করোনাভাইরাসে মানুষের বিপর্যয় ও কিছু ভাবনার বিষয়-জালাল উদ্দিন ওমর

করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে এখন তুমুল হইচই। আতঙ্কে সারা বিশ্বের মানুষ। কে কখন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হবে, তা নিয়ে বিশ্ববাসীর উৎকণ্ঠার শেষ নেই। চিকিৎসক থেকে আরম্ভ করে রাজনীতিবিদ, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী- সবাই এখন করোনাভাইরাস মোকাবেলার কৌশল প্রণয়নে ব্যস্ত। কিন্তু কারো কোন কৌশল তেমন একটা কাজে আসছে না। চীনের উহান প্রদেশে এর উৎপত্তি হলেও এখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে এটি। যার আক্রমণ ঠেকাতে ব্যস্ত গোটা বিশ্ব। পৃথিবীর শক্তিধর দেশগুলোও যেন একটি ক্ষুদ্র ভাইরাসের কাছেই বিপর্যস্ত। মানবজাতিকে বাঁচানোর জন্য বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত ওষুধসমূহ করোনাভাইরাস দমনে তেমন একটা কাজে আসছে না, আবার মানবজাতিকে মারার জন্য বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত কোন মারণাস্ত্রও করোনাভাইরাস দমনে অকার্যকর। এইসব মারণাস্ত্রের কোনোটাতেই করোনাভাইরাসকে হত্যা করা সম্ভব হচ্ছে না। করোনাভাইরাস কাউকেই পরোয়া করছে না। ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র, যুদ্ধবিমান অথবা সাবমেরিন- কোনটাই কাজে আসছে না। এর কোনোটাতেই করোনাভাইরাস ভীত নয়। বরং হুঙ্কার দিয়ে করোনাভাইরাস কেবল এগিয়ে চলছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ইতোমধ্যেই দুই লাখেরও বেশি মানুষ মারা গেছে এবং প্রায় পৌনে এক কোটি মানুষ চিকিৎসাধীন আছেন। করোনার আক্রমণে মারা গেছে বহু চিকিৎসকও। দেশে দেশে বিদ্যমান সামরিক বাহিনী করোনাভাইরাস দমনে আজ ব্যর্থ। এই ভাইরাসের প্রভাবে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে আজ বিপর্যয় নেমে এসেছে।
একটি ভাইরাসের কাছে পুরো পৃথিবীই আজ বিপর্যস্ত। সমগ্র পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে এই ভাইরাস। ভয় এবং আতঙ্ক গ্রাস করেছে সবাইকে। উন্নত দেশের বড় বড় শহরের রাস্তাঘাট আজ ফাঁকা। শহরে জনগণের কোলাহল নেই, কাজের ব্যস্ততা নেই। কারো সাথে কেউ প্রাণ খুলে কথা বলছে না। মাস্ক পরে মুখ ঢেকে সবাই চলাচল করছে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। ক্যাম্পাসে ছাত্রছাত্রীর উপস্থিতি নেই, শপিংমলে ক্রেতা নেই, ব্যবসা বাণিজ্যের জৌলুস নেই। পর্যটন কেন্দ্রসমূহে পর্যটক নেই, সি বিচে মানুষ নেই। ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে লোক নেই, রেস্টুরেন্টগুলোতে বিক্রি নেই। বার বন্ধ, নাইট ক্লাব বন্ধ। বিশ্ববিখ্যাত ফুটবল লিগের খেলা বন্ধ। ফুটবল মাঠে খেলা নেই, গ্যালারিতে দর্শক নেই। বিমানে যাত্রী নেই। বিমানবন্দরে বিমান নেই। রেল স্টেশনে রেল নেই। হলিউড বলিউডে নায়ক নায়িকাদের নাচ গান নেই। নাটক সিনেমার শুটিং বন্ধ, নায়ক নায়িকাদের অভিনয়ও বন্ধ। বিখ্যাত গায়কদের গানের কনসার্ট বন্ধ, রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমাবেশ বন্ধ। বিভিন্ন দেশের বড় বড় পুঁজিবাজারগুলোতে ধস নেমেছে। শেয়ারবাজারে ক্রেতা নেই, বিনিয়োগকারীরা লোকসানে জর্জরিত। ব্যবসা বাণিজ্য এবং আমদানি রফতানির পরিমাণ কমে গেছে। কোথাও আজ উৎসবমুখর পরিবেশ নেই। সর্বত্রই ভয়, আতঙ্ক এবং স্থবিরতা। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবীটাই যেন আজ থমকে গেছে। করোনার প্রভাবে পুরো পৃথিবী আজ এক মহা বিপর্যয়ের মুখোমুখি এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে আজ মন্দার ঢেউ।
জ্ঞান-বিজ্ঞানের এত আবিষ্কারের যুগে করোনা নামক একটি ভাইরাসের আক্রমণে মানুষ মারা যাবে তা ভাবতেও কষ্ট হয়। কিন্তু বাস্তবে তাই এখন সত্য। জ্ঞান-বিজ্ঞানে অতি উন্নত এবং অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে শক্তিশালী দেশসমূহ যখন অতীব ক্ষুদ্র একটি ভাইরাসের কাছে পরাজিত হয়, তখন মানুষের উচিত বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা এবং গবেষণা করা। মানুষের আজ অহমিকার শেষ নেই, দাম্ভিকতার অন্ত নেই। একটু ক্ষমতা পেলেই তা নিয়ে বাহাদুরি করতে কারো কোন কমতি নেই। মানুষ হয়ে ওঠে বেপরোয়া এবং যখন যা খুশি করে বেড়ায়। অপরের অধিকার কেড়ে নেয় এবং মানুষকে নির্যাতন করে। করোনা নামক একটি ভাইরাসের কাছে মানবজাতির পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের অসহায়ত্বের বিষয়টি আবারো দিবালোকের মত ফুটে উঠেছে। জ্ঞান বিজ্ঞানে মানুষের অভূতপূর্ব উন্নতির যুগেও তারা একটি ভাইরাসের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে পারছে না। করোনা আতঙ্কে মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। একে অপরের সাথে স্বাভাবিকভাবে দেখা করছে না, কথা বলছে না এবং সবাই আতঙ্কিত। সুতরাং মানুষের উচিত তার অসহায়ত্বের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা এবং গবেষণা করা। তার উচিত অহমিকা, অহঙ্কার এবং দম্ভ পরিহার করা। তার উচিত অন্যায় কাজকে পরিহার করা এবং সত্য-ন্যায়ের পথে চলা। তার উচিত মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করা এবং মানুষের প্রতি দমন, নিপীড়ন বন্ধ করা। তার উচিত স্রষ্টার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা এবং অতীত ভুলের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করা। তা না হলে মানুষের জন্য দুঃখ এবং কষ্টই একমাত্র অর্জন। প্রযুক্তির কল্যাণে করোনাভাইরাসের কথা মুহূর্তেই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। সাথে সাথে করোনাভাইরাস দমনের তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। কিন্তু করোনাভাইরাসে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে এবং মারা যাচ্ছে। এদিকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সারা বিশ্বে সতর্কতা ঘোষণা করেছে। আমরা আশা করব করোনাভাইরাস দমনে সবার প্রচেষ্টা সফল হবে, খুব শিগগিরই করোনাভাইরাস চিরতরে নির্মূল হবে এবং এর হাত থেকে মানবজাতি রক্ষা পাবে।
করোনাভাইরাস একটি অতীব ছোট প্রাণী, খালি চোখে দেখাই যায় না। আর ছোট্ট এই প্রাণীটার কাছেই যখন মানুষ পরাজিত হলো, তখন অন্য একটি বিষয় চিন্তার জগতে প্রবেশ করল। আর তা হলো মানুষের ক্ষমতার সীমা, পরিসীমা এবং অসহায়ত্ব। এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রাণী মানুষের আসলে অহঙ্কার করার মত কিছুই নেই। মানুষের জন্ম এবং মৃত্যুর ওপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। তার জন্মের সময় এবং জন্মস্থান নিজ কর্তৃক নির্ধারিত নয়। কে কখন মারা যাবে তা জানার কোনো ব্যবস্থা নেই। মানুষ ইচ্ছা করলে নিজের শরীরটাকে ছোট বা বড় করতে পারে না। তার গায়ের রঙটাও পরিবর্তন করতে পারে না। ইচ্ছা করলেই মানুষ আকাশে উড়তে পারে না, সাগরতলে বাস করতে পারে না এবং হাজার বছর ধরে বাঁচতেও পারে না। তবু মানুষের এই সব বিষয়ে কোন ভাবনা নেই। অর্থ বিত্ত আভিজাত্যের নেশায় মশগুল। ক্ষমতার মোহে অন্ধ। জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। মানুষকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। দুর্নীতি করে সম্পদ বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। একটি বাড়ি হলে চাই আরো একটি বাড়ি, একটি গাড়ি হলে দরকার আরো একটি গাড়ি। বিলাসিতার শেষ নেই, চাহিদার সীমা নেই। অথচ এই সব অর্থ, সম্পদ, আভিজাত্য এবং ক্ষমতার বাহাদুরি- সবই ছেড়ে মানুষকে এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হয়। যেই সম্পদ সে অর্জন করে, সেই সম্পদই সে ভোগ করতে পারে না। এটাই অনিবার্য বাস্তবতা । তবু মানুষের চাওয়া পাওয়ার শেষ নেই, অহমিকার অন্ত নেই। আর এসব নিয়ে একটু চিন্তারও কোন সুযোগ আজ আমাদের নেই।
মানুষেরা এই পৃথিবীতে যা কিছুই বানিয়েছে তার সবকিছুর উপাদান কিন্তু প্রকৃতিতেই বিদ্যমান। মানুষ কেবল চিন্তা, গবেষণা এবং পরিশ্রম করে সেটাকে ব্যবহারের উপযোগী করেছে। আমরা লোহা দিয়ে বাড়ি, বিমান, জাহাজ তৈরি করেছি। কিন্তু সেই লোহা তো প্রকৃতিরই দান। আমরা জ্বালানি তেল দিয়ে গাড়ি, বিমান, জাহাজ, কলকারখানা সবই চালাচ্ছি। কিন্তু সেই জ্বালানি তেল ও প্রকৃতিরই দান। মানুষ সেটাকে কেবল ব্যবহার উপযোগী করছে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির চমকপ্রদ উপাদান কম্পিউটারের চিপস এর মূল উপাদান সিলিকন তো প্রকৃতিরই অবদান। মানুষ গবেষণার মাধ্যমে সেটাকে কেবল ব্যবহার উপযোগী করেছে। এভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে প্রতিটি জিনিসই প্রকৃতির দান। যে সূর্য পৃথিবীকে আলো দেয়, যে চন্দ্রকে আমরা উপভোগ করি তাও প্রকৃতির দান। আবার সাগর, নদী, পর্বতও মানুষের হাতে সৃষ্ট নয়। যে অক্সিজেন আর পানি নিয়ে আমরা বেঁচে আছি সেটাও প্রকৃতির দান। যে খাবার আমরা খাই তাও সব প্রকৃতির অসীম দান। আর, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে না। চিকিৎসাবিজ্ঞান একজন মানুষের রোগ নিরাময়ে সক্ষম। কিন্তু তাই বলে মানুষকে অমরত্ব দানে সক্ষম নয়। নারী গর্ভে থাকা সন্তানটি ছেলে নাকি মেয়ে তা প্রসবের আগে জানা সম্ভব। কিন্তু তাই বলে ইচ্ছামত ছেলে অথবা মেয়ে শিশুর জন্ম দেয়া সম্ভব নয়। মানুষ তার ইচ্ছামত দিন রাত্রিকে যেমন বড় ছোট করতে পারে না, ঠিক তেমনি রোদ বৃষ্টি আর শীতকেও নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। একইভাবে ভূমিকম্প, অতি বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ¡াসের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগকে বন্ধ করার উপায়ও মানুষ আবিষ্কার করতে পারেনি। কারণ হচ্ছে মানুষের জ্ঞান এবং ক্ষমতার একটি সীমারেখা আছে, যা অতিক্রম করা কোন মানুষের পক্ষে কোনদিনও সম্ভব নয়। এই বাস্তবতাকে মানতেই হবে।
সুতরাং মানুষের উচিত বাস্তবতায় ফিরে আসা, বাস্তববাদী হওয়া এবং এই মহাবিশ্বের স্রষ্টার কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করা। সুতরাং আসুন আমরা সবাই নিজেদেরকে জানি, স্রষ্টাকে জানি এবং তাকে মানি। কিভাবে এই পথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হলো, এই পৃথিবীতে আমাদের কাজ কী এবং মরণের পরে কী হবে সে সব বিষয় জানা এবং সেই অনুযায়ী পথ চলা আমাদের অপরিহার্য দায়িত্ব। তাহলেই কেবল মানুষের জীবন শান্তি এবং সুখের হবে। তা না হলে মানুষের জন্য দুঃখ আর কষ্ট ছাড়া আর কিছুই নেই, যা কারো কাম্য নয়। এদিকে উন্নত দেশসমূহ অস্ত্র তৈরির পিছনে প্রতি বছর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করছে এবং এই খরচ বছরের পর বছর ধরে চলছে। আর অনুন্নত দেশসমূহ প্রতি বছর অস্ত্র কেনার পিছনে খরচ করছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার। অথচ পৃথিবীর ছয় কোটি মানুষ উদ্বাস্তু আর একশত কোটি মানুষ দরিদ্র। অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় বিভিন্ন দেশ যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ব্যয় করছে, তার সিকি ভাগও যদি মানুষের কল্যাণে ব্যয় করত, তাহলে পৃথিবী থেকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং করোনাসহ বিভিন্ন রোগ-ব্যাধি বহু আগেই দূর হতো আর বিশ্বজুড়ে মানুষের জীবন অনেক উন্নত হতো এবং একইসাথে মানবজাতি সুখী হতো। আর এটাই হতো সত্যিকারের মানবতার কল্যাণ।
লেখক : প্রকৌশলী ও উন্নয়ন গবেষক

SHARE

Leave a Reply