জামালুদ্দিন আফগানি আধুনিক ইসলামী আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা -আহমেদ আফগানী

মুসলিম উম্মাহকে ইসলামী আদর্শের মূলধারায় পরিচালিত করার উদ্দেশ্যে নবুওয়তের আলোকে খিলাফতব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে যুগে যুগে মুসলিমসমাজে বিভিন্ন সংস্কার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে। ইসলামের আলোকে যুগের চাহিদা পূরণের জন্য গবেষণা বা ইজতেহাদ পরিচালনা, সংস্কারের পরিকল্পনা প্রণয়ন, ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী বিপ্লব সৃষ্টির লক্ষ্যে চিন্তার পরিশুদ্ধি, কর্মে দক্ষতা, ইসলামী নেতৃত্বদানের উপযোগী লোক তৈরি, ইসলামকে আদর্শ হিসেবে মেনে নিজ জীবনে ও সমাজে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী জনগোষ্ঠী তৈরি ছিল এসব আন্দোলনের লক্ষ্য। এসব আন্দোলনে যুগে যুগে নিজেদের জীবন ব্যয় করেছেন ইমাম জাফর সাদিক, ইমাম আবু হানিফা থেকে শুরু করে ইমাম হাসান আল বান্না, উস্তাদ মওদুদীসহ অনেকে। তাদেরই একজন হচ্ছেন সাইয়্যেদ জামালুদ্দিন আফগানি।
মুসলিম শাসন মানেই ইসলামের বিজয় নয় বরং দুনিয়ার মানুষদের ইসলামের আলোয় অবগাহন করতে পারা, ইসলামের সুমহান আদর্শের প্রতি আগ্রহী করে তোলা, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডল ইসলামের শিক্ষার আলোকে পরিচালনা করার মাধ্যমে ইসলামের সামগ্রিক বিজয়ের ধারণা নিয়ে কাজ করেছেন সাইয়্যেদ জামালুদ্দিন আফগানি। যুবসম্প্রদায়ের তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ইসলামকে সর্বব্যাপী বিজয়ী করার লক্ষ্যে একটি সর্বাত্মক ইসলামী আন্দোলনের ধারণা এবং খিলাফতের আলোকে সমাজ পরিচালনা করার যোগ্যতাসম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরি করার যে পদ্ধতি আল্লাহর রাসূল দেখিয়ে দিয়েছেন সেই সুন্নাতকে পৃথিবীতে পুনরায় উজ্জীবিত করেছেন তিনি।
পাশ্চাত্যদের সামরিক ও আর্থিক শক্তি এবং সার্বিক প্রভাব ব্রিটিশ শাসিত হিন্দুস্তান এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ওপর সর্বগ্রাসী আকারে আপতিত। মুসলিমরা শুধু শোষিতই হচ্ছিল না বরং তাদের ওপর পাশ্চাত্য শিক্ষা, সংস্কৃতি, আদর্শ ও চিন্তাধারার প্রভাব এতটাই বিস্তৃত ছিল যে, ইসলামী আদর্শ ধরে রাখা বা বজায় রাখা দুষ্কর। জড়বাদী ও নাস্তিক্যবাদী মতবাদ এবং এর প্রভাব ইসলাম ও মুসলিম দেশগুলোর জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে ডারউইনের মতবাদ ধর্মীয় বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ধ্বংস ও চরিত্র হননের কারণ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়। এই দুঃসময়ে জামালুদ্দিন আফগানি তার বক্তব্য ও লেখনীর দ্বারা মুসলিমদের পুনর্জাগরণের প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন। তার কর্মক্ষেত্র ছিল আফগানিস্তান, ভারত, ইরান, মিসর, তুরস্ক, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্স।
জামালুদ্দিন আফগানি হিজরি ১২৫৪ (১৮৩৯ খ্রি:) সালের শাবান মাসে আফগানিস্তানের কাবুলের কাছাকাছি আসাদাবাদে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ সাইয়্যেদ আলী তিরমিজি দশম হিজরি শতাব্দীতে আফগানিস্তানে আসেন এবং বসবাস শুরু করেন। আলী তিরমিজি আফগানিস্তানে ইসলাম প্রচার শিক্ষা বিস্তারের কাজ করেন। জামালুদ্দিন আফগানির পিতা সাইয়্যেদ সফদার বিজ্ঞ আলেম এবং প্রভাবশালী ব্যক্তি ছিলেন। আফগানি তাঁর পিতার কাছ থেকেই হাদিস, তাফসির, ফিকাহ, উসুল, আরবিসাহিত্য সম্পর্কে ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। এছাড়াও সমসাময়িক বিজ্ঞ আলেমদের থেকে জ্যোতির্বিজ্ঞান, গণিত, অ্যানাটমি, দর্শন, ইতিহাস বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন।
আঠারো বছর বয়সে আফগানি উচ্চতর শিক্ষার জন্য হিন্দুস্তানে আসেন। তিনি দিল্লি আজমিরের তৎকালীন শিক্ষাকেন্দ্রে ইংরেজি সাহিত্য, তর্কশাস্ত্র, গণিত, ইতিহাসের ওপর গবেষণা ও অধ্যয়ন করেন। এই সময়ে হিন্দুস্তানের মুসলিমগণ ইংরেজ রাজত্ব অবসান ঘটিয়ে মুসলিম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সিপাহি বিপ্লবের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছিল। ইংরেজ কবলিত হিন্দুস্তানকে ১৮০৩ সালে শাহ আবদুল আজিজ ‘দারুল হরব’ ঘোষণার পর একের পর এক লড়াই চলছিল স্বাধীনতার জন্য। বালাকোটে ১৮৩১ সালে সাইয়্যেদ আহমদ বেরলভির শাহদাত, বাংলায় মীর নিসার আলী তিতুমীরের শাহাদাত, ১৮৩৯ সালে বাংলায় হাজী শরিয়তুল্লাহর ইন্তেকালের পরও তাদের উত্তরসূরিরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আফগানি শিক্ষার্থী থাকাকালে এসব আন্দোলন সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন এবং আন্দোলনের দীক্ষা নেন।
বিদেশী শাসনে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতনের শিকার হিন্দুস্তানি মুসলিমদের মুক্তি সংগ্রামের অভিজ্ঞতা বুকে নিয়ে আফগানি ১২৭৩ হিজরিতে (১৮৫৬ সালে) হজ আদায় করতে মক্কায় যান। মক্কায় তিনি বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের জীবনাচার ও রীতিনীতি সম্পর্কে ধারণা লাভ করেন। হজে আগত মুসলিমদের সাথে আলাপকালে তিনি নানান দেশের মুসলিমদের অবস্থা ও তাদের সমস্যা সম্ভাবনার কথা জানতে পারেন। তিনি তখন উপলব্ধি করেন মুসলিমগণ পশ্চিমা শক্তির দ্বারা সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সারা পৃথিবীতে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মুসলিমরা বিতাড়িত হয়ে এশিয়ায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন। মুসলিমরা সংস্কৃতির আগ্রাসনের শিকার হয়ে ভুলে যাচ্ছে তাদের কৃষ্টি কালচার। আফগানি এসব সমস্যা দেখে তার চিন্তা, গবেষণা, প্রজ্ঞা, লেখনী ও বক্তব্য দিয়ে মুসলিম বিশ্বের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসেন।
ইসলামী আদর্শের ভিত্তিতে ঐক্য প্রচেষ্টা
মুসলিম বিশ্বের দুর্দশা ও ক্রমান্বয়ে শক্তি ক্ষয়ের পেছনে আফগানি যে বিষয়টাকে চিহ্নিত করেন তা হলো আদর্শের সঠিক জ্ঞান না থাকা এবং মুসলিমদের মধ্যে ব্যাপক অনৈক্য। জামালুদ্দিন আফগানি মুসলিম বিশ্বের শিক্ষিত শ্রেণীকে ইসলামী আদর্শে উদ্বুদ্ধ করা এবং মুসলিম বিশ্বের মধ্যে অনৈক্য কমানোর জন্য সংগ্রাম করেছিলেন অক্লান্তভাবে। তাঁর চিন্তাধারার আলোকে তিনি যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তার বক্তব্য, লেখনী এবং দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যান। মুসলিম যুবসমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ তার বক্তব্যে তাদের কাজ সম্পর্কে অবগত এবং ইসলামের আলোকে জীবন ও সমাজ পরিচালনার জন্য উজ্জীবিত হয়। তাদের মাঝে ইসলামী চেতনা, স্বদেশপ্রেম ও স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগ্রত হয়।
আফগানি আরো উপলব্ধি করেন ইসলামী ব্যবস্থাপনার সমন্বিত ও সামগ্রিক চিন্তার ক্ষেত্রে অবক্ষয়ের কারণে মুসলিম উম্মাহর মাঝে ফিতনার উদ্ভব হয়েছে। ইসলামী রাষ্ট্র ছোট ছোট রাষ্ট্রে ভাগ হয়ে যাওয়ার জন্য দায়ী সঙ্কীর্ণ জাতীয়তাবাদ, আঞ্চলিকতা, আলেমদের ছোট ছোট বিষয়ে বাহাস ইত্যাদি। উম্মাহর সদস্যদের চিন্তার অনৈক্যই মূলত প্রধান কারণ। আফগানি ইসলামী আইনের যুগোপযোগী ব্যাখ্যার জন্য ইজতিহাদ এবং মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাসমূহের পুনর্গঠন এবং আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে ইসলামের সমন্বয় বিধানের চেষ্টা চালান।
ওয়াহদাত আল ইসলামিয়্যাহ বা প্যান ইসলাম আন্দোলন
মুসলিম বিশ্বের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূর করার জন্য তিনি যেমন সচেষ্ট ছিলেন তেমনি পাশ্চাত্য শক্তির প্রভাববলয় থেকে মুসলিম বিশ্বকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি চিন্তা ও কর্ম উভয় ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের জাগরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আফগানি তার বক্তব্য এবং লেখনীতে সমসাময়িক মুসলিম শাসক, আলেম, সচেতন সমাজ এবং সাধারণ জনসমাজকে তিনি ইসলামের মূল আদর্শে প্রত্যাবর্তন করার আহ্বান জানান। তাদের কাছে তিনি নবুওয়তের আলোকে খিলাফত ব্যবস্থা কায়েমের গুরুত্ব তুলে ধরেন। এজন্য তিনি যে আন্দোলন গড়ে তুলেন সেই আন্দোলনের নাম ওয়াহদাত আল ইসলামিয়্যাহ।
এই আন্দোলনের প্রাথমিক কথা ছিল সকল মুসলিম রাষ্ট্র নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যজোট গঠন করবে, নিজেদের মধ্যে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গঠন করব এবং তারা একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না। মুসলিম জাতি-গোষ্ঠী এবং শাসকদের লক্ষ্য করে আফগানি বলেন, আমি আশা করি কুরআন হবে তাঁদের পথপ্রদর্শক, ইসলাম হবে তাঁদের একতার ভিত্তি এবং প্রত্যেক শাসক তাঁর প্রতিবেশীকে রক্ষার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।
ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম
শুধু যুবকদের সংগ্রামে নামার জন্য আহ্বান বা শুধুমাত্র যুবকদের তাদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন করলেই বিপ্লবের ভিত্তি মজবুত হয় না। আফগানির মৌলিক কাজ ছিল তিনি যুবসমাজের মধ্যে এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন রাজনৈতিক সংগ্রাম মুসলিমদের বাধ্যতামূলক ধর্মীয় দায়িত্ব। এটাই একমাত্র পথ আল্লাহর রাসূলকে সঠিকভাবে অনুসরণ করার। তিনি জনগণকে সবসময় বলতেন আমাদের উচিত যতক্ষণ আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জিত না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত সংগ্রাম অব্যাহত রাখা।
মুসলিমরা মনে করতেন ধর্ম আর রাজনীতি আলাদা বিষয়। তারা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, জিকির আর রোজা পালনের মাধ্যমে তাদের ধর্মীয় দায়িত্ব শেষ করতেন। মুসলিম যুবসমাজের মধ্যে ধর্ম ও রাজনৈতিক সচেতনতা বুঝিয়ে দেবার সাথে সাথে সমগ্র মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে নেয়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করানো ছিল জামালুদ্দিন আফগানির অন্যতম সংগ্রাম। তিনি তার সমকালীন স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন এবং তাদের বিরুদ্ধে তার সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছিলেন।
ইসলামের সঠিক শিক্ষার দিকে আহ্বান
ইসলামের সুদীর্ঘ পথচলায়, নানা দেশের মানুষের কালচারের সাথে মিশ্রণ ঘটে বহু অর্থহীন অনুষ্ঠান ও বিদয়াতের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। আফগানি এই সমস্ত বিদয়াত ও শিরকি কাজের মূলোৎপাটনের জন্য কাজ করেছেন। জামালুদ্দিন আফগানি মনে করতেন প্রকৃত ইসলামে ফিরে আসা মানে আল কুরআন, সহিহ হাদিসের শিক্ষাকে গ্রহণ করা। যদিও এই শুদ্ধি অভিযান সহজসাধ্য ছিল না তবুও জামালুদ্দিন আফগানি তার আদর্শ ও কাজ থেকে বিচ্যুত হননি। এতে করে তিনি এক শ্রেণীর মুসলিম ও শাসকদের কোপানলে পড়েন। তারপরও তিনি তার ক্ষুরধার বক্তব্য, লেখনী ও দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে মুসলিমদের সঠিক শিক্ষার দিকে ফিরে আসার আহবান জানান।
তার আকিদা বিশ্বাস নিয়ে কোন বিতর্কের অবকাশ তিনি রাখেননি। এই বিষয়ে তিনি ছিলেন বিতর্কের ঊর্ধ্বে। যে ব্যক্তি কায়রো, কাবুল, ইস্তাম্বুল, দিল্লি সর্বত্র ইসলামের দায়ী হতে পারেন, পৌঁছতে পারেন শিয়া মতে বিশ্বাসীদের উচ্চ দরবারে আবার অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র বানাতে পারেন সুন্নিদের খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদসহ অন্যান্য সুন্নি নেতাদের দরবারে তাকে শিয়া বা সুন্নি গণ্ডির মধ্যে আটকানো যায় না। তিনি শিয়া-সুন্নি বিরোধ মেটাতে ছিলেন আন্তরিক। একক খিলাফতের যে ধারণা নিয়ে তিনি আদর্শ প্রচার করতেন তা সুন্নি ধারাকে সমর্থন করে। আবার তিনি ইমামতকে অস্বীকার করেছেন এমন প্রমাণ মিলে না। তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। তিনি কালেমার সূত্রকেই ঐক্যের ভিত ভেবেছেন। তাওহিদ এবং রাসূল সা-এর আদর্শই ছিল তার সকল প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দু। সেখানে ধারা বিভক্তি, মাজহাব অত্যন্ত গৌণ।
জামালুদ্দিন কথিত সাধুপুরুষ ছিলেন না, ছিলেন না রাজনৈতিক নেতাও, তিনি ছিলেন একজন প্রজ্ঞাবান সংগঠক। যিনি কাজ করেছেন আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে, স্বাধীনতাকামী মানুষ তৈরিতে, ইসলামে মূল শিক্ষা মুসলিমদের মধ্যে প্রসার ঘটাতে, অমুসলিমদের ইসলামের দাওয়াত দিতে, সর্বোপরি মুসলিমদের মধ্যে পুনর্জাগরণ ঘটাতে।
তিনি মূলত পাঁচটি বিষয়কে লালন করতেন
১. ইসলামের রসম রেওয়াজের ঊর্ধ্বে যে প্রাণশক্তি সেটাই তার কাছে অধিকতর মূল্যবান। অন্যকথায় বলতে গেলে প্রতিটি রসম রেওয়াজের উদ্দেশ্যকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন।
২. মুসলিম সমাজে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া ছিল চরম অন্যায় এবং আলেমগণ এই রাজতন্ত্রকে সমর্থন করা ছিল মহা ভুল এবং এর কারণের মুসলিমদের অধঃপতন ঘটছে।
৩. ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বরূপ তুলে ধরতে হবে জাতির সামনে। না হলে ইউরোপীয় ও জড়বাদী আগ্রাসন ঠেকানো যাবে না। আর পরাধীনতার গ্লানি নিয়ে কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না।
৪. মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সমস্যা অভিন্ন এবং সমাধানও অভিন্ন বলেই তিনি মনে করতেন।
৫. মুসলিমদের মধ্যে চালু হওয়া কুসংস্কার, বিকৃতি তাকে আহত করতো। তিনি মনে করতেন এর সংস্কার না হলে বর্তমান মুসলিমদের মহানবী সা:-এর উম্মত বলা যাবে না।
তিনি তাঁর বিশ্বাস নিয়ে কাজ করতেন। এক জায়গায় ব্যর্থ হলে অন্য জায়গায় গিয়ে আবার দাওয়াত দেয়া শুরু করতেন। এভাবে তিনি সারা পৃথিবীতে তার অনুসারী সৃষ্টি করেছেন। যার ভাবাদর্শে এখনো পরিচালিত হচ্ছে বিশ্বব্যাপী ইসলামী আন্দোলন।
উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
আফগানি বলতে চেয়েছেন উপনিবেশবাদের মূলকথা হচ্ছে মুসলিম দেশগুলোর ওপর বিদেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক আধিপত্য যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশীদের হস্তক্ষেপ ডেকে আনছে। অর্থনৈতিক আধিপত্য যা নিষ্ঠুরভাবে মুসলিম দেশের সম্পদের উৎসগুলো পাশ্চাত্য অমুসলিম শক্তির হাতে তুলে দিচ্ছে। আর সবশেষে সাংস্কৃতিক আধিপত্য ইসলামী তমুদ্দুনের বিলুপ্তি ঘটাচ্ছে এবং মুসলিম যুবকদের তাদের সংস্কৃতির ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত করে তুলছে।
সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এতটাই হয়েছে যে কোন কোন মুসলিম বুদ্ধিজীবী বা পণ্ডিত ব্যাক্তি এমন ভাবতে শুরু করেছিলেন যে, প্রাচ্যবাসী যদি সভ্য হতে চায় তবে অবশ্যই ইউরোপীয়দের অনুকরণ করতে হবে। তাদের সাথে তাল মেলাতে হবে। তাদের ভাষা, লেখা, পোশাক, আচার ব্যবহার, সাহিত্য, বিশ্বাস, দর্শন, শিল্প, চরিত্র ইত্যাদি সবকিছুর সমাবেশ তার মধ্যে থাকতে হবে।
এসব আক্রমণ মোকাবিলার জন্য জামালুদ্দিন ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে ঐক্য এবং অভ্যন্তরীণ স্বৈরাচার ও বিদেশী আধিপত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করাটা জরুরি মনে করেছেন। তিনি স্বৈরাচার ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে মুসলিমদের ধর্মীয় চেতনা জাগানোর জোর প্রচেষ্টা চালান। আর এই কাজটাই তার সমগ্র সংস্কার কর্মসূচির মধ্যে অধিকতর গুরুত্ব পেয়েছিল।
খিলাফতের আদর্শে প্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থা
জামালুদ্দিন আফগানি রাজতন্ত্র বা গণতন্ত্রের পরিবর্তে ইসলামের সামাজিক ন্যায়বিচারভিত্তিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের কথা বলেছেন। তিনি উসমানীয় সুলতান আবদুল হামিদকে মুসলিমদের ঐক্যের প্রতীকরূপে কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। খিলাফতপ্রক্রিয়া চালু রাখার পাশাপাশি এর মর্যাদা, দায়িত্ব-কর্তব্য, সঠিক ভূমিকার ব্যাপারে সচেতন এবং ভুলভাবে সৃষ্ট ত্রুটি-বিচ্যুতি, অনৈসলামিক প্রথার সংস্কার চেয়েছিলেন।
তিনি সুলতান আবদুল হামিদকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে খিলাফতের আদর্শে দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠার আহবান জানান। মিসরের রাজতান্ত্রিক শাসক তাওফিক পাশাকেও তিনি মজলিশে শূরার মাধ্যমে জনগণকে সরকারে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে আহবান জানিয়েছেন। এ উদ্দেশ্যে একটি জাতীয় প্রতিনিধি পরিষদ নির্বাচন করে তার মাধ্যমে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং শাসনব্যবস্থায় জনগণের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য আহবান জানান।
মুসলিম দেশসমূহ এবং মুসলমানদের অধঃপতনের জন্য তিনি তিনটি সমস্যা চিহ্নিত করেন।
প্রথমত, অনৈক্য- বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু অনৈক্যের কারণে তারা দ্বিধাবিভক্ত ও শক্তিহীন। তারা যাতে ঐক্যবদ্ধ না হতে পারে সেজন্য সাম্রাজ্যবাদের দোসররা মুসলিমদের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ, সংশয়, দ্বন্দ্বের প্রাচীর তৈরি করেছে।
দ্বিতীয়ত, সাম্রাজ্যবাদ- পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ, বৈদেশিক শাসন ও প্রভাবকে তিনি মুসলিম সমাজের দুরবস্থার জন্য দায়ী করেন। এদের বিরুদ্ধে সচেতন করা এবং ঐক্য গড়ার কাজ তিনি সারা জীবনব্যাপী করেছেন।
তৃতীয়ত, অশিক্ষা-কুশিক্ষা- মুসলিম সমাজে সঠিক শিক্ষার অভাব এবং কুসংস্কারের বিস্তারের কারণে তারা স্বধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়ে। পাশ্চাত্যদের বর্বর ও পরিবার ধ্বংসকারী সংস্কৃতি তাদের কাছে হয়ে ওঠে চকচকে।
আফগানি বলেছেন, ‘এ কথা বলছি না, সমগ্র মুসলিম দেশের ওপর কোন একক ব্যক্তির আধিপত্য মেনে নেয়া হোক। এমন প্রস্তাব দুঃসাধ্য মনে করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে আমি অবশ্যই চাই যে, এদের সবার ওপর কুরআনি আহকামের আধিপত্য থাকুক এবং সবাই ইসলামকে নিজের ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে পরিণত করুক।’ তিনি আরো বলেছেন, ঐক্য ও নেতৃত্ব ইসলামী সুউচ্চ প্রাসাদের দুটি প্রধান স্তম্ভ। এগুলোকে অটুট রাখার জন্য চেষ্টা করা ইসলামের সাথে সম্পর্কিত প্রতিটি ব্যক্তির ওপর ফরজ। ইসলামী খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে জোর দিয়ে তিনি বলেন, বেশির ভাগ দ্বীনি হুকুম জারি করা একটা সুসংগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল।
তৎকালীন আলেমদের কাছে আহ্বান
জামালুদ্দিন আফগানি মুসলিমদের মধ্যে ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণী তথা আলেমসমাজের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা, বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ এবং যথাযথ নেতৃত্ব দানের জন্য আহবান জানান। সামাজিক সমস্যাসমূহের যুগোপযোগী সমাধানে আলেমদের ব্যর্থতার জন্য তাদের কঠোর সমালোচনা করেন। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে ও বস্তুগত দিক দিয়ে মুসলিমদের পিছিয়ে পড়ার জন্য তিনি প্রধানত আলেমসমাজকে দায়ী করেন।
তৎকালীন আলেমদের ব্যাপারে তিনি বলেন,
“তাদের দেখলে মনে হয়, পার্থিব বিষয়গুলো সমাধান না করতে পেরে তাঁরা যেন গর্ববোধ করেন। … বাস্তবিক পক্ষে একজন সত্যিকার বিজ্ঞ ব্যক্তি হলেন আলোর মত, যিনি পৃথিবীকে আলোকিত করবেন। তা যদি না পারেন অন্তত নিজ দেশ, শহর, গ্রাম, অন্তত নিজের বাড়িটাকে আলোকিত করুন।”
তিনি আরো বলেন, “আমাদের বর্তমানকালে আলেমদের সবচেয়ে অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য হলো, তাঁরা জ্ঞানকে দু’ভাগে ভাগ করেন। একটিকে তাঁরা বলেন ইসলামী জ্ঞান। অন্যটিকে বলেন ইউরোপীয় জ্ঞান। এ কারণে তাঁরা অন্যদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় জ্ঞান আহরণ করতে জনগণকে নিরুৎসাহিত করেন। … তাঁরা ইসলাম রক্ষার নামে আধুনিক জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টির মাধ্যমে বস্তুত ইসলামের সাথেই শত্রুতা করেন। অথচ ইসলাম হচ্ছে জ্ঞান ও শিক্ষার সবচেয়ে সহায়ক আদর্শ। জ্ঞান ও ইসলামের মূল বিষয়গুলোর মধ্যে এক ধরনের পার্থক্য সৃষ্টির কোনো অবকাশ নেই।”
জামালুদ্দিন আফগানি আধুনিক যুগ-জিজ্ঞাসা, সমস্যা সমাধানে ও যুগের চাহিদা পূরণে আল কুরআনের কালজয়ী শিক্ষা ও আদর্শকে ব্যাখ্যা করার জন্য আলেমদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানান।
মুসলিমদের মুক্তির নিশানবাহী এ অগ্রপথিক উত্তাল পৃথিবীর কোথাও দুদন্ড অবসর নেয়ার মত সময় বা সুযোগ কোনটাই পাননি। বিত্ত ও প্রতিপত্তির নগ্ন ইশারাকে পায়ে ঠেলে আজীবন স্বৈরাচার ও সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে কথা বলে গিয়েছেন। সারাজীবন পৃথিবীর সব প্রান্তে নির্যাতিত মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। অনৈক্য, কুসংস্কার এবং বিদায়াতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে সামনে থেকে মৃত্যুবরণ করেন। তামাম পৃথিবীর মুসলিম উম্মাহর জন্য রেখে গিয়েছেন সাহস ও ত্যাগের দৃষ্টান্ত, মুক্তির দিশা আর একটি বিপ্লবী ইসলামী আন্দোলনের রূপরেখা। হ
লেখক : ব্লগার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

SHARE

Leave a Reply