জিলহজ আমলের অবারিত সুযোগের মাস -মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ : “مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيْهَا أَحَبُّ إِلَى اللهِ عَزَّ وَجَلَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ- يَعْنِىْ أَيَّامَ الْعَشْرِ-“. قَالَ : قَالُوْا : يَا رَسُوْلَ اللهِ، وَلا الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ؟ قَالَ : “وَلا الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللهِ، إِلا رَجُلًا خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ، ثُمَّ لَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذٰلِكَ بِشَيْءٍ”.
ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ সা. ইরশাদ করেছেন : জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন নেক আমল করার ন্যায় অন্য কোনো দিনের আমল মহান আল্লাহর কাছে এত প্রিয় নয়। সাহাবীগণ প্রশ্ন করেন, হে মহান আল্লাহর রাসূল সা. মহান আল্লাহর পথে জিহাদও কি এ দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে মহান আল্লাহর নিকট বেশি প্রিয় নয়? তিনি বলেন, মহান আল্লাহর পথে জিহাদও বেশি প্রিয় নয়; তবে ঐ ব্যক্তি ছাড়া, যে ব্যক্তি নিজের জীবন ও সম্পদ নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে গেল এবং তা হতে কোনো কিছুই আর ফিরে এলো না। (বুখারী-৯৬৯; মুসনাদে আহমাদ-৩১৩৯)

রাবি পরিচিতি
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. নবী কারিম সা.-এর চাচাতো ভাই। নবী কারিম সা.-এর প্রিয়জন, বাল্যবন্ধু আপন চাচা হজরত আব্বাস রা.-এর সন্তান। তার মাতা লুবাবা বিনতে হারিস। তার বোন উম্মুল মুমেনিন হজরত মায়মুনা রা.। হিজরতের তিন বছর আগেই তিনি জন্মলাভ করেন। নবী কারিম সা. যখন ওফাতবরণ করেন তখন তিনি তেরো বছরের বালক। মহানবী সা. তাঁর জন্য দোয়া করেছিলেন :
اَللّٰهُمَّ فَقِّمْهُ فِىْ الدِّيْنِ وَعَلِّمْهُ التَّأ وِيْلَ.
“হে আল্লাহ! তুমি তাঁকে দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে বিশেষ বুঝ দাও এবং তাকে নিগূঢ় বিশ্লেষণ শিক্ষা দাও।”
(আল ইসাবা ফি তাময়িযিস সাহাবা- ২য় খ-, ৩২৩ পৃ:)
হযরত আলী রা. এর শাসনামলে তিনি বসরার গভর্নর নিযুক্ত হয়েছিলেন। ৩৭ ও ৩৮ হিজরিতে সংঘটিত যথাক্রমে জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনে সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সিফফিনের যুদ্ধ বন্ধের চুক্তিতে তিনি স্বাক্ষর করেছিলেন।
সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারী ছয়জন সাহাবীর অন্যতম হলেন হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা.। তিনি ১৬৬০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। বুখারী ও মুসলিম যৌথভাবে ৯৫টি, এককভাবে বুখারীতে ১২০টি এবং মুসলিমে ৪৯টি হাদীস উল্লেখ রয়েছে।
তিনি ৬৮ হিজরিতে ৭১ বছর বয়সে ইবনে যোবায়েরের শাসনামলে তায়েফে ইন্তেকাল করেন। মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া তাঁর জানাযার নামাযে ইমামতি করেন।

হাদীসের ব্যাখ্যা
“مَا مِنْ أَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيْهَاأَحَبُّ إِلَى اللهِ عَزَّوَجَلَّ مِنْ هَذِهِ الْأَيَّامِ – يَعْنِىْ أَيَّامَ الْعَشْرِ -“.
“জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন নেক আমল করার চেয়ে অন্যকোন দিনের আমল মহান আল্লাহর কাছে এত প্রিয় নয়।”
আল্লাহ তায়ালার কাছে আমলে সালিহ করার জিলহজ মাসের প্রথম দশটি দিন সর্বাধিক প্রিয়। যদিও এ বিষয়ে আমরা সম্যক অবগত ও ওয়াকিফহাল নই। বিধায় আমরা অন্যান্য সময়ের মতই এই দিনগুলোকেও অবহেলায় নষ্ট করে থাকি। আমলে সালিহ সঠিক নিয়মে সঠিক সময়ে করার মধ্য দিয়েই অর্জিত হয়। জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিন আমলে সালিহর জন্য সবচেয়ে মোক্ষম ও গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে আল্লাহ তায়ালার সমুদয় ইবাদত সম্পাদিত হয়। যেমন- সালাত, সিয়াম, যাকাত, হজ, দান-খায়রাত, কুরবানি যিকির-আযকার এবং অন্যান্য সৎ আমলসমূহ। বিধায় এই দশটি দিন আল্লাহ তায়ালার কাছে এত প্রিয়।

জিলহজ মাসের প্রথম দশকে নেক আমলের ফযিলত
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ مَا مِنْ اَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيْهَا اَحَبُّ اِلَى اللّٰهِ مِنْ هَذِهِ الْاَيَّامِ গ্ধ. يَعْنِىْ اَيَّامَ الْعَشْرِ. قَالُوا يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ وَلاَ الْجِهَادُ فِى سَبِيْلِ اللّٰهِ قَالَ وَلاَ الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللّٰهِ اِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَىْءٍ-
ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে নেক আমল করার মতো প্রিয় আল্লাহ্র কাছে আর কোনো আমল নেই।’ তারা (সাহাবীগণ) প্রশ্ন করেছেন হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ করা কি এর চেয়ে প্রিয় নয়? রাসূল সা. বলেছেন, ‘না, আল্লাহ্র পথে জিহাদও নয়। কিন্তু সে ব্যক্তির কথা আলাদা যে তার প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহ্র পথে জিহাদে বের হয়ে যায় এরপর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই ফিরে আসে না।’ (আবু দাউদ-২৪৪০)

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনে যেসব নেক আমল করা যেতে পারে-

১. আল্লাহ তায়ালার যিকির করা : এ দিনসমূহে অন্যান্য আমলের মাঝে যিকিরের এক বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, যেমন হাদীসে উল্লেখ করা হয়েছে-
عَنْ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِىِّ ﷺ قَالَ مَا مِنْ اَيَّامٍ اَعْظَمُ عِنْدَ اللّٰهِ وَلَا اَحَبُّ اِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيْهِنَّ مِنْ هَذِهِ الْاَيَّامِ الْعَشْرِ فَاَكْثِرُوْا فِيْهِنَّ مِنَ التَّهْلِيْلِ وَالتَّكْبِيْرِ وَالتَّحْمِيْدِ-
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, নবী করিম সা. বলেছেন, এ দশ দিনে (নেক) আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে প্রিয় ও মহান কোনো আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলিল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাকবির (আল্লাহ আকবার) তাহমিদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি করে আদায় কর। (মুসনাদে আহমদ-৬১৫৪)

২. উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করা : এ দিনগুলোতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের মহত্ত্ব ও বড়ত্ব ঘোষণার উদ্দেশ্যে তাকবির, তাহমিদ, তাহলিল ও তাসবিহ পাঠ করা সুন্নাত। এ তাকবির প্রকাশ্যে ও উচ্চস্বরে মসজিদ, বাড়ি-ঘর, রাস্তা-ঘাট, বাজারসহ সর্বস্থানে উচ্চ আওয়াজে পাঠ করা হবে। কিন্তু মহিলারা নিচু-স্বরে পাঠ করবে। আর এ তাকবিরের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত প্রচারিত হবে এবং ঘোষিত হবে তাঁর অনুপম তাযিম।
وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ وَاَبُو هُرَيْرَةَ يَخْرُجَانِ اِلَى السُّوْقِ فِىْ اَيَّامِ الْعَشْرِ يُكَبِّرَانِ وَيُكَبِّرُ النَّاسُ بِتَكْبِيْرِهِمَا-
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ও আবু হুরায়রা রা. জিলহজ মাসের প্রথম দশকে বাজারে যেতেন ও (উচ্চস্বরে) তাকবির পাঠ করতেন, লোকজনও তাঁদের অনুসরণ করে তাকবির পাঠ করতেন।
(বুখারী-৯৬৯)
জিলহজ মাসের প্রথম দশকের দিনগুলোতে পঠনীয় তাকবির হচ্ছে-
اَللهُ اَكْبَرُ اَللهُ اَكْبَرُ لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْبَرُ اَللهُ اَكْبَرُ وَلِلّٰهِ الْحَمْدُ-
এ ছাড়া অন্যান্য রূপেও তাকবির পাঠ করার কথা জানা যায়। কিন্তু আমাদের জানা মতে রাসূল সা. থেকে কোনো সুনির্দিষ্টরূপ তাকবির সহিহভাবে বর্ণিত হয়নি। যা কিছু এ মর্মে বর্ণিত হয়েছে তা সবই সাহাবাগণের আমল। (ইরওয়াউল গালিল ৩/১২৫)
ইমাম সানআনী বলেছেন, তাকবিরের বহু ধরন ও রূপ রয়েছে, বহু ইমামগণও কিছু কিছুকে উত্তম মনে করেছেন। যা থেকে বুঝা যায় যে, এ বিষয়ে প্রশস্ততা আছে। আর আয়াতের সাধারণ বর্ণনা এটাই সমর্থন করে। (সুবুলুস সালাম, ২/১২৫)
জিলহজের ১৩ দিনে দুই ধরনের তাকবির পাঠ সুন্নাহ। একটি হলো সাধারণ তাকবির পাঠ, যা প্রথম জিলহজ থেকে ১৩ জিলহজের সূর্য ডোবা পর্যন্ত যে কোনো সময় পাঠ করা সুন্নাহ। আর একটি হলো মুকায়্যাদ (শর্তযুক্ত) তাকবির পাঠ। আর তা হচ্ছে- প্রত্যেক ফরয নামাযান্তে তাকবির পাঠ। যা আরাফার দিন ফজর নামাযের পর থেকে শুরু হয়ে ১৩ জিলহজের আসর নামায পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। (এটা তাদের জন্য যারা হজ পালনকারী নয়) আর হাজীদের ক্ষেত্রে এই মুকায়্যাদ তাকবির কুরবানির দিন জোহর থেকে শুরু হবে এবং তাশরিকের শেষ দিন আসর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। (মাজমুউ ফাতাওয়া- ২৪/২৫৩, মুলাখ্খাস আল ফিকহী- ১৩২-১৩৩)

৩. সিয়াম পালন করা : জিলহজ মাসের প্রথম নয় দিনে সিয়াম পালন করা মুসলিমের জন্য উত্তম। কারণ, নবী করিম সা. এ দিনগুলোতে নেক আমল করার জন্য সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আর উত্তম সব আমলের মধ্যে সাওম অন্যতম।
প্রিয় নবী সা.ও এ নয় দিনে সিয়াম পালন করতেন। তাঁর পত্নী হাফসা রা.! বলেছেন-
اَرْبَعٌ لَمْ يَكُنْ يَدَعُهُنَّ النَّبِىُّ ﷺ صِيَامَ عَاشُوْرَاءَ وَالْعَشْرَ وَثَلَاثَةَ اَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ وَالرَّكْعَتَيْنِ قَبْلَ الْغَدَاةِ-
নবী সা. কখনো চারটি আমল পরিত্যাগ করেননি। সেগুলো হলো- আশুরার সাওম, জিলহজের দশ দিনের সাওম, প্রত্যেক মাসের তিন দিনের সাওম ও ফজরের ফরজের পূর্বের দু’রাকাত সালাত। (মুসনাদে আহমদ-২৬৪৫৯)

৪. নিয়মিত ফরজ ও ওয়াজিব সমূহ আদায়ে যত্নবান হওয়া : অর্থাৎ ফরজ ও ওয়াজিবসমূহ সময়মতো সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে আদায় করা। যেভাবে আদায় করেছেন প্রিয় নবী সা.। সকল ইবাদতসমূহ তাঁর সুন্নাত, মুস্তাহাব ও আদব সহকারে আদায় করা। এ মর্মে হাদীসে বলা হয়েছে-
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ اِنَّ اللّٰهَ قَالَ مَنْ عَادَى لِىْ وَلِيًّا فَقَدْ اٰذَنْتُهُ بِالْحَرْبِ وَمَا تَقَرَّبَ اِلَىَّ عَبْدِىْ بِشَىْءٍ اَحَبَّ اِلَىَّ مِمَّا افْتَرَضْتُ عَلَيْهِ وَمَا يَزَالُ عَبْدِىْ يَتَقَرَّبُ اِلَىَّ بِالنَّوَافِلِ حَتَّى اُحِبَّهُ فَاِذَا اَحْبَبْتُهُ كُنْتُ سَمْعَهُ الَّذِىْ يَسْمَعُ بِهِ وَبَصَرَهُ الَّذِىْ يُبْصِرُ بِهِ وَيَدَهُ الَّتِىْ يَبْطِشُ بِهَا وَرِجْلَهُ الَّتِىْ يَمْشِىْ بِهَا وَاِنْ سَاَلَنِىْ لَاُعْطِيَنَّهُ وَلَئِنِ اسْتَعَاذَنِىْ لَاُعِيْذَنَّهُ وَمَا تَرَدَّدْتُ عَنْ شَىْءٍ اَنَا فَاعِلُهُ تَرَدُّدِىْ عَنْ نَفْسِ الْمُؤْمِنِ يَكْرَهُ الْمَوْتَ وَاَنَا اَكْرَهُ مَسَاءَتَهُ-
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কোন অলির সাথে শত্রুতা রাখে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার বান্দার ফরয ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় কোনো ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্যলাভ করতে পারে না। আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারাই সর্বদা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয়পাত্রে পরিণত করে নেই যে, আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। সে আমার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার পর আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায় আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দেই। সে যে কোন কাজ করতে চাইলে তাতে কোনো রকম দ্বিধা-সংকোচ করি না, যতটা দ্বিধা-সংকোচ করি মু’মিন বান্দার প্রাণ হরণে। সে মৃত্যুকে অপছন্দ করে অথচ আমি তার বেঁচে থাকাকে অপছন্দ করি।’ (বুখারী-৬৫০২)

৫. খাঁটি মনে তাওবা করা : যেহেতু এ মাসের মর্যাদা অনেক তাই এ মাসে খাঁটি মনে তাওবা করা উচিত কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেছেন-
یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا تُوْبُوْۤا اِلَی اللّٰهِ تَوْبَۃً نَّصُوْحًا ؕ عَسٰی رَبُّکُمْ اَنْ یُّكَفِّرَ عَنْکُمْ سَیِّاٰتِکُمْ وَ یُدْخِلَکُمْ جَنّٰتٍ تَجْرِیْ مِنْ تَحْتِهَا الْاَنْهٰرُ ۙ یَوْمَ لَا یُخْزِی اللّٰهُ النَّبِیَّ وَ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مَعَہٗ ۚ نُوْرُهُمْ یَسْعٰی بَیْنَ اَیْدِیْهِمْ وَ بِاَیْمَانِهِمْ یَقُوْلُوْنَ رَبَّنَاۤ اَتْمِمْ لَنَا نُوْرَنَا وَ اغْفِرْ لَنَا ۚ اِنَّكَ عَلٰی کُلِّ شَیْءٍ قَدِیْرٌ-
হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র কাছে তওবা কর বিশুদ্ধ তওবা; সম্ভবত তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশ নদী প্রবাহিত। সে দিন আল্লাহ লজ্জা দেবেন না নবীকে এবং তার মু’মিন সঙ্গীদেরকে, তাদের জ্যোতি তাদের সামনে ও দক্ষিণ পাশে ধাবিত হবে। তারা বলবে ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর, নিশ্চয় তুমি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।’ (সূরা তাহরিম : ৮)

৬. হজ ও ওমরাহ আদায় করা : হজ হলো ইসলাম ধর্মের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন-
وَ لِلّٰهِ عَلَی النَّاسِ حِجُّ الْبَیْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ اِلَیْهِ سَبِیْلًا ؕ وَ مَنْ كَفَرَ فَاِنَّ اللّٰهَ غَنِیٌّ عَنِ الْعٰلَمِیْنَ-
মানুষের মাঝে যাদের সেখানে (মক্কায়) যাবার সামর্থ্য রয়েছে, আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে সে ঘরের (কাবা) হজ করা তার অবশ্য কর্তব্য এবং কেউ যদি প্রত্যাখ্যান করে সে জেনে রাখুক নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন। (সূরা আলে ইমরান : ৯৭)
হাদীসে বলা হয়েছে-
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ اَنَّ النَّبِىَّ ﷺ- يَقُوْلُ :্র بُنِىَ الاِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ : شَهَادَةِ اَنْ لاَ اِلٰهَ اِلَّا اللّٰهُ ، وَاِقَامِ الصَّلاَةِ ، وَاِيْتَاءِ الزَّكَاةِ ، وَالْحَجِّ ، وَصَوْمِ رَمَضَانَ-
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত যে নবী কারিম সা. বলেছেন, পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত। এ কথার ঘোষণা দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ সা. আল্লাহ্র রাসূল, সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, (মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত কাবার) হজ করা, রমাদানে সিয়াম পালন করা। (মুসলিম-১২২)
নবী করিম সা. বলেছেন-
مَنْ حَجَّ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ اُمُّهُ-
যে ব্যক্তি হজ করেছে, তাতে কোনো অশ্লীল আচরণ করেনি ও কোন পাপে লিপ্ত হয়নি সে যেন সে দিনের মত নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে, যে দিন তার মা তাকে প্রসব করেছে। (বুখারী-১৪৪৯; মুসলিম-১৩৫০)
হাদীসে আরো বলা হয়েছে-
عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ اَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ قَالَ الْعُمْرَةُ اِلَى الْعُمْرَةِ كَفَّارَةٌ لِمَا بَيْنَهُمَا وَالْحَجُّ الْمَبْرُوْرُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ اِلَّا الْجَنَّةُ
আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, নবী কারিম সা. বলেছেন, ‘এক ওমরাহ থেকে অন্য ওমরাহকে তার মধ্যবর্তী পাপসমূহের কাফ্ফারা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। আর কলুষমুক্ত (গৃহীত) হজের পুরস্কার হলো জান্নাত। (বুখারী-১৭৭৩)
আর এ হজ জিলহজ মাস ছাড়া অন্য কোনো মাসে আদায় করা যায় না।

৭. ঈদের সালাত আদায় করা : রাসূলুল্লাহ সা. এ সালাত গুরুত্ব দিয়ে আদায় করেছেন। কোনো ঈদে সালাত পরিত্যাগ করেননি। বরং একে গুরুত্ব দিয়ে তিনি মহিলাদেরকেও এ সালাতে অংশ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ মর্মে হাদীসে বলা হয়েছে-
عَنْ اُمِّ عَطِيَّةَ قَالَتْ اَمَرَنَا رَسُوْلُ اللّٰهِ ﷺ- اَنْ نُخْرِجَهُنَّ فِى الْفِطْرِ وَالْاَضْحَى الْعَوَاتِقَ وَالْحُيَّضَ وَذَوَاتِ الْخُدُوْرِ فَاَمَّا الْحُيَّضُ فَيَعْتَزِلْنَ الصَّلاَةَ وَيَشْهَدْنَ الْخَيْرَ وَدَعْوَةَ الْمُسْلِمِيْنَ. قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ اِحْدَانَا لاَ يَكُوْنُ لَهَا جِلْبَابٌ قَالَ ্র لِتُلْبِسْهَا اُخْتُهَا مِنْ جِلْبَابِهَا-
উম্মে আতিয়া রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ সা. আদেশ করেছেন আমরা যেন মহিলাদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাতে সালাতের জন্য বের করে দেই; পরিণত বয়স্কা, ঋতুবতী ও গৃহবাসিনী সবাইকে। কিন্তু ঋতুবতী মহিলারা সালাত আদায় থেকে বিরত থাকবে কিন্তু কল্যাণ ও মুসলিমদের দোয়া প্রত্যক্ষ করতে অংশ নেবে। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন হে রাসূল। আমাদের মাঝে কারো কারো ওড়না নেই। রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন : সে তার অন্য বোন থেকে ওড়না নিয়ে পরিধান করবে। (মুসলিম-২০৯৩)

৮. কুরবানি করা : এ দিনগুলোর দশম দিন সামর্থ্যবান ব্যক্তির কুরবানি করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর
নবীকে কুরবানি করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন ও কুরবানি করুন।’ (সূরা কাওসার : ২)
عَنِ ابْنِ عُمَرَاَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ ﷺ- قَالَ يَوْم النَّحْرِ ্র اَىُّ يَوْمٍ هٰذَا গ্ধ. قَالُوْا يَوْمُ النَّحْرِ. قَالَ ্র هٰذَا يَوْمُ الْحَجِّ الْاَكْبَرِ-
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. কুরবানির দিন জিজ্ঞেস করেন, এটা কোন দিন? সাহাবাগণ উত্তরে বলেন এটা ইয়াওমুন্নাহার বা কুরবানির দিন। রাসূল সা. বলেন, এটা হলো ইয়াওমুল হজ্জিল আকবার বা শ্রেষ্ঠ হজের দিন।
(আবু দাউদ-১৯৪৭)
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ قَالَ قَالَ النَّبِىُّ ﷺ اِنَّ اَوَّلَ مَا نَبْدَاُ فِىْ يَوْمِنَا هَذَا اَنْ نُصَلِّىَ ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ فَمَنْ فَعَلَ ذَلِكَ فَقَدْ اَصَابَ سُنَّتَنَا وَمَنْ نَحَرَ قَبْلَ الصَّلَاةِ فَاِنَّمَا هُوَ لَحْمٌ قَدَّمَهُ لِاَهْلِهِ لَيْسَ مِنْ النُّسْكِ فِىْ شَىْءٍ-
বারা ইবনে আযেব রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘এ দিনটি আমরা শুরু করব সালাত দিয়ে। এরপর সালাত থেকে ফিরে আমরা কুরবানি করব। যে এমন আমল করবে সে আমাদের আদর্শ সঠিকভাবে অনুসরণ করেছে। আর যে এর পূর্বে জবেহ করে সে তার পরিবারবর্গের জন্য গোশতের ব্যবস্থা করবে। তাতে কুরবানির কিছু আদায় হলো না। (বুখারী-৯৬৫)
আর প্রত্যেক ইবাদত কবুলের প্রথম শর্ত হলো, ইবাদতে ইখলাস থাকা। অর্থাৎ ইবাদতটি খাঁটিভাবে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হওয়া। তাই কুরবানি করার উদ্দেশ্য হবে শরিয়াহ নির্দিষ্ট পশু নির্দিষ্ট সময়ে জবাই করার মাধ্যমে মহান আল্লাহকে রাজি-খুশি করা। কিন্তু তিক্ত সত্য হচ্ছে সমাজের বহু লোক কুরবানি দেয় গোশ্ত খাওয়ার উদ্দেশ্যে, যা তাদের কথাবার্তায় অনেক সময় প্রকাশও পায়। তারা বলে, কুরবানি না দিলে গ্রাম-সমাজের লোকেরা কী বলবে! সেদিন সবাই গোশ্ত খাবে আর আমার বাচ্চা-কাচ্চারা কী খাবে! আর অনেকে দেয় সমাজে প্রসিদ্ধ হওয়ার উদ্দেশ্যে ও নাম পাবার আশায়। তাই বাজারের সেরা পশু ক্রয় করে পত্র-পত্রিকায় প্রচার করে বা প্রচারের আশা করে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেন-
﴿لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلَكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوَى مِنْكُمْ﴾
“আল্লাহর কাছে ঐসবের গোশত এবং রক্ত পৌঁছে না বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া (আল্লাহ ভীরুতা)”
(সূরা হজ : ৩৭)
কুরবানির মূল উদ্দেশ্য আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভ। অর্থাৎ জিলহজের দশম তারিখে সুনির্দিষ্ট পশুর রক্ত প্রবাহিত করে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রচেষ্টাস্বরূপ তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করা।
উম্মাতে মুহাম্মাদির উপর আজ যে কুরবানির বিধান প্রতিষ্ঠিত, তা মুসলিম মিল্লাতের পিতা ইব্রাহিম ও তদীয় পুত্র ইসমাঈল (আ)-এর মধ্যকার এক বেদনাময় রোমহর্ষক পরীক্ষায় কৃতকার্য হওয়ার বিরল দৃষ্টান্তের প্রদর্শনী।
কিন্তু সময়ের পালাবদলে আমরা আজ ইবরাহিমি চেতনা থেকে যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছি। আজও আমাদের মাঝে কুরবানির বিধান চালু আছে। তবে এ কুরবানির সাথে তাকওয়া ও আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য লাভের প্রত্যাশা যেন বড্ড বেমানান। তাকওয়ার পরিবর্তে লৌকিকতা ও প্রদর্শনী আমাদের কুরবানিকে কলুষিত করছে।

হাদীসের শিক্ষা
১. জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমলের তুলনায় বছরের অন্য কোনো দিনের আমল এত মর্যাদাপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ নয়।
২. এ মাসের প্রথম দশ দিনের আমলে অবহেলা ও শৈথিল্য দেখানো কোনোক্রমেই কাম্য নয়।
৩. জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের নফল সিয়াম, তাহাজ্জুদ সালাত, কুরআন তিলাওয়াত, মহান আল্লাহর যিকির ও অন্যান্য সৎ আমলে আমাদের অগ্রণী হওয়া উচিত।
৪. এ মাসের ১০ তারিখে কুরবানি করতে হয়। যাদের সামর্থ্য আছে তারা এ দিনে ঈদের সালাতের পর পশু কুরবানি করবে।

লেখক : প্রভাষক, সিটি মডেল কলেজ, ঢাকা

SHARE

Leave a Reply