ক্রসফায়ারের আড়ালে হত্যা বাণিজ্য আহমেদ বাশার

গত একযুগ ধরে ক্রসফায়ার আতঙ্কে আছে বাংলাদেশ। আতঙ্কের ভয়াবহতা ভুক্তভোগীরা ভালো জানেন। ক্রসফায়ারের নানা বিশ্লেষণ করা যায় কিন্তু মৃত্যু আতঙ্কের উপলব্ধি কয়জনার হয়? মুশকিল হচ্ছে ক্রসফায়ার একটি অপরাধ হলেও সমাজে এর জনপ্রিয়তাও আছে। সম্প্রতি সাবেক সেনাকর্মকর্তা মেজর সিনহা মো: রাশেদ খান পুলিশের গুলিতে নিহত হলে দেশব্যাপী এটা আবার আলোচনায় এসেছে।
সরকারি সন্ত্রাসের নাম ‘বিচারবহির্ভূত হত্যা’। বিভিন্ন নামে এর পরিচিতি রয়েছে। ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুম, নিখোঁজ, সীমান্তে বিএসএফের হাতে হত্যা, মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত ইত্যাদি। বিচারবহির্ভূত হত্যায় র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি ও ভারতের বিএসএফ সবাই যেনো প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। নিহতদের মধ্যে দোষী বা নির্দোষী দুই ধরনের মানুষই আছেন। কখনো সন্ত্রাস দমনে, কখনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে, কখনোবা হত্যা বাণিজ্যের কারণে ব্যবহৃত হয় ক্রসফায়ার।
এবার আসুন কিছু পরিসংখ্যানের দিকে নজর দেয়া যাক। ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত দেশের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর হাতে বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে মোট ২,৪৭০ জন।
কিছু প্রশ্নবোধক ক্রসফায়ার!
বরগুনায় প্রকাশ্যে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করেছিল নয়ন বন্ড। এই ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে সারাদেশে চাঞ্চল্য দেখা যায়। এক সপ্তাহ না যেতেই নয়ন বন্ড কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় (২ জুলাই ২০১৯)। নৃশংস ওই ঘটনার পরে বন্দুকযুদ্ধে নয়ন বন্ড নিহত হওয়ায় ব্যাপারটি জনমনে প্রশংসিত হতে দেখা যায়। বস্তুত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার আগেই নয়ন বন্ডকে ক্রসফায়ার দেয়ার দাবি উঠতে থাকে। উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ তথাকথিত তৎপরতা দেখাতে ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটায়।
যুবলীগ নেতা রিয়াজুল হক খান মিল্কি ২০১৩ সালে নিজ দলের লোকজনের গুলিতে নিহত হন। সিসিটিভি ফুটেজের এই দৃশ্য ছড়িয়ে পড়লে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। কয়েকদিন পর ঘাতক জাহিদ সিদ্দিকী তারেককে ক্রসফায়ারে দেয়া হয়। প্রথমে র‌্যাব তারেককে গ্রেফতার করে। রাতের আঁধারে পুলিশের হাতে হস্তান্তরের সময় ক্রসফায়ারের ঘটনা ঘটে। ঘটনাপরম্পরা প্রশ্ন সৃষ্টি করে যে, প্রভাবশালী কাউকে রক্ষা করতেই ক্রসফায়ার দেয়া হয়েছে কিনা।
প্রিজনভ্যানে হামলা করে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে তিন জেএমবি সদস্যকে ছিনিয়ে নেয় তার সহযোগীরা (ফেব্রুয়ারি ২০১৪)। পরদিন ভোরে পালিয়ে যাওয়া জেএমবি সদস্য রাকিবকে ক্রসফায়ারে দেয় পুলিশ।
২০১৪-১৬ সালের দিকে দেশজুড়ে লেখক, প্রকাশক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, অধ্যাপক, বিদেশি, হিন্দু পুরোহিত, খ্রিস্টান যাজক, বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতো পরিচয়ের ব্যক্তিদের জঙ্গি স্টাইলে একের পর এক হত্যা করা হচ্ছিলো। মাদারীপুরে এক শিক্ষকের ওপর হামলার ঘটনায় হাতেনাতে ধৃত হয় গোলাম ফাইজুল্লাহ ফাহিম নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী। তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। সহযোগীদের গ্রেফতার অভিযানের নামে রিমান্ডে থাকা ফাহিমকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়। ব্লগার- লেখক অভিজিৎ রায়ের সন্দেহভাজন প্রধান আসামি মুকুল রানাও পুলিশ হেফাজতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল র‌্যাবের হাতে প্রাণ যায় এক সাথে সাত জনের। পেশাদার ভাড়াটে খুনির ন্যায় কাজ করে র‌্যাব। এই ঘটনায় সাবেক র‌্যাব অধিনায়ক তারেক সাঈদসহ ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
মাদকবিরোধী অভিযানের নামে টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক র‌্যাবের হাতে নিহত হন (২৬ মে ২০১৮)। হত্যাকাণ্ডের সময়ের অডিও প্রকাশ পেলে বন্দুকযুদ্ধের নামে এটা যে স্পষ্ট হত্যাকাণ্ড সেটা প্রকাশ পায়। নিন্দার ঝড় উঠলেও ক্রসফায়ার কিন্তু বন্ধ হয়নি।

ক্রসফায়ার নিয়ে দায়িত্বশীলদের কিছু কথা
‘ক্রসফায়ার নয়, বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছে জেএমবি সদস্য রাকিব’ এমন মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল (ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৪)। ক্রসফায়ার ও বন্দুকযুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য করেন তিনি।
সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকার দলের এমপি তোফায়েল আহমেদ প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদের আরো কঠোর আইন দরকার। মাদক সংশ্লিষ্ট ঘটনায় যদি ক্রসফায়ার হয়ে থাকে, তাহলে ধর্ষণের ঘটনায় কেন নয়?’ (১৪ জানুয়ারি ২০২০)
একই দিন জাতীয় পার্টির এমপি মুজিবুল হক চুন্নু জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আপনি ক্রসফায়ারে দিচ্ছেন। তবে কেন ধর্ষণের ঘটনায় একজনকেও দিচ্ছেন না?’
৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী দেশে মাদক নির্মূলে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মাদক, জঙ্গিবাদ নির্মূলে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে আমাদের র‌্যাব ও পুলিশ বাহিনী।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান কিন্তু শুরু হয়ে গেছে’ (বিডিনিউজ ২৪, ২০ মে ২০১৮)। জঙ্গিবিরোধী অভিযানের মতো পুলিশকে ২০১৮ এর জানুয়ারি মাসে এবং ৩ মে র‌্যাবকে মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
অভিযান শুরুর প্রথম সপ্তাহে ২৭ জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। ২০১৮ সালের ৪ মে থেকে মাদকবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৫৮৬ জন নিহত হয়েছেন, এর মধ্যে ২৩০ জন নিহত হয়েছেন কক্সবাজারে (১৬ আগস্ট ২০২০ প্রথম আলো)।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ. টি. ইমাম বিবিসিকে বলেন, ‘এ বছর অন্তত তিনটি বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেয়ার কথা বলেছিলেন। তার ধারাবাহিকতাতেই এ অভিযান চলছে।’ (বিবিসি, ২৩ মে ২০১৮) তাহলে বিচার-বহির্ভূত হত্যার নির্দেশদাতা কে?

বিচার-বহির্ভূত হত্যার রকমফের
বিএনপির গণমিছিলে পুলিশের গুলিতে একদিনে চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরে নিহত হয় ৪ জন (বিবিসি, ২৯ জানুয়ারি ২০১২)। মানিকগঞ্জে ইসলামপন্থী আট দলের সকাল-সন্ধ্যা ডাকা হরতালে পুলিশের গুলিতে নিহত হয় অন্তত তিনজন (বিবিসি, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩)। ভোলার বোরহানউদ্দিনে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে বিচারের দাবিতে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের মিছিলে পুলিশ গুলি করলে ৪ জন নিহত হয় (প্রথম আলো, ২০ অক্টোবর ২০১৯)
বিএনপি যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী অভিযোগ করেন ২০০৯ থেকে ১০ বছরে গুম হয়েছে ১,২০৯ জন, যার মধ্যে ৭৮১ জনকে গুম করার অভিযোগ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে (প্রথম আলো, ৩০ আগস্ট ২০১৯)। গুম হওয়াদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, চৌধুরী আলম, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির অধ্যাপক গোলাম আযমের ছেলে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী, যুদ্ধপরাধের কথিত অভিযোগে ফাঁসি হওয়া মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমান প্রমুখ।
এছাড়া বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদকে ঢাকায় নিজ বাসা থেকে গুম হওয়ার পর ভারতে পাওয়া যায়। এ ছাড়া সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মাম কাদের চৌধুরী, কলামিস্ট ফরহাদ মজহার, শিক্ষক মোবাশ্বার হাসান, সাংবাদিক উৎপলকে ছেড়ে দেয়া হয়। কল্যাণ পার্টির মহাসচিব আমিনুর রহমানকে গ্রেফতার দেখানো হয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে উঠিয়ে নেয়া, কয়েকদিন গুম থাকার পর গ্রেফতার দেখানোর কারণে গুমের সাথে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০১৭ সালে ৪৫ জনের ক্ষেত্রে গুম থাকার পর গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। গুম হওয়াদের মধ্যে রয়েছেন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, ছাত্র ও শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, শ্রমিক নেতা ইত্যাদি।
২০০৯ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত সীমান্তে বিএসএফের হাতে নিহত হয়েছে প্রায় সাড়ে তিনশো ব্যক্তি। সীমান্ত হত্যার ব্যাপারে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, ‘আসলে আমাদের চরিত্র যদি ভালো না হয়- পরের দোষ দিয়ে লাভ নেই। এখানে দোষ বাংলাদেশী নাগরিকদেরই, সুতরাং সরকারের কিছুই করণীয় নেই।’ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র উপপরিচালক নীনা গোস্বামী বলেন, সীমান্তে কেউ অপরাধ করলেও হত্যা কোনোভাবেই কাম্য নয় (বিবিসি, ৩১ জানুয়ারি ২০২০)। কুড়িগ্রামে ২০১১ সালে কিশোরী ফেলানীকে গুলি করে হত্যা করে তারকাঁটার বেড়ায় লাশ ঝুলিয়ে রেখেছিল বিএসএফ।
সার্বিকভাবে ক্রসফায়ার, গুম, অপহরণ, বন্দুকযুদ্ধ একটি অস্থির বাংলাদেশের পরিচয় বহন করছে। এগুলো গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের অনুপস্থিতি প্রমাণ করে। বিরোধী দল ও মতকে নৃশংস কায়দায় দমনের পাঁয়তারা। এসবের পেছনে রয়েছে ক্ষমতাসীনদের ফ্যাসিবাদী চিন্তা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভঙ্গুরতা। পাশাপাশি সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রে সমাজে ক্রসফায়ারের এক ধরনের জনপ্রিয়তাও বড় কারণ হিসেবেই দেখা দিয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক গণতান্ত্রিক চর্চা উঠে যাওয়ার পর এখন মানুষের মন মগজ থেকেও গণতান্ত্রিক মনোভাব উঠে যাচ্ছে।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply