করোনা দুর্যোগ ও নীতিহীন রাজনীতির নগ্ন চেহারা -মো: কামরুজ্জামান (বাবলু)

আমরা সবাই জানি রাজনীতির অতি সাধারণ অর্থ হলো রাজার নীতি বা শ্রেষ্ঠনীতি। ইংরেজিতে যাকে আমরা পলিটিকস (চড়ষরঃরপং) বলে থাকি। বিশ্ববিখ্যাত ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে পলিটিকসের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা হলো: Politics means the activities of the government, members of law-making organizations, or people who try to influence the way a country is governed. অর্র্থাৎ রাজনীতি বলতে সেই সব কার্যকলাপকে বোঝায় যা সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসমূহ কিংবা ওই সব লোকের কাজ যা রাষ্ট্র কিভাবে শাসিত হবে সেক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে।
তাই এটা দিবালোকের মতোই পরিষ্কার যারা রাজনীতি করেন তারা হয় ক্ষমতার মসনদে বসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন অথবা বিরোধী দলে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখে সরকারকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করে থাকেন।

আমাদের দেশের দীর্ঘদিনের বহুল পরিচিত চিত্র হলো- বিরোধী দল সবসময় যুক্তি খোঁজে কিভাবে সরকারের সমালোচনা করা যায়। সরকার সঠিকভাবে কাজ করছে নাকি ভুল পথে হাঁটছে সেটি বিরোধীদের কাছে মুখ্য নয়, তাদের কাছে মুখ্য বিষয় হলো- সরকারকে জনগণের সামনে সমালোচনার পাত্র বানিয়ে বেকায়দায় ফেলা।
অপরদিকে, নীতিহীন সরকারেরও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকে বিরোধী শক্তিকে কিভাবে দমন করা যায় এবং তাতে যতই নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বন করা হোক না কেন। আর তারই ফলশ্রুতিতে আমরা যে কোনো কর্তৃত্ববাদী, অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী, জুলুমবাজ কিংবা ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে গুম, খুন, হামলা, মামলার ঘটনা অনেক বেশি দেখতে পাই। আর এই অবস্থা দেশ-কাল-পাত্রভেদে সব জায়গায়ই প্রায় এক ও অভিন্ন। এ কারণেই আমরা অহরহ দেখতে পাই যে অপরাধে ক্ষমতায় থাকার সুবাদে খালাস পাওয়া যায়, সেই একই অপরাধে বিরোধী পক্ষে থাকার কারণে জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়। যুগের পর যুগ আমরা এই দৃশ্য দেখে আসছি।
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় অংশই নীতি-নৈতিকতা ও সততার পথ থেকে বহু দূরে সরে গেছে অনেক আগেই। মুখে শুধু বড় বড় বুলি আওড়িয়ে বাস্তবে ঠিক তার উল্টো কাজ করাটাই যেন এখনকার রাজনীতির বড় অলঙ্কারে পরিণত হয়েছে। কে কত বেশি জনগণের সাথে মিথ্যা কথা বলতে পারে, কতটা সুচারুরূপে প্রতারণা করতে পারে, কার শঠতার জোর বেশি এবং কে কত বেশি চাপাবাজি করতে পারে, সেই যেন তত বেশি রাজনীতির যোগ্য।

রাজনীতিবিদদের এই কালো চেহারাটা যেন আরেকবার খোলাসা হলো করোনাভাইরাসের আগমনের পর। এত ব্যাপকভাবে বিশ্বব্যাপী কোনো মহামারী এর আগে কখনো বিশ্ববাসী দেখেছে কিনা তার নজির ইতিহাসে নেই। যে কোনো সময় যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন এই ভাইরাসে, মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারেন যে কোনো সময়। সাধারণত এ ধরনের মহামারীর মধ্য দিয়ে মানুষের মনে এক ধরনের চেতনা জাগে, মানুষ নিজেকে শোধরায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা কতটা নিজেদেরকে শোধরালেন?
মনে হতে পারে, অনেক মানুষই তো অনেক কিছু করছেন, আমলাদের লুটপাটেও তো দেশ অস্থির। তাহলে রাজনীতিবিদদের নিয়ে কেন বাড়তি আলোচনা। আসলে রাজনীতিবিদদের বিষয়টি আলাদা। কারণ তারাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দায়িত্বে থাকেন। তাই রাজনীতিবিদদের নীতি-নৈতিকতার ওপর দেশের আমলা ও প্রশাসন থেকে শুরু করে সব সেক্টরের সুশাসন ও শৃঙ্খলা অনেকটাই নির্ভরশীল। তাই স্বাভাবিকভাবেই যখন কোনো দেশে রাজনীতিবিদদের ভূমিকা যথাযথ হয় না, তাদের মধ্যে দেশপ্রেমের ঘাটতি দেখা যায়, তখন তার কুফল ভোগ করতে হয় সমস্ত দেশবাসীকে।

এবার করোনা প্রসঙ্গে আসা যাক। করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সরকার ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা নানাভাবে অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। শুরু থেকেই সব কিছু নিয়ে চলছিল এক ধরনের ব্যবসায়িক চিন্তা-চেতনা। পরিস্থিতি ভয়াবহ হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র ভারত থেকে করোনার টিকা কেনা এবং তা কোনো একটি বিশেষ কোম্পানিকে দিয়ে করানোর মধ্য দিয়ে শুরুতেই দেশবাসী দেখলেন যে দেশের চরম সঙ্কটকালেও চরম স্বজনপ্রীতি, নতমুখী কূটনীতি ও মুনাফাখোরদের স্বার্থের বাইরে যেতে পারেনি সরকার।
শুধু তাই নয়, হঠাৎ করে ঘোষণা দেয়া হয় লকডাউনের। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই ছোট্ট দেশে বিপুলসংখ্যক নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ রয়েছেন। তাদের কী হবে, তারা কিভাবে তাদের সংসার চালাবেন- সেই বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান প্রতিশ্রুতি কিংবা কর্মপরিকল্পনা ছাড়াই লকডাউন কার্যকর করা হয়। বন্ধ করে দেয়া হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

চলতি বছরের ২০ শে এপ্রিল বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) প্রকাশিত এক নতুন জরিপে দেখা যায় করোনাভাইরাসের ফলে বাংলাদেশে নতুন করে দরিদ্র হয়েছেন দুই কোটি ৪৫ লাখ মানুষ। পুরনোদের সাথে নতুন করে যুক্ত হওয়া এই দরিদ্র মানুষগুলো কী করবেন? তারা কিভাবে দুবেলা, দুমুঠো মোটা ভাত, মোটা কাপড়ের জোগান দেবেন তাদের পরিবারের জন্য এই কঠোর লকউাউনের মধ্যে- সে ব্যাপারে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা সরকারের পক্ষ থেকে আসা দরকার ছিলো লকডাউন শুরুর আগে থেকেইে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি যখন এই কলামটি লিখছি তখনও দেশে কঠোর লকডাউন চলছে। মাঠে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য কাজ করছেন। এরই মধ্যে জেল-জরিমানা করা হয়েছে হাজারের ওপর মানুষকে। মনে হতে পারে দেশে যখন করোনাভাইরাসের ভয়াবহ ইন্ডিয়ান ভ্যারায়েন্ট চলছে তখন কঠোর লকডাউন ব্যতীত সোসাল ডিসট্যান্স ও মাঠ পর্যায়ে স্বাস্থ্যবিধি যথাযথ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

ঢাকা শহরের অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকশা-সিএনজি চালক, দিনমজুর ও হোটেল শ্রমিকসহ নানা নিম্ন আয়ের মানুষের সাথে কথা বলেছি। সবার কাছেই যে অভিন্ন বক্তব্য শুনতে পেয়েছি তা হলো- করোনা তো অনেক দূরের বিষয়, এভাবে চলতে থাকলে তারা তো না খেয়ে মারা যাবেন। যার ঘরে খাবার নেই, কাজে বের না হলে সন্তান অভুক্ত থাকবে, ঘরে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অসুখের ওষুধ জোগাড় হবে না তার কাছে করোনার ঝুঁকির চেয়েও বড় ঝুঁকি উপার্জন বন্ধ থাকা।
কয়েকদিন আগে ঢাকার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখলাম কয়েকজন নারীশ্রমিক রাস্তা সংস্কারের কাজে পুরুষের সাথে একইভাবে কাজ করছেন। তাদের কাছে গিয়ে কথা বললাম। একজন জানালো সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত কাজ করলে তাদের প্রত্যেককে ৪০০ টাকা করে দেয়া হয় দৈনিক মজুরি হিসেবে। একেবারে একই কাজ করছেন কয়েকজন পুরুষ, তাদের দেয়া হচ্ছে ৪৫০ টাকা। আমি জানতে চাইলাম এখানে নারী-পুরুষের কাজের কোনো পার্থক্য আছে কিনা এবং পুরুষদের বেশি কাজ করতে হয় কিনা। জবাবে তারা বললেন তাদের একই কাজ করতে হয়। কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্য কেন? কোনো সদুত্তর কেউ দেয়নি।

তবে, আমি যেই মজার তথ্যটি পেলাম ত হলো- লকডাউনের কারণে পথে পথে নানা বাধা। পুরুষ লোক বের হলে জেল-জরিমানার ঝুঁকিও বেশি। তাই নারীরা বের হচ্ছেন কাজের সন্ধানে। হয়তোবা আমাদের কাছে এটা খুব স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু এমন দৃশ্য কখনোই স্বাভাবিক নয়। আমরা একটু চোখ বন্ধ করে কল্পনা করি, আমার মা কিংবা বোন কিংবা স্ত্রী রাস্তায় কোদাল নিয়ে মাটি কাটছেন, সেই মাটি আবার মাথায় করে আরেক জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন, শরীর থেকে ঘাম বের হয়ে সেই ঘামে কাপড়-চোপড় ভিজে তা শরীরের সাথে লেপটে আছে। পাশ দিয়ে লোকজন যাচ্ছেন এবং আমার সেই মা-বোন-স্ত্রীর দিকে কেউ কেউ কামুক দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, তাদের শরীরের আকর্ষণীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো লোলুপ দৃষ্টিতে দেখছে। নিশ্চয়ই আমরা এমন দৃশ্য দেখতে চাই না।

আসলে আমাদের নিজেদের জীবনে এমনটি ঘটছে না বিধায় এটা আমাদের কাছে সহজ মনে হচ্ছে। কিন্তু আজ যদি আমাদের মধ্যে সেই চেতনা থাকতো যার কারণে হযরত ওমরের মতো অর্ধেক পৃথিবীর মালিক বলেছিলেন- যদি ফোরাত নদীর পাড়ে একটি কুকুরও না খেয়ে মারা যায় তাহলে এই ওমরকে কাল কেয়ামতের মাঠে আল্লাহর নিকট জবাবদিহি করতে হবে, তাহলে আমরা অনেক কিছুই ভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করতে পারতাম, আমাদের অনুভূতিগুলো নিশ্চয়ই অন্যরকম হতো। আমরা সবাই জানি হযরত ওমর রা. রাতের আঁধারে মরুভূমির ভেতর দিয়ে ঘুরে বেড়াতেন, আর মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে তাদের খোঁজ-খবর নিতেন। অর্ধেক পৃথিবীর খলিফা নিজ মাথায় করে খাবারের বস্তা বহন করে নিয়ে গভীর মরুভূমির ভেতর গরিব বেদুইনের সন্তানকে খাইয়েছেন। নিজের গোলামকে উটের পিঠে বসিয়ে রশি টেনে দীর্ঘ পথে পাড়ি দিয়েছেন, এমন শত শত উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।

কিন্তু প্রিয় মাতৃভূমিতে আমরা কী দেখছি? করোনার রিলিফের মাল দেদারছে চুরি করা হচ্ছে। ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে গরিবের জন্য বরাদ্দ রিলিফ লোপাট করা হচ্ছে। এ নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে খোদ সাংবাদিকদের ওপরই চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে হামলা, মামলা ও জুলুম নির্যাতন। চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, ২০২০ সালে কমপক্ষে ২৪৭ জন সাংবাদিক রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং বাংলাদেশ সরকারের সাথে যুক্ত অন্যান্যদের দ্বারা হামলা, হয়রানি ও হুমকির শিকার হয়েছিলেন। সংস্থাটির আন্তর্জাতিক অ্যাডভোকেসি ও মামলা-মোকদ্দমার ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যাঞ্জেলিতা ব্যায়েন্স বলেন: ‘শুধুমাত্র নিজেদের কাজ করার জন্য বাংলাদেশি সাংবাদিকরা নির্বিচারে গ্রেফতার, নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এবং নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিচ্ছেন।’

অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে পয়লা জুলাই থেকে দেশব্যাপী কঠোরতরো লকডাউন ঘোষণা করা হলো খেটে খাওয়া গরিব মানুষের ঘরে খাবার আছে কিনা সে ব্যাপারে ন্যূনতম খোঁজখবর না নিয়েই। এই কঠোর লকডাউনেরও প্রায় সপ্তাহখানেক আগে হঠাৎ করেই সরকার বাস, ট্রেন ও লঞ্চ বন্ধ করে দেয়। এমনকি এক রাতের ঘোষণায় সবকিছু বন্ধ করে দেয়া হয় সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার নামে। অথচ সবকিছু বন্ধ করে দেয়ার পর দেখা গেলো রাস্তায় প্রাইভেট মাইক্রোবাস। সেই মাইক্রোবাসে গাদাগাদি করে দ্বিগুণেরও বেশি ভাড়া দিয়ে মানুষ ঢাকাসহ বিভিন্ন নগর ছেড়ে গ্রামের পথে পাড়ি জমান। চরমভাবে লঙ্ঘিত হয় সামাজিক দূরত্ব। আর সেই মাইক্রোবাসগুলো কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের লোকদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং মানুষকে জিম্মি করে কারা লাভবান হচ্ছেন তা সবারই জানা। ফলে দেখা গেলো কঠোর লকডাউনের মধ্যে দেশব্যাপী হু হু করে বেড়ে যায় করোনায় মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা।

তাই পরিশেষে বলতে চাই। করোনার এই মহাদুর্যোগ আরেকবার সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা বিশেষ করে যাদের নিয়ন্ত্রণে এখন সবকিছু তারা কতটা অনৈতিক হয়ে গেছেন এবং বিপদের মধ্যেও নীতি-নৈতিকতার পথ গ্রহণ করছেন না। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পবিত্র কুরআনের একটি আয়াত মনে পড়ছে। “আল্লাহ তাদের অন্তরে এবং তাদের কানে মোহর লাগিয়ে দিয়েছেন এবং তাদের চোখসমূহে রয়েছে পর্দা। আর তাদের জন্য রয়েছে মহা আজাব।” (সূরা বাকারা : ৭)

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply