ছাগল সাংবাদিকতা । আমিরুল মোমেনীন মানিক

ছাগল সাংবাদিকতা । আমিরুল মোমেনীন মানিকহুডখোলা রিক্সা। শ্যামলী- মোহাম্মদপুর সড়ক। হাতের বাঁয়ে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়কে ল্যাং করে সামনে এগোচ্ছে ত্রিচক্রযান। কি এক ভাবনার অতলে হাবুডুবু। যতদূর মনে পড়ে, ভাবছিলাম জীবনানন্দ দাশের কবিতা নিয়ে। …যতই সময় পেরুচ্ছে, ততই গ্রামে ফিরে যাবার ইচ্ছে তীব্রতর হচ্ছে: আমার চিরচেনা মল্লিকাবনে। শহরে পূজি-পাট্টা পকেট ভারি করার একটা আশ্বাস দেয় বটে, কিন্তু শহর মনকেও ভারি করে দেয় বড়ো। পূজি নিয়ে কাড়াকাড়ির মধ্যে একটু অলস দুপুর খুঁজে নিয়ে মনের ভেতরে ঘুরে আসার অবসরটুকু শহরে মেলে না। অথচ আমি বিশ্বাস করি সেই মানসিক ভ্রমণেই সুখের নিবাস… [অন্ধকারে জলের কোলাহল/ জীবনানন্দ দাশ]। কবিতার এই লাইনগুলো অযথাই কাঠবিড়ালের মতো দুষ্টুমি করছিলো ঠোঁটে। হঠাৎ একটা ফোনে হুঁশ ফেরে। বাংলাদেশের প্রথম সারির একটি ইংরেজি দৈনিক থেকে ফোন।
: মানিক ভাই বলছেন?
: বলছি ।
: আমি… পত্রিকা থেকে বলছি। এন্টারটেইনমেন্ট পেজে কাজ করি।
: বলুন।
: একটা প্রতিক্রিয়া জানতে চাচ্ছিলাম… সময় হবে এখন?
: কী বিষয়ে বলুন?
সংস্কৃতি অঙ্গনে জোরদারভাবে কাজ করার কারণে একজন কণ্ঠশ্রমিক হিসেবে নানা সময়েই নানা পত্রিকায় ইন্টারভিউ দিতে হয়। কাজেই রিপোর্টারের কথায় অপ্রস্তুত হবার প্রশ্নই আসে না। সুতরাং বিপুল আগ্রহে তার প্রশ্নটি জানতে চাইলাম।
: মানিক ভাই, সম্প্রতি আমরা দেখছি ইন্ডিয়া থেকে সিনেমা আমদানি করে বাংলাদেশের হলগুলোতে প্রদর্শন করা হচ্ছে, এটা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেকেই মন্তব্য করছেন, আপনার মতামত কী?
: দেখুন, ইন্ডিয়ার সিনেমা বাংলাদেশের হলগুলোতে প্রদর্শন করে আমাদের চলচ্চিত্রকে একটা অসম ও অন্যায্য প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ একটা সার্বভৌম রাষ্ট্র, তার সংস্কৃতি কী হবে, চলচ্চিত্র কী হবে, তা নিজেদের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে।
ইন্ডিয়ার মতো চলচ্চিত্র নির্মাণে মেধা থাকলেও আমাদের প্রযুক্তি ও বাজেট নেই। সুতরাং তাদের সিনেমার মুখোমুখি আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে দাঁড় করিয়ে দেয়া অযৌক্তিক। তা ছাড়া ওদের টিভি চ্যানেলগুলো আমাদের এখানে দেদার সম্প্রচারিত হলেও, ন্যূনতম পশ্চিমবঙ্গেও দেখা যায় না আমাদের চ্যানেল। এই বৈষম্য মেনে নেয়া মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের টোটালি পরিপন্থী। প্রত্যেক রাষ্ট্র তার নিজের মতো করে সাহিত্য-সংস্কৃতিকে গড়বে, এটাই নিয়ম।
মালয়েশিয়া কী করেছে দেখুন, বিবিসি-আলজাজিরা ছাড়া বাইরের দেশের আর কোন চ্যানেলকে তারা অ্যালাউ করেনি। তথ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ভারতের টিভিগুলোকে একতরফা প্রচারের অনুমতি দিয়ে ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা আমাদের সংস্কৃতির মস্তিষ্কে সর্বপ্রথম কুঠারাঘাত করেন।
: তার মানে আপনি বলছেন, চলচ্চিত্র আমদানির ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, সেটা রাষ্ট্রদ্রোহী?
: নিঃসন্দেহে। আর কোন কিছু জানতে চান?
: না ভাইয়া, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, সময় দেয়ার জন্য। এটা কাল পাবলিশ হবে, দেখবেন প্লিজ।
: ওকে ভালো থাকুন।
২.
প্রথম সারির ওই ইংরেজি দৈনিকটি সাধারণত পড়া হয় না। পরদিন বিপুল আগ্রহ নিয়ে পত্রিকা কিনলাম। অন্য সব পাতায় না তাকিয়ে সোজা এন্টারটেইনমেন্ট পাতায় নিবদ্ধ করলাম চোখ। কিন্তু চোখ তো ছানাবড়া! একি! চলচ্চিত্র পরিচালক এফ আই মানিকের ছবি দিয়ে তিন কলাম পরিসরে ছাপানো হয়েছে আমাদের দেয়া প্রতিক্রিয়া। হুবহু। বুঝে গেলাম, ঘটনা কী? কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রথম সারির একটা দৈনিকের রিপোর্টার কিভাবে এত বড় ভুল করলো? একবার ভাবলাম, পত্রিকার সম্পাদককে ফোন দেই। মুহূর্তেই চিন্তায় ছেদ। থাক, রিপোর্টার মহোদয়ের! চাকরিটা হালকা করে কী লাভ! এই অদ্ভুত ট্রেন্ডই তো আমাদের মিডিয়া জগতে চলছে। চলুক। মনের আক্ষেপে এই ধরনের রিপোর্টিংয়ের নাম দিলাম-ছাগল সাংবাদিকতা।
৩.
আমি আবার ফিরে গেলাম জীবনানন্দ দাশে।
অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই প্রীতি নেই করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।
যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি
এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়
মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা
শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

লেখক : প্রধান বার্তা সম্পাদক, চেঞ্জ টিভি.প্রেস এবং টকশো উপস্থাপক, এশিয়ান টিভি

SHARE

Leave a Reply