post

কেমন আছে বাংলাদেশ

অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

২৫ মে ২০২৩

কেমন আছে বাংলাদেশ? এই প্রশ্নের জবাব এক কথায় দেওয়া সম্ভব নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল অনেক আশা ভরসাকে কেন্দ্র করে। জনগণ বৈষম্যের শিকার থেকে বাঁচতে পারবে, ভোট এবং ভাতের অধিকার তারা পেয়ে যাবে, স্বাধীনতার সত্যিকার সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে, কিন্তু সুফল এখনো ঘরে পৌঁছে নাই। বরং বর্তমানে বাংলাদেশে তো গণতন্ত্রের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। কুরআন মাজিদে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা একটি জনপদের দৃষ্টান্ত দিয়ে বলেন, “আল্লাহ একটি জনপদের দৃষ্টান্ত দেন। সেটি শান্তি ও নিরাপত্তার জীবন যাপন করছিল এবং সবদিক দিয়ে সেখানে আসছিল ব্যাপক রিজিক, এ সময় তাঁর অধিবাসীরা আল্লাহর নিয়ামতসমূহ অস্বীকার করলো। তখন আল্লাহ তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের স্বাদ আস্বাদন করালেন এভাবে যে, ক্ষুধা ও ভীতি তাদেরকে গ্রাস করলো। তাদের কাছে তাদের নিজেদের সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে একজন রাসূল এলো। কিন্তু তারা তাঁকে অমান্য করলো। শেষ পর্যন্ত আজাব তাদেরকে পাকড়াও করলো, যখন তারা জালেম হয়ে গিয়েছিল।” (সূরা নাহল : ১১২-১১৩)

এই যে এখানে যে জনপদের উদাহরণ পেশ করা হয়েছে, তাকে কিন্তু নির্দিষ্ট করে চিহ্নিত করা হয়নি। মাওলানা মওদূদী রহিমাহুল্লাহ তাঁর বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ তাফহীমুল কুরআনে ইবনে আব্বাসের (রা.) বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়ে বিষয়টি এভাবেই উল্লেখ করেছেন যে- “এখানে ভীতি ও ক্ষুধা দ্বারা জনপদটির আক্রান্ত হবার যে কথা বলা হয়েছে সেটি হবে মক্কার দুর্ভিক্ষ, যা রাসূলুল্লাহ সা.-এর নবুওয়াত লাভের পর বেশ কিছুকাল পর্যন্ত মক্কাবাসীদের ওপর জেঁকে বসেছিল।” (তাফহীমুল কুরআন : সূরা নাহল, টিকা-১১২)

আর এই যে মক্কাবাসীর ওপর দুর্ভিক্ষ চেপে বসা, এটা কিন্তু তাদের অপরাধের কারণেই হয়েছিল। কেননা, মক্কা তো ছিল একটি শান্তি ও সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ এক নগরী। মহান আল্লাহ তায়ালা এ ব্যাপারটি কিন্তু কুরআনের বহু জায়গায়, বহুস্থানে সুন্দরভাবে বিবৃত করেছেন। যেমন সূরা কাসাস : ৫৭, সূরা ইবরাহীম : ২৮-২৯ ইত্যাদি।

আবার এখানে যে কুফরির কথা বলা হয়েছে, সে কুফরিটা আল্লাহর সাথে কুফরি ও আল্লাহর নিয়ামতের সাথে কুফরি উভয়টিই হতে পারে। ইমাম ইবনে কাসীর তাঁর সুপ্রসিদ্ধ তাফসীরগ্রন্থে সেটাই বলেছেন। কারণ, তারা আল্লাহর সাথে কুফরি করেছিল, তাঁর রাসূলদের সাথে কুফরি করেছিল। তাছাড়া তারা আল্লাহর নিয়ামতকেও অস্বীকার করেছিল। আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকারের উদাহরণ হিসেবে এক হাদিসেও রাসূলুল্লাহ সা. এ ধরনের কুফরকে ব্যবহার করেছেন। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, “আমাকে জাহান্নাম দেখানো হলো, আমি দেখলাম তার অধিবাসীদের অধিকাংশই স্ত্রীলোক। তারা কুফরি করে। জিজ্ঞেস করা হলো, তারা কি আল্লাহর সাথে কুফরি করে? তিনি বললেন- তারা স্বামীর প্রতি কুফর বা অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। যদি তুমি এক যুগ ধরে তাদের কারও উপকার কর, তারপরও সে তোমার কোনো ত্রুটি দেখলে বলে, আমি তোমার কাছ থেকে কখনও ভালো কিছু পাইনি।” (বুখারী-২৯) 


উপরে উল্লেখিত আয়াতে ক্ষুধা ও ভীতির স্বাদ আস্বাদনের জন্য ‘লেবাস’ শব্দ ব্যবহার করে বলা হয়েছে যে, তাদেরকে ক্ষুধা ও ভীতির পোষাক আস্বাদন করানো হয়েছে। ক্ষুধা ও ভীতি তাদের সবাইকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে নিয়েছে, যেমন পোশাক দেহের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে যায়। (ফাতহুল কাদীর)। তবে আয়াতে বর্ণিত দৃষ্টান্তটি কোনো কোনো তাফসীরবিদের মতে সাধারণ একটি দৃষ্টান্ত। এর সাথে বিশেষ কোনো জনপদের সাথে সম্পর্ক নেই। অধিকাংশ তাফসীরবিদ একে মক্কা মুকাররমার ঘটনা সাব্যস্ত করেছেন। কারণ, রাসূলুল্লাহ সা. তাদের বিরুদ্ধে ইউসুফ (আ)-এর সময়ের মত দোয়া করেছিলেন। (বুখারি-৪৮২১; মুসলিম-২৭৯৮)

যাহোক, বলছিলাম মক্কাবাসীরা সাত বছর পর্যন্ত নিদারুণ দুর্ভিক্ষে পতিত হবার কথা। তারা এমন দুর্ভিক্ষেই পতিত ছিল যে, যার কারণে তারা কুকুর ও ময়লা-আবর্জনা পর্যন্ত খেতে বাধ্য হয়ে পড়েছিল। এছাড়া মুসলিমদের ভয়ও তাদেরকে পেয়ে বসেছিল (দেখুন, ইবনে কাসীর; ফাতহুল কাদীর) এই যখন তাদের অবস্থা, তখন কোনো উপায়-অন্তর না পেয়ে মক্কার সর্দাররা রাসূলুল্লাহ সা.-এর কাছে কাতরকন্ঠে নিবেদন করল যে, কুফর ও অবাধ্যতার দোষে পুরুষরা দোষী হতে পারে, কিন্তু শিশু ও মহিলারা তো নির্দোষ। এরপর রাসূলুল্লাহ সা. তাদের জন্য মদিনা থেকে খাদ্যসম্ভার পাঠিয়ে দেন। আবু সুফিয়ান কাফের অবস্থায় রাসূলুল্লাহ সা.-কে অনুরোধ করেন যে, আপনি তো আত্মীয় বাৎসল্য, দয়া-দাক্ষিণ্য ও মার্জনা শিক্ষা দেন। আপনারই স্বজাতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। দুর্ভিক্ষ দূর করে দেওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। এতে রাসূলুল্লাহ সা. তাদের জন্য দোয়া করেন এবং দুর্ভিক্ষ দূর হয়ে যায়। (ইবন কাসীর) 

আসলে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তা’য়ালা কোনো জাতিকে উন্নত করেন কুরআন মাজিদ দ্বারা আর কোনো জাতিকে ক্ষতিগ্রস্তও করেন কুরআন মাজীদ দ্বারা। কুরআন মাজিদের আইন যদি কোনো জনপদ মেনে চলে এবং রাসূল সা.-এর মদিনার ইসলামী রাষ্ট্র অনুযায়ী তাদের সমাজ গড়ে তোলে তখন সেই জনপদ তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণ করে সুখ ও শান্তিতে জীবন যাপন করতে পারে। মহাগ্রন্থ আল-কুরআন থেকেই আমরা বিষয়টি জানতে পারি এভাবে, ”আর যদি গ্রামবাসীরা ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা (সত্যকে) অবিশ্বাস করেছে। তাই আমি তাদেরকে তাদের কৃতকর্মের জন্য পাকড়াও করেছি। (সূরা আরাফ : ৯৬) সুতরাং বাংলাদেশের মানুষও যদি আল্লাহর কিতাব কুরআন মাজীদের আইন অনুযায়ী এবং রাসূল সা.-এর সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারে তাহলে তারা দুনিয়াতে সুখ-শান্তি এবং আখেরাতেও নাজাত লাভ করতে পারে। এই শিক্ষাটাই আমাদেরকে এখান থেকে নিতে হবে। 

আজকের বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগে পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল। বাংলাদেশের জনগণ লড়াই করে স্বাধীনতা অর্জন করে। আর এই স্বাধীনতা অর্জন করতে বাংলাদেশের জনগণ যে কষ্ট করেছিল তার কয়েকটি উদ্দেশ্য ছিল- 

১. বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা, 

২. নিজেদের অধিকার আদায় করা, 

৩. নিজের ভোট নিজে দেওয়া, 

৪. ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং 

৫. স্বাধীনভাবে দেশ পরিচালনা করা।


বাংলাদেশের অর্ধশত বছর পার হয়ে গেছে, হিসাব নিকাশ এখন অনেকেই খতিয়ে দেখছে। বর্তমানে আমাদের সকল কিছু মনে হয় যেন রিমোট কন্ট্রোলে চলছে। অনেকেই বলতে চাচ্ছে সরকার নিজেদের ইচ্ছায় দেশ পরিচালনা করতে পারছে না। এখন আলোচনা হচ্ছে যে, তখন তথা একাত্তরের সংগ্রামে যারা দেশ আলাদা হলে যেসব ক্ষতির আশঙ্কা করেছিল, বর্তমানে তাই-ই তো দেখা যাচ্ছে। মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক তাঁর লেখা “স্বাধীনতা : কী পেয়েছি কী পাইনি” নামক কলামে লিখেছেন- “শেখ মুজিবের আমল থেকেই স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছে। তা না হলে উনি কেন বাকশাল করলেন? মুক্তিযুদ্ধের কারণে যেটা পেয়েছি সেটা হলো একটা স্বাধীন দেশ, একটা পতাকা, কিছু লোক ক্ষমতায় যেতে পেরেছে, কিছু লোক কিছু না কিছু বেনিফিট পেয়েছে। মুক্তিযেুদ্ধের তাৎপর্য ও শিক্ষার প্রধান আঙ্গিক হলো জনগণের মতামতকে সম্মান করা, জনগণের সম্পদকে রক্ষা করা। এটা হচ্ছে না। এরপর জিয়াউর রহমান আসলেন, তিনি আর্মিকে নিয়ে সামরিক বাহিনীকে নিয়ে দেশ চালালেন। তারপর এরশাদ সাহেব এসে জাতীয় পার্টি করলেন, এরপর হাসিনা তাঁর সাথে সহযোগিতা করলেন, নির্বাচন করলেন, এই যে জগাখিচুড়ি অবস্থা, এ জন্য সকলেই একযোগে দায়ী। এমন একটা পরিস্থিতি থেকে বের হওয়াটা কঠিন। তারপরেও আমি মনে করি শুধু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নয়, ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, যারা বিবেকবান, স্পষ্টবাদী, চিন্তাশীল তাদেরকে দাঁড়াতে হবে। বলতে হবে, হে জাতি, আসো, একতাবদ্ধ হও। তা না হলে সামনে অনেক বড়ো সমস্যা। জন্ম থেকে বিভাজন তৈরি করা হয়েছে। সকল প্রকারের বিভাজন সৃষ্টি বন্ধ করা প্রয়োজন। মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটিও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। সুযোগসন্ধানী স্বার্থপরদের প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। ভুয়া সনদ বিতরণ হয়েছে।” (দৈনিক ইনকিলাব, ১৬ ডিসেম্বর ২০২১ ইং) 


বাংলাদেশে এখন নির্বাচনের কোনো নিয়ম-নীতি পালন করা হয় না। ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যেমন করে ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য বাকশাল তৈরি করেছিল সকল দলকে নিষিদ্ধ করে একটি দল বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠন করেছিল, বাংলাদেশের সকল পত্রপত্রিকা বন্ধ করে দিয়ে মাত্র চারটি পত্রিকা প্রকাশ হতে থাকে, যেগুলো শুধুমাত্র সরকারের গুণগান করে এবং কাউকে কোনো সমালোচনা করতে পারে না। যার ফলে স্বৈরাচারীর চরমসীমায় পৌঁছে যায় সরকার। জনগণের কোনো কথা পত্রিকায় আসে না। পরবর্তী পর্যায়ে দেশে দুর্ভিক্ষ আসে উত্তরবঙ্গের একটি স্টেশনে একজন যাত্রী ট্রেনের বগি থেকে স্টেশনে বমি করল আর সেখানে একজন জীর্ণশীর্ণকায় ক্ষুধার্ত মানুষ বুকে ভর দিয়ে সেই বমি ভক্ষণ করে জীবন রক্ষা করার জন্য চেষ্টা চালালো। এই দৃশ্য সারা দুনিয়া দেখেছে। দেশের আইন এবং শাসন ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, চুরি ডাকাতি অগ্নিকাণ্ড বিভিন্নভাবে চলতে থাকে।

বর্তমানেও বাংলাদেশের গুরুতর সমস্যাগুলো হচ্ছে- গণতন্ত্রহীনতা, দুর্নীতি, মানুষের, জানমালের অনিরাপত্তা, বেকারত্ব, কর্মসংস্থান সংকট, সুশাসনের অভাব, জুলুম-নির্যাতন, আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর অপব্যবহার। ফারুক ওয়াসিফ- ‘বাংলাদেশ কেমন আছে’- প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, প্রবৃদ্ধি ভালো হলেই যে জনগণ শাসকের পক্ষে তা ঠিক নয়। ২০০৭-০৮ সালে জিডিপি সাড়ে ৬-এর ঘরে ছিল, তবু অস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার জনপ্রিয়তা পায়নি।’

২০০ বছর আগের কথা, নেপোলিয়ন রাশিয়া আক্রমণ করলে রাজধানী মস্কোও বেহাত হয়। রুশ সেনাপতি তাঁদের প্রশ্ন করলেন, ‘তোমার কৃষকেরা কী করছে?’ জেনারেলরা বললেন, তাঁরা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। ‘আর কী করছে?’ যাওয়ার সময় ফসলের গোলা, খেত খামার পুড়িয়ে দিচ্ছেন আর পানিতে ঢেলে দিচ্ছেন বিষ। খাদ্যভাণ্ডার ধ্বংস আর পানি বিষাক্ত করে দিয়ে তারা ফরাসিদের ভাতে-পানিতে মারার বন্দোবস্ত করছে। আসল প্রতিরোধ হবে শীতে। তখন বরফে সব জমে যাবে আর নেপোলিয়নের বাহিনী শীতে ও ক্ষুধায় মারা যাবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সামরিক নেতারাও ঠিক এই কৌশলটাই নিয়েছিলেন এবং জয়ী হয়েছিলেন শেষ পর্যন্ত।

আজকে বাংলাদেশ যতটা ভালো আছে, তা নিচতলার মানুষের অবদান। আর খুনখারাবি ও নৈরাজ্য-দুর্নীতি উঁচুতলার উপহার। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে মুঘল সম্রাট আকবরের উপদেষ্টা আবুল ফজল বলেছিলেন, ‘বঙ্গভূমি হলো অশান্তি ও নৈরাজ্যের দেশ।’ ল্যুক স্ক্র্যাফটন লিখেছেন, ‘আনুগত্য ও দেশপ্রেম বাঙালির অজানা...বাঙালিরা অনুগত থাকে ততক্ষণ, যতক্ষণ তাদের মনে ভয় থাকে; ভয় গেলে আনুগত্যও উবে যায়। টাকা এখানে শক্তির উৎস... সুতরাং যার যত টাকা, সে তত শক্তিশালী।’ (ঊধ্বৃতিসূত্র: প্রাকপলাশী বাংলা/সুবোধকুমার মুখোপাধ্যায়)। 

কবি রবি ঠাকুর বলেছিলেন ’সাত কোটি সন্তানেরে হে মুগ্ধ জননী রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি।” তাই আজকে মনে হয় সত্যিই বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকার মানুষে পরিণত হতে পারেনি। সূরা আরাফে আল্লাহ সুবহানাহুওয়া তায়ালা বলেছেন ‘তাদেরকে আমি অন্তর দিয়েছিলাম কিন্তু অন্তর দিয়ে চিন্তা করেনি। তাদেরকে আমি চোখ দিয়েছিলাম কিন্তু তারা চোখ দিয়ে দেখেনি। তাদেরকে আমি কান দিয়েছিলাম কিন্তু কান দিয়ে তারা শুনেনি। তারা চতুষ্পদ জন্তু জানোয়ারের মত, বরং তার চাইতেও নিকৃষ্ট। প্রকৃপক্ষে তারা হচ্ছে অধম। (সূরা আরাফ : ১৭৯)

যাই হোক, ঝগড়া-মারামারি নিয়ে ভালোই আছে বাংলাদেশ। সরকার রাজনৈতিক ঝগড়াকে রাজপথ থেকে উঠিয়ে টেলিভিশনের টক শো আর ফেসবুকের মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে পেরেছে। ডিজিটাল আইন পাশ করে সরকার ইচ্ছামত কাজ করে যাচ্ছে। ডিজিটাল আইন ও মামলার অন্যান্য ধারায় বিরোধীদেরকে আচ্ছা করে শায়েস্তা করে যাচ্ছে।

কথা বলার লোক আজকে পাওয়া যাচ্ছে না। দুই-একজন যারা বলছে তাদেরকে লাল দালানে মেহমান করে দেওয়া হচ্ছে। ফলে আজকে দেশ একটা মগের মুল্লুকে পরিণত হয়েছে। এখন ৫৭ ধারার আগমনে সকল দিক শান্ত। আগে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করে বিরোধীদেরকে জব্দ করা হতো এখন পুলিশ ও র‌্যাব ব্যবহার করে বিরোধীদেরকে জব্দ করা হচ্ছে। বাদবাকিরা কারাগারস্থ হওয়ায় আপাতত হরতাল-অবরোধের দিন আসছে না। উত্তেজনা, বিবাদ এখন কেবল অনলাইন ও ফেসবুকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অর্থনীতি বিষয়টা জনগণের জানাবোঝার বাইরে।

বিশ্ব কোষের মতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রধান ধর্ম। এ দেশের সর্বাধিক জনগণ ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী। বাংলাদেশে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ১৪৮.৬ মিলিয়ন (১৪.৮৬ কোটি), যা বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মুসলমান জন-অধ্যুষিত দেশ (ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান এবং ভারতের পরে)। ২০২২ সালের ডিজিটাল জনশুমারি অনুসারে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯১% এর বেশি মুসলমান। অথচ এই বাংলাদেশে এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, ইসলামী আইন চাওয়ার অপরাধে তাদেরকে লাঠিপেটা করে মারা হয়েছে। লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেছে এবং লাশের উপরে ওঠে নাচানাচিও করেছে, যা একটি মুসলিম মেজরিটি দেশে কেউ আশা করতে পারেনা। ঘটনাটি ছিল রক্তাক্ত ২৮ অক্টোবর। যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানবতাবিরোধী অপরাধ ও এ দেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক কলংকজনক অধ্যায়। প্রকাশ্য দিবালোকে লগি-বৈঠা দিয়ে তরতাজা তরুণদের পিটিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে নারকীয় উল্লাস চালানো হয়েছিল। সবচেয়ে বড় মানবতা বিরোধী অপরাধ এদিনই সংগঠিত হয়েছিল। লগি, বৈঠা, লাঠি, পিস্তল ও বোমা হামলা চালিয়ে যেভাবে মানুষ খুন করা হয়েছে তা মনে হলে আজও শিউরে ওঠে সভ্য সমাজের মানুষ। সাপের মতো পিটিয়ে মানুষ মেরে লাশের উপর নৃত্য ও উল্লাস করার মতো ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। এ ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, গোটা বিশ্বের বিবেকবান মানুষের হৃদয় নাড়া দিয়েছে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব থেকে শুরু করে সারাবিশ্বে ওঠে প্রতিবাদের ঝড়।

পৈশাচিকতার বিচার হওয়া তো দূরের কথা, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাগুলোই প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। যারা এর সাথে জড়িত তাদের বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। এর বিচার না হওয়া পর্যন্ত জাতি কলঙ্ক মুক্ত হবে না। হত্যার রাজনীতিকে উৎসাহিত করার পরিণতি কারো জন্যই শুভ নয়। ২৮ অক্টোবরের এ লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের বিচার না হওয়ায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আমরা দেখতে পারছি। এছাড়াও নিত্যদিন দ্বীন-ধর্ম অবমাননা তো আছেই। এবং সরকারে কর্তা ব্যক্তিরাই এসব প্রকাশ্যে করে বেড়ায়। কিন্তু সরকার তাদের সঠিকভাবে বিচারের আওয়াতায় আনছে না। নাস্তিক-মুরতাদদের বিচারের জন্য তাওহিদী জনতা দীর্ঘদিন থেকে ব্লাসফেমি আইন চেয়ে যাচ্ছে, সরকার সেটাতে কর্তপাত করছে না। বর্তমানে আফগানিস্তান, অস্ট্রিয়া, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, সোমালিয়া, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশে ব্লাসফেমি আইন চালু রয়েছে। প্রায় ৪০ দেশে ব্লাসফেমি আইন বিদ্যমান। কিছুদিন আগে অস্ট্রিয়ায় বাংলাদেশী সিফাত উল্লাহ সেফু এই অপরাধ করে কারাগারে গিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের মত মুসলিম প্রধান দেশে এরা অনেক সময় ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আপনারা বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের মতামত নিয়ে দেখুন, তারা এখনো সাবেক মন্ত্রী, ধর্মদ্রোহী লতিফ সিদ্দিকীর বিচার দেখতে চায়।

এই যে বাংলাদেশের সবদিকেই এমন শোচনীয় অবস্থা, এর থেকে কি উত্তরণের উপায় নেই? বাংলাদেশ কি আর ভালো অবস্থায় পৌঁছবে না? হ্যাঁ, পৌছবে, বাংলাদেশে যদি কেয়ারটেকার তথা নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা হয় এবং জনগণের সরকার কায়েম হয়, দেশে যদি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হয় গণতান্ত্রিক ও মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হয়, সর্বোপরি আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী হয়, তবে স্বাধীনতার সুফল কিছুটা হলেও জনগণ ভোগ করতে পারবে। বাংলাদেশ তখন গলা উঁচু করে বলবে আমি ভালো আছি। আর এ পথে যারা বাঁধা, তাদেরকে অপসারিত করে মানব রচিত মতবাদের পরিবর্তে ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই জনগণের কাক্সিক্ষত অভাব পূরণ হবে। সেদিনের অপেক্ষায় রইলাম আমরা, আল্লাহ কবুল করুন আমাদেরকে। আমাদের এই দেশকে। আমীন।

লেখক : ভারপ্রাপ্ত আমীরে জামায়াত,

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির