খাবারের সুন্নত । উম্মে নাজিয়া

খাবারের সুন্নত  ।  উম্মে নাজিয়াহাদিসে বিশুদ্ধ খাবার খেতে বলা হয়েছে। দূষিত এবং হারাম উপায়ে অর্জিত কিংবা হারাম খাদ্য খেতে নিষেধ করা হয়েছে। বর্তমানে আমরা দেখছি কিভাবে দূষিত খাবার খেয়ে মানুষ মারাত্মক রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করছে। হাদিসে খাদ্যকে রোগ নিরাময়ের নিয়ামক বলা হয়েছে।

জীবন ও খাদ্য অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। জীবিত কোনো কিছু খাদ্য ছাড়া বাঁচে না। মানুষ সৃষ্টির পূর্বেই আল্লাহ পাক খাদ্য সৃষ্টি করেছেন। আল কোরআনে খাবার এবং পানীয় সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। খাদ্য একাধারে জীবন রক্ষাকারী। খাবার খেয়ে তৃপ্তি লাভ হয় এবং সেই সাথে শরীর সুস্থ নীরোগ হয়। হাদিসে বিশুদ্ধ খাবার খেতে বলা হয়েছে।
দূষিত এবং হারাম উপায়ে অর্জিত কিংবা হারাম খাদ্য খেতে নিষেধ করা হয়েছে। বর্তমানে আমরা দেখছি কিভাবে দূষিত খাবার খেয়ে মানুষ মারাত্মক রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু যন্ত্রণা ভোগ করছে। হাদিসে খাদ্যকে রোগ নিরাময়ের নিয়ামক বলা হয়েছে। যেমন-

মধু: সূরা আল নমলে বিস্তারিত বলা হয়েছে। এটি ক্ষত সারায় এবং নিরাময় করে। আধুনিক বিজ্ঞান বলে মধুতে অ্যান্টি ব্যাকটেরিয়ার গুণাবলি রয়েছে। মধুতে সাধারণ চিনি, যৌগ চিনি, খনিজপদার্থ, এনজাইম এবং বিভিন্ন ধরনের অনুপুষ্টি রয়েছে যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
কালোজিরা: কালোজিরা মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগ ভালো করে- আল হাদিস। এটি হজমের গোলমাল ভালো করে। এতে অ্যান্টিহিস্টাসিন যৌগ রয়েছে। এর অ্যান্টিইনফ্লামেনটরি, অ্যান্টি অক্সিডেন্ট এবং এনালজেসিক গুণাবলি রয়েছে। নিয়মিত খেলে হজমের গোলমাল, ঠাণ্ডাজনিত সমস্যা দূর করাসহ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
জমজমের পানি: এতে ক্যালসিয়াম, ক্লোরাইড, ম্যাগনেশিয়াম এবং অনুপুষ্টি রয়েছে যা শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
খেজুর: ডায়াটরি ফাইবার, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম এবং কমপ্লেক্স চিনি আছে। পুষ্টি এবং শক্তিদায়ক।
জয়তুনের তেল: এতে পলিআনস্যাচুরেটেড এবং মনোঅ্যানস্যাচুরেটেড ফ্যাটি এসিড, ভিটামিন ই রয়েছে যা হার্টকে সুরক্ষা দেয়। ত্বকের সৌন্দর্য এবং লাবণ্য বৃদ্ধি করে। মাথায় ব্যবহারে চুল পড়া বন্ধ করে, মাথা এবং চুলের জন্য অত্যন্ত উপকারী।
হাদিসে নবীজির পছন্দের বেশ কিছু খাবারের কথা বলা হয়েছে। বিজ্ঞান যেগুলোকে সুপার ফুড হিসেবে চিহ্নিত করছে :
১. খেজুর, ২. মাংস- আল্লাহ পাকের বিশেষ নেয়ামত। নবীজির প্রিয় মাংস দুম্বার সিনার মাংস, ৩. ডুমুর- জান্নাতের ফল প্রচুর ক্যালরি আছে, হাড় শক্ত করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সমৃৃদ্ধ, ৪. গম/যব, ৫. দুধ- সকল বয়সের মানুষের আদর্শ খাবার, স্মরণশক্তি বৃদ্ধি করে। প্রচুর ক্যালসিয়াম থাকায় হাড় ও দাঁত মজবুত করে, ৬. ডালিম, ৭. আঙ্গুর- কিডনির জন্য ভালো, প্রচুর ফাইবার আছে, ৮. জলপাইয়ের তেল, ৯. মাশরুম- ঔষধী গুণাবলি সম্পন্ন। শরীরের জন্য উপকারী পুষ্টি উপাদানে ভরপুর, ১০. পেঁয়াজ, ১১. তরমুজ- বীজ এবং ফল ভালো, শরীরে পানিশূন্যতা রোধ করে। কিডনির জন্য উপকারী, গরমে শান্তিদায়ক, ১২. জমজমের পানি, ১৩. কালজিরা, ১৪. বাঙ্গি- কোন ক্ষতিকর দ্রব্য নাই, শরীরে বিশুদ্ধ পানি যোগ হয়, ১৫. লাউ- শ্বাসকষ্ট ভালো করে। কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়, ব্যথানাশক, উচ্চরক্ত চাপ এবং হার্টের জন্য উপকারী।

নবীজি কিছু কিছু খাবার একত্রে খেতে নিষেধ করেছেন, তা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় বর্তমানে তার যথার্থতা পাওয়া গেছে। যেমন, মাছ এবং দই একসঙ্গে খাওয়া নবীজি পছন্দ করতেন না। গবেষণায় দেখা যায় মাছ এবং দইয়ের মিশ্রণে দ্রুত ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং হজমে সমস্যা হয়ে থাকে।

খাবারের সুন্নত  ।  উম্মে নাজিয়াদুধ এবং টকজাতীয় খাবার
নবীজি দুধ এবং টকজাতীয় ফল- টকজাতীয় ফলে প্রচুর ইস্ট থাকে। দুধে ল্যাকটিক এসিড থাকে ফলে ইস্ট দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড সৃষ্টি করে এবং হজমে ব্যাঘাত হয়।
নবীজি খাওয়ার আধ ঘণ্টা আগে এবং আধ ঘণ্টা পর পানি খাওয়ার জন্য বলেছেন- খাবার ঠিক আগে পানি খাওয়া উচিত নয় এবং খাবার সাথে সাথেও নয়- কারণ এতে হজমের জন্য যে এনজাইম থাকে তা পাতলা হয়ে যায় ফলে হজমে ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়।
ফল খাবার পর পানি পান না করার জন্য বলেছেন- ফলে প্রচুর পানি থাকে, সেই সাথে ফলে প্রচুর চিনি, জটিল চিনি ইস্ট থাকে। ফল খাবার পর পানি খেলে হজমের পাচকরস পাতলা হয়ে যায়। ইস্ট দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কার্বন-ডাই-অক্সাইড তৈরি করে, এতে হজমে ব্যাঘাত হয় এবং পেটে গোলমাল সৃষ্টি হয়।
নবীজি খাবার খেয়ে ভরা পেটে গোসল করতে নিষেধ করেছেন। বৈজ্ঞানিক তথ্য মতে- গোসল করলে শরীরের বিভিন্ন অংশের মধ্যে রাসায়নিক ক্রিয়া বেড়ে যায় ফলে খাবারকে হজম করার জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক ক্রিয়া কম হয় ফলে খাবার হজমে সমস্যা হয়, কাজেই খাবার খাওয়ার পূর্বে গোসল করা উচিত।
খুব গরম এবং ঠাণ্ডা খাবার একসাথে খাওয়া ঠিক নয়। খুব গরম এবং ঠাণ্ডা খাবার একসাথে খেলে দাঁতের এনামেল একবার প্রসারিত এবং সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে দাঁতের এনামেল ফাটল সৃষ্টি হয় এতে দাঁত ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ে। এ ছাড়া খুব গরম এবং ঠাণ্ডা খাবার পাকস্থলীর দেওয়ালকে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে।

রংধনু খাবার খাওয়া ভালো
রংধনু খাবার বলতে বোঝায় বিভিন্ন ধরনের রঙিন ফলমূল ও শাকসবজির সমন্বয়ের খাবার তালিকা। যেসব সবজি ও ফল রঙিন তা আমাদের শরীরের জন্য অত্যন্ত উপকারী। রঙিন ফলমূলে বিদ্যমান অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ডায়বেটিস রোগীদের স্মৃতিশক্তি ও বোধশক্তি রক্ষা করে। অ্যান্টি-এইজিং থেকে শুরু করে ওজন কমানোর মত সব কাজে আমাদের শরীরকে সহায়তা করে।

গরম পানির সাথে ঠাণ্ডা পানি মিশিয়ে খেতে নিষেধ করেছেন- গবেষণায় দেখা গেছে গরম পানিতে রোগজীবাণু বৃদ্ধি পেতে পারে না, পক্ষান্তরে ঠাণ্ডা পানিতে রোগজীবাণু থাকতে পারে, কাজেই দুই পানি মিলিয়ে খেলে রোগজীবাণুর সংক্রমণ জীবাণু বৃদ্ধি পেতে পারে। গরম এবং ঠাণ্ডা পানির মেলানোর ফলে বিষাক্ততা সৃষ্টি হতে পারে যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।
ছায়াতে শুকানো মাংস এবং চিজ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। গবেষণায় দেখা গেছে ছায়াতে শুকানো মাংস যারা বেশি খেয়ে থাকে তাদের মধ্যে উচ্চমাত্রায় ডায়াবেটিক, হার্টের সমস্যা, বিশেষ কিছু ক্যান্সার বেশি মাত্রায় দেখা যায়। চিজ নিয়মিত খেলে শরীরে চর্বি জমে এবং স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যায়। মধ্যবয়সী মানুষ চিজ বেশি খেলে মৃত্যুর ঝুঁকি দ্বিগুণ বেড়ে যায় সেই সঙ্গে ক্যান্সারের ঝুঁকিও বাড়ে। যারা ল্যাকটোজ হজম করতে পারে না তারা চিজ খেলে তাদের হজমে সমস্যা হয়, গ্যাস এবং পেট ফাঁপা সমস্যা দেখা দেয়।
ভরা পেট খাবার খাওয়া, খাবার খেয়ে- আবার খাওয়া নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
খাবার খাওয়ার পর হজমপ্রক্রিয়া চলতে থাকে যেক্ষেত্রে একটি খাবার হজম হবার পূর্বেই অন্য খাবার খাওয়া হয়, তাহলে পরের খাবার হজম করার মতো এনজাইমের অভাব হয় এবং হজমে সমস্যা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত ওজন থেকে পেটের চারিদিকে চর্বি জমে গেলে উচ্চরক্তচাপের সম্ভাবনা বেড়ে যাবে উচ্চ কোলেস্টেরল এবং রক্তে চিনির পরিমাণ বেড়ে যাবে সেই সাথে স্ট্রোক এবং মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাবে। ফলে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য খুবই ক্ষতিকর।
রাতে এশা নামাজ পড়ে খাবার খাওয়া সুন্নত। বেশি দেরিতে খাবার খেলে ডায়াবেটিক এবং হার্টের রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। দেরিতে খেলে রক্তে গ্লুকোজ এবং ইনস্যুলিনের পরিমাণ বেড়ে যায়, এটা টাইপ ২ ডায়াবেটিকের অন্যতম কারণ। রাতে দেরিতে খেলে ওজন বাড়ে না কিন্তু রক্তে ইনস্যুলিন, গ্লুকোজ, এবং কোলেস্টেরল বেড়ে যায়। রাতে দেরিতে খেলে স্মৃতিশক্তি কমে যেতে থাকে। দেরিতে খেয়ে ঘুমালে পাকস্থলীর নানা সমস্যা হয় এবং রাতে আজে বাজে স্বপ্ন দেখতে খাকে। পরবর্তী দিনে ক্ষুধা বেড়ে যায়।
জীবনের প্রতিটা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসের আলোকে আমরা জীবনের জটিল সমস্যা সমাধান সুন্দরভাবে করতে পারি।

লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply