জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ শিক্ষার্থী বহিষ্কার আইন ও মানবাধিকার পরিপন্থী -মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১১ জন ছাত্রের ছাত্রত্ব বাতিলের সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর কারণ হিসেবে বর্ণনা করেছে তারা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতায় জড়িত এবং সরকারবিরোধী বক্তব্য দিয়েছে। দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত সংবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বক্তব্য হচ্ছে ‘সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে দাবি করে ১১ শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে নানা অপতৎপরতার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা সরকারবিরোধী। এমন অপতৎপরতায় যদি তারা যুক্ত থাকেন, তবে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করে। তাই তাদের সাময়িক বহিষ্কার করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আদালতের জামিন দেয়া সাপেক্ষে এই শিক্ষার্থীরা তাদের ছাত্রত্ব ফিরে পাবে। যদি আদালত তাদের জামিন দেয়, বা তারা নির্দোষ প্রমাণিত হয় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাদের বহিষ্কারের আদেশ প্রত্যাহার করা হবে। এ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।’
দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদে পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী জানা যায় “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব শিক্ষার্থী ‘নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে’ এক মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন, যে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্রশিবিরের এক নেতা। সেই সূত্রে শিবির নেতা মিকদাদ হোসেনের সঙ্গে একটি বাড়ি থেকে তাদের আটক করা হয়েছে।”
পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বরাতে যে সকল সংবাদ গণমাধ্যমসমূহে প্রকাশিত হয়েছে সেই সংবাদসমূহের ভাষ্য অনুযায়ী কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির প্রতিবাদ করা কি রাষ্ট্রদ্রোহিতা? সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়া কি ফৌজদারি অপরাধ? দেশে চলমান ঘটনাবলির কি কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না? এ সকল শিক্ষার্থী কি আইনবিরোধী কোনো কাজ করেছে? করলে সেটি কোন ধরনের অপরাধ? পুলিশ যাদের গ্রেফতার করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কি কোনো অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে? তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই এ সকল শিক্ষার্থী কোনো অপরাধ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কি এখন পর্যন্ত চার্জশিট দেওয়া হয়েছে? আদালত কি যথাযথ প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের অভিযুক্ত প্রমাণ করে কোনো শাস্তি দিয়েছে? তবে কেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগ বাড়িয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে? এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট জনাব আলী রিয়াজ একটি কলাম লিখেছেন যা ৭ এপ্রিল ২০২২ দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “এই ১১ শিক্ষার্থী কারাগারে আছেন কেন? তাঁদের বিরুদ্ধে ‘সরকারবিরোধী অপতৎপরতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো’র অভিযোগ এনেছে পুলিশ। কোনো আদালত তাঁদের ইতোমধ্যে আইনি প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত করেননি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এক ধরনের ব্যবস্থা নিয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলেছে, একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এ ঘটনা বিভিন্ন কারণেই আমাদের মনোযোগ দাবি করে।”
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও তেল গ্যাস বন্দর রক্ষা আন্দোলনের নেতা জনাব আনু মোহাম্মদ তার ফেসবুক পেজে এ বিষয়ে একটি পোস্ট দিয়েছেন, তাতে তিনি এ সকল শিক্ষার্থীকে অপরাধী বলাও এক ধরনের ফৌজদারি অপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন, যা দৈনিক মানব জমীনে প্রকাশিত হয়েছে, পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তার কিয়দংশ তুলে ধরছি ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কি শিক্ষার্থীদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখবে, না কাস্টমার হিসেবে দেখবে, নাকি দেখবে নিজের সত্তার অংশ হিসেবে? পত্রিকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একটা বক্তব্য দেখলাম- ‘সার্বভৌমত্ব’ ক্ষতিগ্রস্ত করা, দেশের ‘অনিষ্ট’ করা, সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রচার ইত্যাদি অভিযোগে তারা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তারা এখন আটক। প্রশাসনের বক্তব্য খুবই অস্পষ্ট। এই নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের এত শক্তি যে তারা সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত করছে? সরকারবিরোধী বক্তব্য প্রচার তো কোনো অপরাধ হতে পারে না, বরং একে অপরাধ বলা, তার জন্য তাদের শাস্তি দেওয়াই তো অপরাধ।’

ভাবতে অবাক লাগে এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি। আইন, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের স্লোগানের তুবড়ি ফোটানো এ সমাজে একজন নাগরিক কিংবা একজন সাধারণ ছাত্রের মৌলিক অধিকার কতটুকু? তারা কি করতে পারবে আর কি করতে পারবে না। এ বিষয়ে সংবিধানে যা আছে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার ভিন্ন চিত্র আমরা দেখছি নিয়মিত। সংবধিানের ৩৯ নং অনুচ্ছেদের ১ উপধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’
২ এর উপধারায় বলা হয়েছে (ক) ‘প্রত্যেক নাগরিকের বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের, এবং (খ) সংবাদক্ষেত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান করা হইল।’
৩৭ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ-সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’
৩৮ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে ‘জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে সমিতি বা সংঘ গঠন করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’
সংবিধান একজন নাগরিককে যে অধিকার দান করে তার কতটুকু আমরা ভোগ করছি? বিগত ১২-১৩ বছর যাবৎ বাংলাদেশের মানুষ এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার অধীনে জীবন যাপন করছে। সরকারের কর্মকাণ্ড কিংবা সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করার ন্যূনতম কোনো সুযোগ অবারিত রাখা হয়নি। শৃঙ্খলে বাঁধা গণতন্ত্র, পুলিশের লাঠি আর বন্দুকের নলের কাছে অসহায় আইন ও মানবাধিকার। এখানে দিনের ভোট রাতে হয় কেউ প্রতিবাদ করার সুযোগ রাখে না। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস কিন্তু কেউ প্রতিবাদ করতে পারবে না। রমাদানের প্রথম দিনেই অসংখ্য রোজাদার রাস্তায়ই ইফতার করতে বাধ্য হয়েছে। সড়ক ও ট্রাফিক ব্যবস্থায় এ অনিয়ম সম্পর্কে সরকারের একজন মন্ত্রী হাস্যকর বক্তব্য দিয়ে রোজাদারদের কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ আরো পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকলে নাকি গ্রামের রাস্তায়ও যানজট লেগে যাবে। কারণ তাদের উন্নয়নের জোয়ারে গাড়ির সংখ্যা বাড়বে। উন্নয়ন দেখতে দেখতে জনগণ তথাকথিত এ ‘স্বর্গসুখ’ থেকে মুক্তি চায়। রডের পরিবর্তে বাঁশের ব্যবহার, স্কুল ভবন নির্মাণের আগে ভেঙে পড়া। দুস্থদের জন্য দেওয়া ঘর বাতাসে উড়ে যাওয়া, সবই তো দেখছে দেশবাসী। সরকারি দলের দখলদারি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, অন্যায়, আনাচার আর লুণ্ঠনে গোটা দেশে নরকের ‘শান্তি’ বিরাজ করছে। রোজার শুরুতেই বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকায় অনেক বাড়িতে রান্না হয়নি। সামর্থ্যবান পরিবারগুলো হোটেলের কেনা খাবার খেলেও অনেকেরই সে সুযোগও হয়নি। ঢাকা শহরে পানির তীব্র সংকট নাগরিক জীবনকে দুঃসহ করে তুলেছে। ওয়াসার তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে ডায়রিয়া পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। কিন্তু এসবের কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না। আজব এক পরিস্থিতিতে আমাদের বসবাস।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের খবর কোনো কোনো মিডিয়া অতি উৎসাহের সাথে প্রকাশ করেছে। যা যে কোনো বিবেকবান নাগরিকের চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। অতি উৎসাহের কারণ তারা ইসলামী ছাত্রশিবির করে। মূলত তাদের দৃষ্টিতে এটা এক ধরনের অপরাধ। শিবির করা কি আসলেই অপরাধ? ইসলামী ছাত্রশিবির তো কোনো নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন নয়। সংবিধান একজন নাগরিককে যে অধিকার দিয়েছে সেই অধিকার বলেই তারা ইসলামী ছাত্রশিবির করে। পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছে তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দিয়েছে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশকে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করা হয়েছে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাষ্ট্রীয় এই বাহিনীর কাজ ছিলো জনগণের সেবক হিসেবে ভূমিকা পালন করা। তারা এর পরিবর্তে ক্ষমতাসীন মহলের অন্যায় আবদারকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র ও সরকারি দলকে একাকার করে ফেলেছে। ভোটারবিহীন নির্বাচন এবং দিনের ভোট রাতে আয়োজনের মূল ভূমিকায় পুলিশ ছিল এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। জন সমর্থনহীন সরকার অন্যায় করতে করতে জনগণের সাথে তাদের ন্যূনতম সম্পর্ককে ছিন্ন করে ফেলেছে, যার কারণে কোথাও ক্ষীণ কোনো প্রতিবাদ হলেও সরকারের ভয়ের মাত্রা বৃদ্ধি পায়। মৃদুমন্দ বাতাসে গাছের পাতা ঝরার আওয়াজকেও তারা শত্রুর আগমন ভেবে আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে দুই-তিন হাজার লোকের একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অতি উৎসাহী এ কর্মকাণ্ড এ বিষয়কে স্পষ্ট করে তোলে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর এবং ভিসির বক্তব্য যেখানে ছাত্রবান্ধব হওয়া দরকার ছিল, সেখানে তারা নিজ ছাত্রদেরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে জাতিকে কি মেসেজ দিতে চান? এটা তাদের বিবেকের কাছে অতি সাধারণ প্রশ্ন। অবশ্য তোয়াজ আর ক্ষমতার লেজুরবৃত্তি করে যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন বা হয়েছেন, তাদের বিবেকবোধ কতটুকু সচল আছে তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বিবেক যাদের ভোঁতা হয়ে গেছে তারা কর্তৃত্ববাদী সরকারের আজ্ঞাবহ কর্মচারী ব্যতীত কিছু হওয়ার ক্ষমতা রাখেন না।
পুলিশ এ সকল ছাত্রকে গ্রেফতার করেছে ২০২২ সালের ঘটনায় কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে ২০২১ সালের। অবশ্য বাংলাদেশের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় পুলিশ পারে না এমন কোনো কাজ নেই। তারা কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে ধরেই এমনভাবে মিডিয়া ট্রায়াল করে যে বিচারের আগেই এক ধরনের বিচার তারা করে ফেলে। এ জন্যই হয়তো ব্রিটিশদের প্রবর্তিত সাক্ষ্য আইনে পুলিশের কাছে দেওয়া স্বীকারোক্তি আদালতে অগ্রহণযোগ্য বা অপ্রাসঙ্গিক গণ্য করা হয়েছে। সাক্ষ্য আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে ‘অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি পুলিশ অফিসারের নিকট দোষ স্বীকার করিয়া থাকিলে তাহা তাহার বিরুদ্ধে প্রমাণ করা যাইবে না’ বর্তমান সময়ে আমরা দেখেছি প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে যে কোনো আসামি গ্রেফতার করেই রিমান্ড চাওয়া হয়। পুলিশ রিমান্ডে অবর্ণনীয় নির্যাতনের বিষয়টি আমরা নিয়মিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানতে পারি। বাংলাদেশে পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন, ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য করার ঘটনা অহরহ ঘটে। এমনকি পুলিশ হেফাজতে যাওয়ার আগে একজন সম্পূর্ণ সুস্থ ব্যক্তিকে পরবর্তীতে পুরোপুরি অচেতন অবস্থায় আদালতে হাজির করা হয়। তিন দিনের পুলিশ রিমান্ডে এ সকল ছাত্রের সাথে পুলিশ কেমন আচরণ করেছে তা অবশ্য আমাদের জানার কোনো সুযোগ এখন পর্যন্ত হয়নি। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই সরকারের বিরুদ্ধে মিছিল করা কিংবা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ করা আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ। তবে তা তো শুধুমাত্র মিছিলের ভিডিও ফুটেজে যার ছবি পাওয়া গেছে শুধু তাকে গ্রেফতার করা উচিত ছিল। কিন্তু পুলিশ মেসে যে ১১ জনকে পেয়েছে সবাইকে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন আছেন যারা ২০২১ সালে ঢাকা শহরে অবস্থান করাতো দূরের কথা, ঢাকা শহরে আসেওনি। অথচ ২০২২ সালে গ্রেফতার করে ২০২১ সালের মামলায় তাদের আসামি করা হয়েছে। যাদের বেশ কয়েকজনের পরিবার এবং অভিভাবকদের বক্তব্য দৈনিক নয়া দিগন্তে প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক নয়া দিগন্তের ৬ এপ্রিল ’২০২২ সংখ্যার নিউজের হেডলাইন ছিল ‘ঘটনাস্থলে না থেকেও গায়েবি মামলার আসামি’ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে এই রিপোর্টের কিয়দংশ তুলে ধরছি “বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হয়ে ক্লাস করতে ৩ মার্চ নীলফামারীর গ্রামের বাসা থেকে ঢাকায় আসেন রওশনুল ফেরদৌস রিফাত। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী।… রিফাতের মতো আরো তিন শিক্ষার্থী রয়েছেন, যারা প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়ে মাত্র ঢাকায় এসেছেন। রিফাতের বাবা মোরশেদুল করিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অফিসে এসে ঘটনার জবাব খুঁজতে চাচ্ছেন। তিনি বলেন, ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ওই সময় আমার ছেলে ঢাকায়ই ছিলো না। নীলফামারী থেকে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতি নিচ্ছিল। প্রথমে সে দিনাজপুরের হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো সাবজেক্ট পেলে এখানে চলে আসে। এখানে ভর্তির পর চলতি বছরের ৩ মার্চ ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে যুক্ত হতে ঢাকায় আসে। অথচ ২০২১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর যাত্রাবাড়ী এলাকার ঘটনার এমন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে যেসময় সে ঢাকায়ই আসেনি। শুধু রিফাতের পরিবার নয়, একই দাবি জানিয়েছেন গ্রেফতার হওয়া রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে সদ্য ভর্তি হওয়া আব্দুর রহমান অলির পরিবার। অলির বাবা জাহাঙ্গীর ইসলাম নিজেও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।”
গ্রেফতার হওয়া ছাত্রদের অভিভাবকদের যে বক্তব্য পত্রিকায় এসেছে যে, তাদের অধিকাংশই ২০২১ সালে ঢাকায়ই ছিলো না। অথচ তাদের সেই সময়ের মামলায় আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনা বিগত বছরগুলোতে একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ঘটনা ঘটা ছাড়াই গায়েবি মামলা। মৃত ব্যক্তি মামলার আসামি। হজে থেকে আসামি হওয়া, বিদেশে চিকিৎসা নিতে গিয়ে আসামি হওয়া, প্রবাসে বসবাসরত ব্যক্তি আসামি হওয়া যেন এখন নস্যি ব্যাপার। একটি স্বাধীন ও সুসভ্য রাষ্ট্রে এটা কাম্য হতে পারে না। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত এই সম্ভাবনাময় তরুণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নিয়ে এমন রাজনৈতিক নোংরা খেলার অধিকার পুলিশ এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন রাখেন কি না? শিক্ষাজীবনের শুরুতেই যাদেরকে এমন হয়রানি আর আইনি নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে তারা তাদের আগামী পথচলাকে মসৃণ করতে পারবে কি? তাদের শিক্ষাজীবনের পরতে পরতে এই দুষ্টুক্ষত তাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াবে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলেছে, তারা জামিনে মুক্ত হলে তাদের অস্থায়ী বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হবে। কিন্তু মোটা দাগে একটি প্রশ্ন থেকে যায়। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল গ্রেফতারকৃত ছাত্রদের অন্যায় আটকের প্রতিবাদ করা সেখানে তারাই যখন এ সকল ছাত্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, তারা আগামীতে কতটুকু ন্যায়বিচার করতে পারবে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের একক আধিপত্য, দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজি এবং ছাত্র নির্যাতনের ঘটনা নিয়মে পরিণত হয়েছে। যার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনসমূহের কার্যকর কোনো ভূমিকা প্রত্যক্ষ করা যায়নি, বরং ছাত্রলীগ কর্তৃক শিবির সন্দেহে কোনো ছাত্রকে মারধর করার পর তাকে উদ্ধারের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পুলিশ ডেকে তাদের গ্রেফতার করিয়েছে, এমন নজির অসংখ্য। বুয়েটের আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনা এর প্রকৃষ্ট নজির। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নির্যাতনের ভয়ে সাধারণ ছাত্ররা তটস্থ থাকে। গেস্ট রুম কালচার, র‌্যাগিং, মিছিলে যেতে বাধ্য করা, গণরুমে গাদাগাদি করে থাকার ব্যবস্থা করা, সিট পেতে ছাত্রলীগকে চাঁদা দেওয়া যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ সকল অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে কি কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা নিয়েছে? উত্তর নেতিবাচকই হবে। অতি সম্প্রতি দুটি ঘটনা দেশের সকল মানুষই সোস্যাল মিডিয়া এবং গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছে। ছাত্রলীগের এক নেতা পরীক্ষার হলে ফেসবুক লাইভে পাস করিয়ে না দিলে বোর্ড ফাটিয়ে ফেলার ঘোষণা দিয়েছে। অপর ঘটনা শেরপুরে প্রকাশ্যে পুলিশের সামনে ছাত্রলীগের এক নেতা কর্তৃক একজন লোককে গলা কেটে হত্যা করা। এ সকল ঘটনা এটাই প্রমাণ করে দেশে দুষ্টের লালন এবং শিষ্টের দমন চলছে। গ্রেফতার হওয়া ছাত্রদের বিরুদ্ধে অভিযোগের একটি হচ্ছে, তারা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথে সম্পৃক্ত। প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামী ছাত্রশিবির কি কাজ করে? ইসলামী ছাত্রশিবির ইসলামী আদর্শের পতাকাবাহী একটি সংগঠন। যারা তরুণ ছাত্রদেরকে কুরআন হাদিস পড়ার ব্যবস্থা করে। ইসলামের আলোকে চরিত্রগঠনের আহ্বান জানায়। ছাত্রদের লেখাপড়ায় মনোযোগী করা, সময়ের সদ্ব্যবহার করার জন্য ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিটি কর্মীকে ব্যক্তিগত রিপোর্ট সংরক্ষণ করতে হয়। ধূমপান, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও মাদকমুক্ত সংগঠনের নাম ইসলামী ছাত্রশিবির। শিবিরের বিরুদ্ধে অবস্থান না নিয়ে তাদেরকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া বিবেক ও মানবিকতার দাবি। অন্যায়, দুর্নীতি, দুরাচার, সন্ত্রাস, সহিংসতা, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানিমুক্ত একটি সুখী, সুন্দর, কল্যাণময় দেশ গড়ার জন্য যেমন আদর্শ নাগরিক প্রয়োজন। সে ধরনের একদল আদর্শ নাগরিক তৈরির কাজ করছে ইসলামী ছাত্রশিবির। শুধুমাত্র শিবির করার কারণে কিংবা দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির প্রতিবাদে যে সকল ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে তারা কোনো অস্ত্রধারী মাস্তান নয়, তারা টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি কিংবা ছাত্রী নিগ্রহের সাথে জড়িত নয়। তারা কেউই ধূমপায়ী কিংবা মাদকসেবী নয়। তাদেরকে অপরাধী হিসেব উপস্থাপন মানেই একটি ফৌজদারি অপরাধ। ছাত্রদের অভিভাবক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে, নিরপরাধ এ সকল ছাত্রের শিক্ষাজীবনের অনিশ্চয়তা দূর করা, তাদেরকে দ্রুত পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা। আশা করি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্রদের মুক্তির জন্য স্ব-উদ্যোগে ব্যবস্থা নিবে এবং ছাত্রত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করবে।
লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply