জিহবা ও ভাষার নিয়ন্ত্রণ আব্দুদ্দাইয়ান মুহাম্মদ ইউনুছ

আল্লাহ তায়ালা মানবদেহে হাত, পা, চোখ, কান, নাক, জিহবাসহ অনেক মূল্যবান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করেছেন। তিনি আল কুরআনে ইরশাদ করেন, “আমি কি তাকে দুটো চোখ, একটি জিহবা ও দুটি ঠোঁট দেই নাই? আমি কি তাকে দুটি সুস্পষ্ট পথ দেখাইনি..?” (সূরা বালাদ : ৮-১০)। আমরা চোখ দিয়ে বস্তু দেখি। কান দিয়ে শুনি। নাক দিয়ে গন্ধ অনুভব করি। পশুর মাঝেও এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে। কিন্তু মানুষ আর পশুর মাঝে পার্থক্য হচ্ছে পশুর চোখের সামনে যা পড়ে তা দেখে বা শোনে। কিন্তু মানুষের দেখা ও শোনার মাঝে আল্লাহর পছন্দ বা অপছন্দের সীমারেখার প্রতি খেয়াল রাখা হয়। মানুষ আর পশুর মাঝে পার্থক্য এখানে।

আল্লাহ তায়ালা জিহবার মাঝে পানি দিয়েছেন। আমরা যখন কথা বলি বা খানা-পিনা করি জিহবায় পানি আসে। এর মাধ্যমে খাদ্য সহজে খাদ্যনালীতে যায়। আল্লাহ তায়ালা খাবারের প্রতি লোকমার সাথে পরিমিত পানি সৃষ্টি করে দেন। জিহবা দিয়ে আমরা টক-মিষ্টি-ঝাল আস্বাদন করি; কথা বলি। মনের ভাব প্রকাশ করি। কিন্তু শুধু জিহবা থাকলেই মানুষ কথা বলতে পারেনা। এজন্য বাকশক্তি প্রয়োজন। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে কথা বলার জন্য বাকশক্তি দান করেছেন। কিন্তু পৃথিবীতে অনেক মানুষ আছেন যারা বোবা কথা বলতে পারেনা; কথা বলার নিয়ামত থেকে তারা চিরবঞ্চিত। আল্লাহ তায়ালা বাকশক্তি দান করার পর মানুষকে নেকি ও গোনাহের দুটি পথ দেখিয়ে ইচ্ছামত বাকশক্তি ব্যবহারের শক্তি দান করেছেন। তাই মানুষ বাকশক্তি প্রয়োগ করে ভালো কথা; নেকির যেমনি বলতে পারে তেমনি খারাপ কথা- গোনাহের কথাও উচ্চারণ করতে পারে। খারাপ কথা বলার সাথে সাথে আল্লাহ ইচ্ছা করলে বাকশক্তি রহিত করে দিতে পারতেন কিন্তু তিনি তা করেননা। তিনি জিহবাকে সিক্ত রেখেছেন সবসময় আল্লাহর যিকির করার জন্য। কুরআন তিলাওয়াত করার জন্য। দাওয়াতি কাজ করার জন্য। সঠিক কাজে সঠিকভাবে জবান ব্যবহার করা এবং ফাহেশা ও হারাম থেকে যবান হেফাজত করা মুমিন জীবনের বৈশিষ্ট্য। মিথ্যা কথা বলা, গীবত করা, অশ্লীল কথা বলা, ঝগড়া করা মস্ত বড় গুনাহ। অনেক মানুষ জিহবা ব্যবহার করে এই ধরনের পাপ করছে। তাই আল্লাহ তায়ালা জিহবা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর রাসূল জিহবা ও ভাষা হেফাজতের বাস্তব শিক্ষা দিয়েছেন।

আল কুরআনে লিসান শব্দের প্রয়োগ
আল কুরআনে লিসান শব্দটি কোথাও জিহবা আর কোথাও কোথাও মুখের ভাষা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। সূরা মায়েদার ৭৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন, বনি ইসরাইলের মধ্যে যারা কাফের তাদেরকে দাউদ ও মরিয়ম তনয় ঈসার মুখে অভিসম্পাত করা হয়েছে (লিসানে দাউদ ওয়া ঈসা)। সূরা ইবরাহিমের ৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ইরশাদ করেন, “আমি সব পয়গম্বরকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী (লিসানে কাওমিহ) করেই প্রেরণ করেছি। যাতে তাদেরকে পরিষ্কার করে বুঝাতে পারেন।” সূরা ত্ব-হার ২৭ নম্বর আয়াতে ‘উকদাতান মিন লিসানি’ দ্বারা জিহবা থেকে জড়তা দূর করার প্রার্থনা করা হয়েছে। সূরা মারইয়ামের ৯৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আমি কুরআনকে আপনার ভাষায় সহজ করে দিয়েছি, যাতে আপনি এর দ্বারা পরহেজগারদের সুসংবাদ দেন এবং কলহকারী সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন। সূরা কাসাসের ৩৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, আমার ভাই হারুন সে আমার চেয়ে প্রাঞ্জলভাষী। অতএব তাকে আমার সাথে সাহায্যের জন্য প্রেরণ করুন। সে আমাকে সমর্থন জানাবে। সূরা কিয়ামার ১৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, তাড়াতাড়ি শিখে নেয়ার জন্য আপনি দ্রুত অহি আবৃত্তি করবেন না।

জিহবা ও ভাষা সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা
প্রকৃত মুসলিম এর যবান নিয়ন্ত্রিত থাকে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন আমর থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে কারীম সা. বলেছেন প্রকৃত মুমিন সেই ব্যক্তি যার হাত ও যবান থেকে মুসলমানগণ নিরাপদ থাকে- বুখারী। এই হাদীসে লিসান শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। কালাম শব্দ বলা হয়নি। কারণ অনেক মানুষ আছে মূক তারা কথা বলতে পারেনা। কিন্তু মুখের অঙ্গভঙ্গি তথা জিহবা দ্বারাও অপরকে কষ্ট দিতে পারে। মুখের কথা বা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে ভদ্রতা আর অভদ্রতার পার্থক্য ফুটে উঠে। যাদের ভাষা নিকৃষ্ট তারা উত্তম চরিত্রের অধিকারী হতে পারেনা। এই কারণে রাসূলে কারীম সা. বলেন, বান্দার ঈমান ততক্ষণ পর্যন্ত সঠিক হবেনা যতক্ষণ না তার অন্তর সঠিক হবে। ততক্ষণ পর্যন্ত তার অন্তর সঠিক হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তার জিহবা সঠিক না হবে- মুসনাদে আহমদ।
যে ব্যক্তি জবানের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না শয়তান তার দ্বারা অনেক কাজ করায় যা তার জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয়। স্বামী-স্ত্রীর মাঝে তালাক পর্যন্ত হয়ে যায় জিহবা নিয়ন্ত্রণ না রাখার কারণে। এজন্য রাসূলে কারীম সা. রাগের সময় নীরব থাকতে বলেছেন। ইবন জাওযী বলেন আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে অনেক মানুষ হারাম খাবার, যেনা বা চুরি থেকে বিরত থাকতে পারে কিন্তু জিহবার অপব্যবহার থেকে বিরত থাকতে পারেনা। হযরত সুফিয়ান ইবন আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আরজ করলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার জন্য সবচেয়ে ভয় করার বস্তু কী? তখন রাসূলে কারীম সা. স্বয়ং জিহবাকে বের করে তা হাত দিয়ে ধরে বলেন এটা। জিহবাকে ভয় করার অর্থ সাবধানতা অবলম্বন করা, সচেতনতার সাথে বাক্য প্রয়োগ করা; অনর্থক বাজে কথা না বলা। আমাদের সব কথা-বার্তা লিপিবদ্ধ করা হয়। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘স্মরণ রেখো দুই গ্রহণকারী ফিরিশতা তার ডানে ও বামে বসে তার কর্ম লিপিবদ্ধ করে। মানুষ যা উচ্চারণ করে তার জন্য একজন প্রহরী নিযুক্ত আছে। যে লেখার জন্য সদা প্রস্তুত।’- (সূরা কাফ : ১৭-১৮)

সুফিয়ান সাওরী একদিন তার সঙ্গীদেরকে বলেন তোমাদের মধ্যে যদি এমন কেউ থাকে, যে তোমাদের কথা সুলতানের কাছে পৌঁছে দিবে, তোমরা কি কোন বলা বলবে? সঙ্গীরা বললেন জি না। তিনি তখন বললেন তাহলে জেনে রাখ তোমাদের সাথে এমন লোক আছেন যিনি কথা পৌঁছান অর্থাৎ ফেরেশতাগণ।
জিহবা একদিকে মানুষের বন্ধু অপরদিকে বড় এক শত্রু। জিহবাকে মানব দেহের বডিগার্ড বলা হয়। কোনো বাড়ির গার্ড যদি অসুস্থ হয়ে যায় যেমনি বাড়ির নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়। তেমনিভাবে কারো জিহবা অসংযত হওয়ার রোগে আক্রান্ত হলে সেই ব্যক্তি কাকে কি বলে এই নিরাপত্তাহীনতায় সকলে ভোগে। তাই রাসূলে কারীম সা. জিহবা সংযমের নির্দেশনা দান করেছেন। হযরত উমর বলেন, রাসূলে কারীম সা. বলেছেন যে ব্যক্তি জিহবাকে নিয়ন্ত্রণ রাখেন আল্লাহ তায়ালা তার দোষ ঢেকে দেন।

জিহবা নিয়ন্ত্রণের উপকারিতা
আখিরাতে নাজাতের পথ বাক সংযম। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেন, সেদিন তাদের বিরুদ্ধে তাদের জিহবা হাত ও পা তাদের কৃতকর্ম সম্বন্ধে সাক্ষ্য দিবে- (সূরা নূর : ২৪)
হযরত উকবা বিন আমের থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল আখিরাতে নাজাত পাওয়ার উপায় কী? তিনি জবাব দিলেন তোমার কথাবার্তা সংযত রাখ; তোমার ঘরকে প্রশস্ত কর (অর্থাৎ মেহমানদারি কর) এবং তোমার কৃত আমলের জন্য আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি কর- তিরমিজি। হযরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে কারীম সা. বলেছেন মানুষ সকালে ঘুম থেকে উঠলে সকল অঙ্গ প্রত্যঙ্গ জিহবাকে অনুনয় বিনয় করে বলে তুমি আমাদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর। তুমি যদি সঠিক পথে থাক আমরাও সঠিক পথে থাকতে পারি। আর তুমি যদি বাঁকা পথে চল তাহলে আমরাও বাঁকা পথে যেতে বাধ্য- তিরমিজি।

জবানের হিফাজতে জান্নাতের গ্যারান্টি
হযরত সাহল ইবন সাদ থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি তার দুই চোয়ালের মধ্যবর্তী বস্তু অর্থাৎ জিহবা এবং তার দুই ঊরুর মধ্যবর্তী তথা লজ্জাস্থানের জিম্মাদার হবে আমি তার জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হব- বুখারী

জিহবা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার শাস্তি
হযরত আবু সাঈদ খুদরী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একবার মুয়ায ইবন জাবাল আল্লাহর রাসূলকে প্রশ্ন করলেন হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যা কিছু বলি তা নিয়ে কি আমাদের পাকড়াও করা হবে। তখন আল্লাহর রাসূল বলেন, ‘হে মুয়ায জবান হেফাজত না করার কারণে মানুষকে উপুড় করে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে’- তিরমিজি।

জবানের হেফাজতে কতিপয় বর্জনীয় কাজ

অপ্রয়োজনীয় ও অনর্থক কথা : সূরা মুমিনুনের ১-৩ আয়াতে মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে ‘অবশ্যই মুমিনরা সফলকাম হয়েছে যারা নিজেদের সালাতে বিন¤্র। যারা অনর্থক ক্রিয়াকলাপ থেকে বিরত থাকে।’ এই আয়াতে উল্লিখিত লাগউন শব্দের অর্থ অনর্থক কথা বা কাজ। আল্লাহর প্রিয়বান্দা হতে চাইলে আমাদেরকে অনর্থক কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। রাসূলে কারীম সা. বলেন, ব্যক্তি ভালো মুসলিম হওয়ার একটি বৈশিষ্ট্য হলো অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা- তিরমিজি। হযরত লোকমান হাকীমকে প্রশ্ন করা হলো আপনাকে কোন জিনিস বিজ্ঞ করেছে? তিনি জবাব দিলেন ‘আমি অনর্থক কোনো কথা বলি না।’

গালি দেয়া : মুমিন কাউকে গালি দেয় না বা অশ্লীল কথা বলে না। রাসূলে কারীম সা. বলেন, মুমিন দোষ চর্চাকারী হয় না; লানতকারী, অশ্লীল ও গালিগালাজকারী হয় না বাজে কথা বলে না- তিরমিজি। রাসূলে কারীম সা. বলেন, কোনো মুসলিমকে গালি দেয়া ফিসক (গুনাহের কাজ) আর তাকে হত্যা করা কুফর- বুখারী ও মুসলিম। তিনি আরো বলেন, চারটি মন্দ স্বভাব আছে এগুলো যার মধ্যে থাকবে সে খালেস মুনাফিক বলে গণ্য হবে। এই চার স্বভাবের একটি কারো মাঝে থাকলে তার মাঝে মুনাফেকির একটি স্বভাব থাকল। যতক্ষণ না সে তা বর্জন করে। ১. আমানত রাখলে খেয়ানত করে ২. কথা বলে তো মিথ্যা বলে। ৩. প্রতিশ্রুতি দিলে ভঙ্গ করে ৪. তর্কের সময় গালি গালাজ করে- বুখারী। মানুষ অনেক সময় রাগের সময় গালিগালাজ করে। তাই রাসূলে কারীম সা. বলেন, কেউ যখন রেগে যায় সে যেন চুপ হয়ে যায়- মুসনাদে আহমদ। রাসূলে সা. আরও বলেন, সবচেয়ে বড় কবিরাহ গুনাহ হল ব্যক্তি তার মা- বাবাকে গালি দেয়া। একথা শুনে সাহাবারা বললেন নিজের মা-বাবাকে মানুষ আবার গালি দেয় কিভাবে? উত্তরে আল্লাহর রাসূল বললেন, ব্যক্তি কারো মা-বাবাকে গালি দেয় তখন সে গালিদাতা তার মা-বাবাকে গালি দেয়- বুখারী।
অশ্লীল কথা : হযরত আবু দারদা থেকে বর্ণিত আল্লাহর রাসূল বলেন, কিয়ামতের দিন মুমিনের জন্য মিযানের পাল্লায় সদ্ব্যবহারের চেয়ে অধিক ভারী আর কিছু হবেনা। আল্লাহ তায়ালা অশ্লীল ও কটুভাষীকে অবশ্যই ঘৃণা করেন- তিরমিজি। রাসূলে কারীম সা. বদর যুদ্ধে যেসব কাফের নিহত হয়েছে তাদেরকে গালি দিতে নিষেধ করেন।

মিথ্যা কথা : মিথ্যা সকল পাপের মূল। মুমিন মিথ্যা বলতে পারে না কারণ মিথ্যা মুনাফিকের স্বভাব। হযরত আব্দুল্লাহ ইবন উমর থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন যখন কোন ব্যক্তি মিথ্যা বলে তখন এর দুর্গন্ধে ফেরেশতারা তার থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়- তিরমিজি। হযরত মুয়াবিয়া ইবন হাইদা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে কারীম সা. বলেছেন দুর্ভোগ তার জন্য যে মানুষকে হাসানোর জন্য মিথ্যা গল্প বানিয়ে বলে। দুর্ভোগ তার জন্য দুর্ভোগ তার জন্য- আবু দাউদ। আল্লাহর রাসূল সা. একবার সাহাবাদেরকে বললেন, আমি কি তোমাদেরকে সব চেয়ে বড় কবিরাহ গুনাহ সমূহের কথা বলে দিব? সাহাবাগণ বললেন অবশ্যই বলুন আল্লাহর রাসূল। তখন নবী করীম সা. বললেন, আল্লাহর সাথে শিরক করা। মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া (এতটুকু বলা পর্যন্ত নবী করিম সা. হেলান দেয়া অবস্থায় ছিলেন। এরপর নবীজি হেলান দেয়া থেকে বসে বললেন আরো ভালো করে খেয়াল রাখ বড় কবিরাহ গুনাহসমূহের অন্যতম হলো মিথ্যা বলা, মিথ্যা বলা, মিথ্যা বলা। নবীজি অতি গুরুত্বের সাথে এই কথা বারবার বলতে লাগলেন। এটা দেখে আমরা মনে মনে ভাবলাম নবীজির তো কষ্ট হচ্ছে। নবীজি যদি একট চুপ করতেন- বুখারী। আল্লাহর রাসূল আরও বলেন তোমরা মিথ্যা থেকে দূরে থাক। নিশ্চয়ই মিথ্যা পাপের পথে নিয়ে যায়। আর পাপ জাহান্নামে নিয়ে যায়।

মিথ্যা সাক্ষ্য : মুমিন কখনও মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে পারে না। আল্লাহ সূরা ফুরকানের ৭২ নম্বর আয়াতে মুমিনের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে ইরশাদ করেন, ‘যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না। অসার ক্রিয়া কথার সম্মুখীন হলে ভদ্রতার সাথে পরিহার করে অতিক্রম করে।’ আল্লাহর রাসূল বলেন, তোমরা শুনে রাখ বড় কবিরাহ গুনাহের অন্যতম হলো মিথ্যা কথা, মিথ্যা সাক্ষ্য, মিথ্যা কথা, মিথ্যা সাক্ষ্য- বুখারী।

মিথ্যা কসম : সাধারণত কসম করা হয় কাউকে কোন কথা বিশ্বাস করানোর জন্য। নিজের কথার গুরুত্ব বুঝানোর জন্য। প্রমাণবিহীন কথার প্রমাণস্বরূপ পেশ করার জন্য। আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত কঠোরভাবে মিথ্যা কসমের নিন্দা করে বলেন: যারা আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতি এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে। পরকালে তাদের কোন অংশ নাই। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তাদের সাথে কথা বলবেন না। তাদের দিকে তাকাবেন না এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন না। তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি- (সূরা আলে ইমরান : ৭৭) আল্লাহর রাসূল বলেন, কেউ যদি মিথ্যা কসমের মাধ্যমে কোন মুসলিমের হক কেটে দেয় (মিথ্যা কসমের মাধ্যমে কারো হক নষ্ট করে) আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম অবধারিত করে দেন এবং জান্নাত হারাম করে দেন। একথা শুনে এক সাহাবী বললেন যদি সামান্য বস্তুর ক্ষেত্রে এমনটি ঘটে। তখন নবী করীম সা. বললেন হ্যাঁ যদি আরাকের (এক প্রকার গাছ) সামান্য একটি ডালও হয়- মুসলিম।

গীবত : জবানের দ্বারা সংঘটিত গুনাহের মাঝে মানুষ অহরহ গীবত করে। হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে কারীম সা.কে প্রশ্ন করা হল গীবত কী? তিনি উত্তরে বলেন গীবত হলো এই যে তুমি তোমার ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার সম্বন্ধে এমন কিছু আলোচনা করবে যা সে অপছন্দ করে। আবার প্রশ্ন করা হল তার সম্বন্ধে যা আলোচনা করা হল তা যদি তার মধ্যে বাস্তব থাকে। জবাবে তিনি বললেন হ্যাঁ গীবত তো এটাই। আর যদি বাস্তবে দোষ তার মধ্যে না থাকে ওটাতো অপবাদ- বুখারী। রাসূলে কারীম সা. আরও বলেন, এক মুসলমান অন্য মুসলমানের রক্ত, সম্পদ ও সম্মানহানি হারাম- মুসলিম। আমরা ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনেকরই গীবত করি। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে এই বিষয়ে সতর্ক করে ইরশাদ করেন, হে মুমিনগণ তোমরা অধিকাংশ অনুমান থেকে বেঁচে থাক। কারণ কোনো কোনো অনুমান গুনাহ। তোমরা কারো গোপন ত্রুটি অনুসন্ধানে পড়বে না এবং তোমরা একে অপরের গীবত করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে। তোমরা তা অপছন্দ করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী অসীম দয়ালু- (সূরা হুজুরাত : ১২) রাসূলে কারীম সা. বলেছেন গীবত যেনার চেয়ে জঘন্য। আল্লাহর রাসূল বলেন, মিরাজের সময় আমি কিছু লোকের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলাম যাদের ছিল তামার নখ। সেই নখ দিয়ে তারা নিজেদের চেহারা এবং বুক ক্ষত-বিক্ষত করছিল। আমি বললাম জিবরাইল এরা কারা। উত্তরে তিনি বললেন যারা দুনিয়াতে মানুষের গোশত খেত অর্থাৎ গীবত করত এবং মানুষের সম্মানহানি করত- আবু দাউদ।

পরনিন্দা : সমাজজীবনে ফেতনা-ফাসাদের অনেক ঘটনা চোগল-খুরি বা পরনিন্দার কারণে হয়। পরনিন্দাকারী অন্যকে লাঞ্ছিত করতে গিয়ে নিজে লাঞ্ছিত হয়। আল্লাহ তায়ালা এই ধরনের স্বভাবের নিন্দা করে বলেন, “দুর্ভোগ প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির যে পেছনে ও সামনে মানুষের নিন্দা করে” (সূরা হুমাযাহ : ১) রাসূল সা. বলেন, পরনিন্দাকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না- মুসলিম।

দ্বিমুখীপনা / চোগলখুরি : হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে কারীম সা. বলেছেন, দ্বিমুখী চরিত্রের লোকেরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বেশি নিকৃষ্ট বলে গণ্য হবে- বুখারী। অন্য এক হাদীসে উল্লেখ আছে যে, একবার রাসূলে কারীম সা. দুটি নতুন কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দাঁড়িয়ে গেলেন। দুআ করলেন। খেজুরের ডাল দুই টুকরা করে দুটি কবরে গেড়ে দিলেন। সাহাবায়ে কেরাম কিছুই বুঝতে পারলেন না। কারণ জিজ্ঞাসা করলে রাসূলে কারীম সা. বললেন কবর দুটিতে এমন কোন গুনাহের কারণে তাদের শাস্তি হচ্ছে না যা থেকে বেঁচে থাকা তাদের জন্য কঠিন ছিল। সহজেই তারা বাঁচতে পারতো। কিন্তু বেঁচে থাকেনি। একজন পেশাবের ফোঁটা থেকে বেঁচে থাকেনি। অপরজন চোগলখুরি করে বেড়াতো। আল্লাহ তায়ালা দুজনকে শাস্তি দিয়েছেন- বুখারী।

দোষ চর্চা করা : একদিন হযরত আয়েশা নিজের কথা বর্ণনা করেন যে, আমি একবার নবী করিম সা.-এর কাছে সাফিয়্যা সম্পর্কে বললাম সাফিয়্যা তো এই (অর্থাৎ বেঁটে)। এই কথা শুনে নবীজি বললেন তুমি এমন কথা বলেছো যদি তা সাগরের পানিতে মিশিয়ে দেয়া হয় তাহলে সাগরের পানি ঘোলা হয়ে যাবে- সুনানে আবু দাউদ। কারো দোষ বর্ণনার পরিবর্তে তা ঢেকে রাখা নেকির কাজ। আবু হুরাইরা বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, যে বান্দাহ অন্য বান্দার দোষত্রুটি ইহজীবনে গোপন রাখবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন- মুসলিম।

তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ও মন্দ নামে ডাকা : হাসি তামাশার স্থলে বা ইচ্ছা করে কাউকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা বা মন্দ নামে ডাকতে দেখা যায়। কিন্তু এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ কোন পুরুষ যেন অপর কোন পুরুষকে উপহাস না করে কেননা যাকে উপহাস করা হচ্ছে সে উপহাসকারী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। কোন নারী অপর কোন নারীকে যেন উপহাস না করে। কেননা যাকে উপহাস করা হয় সে উপহাসকারিণী অপেক্ষা উত্তম হতে পারে। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করোনা এবং একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমানের পর মন্দ নাম অতি মন্দ। যারা এসব থেকে বিরত না হবে তারা যালেম-(সূরা হুজুরাত : ১১) মাওলানা তাকী উসমানী তাফসীরে তাওযিহুল কুরআনে উল্লেখ করেন যে, কাউকে খারাপ নাম দিয়ে দিলে তা তার জন্য পীড়াদায়ক হয়। কাউকে অপমান করা বা তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করা মুমিনের স্বভাব হতে পারেনা। রাসূলে কারীম সা. বলেন, তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে যাও। মুসলিম মুসলিমের ভাই। একে অপরের প্রতি যুলুম করোনা এবং তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করোনা- মুসলিম।

বিতর্ক করা : হযরত আবু উমামা বাহেলী থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে কারীম সা. বলেছেন, আমি ঐ ব্যক্তির জন্য জান্নাতের কিনারায় একটি ঘরের দায়িত্ব গ্রহণ করব যে সত্য ও সঠিক হবার পরও বিতর্ক ছেড়ে দেয়। আর ঐ ব্যক্তির জন্য জান্নাতের মধ্যস্থলে কোন গৃহের জামিন হব যে ঠাট্টাস্থলেও মিথ্যা পরিহার করে। আর যে ব্যক্তির চরিত্র সুন্দর হবে তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে একটি ঘরের দায়িত্ব গ্রহণ করব- আবু দাউদ।

হাসি তামাশা ও ঠাট্টা করা : কাউকে নিয়ে হাসি তামাশা করা শোভনীয় নয়। হযরত আবু হুরায়রা বলেন, সাহাবায়ে কেরাম রাসূলে কারীম সা.কে একবার বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনিও আমাদের সাথে হাসি তামাশা করেন। তখন নবীজি বলেন হ্যাঁ আমি হাসি তামাশা করি তবে আমি সত্য ছাড়া বলিনা- তিরমিজি। এই হাদীস থেকে বুঝা যায় সত্য কথা শরিয়তের সীমার মাঝে আনন্দদায়কভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারে। তবে এটা মাঝে মধ্যে করা যায়। সব সময় হাসি তামাশায় মত্ত থাকা ঠিক নয়।
শোনা কথা বলে বেড়ানো : হযরত আবু হুরাইরা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে কারীম সা.কে বলতে শুনেছেন যেকোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে সে যা শুনে তা বলে বেড়ায়- মুসলিম।

ভালো-মন্দ বিচার না করে কথা বলা : আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত তিনি রাসূলুল্লাহকে বলতে শুনেছেন কোন বান্দা ভালো মন্দ বিচার না করে এমন কথা বলে যার কারণে সে পদস্খলিত হয়ে জাহান্নামের এতদূর গভীরে চলে যায় যা পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের দূরত্বের সমান- বুখারী।

কথায় কষ্ট দেয়া: হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত রাসূলে কারীম সা. এর সামনে একজন নারী সম্পর্কে বলা হল সে খুব নফল নামায পড়ে রোযা রাখে এবং দান সদকা করে। কিন্তু তার মুখের ভাষা প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয়। রাসূলুল্লাহ বললেন সে জাহান্নামি। ঐ ব্যক্তি আরেকজন নারী সম্পর্কে বললেন যার নফল রোযা ও দান সদকার ক্ষেত্রে কোন প্রসিদ্ধি নাই। কখন হয়ত সামান্য পনিরের টুকরা সদকা করে তবে সে প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। কেউ তার মুখের ভাষায় কষ্ট পায় না। রাসূলুল্লাহ বললেন সে জান্নাতি- মুসনাদে আহমদ।

অভিশাপ ও বদদোয়া : হযরত সামুরা ইবনে জুন্দব থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল বলেছেন তোমরা একে অপরকে আল্লাহর অভিসম্পাত, তাঁর গজব ও জাহান্নামের বদদোয়া করো না- মুসনাদে আহমদ।

গোপন কথা ফাঁস করা, প্রতিশ্রতি ভঙ্গ করা: কারো গোপন কথা ফাঁস করা বড় ধরনের অপরাধ। অর্থ-সম্পদ যেমনিভাবে আমানত অনুরূপভাবে গোপন কথা বার্তাও আমানত। আমরা অনেক সময় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই যে গোপন কথা ফাঁস করব না কিন্তু কারো সাথে ঝগড়া হলে অথবা মুখ ফসকে অহরহ গোপন কথা ফাঁস করতে দেখা যায়। আবার বলা হয় এটা অত্যন্ত গোপন। শুধু আপনাকেই বলছি। আপনি আর কাউকে বলবেন না।

অহেতুক তোষামোদী করা: একজন মানুষ আরেকজনকে কৃতজ্ঞতা জানানো ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু তোষামোদী করে প্রশংসা করবে না। আল্লাহ তায়ালা তখন অসন্তুষ্ট হন যখন কোন ফাসেকের প্রশংসা করা হয়। তবে কারো গুণাবলি তুলে ধরা তোষামোদী নয়। যেমন রাসূলে কারীম সা. আবু বকর, উমর, উসমান, আলী, মায়ায ইবন জাবালসহ অনেক সাহাবার গুণাবলি তুলে ধরে প্রশংসা করেছেন।

তাকাল্লুফি করা: অনেক সময় দেখা যায় কারো ক্ষুধা আছে। যদি জিজ্ঞাসা করা হয় আপনার কি ক্ষুধা আছে? আপনি কিছু খাবেন? তখন পেটে ক্ষুধা রেখেও বলা হয় না ক্ষুধা নেই। এই ধরনের তাকাল্লুফি ঠিক নয়। আসল অবস্থা বর্ণনা করা উচিত।

(আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

SHARE

Leave a Reply