গ্রেট পার্জ কমিউনিজমের এক কালো অধ্যায় -গোলাপ মুনীর

‘দ্য গ্রেট পার্জ’। সোভিয়েত ইউনিয়নের দ্বিতীয় নেতা জোসেফ স্টালিনের মহাশুদ্ধি অভিযান। এই অভিযানের শুরু ১৯৩৬ সালের দিকে। এর আনুষ্ঠানিক অবসান ১৯৩৮ সালে। অনানুষ্ঠানিকভাবে চলে আরো কয় বছর। ‘গ্রেট টেরর’ নামেও রয়েছে এর পরিচিত। এই রাজনৈতিক অভিযানের নেতৃত্ব দেন স্বঘোষিত ডিক্টেটর জোসেফ স্টালিন। স্টালিনের নির্মম এই অভিযান সোভিয়েত কমিউনিস্ট শাসনের কালো ইতিহাস হিসেবে চিহ্নিত। কমিউনিস্ট পার্টির ভিন্ন মতাবলম্বী সদস্য ও স্টালিন যাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতেন, তাদের দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেয়ার অভিযান ছিল এটি। বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞের মতে স্টলিনের এই মহাশুদ্ধি অভিযানের সময়ে কমপক্ষে সাড়ে ৯ লাখ থেকে ১২ লাখ ভিন্ন মতাবলম্বীকে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া ১০ লাখেরও বেশি লোককে জোর করে পাঠানো হয় ‘গুলাগ’ নামের বাধ্যতামূলক শ্রমশিবিরে। অনেককে পাঠানো হয় নির্বাসনে। এই নিষ্ঠুর ও রক্তাক্ত সন্ত্রাসী অভিযান পরিচালিত হয় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে। ১৯৩৮ সালে এই অভিযানের আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটলেও এর প্রভাব চলে আরো বহু বছর ধরে। মূলত কমিউনিস্টবিরোধী লোকজন ও তাদের কর্মকাণ্ডকে ছেঁটে ফেলার আয়োজন ছিল এটি।

এর শিকারে পরিণত হয়েছিলেন সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী সোভিয়েত কবি বরিস পাস্তেরনাকের বন্ধুরাও। ১৯৩৬-৩৮ সময়ে স্টালিন নিজে প্রায় চল্লিশ হাজার লোকের মৃত্যু পরোয়ানায় সই করেছিলেন। ১৯৩৭ সালের ১২ ডিসেম্বর, শুধু এই একটি দিনেই স্টালিন ৩১৬৭ জনের মৃত্যুদণ্ডে সম্মতি জ্ঞাপন করেন। এ বছরে জুনের একদিনে পাস্তেরনাকের কাছে সামরিক বাহিনীর কয়েকজন বিরুদ্ধাচরণকারীর মৃত্যুদণ্ডের সমর্থনে স্বাক্ষর চাওয়া হলো।’ তখন স্টালিন তার এই মহাশুদ্ধি অভিযানে বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন আদায়ে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু পাস্তেরনাক সই দেননি। বরং বিরক্তিভরে তিনি বলেছিলেন, “আমি যখন কাউকে প্রাণ দান করতে পারব না, অতএব কারো প্রাণহরণে সম্মতি দানও আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” পাস্তেরনাক যদিও জানতেন, তিনি সই না দিলেও পিটিশনে তার সইটি পড়েই যাবে। বাস্তবে তাই হয়েছিল। মাঝে মাঝে তিনি অবাক হতেন, তিনি কী করে বেঁচে আছেন গ্রেফতার না হয়ে। ১৯৫৪ সালে তিনি এক চিঠিতে লিখেছিলেন: It’s surprising that I remind whole during the purges’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রথম জীবনে সমর্থক হলেও উত্তরোত্তর তিনি রুশ বিপ্লব ও সোস্যালিজমের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন।

বরিস পাস্তেরনাক ও তার বন্ধুরা চরম শিকারে পরিণত হয়েছিলেন এই গ্রেট পার্জের। বিখ্যাত রুশ কবি, ঔপন্যাসিক ও সাহিত্যের অনুবাদক বরিস পাস্তেরনাক ১৯৫৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। এই ঘটনা সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষুব্ধ করে তোলে। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে এই পুরস্কার নিতে অস্বীকার করেন। তিনি বেশ কয়েকটি বই লিখে গেছেন। তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘ডক্টর জিভাগো’ প্রকাশ পায় ১৯৫৭ সালে। এটি লিখেন ১৯০৫ সালের রুশ বিপ্লব ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে। সোভিয়েত ইউনিয়নে এর প্রকাশনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কিন্তু এর পাণ্ডুলিপি ছাপার জন্য গোপনে চলে যায় ইতালিতে। অবশ্য পরবর্তী শাসকেরা ১৯৮৯ সালের দিকে এই বইটিকে মেনে নেন। ২০০৩ সাল থেকে রাশিয়ার স্কুল পাঠক্রমের অংশ হয়ে আছে এই ‘ডক্টর জিভাগো’ উপন্যাসটি।

সে যা-ই হোক, গ্রেট পার্জের শিকার হয়ে একে একে হারিয়ে যাচ্ছিলেন পাস্তেরনাকের বন্ধুরা। পার্জ চলাকালে হঠাৎ দেখা গেল বন্ধু বরিস পিলনিয়াক নেই। পরের বছর হারান আরেক বন্ধু ইসাক বাবেলকে। দুজনেই ছিলেন নামী লেখক। সোভিয়েত গোপন পুলিশ বাহিনী ‘পিপলস কমিসারিয়েট ফর ইন্টারনাল অ্যাফেয়ার্স’-এর লোকেরা তাদেরকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। আর ফিরে আসেননি। সোভিয়েতের এই গুপ্ত পুলিশ বাহিনী সোভিয়েত ভাষায় সংক্ষেপে এনকেভিডি নামে পরিচিত। স্টালিনের আজ্ঞাবহ ছিল এ বাহিনী। রুশ সমাজতন্ত্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ছিল পাস্তেরনারের বন্ধুদের বিরুদ্ধে। এ অভিযোগে এই দু-জনকেই গুলি করে হত্যা করা হয়। আরেকদিন ধরে নিয়ে যাওয়া হলো বন্ধু কবি ওসিপ মেন্ডেলস্টামকে। এভাবে পাস্তেরনাক হারান আরো দুই কবি-বন্ধু টিটসিয়ান টাবিডজে ও পাওলো ইয়াসভিলিকে। টাবিডজের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাননি পাওলো। অথচ বাঁচতে হলে তাকে তা করতে হবে। তাই আত্মহত্যার পথই শেষ পর্যন্ত বেছে নেন পাওলো। পাওলোর আত্মহত্যার কিছু পরেই ধরা পড়েন টাবিডজে। মৃত্যুদণ্ড হলো তার। গ্রেট পার্জের প্রবল প্রভাবে তার বহু বন্ধুকেই হারান বরিস পাস্তেরনাক। সে আরেক লম্বা কাহিনী।

সোভিয়েত নেতা ও বলশেভিক পার্টির প্রধান ভøাদিমির ইলিচ লেনিন মারা যান ১৯২৪ সালে। তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের জন্য স্টালিনকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ১৯২৯ সালে তিনি নিজেকে ডিক্টেটর ঘোষণা করেন। স্টালিন ক্ষমতায় আসার পর সাবেক বলশেভিক পার্টির কিছু সদস্য তার কর্তৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। ১৯৩০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে স্টালিন ভাবলেন, যারা বলশেভিক পার্টির ও লেনিন সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল, তারা তার জন্য হুমকি। অতএব স্টালিনের স্থির সিদ্ধান্ত: তাদের বিদায় করতে হবে। সে লক্ষ্যেই তিনি এই মহাশুদ্ধি অভিযান শুরু করেন। তবে এই গ্রেট পার্জের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। কারো কারো দাবি, স্টালিনের উদ্দেশ্য ছিল তিনি একজন স্বৈরশাসক হিসেবে তার কর্তৃত্ব বহাল রাখবেন। সে জন্যই তিনি এই শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছিলেন। অন্যরা মনে করেন, তিনি এই শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছিলেন সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ঐক্য আরো জোরদার কবে তুলে পার্টিকে শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে দাঁড় করানোর মানসে। জার্মানিতে নাৎসিদের ক্ষমতায় আসা এবং জাপানের সামরিকতন্ত্রী হয়ে ওঠাও ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য এক ধরনের হুমকি। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এ কারণেও স্টালিন অধিকতর আগ্রহী হয়ে ওঠেন এই শুদ্ধি অভিযানে; তার দেশের ঐক্য সুসংহত ও জোরদার করার লক্ষ্যে।

গ্রেট পার্জেন প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৩৪ সালে। প্রখ্যাত বলশেভিক নেতা সার্গেই কিরভের হত্যার মধ্য দিয়ে। কিরভকে খুন করা হয় কমিউনিস্ট পার্টির সদর দফতরে। লিওনিদ নিকোলাভেভ নামের এক ব্যক্তি তাকে খুন করেন। যদিও তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবু অনেকের সন্দেহ স্টালিন নিজে কিরভকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন। কিরভ খুন হওয়ার পরপরই স্টালিন শুরু করেন তার গ্রেট পার্জ। তখন দাবি তোলেন, তিনি উদঘাটন করতে পেরেছেন স্টালিনবাদী কমিউনিস্টবিরোধী এক ষড়য়ন্ত্র চলছে। এ দাবি তুলে এই ডিক্টেটর শুরু করেন পার্টির সন্দেহভাজন লোকদের হত্যা ও আটক করা। তা-ই শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় মূল বলশেভিক পার্টির সবাইকে সরিয়ে ফেলার কাজে, যারা অংশ নিয়েছিলেন ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবে। যারা এই পার্জের শিকার হয়েছিলেন, তারা ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টি বিরোধী সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, সেনা কর্মকর্তা ও তাদের সহায়তাকারী।

কিরভের মৃত্যুর পর মস্কোতে বহুল প্রচারিত তিনটি বিচারকাজ শুরু হয়। এগুলো ‘মস্কো ট্রায়ালস’ নামে পরিচিত। এসব বিচারের মাধ্যমে স্টালিনের বহু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকদের শেষ করে দেয়া হয়। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কমিউনিস্ট ছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ আনা হয়েছিল। এদেরই কয়েকজন হচ্ছেন: লেভ ক্যামেনেভ, গ্রেগরি জিনোভিয়েভ, নিকোলাই বুখারিন ও আলেক্সি রিকভ। মস্কো ট্রায়ালস নামের এসব বিচারকাজ ছিল স্পষ্টতই সাজানো নাটক। অভিযুক্তরা নিজেদের বিশ্বাসঘাতকতা ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ স্বীকার করেন। পরে ইতিহাসবিদেরা জানতে পারেন, অভিযুক্তদের কাছ থেকে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। জেরার সময় তাদের ওপর অত্যাচার চালানো ও মেরে ফেলার হুমকি দিয়ে এই স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। অপর দিকে সোভিয়েত গোপন পুলিশ বাহিনী এনকেভিডি তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটি সিদ্ধান্ত নিতো অন্যান্য সোভিয়েত-বিরোধীদের হত্যা করা না করার বিষয়টি। অভিযুক্তদের সেখানে বিচারের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করে তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হতো।

গ্রেট পার্জের সময় স্টালিন অভিযুক্তদের বর্ণনা করতে ফিফথ কলাম, এনিমি অব দ্য পিপল, সাবোটিয়ার ইত্যাদি শব্দ বা শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করতেন। হত্যাকাণ্ড ও আটক করা শুরু হয় বলশেভিক পার্টির সদস্য, রাজনৈতিক কর্মকর্তা ও সামরিক বাহিনীর সদস্যদের দিয়ে। এর পর এই পার্জ সম্প্রসারিত করা হয় কৃষক, নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু, শিল্পী, বিজ্ঞানী, পর্যটক, বিদেশী ও সাধারণ নাগরিক পর্যায়ে। কার্যত কেউই এই পার্জের হাত থেকে বিপদমুক্ত ছিল না। স্টালিন ধরে নিয়েছিলেন তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের প্রয়াস চলছে। এই ভেবে তিনি রেড আর্মির ৩০ হাজার সদস্যকে হত্যা করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১০৩ জন জেনারেল ও অ্যাডমিরালের মধ্যে ৮১ জনকেই তখন হত্যা করা হয়। তখন স্টালিন এক ডিক্রি জারি করে বলেন: স্বামী অথবা বাবার অপরাধের জন্য পুরো পরিবার দায়ী। এর অর্থ বাবা বা মায়ের অপরাধের জন্য ১২ বছরের শিশুকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া যাবে। তখন কমিউনিস্ট পার্টির ৩০ লাখ সদস্যের মধ্যে ১০ লাখকেই হত্যা করা হয়।

সন্দেহ নেই, স্টালিনের এই নির্মম কৌশল গোটা দেশকে পঙ্গু করে দেয়। এর ফলে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাস। এই ঘটনার শিকার কিছু ভুক্তভোগীর দাবি, কুখ্যাত বাধ্যতামূলক শ্রমশিবির গুলাগে পাঠিয়ে তাদের ওপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তার চেয়ে বরং তাদের মেরে ফেললেই ভালো হতো। যাদের গুলাগ শিবিরে পাঠানো হয়েছিল, তাদের অনেককে শেষ পর্যন্ত মেরেও ফেলা হয়। যদিও বেশির ভাগ ইতিহাসবিদের মতে এই গ্রেট পার্জের সময়ে সাড়ে ৯ লাখ থেকে ১২ লাখ লোককে হত্যা করা হয়, তবে অনেকের মতে, এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি। কিছু লোককে গুম করে ফেলা হয় এবং অনেককে হত্যা করা হতো গোপনে। তাই এই পার্জের কারণে নিহতের সংখ্যা একদম সঠিক সংখ্যায় নির্ধারণ একেবারেই অসম্ভব। অনেকে বাধ্যতামূলক শ্রমশিবিরে মারা যায় চরম দুর্দশার কারণে রোগশোকে ভোগে ও না খেতে পেয়ে। এভাবে কত লোক প্রাণ হারিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এ বিষয়টিও এই গ্রেট পার্জে নিহতদের সংখ্যা নির্ধারণকে আরো জটিল করে তোলে।

আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেট পার্জের অবসান ঘটে ১৯৩৮ সালে। কিন্তু অনেকের বিশ্বাস, স্টালিন সত্যিকার অর্থে এই শুদ্ধি অভিযান অবসান ঘটাননি, ১৯৪০ সালের আগস্টে তার দীর্ঘদিনের প্রতিপক্ষ লিওন ট্রটস্কিকে হত্যার আগে পর্যন্ত। মস্কো ট্রায়ালের সময় তার অবর্তমানে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। তখন তিনি নির্বাসনে ছিলেন মেক্সিকোতে। সেখানে তিনি স্পেনীয় কমিউনিস্ট র‌্যামো’এন মারকেডারের একটি আইস-এক্স তথা বরফ-কুঠারের ভয়াবহ আঘাতের শিকার হন। আঘাতের পরদিন তিনি মারা যান। এমনকি তাকে খুন করার পরও ব্যাপক গণহত্যা, গ্রেফতার ও নির্বাসনে পাঠানো চলতে থাকে ১৯৫৩ সালের মার্চে স্টালিনের মৃত্যুর আগে পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যুদ্ধবন্দী হত্যার জন্য দায়ী ছিলেন স্টালিন। বিশেষ করে তিনি দায়ী পোলান্ডের লোকজন হত্যার জন্য। স্টালিনের মৃত্যুর পর ক্রুশ্চেভ হয়ে ওঠেন তার সম্ভাব্য উত্তরসূরি। এর ৬ মাস পর তিনি হন কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। প্রথম দিকে ক্রুশ্চেভ ও তার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যৌথভাবে শাসনকাজ পরিচালনা করেন। কিন্তু ১৯৫৫ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী গিরর্গি মেলনকভকে সরিয়ে তার মিত্র নিকোলাই বুলগেনিনকে করেন প্রধানমন্ত্রী। ক্রুশ্চেভ ১৯৫৭ সালে মেলনকভের নেতৃত্বাধীন এক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন। এবং পরবর্তী সময়ে নিজেই প্রধানমন্ত্রী হন।

এক সময়ের স্টালিন-অনুগত ক্রুশ্চেভ ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সুদীর্ঘ এক ভাষণ দেন। এ ভাষণে তিনি স্টালিনের প্রতিপক্ষদের গ্রেফতার ও নির্বাসনে পাঠানোর সমালোচনা করেন। স্টালিনের উত্তরসূরি নিকিতা ক্রুশ্চেভ গ্রেট পার্জের নির্মমতার নিন্দা জানিয়েছিলেন। এই ভাষণে ক্রুশ্চেভ গ্রেট পার্জকে ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ বলে অভিহিত করেন এবং স্বীকার করেন প্রকৃতপক্ষে গ্রেট পার্জের শিকার অনেকেই ছিলেন নির্দোষ।
স্ট্যালিনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও নির্যাতন-নিপীড়ন সোভিয়েত জনগণের চেতনার বিনাশ ঘটায়। তিনি কার্যকরভাবে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন একটি সুনির্দিষ্ট নাগরিক গোষ্ঠীকে। যেমন, তিনি নিশ্চিহ্ন করে দেন দেশটির বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী সমাজকে। ডিক্টেটর হিসেবে তার শাসনামলে জনগণকে করে তুলেছিলেন রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।

অবাক ব্যাপার হলো, গ্রেট পার্জের ও স্টালিনের লেগাসি সোভিয়েত ইউনিয়নে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। একদিকে বেশির ভাগ রুশ যেমনি গ্রেট পার্জকে বিবেচনা করে ইতিহাসের ভয়াবহতম এক নির্মম ঘটনা হিসেবে, তেমনি অন্যরা মনে করেন- স্টালিন তার এই বর্বরতার মধ্য দিয়েও সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘গ্রেটনেস’ তুলে ধরায় জনগণকে শক্তিশালী করে তুলতে সহায়তা করেছিলেন। কিন্তু বিবেকবান রুশ জনগণ ও বিশ্বের মানুষ সাধারণভাবে এই গ্রেট পার্জকে কমিউনিজমের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায় বলেই জানে। আসলে কমিউনিস্ট শাসনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গ্রেট পার্জের মতো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন ও মানবতাাবিরোধী অনেক অপরাধ, যা বাম রাজনীতির অনুষঙ্গ হয়ে আছে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply