চূড়ান্ত এবং সর্বশেষ পয়গম্বর মুহাম্মাদ সা. -অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

নতুন হিজরি সালকে কেন্দ্র করে কোনো মাস পালন, অনুষ্ঠান পালন ইসলামে নাই। যেহেতু ৩৬৫ দিনের প্রতিদিন সমান গুরুত্ব দিয়ে নবীকে অনুসরণ করতে হবে তাই বছরের জন্য আলাদা কোনো অনুষ্ঠান পালন নাই, শুধু আছে নতুন চাঁদ দেখার দোয়া। নববর্ষের সমস্ত বিদআত এবং অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ সা. প্রতি মাসের শুরুতে আল্লাহ তায়ালার কাছে সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করতেন। বারো মাসে বারো বার দোয়া করতেন। দোয়াটি হচ্ছে-আল্লাহুম্মা আহিল্লাহু আলাইনা বিল-আমনি ওয়াল ঈমানি, ওয়াসসালামাতি ওয়াল ইসলামি- রাব্বি ওয়া রাব্বুকাল্লাহ- ‘হে আল্লাহ! আপনি আমাদের জন্য এই চাঁদকে সৌভাগ্য ও ঈমান, শান্তি ও ইসলামের সঙ্গে উদিত করুন। আল্লাহই আমার ও তোমার রব। (তিরমিজি-৩৪৫১) প্রত্যেক মুমিনের উচিত, চাঁদ দেখা কমিটির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নিজেই চাঁদ দেখা ও দোয়া করার সুন্নতের ওপর আমল করা।

হিজরি সন মুসলমানদের সন। চন্দ্রমাসের হিসাবের অনুসরণ নবী সা. ও খোলাফায়ে রাশেদার সুন্নাত। মুসলমানদের উচিত এর অনুসরণ করা। ইসলামী ফিকাহবিদগণ চান্দ্রবর্ষের হিসাব রাখাকে মুসলমানদের জন্য ফরজে কিফায়া বলেছেন। মুফতি মুহাম্মদ শফি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, সামগ্রিকভাবে মুসলমানদের মধ্যে চান্দ্র হিসাবের প্রচলন থাকতে হবে। যাতে রমজান, হজ ইত্যাদি ইবাদতের হিসাব জানা থাকে। এমন যাতে না হয়, শুধু ইংরেজি মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসই তার জানা নেই। আমাদের অবস্থা প্রায় এ রকমই।
হিজরি নববর্ষে মুসলমানরা কোনো আনন্দ উৎসব করবে না। কোনো নববর্ষে অযথা আনন্দ উৎসব করার অনুমোদন ইসলাম করে না। নবী সা. ও তার সহকর্মীদের ত্যাগের কথা স্মরণ করে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও মানবতার জন্য ত্যাগ স্বীকার করার শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। হিজরি নববর্ষে মুসলমানদের নবোদ্যমে কাজ করতে হবে।

বিদায় ১৪৪২ হিজরি
মুহাম্মাদ সা. এখন থেকে ঠিক ১৪৪২ বছর আগে ইসলামের দুশমন কাফের কুরাইশদের অত্যাচারে জন্মস্থান মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিলেন। আজকে সারা দুনিয়ার বেশ কিছু দেশে অত্যাচার নির্যাতনের কারণে নিজেদের জন্মস্থান থেকে মানুষ বাধ্য হয়ে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে। হযরত মুহাম্মাদ সা. নিজে এ অকথ্য জুলুমের শিকার হন এবং এমন এক ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করে বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে যান যাতে এ জুলুম অত্যাচার হতে না পারে।

অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা ও বিশেষজ্ঞের মতে, মুহাম্মাদ সা. ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক, সামাজিক নেতা। তার এই বিশেষত্বের অন্যতম কারণ হচ্ছে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় জগতেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন। তিনি ধর্মীয় জীবনে যেমন সফল, তেমনই রাজনৈতিক জীবনেও। বিবদমান আরব জনতাকে একীভূতকরণ তার জীবনের অন্যতম সাফল্য। গুগলে best man, who is the best man in the world- ইত্যাদি লিখে সার্চ করলে প্রথমেই চলে আসে হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর নাম। মাইকেল হার্টসের লেখা ‘বিশ্বসেরা ১০০ মনীষী’ গ্রন্থে প্রথম স্থানেই রয়েছে হযরত মুহাম্মাদ সা. এর নাম।
আল-কুরআনে মুহাম্মাদ শব্দটি চারবার এবং একবার আহমাদ শব্দটি এসেছে। আর মুহাম্মদ সা. একজন রাসূল বৈ তো নন! তাঁর পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে। তার যদি মৃত্যু হয়ে যায় কিংবা তাঁকে হত্যা করে ফেলা হয়, তবে কি তোমরা উল্টো দিকে ফিরে যাবে? যে কেউ উল্টো দিকে ফিরে যাবে, সে কখনই আল্লাহর কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারবে না। আর যারা কৃতজ্ঞ বান্দা, আল্লাহ তাদেরকে পুরস্কার দান করবেন। (সূরা আলে ইমরান : ১৪৪); মুহাম্মদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত। (সূরা আহযাব : ৪০); আর যারা বিশ্বাস স্থাপন করে, সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে মুহাম্মদের প্রতি অবতীর্ণ সত্যে বিশ্বাস করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কর্মসমূহ মার্জনা করেন এবং তাদের অবস্থা ভালো করে দেন। (সূরা ফাতহ : ২৯) মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পর সহানুভূতিশীল। (সূরা মুহাম্মাদ : ২) স্মরণ কর, যখন মরিয়ম-তনয় ঈসা (আ) বলল, হে বনি ইসরাইল! আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, আমার পূর্ববর্তী তওরাতের আমি সত্যায়নকারী এবং আমি এমন একজন রাসূলের সুসংবাদদাতা, যিনি আমার পরে আগমন করবেন। তাঁর নাম আহমদ। অতঃপর যখন সে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করল, তখন তারা বলল: এ তো এক প্রকাশ্য জাদু। (সূরা সফ : ৬)

ইয়াতিম হিসেবে এসে বিশ্ব অসহায়দের পাশে
মুহাম্মাদ সা. মাতৃগর্ভে থাকাকালীন পিতাকে হারান। শৈশবে মাতাকে হারিয়ে এতিম হন এবং প্রথমে তার পিতামহ ও পরে চাচার নিকট লালিত-পালিত হন। হেরা পর্বতের গুহায় ৪০ বছর বয়সে তিনি নবুওয়াত লাভ করেন। এই পর্বতের গুহায় আল্লাহর তরফ থেকে তার নিকট ওহি নাজিল হয়। তিন বছর পর ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মাদ প্রকাশ্যে ওহি প্রচার করেন এবং ঘোষণা দেন আল্লাহ্ এক ও তার নিকট নিজেদের জানমাল সঁপে দেওয়ার মধ্যেই দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ নিহিত।
মুহাম্মাদ সা. ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। সমগ্র আরব বিশ্বের জাগরণের পথিকৃৎসহ সারা বিশ্বের নেতা হিসেবে তিনি সফল।
অমুসলিমদের মধ্যে থমাস কার্লাইল, রেভারেন্ড অধ্যাপক উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াট, বার্নারড শ’ বিভিন্ন বিশেষণে মুহাম্মাদ সা.-এর প্রশংসা করেছেন। মন্টগোমারি ওয়াট এর লিখা ‘মুহাম্মদ এট মক্কা (১৯৫৩), মুহাম্মদ এট মদিনা (১৯৫৬) উল্লেখযোগ্য। ফরাসি স¤্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেন যে ‘আমি মুহাম্মদীয় ধর্মটাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করি।’ তিনি আরো বলেন ‘সকল ধর্মের মাঝে মুহাম্মদীয় ধর্ম সবচেয়ে উত্তম।’ মাইকেল এইচ. হার্ট তার বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একশ মনীষী নামক জীবনীগ্রন্থে মুহাম্মাদ সা.কে প্রথম স্থানে রেখেছেন। আজো ব্রিটিশ মিউজিয়ামের গেটে গেলে দেখা যায় সেখানে লিখা আছে- As a father, as a teacher, as a lawgiver and as a reformer MUHAMMAD sm is the superman of the world. অর্থাৎ একজন পিতা, একজন শিক্ষক, একজন আইনপ্রণেতা ও একজন সংস্কারক হিসেবে মুহাম্মাদ সা. পৃথিবীর একজন শ্রেষ্ঠ মানব।

‘আমি মুহাম্মদকে নিয়ে গবেষণা করেছি- চমৎকার মানুষ। তিনি খ্রিষ্টবিরোধী হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমার মতে তাঁকে অবশ্যই মানবতার ত্রাণকর্তা বলা যেতে পারে।’
‘আমি বিশ্বাস করি যে যদি তাঁর মত একজন মানুষ আধুনিক বিশ্বের একনায়কতন্ত্র গ্রহণ করে, তবে তিনি বিশ্বের সমস্যাগুলো এমনভাবে সমাধান করতে সফল হবেন যা বিশ্বকে প্রয়োজনীয় শান্তি এবং সুখ এনে দেবে। আমি মুহাম্মদ সা.-এর বিশ্বাস সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করেছি যে এই বিশ্বাস কালকের ইউরোপের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, যেহেতু এই বিশ্বাস আজকের ইউরোপের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে শুরু করেছে।’ (জর্জ বার্নার্ড শ-দ্য জেনুইন ইসলাম)

ইনসাফ, ঐক্য, শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রতীক
বিশ্বে ইনসাফ, ঐক্য, শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রশিক্ষণ দিলেন মুহাম্মাদ সা., যখন তার বয়স ৩৫ বছর। ঐ সময় কাবাগৃহের পুনঃনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। যখন হজরে আসওয়াদ পবিত্র কালো পাথরের নির্মাণকাজ শেষ হয় তখনই আরব নেতাদের মধ্যে বিপত্তি দেখা দেয়। পাথরটি কে স্থাপন করবে এ নিয়ে বিবাদ শুরু হয়, এক পর্যায়ে এটি এমনই মারাত্মক রূপ ধারণ করে যে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এমতাবস্থায় আবু উমাইয়া মাখজুমির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় যে পরদিন প্রত্যুষে মসজিদে হারামের দরজা দিয়ে যে প্রথম প্রবেশ করবে তার সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেবে। পরদিন মুহাম্মাদ সা. সবার প্রথমে কাবায় প্রবেশ করেন। এতে সবাই বেশ সন্তুষ্ট হয় এবং তাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। আর তার প্রতি সবার সুগভীর আস্থাও ছিল। এই দায়িত্ব পেয়ে মুহাম্মাদ সা. অত্যন্ত সুচারুভাবে ফয়সালা করেন। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তার উপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ রাখেন এবং বিবদমান প্রত্যেক গোত্রের নেতাদের ডেকে তাদেরকে চাদরের বিভিন্ন কোনা ধরে যথাস্থানে নিয়ে যেতে বলেন এবং তারা তাই করে। এরপর তিনি পাথর উঠিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করেন।

গোপনে ইসলামের কালেমা প্রচার
প্রথমে তিনি নিজ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝে গোপনে ইসলামের কালেমা প্রচার শুরু করেন। হযরত মুহাম্মাদ সা.-এর আহ্বানে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তার সহধর্মিণী। এরপর মুসলিম হন তাঁর চাচাতো ভাই এবং তার ঘরেই প্রতিপালিত কিশোর হযরত আলী। ইসলাম গ্রহণের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়ার জন্য নবী নিজ বংশীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা করেন; এই সভায় কেউই তার আদর্শ মেনে নেয়নি, এ সভাতে শুধু একজনই ইসলাম গ্রহণ করে, সে হলো ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি ছিল নবীর অন্তরঙ্গ বন্ধু হযরত আবু বকর রা.। এভাবেই প্রথম পর্যায়ে তিনি ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন এবং এই প্রচারকাজ চলতে থাকে সম্পূর্ণ গোপনে।

এবার প্রকাশ্যে
আল কুরআনে বলা হয়-‘আত্মীয়দেরকে ভয় দেখাও’- নবীর কাজ হচ্ছে সবার আগে নিজে তা থেকে বাঁচবেন এবং নিজের নিকটবর্তী লোকদেরকে তার ভয় দেখাবেন। তারপর সাধারণ অসাধারণ নির্বিশেষে সবাইকে সতর্ক করে দেবেন।
মুহাম্মাদ সা. সাফা পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে চিৎকার করে সকলকে সমবেত করেন। এরপর প্রকাশ্যে বলেন যে, ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।’ কিন্তু এতে সকলে তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড খেপে যায়। বেশির ভাগ মক্কাবাসী তাকে অবজ্ঞা করে, তবে তার অল্পসংখ্যক অনুসারীও হয়।
নির্ভরযোগ্য হাদিসে বলা হয়েছে, এ আয়াত নাযিল হবার পর নবী সা. সবার আগে নিজের দাদার সন্তানদের ডাকলেন এবং তাদের একেক জনকে সম্বোধন করে বললেন:
“হে বনি আবদুল মুত্তালিব, হে আব্বাস, হে আল্লাহর রাসূলের ফুফি সফিয়াহ, হে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা, তোমরা আগুনের আজাব থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার চিন্তা করো। আমি আল্লাহর আজাব থেকে তোমাদের বাঁচাতে পারবো না। তবে হ্যাঁ আমার ধন-সম্পত্তি থেকে তোমরা যা চাও চাইতে পারো।”
তারপর তিনি অতি প্রত্যুষে সাফা পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় উঠে দাঁড়িয়ে ডাক দিলেন, “হে কুরাইশের লোকেরা! হে বনি কাব ইবনে লুআই! হে বনি মুররা! হে কুসাইর সন্তান-সন্ততিরা! হে বনি আবদে মান্নাফ! হে বনি আবদে শামস! হে বনি হাশেম, হে বনি আবদুল মুত্তালিব! এভাবে কুরাইশদের প্রত্যেকটি গোত্র ও পরিবারের নাম ধরে তিনি আওয়াজ দেন। তিনি বললেন, “হে লোকেরা! যদি আমি বলি, এ পাহাড়ের পেছনে একটি বিশাল সেনাবাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণ করার জন্য ওঁৎ পেতে আছে। তাহলে কি তোমরা আমার কথা সত্য বলে মেনে নেবে?” সবাই বললো, হ্যাঁ আমাদের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, তুমি কখনো মিথ্যা বলনি। তিনি বললেন, “বেশ, তাহলে আমি আল্লাহর কঠিন আজাব আসার আগে তোমাদের সতর্ক করে দিচ্ছি। তাঁর পাকড়াও থেকে নিজেদের বাঁচাবার জন্য বল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।”
“হে লোকজন যারা ঈমান এনেছো, তোমরা নিজেদেরকে এবং নিজেদের পরিবার ও সন্তান-সন্ততিকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো মানুষ এবং পাথর হবে যার জ্বালানি।” (সূরা তাহরিম : ৬)
বুখারিতে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, তোমরা প্রত্যেকেই রাখাল এবং তাকে তার অধীনস্থ লোকদের সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। শাসকও রাখাল। তাকে তার অধীনস্থ লোকদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। নারী তার স্বামীর বাড়ি এবং তার সন্তান-সন্ততির তত্ত্বাবধায়িকা তাকে তাদের ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। পাথর ও মানুষ হবে জাহান্নামের জ্বালানি। এর অর্থ পাথরের কয়লা। ইবনে মাসউদ রা., ইবনে আব্বাস রা., এর মতে, এর অর্থ গন্ধকের পাথর।

নির্যাতনের স্টিম রোলার
বিরুদ্ধবাদীরা কয়েকটি স্তরে তার উপর নির্যাতন শুরু করে : প্রথমত উসকানি ও উত্তেজনার আবহ সৃষ্টি, এরপর অপপ্রচার, কূটতর্ক। এগুলোতেও কাজ না হওয়াতে এক সময় ইসলামের প্রচারকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা শুরু হয়। অপপ্রচার গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয়। একই সাথে তৎকালীন আরব কবি ও চাটুকারদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় মনোরঞ্জক সাহিত্য ও গান-বাজনার দল, এমনকি এক পর্যায়ে মুহাম্মাদ সা.-এর সাথে আপসেরও প্রচেষ্টা চালায় কুরাইশরা। কিন্তু মুহাম্মাদ সা. তা মেনে নেননি।

ইথিওপিয়ায় হিজরত
ধীরে ধীরে যখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চরম রূপ ধারণ করে, তখন নবী সা. কিছু সংখ্যক মুসলিমকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে পাঠান। সেখান থেকেও কুরাইশরা মুসলিমদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, যদিও তৎকালীন আবিসিনিয়ার স¤্রাট নাজ্জাশির কারণে তা সফল হয়নি।

প্রভাবশালী আত্মীয়দের ইসলাম গ্রহণ
মুহাম্মাদ সা.-এর চাচা হামজা এবং কুরাইশ নেতা উমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ। মুহাম্মাদ সা.কে তার চাচা হামজা খুব পছন্দ করতেন এবং তাকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। আবু জাহল কাবা প্রাঙ্গণে মুহাম্মাদ সা.-এর সাথে খারাপ আচরণ করার কথা জানতে পেরে চাচা হামজা তার প্রতিবাদস্বরূপ আবু জাহলকে মারধর করেন এবং মুহাম্মাদ সা.-এর সমর্থনে ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণে আরবে মুসলিমদের আধিপত্য কিছুটা প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মাদ সা. সবসময় প্রার্থনা করতেন যেন আবু জাহল ও উমরের মধ্যে যে কোনো একজন অন্তত ইসলাম গ্রহণ করে। উমরের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যমে তার এই প্রার্থনা পূর্ণতা লাভ করে। আরব সমাজে উমরের বিশেষ প্রভাব থাকায় তার ইসলাম গ্রহণ ইসলাম প্রচারকে অনেকখানি সহজ করে দেয়। তখন থেকে উমর রা. এর সাথে কাবা প্রাঙ্গণে প্রকাশ্যে নামাজ ও তাওয়াফ করা শুরু করেন।

একঘরে করা
এভাবে ইসলাম যখন শ্লথ গতিতে এগিয়ে চলছিল তখন মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মাদ সা. ও তার অনুসারীসহ বনু হাশিম গোত্রকে একঘরে ও অবরোধ করে। তিন বছর অবরুদ্ধ থাকার পর তার গোত্রসহ নবী সা. মুক্তি পান।

শোকের বছর
মুক্তির পরের বছর ছিল মুহাম্মাদ সা.-এর জন্য দুঃখের বছর। কারণ এই বছরে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তার স্ত্রী খাদিজা রা. ও চাচা আবু তালিব মারা যান। দুঃখের সময়ে মুহাম্মাদ সা. মক্কায় ইসলামের প্রসারের ব্যাপারে অনেকটাই দুশ্চিন্তায় পড়েন। তিনি মক্কা বাদ দিয়ে এবার ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ যান। কিন্তু সেখানে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি চূড়ান্ত অপমান, ক্রোধ ও উপহাসের শিকার হন। এমনকি তায়েফের লোকজন তাদের কিশোর-তরুণদেরকে মুহাম্মাদ সা.-এর পিছনে লেলিয়ে দেয়; তারা ইট-প্রস্তরের আঘাতে তাকে রক্তাক্ত করে দেয়।

মদিনার সাহসী সৈনিকগণ
মদিনার বেশকিছু লোক ইসলামের প্রতি উৎসাহী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারা হজ করতে এসে ইসলামের দাওয়াত পেয়েছিলেন। এরা আকাবা নামক স্থানে শপথ করে যে তারা যেকোনো অবস্থায় তাদের নবী মুহাম্মাদ সা.কে রক্ষা করবেন এবং ইসলামের প্রসারে কাজ করবেন। ফলে ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং একসময় মদিনার ১২টি গোত্রের নেতারা একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের মাধ্যমে মুহাম্মাদ সা.কে মদিনায় আসার আমন্ত্রণ জানায়।
বুয়াসের যুদ্ধে সবগুলো গোত্র অংশ নেয়ায় প্রচুর রক্তপাত ঘটে। এ থেকে মদিনার লোকেরা বুঝতে সমর্থ হয়েছিল যে, রক্তের বিনিময়ে রক্ত নেয়ার নীতিটি এখন আর প্রযোজ্য হতে পারে না। এজন্য তাদের একজন নেতা দরকার যে সবাইকে একতাবদ্ধ করতে পারবে। এ চিন্তা থেকেই তারা মুহাম্মাদ সা.কে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ও মুসলিমরা মক্কা থেকে মদিনায় চলে যান। সবশেষে মুহাম্মাদ সা. ও আবু বকর রা. ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় হিজরত করেন। তাদের হিজরতের দিনেই কুরাইশরা মুহাম্মাদ সা.কে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল যদিও তা সফল হয়নি। এভাবেই মাক্কি যুগের সমাপ্তি ঘটে।
ইসলামী পঞ্জিকায় হিজরতের বর্ষ থেকে দিন গণনা শুরু হয়। এজন্য ইসলামী পঞ্জিকার বর্ষের শেষে ঐ উল্লিখিত থাকে যার অর্থ ‘হিজরি পরবর্তী’।

ইসলামী রাষ্ট্র ও তার সংবিধান
মুহাম্মাদ সা. মদিনায় গিয়ে মদিনার সকল গোত্রকে নিয়ে ঐতিহাসিক মদিনা সনদ স্বাক্ষর করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই সনদের মাধ্যমে সকল গোত্রের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভূতি সৃষ্টি করা হয়। আওস, খাযরাজ উভয় গোত্রই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এছাড়াও প্রধানত তিনটি ইহুদি গোত্র (বনু কাইনুকা, বনু কুরাইজা এবং বনু নাদির) সহ মোট আটটি গোত্র এই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। এই সনদের মাধ্যমে মদিনা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুহাম্মাদ সা. হন তার প্রধান। যে সকল মদিনাবাসী ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম মুহাজিরদের আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেন তারা আনসার (সাহায্যকারী) নামে পরিচিত হন।
৬২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ মার্চ তারিখে সংঘটিত আত্মরক্ষামূলক বদর যুদ্ধে মুসলিমরা সৈন্যসংখ্যার দিক দিয়ে কুরাইশদের এক- তৃতীয়াংশ হয়েও আল্লাহর রহমতে বিজয় অর্জন করেন। এইসময় থেকেই সশস্ত্র ইতিহাসের সূচনা ঘটে। এরপর ৬২৫ সালের ২৩ মার্চে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মুসলিমগণ সূচনাপর্বে বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত মুহূর্তের নীতিগত দুর্বলতার কারণে পরাজিতের বেশে মদিনায় প্রবেশ করে। ৬২৭ সালে আবু সুফিয়ান কুরাইশদের আরেকটি দল নিয়ে মদিনা আক্রমণ করে। কিন্তু এবারও খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের কাছে পরাজিত হয়। মুসলিমরা আরবে একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে আশপাশের অনেক গোত্রের ওপরই মুসলিমরা প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হন।

মদিনার ইহুদিরা ইসলামী রাষ্ট্রের হুমকি
কিন্তু এ সময় মদিনার বসবাসকারী ইহুদিরা ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেয়। মূলত ইহুদিরা বিশ্বাস করত না যে, একজন অ-ইহুদি শেষ নবী হতে পারে। এজন্য তারা কখনই ইসলামের আদর্শ মেনে নেয়নি। ইহুদিদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বদর ও উহুদের যুদ্ধের পর বনু কাইনুকা ও বনু নাজির গোত্র সপরিবারে মদিনা থেকে বিতাড়িত হয়; আর খন্দকের পর সকল ইহুদিকে মদিনা থেকে বিতাড়িত করা হয়। আহলে কিতাব হয়েও শেষ নবীকে মেনে না নেয়ার শাস্তি ছিল এটি। আর রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করলে, ইহুদিরা চুক্তি লঙ্ঘনকারী ছিল। এজন্যই তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়।

রাসূলের স্বপ্ন ও দশ বছরের শান্তি চুক্তি
কুরাইশদের শত্রুতার কারণে মুসলিমরা হজ্জ আদায় করতে পারছিল না। মুহাম্মাদ সা. এক স্বপ্নে দেখতে পান তিনি হজ্জের জন্য মাথা কামাচ্ছেন। এ দেখে তিনি হজ্জ করার জন্য মনস্থির করেন এবং ৬ হিজরি সনের শাওয়াল মাসে হজ্জের উদ্দেশ্যে ১৪০০ সাহাবা নিয়ে মক্কার পথে যাত্রা করেন। কিন্তু এবারও কুরাইশরা বাধা দেয়। মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামক স্থানে ঘাঁটি স্থাপন করে। এখানে কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা ইতিহাসে হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে সুপরিচিত।
‘হুদাইবিয়ার সন্ধি মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ ও সুহাইল ইবন আমর-এর মধ্যে সম্পাদিত শান্তিচুক্তি। তারা দশ বছরের জন্য অস্ত্রবিরতিতে সম্মত হয়েছেন। উক্ত সময়ের মধ্যে উভয় পক্ষ নিরাপদ এবং কোন পক্ষই অপর পক্ষের ক্ষতিসাধন করবে না; কোনো গোপন আক্রমণ করবে না, তবে তাদের মধ্যে পারস্পরিক সততা ও সম্মান বিরাজ করবে। আরবের যে কেউ যদি মুহাম্মাদের সাথে কোনো চুক্তি করতে চায়, তবে সে তা করতে পারবে এবং যে কুরাইশের সাথে চুক্তি করতে চায়, সেও তা করতে পারবে। আর যদি কোন কুরাইশ অনুমতি ব্যতীত (মদিনায় প্রবেশ করে) মুহাম্মাদের নিকট উপস্থিত হয়, তবে তাকে কুরাইশের নিকট ফেরত দেওয়া হবে; তবে অন্যদিকে যদি মুহাম্মাদের লোকদের মধ্যে কেউ কুরাইশের কাছে আসে তবে তাকে মুহাম্মাদের হাতে তুলে দেওয়া (ফেরত দেওয়া) হবে না। এ বছর মুহাম্মাদ সা.কে তার সঙ্গীদের নিয়ে মক্কা থেকে চলে যেতে হবে, তবে পরের বছর তিনি মক্কায় এসে তিন দিন অবস্থান করতে পারবেন, তবে তাদের অস্ত্র ব্যতীত এবং তরবারিগুলো খাপে বদ্ধ রাখতে হবে।’

রাষ্ট্রনায়কদের কাছে পত্র প্রেরণ
হুদায়বিয়ার সন্ধির পর কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলো থেকে আশ্বস্ত হয়ে তিনি দাওয়াতি কাজে মনোনিবেশ করেন। সে সময়ে পৃথিবীর প্রধান রাজশক্তিগুলো ছিল ইউরোপের রোম সা¤্রাজ্য, এশিয়ার পারস্য সা¤্রাজ্য এবং আফ্রিকার হাবশা সা¤্রাজ্য। এছাড়াও মিসরের ‘আজিজ মুকাউকিস’, ইয়ামামার সর্দার এবং সিরিয়ার গাসসানী শাসনকর্তাও বেশ প্রতাপশালী ছিল। তাই ষষ্ঠ হিজরির জিলহজ মাসের শেষদিকে একইদিনে এদের কাছে ইসলামের আহ্বানপত্রসহ ছয়জন দূত প্রেরণ করেন।

প্রেরিত দূতগণের তালিকা
১. রোমস¤্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে মুহাম্মাদ সা. এর চিঠি
২. মুকাউকিসের কাছে মুহাম্মদ সা. এর চিঠি
৩. বাহরাইনের শাসক মুনজিরের নিকট প্রেরিত চিঠি
৪. দাহিয়া কালবি কে রোমস¤্রাট কায়সারের (হিরাক্লিয়াস নামে পরিচিত) কাছে।
৫. আবদুল্লাহ বিন হুযায়ফাকে পারস্যস¤্রাট কিসরা বা খসরু পারভেজের কাছে।
৬. হাতিব বিন আবু বালতা’আকে মিসরের (আলেকজান্দ্রিয়ার) শাসক মুকাউকিসের কাছে।
৭. আমর বিন উমাইয়া কে হাবশার রাজা নাজ্জাশির কাছে।
৮. সলিত বিন উমর বিন আবদে শামসকে ইয়ামামার সর্দারের কাছে।
৯. শুজা ইবনে ওয়াহাব আসাদি কে গাসসানী শাসক হারিসের কাছে।
১০. আল আলা আল হাদরামিকে বাহরাইনের মুনজির ইবন সাওয়া তামিমির কাছে।
শাসকদের মধ্য হতে বাদশাহ নাজ্জাসি ও মুনজির ছাড়া আর কেউ তখন ইসলাম গ্রহণ করেননি।

দশ বছরের সন্ধি দুই বছরেই ভেঙে যায়
খুজাআহ গোত্র ছিল মুসলমানদের মিত্র, অপরদিকে তাদের শত্রু বকর গোত্র ছিল কুরাইশদের মিত্র। একরাতে বকর গোত্র খুজাআদের উপর অতর্কিত হামলা চালায়। কুরাইশরা এই আক্রমণে অন্যায়ভাবে বকর গোত্রকে অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে। এই ঘটনার পর মুহাম্মাদ সা. কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্তসহ পত্র প্রেরণ করেন এবং কুরাইশদেরকে এই তিনটি শর্তের যে কোনো একটি মেনে নিতে বলেন। শর্ত তিনটি হলো; কুরাইশ খুজাআ গোত্রের নিহতদের রক্তপণ শোধ করবে। অথবা বকর গোত্রের সাথে তাদের মৈত্রীচুক্তি বাতিল ঘোষণা করবে। অথবা বলবে যে, হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল এবং কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।
মুহাম্মাদ সা. মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি শুরু করলেন। ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে দশ হাজার সাহাবীর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন। সেদিন ছিল অষ্টম হিজরির রমজান মাসের দশ তারিখ। বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া মোটামুটি বিনা প্রতিরোধে মক্কা বিজিত হলো এবং মুহাম্মাদ সা. বিজয়ীবেশে সেখানে প্রবেশ করলেন। তিনি মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলেন। তবে দশজন নর এবং নারী এই ক্ষমার বাইরে ছিল। তারা বিভিন্নভাবে ইসলাম ও মুহাম্মাদের কুৎসা রটাত। মক্কায় প্রবেশ করেই মুহাম্মাদ সা. সর্বপ্রথম কাবাঘরে আগমন করেন এবং সেখানকার সকল মূর্তি ধ্বংস করেন। মক্কা বিজয়ের পর পুরনো শত্রু বনু হাওয়াজিনদের ও তায়েফবাসীদেরকে মুহাম্মাদ সা. পরাজিত করেন।

বাংলা ভাষায় ১০২৮ সিরাত গ্রন্থ
বাংলাসাহিত্যে নবীজিকে নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে প্রথম গ্রন্থ রচনা করেন শেখ আবদুর রহীম (১৮৫৯-১৯৩১)। গ্রন্থটির নাম ‘হযরত মুহম্মদের সা. জীবনচরিত ও ধর্মনীতি’, ১৮৮৭ সালে ৪০৪ পৃষ্ঠার গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গবেষক নাসির হেলাল তাঁর গবেষণায় মধ্যযুগ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলায় রচিত মোট ১০২৮টি সিরাত গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন।

নারীদের সিরাত রচনা
মহানবী সা.-এর জীবনীগ্রন্থ রচনার কাজটি আধুনিক সময়ে বেশ কয়েকজন নারীর লিখিত গ্রন্থ বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে সবার ওপরে থাকবেন ইংল্যান্ডের গির্জার নান ক্যারেন আর্মস্ট্রং। ১৯৯১ সালে তাঁর ‘Muhammad: A Biography of the Prophet’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হলো ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং বাংলা ভাষাসহ বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়। ২০০৬ সালে ‘Muhammad: A Prophet For Our Time’ নামে আরও একটি গ্রন্থ তিনি প্রকাশ করেন।
“আর তোমার জন্য তোমার খ্যাতির কথা বুলন্দ করে দিয়েছি।”
খোলাফায়ে রাশেদার শাসনামল থেকে তাঁর মুবারক নাম সারা দুনিয়ায় উচ্চারিত হতে লাগলো। এই সিলসিলাটি আজ পর্যন্ত বেড়েই চলছে। ইনশাআল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত বেড়ে যেতেই থাকবে। দুনিয়ার এমন কোন জায়গা নেই যেখানে মুসলমানদের কোন জনপদ নেই এবং দিনের মধ্যে পাঁচবার আযানের মধ্যে বুলন্দ আওয়াজে মুহাম্মাদ সা.-এর সালাতের ঘোষণা করা হচ্ছে না, বছরের বারো মাসের মধ্যে কোন সময় এমন নেই যখন সারা দুনিয়ার কোন না কোন জায়গায় তাঁর মুবারক নাম উচ্চারিত হচ্ছে না। নবুওয়াতের প্রাথমিক যুগে আল্লাহ বলেছিলেন, “আর তোমার নাম ও খ্যাতির কথা আমি বুলন্দ করে দিয়েছি অর্থাৎ অত্যন্ত ব্যাপকভাবে সম্প্রচার করেছি।” (সূরা আলাম নাশরাহ : ৪) তখন কেউ একথা অনুমানই করতে পারতো না যে, এমন সাড়স্বরে ও ব্যাপকভাবে এই নাম বুলন্দ করার কাজটি সম্পন্ন হবে। এটি কুরআনের সত্যতার একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য ও ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply