা তাণ্ডবে নিহত শহীদানের পদদলিত লাশের কসম; মহান মালিক মাওলা সব কিছুই প্রত্যক্ষ করেছেন। আমরা ছিলাম অসহায় দর্শক! কাছে যাওয়ার সাহস বা শক্তি কোনটাই ছিল না। শুধু অব্যক্ত বেদনায় বুক ফেটে ফরিয়াদ বের হয়ে আসছিল, মাওলা! লগি-বৈঠার তাণ্ডবে নিহত ও মর্মান্তিকভাবে পদদলিত এই তরুণগুলোর অতৃপ্ত ক্ষুব্ধ আত্মাগুলোকে শহীদানে-উহুদের সান্নিধ্য দান করে ধন্য কর!! আর দয়া করে ক্ষমা করে দাও আমাদের অপারগতা আর অথর্বতাকে!!!
লেখক : সম্পাদক, মাসিক মদিনা

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here