কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বিশ্বনবী -মিয়া গোলাম পরওয়ার

(প্রথম কিস্তি)

পৃথিবীর প্রত্যেক দেশ ও রাষ্ট্রপ্রধানের অঙ্গীকারনামায় একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ থাকে। জনগণের কল্যাণ সাধনই সেই রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আক্ষরিক অর্থে এই অঙ্গীকার অনেক রাষ্ট্রে কিছুক্ষেত্রে বাস্তবায়ন হয়েছে। বিশ^নবী সা.-এর প্রতিষ্ঠিত আদর্শ ও পরিপূর্ণ কল্যাণমূলক রাষ্ট্রটির সাথে এর কোনটিকে কল্পনা করা যায় না। একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সমুদয় সম্পদ ও শক্তি নাগরিকের সার্বিক কল্যাণে নিয়োজিত হয়। ব্যক্তি ও সমাজের উন্নতির জন্য কর্মসূচী প্রণয়ণ ও বাস্তবায়নসহ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, সাংস্কৃতিক চাহিদা মেটাতে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থাকে। মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা ও অধিকারকে সমুন্নত রেখে সর্বাধিক কল্যাণের জন্য প্রয়োজনীয় কার্যাদি সম্পন্ন করা। রাষ্ট্রে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের সামগ্রিক কল্যাণ সাধন করাই মূল লক্ষ্য। মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় হাবিব মুহাম্মাদ সা.-কে বহুমুখী প্রতিভা, বহুমুখী নেয়ামত ও বরকতপূর্ণ চরিত্রের অধিকারী করেছিলেন। তিনি তাঁর রাসূলকে বিশ্ববাসীর সামনে সর্বোত্তম আদর্শ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর আদর্শ এত দেদীপ্যমান যে, ২৩ বছরের নবুয়্যতের জীবন; সংগ্রামী জীবন, ১৩ বছর মক্কায় কত কষ্ট তিনি করলেন, ইসলামী সমাজ এবং রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ১০ বছর মদিনায় তিনি ইতিহাসের একটি স্বর্ণোজ্জ্বল যুগ উপহার দিলেন। সে সম্পর্কে এত দিক এবং বিভাগ যেগুলো তাঁর বিশাল রাষ্ট্রের যে পরিধি ছিল এবং যে বিশাল কর্মযজ্ঞ ছিল সেগুলো এত সংক্ষিপ্ত সময়ে আলোচনায় তুলে ধরা যাবে না। আলোচনাটা পরিষ্কার করার জন্য আলটিমেটলি আমরা দু-দিককে প্রতিপাদ্য হিসেবে নিতে পারি। একটা হচ্ছে, রাসূল সা. কেমন কল্যাণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনা করেছিলেন। সে রাষ্ট্রের একটা চিত্র; একটা ছবি সংক্ষিপ্তভাবে আমাদের সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করবো। এটা একটা আলোচনার দিক। আরেকটা দিক হলো, সেই কল্যাণমুখী রাষ্ট্র রাসূল সা. কিভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন; কী পদ্ধতিতে তিনি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কায়েম করেছিলেন সেই পদ্ধতিটাও এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এ দুটো বিষয় আমি তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

প্রথম কথা হচ্ছে, সেই আলোচনায় যাওয়ার শুরুতে আমাদের বুঝে নেয়ার দরকার যে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় রাসূলের ভূমিকা যেহেতু আমরা আলোচনা করছি- তো সে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কথাটার অর্থ কী? কল্যাণরাষ্ট্র বলতে কী বুঝায়? এটা একটু বুঝা দরকার। পৃথিবীতে অনেক সমাজবিজ্ঞানী, অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অনেক দার্শনিক কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের, কল্যাণরাষ্ট্র অর্থাৎ ‘ওয়েলফেয়ার স্টেইট’ সম্বন্ধে অনেক কথা বলেছেন। সমাজবিজ্ঞানী মার্শাল-রুশো-ল’-মিল (Jaun Stuart mill) এরা যে ‘লেইস্যাজ ফেয়ার’ (Laissey-Faire) থিওরিদ বা কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের যে ধারণা দিয়েছেন আসলে প্র্যাক্টিক্যালি দেখা গিয়েছে সে রাষ্ট্রগুলো কল্যাণরাষ্ট্র নয়, এটা ছিল একটা পুলিশি রাষ্ট্র। ‘পুলিশ স্টেইট’ হিসেবেই সেগুলো প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

উইকিপিডিয়াতে ‘ওয়েলফেয়ার স্টেইট’ অর্থাৎ ‘কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের’ যে ধারণা দেয়া হয়েছে সেখানে বলা হয়েছে যে, The welfare state is a form of government in which the state protects and promotes the economic and social well-being of the citizens, based upon the principles of equal opportunity, equitable distribution of wealth, and public responsibility for citizens unable to avail themselves of the minimal provisions for a good life.
অর্থাৎ এখানে উইকিপিডিয়াতে ওয়েলফেয়ার স্টেইট বলতে বুঝানো হচ্ছে যে, ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্র এমন একটা ধারণা যেখানে রাষ্ট্র তাদের নাগরিকের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং কল্যাণকে রক্ষা করবে, উন্নয়ন করবে এবং এক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এমনকি একটা রাষ্ট্রের যারা ‘অক্ষম’, যারা ‘আয় উপার্জন করতে পারে না’ বা ‘কোন কারণে যাদের কাজ নেই’, সমতার ভিত্তিতে তাদের সম্পদের সমানুপাতিক বিধান করে তাদেরও একটা সুখী জীবনের নিশ্চয়তা যারা দিতে পারে, দায়বদ্ধতা যারা নিতে পারে। এটাকে একটা ওয়েলফেয়ার হিসেবে বলা হয়েছে।

রাসূলে আকরাম সা. তাঁর যে কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা, তিনি যে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন এই কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণা কুরআন মাজিদে দিয়ে প্রিয় নবী মুহাম্মদ মোস্তফা সা. কে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছেন যে, একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতা হাতে আসলে পরে (What is his duty) তাঁর কর্তব্য কী হবে? সেটার ওয়েলফেয়ার অ্যাকটিভিটিসটা কী?
আল্লাহ তায়ালা সূরা হজ্জের ৪১ নম্বর আয়াতে প্রিয় নবীর শানে একথা বলে দিয়েছিলেন। রাসূল সা. যে রাষ্ট্রের দায়িত্ব নিয়ে তিনি মদিনাতে ‘Government’-এর একটা দায়িত্ব গ্রহণ করলেন, সে দায়িত্বটার, সে ক্ষমতার কল্যাণ কী? আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলছেন সূরা হাজ্বের ৪১ নম্বর আয়াতে-
,الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ أَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ ۗ وَلِلَّهِ عَاقِبَةُ الْأُمُورِ﴾
চারটি কাজ এখানে বলা হয়েছে, ইসলামি কল্যাণ রাষ্ট্রের, রাসূল সা. এর কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের চারটা বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন। প্রথম হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা শুরুতেই বলছেন, الَّذِينَ إِن مَّكَّنَّاهُمْ فِي الْأَرْضِ যারা যাদেরকে পৃথিবীর উপরে ক্ষমতাবান করা হবে, রাষ্ট্র ক্ষমতার দায়িত্বে যারা আসবে, যারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে তাদের প্রথম কাজ কী? আল্লাহ তায়ালা বলছেন,First and firmest ডিউটি হচ্ছে أَقَامُوا الصَّلَاةَ সালাত প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে নাগরিকদের, জনগণের চরিত্র গঠন করতে হবে। নৈতিকতা তৈরি করার মূল মাধ্যম হচ্ছে প্রতিদিন পাঁচবার আল্লাহ তায়ালার কাছে হাজির হয়ে, সে যে আল্লাহর গোলাম, আল্লাহর দাস এবং তার যে একজন মালিক আছে, তাঁর আদেশ-নিষেধ, বিধিবিধান প্রতিদিন পাঁচবার স্মরণ করে নিজের চরিত্রকে আল্লাহমুখী করবে। এটা হচ্ছে প্রথম কাজ।
দ্বিতীয় কাজ হচ্ছে, وَآتَوُا الزَّكَاةَ ‘যাকাতভিত্তিক’ একটা অর্থনীতি, অর্থব্যবস্থা চালু করে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন রাষ্ট্রের পূরণ করতে হবে।

তৃতীয় দায়িত্ব, وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ সমস্ত ভালো কাজগুলো চালু করে দিবে, এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আমর (হুকুম) এটা রাষ্ট্র ছাড়া মানুষের উপরে কোন আদেশ কিন্তু একজন ব্যক্তি ওহফরারফঁধষষু দাওয়াত দিতে পারে, অনুরোধ করতে পারে, এটা ‘আমর বিল মারুফ’ হয় না। এটা অনুরোধ বিল মারুফ হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ বলছেন ‘আমর’ (আদেশ) কিন্তু আদেশ দেয়ার একটা পজিশন হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের পজিশনে না গেলে সে কিন্তু একটা হুকুম জারি করতে পারে না। তাই আল্লাহ বলছেন, وَأَمَرُوا بِالْمَعْرُوفِ সমস্ত ভালো কাজ; সৎকাজগুলো রাষ্ট্র চালু করবে। এবং চতুর্থ কাজ হচ্ছে, وَنَهَوْا عَنِ الْمُنكَرِ এবং সমস্ত অকল্যাণকর কাজ, ক্ষতিকর কাজ, খারাপ কাজগুলো বন্ধ করে দিয়ে সমাজকে পবিত্র করবে। এই চারটি কাজ,
১. সালাত কায়েমের মাধ্যমে চরিত্র গঠন করা।
২. জাকাত আদায়ের মাধ্যমে অর্থনীতির ব্যাপারে মানুষের মৌলিক প্রয়োজন; ভাত, কাপড়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাসস্থানসহ তার সমস্ত হকগুলো ফিরিয়ে দেয়া।
৩. সমাজে সমস্ত ভালো কাজগুলো চালু করা এবং সমস্ত অকল্যাণকর কাজগুলো বন্ধ করে দেওয়া।
৪. সমস্ত অকল্যাণকর কাজগুলো বন্ধ করে দেয়া।
এটা সূরা হজ্জে আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবিবকে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কায়েমের চারটা কাজ দিয়েছেন, দুনিয়ার মানুষ তো ওয়েলফেয়ার স্টেইটের সংজ্ঞা দিয়েছে, আল্লাহ তায়ালা যে ওয়েলফেয়ার স্টেইট এর সংজ্ঞা দিচ্ছেন সেটার হচ্ছে চারটি বৈশিষ্ট্য। চরিত্র গঠন করো, মানুষের অর্থনীতির সমস্যা সমাধান করো, সমস্ত ভালো কাজগুলো করো, এবং সমস্ত খারাপ কাজগুলো বন্ধ করে দাও।
আমরা দেখতে পাই যে, রাসূল সা. কল্যাণমুখী যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, পৃথিবীতে তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য ছিলো এটাই। আল্লাহ তায়ালা সূরা হাদীদের ২৫ নম্বর আয়াতে পরিষ্কারভাবে রাসূল সা. সহ সমস্ত আম্বিয়ায়ে কিরামের পৃথিবীতে আগমনের লক্ষ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন,
لَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَیِّنٰتِ وَ اَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَ الْمِیْزَانَ لِیَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِۚ وَ اَنْزَلْنَا الْحَدِیْدَ فِیْهِ بَاْسٌ شَدِیْدٌ وَّ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَ لِیَعْلَمَ اللّٰهُ مَنْ یَّنْصُرُهٗ وَ رُسُلَهٗ بِالْغَیْبِؕ اِنَّ اللّٰهَ قَوِیٌّ عَزِیْزٌ۠-
আল্লাহ তায়ালা বলছেন, আমি রাসূলগণকে পাঠিয়েছি, বাইয়্যেনাহ দিয়েছি, মিযান দিয়েছি, কিতাব দিয়েছি। সমস্ত বিধিবিধান, ভালো মন্দ মাপার মানদ- সব দিয়েছি। কী জন্য? কী উদ্দেশ্য? রাসূলগণ কেনো আসলেন? لَقَدْ اَرْسَلْنَا رُسُلَنَا. বহুবচন। শুধু আখেরি নবী নন। সমস্ত নবীগণকে পাঠানোর উদ্দেশ্য, তাদের কাছে কিতাব, সহিফা আকারে বাইয়্যেনাহ, বিধান, মানদ- সবকিছু দিয়ে পাঠানো হয়েছে। তাদের কী? لِیَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِۚ قُوْمَ মানে হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত করা, খাড়া করা, কায়েম করা, দাঁড় করানো, করা। কিসের ওপর? بِالْقِسْطِۚ ..। সুবিচার, ইনসাফ নাগরিকের যার যা হক, তা তাকে দিতে পারা- এর নাম হচ্ছে সুবিচার। এটার জন্য সমস্ত আম্বিয়ায়ে কিরাম এসেছেন মানবজাতির কাছে। এবং কী বলা হয়েছে? শুধু মুসলমান নয়; কে দ্বীন মানলো আর মানলো না; কে ঈমান আনলো আর আনলো না, সেটি কোন বিষয় নয়। আল্লাহ তায়ালা বলে দিচ্ছেন যে, এই সুবিচারটা হচ্ছে সকলের জন্য। সমস্ত মানবজাতির জন্য। لِیَقُوْمَ النَّاسُ. সমস্ত বিশ্বমানবতার কল্যাণের জন্য আল্লাহর নবীদের পাঠানো হয়েছে এবং আমাদের আখেরি নবী ছিলেন সেই রিসালাতের ধারাবাহিকতার সর্বশেষ নবী, খাতিমুন নাবিয়্যিন মুহাম্মদ মুস্তফা সা.। ফলে, দেখা যাচ্ছে যে, রাসূলদের আগমনের উদ্দেশ্য-ই হচ্ছে কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তাহলে শুধু নামায, শুধু রোযা, শুধু হজ্জ, শুধু যাকাত, ব্যক্তিগত জীবনে কিছু ধর্ম পালন এটাই যদি উদ্দেশ্য হতো- তাহলে আল্লাহ তায়ালা সূরা হাদিদের এই ২৫ নম্বর আয়াতে কী বললেন?

এখানে বলছেন, وَ اَنْزَلْنَا الْحَدِیْدَ হাদিদের শাব্দিক অর্থ হচ্ছে ‘লৌহ’ রূপক অর্থে এখানে ‘রাষ্ট্রশক্তিকে’ রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। রাষ্ট্রশক্তি দিয়ে এই যে, ‘কিতাব’-‘মিযান’-‘বাইয়্যেনাহ’ এগুলো দিয়ে যা মানবতার সুবিচারের জন্য একটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে যা লৌহের মত ক্ষমতাবান فِیْهِ بَاْسٌ شَدِیْدٌ وَّ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ এটার মধ্যে, এই রাষ্ট্রের মধ্যে শক্তি আছে। আল্লাহর এই বিধান, এই সুবিচার কায়েমের জন্য সে প্রয়োজনে রাষ্ট্রশক্তি প্রয়োগ করবে وَّ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ এবং রাষ্ট্রের মধ্যে যেহেতু শক্তি প্রয়োগের সুযোগ রেখেছে এবং وَّ مَنَافِعُ لِلنَّاسِ মানুষের জন্য কল্যাণ সুযোগও এই রাষ্ট্রের মধ্যে আছে।
সম্মানিত ভাই এবং বোনেরা, আমরা এটা মনে রাখবো যে- রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিশ্বমানবতার কল্যাণ এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূল সা. কে এই কাজের জন্যেই পাঠিয়েছেন। এবং সে দায়িত্বই রাসূলগণ পালন করেছেন। আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে অনেক জায়গায় বলেছেন, ‎لِیُظْهِرَهٗ عَلَى الدِّیْنِ كُلِّهٖؕ আর যত মতবাদ-আর যত দ্বীন-আর সমাজ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকবে তার ওপরে আল্লাহর এই ‘দ্বীন’ কে জাহির করা, বিজয়ী করা, প্রতিষ্ঠিত করা। এটা নবী রাসূলের আগমনের উদ্দেশ্য ছিল।

আমরা যদি সূরা ‘আল-ইমরান’ ১১০ নাম্বার আয়াতে দেখি- সেখানে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,كُنْتُمْ خَیْرَ اُمَّةٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاْمُرُوْنَ بِالْمَعْرُوْفِ وَ تَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ একই কথা আমাদের সকলের পরিচিত জায়গা যে আমাদের আসাই এখানে আগমনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে, মানবতার জন্য Human being/Whole mankind তাদের কল্যাণের জন্য, তাদের ‘ওয়েলফেয়ারের’ জন্য اُخْرِجَتْ ‘উখরিজাত’-তাদের আগমন, তাদের আবির্ভাব ঘটেছে। ফলে, রাসূল সা. কেমন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-খুব সংক্ষেপে আমি সেদিকে আপনাদেরকে নিয়ে যেতে চাই। ছোট্ট একটা ছবি যদি আঁকি সেখানে আমি শুরুতেই এটা বলতে চাইবো যত কল্যাণরাষ্ট্রের সংজ্ঞা আজকে সমাজবিজ্ঞানী-রাষ্ট্রবিজ্ঞানী-দার্শনিকরা দিক না কেন, আল্লাহ তায়ালা ‘কল্যাণরাষ্ট্রের’ যে ধারণা কুরআন মাজিদে সূরায়ে হজ্জের ৪১ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করে বলেছেন, সেখান থেকেই রাসূল সা. কিন্তু একটি কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এবং তিনি হাদিস শরিফে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছিলেন যে, خير القرون قرني -অর্থাৎ ‘সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ’। ‘কারনি’- আমার যে রাজ্য, আমার যে যুগ, আমার যে সময়, আমি যে সমাজ প্রতিষ্ঠা করেছি এটাই হচ্ছে-সর্বোত্তম যুগ।

এবং ঐ হাদিসেই বলেছেন, ثم الذين يلونهم ثم الذين يلونهم -পরবর্তী ধারাবাহিক সমাজব্যবস্থার একটি অবস্থা সম্পর্কে তিনি ধারণা দিয়েছেন যে, এই নবুয়্যতের পর আসবে-খেলাফত। তারপর আসবে রাজতন্ত্র। তারপর আসবে- স্বৈরতন্ত্র বা জুলুমতন্ত্র। তারপর আসবে-‘খেলাফত আলা মিনহাজিন নবুয়্যত’। আমরা ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখতে পাই, আমাদের প্রিয় নবী সা.-এর পর দেড় হাজার বছর চলে যাবার পর রাষ্ট্রব্যবস্থার যে ধারাবাহিকতা দেখতে পাই, তা হচ্ছে এরূপ- নবুয়্যত এর ধারা শেষ হবার পর-খেলাফত শাসন চলেছে। খেলাফত এর যুগ বিদায় হবার পর-রাজতন্ত্রের প্রচলন ঘটেছে।
রাজতন্ত্রের সময়কালও চলে যাবার পর আমরা এখন স্বৈরতন্ত্রের বা জুলুমতন্ত্রের যুগ অতিক্রম করছি। ফ্যাসিজম বা স্বৈরযুগ এখন আমরা অতিবাহিত করছি (We are passing now fascism) এরপরেই আল্লাহর রাসূলের ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে, ‘খেলাফাত আলা মিনহাজিন নবুওয়্যাত’।
এবার আমরা সেই আলোচনায় চলে যাচ্ছি। রাসূল সা. নিজেই হাদিসে এর বর্ণনা দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে রাসূল সা.-এর চরিত্র, আদর্শ বা রফবড়ষড়মু সম্পর্কে বলেছেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِیْ رَسُوْلِ اللّٰهِ اُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
অর্থ : তোমাদের জন্য রাসূলের সা. জীবনেই রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। (৩৩ : ২১)
রাসূলের জীবনই তো সর্বোত্তম আদর্শ। সর্বোত্তম যুগ তো তাহলে তাঁরটাই হবে। তাঁকেই তো ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। সমগ্র আলমের জন্য রহমত। ‘আলম’ বলতে সমগ্র মানবজাতিকে বোঝানো হয়েছে। তাদের সকলের জন্য তিনি ছিলেন শান্তিস্বরূপ। শান্তিস্বরূপ অর্থ কী? তাঁর আদর্শ মানলে শান্তি, তাঁর আখলাক মানলে শান্তি। তাঁর যে বিধান, আদেশ তা জীবনে কার্যকর করলে শান্তি। ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার জীবনের সব জায়গায় মানলেই তিনি ‘রহমাতুল্লিল আলামিন’। ফলে তাঁর জীবদ্দশায় দশ বছরের শাসনামলে তিনি সেটা মেনেছিলেন, রাষ্ট্রে সেটা কায়েম করেছিলেন এবং সারা আলমের জন্য নিজেকে রহমতস্বরূপ প্রমাণ করেছেন। তিনি যে ছিলেন ‘উসওয়াতুন হাসানা’ বা সর্বোত্তম আদর্শ, তা তিনি তার জীবনে প্রমাণ করে গিয়েছেন। আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থায়, আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গণতন্ত্রের সংজ্ঞায় আমরা মানুষকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বলে থাকি। অর্থাৎ, জনগণই ক্ষমতার উৎস। আল্লাহর রাসূলের স্থাপিত কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রথম যে মডেল, তার ভিত্তি ছিলো, সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হবেন কেবল আল্লাহ।
اِنِ الْحُكْمُ اِلَّا لِلّٰهِؕ
অর্থ : সকল ক্ষমতার মালিক কেবল আল্লাহ। (সূরা ইউসুফ, আয়াত : ৪০)
কারো কোন পাওয়ার নেই। There is no leader, there is no government, There is no parliament, no superior authority, আল্লাহ ছাড়া। ইসলামী কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “আল্লাহ ছাড়া কোন সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী কেউ নেই।”
সার্বভৌম ক্ষমতা পেতে হলে তাঁর চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী, ভবিষ্যৎ, অতীত, বর্তমান সব কিছু জানেওয়ালা আলিমুল গায়েব হতে হবে। আয়াতুল কুরসিতে উল্লিখিত আল্লাহর বৈশিষ্ট্যগুলোই প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌম ক্ষমতার বৈশিষ্ট্য। মানুষ বলে, জনগণ সকল ক্ষমতার উৎস; জনগণ পার্লামেন্টে যাবে; জনগণ ভোট দিয়ে যাদের নির্বাচিত করবে তারা তাদের তৈরি আইন দিয়ে রাষ্ট্র চালাবে। কিন্তু আমার প্রিয় নবী মুস্তফা সা. এই ধারণার পরিবর্তে কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের প্রথম বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলে দিয়েছেন, Sovereignty belongs to almighty ALLAH. অর্থাৎ সব ধরনের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হবেন একমাত্র আল্লাহ। এটাই ছিলো রাসূল সা. এর প্রতিষ্ঠিত কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য। এবং কল্যাণমুখী রাষ্ট্র পেতে গেলে আল্লাহকে সব ক্ষমতার মালিক বলে মেনে নিতে হবে। সূরা আরাফে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
-اَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَ الْاَمْرُ
“সতর্ক হও! তাঁর সৃষ্টিতে তাঁরই হুকুম চলবে।” (সূরা আরাফ : ৫৪)
এখানে কোন মানুষের হুকুম চলবে না।

ফলে, মক্কার কাফের মুশরিকেরা রাসূল সা.কে এই দাওয়াত বন্ধ করতে বলেছিলো। উনি যখন সাফা পর্বতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ইয়া সাবাহা! সকলে জড়ো হলো। তারপর যখন তিনি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালেমার দাওয়াত দিলেন, তাঁকে অভিশাপ দেয়া হলো; তাঁর উপর ধ্বংস কামনা করা হলো; অত্যাচার শুরু হলো। আমরা জানি, মক্কার কাফির মুশরিকেরা তার এই দাওয়াতের প্রসার বন্ধ করবার জন্য তার চাচা আবু তালিবকে দিয়ে অনুরোধ করালেন। তিনি অনুরোধ করলেন। রাসূল সা. তখন কী বলেছিলেন? তিনি বলেন, ‘আমার এক হাতে চাঁদ, আরেক হাতে সূর্য এনে দিলেও আমি এই পথ থেকে দূরে সরবো না।’
কাফিররা তাঁকে বলেছিলো, আমরা আপনাকে বাদশাহ বানাবো, সুন্দরী নারী দেবো, ধনসম্পদের পাহাড় করে দেবো। কিন্তু আপনি শুধু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাওয়াত দিবেন না। আল্লাহর রাসূল সা. এই প্রস্তাব মেনে নেননি। এটার নাম কল্যাণমুখী রাষ্ট্র তৈরি করতে হলে সেই কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের উৎস জনগণ নয়, বরং হতে হবে আল্লাহর বিধান।
পরবর্তী বিষয় হচ্ছে, সরকার ও জনগণের সম্পর্ক। আল্লাহর রাসূল সা. পরিষ্কার বলে গিয়েছেন, ‘নাফরমানির কাজে কোন আনুগত্য নেই। শুধু নেক কাজেই আনুগত্য করা হবে।’
সূরা নিসার ৫৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন,
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْۤا اَطِیْعُوا اللّٰهَ وَ اَطِیْعُوا الرَّسُوْلَ وَ اُولِی الْاَمْرِ مِنْكُمْۚ
“হে ঈমানদারগণ! আনুগত্য করো খোদার এবং আনুগত্য করো রাসূলের আর সেই সব আদেশ দানকারী লোকদের।”
আল্লাহর রাসূল সা.-এর কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের আলোকে জনগণ ও সরকারের সম্পর্ক হবে ঠিক এরূপ। এবং এটা তিনি করেছিলেন। এই কারণে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দায়বদ্ধতা গড়ে উঠেছিলো। রাসূল সা.-এর নবুয়্যতের ধারাবাহিকতায় যে খেলাফত গড়ে উঠেছিলো, তা ও ছিলো এই সব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী।
আমিরুল মুমিনীন উমর রা. খুতবা দিচ্ছেন মসজিদে। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো, আমরা যে কাপড় পেয়েছি তাতে জামা এতো বড় হওয়ার কথা না। তাহলে আপনার জামা এতো বড় কেন? তখন উমর রা.-এর ছেলেকে দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা দিতে হলো যে, আমার কাপড় আর আব্বার কাপড় দুটো জুড়ে দিয়ে আব্বার জামা বড় বানানো হয়েছে। এটাই  যেখানে বাদশাহ বা প্রেসিডেন্টকে প্রশ্ন করার অধিকার জন্মাবে। তিনি বিন্দুুমাত্র বিরক্ত না হয়ে সেসব প্রশ্নের জবাব দিবেন।

একদিন খুতবায় উমর রা. মহিলাদের নসিহত করছিলেন। তিনি মহিলাদের দেনমোহর কম নেয়ার জন্য উৎসাহিত করছিলেন। তখন এক মহিলা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘না, এ দেনমোহর নির্ধারণ করার অধিকার আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। আল্লাহ প্রদত্ত এ অধিকার হরণ করার ক্ষমতা আপনাকে কে দিয়েছে হে আমিরুল মুমিনিন?’ আমিরুল মুমিনিন মহিলার কথা শুনে তাজ্জব! এবং তিনি অবশেষে সেই মহিলার কথা মেনে নিলেন। তিনি এখতিয়ার দিলেন, যে মহিলারা নিজের পছন্দ মতো মোহর নির্ধারণ করতে পারবেন। একজন রাষ্ট্রনায়ক একজন জনগণের কথায় তার মত পরিবর্তন করলেন। রাসূল সা. প্রতিষ্ঠিত কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের জনগণ ও সরকারের সম্পর্ক এভাবেই গড়ে উঠেছিলো।

ব্যক্তিস্বাধীনতা ও রাসূল সা. এর কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে বিদ্যমান ছিলো। এ রাষ্ট্রের নির্দেশ ছিলো, আদালত কর্তৃক দ-প্রাপ্ত কোন ব্যক্তি এবং এমন কোন অভিযুক্ত ব্যক্তি যার তদন্ত বা বিচার চলাকালীন সময়ে কেউ বাধা দিতে পারে, এই ধরনের ব্যক্তিরা ব্যতীত আর কাউকে আটক করা যাবে না। রাসূল সা.-এর সামনে মদিনার কিছু ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে আসা হলো। একজন সাহাবী দুইবার জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার প্রতিবেশীকে কেন ধরে নিয়ে আসা হয়েছে? আল্লাহর রাসূল সা. খোঁজ নিয়ে দেখলেন, এই ব্যক্তিদের গ্রেফতার ঠিক হয়নি। তিনি অতঃপর তাঁদের মুক্ত করে দিলেন।

রাসূল সা.-এর কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বজায় ছিলো। আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী তিনি মানুষের খাদ্য, বস্ত্র, শিক্ষা ইত্যাদি ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান করেছিলেন। হালাল হারামের মানদ- আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন। কোন পথে আয় হালাল, কোনটা হারাম আয়। কোনটা অপচয়, কোনটা সুদ। وَأَحَلَّ اللّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন সুদকে করেছেন হারাম। যাকাতকে বাধ্যতামূলক আইন করেছেন; উত্তরাধিকার আইনকে করেছেন-মিরাসি আইন করেছেন। এতিমের হক দিয়েছেন। এভাবে একটা ঊপড়হড়সরপধষ ব্যবস্থার কাঠামো আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদে দিয়েছিলেন, আল্লাহর রাসূল সা. তা দিয়েই কিন্তু রাষ্ট্রের কল্যাণমুখী কাঠামো তৈরি করেছিলেন। এবং রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের বুনিয়াদি প্রয়োজন আল্লাহর রাসূল পূরণ করেছিলেন এবং সরকারের দায়িত্ব অন্ন-বস্ত্র-খাদ্য-চিকিৎসা-বাসস্থান সব পালন করেছিলেন। এবং রাসূল বলছেন, এই হাদিসটা আপনাদের জানা আছে যে রাসূল বলছেন যে, রাষ্ট্র ও সরকার সকল অভিভাবকহীনদের অভিভাবক এবং সাহায্যকারী।

যার কোন গার্ডিয়ান নাই, যার দেখার কেউ নেই, তার গার্ডিয়ান এবং সাহায্যকারী হচ্ছেন রাসূল সা.। উনি বলছেন এটা-রাষ্ট্র, রাষ্ট্র হচ্ছে তার সাহায্যকারী। এবং আরেকটি হাদিসে আল্লাহর রাসূল বলছেন যে, ‘পশ্চাতে বোঝা রেখে গেছে যে ব্যক্তি’ হাদিসে এই বোঝার অর্থ মুহাদ্দেসিনে কেরাম করেছেন যে, ঋণ অথবা আশ্রয়হীন কোন স্ত্রী বা পুত্রকে রেখে কোনো ব্যক্তি ইন্তেকাল করেছে এ রকম পেছনে কোন ব্যক্তি ‘বোঝা’ রেখে মারা গেলে, যদি বোঝা রেখে যায় তাহলে সে বোঝা বহন করার দায়িত্ব আমার। অর্থাৎ রাষ্ট্রের-যিনি প্রেসিডেন্ট তিনি এ কথা বলেছেন। ফলে অভিভাবকহীন মানুষের, এতিম অসহায়, যার কোন গার্ডিয়ান নাই, যার কোন সাহায্যকারী নাই, তার দায়িত্ব হচ্ছে ইসলামী রাষ্ট্রের। এবং ইসলামী কল্যাণরাষ্ট্রের রাসূলের ফর্মুলাই তিনি এটা দিয়ে গিয়েছেন যে, হয় রাষ্ট্রকে মানুষকে কাজ দিয়ে তার জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে আর না দিতে পারলে তার ভরণপোষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হবে।

একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে কোন মানুষ না খেয়ে থাকতে পারবে না, অন্নহীন-বস্ত্রহীন-নিরন্ন-ক্ষুধার্ত মানুষের আহাজারি কোন কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। রাসূলে আকরাম সা. সেই কল্যাণমুখী অর্থনীতির নিরাপত্তা দিয়েছিলেন। এবং কুরআন মাজিদে আল্লাহ তায়ালা রাসূলকে চমৎকার এক বিধান দিয়েছেন وَفِي أَمْوَالِهِمْ حَقٌّ لِلسَّائِلِ وَالْمَحْرُومِ তোমাদের সকলের সম্পদে যারা ‘সায়েল’ যারা ‘মাহরুম’ যারা প্রার্থনা করবে, আর যারা বঞ্চিত তাদের সকলের অধিকার সম্পদশালীর সম্পদে আল্লাহই রেখে দিয়েছেন। ফলে অর্থনীতির সাম্যে এবং সম্পদের বণ্টনকে ভারসাম্যপূর্ণভাবে, সুুবণ্টিত করে নাগরিকদের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যহীন এক সমাজ কায়েম করার সে বিধান রাসূল সা. কল্যাণমুখী রাষ্ট্রে ছিল।
(আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত)
লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও সমাজসেবক

SHARE

Leave a Reply