post

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে রোজা

মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

০৯ মার্চ ২০২৩

আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য, পানীয় স্বামী-স্ত্রীর মিলন হতে বিরত থাকার নাম রোজা। রোজা ইসলামের অন্যতম একটি রুকন। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, “তোমরা যদি রোজা রাখো তবে তাতে রয়েছে তোমাদের জন্য কল্যাণ, তোমরা যদি সেটা উপলব্ধি করতে পারো।” (সূরা বাকারা : ১৮৪)। বস্তুত এ আয়াতে আল্লাহ তায়ালা রোজা পালনের নানাবিধ কল্যাণের প্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানীগণ গবেষণা করে উপরোক্ত আয়াতের সত্যতা প্রমাণ করেছেন। রোজার সকল হুকুম আহকাম স্বাস্থ্যরক্ষার দিকে লক্ষ্য রেখেই করা হয়েছে। যেমন- শিশু ও অতিবৃদ্ধের জন্য রোজা ফরজ নয়। সফরে ও অসুস্থ অবস্থায় রোজা না রাখার অনুমতি রয়েছে। ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় বেশি কষ্ট না পাওয়ার জন্য সাহরির ব্যবস্থা ইত্যাদি। রোজাপালনের ফলে মানুষের শরীরে কোনো ক্ষতি হয় না; বরং অনেক কল্যাণ সাধিত হয়, তার বিবরণ কায়রো থেকে প্রকাশিতScince for Fasting গ্রন্থে পাওয়া যায়। পাশ্চাত্যের প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদগণ একবাক্যে স্বীকার করেছেন, The power and endurance of the body under fasting Conditions are remarkable; After a fast properly taken the body is literally bom afresh. অর্থাৎ- “রোজারাখা অবস্থায় শরীরের ক্ষমতা ও সহ্যশক্তি উল্লেখযোগ্য; সঠিকভাবে রোজাপালনের পর শরীর প্রকৃতপক্ষে নতুন সজীবতা লাভ করে।” রোজা মুসলমানদের জন্য এক ফরজ বিধান। মুসলমানদের কাছে এর গুরুত্ব অপরিসীম। অনেকে মনে করেন রোজা রাখার কারণে শরীরের অনেক সমস্যা দেখা দেয়। তাদের কথা আদৌ ঠিক নয়। কেননা চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে রোজা মানুষের শরীরের জন্য খুবই উপকারী। নিম্নোক্ত রোজা সম্পর্কে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মন্তব্য উল্লেখ করা হলো-

১. ডা. জুয়েলস এম. ডি বলেছেন, ‘‘যখনই একবেলা খাওয়া বন্ধ থাকে, তখনই দেহ সেই মুহূর্তটিকে রোগমুক্তির সাধনায় নিয়োজিত করে।”

রোজা কম খাওয়ার প্রশিক্ষণ। কিন্তু রোজা ছাড়াও ইসলাম কম খাওয়াকে উৎসাহিত করে। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, “পেট ভর্তি করে খাওয়া অপেক্ষা মানুষের জন্য মন্দ দ্বিতীয় কোনো কাজ নেই। আদম সন্তানের বেঁচে থাকার জন্য কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট। যদি তা না করে (অর্থাৎ বেশি খেতে চায়) তাহলে পেটের এক-তৃতীয়াংশ খাবার, এক-তৃতীয়াংশ পানি এবং অপর তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য খালি রাখা দরকার। (আহমাদ, ইবনে মাজাহ, হাকেম)

২. ডা. হেনরী এডওয়ার্ড মন্তব্য করেন, রোজা মানে অসামাজিক কার্যকলাপ, কতিপয় ব্যক্তিগত সমস্যা ও রোগ শোক এবং মিথ্যা বলা থেকে রক্ষা পাওয়ার মোক্ষম অবলম্বন। আমি এ মহাসত্যকে স্বীকার করছি। রোজার মধ্যে মানবের সুন্দর চরিত্র সৃষ্টির ঐশী অবদান লুকিয়ে রয়েছে। 

৩. ডা. স্যামুয়েল আলেকজান্ডার পরিষ্কারভাবে বলেন, রোজা হচ্ছে রকমারি মানসিক রোগগুলোর উত্তম ঔষধ, চমৎকার এবং ফলপ্রসূ প্রতিষেধক, আত্মাকে নির্মল করে দেয় ঠিক তেমনি পবিত্রও রাখে।

৪. ডা. আলেক্স হেইগ বলেছেন, “রোজা হতে মানুষের মানসিক শক্তি ও এবং বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়। স্মরণশক্তি বাড়ে, মনোসংযোগ ও যুক্তিশক্তি পরিবর্ধিত হয়।” প্রীতি, ভালোবাসা, সহানুভূতি, অতীন্দ্রিয় এবং আধ্যাত্মিক শক্তির উন্মেষ ঘটে। ঘ্রাণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি প্রভৃতি বেড়ে যায়। ইহা খাদ্যে অরুচি ও অনিচ্ছা দূর করে। রোজা শরীরের রক্তের প্রধান পরিশোধক। রক্তের পরিশোধন এবং বিশুদ্ধি সাধন দ্বারা দেহ প্রকৃতপক্ষে জীবনীশক্তি লাভ করে। যারা রুগ্ন তাদেরকেও আমি রোজা পালন করতে বলি।”

৫. বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমন্ড নারায়ড বলেন, ‘‘রোজা মনস্তাত্ত্বিক ও মস্তিষ্ক রোগ নির্মূল করে দেয়। মানবদেহের আবর্তন-বিবর্তন আছে। কিন্তু রোজাদার ব্যক্তির শরীর বারংবার বাহ্যিক চাপ গ্রহণ করার ক্ষমতা অর্জন করে। রোজাদার ব্যক্তি দৈহিক খিঁচুনি এবং মানসিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয় না।”

৬. প্রখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী Macfadden সাহেব মনের প্রগাঢ়তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে রোজার ভূমিকা প্রসঙ্গে বলেন, “রোজার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে কি পরিমাণ খাদ্য গ্রহণ করা হলো তার উপর বুদ্ধিবৃত্তির কর্মক্ষমতা নির্ভর করে না। বরং কতিপয় বাধ্যবাধকতার উপরই তা নির্ভরশীল। একজন ব্যক্তি যত রোজা রাখে তার বুদ্ধি তত প্রখর হয়।”

৭. ডা. এ এম গ্রিমী বলেন, “রোজার সামগ্রিক প্রভাব মানব স্বাস্থ্যের উপর অটুটভাবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে এবং রোজার মাধ্যমে শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

৮. ডা. আর ক্যাম ফোডের মতে, “রোজা হচ্ছে পরিপাক শক্তির শ্রেষ্ঠ সাহায্যকারী।”

৯. ডা. বেন কিম তাঁর Fasting for health প্রবন্ধে বেশ কিছু রোগের ক্ষেত্রে উপবাসকে চিকিৎসা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে উচ্চরক্তচাপ, শ্বাসতন্ত্রের প্রদাহ (হাঁপানি), শরীরের র‌্যাশ, দীর্ঘদিনের মাথাব্যথা, অন্ত্রনালীর প্রদাহ, ক্ষতিকর নয় এমন টিউমার ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে তিনি বলেন, উপবাসকালে শরীরের যেসব অংশে প্রদাহজনিত ঘা হয়েছে তা পূরণ (Repair) এবং সুগঠিত হতে পর্যন্ত সময় পেয়ে থাকে। বিশেষত: খাদ্যনালী পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাওয়াতে তার দেহে ক্ষয়ে যাওয়া টিস্যু পুনরায় তৈরি হতে পারে। সাধারণত দেখা যায় টিস্যু তৈরি হতে না পারার কারণে অর্থপাচ্য আমিষ খাদ্যনালী শোষণ করে দুরারোগ্য (Auto, une disease) সব ব্যাধির সৃষ্টি করে।

১০. প্রখ্যাত চিকিৎসক ডা. জন ফরম্যান Fasting and eating for helth প্রবন্ধে সুস্বাস্থ্য রক্ষায় উপবাস এবং খাবার গ্রহণের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে উপবাসের স্বপক্ষে মত দিয়েছেন।

১১. প্রফেসর বি এন নিকেটন দীর্ঘায়ু লাভের এক গবেষণা রিপোর্টে ৩টি কাজের কথা বলেন। এগুলো হলো (ক) পরিশ্রম করা, (খ) নিয়মিত ব্যায়াম করা, (গ) প্রতি মাসে কমপক্ষে একদিন রোজা বা উপবাস থাকা।

১২. ডা. এম. কাইভ বলেন, “রোজা রাখলে শ্লেষ্মা ও কফজনিত রোগ দূরীভূত হয়।”

১৩. ডা. আব্রাহাম জে. হেনরি বলেছেন, “রোজা হলো পরম হিত সাধনকারী ঔষধ।”

১৪. ডা. অ্যাডওয়ার্ড নিক্সন বলেছেন, “রোজা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং অনেক রোগের কবল থেকে দেহকে রক্ষা করে।”

১৫. ডা. ফ্রাঙ্কলিন বলেছেন, “রোজা স্বাস্থ্যের জন্য খুব উপকারী; তবে ইফতারিতে বেশি খাওয়া ক্ষতিকর।”

১৬. ডা. লিউ থার্ট বলেছেন, দেহের রোজা অত্যন্ত হিতকর টনিক। রোজাদাররা অনেক রোগ থেকে মুক্ত থাকেন।”

১৭. ডা. লুইস ফ্রন্ট বলেছেন, “রোজা পালনে মানবদেহ যথেষ্ট পুষ্ট এবং বলিষ্ঠ হয়ে থাকে। মুসলমানরা নিশ্চয়ই রোজার মাসকে সুস্বাস্থ্যের মাস হিসেবে গণ্য করে থাকেন। রোজা বা উপবাস মেধাশক্তিকেও বৃদ্ধি করে থাকে।

১৮. ভারতের নেহরু গান্ধী গোটা জীবন রোজায় অভ্যস্ত ছিলেন। তিনি তার অনুসারীদেরকে বলেন, “রোজার মাধ্যমে আত্মসংযম বাড়ে এবং মানবাত্মা পবিত্রতা অর্জন করে।”

১৯. ডক্টর ডিউই বলেছেন, “রোগজীর্ণ এবং রোগক্লিষ্ট মানুষটির পাকস্থলী হতে খাদ্যদ্রব্য সরিয়ে ফেলো, দেখবে রুগ্ন মানুষটি উপবাস থাকছে না, সত্যিকাররূপে উপবাস থাকছে রোগটি।”

২০. একাদশ শতাব্দীর বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসাবিজ্ঞানী ইবনে সিনা তার রোগীদের তিন সপ্তাহের জন্য উপবাস পালনের বিধান দিতেন।

২১. জার্মানির এক স্বাস্থ্য ক্লিনিকের গেইটে লেখা আছে, “রোজা রাখো স্বাস্থ্যবান হবে।” এর নিচে লেখা আছে “মোহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ।” খ্রিস্টান জার্মানিসহ অন্যান্য খ্রিস্টান চিকিৎসকরা রোজার উপকারিতার বিষয়ে বেশ কিছু গবেষণা করেছেন। বিশ্বের অনেক দেশে রোজার মাধ্যমে “চিকিৎসা ক্লিনিক” খোলা হয়েছে। এর মধ্যে বেশি প্রসিদ্ধ হলো জার্মানির ড. হেজিগ রাহমান ক্লিনিক, ড. ব্রাশরাযজ ও ড. ওয়ালারের ক্লিনিক।

২২. ডা. আলেক্স হেইগ বলেন, রোজা হতে মানুষের মানসিক শক্তি ও বিশেষ বিশেষ অনুভূতিগুলো উপকৃত হয়। স্মরণশক্তি বাড়ে, মনঃসংযোগ ও শক্তি পরিবর্ধিত হয়।

২৩. Scientific indications in the holy Quran গ্রন্থে এ বিষয়ে একটি গবেষণামূলক প্রতিচিত্র উপস্থাপন করা হয়েছে।   

Abnormal gastric acidity both hypo and hyprecnlrhydria are mostly changed to normal acidity due to morn long fasting in Ramadan. Since fasting normally feduces gastric acidity (lowest gastric acid is normally found in the early morning before the lacking of any food following fasting after dinner), Ramadan fasting should naturally help in reducing and preventing higher acidity which is one of the important factors which cause peptic ulcers. Incidence of peptic ulcer in much less in Muslim majority countries. This may be due to regular Ramadan fasting and absence of alcohol in their diet. DR. E. T. Hess. ‘As regards your inquiry reference cases of peptic ulcer. The incidence of this diseases here amongst the Africans living in a tribal manner appears to be absolutely nil. T. L Cleave further reported higher incidence of peptic ulcer among the chances in Indonesia and Malaysia then the local Japanese and Malay Muslims” (আল-কুরআন ইজ অল সায়েন্স-পৃ: ২৭৬-২৭৭)

২৪. অধ্যক্ষ ডা. জিসি আর গুপ্ত রোজাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেন, পবিত্র রোজা পালনের যে আদেশ ইসলামে আছে, তা মানবের আত্মিক ও দৈহিক মঙ্গলের জন্যই। রোজা সত্যিই উপকারে আকর এর কথা নিম্নদেহে বলা যায়। 

২৫. ডা. হেনরী এডওয়ার্ড মন্তব্য করেন, রোজা মানে অসামাজিক কার্যকলাপ, কতিপয় ব্যক্তিগত সমস্যা ও রোগ শোক এবং মিথ্যা বলা থেকে রক্ষা পাওয়ার মোক্ষম অবলম্বন। আমি এ মহাসত্যকে স্বীকার করছি। রোজার মধ্যে মানবের সুন্দর চরিত্র সৃষ্টির ঐশী অবদান লুকিয়ে রয়েছে। 

২৬. ডা. বিধান চন্দ্র রায় উল্লেখ করেন, রোজাকে সুন্দর একটি পবিত্র ঔষধ বললে ভুল, অন্যায় কিংবা অতিরিক্ত কিছু বলা হবে না।

২৭. ডা. স্যামুয়েল আলেকজান্ডার পরিষ্কারভাবে বলেন, রোজা হচ্ছে রকমারি মানসিক রোগগুলোর উত্তম ঔষধ, চমৎকার এবং ফলপ্রসূ প্রতিষেধক, আত্মাকে নির্মল করে দেয় ঠিক তেমনি পবিত্রও রাখে।

২৮. অধ্যাপক সোর্ড বলেন, রোজা মানুষকে দুষ্কর্ম থেকে শুধু দূরেই সরিয়ে রাখে না বরং মারাত্মক ধরনের রোগের কবল থেকে রক্ষা করে। 

২৯. বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা বলেন, রোজা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত মঙ্গলকর। কারণ রোজা পালনে পেটের অভ্যন্তরীণ গোলযোগ থাকতেই পারে না বলে আমি মনে করি। মুসলমানদের পুণ্যই উপবাসব্রত বিজ্ঞানীর বহু শাখা-প্রশাখায় গন্ধ পাওয়া যায়। এগারো মাস পর একাধারে এ নিয়ম অত্যন্ত সুন্দর। 

৩০. মহাত্মা গান্ধী এ বিষয়ে মন্তব্য করেন, মুসলমানদের রোজা উপবাসব্রতের অতি উত্তম নিয়ম। মনের তাগিদে আমিও এ ব্যবস্থা অবলম্বন করি। যদিও আমি একজন খাঁটি ব্রাহ্মণ। আমিও ঠিক রোজার মতো নিজের উপর সঠিক পরীক্ষা করে যাই। রোজায় মুসলমানদের আধ্যাত্মিক সুফল পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, পরমাত্মার সঙ্গে যোগাযোগটাও যথেষ্ট নিকটতর হয়। অধিকাংশ সময় আমার উপবাসব্রতের অভ্যাস রয়েছে বলেই আমি মুসলমানদের রোজা সম্পর্কে আমার অভিমত ব্যক্ত করলাম। 

৩১. পণ্ডিত বিদ্যাসাগর কাশ্মিরী বলেন, রোজা যা ইসলামের নির্দেশ এ ব্রত হচ্ছে অপরাপর ব্রত থেকে শ্রেষ্ঠ। আমি আমার স্বজাতি ভাই-বোনকে আন্তরিক অনুরোধ জানিয়েছি, জানাচ্ছি এবং জানাবো উপবাস যদি করতে হয়, তাহলে তারা যেন ইসলামী নিয়ম পদ্ধতিতে পালন করে। 

৩২. ডা. অ্যাডওয়ার্ড নিক্সন বলেছেন, “রোজা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী এবং অনেক রোগের কবল থেকে দেহকে রক্ষা করে।”

৩৩. ১৯৫৮ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ডা. গোলাম মুয়াযযম সাহেব কর্তৃক “মানব শরীরের উপর রোজার প্রভাব” সম্পর্কে যে গবেষণা চালানো হয়, তাতে প্রমাণিত হয় যে, রোজার দ্বারা মানব শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না, কেবল ওজন সামান্য কমে। তাও উল্লেখযোগ্য কিছু নহে, বরং শরীরের অতিরিক্ত মেদ কমাতে এরূপ রোজা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের খাদ্য নিয়ন্ত্রণ (Dietcontrol) অপেক্ষা বহুদিক দিয়েই শ্রেষ্ঠ। ১৯৬০ সালে তাঁর গবেষণায় প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করে রোজা দ্বারা পেটের শূলবেদনা বেড়ে যায়, তাদের এ ধারণা নিতান্তই অবৈজ্ঞানিক। কারণ উপবাসে পাকস্থলীর এসিড কমে এবং খেলেই এটা বাড়ে। এ অতি সত্য কথাটা অনেক চিকিৎসকই চিন্তা না করে শূলবেদনার রোগীকে রোজা রাখতে নিষেধ করেন। ১৭ জন রোজদারের পেটের রস পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, যাদের পাকস্থলীতে এসিড খুব বেশি বা খুম কম রোজার ফলে তাদের এ উভয় দোষই নিরাময় হয়েছে। এ গবেষণায় আরো প্রমাণিত হয় যে, যারা মনে করে রোজা দ্বারা রক্তের পটাশিয়াম কমে যায় এবং তাতে শরীরের ক্ষতি সাধন হয়, তাদের এ ধারণাও অমূলক। কারণ পটাশিয়াম কমার প্রতিক্রিয়া প্রথমে দেখা যায় হৃৎপিণ্ডের উপর অথচ ১১ জন রোজদারের হৃৎপিণ্ড অত্যাধুনিক ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম যন্ত্রের সাহায্যে (রোজার পূর্বে ও রোজা রাখার ২৫ দিন পর) পরীক্ষা করে দেখা গেছে রোজা দ্বারা তাদের হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়ার কোনোই ব্যতিক্রম ঘটে নাই।

৩৪. ডাক্তার দেওয়ান এ কে এম আব্দুর রহীম বলেছেন, রোজাপালনে মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র সর্বাধিক উজ্জীবিত হয়। চিকিৎসকদের মতে, রোজাদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। শরীরের পরিপাক প্রক্রিয়ায় সুস্থতা বিধানে ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। সাধারণত যে খাদ্য গ্রহণ করি তার মধ্যে আমিষ, শ্বেতসার ও স্নেহ জাতীয় খাদ্যগুলো দেহের মধ্যে জীর্ণ ও শোষিত হয়ে গ্লুকোজ আকারে পেটালিশি হয়ে যকৃতে প্রবেশ করে এভাবে মানুষের দেহে যত গ্লুকোজ উৎপন্ন হয় তা পুরোটা খরচ হয় না। যকৃত হতে কিছু গ্লুকোজ রক্তে প্রবাহিত হয়ে দেহের চালিকাশক্তিকে কর্মক্ষম রাখে। বাকি অংশ গ্লাইকোজেন রূপে যকৃতের মাংসপেশিতে জমা হয়। কিছু অংশ চর্বি জাতীয় পদার্থে পরিণত হয়। চর্বি উপবাসের কারণে পুনরায় গ্লুকোজে পরিণত হয়ে রক্তের মধ্যে প্রবাহিত হয়। এ রূপান্তরিত গ্লুকোজ দেহের তাপ ও শক্তি বৃদ্ধিতে দ্বিগুণ সহায়তা করে। রোজাপালনের ফলে গ্লাইকোজেন ও চর্বি দরকার মত খরচ হয়ে যায়। ফলে দেহের শক্তি ও চর্বি কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। ক্ষতিকর চর্বি জমতে পারে না। মেদ কমে গিয়ে শরীর সুগঠিত থাকে। 

৩৫. বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপক ডা. নূরুল ইসলাম বলেছেন, “রোজা মানুষের দেহে কোনো ক্ষতি করে না। ইসলামের এমন কোনো বিধান নেই, যা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। গ্যাস্ট্রিক ও আলসার-এর রোগীদের রোজা নিয়ে যে ভীতি আছে তা ঠিক নয়। কারণ রোজায় এসব রোগের কোনো ক্ষতি হয় না বরং উপকার হয়। রমজান মানুষকে সংযমী ও নিয়মবদ্ধভাবে গড়ে তুলে।”

লেখক : প্রভাষক, সিটি মডেল কলেজ, ঢাকা

আপনার মন্তব্য লিখুন

কপিরাইট © বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির