কমিউনিস্টদের চ্যাম মুসলমান নিধন -গোলাপ মুনীর

কমিউনিস্ট পার্টি অব কম্পোচিয়া (সিপিকে) সমধিক পরিচিত খেমার রোজ নামে। জানিয়ে রাখি কম্পোচিয়া বা কম্বোডিয়া একই দেশ। ইতিহাসে ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে স্বল্প সময়ে দেশটির সরকার দেশটিকে কম্পোচিয়া নামে অভিহিত করেছে। তবে দেশটি কম্বোডিয়া নামে আন্তর্জাতিক মহলে সমধিক পরিচিত। সে যা-ই হোক, খেমার রোজ কম্বোডিয়া শাসন করে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত সময়ে। কমিউনিস্ট নীতি-আদর্শের কট্টর ধারক-বাহক হিসেবে পরিচিত খেমার রোজ সরকার ছিল অতিমাত্রিক অটোক্র্যাটিক, টোটালিটারিয়ান, জেনোফোবিক, প্যারানয়েড ও রিপ্রেসিভ। অন্য কথায় এরা ছিল স্বৈরতান্ত্রিক, সামগ্রিক কর্তৃত্ববাদী, বিদেশী ও বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসীদের প্রতি প্রবল ঘৃণার মনোভাব পোষণকারী, নির্যাতনে বদ্ধমূল বিশ্বাসী ও রাজনীতিতে ভিন্ন মতাবলম্বী নিপীড়ক। খেমার রোজ সরকারের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পলিসি ও Maha Lout Ploh-এর কারণে কম্বোডিয়ায় প্রচুর লোকক্ষয় ঘটে। Maha Lout Ploh চীনের Great Leap Forward-এর কম্বোডীয় সংস্করণ। এটি ছিল খেমার রোজ সরকারের ইকোনমিক পলিসি। এ নীতি অবলম্বন করে কম্বোডিয়াকে কার্যত পরিণত করা হয় ভাসমান শ্রমিকের দেশে। এ নীতির কারণেই চীনে মহাদুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল। খেমার রোজও চীনের মতো একই ধরনের কালেক্টিভিজম বা যৌথবাদের আওতায় যৌথ চাষাবাদের কৃষি-সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর ফলে কম্বোডিয়ায়ও ব্যাপক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এতে প্রচুর লোক চিকিৎসা না পেয়েই মারা যায়।
খেমার রোজ সরকার তাদের কমিউনিস্ট নীতি-আদর্শ বাস্তবায়নের নামে ভিন্ন মতাবলম্বী মানুষের ওপর সে দেশে চালায় নির্যাতন-নিপীড়ন ও ব্যাপক গণহত্যা, যা ইতিহাসে ঘৃণ্য ‘কম্বোডিয়া গণহত্যা’ নামে ঠাঁই পেয়েছে। তখন এই গণহত্যায় কম্বোডিয়ার ২৫ শতাংশ লোক প্রাণ হারায়। কিন্তু একই সময়ে অপেক্ষাকৃত কম আলোচিত আরেকটি গণহত্যা চলে সেখানকার সংখ্যালঘু নৃতাত্ত্বিক চ্যাম মুসলিম জনগোষ্ঠী নিধনের লক্ষ্যে। কারণ, বিশ্বজুড়ে কমিউনিস্টরা মুসলমানদের মনে করে তাদের প্রধান শত্রু। বক্ষ্যমাণ এ লেখায় খেমার রোজ সরকারের পরিচালিত সেই গণহত্যার ওপর আলোকপাতের প্রয়াস পাবো।

বেন কিয়েরনান (Ben Kiernan) হচ্ছেন অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত এক আমেরিকান শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদ। তিনি ইতিহাসের হুইটনি গ্রিসওয়ার্ল্ড অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক ও এরিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক এবং ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনোসাইড স্টাডিজ প্রোগ্রামের ডিরেক্টর। তিনি বলেছেন: ‘কম্বোডিয়ার নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ‘ফায়ারচেস্ট এক্সটার্মিনেশন ক্যাম্পেইন’ (হিং¯্রতম নিধন অভিযান) পরিচালিত হয়েছে। কারণ, খেমার রোজ কমিউনিস্ট সরকার ইসলামকে বিবেচনা করত একটি ‘অ্যালিয়েন’ ও ‘ফরেন’ কালচার হিসেবে, যা তাদের মতে- নতুন কমিউনিস্ট ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রথম দিকে খেমার রোজের লক্ষ্য ছিল চ্যাম জনগোষ্ঠীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার মাধ্যমে আত্তীকরণে (ফোর্সড অ্যাসিমিলেশনে) বাধ্য করা। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন খেমার রোজ দলের নেতা ও কম্বোডিয়ার শাসক পলপট চ্যামদের বিরুদ্ধে ভীতি প্রদর্শনমূলক কর্মকাণ্ড শুরু করেন। এ ভীতি প্রদর্শনের কাজের মধ্যে ছিল: গ্রামের প্রবীণদের হত্যা করা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পলপটের আদেশে তা রূপ নেয় চ্যাম মুসলমানবিরোধী সর্বাত্মক এক গণহত্যায়। অস্ট্রেলীয় অধ্যাপক পল আর. বার্ট্রপের (Paul R. Bartrop) অভিমত- এই গণহত্যা অভিযান পুরো চ্যাম সংখ্যালঘু মুসলমানদের নিঃশেষ করে দিত, যদি না ১৯৭৯ সালে খেমার রোজ সরকার কম্বোডিয়ার শাসনক্ষমতা থেকে উৎখাত হতো।
১৯৫০-এর দশকে চ্যাম জনগোষ্ঠী কিছুটা উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে কমিউনিস্টদের সাথে যোগ দিয়ে। চ্যাম নেতা সস মান (ঝড়ং গধহ) তখন ইন্দোচীন কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং দলের মধ্যে অন্যতম শক্তিতে পরিণত হন। এর পর ১৯৭০ সালে দেশের ইস্টার্ন জোনে ফিরে আসেন এবং যোগ দেন ‘কমিউনিস্ট পার্টি অব কম্পোচিয়া (সিপিকে) দলে। সেই সাথে তার ছেলেকে সাথে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘ইস্টার্ন জোন ইসলামিক মুভমেন্ট’। এরা দু’জন চ্যাম জনগোষ্ঠীকে বিপ্লবে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে হয়ে ওঠেন সিপিকে’র মুখপাত্র। ১৯৭০-৭৫ সময়ে সিপিকে নেতারা সস মানের ইসলামিক মুভমেন্টের প্রতি সহিষ্ণুই ছিল। ১৯৭২ সাল থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চ্যাম জনগোষ্ঠী ক্রমেই তাদের ধর্মবিশ্বাস থেকে সরে গিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন আচার-অনুশীলনে চলে যেতে থাকে।
এদিকে চ্যাম অধ্যুষিত দশটি গ্রাম ১৯৭২-৭৩ সালের দিকে চিপিকে দখল করে নেয়। সেখানে তাদের অনুসারী নতুন নতুন চ্যাম নেতাদের বসানো হয়। সাধারণ চ্যামদের বাধ্য করা হয় তাদের নিজেদের গ্রাম ও শহর থেকে দূরের কোনো ক্ষেত-খামারে কাজ করতে। বেন কিয়েরনানের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে একজন প্রত্যক্ষদর্শী চ্যাম মুসলমান স্বীকার করেন- প্রথম দিকে চিপিকে তাদের সাথে ভালো আচরণ করতো। ১৯৭৪ সালেও তাদেরকে বাড়িঘরে ফিরে আসতে দেয়। কিন্তু এক পর্যায়ে চ্যাম মুসলমানদের ফবঢ়ড়ংরঃবব নধংব ঢ়বড়ঢ়ষব হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে নির্যাতন নিপীড়নের শিকার এক ভঙ্গুর জনগোষ্ঠীতে পরিণত করা হয়।
এর পরও কম্বোডিয়ার বিভিন্ন এলাকায় চ্যাম সম্প্রদায় পাশাপাশি বসবাস করছিল স্থানীয়দের সাথে। তারা কথা বলতো খেমার ভাষায়। এমনকি সংখ্যাগুরু খেমার এবং সংখ্যালঘু চীনা ও ভিয়েতনামিদের সাথে তাদের বিয়ে-শাদিও চলতো। ১৯৭২ সালের দিকে চিপিকের উত্থানের পর থেকে কম্বোডিয়ানদের মাঝে এই বহুমাত্রিক ও সাংস্কৃতিক অনুশীলন খারাপের দিকে যেতে শুরু করে। তখন চ্যামদের বাধা দেয়া হয় নিজেদের ধর্মবিশ্বাসভিত্তিক আচার-অনুশীলন-অনুষ্ঠান পালনে। বন্ধ করে দেয়া হয় ইসলামী সংস্কৃতি চর্চা; চ্যাম মহিলাদের বলা হয় খেমারদের মতো চুল খাটো করতে; পুরুষদের সারং (লুঙ্গিসদৃশ জাতীয় পোশাক) পরতে দেয়া হতো না; কৃষকদের পরতে দেয়া হতো লুপ্তপ্রায় কালো পোশাক; বাধা দেয়া হতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ায়।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের সুপরিচিত লেখক আমেরিকান ইতিহাসবিদ মাইকেল থিওডোর ভিকারি (১৯৩১-২০১৭) উল্লেখ করে গেছেন- কম্বোডিয়ার কিছু কিছু এলাকায় চ্যাম মুসলমানদের প্রতি খেমারদের বৈষম্য যুদ্ধের আগেই শুরু হয়েছিল। এর আংশিক কারণ, চ্যামদের ধরেই নেয়া হতো এরা ব্ল্যাক ম্যাজিক অনুশীলন করে। কিন্তু অন্যান্য এলাকায় চ্যামদের ভালোভাবেই আত্তীকৃত করে নেয়া হয়েছিল স্থানীয় জনসমাজে। এরা খেমার ভাষায় কথা বলতো। খেমার, ভিয়েতনামি ও চীনাদের সাথে এদের বিয়ে-শাদি চলতো।
১৯৭২-৭৪ সময়ে চ্যামদের ওপর উল্লিখিত সব বিধিনিষেধ আরো কঠোর করে তোলা হয়। কারণ খেমার রোজ ধরে নিলো, চ্যামরা কমিউনিস্ট অ্যাজেন্ডার জন্য হুমকি। কারণ, তাদের রয়েছে অনন্য ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাস ও স্বতন্ত্র সামাজিক ব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, চ্যাম মুসলমানদের অভিহিত করা হলো নতুন নামে; ইসলামিক খেমার। এর মধ্যমে চলে পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ও নৃতাত্ত্বিকতা থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা। এভাবে চেষ্টা চলে খেমারদের বৃহত্তর আধিপত্যের ডেমোক্র্যাটিক কম্পোচিয়ায় (ডিকে) শেকড়বিহীনভাবে চ্যামদের আত্তীকৃত করে নেয়ার। খেমার রোজ দলটি বিশ্বাস করতো, চ্যাম মুসলমানেরা কমিউনিস্টদের উদ্যোগকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তাদের নিজেদের ঘনিষ্ঠ সমাজ গড়ে তুলে তারা এই কাজটি করতে পারে। তাই তাদের একসাথে সমাজবদ্ধ হয়ে থাকতে দেয়া যায় না। সে ভাবনা থেকেই খেমার রোজ সরকার সিদ্ধান্ত নেয়- এদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হবে; তাদের নিজস্ব এলাকা থেকে অন্য কোনো এলাকা বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে; কম্বোডিয়ার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে দিয়ে এদের সামাজিক কাঠামো ভেঙে দিতে হবে; সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে; এরা জীবন যাপন করবে কৃষি শ্রমিক হিসেবে; সেই সাথে তাদের ওপর তদারকি জারি রাখা হবে।
চ্যাম নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী যাতে আর কোনোদিন তাদের নিজস্ব সমাজ গড়ে তুলতে না পারে, তা নিশ্চিত করতেই এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়। এর ফলে সরকারের সমবায়ভিত্তিক কেন্দ্রীয় আর্থনীনিতিক কর্মসূচিতে এরা বাধা হয়ে কাজ করবে। কিন্তু যারা এসব বিধিনিষেধ মানেনি, তাদেরকে সরকার আটক করে নিয়ে যেতে থাকে। এ নিয়ে ১৯৭৩ সালের অক্টোবরের দিকে ডিকে’র পূর্বাঞ্চলে চিপিকে’র এসব বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে ড্রাম বাজিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়। ঐতিহ্যগতভাবে স্থানীয় মসজিদে এরা এই ড্রাম বাজিয়ে প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় জানিয়ে দিতো। এই অবাধ্যতায় রুষ্ট হয়ে নির্বিচারে আটক করা হয় অনেক চ্যাম মুসলমান ও ধর্মীয় শিক্ষককে।
১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি ডিকে’র ওয়েস্টার্র্ন জোনের ৩১ নম্বর রিজিয়নে প্রতিবাদ জানানো হয় চিপিকে নীতির। এই নীতিতে বলা হয় জেলেদেরকে তাদের প্রতিদিনের ধরা মাছ নিবন্ধন করতে হবে স্থানীয় কো-অপারেটিভে। এবং কম দামে তাদের ধরা মাছ কো-আরেটিভের কাছেই বিক্রি করতে হবে। একই সময়ে স্থানীয়দের বেশি দাম দিয়ে কো-অপারেটিভ থেকে মাছ কিনতে হবে। এর ফলে স্থানীয় ও কো-অপারেটিভের মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এ ধরনের একটি ঘটনায় শুধু ঘটনাস্থলেই গুলি করে হত্যা করা হয় ১০০ নারী-পুরুষ চ্যামকে। ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বেরে ইস্টার্ন জোনের ২১ নম্বর রিজিয়নে কমিউনিটি নেতাদের গ্রেফতারের পর চিপিকে’র বিরুদ্ধে চ্যাম সম্প্রদায় বিদ্রোহ করে। সরকার চাপ প্রয়োগ করে এই বিদ্রোহ দমন করে। তবে এতে হতাহতের কোনো রেকর্ড নেই। কিন্তু ১৯৭০-৭৫ সময়ে চ্যাম কমিউনিটির ওপর সরকারের অনেক নির্যাতন-নিপীড়ন জারি ছিল। এ সময়ে তাদের ওপর ব্যবসায়-বাণিজ্য, ভ্রমণ ও অন্যান্য কিছু কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ ছিল। এগুলোকে চলমান গৃহযুদ্ধের উপজাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে কিছু সংখ্যক চ্যাম মুসলমান সৈনিক ও সিপিকে’র সদস্য হিসেবে বিপ্লবে অংশও নিয়েছিল। স্থানীয়দের কারো কারো বর্ণনা মতে, প্রথম দিকে সাধারণ চ্যামরা আস্থাশীল ছিল খেমার রোজ সরকারের প্রতি। কারণ, এরা প্রথম গ্রামে আসার সময় স্থানীয়দের খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জোগানে সহায়তা দিয়েছিল। তখন এরা স্থানীয় সংস্কৃতি ও ধর্মাচারেও বাধা দেয়নি। যদিও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, তবুও তা পালনে কঠোরতা অবলম্বন করা হয়নি।
সিপিকে বিবেচিত হতো বিপ্লবের বীর হিসেবে। কারণ, এরা লড়াই-সংগ্রাম করেছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৃষকদের ও জাতিকে রক্ষার জন্য। চ্যাম সমাজ কম্পোচিয়া জুড়েই ছিল। ১৯৭৫-পূর্ব সময়ে বিভিন্ন এলাকায় সিপিকে এদের ওপর নানাভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে। হয়তো এক এলাকার চ্যাম জনগোষ্ঠী যে ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে, অন্য এলাকার চ্যামদের তা করা হয়নি। তাদের ওপর চালানো হয়েছে ভিন্ন আকার ও প্রকারের নিপীড়ন। ১৯৭৫ সালে পলপট তার ক্ষমতা সুসংহত করার পর থেকেই চ্যাম জনগোষ্ঠীর ওপর নির্বিচারে চরম নৃশংসতা শুরু হয়।
১৯৭৫ সালে সিপিকে খেমার রিপাবলিক বাহিনীকে পরাজিত করে। তখন চ্যাম বংশোদ্ভূত দুই ভাই ক্যাম্পং চ্যাম প্রদেশের ২১ নম্বর রিজিয়নে ফিরে আসেন। এখানে সবচেয়ে বেশিসংখ্যক চ্যাম নৃগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। এই দুই ভাই খেমার রোজে বিপ্লবে যোগ দিয়েছিলেন সৈনিক হিসেবে। এই দুই ভাই তখন তাদের বাবাকে বলেন বিপ্লবের অংশ হিসেবে তাদের অ্যাডভেঞ্চারের নানা কথা। এর মধ্যে ছিল খেমারদের হত্যা ও শূকরের গোশত খাওয়ার কথাও। তারা এসব জানিয়েছিল, যাতে তাদের বাবাও কমিউনিস্টদের সাথে যোগ দেন। বাবা নিশ্চুপ রইলেন। স্পষ্টতই তিনি তাদের কুমন্ত্রণায় সায় দেননি। বরং উল্টো তিনি গোশত কাটার একটি ভারী ছুরি হাতে নিয়ে তার দুই পুত্রকেই হত্যা করেন এবং তার অনুসারীদের বলেন, তিনি শত্রু হত্যা করেছেন। তিনি গ্রামবাসীদের কাছে আরো জানান, সেইসব কাহিনী যা তিনি এর আগে তার পুত্রদের কাছ থেকে শুনেছিলেন। সেগুলো ছিল ইসলাম ও চ্যাম জনগোষ্ঠীর প্রতি খেমার রোজের তীব্র ঘৃণার কাহিনী। এ ঘটনার প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই গ্রামবাসী একযোগে সম্মত হয়, এ রাতেই এই এলাকার খেমার রোজ সেনাদের হত্যা করা হবে। পরদিন সকালে ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ আরো অনেক সরকারি সৈন্য নামানো হলো এ এলাকায়। এরা পুরো গ্রামটি ঘিরে ফেলে। হত্যা করে গ্রামের প্রতিটি মানুষকে।
একইভাবে ১৯৭৫ সালের জুলাইয়ে ইস্টার্ন জোনের ২১ নম্বর জোনের সিপিকে কর্র্তৃপক্ষ জনগণের কাছে থাকা কুরআনের সব কপি বাজেয়াপ্ত করার অভিযান চালায়। একই সাথে বাধ্যতামূলকভাবে চ্যাম নারীদের খাটো চুল রাখার আদেশ কার্যকর করে। এ আদেশের বিরুদ্ধে স্থানীয় চ্যাম সমাজ ব্যাপক বিক্ষোভ করে। সরকারের সৈন্যেরা তাদের ওপর গুলি চালায়। চ্যামরা এর প্রতিক্রিয়ায় তরবারি ও ব্লেড নিয়ে আক্রমণ করে কয়েকজন সৈন্যকে হত্যা করে। ফলে সরকারি সৈন্যরা এ এলাকায় তাদের অভিযান আরো জোরদার করে তোলে। সরকারি সৈন্যরা পুরো গ্রামটি ও গ্রামবাসীর সম্পদ ধ্বংস করে দেয়। আরেকটি ঘটনায় সিপিকে’র সভায় যোগদানের পরিবর্তে নামাজে যোগ দেয়ার কারণে ১৯৭৫ সালের জুনে বেশ কয়েক জন চ্যাম মুসলমানকে সরকারি সৈন্যেরা হত্যা করে।
ঘটনা আরো খারাপের দিকে যেতে শুরু করে ১৯৭৫ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে। তখন সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীকে বাধ্য করা হয় শুধু খেমার জাতীয়তা ও ধর্মের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে: বলা হয়- খেমার ছাড়া আর কোনো পরিচয় সত্তা থাকবে না। এর ফলে চ্যাম ভাষায় কথা বলা যাবে না, কোনো সম্প্রদায় বিশেষ কোনো খাবার খেতে পারবে না। সবাইর জন্য একই ধরনের খাবার বাধ্যতামূলক। মুসলমানদের বাধ্য করা হয় শূকর পালনে ও শূকরের গোশত খেতে, যা ইসলামে চরমভাবে নিষিদ্ধ। কিছুসংখ্যক মুসলমান খেমার রোজে যোগ দিয়ে কিছু পদ-পদবি অর্জন করেছিল, পলপটের ক্ষমতা সুসংহত করার পর ১৯৭৫ সালের দিকে এসব চ্যাম মুসসলমান সৈন্যদেরকে খেমার রোজ বাহিনী থেকে বের করে দেয়া হয়। এরাও বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে তাদের ইসলামিক সংস্কৃতি, ধর্মাচার, নামায-রোজা ও জাতীয় পরিচয় সত্তা কেড়ে নেয়ায়।
অপর দিকে অব্যাহতভাবে খেমার রোজ চালাতে থাকে চ্যাম মুসলিম নিধনের কাজটি: প্রথমত, চ্যাম মুসলমান নেতাদের হত্যা করে তাদের সামাজিক কাঠামো ভেঙে দেয়ার প্রয়াস চলে, এ হত্যা তালিকায় ছিলেন মুফতি, ইমাম ও অন্যান্য প্রভাবশালী বিদ্ধজন; দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় প্রার্থনা ও আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ করে দিয়ে চ্যামদের ইসলামিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় সত্তা মুছে ফেলা, কারণ এগুলোই ছিল খেমারদের থেকে এদের স্বাতন্ত্র্যের নিয়ামক; তৃতীয়ত, সিপিকে’র বিরুদ্ধে যাতে এরা কোনো সংঘবদ্ধ বিদ্রোহ না করতে পারে, সে জন্য এদেরকে বাধ্যতামূলক শ্রমশিবিরে পাঠিয়ে ও নানা অভিযোগে আটকে রাখা কিংবা হত্যা করে ফেলা।
খেমার রোজ শাসনামলে বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সব রিজিয়নে হয়রানি জারি ছিল। চীনের একটি সূত্রমতে, খেমার রোজ সরকারের আমলে ১৩২টি মসজিদ ধ্বংস করা হয়। অনেক মসজিদ পাপাচারের কাজে ব্যবহার করে অপবিত্র করা হয়। মুসলমানদের ইবাদত করা বন্ধ করে দেয়া হয়। তাদের বাধ্য করা হয় শূকরের গোশত খেতে। যারা তা খেতে অস্বীকার করতো তাদের হত্যা করা হতো। চ্যামদের পুরো গ্রাম ধ্বংস করে দেয়ার মতো ঘটনাও ঘটে। তাদের নিজের ভাষায় কথা বলতে দেয়া হতো না। চ্যাম শিশুদের মা-বাবার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে খেমার হিসেবে লালন-পালন করা হতো। ১৯৭৯ সালের এক সরকারি আদেশে বলা হয়: ‘চ্যাম জাতির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। কম্পোচিয়ার মাটির মালিক খেমার। সে অনুযায়ী, চ্যাম জাতীয়তা, ভাষা, প্রথা ও ধর্মীয় বিশ্বাস তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল হবে। যারা এই আদেশ মেনে চলতে ব্যর্থ হবে, অহশধৎ-বিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য তাদেরকে করুণ পরিণতি মেনে নিতে হবে।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সিপিকে ক্ষমতায় আসার পর মোটামুটি দুই বছর পর্যন্ত এরা নিজেদের অহশধৎ (খেমার ভাষায় উচ্চারণ অঙ্কাহ, যার অর্থ সংগঠন) নামে অভিহিত করত। তা সত্ত্বেও ১৯৭৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর পলপট তার ৫ ঘণ্টার দীর্ঘ বক্তৃতায় প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন সিপিকে’র অস্তিত্বের বিষয়টি। তিনি প্রকাশ করেন কম্বোডিয়ার সুপ্রিম অথোরিটির সত্যিকারের চেহারা, যা ছিল দেশ শাসনে নিভৃতে থাকা কর্তৃপক্ষ।
ভিকারির অভিমত- ১৯৮০-র মধ্য-দশকের দিকে কম্বোয়িায় বসবাস করত ১ কোটি ৮৫ লাখ চ্যাম। এক তথ্য মতে- খেমার রোজ সরকারের লোকেরা ৫ লাখের মতো চ্যাম মুসলমানকে হত্যা করে। খেমার রোজ শাসনের অবসানের পর অবশ্য আবার সব ধর্ম পালনের অনুমতি দেয়া হয়।
খেমার রোজ দলের নেতা ও সরকারপ্রধান পলপট ছিলেন একজন কট্টর মার্কসবাদী নাস্তিক। তার নেতৃত্বাধীন খেমার রোজ সরকারের রাষ্ট্রীয় নীতি ছিল নাস্তিক্যবাদ। ক্যাথারিন ওয়েসিঙ্গারের মতে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ডেমোক্র্যাটিক কম্পোচিয়া ছিল একটি নাস্তিক্যবাদী রাষ্ট্র। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে এরা মানুষের ওপর যে হয়রানি চালিয়েছে, তার সাথে একমাত্র তুলনা চলে কমিউনিস্ট রাষ্ট্র আলবেনিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার। কম্বোডিয়ায় সব ধর্ম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। খেমার রোজ সরকারের আমলে ইসলাম, খ্রিষ্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম অনুসারীদের ওপর চালানো হয়েছিল ব্যাপক নির্যাতন। এক অনুমিত হিসাব মতে খেমাররোজ সরকার ৫০ হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু হত্যা করেছিল।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply