‘করোনা’ বিপর্যয় -সাজ্জাদ হোসেন সুমন

করোনাভাইরাস এখন গোটা বিশ্বের জন্য এক মহা বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ বছর ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ‘করোনাভাইরাস ডিজিজ ২০১৯’-এর সংক্ষিপ্ত রূপ কোভিড-১৯ নামে নামকরণ করার পর করোনাকে আন্তর্জাতিক মহামারী ঘোষণা করে। ১১ মার্চ বুধবার রাতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ঘোষণা দেয়। কোনও রোগ ছড়িয়ে পড়লে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তিনটি পর্যায়ে তাকে ভাগ করে। Outbreak (প্রাদুর্ভাব) অর্থাৎ রোগটি ছড়াচ্ছে, Epidemic (মহামারী), ঊঢ়রফবসরপ কোনও নির্দিষ্ট অঞ্চল বা দেশেও হতে পারে; কিন্তু যখন তামাম দুনিয়ায় সেই রোগ ছড়িয়ে যায় তখন তা Epidemic অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মহামারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। করোনা নামক নতুন এই রোগটিকে প্রথমদিকে নানা নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিল, যেমন- ‘চায়না ভাইরাস’, ‘করোনাভাইরাস’, ‘২০১৯ এনকভ’, ‘নতুন ভাইরাস’, ‘রহস্য ভাইরাস’ ইত্যাদি। রোগটি এমন জটিল যে সারা বিশ্ব এর হাত থেকে বাঁচার জন্য নানা রকম সচেতনতা অবলম্বন করে।

দেশে দেশে করোনা আতঙ্ক
খুব কম সময়ের ব্যবধানেই মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমিত হতে পারে বলে এই রোগ চীন থেকে দ্রুতই বিশ্বের নানান দেশে ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, কানাডা, সৌদি আরব, কাতার, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, জাপান, মালয়েশিয়া, নেপাল, জার্মানি, শ্রীলংকা, যুক্তরাষ্ট্র, ভিয়েতনাম, তাইওয়ান, ইতালিসহ এ যাবৎ ১৮৫টি দেশে ২ লক্ষ ২৫ হাজারেরও অধিক মানুষের শরীরে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। এ রোগের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও সীমান্তে কড়াকড়ি এবং ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। সৌদি আরবের হজ ও ওমরার ফ্লাইট বাতিল করা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ ইতালিতে করোনাভাইরাস মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জীবনযাত্রায় এরকম ব্যাপক ব্যাঘাত আর দেখা যায়নি এই দেশে। সেখানে বন্দীরা জেল থেকে পালিয়ে জেলখানায় আগুন ধরিয়ে দেয়। রাস্তায় সাধারণ মানুষের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সরকারি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে শত শত মানুষ পালিয়ে যায়। সেখানকার রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল শপিং মল, দোকানপাট সবকিছু জনশূন্য ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর লোকজনকে বাইরে বের হলে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করার আইন জারি হয়। ফলে ৪০ বছর বয়সী থেরেসা ফ্রানজাসে ১৪ মার্চ শনিবার মারা গেলে তাকে দাফন করতে পারছিলেন না বলে জানান থেরেসার ভাই লুকা। কেউই করোনা রোগীর দাফনে এগিয়ে আসছিলেন না। এমনকি হাসপাতালগুলোও বারবার ফিরিয়ে দিচ্ছিল বলে অভিযোগ করেন লুকা। প্রায় ৩৬ ঘণ্টা ধরে মৃতবোনের দেহ আগলে বসেছিলেন তিনি। এজন্য ফেসবুক লাইভে এসে বোনের লাশ নিয়ে তাকে আহাজারি করতে দেখা যায়।
ইতালির সাথে সাথে ব্রিটেনেও করোনাভাইরাসে মারা গেছে অনেক লোকজন। গত ১৪ মার্চ একদিনেই মোট ১০ জন মারা যাওয়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে ব্রিটেনের জনগণ। বিবিসি’র মতে, সুপারমার্কেটগুলোতে হঠাৎ করে বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চরম আকাল দেখা দেয়। বিশাল বিশাল সুপারশপের তাকগুলোতে টয়লেট পেপার, হাত ধোয়ার তরল সাবান, পাস্তা, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, টিনজাত খাদ্য, আটা, ময়দার মতো জিনিস প্রায় উধাও। করোনাভাইরাস নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার কারণে ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষজন তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ঘরে মজুদ করতে শুরু করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষজন এমন কথাও লিখছেন যে শুধু এক প্যাকেট টয়লেট পেপার কিনতে দোকানের পর দোকানে ঘুরছেন তারা। ব্রিটেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২২৯ জন বিজ্ঞানী জানিয়েছেন কোভিড-১৯ করোনা এভাবে ছড়াতে থাকলে সরকারকে আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
এই আতঙ্ক গ্রাস করেছে ইসরাইলের সেনাবাহিনীকেও। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে ইসরাইলের ১ হাজার ২৬২ সেনাকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। জানা যায়, সেনাদের কাজে না গিয়ে দুই সপ্তাহ বাড়িতে অবস্থান করতে বলা হয়। ইসরাইলের সামরিক বাহিনীর এক মুখপাত্র জানায়, যেসব সেনা সদস্য করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদেরকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। তার দাবি, এই সমস্ত সেনা বেশিরভাগই ছুটিতে দেশের বাইরে ছিল। কিন্তু দেশে ফেরার পরেই এই সমস্ত সেনার মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা গিয়েছে। আর সতর্কতা হিসাবেই এই সিদ্ধান্ত বলে জানান তিনি। এর আগে ইসরাইলের ১৮৯ সেনাকে ১৪ দিনের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে আইসোলেশনে রাখা হয়েছিল।

সারা বিশ্বে এমন পরিস্থিতির সাথে সাথে বাংলাদেশেও এই রোগ ধরা পড়ে। গত ১৬ মার্চের পর দেশে ১ জন মৃত্যুর পর থেকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সবখানে। রাজশাহী থেকে সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। মাদারীপুরের শিবচরকে লক ডাউন ঘোষণা করা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘মাদারীপুরের পর শরিয়তপুর, ফরিদপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকা লক ডাউন করার কথা ভাবছে সরকার। ওইসব এলাকায় বিদেশ থেকে বেশি প্রবাসী এসেছেন। তারা অনেকে বিদেশ থেকে এসে সঙ্গরোধ না করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাজধানীর টঙ্গী ইজতেমা মাঠকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। বাংলাদেশি রোগতত্ত্ববিদ, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক সেব্রিনা ফ্লোরা জানান, ‘বাংলাদেশে ২ হাজার ৩শ ১৪ জন আছেন হোম কোয়ারেন্টাইনে। করোনাকে তাই এখন হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।’ এই অবস্থায় বাংলাদেশ সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে নানারকম ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ কথাবার্তা ও হেয়ালিপনা মন্তব্য করে।
এই পরিস্থিতিতে আমরা সচেতন না হলে বাংলাদেশের ভাগ্যে কী দুর্যোগ অপেক্ষা করছে তা বলা যায় না। বিশ্বদরবারে দূষিত হিসেবে চ্যাম্পিয়ন হওয়া বর্তমান ঢাকা নগরীতে যে দূষণ ও ধুলোবালি ছড়াচ্ছে তার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুবই জরুরি। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করা মাস্টার আব্দুর রহিম জানান, ‘করোনাভাইরাস মহামারীতে তার এবং বাংলাদেশের প্রায় দশ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থীর ভাগ্যে কী আছে তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।’ রোহিঙ্গাদের বর্তমান অবস্থান এখন দক্ষিণ কক্সবাজার জেলায়। এই ভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কা বেশি সেখানকার শরণার্থীদের। নির্যাতিত এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতা আনাদোলু একটি এজেন্সিকে জানায়, ‘আমরা দরিদ্র, রাষ্ট্রহীন। আমরা অন্যের করুণার ওপর নির্ভরশীল। আমরা যে অঞ্চলে বাস করি সে অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এটি সব ধরনের ভাইরাসের প্রজনন ক্ষেত্র। আমাদের মিলিয়নেরও বেশি লোক ৩৪টি শরণার্থী শিবিরে বসবাস করে। বাঁশের কাঠি দিয়ে তৈরি একটি একক অস্থায়ী ঘরে চার থেকে পাঁচজন থাকে। বেশির ভাগ তাঁবুতে; কাঁচা মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্লাস্টিকের কাগজে ঘুমায়। স্বাস্থ্য বিষয়ক নীতি নিয়ে ভাবনা বা করোনাভাইরাসকে মোকাবেলা করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা তাদের নেই।’
রোগটির লক্ষণ
জ্বর, সর্দি-কাশি, শ্বাস প্রশ্বাসের সমস্যা দিয়ে ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয়, এরপর শুকনো কাশি দেখা দিতে পারে। প্রায় এক সপ্তাহ পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। পরবর্তীতে ভাইরাসটি রোগীদের শরীরে নিউমোনিয়া তৈরি করে, যা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগজনক। এ ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল, শক্তি হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়া, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, শরীর ব্যথা বমি বমি ভাব, হাতে পায়ে কম্পন ইত্যাদি হতে পারে। সারা বিশ্বের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এ বিষয়ে চরম সতর্ক করেছেন। করোনাভাইরাসের অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ছয় থেকে সাতটি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি মানুষের দেহকোষের ভেতরে ‘মিউটেট (Muted) করে’, অর্থাৎ গঠন পরিবর্তন করে নতুন রূপ নেয় এবং সংখ্যাবৃদ্ধি করে। ফলে এটি আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছে যে, এ ভাইরাস একজন মানুষের দেহ থেকে আরেকজন মানুষের দেহে ছড়াতে পারে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হালকা ঠাণ্ডা লাগা থেকে শুরু করে মৃত্যুর সব উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর মার্ক উলহাউসের মতে, “করোনাভাইরাসের জেনেটিক কোড বিশ্লেষণ করে দেখা যায় এটা অনেকটাই সার্স ভাইরাসের মতো। যে ভাইরাসে ২০০০ সালের শুরুতে এশিয়া মহাদেশের অনেক দেশে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়। যখন আমরা নতুন কোনো ভাইরাস দেখি, তখন জানতে চাই এর লক্ষণগুলো কতটা মারাত্মক। এ ভাইরাসটি অনেকটা ফ্লুর মতো কিন্তু সার্স ভাইরাসের চেয়ে খুব বেশি মারাত্মক নয়। প্রথমে বিজ্ঞানীদের অজানা ছিল বলে এই ভাইরাস চীনে অনেক মানুষের ফুসফুসে মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করে এবং বিশ্বের নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।”

উৎপত্তি ও বিস্তার
করোনাভাইরাসের উৎপত্তি চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর। গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীন কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। তবে ঠিক কিভাবে এর সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তা এখনও নিশ্চিত করে বলতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সম্ভবত কোনও প্রাণীই হবে এর উৎস। প্রাণী থেকেই প্রথমে ভাইরাসটি কোনও মানুষের দেহে ঢুকেছে এবং তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। এর আগে সার্স ভাইরাস প্রথমে বাদুড় এবং পরে গন্ধগোকুল থেকে মানুষের দেহে ঢুকে এবং মার্স ভাইরাস উট থেকে ছড়িয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ২০০২ সালে মার্স এবং ২০১২ সালে মার্সের মতোই নভেল করোনা ভাইরাস; যা ২০১৯ এনসিওভি নামকরণ হয়। ২০০৯ সালে সোয়াইন ফ্লু, ২০১৩ সালে ইবোলা, ২০১৪ সালে পোলিও, ২০১৬ সালে জিকা ভাইরাস এবং ২০১৯ সালে আবারো ইবোলার প্রাদুর্ভাবের কারণে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরির মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় “পাবলিক হেলথ্ ইমাজেনিস” গত ১ দশকে অন্তত ৫ বার আন্তর্জাতিক সতর্কতা জারি করে। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে উহান শহরে সামুদ্রিক একটি খাবারের কথা বলা হচ্ছে। শহরটির একটি বাজারে গিয়েছিল এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই বাজারটিতে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী বেচাকেনা হতো। কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি করোনাভাইরাস বহন করতে পারে বলে ধারণা করা হয়। উহান শহরের ওই বাজারে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ এবং সাপও বিক্রি হতো।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ভাইরাসটি নতুন হওয়াতে এখনও এর কোনও টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এই রোগ ঠেকাতে এমন কোনও চিকিৎসাও আপাতত নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানুষকে নিয়মিত ভালোভাবে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা এবং ঠাণ্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকারও পরামর্শ দিয়েছে। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাবিয়েল লিউং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এ নির্দেশনায় বলেছেন, হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, বারবার হাত ধুতে হবে। হাত দিয়ে নাক বা মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাইরে গেলে মাক্স পরতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন তাহলে মাক্স পরুন, আর নিজে অসুস্থ না হলেও, অন্যের সংস্পর্শ এড়াতে মাক্স পরুন।’ অনেকে বলে থাকে বাংলাদেশে তাপমাত্রা এখন বেশি তাই টেনশনের কারণ নেই কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর পরিচালক ডা. সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, তাপমাত্রার সঙ্গে করোনাভাইরাসের কোনো সম্পর্ক নেই। উচ্চ তাপমাত্রা আছে এমন দেশেও মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে। করোনাভাইরাস ৭০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় টিকতে পারে না। কোনো দেশেই এতো তাপমাত্রা নেই। গ্রীষ্মকালের তাপমাত্রায় করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা কমে যাবে এ ভরসায় বসে থাকা যাবে না। সবাইকে সচেতন হতে হবে।”

এ বিষয়ে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলাম সব বিষয়ই মধ্যপন্থা শিক্ষা দেয়। মহামারীর ক্ষেত্রে প্রিয়নবী (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘যখন কোনো এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়ে তখন যদি তোমরা সেখানে থাকো তাহলে সেখান থেকে বের হবে না। আর যদি তোমরা বাইরে থাকো তাহলে তোমরা সেই আক্রান্ত এলাকায় যাবে না।’ (বুখারী ও মুসলিম)। অন্য জায়গায় এসেছে, যখন কোন কওমের মধ্যে অশ্লীলতা বেহায়াপনা ছড়িয়ে পড়ে তখন তাদের মধ্যে এমন এমন রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়বে যা ইতঃপূর্বে দেখা যায়নি। (ইবনে মাজাহ)। হযরত ইবনু আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে নবী (সা.) মু‘আয (রা)কে ইয়েমেনে পাঠানোর সময় বলেন, মযলুমের খারাপ দু‘আকে ভয় কর, কেননা তার দু‘আ ও আল্লাহর মাঝে কোনো বাধা নেই। (সহিহ বুখারী)। তিনি (সা.) আরো বলেন, আমার উম্মত কেবলই যুদ্ধ ও মহামারীতে ধ্বংস হবে। যে এলাকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়বে সেখানে অবস্থান করে যদি কেউ মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে শহীদ বলে আখ্যায়িত হবে। আর উপদ্রব এলাকা থেকে যে পালিয়ে আসবে তাকে জিহাদ থেকে পলায়নকারীর মতোই গণ্য করা হবে। যুদ্ধের ময়দান থেকে নিজেদের সঙ্গীসাথীদের সহযোগিতা না করে পলায়ন করাকে হাদিসে কবিরা গোনাহ আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তেমনি কুরআন মাজিদে জিহাদ থেকে পলায়নকারীকে আল্লাহর ক্রোধে নিপতিত হওয়ার ধমকি শোনানো হয়েছে। আর আক্রান্ত এলাকা থেকে পলায়ন করা জেহাদ থেকে পলায়ন করার মতই। যারা আল্লাহ তা’আলার ওপর বিশ্বাস রাখে তাদের পায়ে যদি কোনো কাঁটাও ফুটে, আল্লাহর কাছে এরও বিনিময় পাওয়া যাবে। মহামারীর বিষয়ে রাসূল (সা.) বলেন, মহামারী আল্লাহ তাআলার একটি শাস্তি। তবে তা মুসলমানদের জন্য আল্লাহর রহমত। (বুখারী)
বিশ্বনবী (সা.)-এর এ নির্দেশের কারণ ব্যাখ্যা করে ওলামায়ে কেরাম বলেছেন-
১. যদি মহামারী আক্রান্ত এলাকার লোকজন পলায়ন করে অন্যত্র চলে যায় তবে যেসব লোক মহামারীতে আক্রান্ত হয়েছেন তাদের সেবা কে করবেন?
২. সম্পদশালী ব্যক্তিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও গরিব অসহায় ব্যক্তিরাতো পালাতে সক্ষম হবে না।
৩. যদি কেউ মনে করে যে, তাকে এ ভাইরাস বা রোগে এখনও আক্রমণ করেনি, তাই সে পালিয়ে যাবে। আর যদি ওই ব্যক্তি আক্রান্ত হয়ে যায়, তবে সে যে এলাকায় যাবে সে এলাকার মানুষও তার মাধ্যমে সংক্রমিত হবে।
৪. আবার অন্য এলাকা থেকে যদি কোনো সুস্থ মানুষ আক্রান্ত এলাকায় আসে তবে সেও এ ভাইরাস বা মহামারীতে আক্রান্ত হয়ে যেতে পারে।
হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে তিনি আল্লাহর রাসূল (সা.)কে প্লেগ রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে রাসূল (সা) তাঁকে বললেন, এটা আজাব; আল্লাহ তা‘আলা যার প্রতি ইচ্ছা করেন তার জন্য এটি পাঠান। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা একে মু’মিনদের জন্য রহমত বানিয়ে দেন। ফলে যে ব্যক্তি প্লেগ রোগে আক্রান্ত হবে এবং নিজ দেশে ধৈর্য সহকারে (নেকির নিয়তে) অবস্থান করবে, সে জানুক, তাঁকে তাই পাবে যা আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য লিখে দিয়েছেন, ফলে সেই ব্যক্তির জন্য শহীদের মত পুরস্কার রয়েছে।” (সহীহ বুখারী ও আহমাদ)
পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।” (সুরা মায়িদাহ : ৮)
ইবনে হাজর (র) বলেন-
কেউ কোনো প্লেগ বা মহামারী আক্রান্ত এলাকায় থাকলে; রোগের ভয়ে সেখান থেকে পালিয়ে যাওয়া আল্লাহর দৃষ্টিতে গুরুতর অন্যায় কাজ। কারো আগে থেকেই যদি সেই এলাকা ছাড়ার পরিকল্পনা থাকে বা টিকেট কাটা থাকে, তারপরেও আক্রান্ত এলাকা ছাড়া যাবে কিনা তা নিয়েও মতানৈক্য আছে। ইসলামী শরিয়তের আরেকটি বিষয় হলো, কোনো কাজে অল্প ক্ষতি সহ্য করার বিনিময়ে বড়ো কোনো ক্ষতি থেকে বাঁচা গেলে সেই অল্প ক্ষতিকে মেনে নেয়াই উত্তম।
করোনা থেকে মুক্তি পেতে আমাদের নিরাপদ অবস্থান ও বারবার ওজু করে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত দ্রবাদি ও পোশাক পরিচ্ছদ থেকে নিরাপদে থাকতে হবে। হালাল প্রাণীর গোশত ছাড়া হারাম ও হিংস্র প্রাণীর গোশত ভক্ষণ করা যাবে না। সকল প্রকার মহামারী থেকে মুক্তি পেতে রাসূল (সা.) আমাদের জন্য একটি দোয়া শিখিয়ে দিয়েছেন। দোয়াটি হলো-
‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আউজুবিকা মিনাল বারাসি ওয়াল জুনুনি ওয়াল জুজামি ওয়া মিন সায়্যিয়িল আসক্বাম।’ (আবু দাউদ ও তিরমিজি)
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আপনার কাছে আমি শ্বেত রোগ থেকে আশ্রয় চাই। মাতাল হয়ে যাওয়া থেকে আশ্রয় চাই। কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে আশ্রয় চাই। আর (নাম না জানা) সকল দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে আপনার আশ্রয় চাই।’

করোনা থেকে জাতির জন্য শিক্ষণীয় দিক
পৃথিবীতে যতগুলো ধর্ম নিপীড়নকারী দেশ আছে তার মধ্যে চীন অন্যতম। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকায় নিপীড়নের বীভৎস দৃশ্যগুলো অজানাই থেকে যায় বিশ্ববাসীর কাছে। বিভিন্ন গোয়েন্দার মাধ্যমে এ সম্বন্ধে কালেভদ্রে কিছু খবর আমরা জানতে পাই। সেখানকার উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে চীন সরকার নানান সময় নানান রকম ভুয়া ইস্যু তুলে বর্বরোচিত নির্যাতন চালিয়ে থাকে। ইসলামকে নিশ্চিহ্ন করতে চীন মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থার নির্মূল করার কথা বলে থাকে। কিন্তু নামাজ আদায় করা, দাড়ি রাখা, রমজানে রোজা রাখা কিভাবে ধর্মীয় চরমপন্থা হয়, তা আমাদের অজানা। ওরা বুঝাতে চায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান মানে চরমপন্থা। সম্প্রতি মুসলমানদের উপর ওরা কঠোর নির্যাতন চালিয়েছে। পবিত্র কুরআন পরিবর্তন করে আপডেট ভার্সন তৈরি করার ঘোষণা দিয়েছে। শুধু কুরআন নয়, বাইবেলসহ সবকয়টি ধর্মীয় গ্রন্থ নতুন করে লেখার পরিকল্পনা করেছে। চীন সরকার কমিউনিস্ট পার্টির সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের আদলে ধর্মগ্রন্থগুলো পুনর্লিখনের বিষয়ে পরিকল্পনা করে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহ’র এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

মুসলিম নির্যাতন ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ
চীনের একদম পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সবচেয়ে বড় প্রদেশ শিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলিম নির্যাতনের কাহিনী নতুন নয়। এই কাহিনী বেশ পুরনো। শিনজিয়াং প্রদেশটি কাগজ কলমে স্বায়ত্তশাসিত হলেও, কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উইঘুর মুসলমানরা নিজেদের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১৯৪৯ সালে চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কিছুদিন পর চীনের কমিউনিস্ট সরকার উইঘুরদের বৃহত্তর চীনের সাথে যোগ দেয়ার প্রস্তাব জানায়। প্রস্তাব মেনে না নেয়ায় শুরু হয় উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে উইঘুর মুসলমানদের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে কমিউনিজম চাপিয়ে দেয়ার জন্য চীনা কমিউনিস্টরা উঠে পড়ে লেগে যায়। মুসলমানদের ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। মসজিদ ও মাদরাসাগুলো ভেঙে দেয়া হয়। বিভিন্ন ইবাদাত বন্দেগির ওপর নিষেধজ্ঞা জারি করা হয়। এ বিষয়ে চীন সরকারের কঠোর সমালোচনা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলে, ২০০৯ সালের দাঙ্গার পর চীনা সরকারের সমালোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের দায়ে চীন সরকার গোপনে বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবীর বিচার করেছে। তারা আরও বলেছে, ধর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘুদের ভাষাশিক্ষা নিষিদ্ধ করার চীনা নীতি জিনজিয়াংয়ে অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ। চীনাদের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে যখন উইঘুররা বিদ্রোহ করে তখনই রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও কমিউনিস্টপন্থীরা হাজার হাজার নিরীহ উইঘুরকে হত্যা করে। অনেককে করা হয় গৃহহীন। শিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুর মুসলমানদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধ্বংস করার জন্য চীনের অন্য এলাকার লোকদের সেখানে এনে পুনর্বাসন করা হয়। ১৯৪৯ সালে শিনজিয়াংয়ে উইঘুর মুসলিমদের সংখ্যা যেখানে ৯৫% ছিল, ১৯৮০ সালের মধ্যেই তা ৫৫% এ নেমে আসে। ১৯৮৮ সালে চীনাদের এই নির্যাতনের হাত থেকে মুক্তি পেতে ও চীন থেকে স্বাধীন হতে উইঘুররা প্রতিষ্ঠা করে পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টি। এই সংগঠন চীনাদের দমন পীড়নের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে। কিন্তু চীনা সরকার ১৯৯০ সালে সেখানে পরিকল্পিতভাবে এক দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়। এই দাঙ্গার অভিযোগ উল্টা মুসলমানদের উপর চাপিয়ে হাজার হাজার উইঘুর যুবককে হত্যা এবং কারাদণ্ড প্রদান করে। মোটকথা উইঘুরদের ধ্বংস করার জন্য যা যা করা দরকার তার কোন কিছুই বাকি রাখেনি চীনা প্রশাসন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বর্ণনায়, ‘উইঘুর সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর কড়া নজর রাখা হয়। তাদের বাড়িঘরের দরজায় বিশেষ কোড লাগিয়ে দেয়া হয়। মুখ দেখে শনাক্ত করার জন্য বসানো হয় বিশেষ ক্যামেরা। ফলে কোন বাড়িতে কারা যায়, থাকে বা বের হয় তার উপর কর্তৃপক্ষ সতর্ক নজর রাখে। এমনকি তাদেরকে নানা ধরনের বায়োমেট্রিক পরীক্ষাও দিতে হয়।’
মুসলমানদের উপর কমিউনিস্টদের রাষ্ট্রীয়ভাবে এই নজরদারী ও নির্যাতন চালানোর কারণ হলো তাঁদের এক আল্লাহকে রব হিসেবে বিশ্বাস করা; ইসলামকে সত্য দ্বীন হিসেবে মেনে নেয়া; দুঃখ-কষ্ট, অভিযোগ সবকিছুই আল্লাহর জন্য বরদাস্ত করার মনমানসিকতাকে অত্যাচার করে দমিয়ে রাখা। এই ধরনের কাজ সচেতন ও বুদ্ধিমান কোন প্রাণীদের জন্য শোভনীয় হতে পারে না। আল্লাহ সব মানুষকে এই বিষয়টি বুঝার তাওফিক দিন। আমিন।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply