জান্নাতে অনন্ত সুখ -ড. কামরুল হাসান

[১ম কিস্তি]

মৃত্যু মূলত আরেক অনন্ত জীবনের অভিষেক। কবর সে জীবনের প্রথম ধাপ। অন্তর্বর্তীকাল পেরোনোর পর হবে উত্থান। তারপর শুরু হবে হিসাব-নিকাশ। সেখানেও থাকবে চড়াই-উতরাই। এক চরম ভীতিকর অবস্থার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হবে এবং এগিয়ে যাবে সে বিচারকার্য। সে বিচারকার্য অতিক্রমণে অনেকের নাভিশ্বাস উঠবে। প্রচণ্ড তাপদাহ, প্রখর সূর্যতাপ, মাথার উপর রবির অবস্থান, শরীর বাহিত ঘর্মের দরিয়া, তৃষ্ণার্তের হাহাকার, পাপী-তাপীদের আর্তচিৎকার, অসহায়দের উ™£ান্ত দৌড়াদৌড়ি, দিনমণির প্রচণ্ড উত্তাপে মস্তিষ্কের গলে যাওয়া ও তার টগবগানি, ক্ষুধা-তেষ্টা ও ভীতিতে রসনা হাঁটু পর্যন্ত ঝুলে যাওয়া, উভয় ঠোঁট উপর-নিচে ফেটে যাওয়া, সর্বত্র সাহায্যের আকুলতা, সড়ক-পুল পারাপারে নিশ্চয়তা-অনিশ্চয়তার দোদুল্যমানতা, সবার মাঝে আত্মকেন্দ্রিকতা, আত্মস্বার্থ, শুধুই নিজেকে নিয়ে ভাবা। এমনই দৃশ্য বিচার দিবসের। কেউ কারো নয়। রাজা-প্রজা, ধনী-নির্ধন, আমির-ফকির, আমলা-কামলা, অধ্যাপক-শ্রমিক, পাঁচতলা-গাছতলা, আরব-আজম, প্রাচ্য-প্রতীচ্য, মনিব-গোলাম, জমিদার-ঝাড়–দার, স্বর্ণকার-কর্মকার, মৌয়াল-গোয়াল, শ্বেতাঙ্গ-কৃষ্ণাঙ্গ ইত্যাদি শ্রেণী-পেশা-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সেই বিচারালয়ে উপস্থিত হবে। ছায়াহীন, বৃক্ষহীন, বারিহীন সেই বিশাল ময়দান। কারো কোনো বিশেষত্ব সেখানে বিচার্য নয়। তবে আল্লাহর অতি কাছের, অতি পছন্দের বান্দাদের জন্য থাকবে আরশের ছায়া, হাউজে কাউসারের প্রাণসঞ্জীবনী পানি, আল্লাহ সচেতনদের জন্য কিঞ্চিৎ সুযোগ। নবী-রাসূল, অলি-মুত্তাকি, সৎকর্মশীল বান্দারা থাকবে সে সৌভাগ্যবানদের দলে। সে বিচারালয়ের ডানে-বামে বিশেষ কারো অস্তিত্ব থাকবে না। উকিল-মুখতার, পরামর্শক-সাহায্যকারী বা আইন সহায়কের অস্তিত্ব থাকবে না। সেখানে একমাত্র এবং সর্বোচ্চ অধিকর্তা থাকবেন আল্লাহ। তথায় কারো প্রতি কোনো অবিচার হবে না। সবাইকে যথাযথ প্রাপ্য দেয়া হবে। সেখানে সাক্ষী, তর্ক-বিতর্ক কিংবা কূটতর্কের কোনো অবকাশ থাকবে না। আল্লাহর বিচারে ভেটো দেয়ার অধিকার বা সাহস কোনোটাই থাকবে না। অডিও, ভিডিও অথবা আরো কার্যকর কোনো দস্তাবেজের প্রয়োজন হলে তাও সেখানে থাকবে। সর্বোপরি মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গরা প্রতিটি অপকর্মের রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করবে। সবার মুখকে মূক বানিয়ে দেয়া হবে। এমনিতরো অতি নিরপেক্ষ পক্ষপাতহীন এক আদালতে বিচারকার্য সমাপনান্তে যার যার কর্ম-অনুযায়ী তার চিরকালীন আবাস নির্ধারিত হবে। সেটি হবে জান্নাত অথবা জাহান্নাম।

জান্নাত শব্দের অর্থ

জান্নাত শব্দটি আরবী। বাংলা প্রতিশব্দ- বাগান, বাগিচা, উদ্যান, বিথি। তবে জান্নাত শব্দটি এই জগতের পরের জগতে আল্লাহ-সচেতন বান্দাদের জন্য আল্লাহর পুরস্কার বা প্রতিদানই জান্নাত। এটি চিরকালীন আবাস। শান্তির অনন্ত আবাস। এটিকে ফারসি ভাষায়- বেহেস্ত, ইংরেজিতে ঐবধাবহ আর বাংলায় বলে স্বর্গ। এটি জাহান্নামের বিপরীতধর্মী শব্দ। জান্নাত শব্দটি মূল অক্ষর বিবেচনায় একাধিক অর্থ ধারণ করে। যেমন আবরণ, আচ্ছাদন, গোপন, উদরস্থ, জ্ঞানশূন্যতা ইত্যাদি। জান্নাত একটি বিশেষায়িত শব্দ। শরিয়তের পরিভাষায়- আখিরাতে ঈমানদার ও নেককার বান্দাদের জন্য চিরশান্তির আবাসের নাম জান্নাত।
মূলত জান্নাত আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের চিরকালীন সুখের আবাস। জান্নাতের সৌন্দর্য অনুপম। এর নিয়ামতরাজি অনবদ্য। সৃষ্টি হিসেবে অনন্য। জান্নাতের সজ্জায়ন, তথাকার পরিবেশন, যাবতীয় ব্যবস্থাপনা ব্যতিক্রমী ও ব্যত্যয়ী। পার্থিব জীবনের সাথে কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও মৌলিকত্ব ও প্রাকৃতিক দিক হতে তা সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও আলাদা। মুমিনের উপভোগ্য ও উপাদেয় সকল উপাত্ত দিয়ে ভরপুর থাকবে জান্নাত। আল্লাহ বলেন, সেখানে তোমাদের মন যা চাইবে তাই তোমাদের জন্য রয়েছে। আর যা তোমরা দাবি করবে তাও তোমাদের দেওয়া হবে। ৪১:৩১; জান্নাতের বর্ণনায় রাসূল সা. হাদীসে কুদসিতে বলেন, আল্লাহ বলেন, আমি আমার পুণ্যবান বান্দাদের জন্য জান্নাতে এমন সব বস্তু তৈরি করে রেখেছি যা কোনো চোখ কোনোদিন দেখেনি, কোনো কান কখনও শোনেনি আর অন্তর কোনোদিন কল্পনা করতে পারেনি। (মিশকাত)

জান্নাতি কারা

পার্থিব জীবন শেষে আসবে কবরের জীবন। তারপরই হবে পুনরুত্থান। সেদিন সবাই কবর থেকে উত্থিত হবে। এরপর শুরু হবে হিসাব-নিকাশ। দুনিয়ার জীবনের যাবতীয় কাজ-কর্মের অনুপুঙ্খ হিসাব-নিকাশ। সেদিন সকল পুণ্যকর্মের জন্য প্রতিদান ও পুরস্কার এবং পাপকর্মের জন্য শাস্তি ও তিরস্কার ঘোষণা করা হবে। সেদিন কারুর প্রতি সামান্যতম অবিচার করা হবে না। দুনিয়ার জীবনে সৎকর্মের পাল্লা যাদের ভারী হবে, যাবতীয় অপরাধ মার্জনাসহ কিয়ামতের দিন হাজির হবে, ঈমানসহ আল্লাহর শাহি দরবারে উপস্থিত থাকবে তাদের জন্য নির্ধারিত হবে চিরসুখের আবাসের। সেখানে তারা থাকবে অনন্তকাল। তাদের এই আবাসই জান্নাত। যারা জান্নাতে অবস্থানের মহাসৌভাগ্য অর্জন করবে তারাই জান্নাতি।

জান্নাত শব্দের পরিসংখ্যান

জান্নাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আলোচনায় ভরপুর আল-কুরআন। জান্নাতের নিয়ামত, বৈশিষ্ট্য, অধিবাসী, জান্নাতের অনন্ত জীবন ইত্যাকার বিষয়ে অজস্র আয়াত রয়েছে। জান্নাত শব্দটি একবচন ও বহুবচনরূপে ১৪৭ স্থানে এসেছে। তবে শব্দটি কখনও কখনও উদ্যান বা বাগান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। উল্লেখ্য, জান্নাত শব্দ ছাড়াও একাধিক শব্দ জান্নাতের সমার্থকরূপে ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন নাঈম, মাওয়া ইত্যাদি। আল্লাহ বলেন, ইন্নাল আবরারা লাফি নাঈম অর্থাৎ সৎকর্মশীলরা নিশ্চয়ই জান্নাতে অবস্থান করবে। ৮২:১৩;

জান্নাতের স্তরসমূহ

জান্নাতের ফটক বিষয়ে হাদীসে রাসূলে বর্ণনা রয়েছে। আল-কুরআনুল কারিমের আলোচনা থেকে জান্নাতের আটটি স্তর সম্পর্কে জানা যায় বলে আকাবির মনীষীগণ উল্লেখ করেছেন। সাধারণ্যে এটিই অত্যধিক পরিচিত। আটটি স্তর হলো-

জান্নাত আল-ফিরদাউস : এটিই জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর। হাদীসে এসেছে, তোমরা যখন আল্লাহর কাছে জান্নাত চাইবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস চাইবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ইন্নাল্লাজিনা আমানু ও আমিলুছ ছালিহাতি কানাত লাহুম জান্নাতুল ফিরদাইসে নুজুলা অর্থাৎ- যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত আল-ফিরদাউস। ১৮:১০৭; অন্যত্র আল্লাহ বলেন, আল্লাজিনা ইয়ারিছুনাল ফিরদাউসা হুম ফিহা খালিদুন অর্থাৎ- যারা অধিকারী হবে ফিরদাউসের, তাতে তারা থাকবে চিরকাল।

জান্নাতুল খুলদ : এটি জান্নাতের অন্যতম স্তর। আল্লাহ বলেন, কুল আজালিকা খাইরুন আম জান্নাতুল খুলদ আল্লাতি উয়িদাল মুস্তাকুনা কানাত লাহুম জাজায়াও ওয়া মাসিরা অর্থাৎ- তাদের জিজ্ঞেস করুন, এটিই কি উত্তম নাকি চিরকালীন জান্নাত? যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে মুত্তাকিদের। এটিই তাদের পুরস্কার ও প্রত্যাবর্তনস্থল। ২৫:১৫; খুলদ শব্দের অর্থ- চিরকালীন ও চিরস্থায়ী।

জান্নাতুল নাঈম : নাঈম শব্দটি নিয়ামত থেকে। নিয়ামতপূর্ণ বা অনুগ্রহে ভরপুর জান্নাত। মহান আল্লাহ বলেন, ওয়া লাও আন্না আহলাল কিতাবি আমানু ওয়াত্তাকু লাকাফফারনা আনহুম সাইয়্যিয়াতিহিম ওয়া লাআদখালনাহুম জান্নাতিন্নাইম অর্থাৎ- আহলি কিতাবিরা যদি ঈমান আনে এবং আল্লাহকে ভয় করে তবে আমরা তাদের পাপরাশি অবশ্যই ক্ষমা করে দিব এবং তাদেরকে অবশ্যই নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশ করাব। ০৫:৬৫; অন্যত্র এসেছে, তাজরি মিন তাহতিহিমুল আনহানু ফি জান্নাতিন্নাঈম অর্থাৎ- তারা থাকবে নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতে যার তলদেশে প্রবাহিত থাকবে স্রােতস্বিনী। ১০:০৯; এমনিভাবে আরো অনেক স্থানে এ জান্নাতের প্রসঙ্গ এসেছে।

জান্নাতুল আদন : জান্নাতের স্তরসমূহের অন্যতম। আদন শব্দের অর্থ নিবাস বা শাশ^ত আবাস। জান্নাতুল আদন বলতে চিরসুখের শাশ^ত নিবাসকে বুঝানো হয়। আল্লাহ বলেন, ওয়াদাল্লাহুল মুমিনিনা ওয়াল মুমিনাতি জান্নাতিন তাজরি মিন তাহতিহাল আনহারি খালিদিনা ফিহা ওয়া মাসাকিনা তায়্যিবাতান আকবার জালিকা হুয়াল ফাওজুল আজিম অর্থাৎ- আল্লাহ মুমিন নর-নারীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এমন জান্নাতের যার তলদেশে নদী-নালা প্রবাহিত থাকবে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আর জান্নাতে আদনে রয়েছে অনন্য আবাস। আল্লাহর সন্তুষ্টি। আর আল্লাহর সন্তুষ্টিই সব থেকে বড় পাওয়া। এটিই মহাসাফল্য। ০৯:৭২; আল-কুরআনুল কারিমের মোট ১১ স্থানে আদন শব্দ সহযোগে জান্নাতের এ স্তরের বর্ণনা ও আলোচনা উল্লেখ করা হয়েছে। জান্নাতুল আদন মুমিনদের জন্য অতি সম্মানিত একটি স্তর।

জান্নাতুল মাওয়া : জান্নাতুল মাওয়া জান্নাতের একটি বিশেষ স্তর। মাওয়া শব্দের অর্থ আবাস। জান্নাতুল মাওয়া শব্দের অর্থ আবাস, উদ্যান বা বাগানবাড়ি করা যেতে পারে। আল্লাহ বলেন, আম্মাল্লাজিনা আমানু ওয়া আমিলুস সালিহাতি ফালাহুম জান্নাতুল মাওয়া নুজুলাম বিমা কানু ইয়ামালুন অর্থাৎ- যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া। তাদের কর্মফল হিসেবে এটি তারা পাবে। মাওয়া শব্দটি জান্নাত-জাহান্নাম উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়েছে। তবে জান্নাতের সাথে সম্পৃক্ত করে তিন স্থানে ব্যবহৃত হয়েছে। আর জাহান্নামের সাথে সম্পৃক্ত করে ব্যবহার হয়েছে ১৯ স্থানে। অবশ্য তা জাহান্নামের নাম হিসেবে নয়। আবাস অর্থে। আল্লাহ অত্যন্ত চমৎকাররূপে বলেন, যে নিজ প্রতিপালকের সামনে উপস্থিত হওয়াকে ভয় করে এবং নফসকে প্রবৃত্তির তাড়না থেকে দূরে রাখে নিশ্চয়ই জান্নাত হবে তার আবাস।

দার আল-কারার : কারার শব্দের অর্থ- স্থায়ী, চিরস্থায়ী, স্থায়িত্ব ইত্যাদি। আবার শব্দটি আবাস, নিবাস, প্রস্তাব, সিদ্ধান্ত, নির্দেশ এসব অর্থেও এসেছে। সুতরাং দার আল-কারার অর্থ চিরন্তন আবাস বা চিরসুখের আলয় অর্থ- করা যেতে পারে। কারার শব্দটি আল-কুরআনুল কারিমে ৯ বার এসেছে। আখিরাতকে দার আল-কারার হিসেবে বলা হয়েছে। অন্য ৮ স্থানে শব্দটি আবাস বা স্থায়ী অর্থে এসেছে। আল্লাহ বলেন, ওয়া ইন্নাল আখিরাত হিয়া দারুল কারার অর্থাৎ- আর আখিরাতই হচ্ছে চিরস্থায়ী আবাস। ৪০:৩৯;

দার আল-মাকাম : মাকাম অর্থ- স্থান, পাত্র, অবস্থান, আবাস ইত্যাদি। দার আল-মাকাম এর অর্থ সুখ-ভূমি, শান্তি-আলয়। এটি জান্নাতের একটি স্তর। আল্লাহ বলেন, ইন্নাল মুত্তাকিনা ফি মাকামিন আমিন অর্থাৎ- মুত্তাকিরা থাকবে নিরাপদ আবাসে। ৪৪:৫১;

দার আস-সালাম : এটি জান্নাতের একটি বিশেষ স্তর। সালাম শব্দের অর্থ- শান্তি বা প্রশান্তি। দার আস-সালাম শব্দের অর্থ শান্তির ঘর বা শান্তি নিকেতন। আল্লাহ বলেন, লাহুম দারুস সালাম ইনদা রাব্বিহিম ওয়া হুয়া ওলিয়্যুহুম বিমা কানু ইয়ামালুন অর্থাৎ- তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে তাদের জন্য শান্তির আবাস। আর তাদের কৃতকর্মের ব্যাপারে তিনিই তাদের অভিভাবক। ০৬:১২৭; অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ওয়াল্লাহু ইয়াদউ ইলা দারিস সালাম ওয়া ইয়াহদি মাই ইয়াশাউ ইলা সিরাতিম মুস্তাকিম অর্থাৎ- আর আল্লাহ আহ্বান করেন চিরসুখের শান্তির আবাসের দিকে। আর যাকে ইচ্ছা সঠিক পথের দিশা দিয়ে থাকেন। ১০:২৫; আল-কুরআনে সালাম শব্দটি ৪২ বার এসেছে।

সাধারণ সমাজে আমজনতার মাঝে এই আটটি স্তর বহুল প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ। তবে আল-কুরআনের ভাষ্যে আরো জান্নাতের স্তর বা বিশেষ বৈশিষ্ট্য জানা যায়। যেমন আল্লাহ বলেন, ফাহুয়া ফি ইশাতির রাদিয়া ফি জান্নাতিন আলিয়াতিন অর্থাৎ- সুতরাং সে সন্তুষ্টির জীবন স্থাপন করবে সুউচ্চ জান্নাতে। ৬৯:২১-২২; অন্যত্র আল্লাহ বলেন, উজুহুই ওয়াওমায়িজিন্নায়িমাহ, লি সা’য়িহি রাদিয়াহ, ফি জান্নাতিন আলিয়াতিন অর্থাৎ- আর অনেক চেহারা সেদিন হবে আনন্দোজ্জ্বল। স্বীয় প্রচেষ্টায় পরিতৃপ্ত। তাদের অবস্থান হবে সুউচ্চ জান্নাতে। ৮৮:৮-১০; এভাবে অন্বেষণ ও গভীর অধ্যয়নে হয়তো আরো জান্নাতের সন্ধান মিলবে। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।
তবে জান্নাতের ফটক বা দরজা সম্পর্কে হাদীসের বক্তব্য আরো চমৎকার। হাদীসের ভাষ্যে এসেছে- জান্নাতের আটটি ফটক রয়েছে। তন্মধ্যে একটি হলো- রাইয়ান। ঐ ফটক দিয়ে রোজাদার ব্যতীত কেউ প্রবেশ করবে না। রোজাদারগণ সবাই প্রবেশ করলে দরজা বন্ধ করে দেয়া হবে। তখন আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। অপর ফটক হলো- সাদকাকারী, বেশি বেশি সালাত আদায়কারী এবং আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের ফটক। এই ফটক দিয়ে সালাতের সংরক্ষক আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয়কারী, আল্লাহর পথে জিহাদকারীরাই প্রবেশ করবে। রাসূল সা. বলেন- যে আল্লাহর রাস্তায় বারবার ব্যয় করে তাকে জান্নাতের ফটকসমূহ থেকে আহ্বান করা হবে। আর জান্নাতের রয়েছে আটটি ফটক। কাজেই যারা সালাতি তাদেরকে বাবুস সালাত থেকে আহ্বান করা হবে। আর যারা অর্থ ব্যয়কারী তাদেরকে বাবুস সাদাকাহ থেকে আহ্বান করা হবে। আর যারা জিহাদকারী তাদেরকে বাবুল জিহাদ থেকে আহ্বান করা হবে। আর যারা রোজাদার তাদেরকে বাবুস সিয়াম থেকে আহ্বান করা হবে। এ কথা শুনে আবু বকর বলেন- আল্লাহর কসম! কাউকে যেকোনো এক ফটক থেকে ডাকলেই তো কোনো ক্ষতি নেই। এমন কেউ কি থাকবে যাকে সকল ফটক থেকে ডাক দেয়া হবে? জবাবে রাসূল সা. বলেন- হ্যাঁ! আমি আশা করি তুমিও তাদের একজন হবে। এরপর বাবুত তাওবাহ বা তাওবার ফটক। আল্লাহর কাছে যারা তাওবা করেছে এবং ক্ষমা প্রাপ্ত হয়েছে তারাই কেবল এই ফটক দিয়ে প্রবেশ করবে। এরপর বাবু দ্বোহা বা দোহা ফটক। যারা পুর্বাহ্নের সালাত আদায় করে তাদের জন্য এই ফটক বিশেষভাবে উন্মুক্ত থাকবে। এরপর বাবুচ্ছিলাহ বা সম্পর্ক রক্ষাকারী ফটক যারা আত্মীয়তার সম্পর্কে রক্ষা করে চলে তাদের জন্য বিশেষায়িত থাকবে এই ফটক। এরপর বাবুল জিহাদ বা জিহাদের ফটক। আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীদের জন্য অবারিত থাকবে জান্নাতের এই ফটক। এরপর বাবুল হজ ওয়াল উমরা বা হজ ও উমরার ফটক। হজ ও উমরা সম্পন্নকারীদের জন্য বিশেষায়িত থাকবে এই ফটক। এরপর বাবুস সাদাকাহ- বা সাদাকার ফটক। যারা আল্লাহর পথে বারবার অর্থ ব্যয়ে সদা তৎপর থাকত তাদের জন্য নির্ধারিত এই ফটক।
প্রকৃতপক্ষে জান্নাত সমগ্র মুসলিম মিল্লাতের চূড়ান্ত প্রত্যাশা। আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলমানদের প্রতি তার মহান পুরস্কার। যারা আল্লাহর আদেশের অনুবর্তী থেকেছে। তৎপ্রতি বিন¤্র থেকেছে, পার্থিব বিপদ-ঝঞ্ঝায় ধৈর্য ধারণ করেছে তাদের উত্তরাধিকার এই জান্নাত এবং তার অনন্য নিয়ামতরাশি। জান্নাতের কতিপয় বিশেষায়িত নেজাম বা ব্যবস্থাপনা রয়েছে। আমরা এমন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোকপাত করতে প্রয়াসী হবো।

জান্নাতের ব্যাপ্তি
জান্নাতের জীবন বা তার অবস্থানকাল হবে অনন্ত। এ জীবন শুরু হওয়ার পর আর কখনও শেষ হবে না। জান্নাতের নিয়ামতরাজি কোনোদিন ফুরিয়ে যাবে না। অফুরন্ত অনুগ্রহ অনুকম্পা। জান্নাতে সদা সর্বত্র বিদ্যমান থাকবে। আল্লাহ বলেন, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত যার তলদেশে নদী-নালা প্রবাহিত। তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। ০৬:১১৯; অন্যত্র আল্লাহ বলেন, আর যারা ভাগ্যবান তারা যাবে জান্নাতে, সেখানে তারা স্থায়ী হবে যতদিন আকাশ ও পৃথিবী বিদ্যমান থাকবে। তবে তোমার রবের বিধানে অন্য কিছু থাকলে আলাদা কথা। প্রকৃতই এটি নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার। ১১:১০৮; এমনিভাবে অসংখ্য আয়াতের উল্লেখ করা যাবে যেখানে জান্নাত ও তার নিয়ামতরাজি চিরন্তন, চিরশাশ্বত ঘোষণা দেয়া হয়েছে। [চলবে]
লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply